All posts by রশীদ আল ঘান্নুশী

তিউনিশিয়ার প্রধান ইসলামী দল আন-নাহদা এর প্রতিষ্ঠাতা ও এর বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা।
fiqh ul jihad

শাইখুল ইসলাম ইউসুফ আল-ক্বারাদাওয়ী রচিত অনন্য সাধারণ গ্রন্থ “ফিক্‌হুল জিহাদ” এর পাঠ পর্যালোচনা (পর্ব-২)

রশীদ আল ঘান্নুশী | মার্চ ২৬, ২০১৫
Download PDF

প্রথম পর্বঃ

শাইখুল ইসলাম ইউসুফ আল-ক্বারাদাওয়ী রচিত অনন্য সাধারণ গ্রন্থ “ফিক্‌হুল জিহাদ” এর পাঠ পর্যালোচনা (পর্ব-১)

৪। সামরিক জিহাদঃ আত্মরক্ষামূলক (দাফ’) ও আক্রমণাত্মক (তালাব) জিহাদ

মুতাকাদ্দিমীন এবং সমসাময়িক ফক্বীহদের ধারা অনুসরণ করে, আল ক্বারাদাওয়ীও জিহাদের প্রকৃতি এবং ইসলামে এর অবস্থান অনুসন্ধান করেছেন। এটির প্রকৃতি কি ধর্মীয়; অর্থাৎ অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত অথবা ইসলামের কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত তাদের সাথে লড়াই করা কি মুসলিমদের উপর আবশ্যক যেটাকে জিহাদ আত তালাব তথা স্বেচ্ছাপ্রসূত আক্রমণাত্মক জিহাদ বলা হয়ে থাকে? নাকি এর প্রকৃতি রাজনৈতিক যার প্রয়োজনীয়তা আগ্রাসীদের থেকে ইসলামের ভূমিকে রক্ষা করা এবং যারা মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে তাদের থেকে মুসলিমদের ও সাধারণভাবে নিপীড়িতদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যাকে নাম দেয়া হয়েছে জিহাদ আদ দাফ’ তথা আবশ্যক আত্মরক্ষামূলক জিহাদ? মুসলিমরা যদি এতে অংশগ্রহণ করে তবে তাদের তা খালেসভাবে আল্লাহর জন্যই করতে হবে এবং কঠোর নৈতিক নিয়মাবলী মেনে করতে হবে যেগুলো উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই।

পুরনো ও অধুনা যুগের ফক্বীহগণ এ ব্যাপারে দুই শিবিরে বিভক্ত হয়েছে যাদের আল ক্বারাদাওয়ী এভাবে নামকরণ করেছেনঃ হুজুমিয়্যীন (আক্রমণাত্মক জিহাদের প্রস্তাবকগণ) এবং দিফায়িয়্যীন (আত্মরক্ষামূলক জিহাদের প্রস্তাবকগণ)। তিনি নিজেকে দ্বিতীয় শিবিরের একজন গর্বিত অনুসারী হিসেবে দাবী করেন। হুজুমিয়্যীনগণ ইসলামের দাওয়াত এবং এর সীমা বিস্তৃতির জন্য বছরে অন্তত একবার অমুসলিমদের ভূমিতে আক্রমণ করাকে মুসলিম উম্মাহর জন্য আবশ্যক মনে করেন।তারা অবিশ্বাসকেই যুদ্ধ শুরু এবং বৈধ হত্যাকান্ডের জন্য যথেষ্ট কারণ মনে করে থাকেন যদিও অমুসলিমরা মুসলিমদের আক্রমণ বা ক্ষতি না করে থাকে। এমনকি মুসলিমরা যদি এ আক্রমণ না করে থাকে তবে গুনাহগার হবে। বিরাট সংখ্যক ফক্বীহগণ এ মতের সমর্থক। এ শিবিরের অন্তর্ভুক্ত পুরনো যুগের আলেমদের মধ্যে সবচেয়ে প্রথিতযশা হলেন ইমাম শাফিঈ আর আধুনিক যুগের চিন্তাবিদদের মধ্যে মাওলানা মাওদুদী এবং সাইয়্যেদ কুতুব, যাদের দুজনই নিজেদের মতের সমর্থনে কোরআন ও সুন্নাহ এবং ঐতিহাসিকভাবে যে চর্চা হয়ে আসছে তা থেকে দলিল পেশ করেছেন। কোরআনের যেসব আয়াতসমূহ সকল মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আহবানের জন্য ব্যবহার করা হয় সেগুলো হচ্ছে সূরা তাওবার ৩৬ নং আয়াত “মুশরিকদের সাথে একত্রিত হয়ে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে যুদ্ধ করে।”, সূরা তাওবার ৫নং আয়াত “মুশরিকদের যেখানেই পাও, হত্যা কর।”, এবং ২৯নং আয়াত “যারা আল্লাহ এবং আখিরাতে বিশ্বাস করে না…যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা স্বেচ্ছায় পদানত হয়ে জিযিয়া দেয়।”কিন্তু তাঁরা এগুলোর মধ্যে কোনটি আয়াত আস সাইফ বা তলোয়ারের আয়াত সেটা নিয়ে মতপার্থক্য করেছেন। তাঁদের মতে এই তলোয়ারের আয়াত এর বিপরীতে যায় এমন ২০০টিরও বেশী আয়াত রহিত করে দিয়েছে, যে আয়াতসমূহ দয়া, ক্ষমাশীলতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্মীয় ব্যাপারে জোরজবরদস্তি ও কঠোরতার উপর নিষেধাজ্ঞা, মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারটিকে একমাত্র আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়ার দিকে আহবান করে। তাঁরা নিজেদের মতের সমর্থনে রাসূলের এ হাদীসকেও প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেনঃ “মানুষ লা ইলাহা ইল্লাহ না বলা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি” (বুখারী কর্তৃক বর্ণিত)। এছাড়াও তাঁরা ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে মুসলিমদের যুদ্ধের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চল বিজয়ের ইতিহাসকে তাঁদের এ মতের সমর্থনে দলিল হিসেবে পেশ করেছেনঃ মুসলিমদের সাথে অন্যদের স্বাভাবিক সম্পর্ক শান্তি নয় বরং যুদ্ধ।

উপরোক্ত দলের সাথে নিজের মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আল ক্বারাদাওয়ী তাঁদের জন্য, বিশেষ করে পুরনো আলেমদের জন্য কৈফিয়ত দিতে বিরত হন নি। কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন যেসে সময়ে জাতিসমূহের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ক্ষমতা ও যুদ্ধ এবং আরব উপদ্বীপে ইসলামের আবির্ভাবের সূচনা থেকেই ইসলামের অস্তিত্ব বহির্শক্তির হুমকির সম্মুখীন হচ্ছিল।

পুরনো ও সমসাময়িক আলেমদের মত আল ক্বারাদাওয়ীও এই ইজমার উপর জোর দেনঃ কোন মুসলিম ভূমি আক্রান্ত হলে অথবা মুসলিমরা কোন ফিতনায় পতিত হলে (ধর্মীয় স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হলে) জিহাদ তখন প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয হয় এবং প্রত্যেক মুসলিমকেই কোন না কোন প্রকারের জিহাদ পালন করতে হয়, হোক সেটা নিজের বিরুদ্ধে বা দুর্নীতি ও মন্দের বিরুদ্ধে কিংবা সৎ কাজের আদেশ ও নিজ সাধ্যমত ধর্মকে সাহায্য করার ব্যাপারে। আল ক্বারাদাওয়ী তাঁর গবেষণা এবং জিহাদ সংক্রান্ত বিভিন্ন ধর্মীয় নির্দেশনা ও পুরনো এবং আধুনিক আলেমদের মতামত বিশ্লেষণ করে নিম্নোক্ত উপসংহারগুলোতে পৌঁছেছেনঃ

