হাদীস চয়নের তিনটি নিয়ম

ইসলামে কুরআনের পরেই দ্বিতীয় উৎস হল সুন্নাহ। সুন্নাহর নির্দেশনা আকীদা, আমল, শরীয়াহ ও আখলাকে গ্রহণ ও প্রয়োগ করতে হবে। এক কথায় সুন্নাহ হল ইসলামী শরীয়তের অপরিহার্য উৎস।

যখন শরীয়ার কোন বিধান প্রণয়নে সুন্নাহকে উদ্ধৃত করা হয় তখন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবেঃ

১. হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাই করতে হবে এবং মুহাদ্দিসগণের দেয়া মানদন্ডের বিচারে তা পর্যালোচনা করতে হবে।

২. যে প্রেক্ষিতে এটি উদ্ধৃত করা হয়েছে হাদীসটি প্রকৃতপক্ষে সে অর্থই বুঝায় কিনা তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিছু লোক আছে যারা হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করে এবং হাদীসের এমন সব অর্থ দাঁড় করায় যা কখনোই হাদীসে বলা হয়নি কিংবা ইংগিতও দেয়া হয়নি। তারা শব্দের বিকৃত উপস্থাপনার মাধ্যমে এমন উপসংহার টানেন। অন্যদিকে কিছু কট্টরপন্থী আছে যারা হাদীসকে আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শরীয়াহর উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) বা তার সাধারণ মূলনীতিসমূহের প্রতি কোন দৃষ্টিপাতই করে না।

৩. নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যে হাদীস উদ্ধৃত করা হয়েছে তার বিপরীতে এমন কোন প্রমাণ নেই যার জন্য ঐ হাদীসটির ভাবগত ব্যাখ্যার দরকার, যা কোন সাধারণ (আম) বিষয়কে নির্দিষ্ট (খাস) করে দেয়, শর্তহীন (মুতলাক) বিষয়কে শর্তযুক্ত (মুকাইয়্যাদ) করে এবং মানসূখ (রদ) হাদীস প্রয়োগের শর্ত পরিবর্তন করে দেয়। উপস্থাপিত প্রমাণটি অবশ্যই প্রাসঙ্গিক বা যৌক্তিক হতে হবে। উপস্থাপিত প্রমাণটি হতে পারে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক অথবা উসূলী যুক্তিভিত্তিক যা কুরআন, সুন্নাহ অথবা শরীয়াহর মূলনীতি থেকে উৎসরিত অথবা হতে পারে প্রাসংগিক ঐতিহাসিক কিংবা সাম্প্রতিক কোন নিশ্চিত সত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত।

উল্লেখিত তিনটি বিষয় বুঝতে হলে হাদীসশাস্ত্রের শাখা-প্রশাখা, এর উৎসসমূহ এবং মুহাদ্দিসগণের রেখে যাওয়া জ্ঞানভাণ্ডার সম্বন্ধে গভীর জ্ঞান রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি সুন্নাহর প্রকৃত অনুধাবনের জন্য শরীয়াহর উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) ও তার সাধারণ মূলনীতি যা কুরআনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা (কাতঈ) থেকে পাওয়া যায় সে সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা প্রয়োজন। এছাড়াও আরবী ভাষা ও তার অর্থ নির্ণয়ে পারদর্শিতা থাকা দরকার। এক্ষেত্রে উসূল আল-ফিকাহ, উসূল আত-তাফসীর এবং উলুম আল-কুরআন এর গভীর অধ্যয়ন প্রয়োজন। এসব বিষয়সমূহ কুরআন এবং সুন্নাহর বোঝাপড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সূত্রঃ পূর্ব OnIslam.net  সাইটে প্রকাশিত “আল মারজিয়াতুল 'উলিয়াহ ফিল ইসলাম লিল ক্বুরআন ওয়া সুন্নাহ” গ্রন্থ থেকে নেওয়া অংশবিশেষের ইংরেজী অনুবাদ।

 

৬৩০

বার পঠিত

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী

প্রফেসর ড. ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী একজন ইসলামী চিন্তাবিদ, পন্ডিত ও কুশলী। ইসলামী জ্ঞানে তাঁর গভীরতা এবং সমসাময়িক বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের কি ভূমিকা হবে সে বিষয়ে সুচিন্তিত মতামতের জন্য তিনি সারা বিশ্বে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র। ইসলাম ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সংলাপের উপর তিনি সব সময় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

