আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার পথে বাধাসমূহ ( পর্ব - ২)

প্রথম পর্বঃ আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার পথে বাধাসমূহ

ঘ. অনিয়ন্ত্রিত রাগ

চতুর্থ যে বদগুণ মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তা হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত রাগ। যখনই আপনি আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবেন আপনি দেখবেন আপনার জীবন আনন্দময় ও সহজ হয়ে গিয়েছে। আল্লাহর পথে কাজ করাই আপনার জন্য আনন্দের বিষয় মনে হবে। দেখবেন ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অথবা সংগঠনের সদস্যদের মধ্যকার বিরোধগুলো অতি সহজেই সমাধান হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সামাজিক এবং সাংগঠনিক জীবনে যেসব ব্যক্তিগত অমিল ও সংঘাত স্থায়ী হয় তা আসলে এজন্য যে আমরা পরিপূর্ণ ভাবে আল্লাহর পথে আন্তরিক হতে পারিনি।
যদি আপনি শুধুমাত্র আল্লাহরই তুষ্টির জন্য সবকিছু করতে থাকেন তবে কারো পক্ষ থেকে অবমাননা বা উপেক্ষার জবাবে আপনার রাগ করবার প্রয়োজন হবে না। কারণ সেই ব্যক্তি তার কাজ দিয়ে আপনার কোন ক্ষতি করছে না। কেবলমাত্র আল্লাহর অসন্তষ্টিই মুমিনকে শংকিত করবে। মনে রাখবেন আল্লাহ বলেছেন- “কারো প্রতি শত্রুতা তোমাদের যেন এত উত্তেজিত করে না দেয় যে তার ফলে তোমরা বেইনসাফী করবে; সর্বদা ইনসাফ কর।” (আল-কুরআন ৫:৮)

আপনি কেন রাগ করবেন? একটি ইসলামী সংগঠনে যেখানে সকল ভাই-বোনকে একসাথে আল্লাহর পথে হাতে হাত রেখে চলতে হয় সেখানে অনিয়ন্ত্রিত রাগ বা অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা  এবং পারস্পরিক বিবাদ ইসলামী জামায়াতকে সংকটাপন্ন করে। মনে রাখবেন আমরা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করছি। সেখানে আপনার সকল ভাল আমলকে গর্ব-অহংকার দিয়ে ধ্বংস করবেন না অথবা আপনার নফসকে নিছক ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ বা শুধু নিজের লাভের লক্ষ্যে নিয়োজিত করবেন না। আপনার রাগকে নিয়ন্ত্রিত করবার পন্থা উদ্ভাবন করুন।

রাসূল (সাঃ) উপদেশ দিয়েছেন, “যদি তোমাদের কারো দাঁড়ানো অবস্থায় রাগ উঠে তবে যেন সে বসে পড়ে; যদি এতেও রাগ দূর না হয় তবে যেন সে শুয়ে পড়ে।” (আহম্মদ, তিরমিযি)

আমাদের হৃদয়কে সকল নেতিবাচক আচরণ থেকে মুক্ত করতে রাসূল (সাঃ) আমাদের আরও কিছু দোয়া শিখিয়েছেন, “হে আল্লাহ আমার হৃদয়কে শঠতা থেকে মুক্ত করে দাও এবং আমার কাজকে সকল ভান (লোক-দেখানো) থেকে মুক্ত করে দাও।” (বুখারী)

“হে আল্লাহ আমার মধ্যে তোমার প্রতি ভালবাসাকে চিরস্থায়ী করে দাও। এমন ভালবাসা পয়দা করে দাও যেভাবে তোমার প্রিয় মানুষ তোমাকে ভালবাসে। এমন ভালবাসা যা আমাকে তোমার নিকটতর করে দেয়। আমার প্রতি তোমার ভালবাসাকে (তীব্র গরমে) শীতল পানির চাইতে প্রিয়তর করে দাও।”(বুখারী)

এধরণের আরও অনেক দোয়া রাসূল (সাঃ) শিখিয়েছেন। এসব দোয়া ও ইবাদত হচ্ছে আত্মার খোরাক, ক্বলব এর পুষ্টিদাতা, এবং জীবনে সফল হবার পাথেয়। জীবনের সকল তৎপরতায় এসব দোয়া উচ্চারণ করুন; পড়াশুনার সময়, কাজের সময়, সন্তানকে শিক্ষা প্রদানের সময়।

মনে রাখবেন যদি আমরা নিছক দুনিয়াবী স্বার্থপ্রণোদিত হয়েই কাজ করি তবে আত্মা তার খোরাক বঞ্চিত হবে, আমাদের সব ভাল আমল হারিয়ে যাবে। কুরআনে বলা হয়েছে, “যেসব লোক নিজেদের খোদার সাথে কুফরী করেছে তাদের কাজের দৃষ্টান্ত সেই ভস্মের মত যাকে এক  ঝড়ো হাওয়া উড়িয়ে দিয়েছে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের কোন ফলই পাবে না। এটাই প্রথম পর্যায়ের পথভ্রষ্টতা।”(আল-কুরআন ১৪:১৮)