১) কোরআনের যেসব আয়াতগুলোতে, বিশেষ করে সূরা তাওবার যে আয়াতগুলোতে সকল মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ এসেছে সেগুলোকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং উপযুক্ত শাস্তি সংক্রান্ত আয়াত হিসেবে গণ্য করা উচিত যেমন একটি আয়াতে এসেছে “যেমন কিনা তারা তোমাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে লড়াই করে।” এটি কোন সাধারণ নির্দেশনা বা সকল অমুসলিমদের সাথে আচরণের ভিত্তি নয় বরং আরব মুশরিকদের একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে সম্পর্কিত যারা শুরু থেকেই ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, একে তাড়া করে বেরিয়েছে এবং এর নতুন আবাস পর্যন্ত একে অনুসরণ করেছে; যারা চুক্তিভঙ্গ করেছে এবং একে নির্মূল করার জন্য সবাইকে জড়ো করেছে। “তোমরা কি সেসব লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না যারা নিজেদের চুক্তি ভঙ্গ করেছে, রাসূলকে বিতাড়ির করার চক্রান্ত করেছে এবং তোমাদের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ির সূচনা করেছে” (কোরআন-৯:১২)। ঠিক একই সূরা এবং অন্যান্য সূরায় উপরোক্ত নির্দেশনাগুলোর সাথে কিছু বিধিনিষেধ ও শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ নির্দেশনা। “যদি তারা শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে তবে তোমরাও শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ো” (৮:৬১)। কোরআনের আয়াতসমূহকে পরস্পরের বিরুদ্ধে স্থাপন করার কোন প্রয়োজন নেই বরং এ বিষয় সংক্রান্ত কোরআনের সকল আয়াত ও হাদীসসমূহের দিকে তাকানো উচিত যেগুলো এ নীতিকেই প্রতিষ্ঠিত করে যে, ইসলাম শান্তিকামীদের সাথে শান্তি চায় এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে করে যারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

২। শাহাদাহ, সালাত, রোযা, যাকাত এবং হজ্জ্বের মত সামরিক জিহাদ প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয নয় কেননা, ইসলামে এর গুরুত্বপূর্ণ স্থান থাকা সত্ত্বেও সূরা বাক্বারায় মুত্ত্বাকীদের অন্তস্থিত বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে, সূরা আনফাল ও সূরা মু’মিনুনে ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে, সূরা রা’দে সত্যিকার বুঝের অধিকারী লোকদের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে, সূরা ফুরক্বানে আল্লাহর বান্দাদের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে, সূরা যারিয়াতে ধর্মপরায়ণদের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে, সূরা ইনসানে ধর্মনিষ্ঠ লোকদের বৈশিষ্ট্যেগুলোর মধ্যেসামরিক জিহাদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। সেজন্য মুসলিমদের উপর সামরিক জিহাদ তখনই ফরয হয় যখন এর শর্ত আবির্ভূত হয় যেমনঃ মুসলিমদের উপর বা তাদের ভূমি ও ধর্মের উপর আক্রমণ হওয়া। অন্যদিকে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার জন্য সাধ্যমত প্রস্তুত থাকা মুসলিমদের উপর ফরয যাতে শত্রুদের নিরুদ্যম করা যায় এবং শান্তি বজায় থাকে।

৩।  অমুসলিমদের থেকে নিরাপদ থাকলে তাদের ভূমি হামলা করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই মুসলিমদের উপর। সামগ্রিক দায়িত্ব পালন করতে জন্য মুসলিমদের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, তাদের প্রশিক্ষিত সৈনিক ও সর্বশেষ প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকবে যারা সীমান্ত প্রহরা দেবে এবং শত্রুদের নিরুদ্যম করবে যাতে তারা মুসলিমদের আক্রমণ করার চিন্তাও না করে (পৃষ্ঠা ৯১)। আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মত যে, আল ক্বারাদাওয়ী ‘কুফফার’ বা ‘অবিশ্বাসী’ শব্দটি ব্যবহারের চাইতে ‘অমুসলিম’ শব্দটিই বেশী ব্যবহার করেছেন। এটিই আল কোরআনের পদ্ধতি। কোরআন “হে আহলে কিতাব”, “হে মানবজাতি”, “হে মানুষ”, “হে বনী ইসরাইল”, “আমার জাতি”, “হে আদমসন্তানেরা” এসব সম্বোধনই ব্যবহার করেছে। এটি কখনোই অমুসলিমদের অবিশ্বাসী হিসেবে সম্বোধন করেনি কিছু ব্যাতিক্রমী ঘটনা ছাড়া যেখানে বিশ্বাসের বিষয় নিয়ে বোঝাপড়া হয়েছে।

৪। ইসলাম ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আল্লাহর সামনে প্রত্যেকের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়ে দায়বদ্ধ থাকার বিষয়টি স্বীকার করে। এ কারণেই মুসলিম সমাজগুলো সামগ্রিকভাবে কখনো ধর্মীয় যুদ্ধের সম্মুখীন হয় নি। ইসলামে যিম্মী ব্যবস্থার ছায়াতলে তাই বিভিন্ন একত্ববাদী ও বহুত্ববাদী ধর্মগুলো টিকে থেকেছে এবং এখনো টিকে আছে যা অমুসলিমদের তাদের ধর্মবিশ্বাস সত্ত্বেও নাগরিকত্ব প্রদান করেছে। মুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিমদের পাশাপাশি নিরাপত্তার অধিকার পেতে তাদেরকে শুধুমাত্র জিযিয়া প্রদান করতে হয়েছে যা অনেক আধুনিক ব্যবস্থায় সামরিক সেবা করের (Military Service Tax) সমার্থক। আল ক্বারাদাওয়ীর মতে, করের হার একীভূতকরণ এবং সামরিক সেবার বিষয়টিকে সাধারণীকরণের কারণে এই (যিম্মী) ব্যবস্থা এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে যা অনেক সময় ভুল বোঝা হয়েছে ও ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

৫। ইসলামের ধর্মগ্রন্থসমূহ নয় বরং ঐতিহাসিক পরিস্থিতিই ফক্বীহদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, অমুসলিমদের ভূমি আক্রমণ করার জন্য যে আক্রমণাত্মক জিহাদ তা বাধ্যতামূলক। উম্মাহ বিরতীহীনভাবে পারস্য ও রোমানদের মত শক্তিশালী প্রতিবেশীসমূহ দ্বারা হুমকির সম্মুখীন ছিল (পৃষ্ঠাঃ ৮২) এবং সেসময় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং শত্রুতা পরিহারকরণের উপর ভিত্তি করে আজকের মত কোন আন্তর্জাতিক আইন ছিল না।যদিও বর্তমানে ক্ষমতাশালীদের দ্বারা এ আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে।

৬। মুসলিম এবং অন্যদের মধ্যে স্বাভাবিক পরিস্থিতি হচ্ছে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক এবং ভালোকাজে পারস্পরিক সহযোগিতা। ইসলাম যুদ্ধকে অপছন্দ করে এবং এতে কেবল অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রয়োজনের খাতিরে অংশগ্রহণ করে। “যুদ্ধ তোমাদের উপর ধার্য করা হয়েছে যদিও তা তোমাদের অপছন্দ” (কোরআন ২:১১৬)। শান্তি ইসলামের অপরিহার্য অংশ, এটি মুসলিমদের এবং বেহেশতের অধিবাসীদের সম্ভাষণ এবং আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে একটি। অন্যদিকে আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে অপছন্দীয় নাম হল ‘হারব’ যার অর্থ যুদ্ধ এবং যা আরবদের প্রাচীন নামসমূহের মধ্যে একটিযেহেতু আরবরা ছিল যোদ্ধা। যখন রাসূল (সা) তাঁর জামাতা থেকে জানতে পারলেন তাঁর কন্যা ফাতিমা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে যাকে হারব নাম দেয়া হয়েছে তখন, রাসূল (সাঃ) তাঁকে আদেশ করলেন তার নাম হাসান (যার অর্থ সুন্দর) রাখতে।

৭। ইসলাম এমন আন্তর্জাতিক সমঝোতাকে সমর্থন করে যা আগ্রাসনের বিরোধিতা করে এবং জাতিসমূহের মধ্যে শান্তিকে উৎসাহিত করে। জাতিসংঘ, ইউনেস্কোর মত যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এসব আইনকে বলবৎ রাখে তাদের ইসলাম স্বাগত জানায়। তবে পাশ্চাত্য এখনো অন্য জাতি ও রাষ্ট্রসমূহের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ক্ষমতার নীতিতে বিশ্বাস রাখে। এর একটি উদাহারণ হল, সমতার নীতিকে প্রকাশ্যে অগ্রাহ্য করে পাশ্চাত্যের প্রধান রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা একচেটিয়াভাবে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা যেটার মাধ্যমে পাশ্চাত্য নিজেদের স্বার্থ নিশ্চিত করে এবং এ নীতি লংঘনের কারণে সম্ভাব্য যেকোন প্রতিবাদ এড়িয়ে চলে। যেমন কিনা আমরা দেখেছি কিভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য কোন বৈধতা ছাড়াই যে কোনপ্রকার নিন্দার ঝুঁকি থেকে ঊর্ধ্বে থেকে ইরাক আক্রমণ করেছে এবং একইভাবে কিভাবে ফিলিস্তিন ও এর জনগণের বিরুদ্ধে যায়োনিষ্টদের বিভিন্ন রকম শত্রুতাকে বিরামহীনভাবে সুরক্ষা দিয়ে চলছে।

