মুহাম্মদ ইকবাল

মুহাম্মদ ইকবাল

বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে আল্লামা ইকবাল মোটেও অপরিচিত নন। বিশের দশকেই তার জীবনবাদী ও মানবতাবাদী কবিতা বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এরপরেও হয়েছে। বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ ছিলেন। আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আল্লামা ইকবালের বহু গ্রন্থ বাংলা ভাষায় বিভিন্ন সময়ে অনূদিত হয়েছে। দার্শনিক ও কালজয়ী তথ্য ও আদর্শ সমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘Reconstruction of Religions Thought in Islam’ ও ‘প্রজ্ঞান চর্চায় ইরান’ বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়াও আল্লামা ইকবালের আরও বহু গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

 বিশ্ব মানবতাকে ধ্বংসের গভীর আবর্ত থেকে উদ্ধার করার যে আর্তি আল্লামা ইকবালের কবিতায় ফুটে উঠেছে, তার অন্তরঙ্গ সুর বাংলার মানসকে আচ্ছন্ন করছে। বিশেষ করে বাংলার মুসলিম মানস তার কবিতার মধ্যে আত্ম আবিষ্কারের সন্ধান পেয়েছে। সমগ্র উপমহাদেশের ন্যায় বাংলায়ও তিনি একজন জনপ্রিয় জীবনধর্মী কবি ও দার্শনিক। সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় আল্লামা ইকবাল অনূদিত হয়েছে। মানবতাবাদী কবি হিসেবে তিনি বিশ্বের সর্বত্র সমাদৃত হয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ে আল্লামা ইকবালের ওপর গবেষণা অব্যাহত আছে। বিভিন্ন ভাষায় তার গ্রন্থসমূহ ভাষান্তর হচ্ছে। তাঁর উপর স্বতন্ত্র পুস্তকাদি রচিত হচ্ছে। দেশ-বিদেশে ইকবালের উপর যেসব পুস্তক রচিত হয়েছে, এক হিসেব অনুযায়ী তার সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। ইকবালের জীবন ও কাব্যের এমন কোন দিক নেই, যার উপর গবেষণা হয়নি। তাঁর কবিতা, গজল, মর্সিয়া এবং গান হতাশাগ্রস্ত মানুষের মনে আশা ও আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছে।

ইতিহাসের এক অশান্ত পরিবেশে ১৮৭৭ খৃস্টাব্দের ৯ নভেম্বর শুক্রবার ফজরের আযানের সময় বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট নগরীতে এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। একতলা একটি জীর্ণ বাড়ির যে প্রকোষ্ঠে তার জন্ম তা এখনও পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষতি। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য এটি একটি দর্শনীয় বাড়ি। ইকবালের পূর্ব-পুরুষগণ কাশ্মীর থেকে হিজরত করে শিয়ালকোটে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ নূর মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন শিয়ালকোটের অন্যতম টুপি ব্যবসায়ী। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু ইকবাল মাওলানা গুলাম হাসান ও সৈয়দ মীর হাসানের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। স্কচ মিশন স্কুলের শিক্ষক সৈয়দ মীর হাসান মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তনে খুব আগ্রহী ছিলেন। পিতা শেখ নূর মুহাম্মদের অনুমতিক্রমে ইকবালকে তিনি স্কচ মিশন স্কুলে ভর্তি করেছেন। প্রাথমিক স্তর থেকে এফএ পর্যন্ত দশ বছরকাল তিনি সৈয়দ মীর হাসানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহণ করেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সৈয়দ মীর হাসান অভিনব পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণ ইকবালের মানে ঐকান্তিক পিপাসা জাগিয়ে তোলেন। ১৮৮৮ সালে প্রাথমিক, ১৮৯১ সালে মিডল এবং ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি ও মেডেলসহ উত্তীর্ণ হন। ১৮৯৫ সালে ইকবাল ঐ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন এবং একই বছর ১৮ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে লাহোর গমন করেন। লাহোর সরকারি কলেজ থেকে ১৮৯৭ সালে স্নাতক ও ১৮৯৯ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। একই বছর তিনি লাহোরের ওরিয়েন্টাল কলেজে ইতিহাস ও দর্শন শাস্ত্রে অধ্যাপনার চাকরি গ্রহণ করেন।