ঙ. জিহবার অপব্যবহার

পঞ্চম ভয়াবহ বদঅভ্যাস হচ্ছে জিহবার অপব্যবহার। জিহবার ব্যবহার এর বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এর অপব্যবহার দোজখের আগুনকে দ্রুত নিকটতর করে। মিথ্যা, অশ্লীল, নোংরা কথা, গীবত এবং কটুভাষণ যেন আমাদের জিহবা থেকে নির্গত না হয়। অন্যদের বিষয়ে বলার সময় আমরা যেন সবোর্চ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের কেউ আমাকে অন্যের বিষয়ে কিছু বলা থেকে বিরত থাকো কারণ আমি তোমাদের প্রত্যেককে পরিস্কার হৃদয় বিশিষ্ট দেখতে চাই।” (আবু দাউদ)
জিহবাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবার সহজতম উপায় হচ্ছে পারস্পরিক কথোপকথনের সময়েও মনে আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত রাখা। এ বিষয়ে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “আল্লাহর জিকির ছাড়া দীর্ঘ সময় কথা বলো না, কারণ দীর্ঘসময় আল্লাহর স্মরণ বিহীন কথাবার্তা হৃদয়কে কঠোর করে দেয়, আর যার হৃদয় কঠোর সে আল্লাহর কাছ থেকে সবচেয়ে দূরের মানুষ।” (তিরমিযি)

চ. যৌন লালসা

আল্লাহর কাছের মানুষ হবার পথে ষষ্ঠ এবং সর্বশেষ বাধা হচ্ছে লালসাপূর্ণ যৌনাকাঙ্খা। আল্লাহ আমাদের যেসব শক্তিশালী তাড়না দিয়ে তৈরী করেছেন যৌনতা তার অন্যতম। পবিত্র কেুরআনে আল্লাতায়ালা সেইসব মানুষের প্রশংসা করেছেন যারা তাদের যৌনাঙ্গকে হেফাজতে রাখে ।(আল-কুরআন ২৪:৩০-৩১)
প্রচন্ড লোভের মুখেও মুমিন বান্দারা তাদের যৌনাকাঙ্খাকে নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রেখে তাদের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করতে সমর্থ হয়।

মানুষের যৌনাঙ্গের অপব্যবহার ব্যাভিচার বা জেনার দিকে চালিত করে যাকে কুরআনে মহাপাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে “হে ঈমানদারগণ তোমরা জেনার নিকটবর্তী হয়ো না, এটা এক বিরাট অসাধুতা এবং শয়তানী পন্থা।” (আল-কুরআন ১৭:৩২)

এই আয়াতে অবৈধ যৌনাকাঙ্খা জাগ্রত হয় তথা নারী পুরুষের মাঝে আপত্তিকর সম্পর্ক সৃষ্টি হয় এমন সব ক্ষেত্রকে এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত উপদেশ দেয়া হয়েছেঃ

সামর্থ থাকলে আমাদের বিয়ে করা উচিত। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “হে যুবকগণ! তোমাদের মাঝে যারা স্ত্রীর ভরণপোষণে সক্ষম তাদের বিয়ে করা উচিত। কারণ এটা তোমাদের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করবে এবং অন্য স্ত্রী লোকদের দিকে চাহনি থেকে তোমাদের মুক্ত রাখবে।” (বুখারী) যদি আপনার বিয়ের আর্থিক সঙ্গতি না থাকে তবে আপনার নফল রোযা রাখা উত্তম কারণ এটা আপনার যৌনাকাঙ্খাকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে সাহায্য করবে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “হে যুবকগণ তোমাদের বিয়ে করা উচিত। যারা বিয়ে করতে (আর্থিকভাবে) অক্ষম তাদের রোযা রাখা উচিত কারণ রোযা যৌনকাঙ্খা কমায়।” (বুখারী)

আমাদের শরীরের সকল অংশকে (শুধুমাত্র লজ্জাস্থানকে নয়) জেনার নিকটবর্তী হওয়া থেকে দূরে রাখতে হবে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “আদম সন্তানের প্রত্যেক অঙ্গেরই যেনা হতে পারে। চোখ এর জেনা হতে পারে লালসার দৃষ্টির মাধ্যমে। হাতের জেনা হতে পারে স্পর্শের মাধ্যমে। পায়ের জেনা হতে পারে অনৈতিক কাজের স্থানে গমনের মাধ্যমে। মুখের জেনা হতে পারে চুম্বনের মাধ্যমে। হৃদয়ের জেনা হতে পারে কুচিন্তার মাধ্যমে যা যৌন অঙ্গের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে।” (বুখারী, মুসলিম) এজন্য রাসূল (সাঃ) সব সময় শয়তানের কবল থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন।”(আবু দাউদ)