৮। ধর্ম বিশ্বাস ও প্রচারের স্বাধীনতা, প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের রক্ষাসহ বিভিন্ন মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করার কারণে জিহাদ আত তালাবের অন্যতম মূল কারণটি অপ্রযোজ্য হয়ে পড়েছে। আর তা হচ্ছে, ইসলামের দিকে আহবান করার জন্য স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা যা জনগণকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে এবং শাসকের ধর্ম ব্যতীত অন্য ধর্ম গ্রহণ করতে বাধা দিত। যেমনটি কিনা ফেরাউন বনী ইসরাইলকে তার অনুমতি ব্যতীত ঈমান আনার জন্য তিরস্কার করেছিল। “সে বললঃ আমি অনুমতি দেয়ার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান এনেছ” (আল কোরআন ২০:৭১)। অন্যদিকে বর্তমানে মসজিদ ও মুসলিম সংখ্যালঘু সব অঞ্চলে পাওয়া যায় যা ইসলামের ইতিহাসে অভুতপূর্ব। তাই আমাদের এখন আরো বেশী প্রয়োজন “দক্ষ দা’য়ী, শিক্ষক, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের এক বিশাল বহর যারা সকলেই হবে উপযুক্তভাবে প্রশিক্ষিত এবং পৃথিবীকে এর বিভিন্ন ভাষায় সম্বোধন করবে ও যারা এ কাজে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করবে, দুঃখজনকভাবে, যার এক হাজার ভাগের এক ভাগেরও কম আমাদের রয়েছে।” (পৃষ্ঠা ১৬)। আল ক্বারাদাওয়ী দুঃখের সাথে বলেন, এমন অনেককেই আপনারা পাবেন যারা আল্লাহর জন্য মরতে রাজি আছে, কিন্তু এমন খুব কমই পাবেন যারা তাঁর রাস্তায় বাঁচতে প্রস্তুত।

৯। ইসলামের ধর্মীয় উৎসসমূহ থেকে এটা পরিষ্কার যে, ইসলামের মতে, পৃথিবী তিনটি ভাগে বিভক্তঃ দার আল ইসলাম তথা ইসলামের ভূমি যেখানে ইসলামের আইন প্রতিষ্ঠিত আছে, এর রীতিনীতিগুলো প্রকাশ্যে চর্চা করা হয় এবং এর অনুসারী ও এর দিকে আহবানকারীগণ নিরাপদে থাকে; দার আল আহদ তথা চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রসমূহ যাদের এবং মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও শত্রুতার নিবৃত্তিকরণ; এবং সর্বশেষ হল দার আল হারব তথা মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত রাষ্ট্র। আল ক্বারাদাওয়ী মনে করেন, জাতিসংঘের ব্যবস্থার অংশীদার হওয়ার কারণে মুসলিমরা অন্যান্য সব দেশের সাথে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় আছে একমাত্র ইসরাইল ব্যতীত কেননা এ রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে জবরদখল করে রেখেছে এবং এর জনগণকে উৎখাত করেছে এবং যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রধান রাষ্ট্রসমূহের সহায়তায় সংঘটিত হয়েছে। সেজন্য আল ক্বারদাওয়ী পাশ্চাত্যের সাথে আমাদের সম্পর্কের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে ইসরাইলের প্রতি পাশ্চাত্যের অবিরত সীমাহীন সমর্থন এবং ফিলিস্তিন ও এর জনগণের বিরুদ্ধে এর লাগাতার আগ্রাসনকে দায়ী করেন।

১০। আল ক্বারাদাওয়ী জিহাদ এবং ইরহাব তথা সন্ত্রাস অন্যকথায়, বৈধ ইরহাব ও অবৈধ ইরহাবের মধ্যে পার্থক্য করেন। বৈধ ইরহাব হচ্ছে শত্রুর ভীতির পাত্র হওয়া যা শত্রুকে যেকোন প্রকার আগ্রাসন থেকে বিরত রাখবে। অপরপক্ষে অবৈধ ইরহাব হচ্ছে নিরীহ মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করা যেমন কিনা কিছু দল ইসলামের নামে করে থাকে। এরা জিহাদের অপব্যবহার করে অনুপযোগী পরিস্থিতে পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং মুসলিম দেশসমূহের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ইসলামে জিহাদের মূলনীতি ও নৈতিক বিধিবিধানসমূহের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে নিরাপরাধ মানুষদের ভীতসন্ত্রস্ত করে। এজন্যই আল ক্বারদাওয়ী মুসলিম ও অমুসলিম দেশসমূহে চরমপন্থী দলগুলো দ্বারা পর্যটক ও অন্যান্য নিরাপরাধ মানুষদের বিরুদ্ধে চালানো সহিংস কর্মকান্ডের সমালোচনা করেন। এছাড়াও তিনি এ দলগুলো দ্বারা সংঘটিত বাছবিচারহীন হত্যাকান্ড ও নিরাপরাধ জীবন নেয়াকে যেকোন বৈধতা থেকে বঞ্চিত করেন।

১১। আল ক্বারাদাওয়ী খুবই সতর্কতার সাথে চরমপন্থী দলসমূহ, যারা পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং বাছবিচারহীন হত্যাকান্ড চালিয়ে ইসলামের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে ও এর শত্রুদের হাতে এর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য ভয়াবহ অস্ত্র তুলে দিচ্ছে এবং যারা দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইরত প্রতিরোধযোদ্ধা এদের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তিনি যেভাবে পূর্বোক্ত দলসমূহকে সমালোচনা করেছেন এবং তাদের ভিত্তিমূলকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করেছেন তেমনি শেষোক্ত দলসমূহের পক্ষ সমর্থন করেছেন এবং বিশেষ করে ফিলিস্তিনে তাদের সাহায্য সমর্থনে পুরো উম্মাহকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে সামরিক। তিনি আত্মঘাতী হামলাসমূহকেও কোন দ্বিধা ছাড়াই সমর্থন করেছেন এবং একে নিরুপায় ব্যাক্তির একমাত্র অস্ত্র হিসেবে গণ্য করেছেন যে কিনা নিজের আবাসভূমিকে রক্ষা করার জন্য শত্রুর সমপর্যায়ের অস্ত্র থেকে বঞ্চিত। আল্লাহর সুবিচার দুর্বল ব্যক্তিকে পুরোপুরি অস্ত্র থেকে বঞ্চিত করে না আর এজন্যই এরুপ ব্যক্তি নিজ দেহকে নিবৃত্তকারী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তবে যেকোন পরিস্থিতে জিহাদের নৈতিক বিধান মেনে চলতে হবে। তাই শুধুমাত্র যোদ্ধাদেরকেই হামলার লক্ষ্যবস্তু বানানো যেতে পারে।

১২। আল ক্বারাদাওয়ী জোর দিয়ে বলেন, এ যুগে উম্মাহর উপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিহাদ হচ্ছে উপনিবেশবাদ থেকে স্বাধীনতা লাভ করা বিশেষ করে ফিলিস্তিনে। কিন্তু তিনি সতর্কতার সাথে তাদের ভুলও তুলে ধরেন যারা বিশ্বাস করে, যায়োনিষ্টদের সাথে আমাদের লড়াই তাদের সেমিটীয় হওয়ার কারণে, কারণ আমরাও সেমিটীয় তথা ইব্রাহীম (আঃ) এর বংশধর অথবা যারা মনে করে এ লড়াই ধর্মীয় লড়াই, কেননা মুসলিমরা ইহুদীদের আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত মনে করে যাদের খাদ্য আমাদের জন্য হালাল, যাদের সাথে বিয়ের সম্পর্ক স্থাপন করা হালাল এবং যারা মুসলিমদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে নিরাপত্তার সাথে বসবাস করেছে। যখন স্পেন ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে তাদের বিতাড়িত করা হচ্ছিল তখন তারা আমাদের ভূমিগুলোতে আশ্রয় খুঁজেছে। মুসলিমদের ছাড়া আর কারো কাছে ঠাঁই পায় নি তারা। বাস্তবতা হচ্ছে, যায়োনিষ্টদের সাথে আমাদের সংঘর্ষ সূচনা হওয়ার একটাই কারণ আর তা হচ্ছে তাদের দ্বারা ফিলিস্তিনের ভূমি আত্মসাৎকরণ, সেখান থেকে এর জনগণকে উৎখাত করা এবং তাদের উপর সহিংসতা চাপিয়ে দেয়া। এ সংঘর্ষ ততদিন চলবে যতদিন এর কারণগুলোও জারি থাকবে। কোন মুসলিম ভূমির উপর অধিকার ত্যাগ করা সম্ভব নয়। তবে ইসরাইলের সাথে নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তি হতে পারে। আর ‘শান্তির বিনিময়ে ভূমি’ তত্ত্বখানা শত্রুপক্ষের পাশবিক শক্তির যুক্তিতে চাপিয়ে দেয়া উদ্ভট একটি তত্ত্ব বটে। কারণ, এটি আমাদের ভূমি, শত্রুপক্ষের নয় যে তারা এটিকে শান্তির বিনিময়ে দর কষাকষির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবে।