বিখ্যাত মিশরীয় পণ্ডিত ড. ক্বারাদাওয়ীর জন্ম ১৯২৬ সালে। দশ বছর বয়সেই তিনি সম্পূর্ণ কুরআন হেফজ করেন এবং কুরআন তেলাওয়াতের নীতিমালা, তাজবীদের উপর ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তিনি আল আজহারেই পড়ালেখা করেন। ১৯৭৩ সালে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের উসূল আল দ্বীন অনুষদ হতে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। ড. ক্বারাদাওয়ী আল আজহার ইনস্টিটিউটে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশুনার সময়ই তার প্রতিভার স্বাক্ষর হিসেবে শিক্ষকদের কাছ থেকে আল্লামা বা মহান পণ্ডিত খেতাবে ভূষিত হন। ১৯৫৮ সালে আরবী ভাষা ও সাহিত্যের উপর ডিপ্লোমা করেন। এর আগে তিনি আরবী ভাষা অনুষদ থেকে শিক্ষকতার সনদ পান।

ড. ক্বারাদাওয়ী মিশর সরকারের আওকাফ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বোর্ড অব রিলিজিয়াস এফেয়ার্স-এর একজন সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি আলজেরীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ইসলামিক সায়েন্টিফিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে তিনি জেদ্দাস্থ ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) ফিকাহ একাডেমী, মক্কাভিত্তিক রাবেতা আল আলম আল ইসলামীর ফিকাহ একাডেমী, রয়াল একাডেমী ফর ইসলামিক কালচার এন্ড রিসার্চ জর্ডান, ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার অক্সফোর্ড-এর সদস্য, ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া এন্ড রিসার্চ-এর প্রেসিডেন্ট এবং কাতার সীরাহ স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক। তিনি বাংলাদেশস্থ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম এর ট্রাস্টি বোর্ডেরও সদস্য।

তাঁর এ পর্যন্ত ৪২টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজি, তুর্কী, ফার্সী, উর্দু, ইন্দোনেশিয়া সহ বিশ্বের অন্যান্য অনেক ভাষায় তার বই অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা ভাষায় এ পর্যন্ত এ বইটি সহ মোট ৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘ইসলামে হালাল-হারামের বিধান’, ‘ইসলামের যাকাত বিধান’, ‘ইসলামী শরীয়তের বাস্তবায়ন’ বই তিনটি খায়রুন প্রকাশনী প্রকাশ করেছে। এছাড়া নতুন সফর প্রকাশনী, ঢাকা ‘আধুনিক যুগ, ইসলাম, কৌশল ও কর্মসূচি’ এবং সেন্টার ফর রিসার্চ অন দ্যা কুরআন এন্ড সুন্নাহ, চট্টগ্রাম ‘দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলাম’ প্রকাশ করেছে। ড. ক্বারাদাওয়ীর ইংরেজি ভাষায় অনূদিত www.qardawi.net/english বই ওয়েব সাইটে পাওয়া যায়।

তিনি একজন স্বনামধন্য কবি। নিজস্ব কাব্য বৈশিষ্ট্যের জন্য তিনি আরব বিশ্বে সুপরিচিত। বর্তমানে ড. ক্বারাদাওয়ী আল জাজিরাহ টেলিভিশনে একটি সরাসরি সম্প্রচারিত সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন। বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক শ্রোতা এ অনুষ্ঠান উপভোগ করে থাকেন।

বাল্যকাল থেকেই তিনি ইসলামের একজন সক্রিয় কর্মী। এর জন্য তাঁকে ১৯৪৯, ১৯৫৪-১৯৫৬ এবং ১৯৬৫ সালে কারাবরণ করতে হয়। আরব ও মুসলিম দেশ সমূহের প্রতি পাশ্চাত্য বিশ্বের বিশেষ করে আমেরিকা ও বৃটেনের পররাষ্ট্র নীতির জন্য তিনি তাদের একজন কঠোর সমালোচক। একই সাথে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরাঈলের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ, একপেশে ও নিঃশর্ত সমর্থনের তিনি তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা করেন। ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে তার সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনগণের মতামতকে শাণিত করতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে। তিনি একজন মানবাধিকারের প্রবক্তা। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের সপক্ষে তিনি সোচ্চার যা তার বিভিন্ন লেখনীতে প্রতিফলিত হয়েছে।

ড. ক্বারাদাওয়ী পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য, আরব ও মুসলিম দেশসমূহ ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেছেন। তিনি বাংলাদেশেও বেশ কয়েকবার এসেছেন।