বিপরীত লিঙ্গের মানুষের দিকে কামনার দৃষ্টিতে তাকানো বর্জন করতে হবে। রাসূল (সাঃ) কামনার দৃষ্টিতে তাকানোকে চোখের জেনা বলেছেন, ‘চোখেরও জেনা হতে পারে এবং তা হচ্ছে লালসার (কামনার) দৃষ্টি।(বুখারী) তিনি আরও বলেছেন, লালসার দৃষ্টি হচ্ছে শয়তানের তরফ থেকে আসা এক বিষাক্ত তীর; যে এটা থেকে আল্লাহর ভয়ে নিজেকে বিরত রাখবে তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে; এর ফলে সে অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করবে।(মুসনাদ ইবনে হাম্বল)

অন্যের ‘আওরা’ বা গোপন অঙ্গের দিকে তাকানো পরিহার করতে হবে। রাসূল (সাঃ) অন্যের গোপন অঙ্গের দিকে তাকাতে বারণ করেছেন। “একজন পুরুষ অপর পুরুষের গোপন অঙ্গের দিকে তাকাবেনা, কোন নারী অপর নারীর গোপন অঙ্গের দিকে তাকাবে না, এক চাদর-এর নীচে দুজন পুরুষ ঘুমানো ঠিক নয় এবং এক চাদরের নীচে দুজন নারীও ঘুমানো ঠিক নয়।” (মুসলিম)

আমাদের ‘খালওয়া’ আইন মেনে চলা উচিৎ।  খালওয়া হচ্ছে এক ঘরে নারী-পুরুষের এমন অবস্থান যেখানে তৃতীয় কোন ব্যক্তি নেই এবং তৃতীয় কোন ব্যক্তি আসবার সম্ভাবনা নেই। এ ধরণের পরিবেশ মানুষের অসৎ চিন্তা বাস্তবায়নে সহায়ক হয়। ইসলাম মাহরাম আত্মীয়তার বাইরের নারী পুরুষের ‘খালওয়া’ নিষেধ করেছে। এর মানে এই নয় যে ইসলাম আমাদের উপর আস্থা কম রাখছে; এর মানে এই যে কোন শয়তানী প্ররোচনার মুখোমুখী হওয়া থেকে আমাদের মুক্ত রাখা। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘যারাই আল্লাহ এবং হাশরের বিশ্বাসী তারা যেন কোন (গায়রে মাহরাম) মহিলার সাথে একাকী নিভৃতে (তার মাহরাম আত্মীয় বা তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়া) না বসে, তা না হলে তাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে শয়তান উপস্থিত হবে।” (আহমাদ)

সূত্রঃ বিআইআইটি (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট) কর্তৃক প্রকাশিত “সুবহে সাদিক” গ্রন্থ
 

 

৬১৩

বার পঠিত

খুররম জাহ্ মুরাদ

উস্তাদ খুররম জাহ্ মুরাদ (১৯৩২-১৯৯৬) ইসলামী পুনর্জাগরণের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে দা’য়ী, ইসলামী চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। মূলতঃ পাকিস্থানী হলেও তিনি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা জুড়ে ইসলামের পুনর্জাগরণ ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তিনি পাকিস্তানের বিখ্যাত “তরজুমানুল কুরআন” ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন ও ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ইউকে এর ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার এই মনীষী ১৯৭৫-১৯৭৬ সালে মক্কার মসজিদ-আল-হারামের সংস্কার প্রকল্পেও জড়িত ছিলেন। উর্দূ এবং ইংরেজীতে তাঁর রচিত পঞ্চাশটিরও অধিক গ্রন্থ রয়েছে। পাশাপাশি তিনি সাইয়েদ আবুল হাসান নদভীর বিখ্যাত Muslims in the West: Message and the Mission গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন। এছাড়াও তাঁর চার’শ এরও অধিক অডিও-ভিডিও লেকচার রয়েছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহঃ বাংলাঃ ১। কুরআন অধ্যয়ন সহায়িকা ২। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক English: 1. Way to the Quran 2. Key to al-Baqarah 3. The Quranic Treasures 4. Islam - The Easy Way 5. Who is Muhammad? 6. Gifts from Muhammad 7. Shariah: The Way to Justice 8. Shari'ah: The Way to God 9. Interpersonal Relations 10. In the Early Hours: Reflections on Spiritual and Self-Development 11. Sacrifice the making of a Muslim 12. Dawah among Non-Muslims in the West 13. Islam & Terrorism 14. The Islamic Movement: Dynamics of Values Power and Change 15. Islamic Movement in the West: Reflections on Some Issues 16. Dying & Living for Allah Urdu: 1. Zikr-e-Ilahi ("Remembrance of God") 2. Rabb se Mulaaqaat ("Meeting with the Lord") 3. Dawat kai Nishan-e-Raah 4. Imaanat Daary ("Honesty") 5. Allah se Muhabbat ("Loving Allah") 6. Hasad aur Bughz ("Jealousy & Envy") 7. Rizq-e-halal ("Lawful Sustenance") 8. Niyyat aur Amal ("Intention & Action") 9. Hubb-e-Dunya ("Love of the World") 10. Dil ki zindagi ("Life of the Heart") 11. Ghalatiyon to Maaf Karna ("Forgiving Mistakes") 12. Haqeeqat-e-Zuhd ("Reality of Piety") 13. Urooj ka Raasta ("The Way to Elevation"