১৩। চরমপন্থী দলগুলোর মোকাবেলায় তাঁর এবং তাঁর শিক্ষক শাইখ মুহাম্মাদ আল গাজ্জালীর মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। মুসলিম দেশগুলোর ভেতরে-বাহিরে জিহাদের নামে এসব দলগুলো দ্বারা সংঘটিত কর্মকান্ডকে তাঁরা বৈধতা দেননি। তাঁরা এদেরকে ইসলাম ছিনিয়ে নিয়ে একে মূলধারা থেকে বিচ্যুত করে প্রান্তিকতায় নিয়ে যেতে দেন নি। এসব দলগুলোর মধ্যে মুখ্য দলগুলো দ্বারা নিজেদের কর্মপদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করার ব্যাপারটিকে আল ক্বারাদাওয়ী প্রশংসা করেছেন। এসব দলগুলো প্রথমে তাঁর লেখাগুলোকে আক্রমণ ও অগ্রাহ্য করলেও পরবর্তীতে নিজেদের পুনর্বিবেচনার কাজে তাঁর লেখা থেকে সাহায্য পেয়েছে যেটাকে আল ক্বারাদাওয়ী সাহসী ও আলোকিত পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন (পৃষ্ঠা ১১৬৮)।

৫। জিহাদের নৈতিক বিধান

“ইসলামে যুদ্ধ নৈতিকতাপূর্ণ যেমন কিনা রাজনীতি, অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং অন্যান্য কাজ কোন কিছুই নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। অপরদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতায় যুদ্ধ সবসময় নৈতিকতা দ্বারা সীমিত থাকে না।” মুসলিমদের জন্য যুদ্ধ নৈতিক বিধান দ্বারা পরিচালিত কেননা নৈতিকতা কোন ঐচ্ছিক ব্যাপার নয় বরং দ্বীনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ইসলামী নৈতিকতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেঃ ক) শত্রুপক্ষের সেনাবাহিনীতে অনুপ্রবেশ এবং গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য যৌনতা ও মাদকের মত অনৈতিক উপকরণ ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা, খ) সীমালংঘন না করা যেমন কিনা কোরআনে নির্দেশনা এসেছেঃ “আল্লাহর পথে লড়াই কর তাদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু সীমালংঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের ভালোবাসেন না” (কোরআন ২:১৯০)। লেখক সীমালংঘনকে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ, কৃষক এবং অন্যান্য যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না তাদের হত্যা করা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন (পৃষ্ঠা ৭২৮)। এছাড়াও রয়েছে শত্রুপক্ষের মৃতদেহের বিকৃতিসাধনের উপর নিষেধাজ্ঞা। গ) চুক্তি মেনে চলা এবং ধোঁকাবাজি ও বিশ্বাসঘাতকতা পরিহার করে চলা, ঘ) গাছ কেটে ফেলা এবং ইমারত ধ্বংসের উপর নিষেধাজ্ঞা, ঙ) জৈব-রাসায়নিক অস্ত্র ও নিউক্লিয়ার অস্ত্রের মত গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা। এসব অস্ত্র দোষী-নিরাপরাধের মধ্যে কোন বৈষম্য না করেই হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ মানুষকে একসাথে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। জীবন ও জীবিত সব কিছুকে ধ্বংস করে দেয়। ইসলাম এ সমস্ত অস্ত্র ব্যবহারের বিরোধী কারণ যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না তাদের হত্যাকান্ড ইসলাম সমর্থন করে না। যেমনটি কিনা আমরা দেখতে পাই, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) একবার একটি যুদ্ধে একটি মহিলাকে হত্যা করার নিন্দা করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও তা উম্মাহকে এসব নিবৃত্তকারী অস্ত্র অধিকারে রাখতে নিষেধ করে না কেননা অন্যরাও এসব অস্ত্রের অধিকারী এবং উম্মাহকে এসব অস্ত্রের মাধ্যমে হুমকির সম্মুখীন করতে পারে। এক্ষেত্রে যায়োনিষ্ট শত্রুপক্ষের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যারা মুসলিমদের ভূমি জবরদখল করে রেখেছে এবং এসব অস্ত্রের অধিকারী। তাদের ধর্মগ্রন্থও সব প্রতিবেশী জাতিকে সমূলে ধ্বংস করাকে বৈধতা দান করে। অবাক করা ব্যাপার হল, আমেরিকা ও অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অন্যদের এসব অস্ত্রের অধিকারী হওয়া থেকে বারণ করলেও নিজেরাই এসব অস্ত্রের অধিকারী। তারা আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে এসব অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে বিরত রাখলেও, ইসরাইল দুইশোরও বেশী নিউক্লিয়ার হেডের মালিক। পশ্চিমা ও পূর্বের ব্লকসমূহের পারস্পরিক নিবৃত্তকরণ বিশ্বশান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। একই ব্যাপার ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। তবে এসব অস্ত্র অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন একটি জাতি বাহ্যিক হুমকির সম্মুখীন হয়। চ) ইসলাম এর মুজাহিদদের যুদ্ধবন্দীদের প্রতি সদয় আচরণ করতে নির্দেশ দেয়। যুদ্ধবন্দী বিশেষ করে তাদের হত্যা করা যাবে কিনা এ সংক্রান্ত কোরআন-সুন্নাহর সকল নির্দেশনা এবং সকল ফিক্বহী মতামত বিশ্লেষণ করার পর লেখক উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, এ ব্যাপারে সর্বশেষ নির্দেশনা সেটিই যা সূরা মুহাম্মাদে এসেছে, “তাদেরকে অনুগ্রহ করে ছেড়ে দাও অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ করো” (কোরআন ৪৭:৪)। তবে যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারটি সম্ভবত এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সামগ্রিকভাবে লেখক যুদ্ধবন্দী সংক্রান্ত জেনেভা কনভেনশনের ধারাগুলোকে অনুমোদন করেছেন।

উপসংহারে এটাই বলা যেতে পারে যে, জিহাদের ফিক্বহের উপর আল ক্বারাদাওয়ীর এ গবেষণা একটি প্রামাণ্য ইসলামী ইজতিহাদ হিসেবে গণ্য হতে পারে যেটি জিহাদের তত্ত্বকে আত্মরক্ষার চিরন্তন ইসলামী ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেছে এবং যা অনেক বড় ভুল উপস্থাপনার শিকার হয়েছে ও ইসলামের সুনাম ক্ষুন্নের কারণ হয়েছে। আল ক্বারাদাওয়ী চরমপন্থীদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও মধ্যমপন্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে সাহসিকতার সাথে তিনি ইসলামের এ গুরুত্বপূর্ণ বিধানের বিরুদ্ধে চালানো নেতিবাচক প্রচারণার মোকাবেলা করেছেন ঠিক একই সাহসের সাথে তিনি চরমপন্থীদের যুক্তি খন্ডন করেছেন যারা সমস্ত পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তিনি আক্রমণাত্মক জিহাদকে সমর্থনকারী এক বিশাল সংখ্যক ফক্বীহগণকে সমালোচনা করতে যেমন দ্বিধাবোধ করেন নি তেমনি জিহাদকে কেবল আত্মরক্ষামূলক গণ্য করা শিবিরের একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে নিজেকে দাবী করতেও লজ্জিত হন নি। কোনপ্রকার ভয় বা দ্বিধা ছাড়াই, কোনপ্রকার অবিচার না করে কিংবা কোন রকমের হেয় বা ভুলভাবে উপস্থাপন না করে এখনো তিনি পূর্বোক্ত দলের যুক্তি খন্ডন করে চলেছেন, যাদের সাথে তিনি দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বরং তাঁদের জন্য কৈফিয়ত তালাশ করেন। তিনি এভাবে জিহাদ আত তালাবের ভিত্তিমূলকে প্রায় অকার্যকর প্রতিপন্ন করে আত্মরক্ষামূলক জিহাদের ভিত্তিকে এর বিস্তৃত অর্থে সুসংহত করেছেন, যে জিহাদের গায়ে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের কোন চিহ্ণ পর্যন্ত নেই। এ সন্ত্রাসবাদকে তিনি আবার সুস্পষ্টভাবে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে চলা প্রতিরোধ যুদ্ধের থেকে পৃথক করেছেন। এটি এমন এক নৈতিক জিহাদ যা আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, মূলনীতি, মূল্যবোধ ও আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেগুলো আগ্রাসন, দখলদারিত্ব, গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার, যুদ্ধবন্দীদের উপর নির্যাতনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এটি এমন এক জিহাদ যা মুক্ত পৃথিবীকে বরণ করে নেয় যেখানে বিভিন্ন ভাবধারা ও ব্যক্তিবর্গ মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারবে; সহিংসতা ও ক্ষমতার পরিবর্তে যেখানে প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে মানুষ একে অপরের সাথে মতের আদান-প্রদান করবে; যেখানে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে সঠিক চিন্তার অধিকারীগণই বিজয়ী হবেন। জিহাদের এরূপ উপস্থাপনার মাধ্যমে আল ক্বারদাওয়ী ইসলাম ও অন্যান্য ধর্ম, মানবীয় মূল্যবোধ, আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহের মধ্যে সংলাপ, সহনশীলতা, ঐক্যমত ও সম্প্রীতির এমন এক বিশাল দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন যা কোরআনের এ আয়াতের প্রতি সাড়া দেয়ার একটি সুযোগ করে দিয়েছেঃ “হে মানবজাতি, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের পুরুষ ও নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে তারাই আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম যারা উত্তম আচরণের অধিকারী” (৪৯:১৩)।