১৯০১ সালে লাহের সরকারি কলেজে ইংরেজি ও দর্শন শাস্ত্রে সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ইংরেজি, আরবি ও দর্শনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারী ইকবালের শিক্ষা জীবনে দ্বিতীয় শিক্ষক মীর হাসানের গভীর জ্ঞান এবং কলেজ জীবনে দর্শনের শিক্ষক টমাস আরনল্ড তার জীবনে প্রবল প্রভাব প্রতিফলিত করেন। টমাস আরনল্ডের উৎসাহে ১৯০৮ সালে যুক্তরাজ্যের Lincoln’s Inn থেকে ব্যারিস্টারী ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি পাশাপাশি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। জার্মানী থেকে ১৯০৭ সালে দর্শনে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯১২ সালে এক নতুন ইকবাল স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। তদানীন্তন বিশ্বপরিস্থিতিতে মুসলিম বিশ্বের অধঃপতনে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর থেকে ভারতীয় মুসলমানদের ভাগ্যেও নেমে এসেছিল চরম দুর্দিন। সেই যুগসন্ধিক্ষণে যেসব তরুণ মুক্তি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের সম্মুখ ভাগে ছিলেন আধুনিক বিশ্বে ইসলামের সময়োপযোগী ব্যাখ্যাকার, ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলনের অগ্রসেনা, মানবতার মুক্তিকামী বিদ্রোহী কলম যুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক মহাকবি ইকবাল। ইকবাল তন্দ্রাচ্ছন্ন মুসলিম জাতিকে আমৃত্যু কাব্যের চাবুক মেরে জাগ্রত করার প্রয়াস পান। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এমন কোন দিক ছিল না, যে বিষয়ে তিনি তার মেধাকে ব্যবহার করেননি। কাশ্মীর, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, স্পেন, ইন্দোনেশিয়াসহ প্রতিটি রাষ্ট্রের সমস্যা নিয়েই তিনি দিক-নির্দেশনা সম্বলিত দরদমাখা কাব্য রচনা করেন। মুসলিম জাতি তাঁর কাব্যে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হৃত গৌরবের কথা স্মরণ করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকে। তাদের সম্বিৎ ফিরে আসতে শুরু করে। ইকবাল নিছক কবি বা দার্শনিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন দূরদর্শী রজনীতিকও। সবচেয়ে বড় কথা, ইকবাল ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী কবি, ভাবুক ও রাজনীতিক। গতানুগতিকতার সোজাপথ ছেড়ে যে কবি-দার্শনিক সম্পূর্ণ এক নতুন পথে এগিয়ে গেছেন, তিনিই হলেন মহাকবি আল্লামা ইকবাল। তিনি কাব্যকে করেছেন জাতি গঠনের হাতিয়ার। এই বিশাল ব্যক্তি উর্দু, ফার্সি ও ইংরেজি ভাষায় মুসলিম উম্মাহকে যে পথের দিশা দিয়ে গেছেন, তা সম্পূর্ণ কুরআন, হাদিস, ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্যের নির্যাস। তার রচনা সমগ্রে মিশে আছে ইসলাম। ইকবাল ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’-এ বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প জীবনের জন্য। আর সেজন্যই তিনি নির্জীব জাতিকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কবিতাকে ব্যবহার করেন।

তাঁর পদ্য গদ্য যেকোন রচনার উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র মুসলিম মিল্লাত, মুসলিম জাতির ঐক্য ও সংহতি। তিনি মুসলিম বিশ্বকে এক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য আমৃত্যু কলম সৈনিক হিসেবে সংস্কার আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। ইকবালের প্রত্যাশা ছিল, ইসলাম একদিন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই। একজন মহৎ মানবতাবাদী কবি হিসেবে যেমন রয়েছে তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, তেমনি ইসলামের অতি আধুনিক ব্যাখ্যাদাতা হিসেবেও তিনি সমান গৌরবের অধিকারী। কুরআনুল করীমের বিশাল প্রাঙ্গণ, হাদীস শরীফ এবং ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য ছিল ইকবাল কাব্যের সারবস্তু। ইসলামকে তিনি একটি গতিহীন ধর্মের কতকগুলো সূত্র সর্বস্ব ব্যবস্থা পত্র মনে করতেন না। তাঁর কাছে ইসলাম ছিল এক প্রাণপ্রাচুর্য্য উন্নত জীবনের প্রতীক। ইকবালকে উর্দু ভাষার কবি বলা হলেও একই সঙ্গে তিনি উর্দু ও ফার্সি ভাষার কবি। ইকবালের ১১টি কাব্য গ্রন্থের মধ্যে ৮টি ফার্সি ভাষায় ও ৩টি উর্দু ভাষায় লিখিত। তাঁর কবিতা লেখার সময়কাল ১৯০৮ থেকে ১৯২৪ খৃস্টাব্দ। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগন্থ ‘শিকওয়া’ এবং ‘জবাব-ই-শিকওয়া’। ১৯১৫ সালে আসরারে-ই-খুদী এবং ১৯১৮ সালে রমুয-ই-বেখুদী’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩২ সালে ইকবালের ‘জাবিদলামা’ প্রকাশিত হয়। ফার্সি ভাষায় রচিত এই কাব্যগ্রন্থ কনিষ্ঠপুত্র জাবিদের নামে নামকরণ করেন তিনি।