লেখাটি মূলত ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ এ এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত একটি ভাষণ থেকে নেওয়া হয়েছে।

সূত্রঃ VirtualMosque.com

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
fiqh ul jihad

শাইখুল ইসলাম ইউসুফ আল-ক্বারাদাওয়ী রচিত অনন্য সাধারণ গ্রন্থ “ফিক্‌হুল জিহাদ” এর পাঠ পর্যালোচনা (পর্ব-১)

রশীদ আল ঘান্নুশী | মার্চ ২৬, ২০১৫
Download PDF

সমকালীন বিশ্বের অন্যতম ইসলামী চিন্তাবিদ শাইখ ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ীর অনন্য সাধারণ গ্রন্থ “ফিক্‌হুল জিহাদ” প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। ১৪৩৯ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে তিনি জিহাদের ধারণাকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ব্যাখ্যা করেছেন।

ড. রশীদ আল ঘানুশী ২০০৯ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গ্রন্থটির উপর একটি বক্তৃতা প্রদান করেন। জিহাদ বিষয়ে বিতর্কিত ধারণাগুলোকে স্বচ্ছ করতে এই বক্তব্যটি বেশ সহায়ক হবে ।

— সম্পাদক

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

এই সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি সমসাময়িক ইসলামী চিন্তাধারার সবচেয়ে জটিল ও আলোচিত একটি বিধান, জিহাদের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে যা ইসলামি চিন্তা-কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। হাদীসের ভাষায় জিহাদ হচ্ছে, ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়া ও সীমা এবং এমন একটি বিষয় যাকে ঘিরে ইসলামের ভেতর ও বাহির উভয় অবস্থান থেকেই বিস্তৃত মতপার্থক্য এবং দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রেক্ষিতে এইসব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির ফলাফল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়াও মুসলিম বিশ্বে ঈমান ও আমলের ক্ষেত্রে যে পুনর্জাগরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিমদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সরকার ও অমুসলিমদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এসব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব রয়েছে। এটিই ইসলামের ধর্মীয় দিক যা বিশ্বাস, আচারানুষ্ঠান ও নৈতিকতা সম্পর্কিত এবং আদর্শিক দিক যা মুসলিমদের সামাজিক ও রাজনৈতিক আচার-রীতি ও চিন্তাধারাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে- এই দু’য়ের মধ্যে বৃহত্তর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে। ইসলামের এ আদর্শিক দিকটি ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ হিসেবেও পরিচিত যার কেন্দ্রবিন্দুতে কোন না কোনভাবে জিহাদের অবস্থান রয়েছে।

এ প্রবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কেননা এটি এই জরুরী বিষয়ে এমন একজন ব্যক্তির মতামত তুলে ধরার চেষ্টা করেছে যিনি সমসাময়িক ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন- তিনি হলেন শাইখ ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী। আর এর সাক্ষ্য বহন করে বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা। বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ের কথা বলতে গেলে, তাঁর লিখিত কর্মের সংখ্যা দেড়শ পেরিয়েছে যেগুলো ইসলামী চিন্তাধারার সমস্ত দিকগুলোকেই পরিবেষ্টিত করেছে। প্রধান প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক ও ফিক্‌হী কাউন্সিলগুলোতে সদস্য হওয়ার পাশাপাশি তিনি “ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ মুসলিম স্কলারস”-এর নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এছাড়াও তিনি “ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া এন্ড রিসার্চ” ও বেশ কিছু দাতব্য সংস্থারও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সে সাথে তিনি “অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ” সহ বেশ কিছু ইসলামিক স্টাডিজ একাডেমিক কমিটির সদস্য। আর ইসলামি আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি এর অন্যতম একটি দল ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর অভ্যন্তরে বেড়ে উঠেছেন এবং এতে নেতৃস্থানীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি মুসলিম ওয়েবসাইট ইসলাম অনলাইনকে পৃষ্ঠপোষকতা এবং আল-জাজিরা চ্যানেলে তাঁর জনপ্রিয় সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান ‘শারীয়াহ্‌ ও জীবন’, যা সপ্তাহে ৬০ মিলিয়ন দর্শক আকৃষ্ট করে, এর মাধ্যমে আধুনিক গণমাধ্যমেও একজন পরিচিত মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

সমসাময়িক ইসলামে আল-ক্বারাদাওয়ী একটি মুখ্য তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন যা থেকে তাঁর সমস্ত মতামত এবং দৃষ্টিভঙ্গী উৎসরিত হয় এবং যার দিকে তিনি অক্লান্তভাবে ডেকে যাচ্ছেন। বিরোধীদের অবস্থানকে সংকুচিত করে এই তত্ত্বের আবেদন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি হচ্ছে ইসলামী ওয়াসাতিয়া বা মধ্যমপন্থার নীতি। এই চিন্তাটি কোরআনের দ্বিতীয় সূরার এই আয়াতটি দ্বারা অনুপ্রাণিত যেখানে বলা হয়েছেঃ “এবং এভাবেই আমরা তোমাদের মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে তৈরী করেছি।”এভাবেই তিনি ইসলামকে পরস্পর বিপরীত ও সাংঘর্ষিক দুটো অনমনীয় অবস্থান যেমনঃ বস্তুবাদ ও আধ্যাত্মবাদ, বাক্তিবাদ ও সমষ্টিবাদ, ভাববাদ ও বাস্তববাদ ইত্যাদির মধ্যে মধ্যম অবস্থানের অধিকারী হিসেবে তুলে ধরেন যেটি সবকিছুকে সমন্বয় করে চলে। এই ওয়াসাতি বা মধ্যমপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি জিহাদের প্রশ্নসহ ইসলামী চিন্তাধারার সকল বিষয়ে নিজের ইজতিহাদ পেশ করে থাকেন যার দৃষ্টান্ত হচ্ছে তাঁর সর্বশেষ বই “জিহাদের ফিক্‌হঃ কোরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে এর আহকাম ও দর্শনের তু্লনামূলক পর্যালোচনা”। লেখকের মতে এই গবেষণাকর্ম টানা কয়েকবছরের পরিশ্রমের ফল যা তাঁর মনমানসকে ব্যস্ত রেখেছিল দশকের পর দশক ধরে। আর এই কাজের ফসলই একটি যুগান্তকারী দুই খন্ডের বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি ওয়াসাতি বা মধ্যমপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছেন এবং জিহাদের উপর তাঁর নিজস্ব তত্ত্ব সুবিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন যা জিহাদের মত একটি গুরুতর বিষয়ে ঐক্যমত তৈরী করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বইটি এ বিশ্বাস থেকেই উৎসরিত হয়েছে যে, “জিহাদকে ভুল বোঝা এবং এর নামে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরানো, সম্পত্তি ও জীবন বিনষ্ট করা এবং মুসলিমদের ও ইসলামকে ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড ও সন্ত্রাসবাদের কলঙ্কে কলঙ্কিত করা বিপদজনক ও ত্রুটিপূর্ণ যখন প্রকৃতপক্ষে ইসলাম এসব অভিযোগ থেকে মুক্ত। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, এই গুরুতর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও উদাসীনতা এই দুই প্রান্তিকতার মাঝে সত্য হারিয়ে যায়।”

শাইখ ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ীর মতে ইসলামে জিহাদের যে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তার স্বচ্ছ একটি ধারণা তুলে ধরার দিকে এই যুগান্তকারী কাজটির উপর আমাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে। এই সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে কোরআন-সুন্নাহ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাফসীর ও ফিক্‌হ ঐতিহ্যের সাথে কোরআন-সুন্নাহর মিথষ্ক্রিয়ার ভিত্তিতে এবং বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্যের মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক ও বাহ্যিক শক্তির সাথে বড় বড় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থা, স্বাধীনতার মূল্যবোধের জয়গান গাওয়া আধুনিক সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক আইনকে বিবেচনায় রেখে যে আইন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে নেয় ও বৈধ যুদ্ধকে কেবল আত্মরক্ষার মধ্যে সীমিত করে দেয়। এইসব কিছুর পরিপ্রেক্ষিতেই জিহাদের ব্যাপারে আল-ক্বারাদাওয়ীর মতামত গঠিত হয়েছে। এই কাজের খুঁটিনাটি অনুসন্ধান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। এই বইটিতে অভিনব যেসব বিষয় রয়েছে, বিশেষ করে যেগুলো বিভিন্ন তাৎপর্যপূর্ণ প্রসঙ্গের সাথে সম্পর্কিত যেমনঃ স্বাধীনতার সাথে জিহাদের সম্পর্ক, মুসলিম ও অন্যান্যদের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর এর প্রভাব, জিহাদ কি মুসলিম সমাজের মধ্যে নাকি বাহিরে সংঘটিত হবে, এসবের সাধারণ একটি চিত্র তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য। অতএব, এই কর্মপন্থার ভিত্তিসমূহ কি? জিহাদ কি? জিহাদের রূপসমূহ কি কি? এর উদ্দেশ্যসমূহ কি কি? এটি আত্মরক্ষামূলক নাকি আক্রমণাত্মক? এটি কি দারুল ইসলাম ও দারুল কুফরের মধ্যে? যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে ইসলামের হুকুম কি? উম্মাহ্‌র মধ্যে কি জিহাদ আছে? উম্মাহ্‌র চলমান পরিস্থিতিতে জিহাদের অবস্থান কোথায়?

১) কর্মপন্থা বিষয়ক প্রশ্নঃ

প্রারম্ভিক ভূমিকাতেই লেখক তাঁর গবেষণার ভিত্তি ও বুনিয়াদ নিরূপণ করেছেনঃ

ক) চূড়ান্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসেবে কোরআনের উপর ভরসা করা যেটি রাসূলের সুন্নাহসহ অন্যান্য উৎসসমূহ বিচারের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। কোরআনকে বুঝতে হবে এরমূল ভাষা আরবী দিয়ে,বাইরে থেকে অর্থ চাপিয়ে দিয়ে নয় এবং এটির উপর ভিত্তি করে যে কোরআনের সব আয়াতই বাস্তবায়ন করার জন্য নাযিল হয়েছে “তাই আমি সবিস্তারে তাদের দাবী নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি যারা বলে থাকেন, কোরআনে আয়াত আস-সাইফ (তলোয়ারের আয়াত) বলে একটি আয়াত রয়েছে যা তাদের দাবী অনুযায়ী ১৪০টি বা তার চেয়েও বেশী আয়াত রহিত করেছে, যদিও এই আয়াত কোনটি তা নিয়েই তাদের মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান।” লেখক বলতে গেলে কোরআনের আয়াত রহিতকরণের মূলনীতিকেই বাতিল সাব্যস্ত করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি চরমপন্থীদের একটি কার্যকর অস্ত্র থেকে বঞ্চিত করেছেন যেটা দ্বারা তারা শত শত আয়াতকে অকার্যকর রেখেছে যেগুলো দয়া, ক্ষমাশীলতা, অমুসলিমদের সাথে প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আচরণ করা এবং অমুসলিমদের মধ্যে সংখ্যালঘু অংশ যারা অন্যায়-অবিচার করে তাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক জিহাদ করা যেতে পারে ও শান্তিপূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যারা সুবিচার এবং দয়াশীলতার অধিকারী- এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে বলে।

খ) সহীহ সুন্নাহর উপর নির্ভর করা যা এর চেয়ে শক্তিশালী উৎস কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক না। সেজন্যই লেখক হাদীসশাস্ত্রের মানদণ্ড ব্যবহার করে “আমাকে তলোয়ার দিয়ে পাঠানো হয়েছে”এবং তদ্রুপ অন্যান্য হাদীসসমূহকে দুর্বল হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি অন্য একটি সহীহ হাদীস, যেটিতে মানুষ লা ইলাহা ইল্লাহ বলা না পর্যন্ত তাদের সাথে লড়াই করার জন্য বলা হয়েছে, ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে হাদীসে ব্যবহৃত ‘মানুষ’ শব্দটি কেবল শত্রু মনোভাব সম্পন্ন আরব মুশরিকদের জন্য নির্দিষ্টভাবে প্রযোজ্য।

গ) কোন একটি নির্দিষ্ট মাযহাবের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে কিংবা প্রসিদ্ধ মাযহাবগুলোর কোন একটিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে তুলনামূলক আইনের পদ্ধতি, বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও সবচেয়ে উপযুক্ত মত গ্রহণের ভিত্তিতে ফিক্‌হের সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্য থেকে লাভবান হওয়া। লেখক ফিক্‌হ এবং শরীয়াহর মধ্যে পার্থক্য করেন এভাবে যে, শরীয়াহর উৎস স্বয়ং আল্লাহ্‌ যেখানে ফিক্‌হ হচ্ছে শরীয়াহর হুকুমে উপনীত হওয়ার জন্য মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার ফল। প্রকৃত ফিক্‌হ সেটা নয় যা কোন বই থেকে হুবহু নকল করা হয়। বরং তা হচ্ছে ফক্বীহর নিজস্ব ইজতিহাদ (বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা) যা তাঁর সময় ও স্থানের জন্য উপযোগী। বিশেষ করে আমাদের সময়ের জন্য তো এটি আরো বেশী প্রযোজ্য যখন বড় বড় পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে।

ঘ) ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্ম ও আইন ব্যবস্থাসমূহের তুলনা করা।

ঙ) বর্তমান বাস্তবতার সাথে ফিক্‌হকে সম্পর্কযুক্ত করাঃ মুসলিম ফক্বীহ যখন জিহাদ সম্পর্কে কথা বলবেন তখন তাঁকে এর অপরিবর্তনীয় মূলনীতিগুলোকে উপলব্ধি করতে হবে যেমনঃ তাদাফু’র নীতি (পারস্পরিক নিবৃত্তিকরণ), শত্রুকে প্রতিহত করার জন্য সম্ভাব্য সবধরনের শক্তিকে প্রস্তুত রাখার হুকুম, মুসলিমদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধের সূচনা করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা, সীমালঙ্ঘন করা নিষিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি। তবে অন্য বেশ কিছু বিষয়েরও আবির্ভাব ঘটেছে (যেগুলোকে মুতাগায়্যিরাত বা পরিবর্তনীয় উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়) যেমনঃ যুদ্ধকে নিন্দা করা, শান্তি তালাশ করা, আন্তর্জাতিক আইনের আবির্ভাব, মানবাধিকার ধারা, জাতিসংঘ, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি। এ বিষয়ে লেখকের বক্তব্য হচ্ছে, “ইসলামের ছায়াতলে থেকে আমরা এমন একটি পৃথিবীতে বসবাস করতে পারি যা ভীতির পরিবর্তে শান্তি ও নিরাপত্তা, গোঁড়ামীর পরিবর্তে সহিষ্ণুতা, ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসাকে উৎসাহিত করে। আমরা জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ধারা, পরিবেশবাদী দলগুলোর সাথে সহাবস্থান করতে পারি। সত্যিকার অর্থে, আমাদের অনমনীয় ভাইয়েরা যারা সব দরজা বন্ধ করে কেবল একটি মতের উপরেই জোর দিচ্ছেন, তাদের সাথে আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে, তারা অতীতে বসবাস করছেন, বর্তমানে না; বইয়ের জগতে বসবাস করছেন, বাস্তবজগতে নয়।”