আল্লামা ইকবালের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ :ইলম আল ইক্তিউদ (The Science of Economics)- উর্দু ছন্দে (ca ১৯০১), Islam as an Ethical and Political Ideal- ইংরেজি (১৯০৮), The Development of Metaphysics in Persia- ইংরেজি (১৯০৮) ( বাংলা অনুবাদ : প্রজ্ঞান চর্চায় ইরান),আসরার ই খুদি (The Secrets of the Self)- ফার্সি (১৯১৫, রুমিজ ই বেখুদি (The Mysteries of Selflessness)- ফার্সি (১৯১৭), পয়গাম ই মাশরিক (The Message of the East)- ফার্সি (১৯২৩), বাং ই দারা (The Call of the Marching Bell)- উর্দু ও ফার্সি (১৯২৪), জুবুর ই আজাম (The Psalms of Persia)- ফার্সি (১৯২৭), The Reconstruction of Religious Thought in Islam- (ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন) (১৯৩০), জাভেদ নামা (The Book of Eternity)- ফার্সি (১৯৩২), বাল ই জিবরাইল (The Gabriel’s Wings)- উর্দু ও ফার্সি (১৯৩৩), পাস ছে বায়াদ কারদ আই আক্বওয়াম ই শারক (So What Should be Done O Oriental Nations)- ফার্সি (১৯৩৬)-, মুসাফির (The Wayfarer)- ফার্সি (১৯৩৬), জারব ই কালিম (The Blow of Moses) উর্দু ও ফার্সি (১৯৩৬)। আরমাঘান ই হিজাজ (The Gift for Hijaz)- ফার্সি ও উর্দু (১৯৩৮)।

আল্লামা ইকবালের জীবন ও কাব্যে জালাল উদ্দিন রুমির প্রভাব অত্যধিক। মিরাজ এ রসুল (সাঃ)-এর সঙ্গী ছিলেন জিবরাইল (আ:), আর ইকবালের ঊর্ধ্বলোকের সফরসঙ্গী মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ইকবাল কেবলমাত্র কবিতা বা কাব্য লেখকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অতিউচ্চ মানের চিন্তাশীল প্রবন্ধ লেখকও। আল্লামা ইকবালের চিন্তার গভীরতার জন্যই ইকবালের কবিতা শুধু মুসলমানের জন্য নয়, গোটা বিশ্বমানব সমাজের জন্য হয়ে ওঠে নতুন চিন্তার দিকদর্শন। কেননা তিনি যে সংকট ও সমস্যার কথা চিন্তা করেছিলেন তা শুধু মুসলিম সমাজের নয়, বিশ্বসমাজের সমস্যা।

ইকবালের অসংখ্য কাব্য, প্রবন্ধের মধ্যে ‘আসরার-ই-খুদী’কে বলা হয় ইকবালের শ্রেষ্ঠ রচনা ‘Masterpiece’ইকবাল ১৯০৮ সালে All India Muslim League-এর সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। ১৯২৬ সালে পাঞ্জাবের লেজিসলেটিব কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭-২৮ সালের ৫ মার্চ পাঞ্জাব আইনসভার বাজেট অধিবেশনে ভাষণ দেন। দিল্লীতে অনুষ্ঠিত All Party Muslim Conference-এ ভাষণ এবং মুসলমানদের স্বতন্ত্র কার্যক্রম গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। তিনি এলাকাবাদে মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে উত্তর-পশ্চিম ভারতে একটি স্বতন্ত্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রস্তাব পেশ করেন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনের কারিগর হিসেবে দার্শনিকতার কাজ করে তাঁর চিন্তাগুলো। আল্লামা ইকবালের এক ছেলে ড. জাবেদ ইকবাল ও এক মেয়ে মুনীরা। তিনি ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫টা ১৪ মিনিটে চতুর্দিকে ফজরের আযান ধ্বনির মধ্যে ৬০ বছরের কিছু ঊর্ধ্বে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।