চ) দাওয়াহ, শিক্ষা, ইফতা (ফতোয়া দেয়া), গবেষণা, সংস্কার এবং পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে ওয়াসাতিয়া বা মধ্যমপন্থা অনুসরণ করা। ফিক্‌হে এ কর্মপন্থার মূলনীতি হল আমাদের পূর্ববতী আলেমরা তাদের সময়ের জন্য যেমন ইজতিহাদ করেছেন, তেমনি আমাদের সময়ের জন্যও নতুন ইজতিহাদ করা, গৌণ উৎসগুলোকে প্রাথমিক উদ্দেশ্যসমূহের (মাকাসিদ) আলোকে বোঝা, মূলনীতিসমূহে (উসূল) দৃঢ় ও শাখাসমূহে (ফুরু) নমনীয় থাকা। উৎস যাই হোক না কেন তা থেকে প্রজ্ঞা আহরণ করা ও দ্বীনের মূলনীতি ও সমকালীন পরিবর্তনসমূহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার মাধ্যমে দ্বীনকে ভেতর থেকে পুনরুজ্জীবিত করা।

ছ) ‘ফিক্‌হ আল-জিহাদ’ পড়ার সময় যে কারোরই চোখে পড়বে যে, লেখক যেন উপরে বর্ণিত মতামতসমূহের একমাত্র প্রস্তাবক হিসেবে বিবেচিত না হোন সেদিকে খেয়াল রেখেছেন। তিনি খুব আগ্রহের সাথে নিজ মতের সমর্থনে অতীত এবং সমকালীন আলেমদের মতামত তুলে ধরেছেন যদিও সেগুলো উপেক্ষিত ও অনাদৃত হয়ে থাকে। সেসব অবহেলিত মতামতসমূহের উপর জমে থাকা ধূলির আস্তর সরিয়ে সেগুলোর উপর আলোকপাত করেছেন, সেগুলোকে আরো আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করেছেন। এভাবে তিনি ঐসব মতসমূহকে নতুন জীবন দান করেছেন। এছাড়াও লেখক ইসলামী সংস্কৃতির উৎসসমূহের উপর তাঁর গভীর জ্ঞান ও আধুনিক সংস্কৃতির সাথে নিজ পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক সংস্কৃতির মধ্য থেকে প্রাসঙ্গিক মূল্যবোধ এবং বিশেষজ্ঞ মতামতকে নিজ মতের সমর্থনে পেশ করেছেন। এভাবে তিনি ইসলামিক জিহাদের একটি সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গী নির্মাণ করেছেন যা অভিনব, আভ্যন্তরীণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ, ইসলামী ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত এবং যুদ্ধ ও শান্তির ব্যাপারে সমকালীন সংস্কৃতির সাথে যার বিশাল অংশের মিল রয়েছে। এই বইয়ের নতুনত্ব এর খুঁটিনাটি বিষয়সমূহে নয় কারণ এর অংশসমূহ তো এর ভেতরে ছড়ানো ছিটানো ও লুকায়িত আছে। এর অভিনবত্ব বরং এরসামগ্রিকতায়যা একে এমন এক মিলন ও ঐক্যমতের বিন্দুতে পরিণত করেছে যেখানে সব অথবা বেশীরভাগ পক্ষই পরিচিত এমন কিছু খুঁজে পাবে যা তাদেরকে অপরিচিত বিষয়সমূহকে গ্রহণ করতে সাহায্য করবে। ঐক্যমত গড়ে তোলার এই সক্ষমতা বড় আলেমদের একটি ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য। তাই লেখক যখন ফক্বীহ, আইনজীবী, ইসলামপন্থী, ইতিহাসবিদ, প্রাচ্যবিদ, কূটনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, সামরিক ব্যাক্তিত্ব এবং শিক্ষিত জনগণের মধ্যে এ ধরনের গবেষণাকর্মের ভীষণ প্রয়োজন বলে অভিহিত করেন তখন তাতে একটুও অতিরঞ্জন করেন নি।

২) জিহাদের মর্ম এবং এর রূপসমূহঃ

ইসলামের কোন বিষয়ই জিহাদের মত এরকম লাগাতার সমালোচনার শিকার হয় নি এবং ইসলাম ও মুসলিমদের উপরও এরূপ অবিরাম আক্রমণের কারণ হয় নি। জিহাদ বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি এই দুই প্রান্তিকতার শিকার। পরের অবস্থানটির ব্যাপারে এমন দল উৎসাহ প্রদান করে যারা বশ্যতা ও আত্মসমর্পণের মানসিকতা ছড়ানোর মাধ্যমে উম্মাহর জীবন থেকে জিহাদের অবসান চায়। একাজে তারা সহিষ্ণুতা, শান্তিসহ বিভিন্ন আহবানের ছদ্মবেশ ব্যবহার করে থাকে। লেখক এই দলগুলোকে উপনিবেশবাদের দালাল হিসেবে অভিহিত করেছেন। এদের জিহাদের প্রতি বিদ্বেষ এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে যে, এরা জিহাদবিহীন ইসলামের প্রবর্তন করেছে এবং এর প্রচার প্রসারে আত্মনিয়োগ করেছে। এই দলগুলোর মধ্যে রয়েছে বাহাই এবং কাদিয়ানী। আরেক প্রান্তে অবস্থান করছে একদল যারা জিহাদকে একটি উন্মত্ত যুদ্ধের ধারণায় পরিণত করেছে যা গোটা বিশ্বের বিরুদ্ধে লড়া হয়। অমুসলিমদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ককে শত্রুতায় পর্যবসিত করেছে। সব মানুষই তাদের মতে শত্রু যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা মুসলিম হচ্ছে। পরের দলটি প্রাচ্যবিদদের দেয়া জিহাদের সংজ্ঞার সাথে একমত হতে পারে যেমন কিনা ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ইসলাম’-এ দেয়া আছেঃ “তরবারীর মাধ্যমে ইসলাম বিস্তার করা, যেটি সব মুসলিমের উপর আবশ্যক এবং ইসলামের ষষ্ঠ স্তম্ভ।” (এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ইসলাম, আরবী অনুবাদ, পৃঃ ২৭৭৮)

লেখক উভয় দলের চরমপন্থাকে খন্ডন করেছেন ‘জিহাদ’, যার অর্থ মূলত নিজে সচেষ্টা হওয়া এবং প্রচেষ্টা চালানো, এ শব্দটির ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং কোরআন-সুন্নাহতে ও মুসলিম ফক্বীহদের দ্বারা এ শব্দের ব্যবহার পরীক্ষা করার মাধ্যমে। তিনি এ উপসংহারে এসেছেন যে, জিহাদ এবং ক্বিতালের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, কেননা জিহাদে অংশগ্রহণ করার আদেশ মক্কায় নাযিল হয়েছিল যেখানে কোন লড়াই ছিল না, বরং ছিল কোরআনের মাধ্যমে দাওয়াতের জিহাদ। “এবং তাদের সাথে এর সাহায্যে কঠোর জিহাদ করুন।” [কোরআনঃ ২৫:৫২] (পৃষ্ঠা ৫০-৫২)

এ শব্দটি কোরআন ও সুন্নাহতে বিভিন্ন প্রকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যেমনঃ শত্রুবাহিনী, শয়তান এবং স্বীয় কামনা-বাসনা ইত্যাদি প্রতিরোধে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো। তাই, ‘জিহাদ’ শব্দটি কেবল ‘লড়াই’-এর চাইতে প্রশস্ত অর্থ বহন করে, যার সমর্থনে লেখক ইবনে তাইমিয়াহ থেকে উদ্ধৃতি দেন, “(জিহাদ) হতে পারে হৃদয় দিয়ে, ইসলামের দিকে আহবান করার মাধ্যমে, ভুল মতকে খণ্ডন করার মাধ্যমে, মুসলিমদের কল্যাণ বয়ে আনে এমন কিছুর উপদেশ বা এর ব্যবস্থা করার মাধ্যমে অথবা নিজের দেহের মাধ্যমে তথা লড়াইয়ের মাধ্যমে।”

এছাড়াও জিহাদের ব্যাপ্তি যে আরো প্রশস্ত তা পরিষ্কার করতে লেখক নিজ সমর্থনে চতুর্দশ শতাব্দীর আলেম, ইবনে তাইমিয়াহর ছাত্র ইবনিল ক্বায়্যিমকেও উদ্ধৃত করেন। এ পরিসরে প্রত্যেক মুসলিমই একজন মুজাহিদ কিন্তু অপরিহার্যভাবে মুক্বাতিল (লড়াইকারী) নয়। ইবনিল ক্বায়্যিম ইসলামী দাওয়াহর উপর তাঁর গবেষণা থেকে এ উপসংহারে আসেন যে, জিহাদের ১৩টি স্তর রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে জিহাদ আন নাফস (নিজের সাথে জিহাদ) যাতে চারটি স্তর অন্তর্ভুক্ত। সেগুলো হচ্ছেঃ হেদায়াত অনুসন্ধান করা, এর উপর আমল করা, এর দিকে আহবান করা, এর উপর অটল থাকা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ যাতে রয়েছে দুটি স্তরঃ শয়তান একজনের ঈমানে যেসব সন্দেহ উস্কে দিয়ে থাকে সেগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং শয়তান যেসব কামনা-বাসনা ও বিকৃতির দিকে আহবান করে সেগুলোকে প্রতিরোধ করা। তৃতীয়ত, অমুসলিম এবং মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ যা চারটি স্তরে বিভক্তঃ হৃদয়, জিহবা, সম্পদ এবং নিজের জীবনের মাধ্যমে জিহাদ। চতুর্থত, অত্যাচারী এবং নীতিহীনদের বিরুদ্ধে জিহাদ যেটির রয়েছে তিনটি স্তরঃ হাত দ্বারা জিহাদ যদি তা সম্ভব হয়, যদি সম্ভব না হয় তবে জিহবা দ্বারা জিহাদ, যদি সেটাও সম্ভব না হয় তবে হৃদয়ের মাধ্যমে জিহাদ। অবশ্য লেখক ইবনিল ক্বায়্যিমের সাথে মতভিন্নতা পোষণ করে অত্যাচারী ও নীতিহীনদের বিরুদ্ধে জিহাদকে কুফর এবং বহির্শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জিহাদের আগে স্থান দিয়েছেন। সেইসাথে এটাও জোর দিয়ে বলেছেন যে, “অন্যায় শাসকের মোকাবেলা করার জন্য অন্যরা যেসব যৌক্তিক উপায়-উপকরণ উদ্ভাবন করেছে যেমনঃ নির্বাচিত পার্লামেন্ট, রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ- সেগুলোর ফায়দা নেয়া যেতে পারে” (পৃষ্ঠা ১৯৮) এবং এর মাধ্যমে অত্যাচারীদের শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবেলা করতে হবে।

লেখক বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক জিহাদের উপরেও জোর দিয়েছেন যা হবে “বিশেষজ্ঞদের জন্য ইসলামি একাডেমিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও ব্যতিক্রমী তরুণদের শিক্ষায়তনিক ও নৈতিকভাবে গড়ে তোলার মাধ্যমে। এটি তাদের এমন কর্মপন্থার উপর ভিত্তি করে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রস্তুত করবে যা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে সমন্বয় করবে… বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার দিকে আহবান আমরা করি না। আমরা বরং সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার পারস্পরিক আদান-প্রদানের দিকে আহবান করি। আমরা কি নিব আর কি নিব না সেটা আমরা সিদ্ধান্ত নিব আমাদের নিজস্ব দর্শন ও মাপকাঠির ভিত্তিতে, যেমন কিনা অতীতে তারা আমাদের চিন্তা ও উদ্ভাবন থেকে ধার নিয়ে সেগুলোকে আরো বিকশিত করেছে ও তা ব্যবহার করে নিজেদের সভ্যতা বিনির্মাণ করেছে। আমরা যা নিব তা আমাদের চিন্তা-চেতনা, বৈশিষ্ট্য ও নৈতিক ঐতিহ্য দ্বারা এমনভাবে অনুপ্রাণিত হবে যে সেগুলো নিজেদের প্রারম্ভিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক ব্যবস্থার অংশে পরিণত হবে।” (পৃষ্ঠা ১৯০-১৯২)

লেখক ইসলামে জিহাদের ফিক্‌হের উপর তাঁর গবেষণা থেকে এ উপসংহারে এসেছেন যে, জিহাদ দু প্রকারঃ বেসামরিক জিহাদ এবং সামরিক জিহাদ। সামরিক জিহাদ হচ্ছে মুসলিমদের উপর আক্রমণকারী শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। যার জন্য জরুরী হচ্ছে যখন এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে তখন প্রস্তুতি নেয়া। এটি রাষ্ট্রের আওতার মধ্যে পড়ে। আর রূহানী বেসামরিক জিহাদ“শিক্ষায়তন, বিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, পরিবেশ এবং সভ্যতার ক্ষেত্রকে পরিবেষ্টন করবে। বেসামরিক জিহাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর জন্য সর্বোচ্চ আত্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে অজ্ঞ ব্যক্তিকে শিক্ষার আলো দেওয়া, বেকারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ক্ষুধার্তকে আহার দেওয়া, বস্ত্রহীনকে পোশাক দেওয়া, গৃহহীনদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা, অসুস্থকে সেবা করা, দরিদ্রদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা, ছাত্রদের জন্য স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা, নামাযীদের জন্য মসজিদ নির্মাণ করা, ক্রীড়াচর্চা করতে যারা ভালোবাসে তাদের জন্য ক্লাব নির্মাণ করা যাতে তারা তাদের ক্রীড়া চর্চা করতে পারে।”

৩। জিহাদের উদ্দেশ্য

ইসলাম শান্তির দিকে একটি আহবান। এটি যুদ্ধকে ঘৃণা করে কিন্তু যুদ্ধ একটি বাস্তবতা। সেজন্যই ইসলাম যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু এর উপর চাপিয়ে দেয়ার আগ পর্যন্ত ইসলাম যুদ্ধ শুরু করে না। এর কারণ ইসলামের বাস্তববাদী প্রকৃতি এবং সুন্নাহ আল-তাদাফু’র (পারস্পরিক নিবৃত্তকরণ নীতি) প্রতি খেয়াল রাখা। যদিও ইসলাম বিভিন্ন নিয়ম-নৈতিকতার মাধ্যমে এর পরিণতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছে। ইসলাম প্রয়োজনের খাতিরে যুদ্ধকে স্বীকৃতি দিয়ে খ্রিষ্টধর্মসহ অন্যান্য ধর্মের চেয়ে আলাদা কিছু করেনি। খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীরা তো নিজেদের মধ্যে এবং অন্যের সাথে সবচেয়ে বেশী যুদ্ধ ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। লুকের বাইবেলে আছে, “আমি পৃথিবীতে আগুন নিয়ে এসেছি। তোমরা কি মনে করেছো আমি পৃথিবীতে শান্তি নিয়ে এসেছি?” সাতটি জনগোষ্ঠী যারা ফিলিস্তিনের অধিবাসী ছিল তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্যবার গণহত্যার মাধ্যমে পুরোপুরি নির্মূলের নির্দেশ এসেছে ওল্ড টেস্টামেন্টে। যেন আধুনিক যায়োনিষ্ট গ্যাঙ্গদের দ্বারা‘স্থানান্তর’এর অধুনা আহবান ও তাদের কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা যেন ওল্ড টেস্টামেণ্টের সে নির্দেশেরই ক্ষুদ্র রূপ।

ইসলামে জিহাদের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে যেগুলোকে আল ক্বারাদাওয়ী এভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেনঃ সীমালংঘনের জবাব দেয়া, ফিতনা প্রতিরোধ করা–তথা মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নির্যাতিতদের রক্ষা করা, চুক্তি ভঙ্গকারীদের শাস্তি দেয়া এবং উম্মাহ্‌র মধ্যে আভ্যন্তরীণ শান্তি নিশ্চিত করা। তাই সীমানা বিস্তৃতি ও ধনসম্পদ কব্জা করা জিহাদের উদ্দেশ্য নয় এমনকি নয় কুফরের নিশ্চিহ্নকরণও; কারণ, তা পার্থক্য ও পারস্পরিক নিবৃত্তকরণের (তাদাফু’) আল্লাহর নীতির বিরুদ্ধে যায়। যারা ইসলামে বিশ্বাস করে না তাদের উপর ইসলাম চাপিয়ে দেয়াও জিহাদের উদ্দেশ্য নয় কেননা তা আল্লাহর বেঁধে দেয়া বৈচিত্র্য ও বহুত্বের নীতির বিরুদ্ধে যায়। (পৃষ্ঠা ৪২৩)

লেখাটি মূলত ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ এ এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত একটি ভাষণ থেকে অনূদিত।

সূত্রঃ VirtualMosque.com

দ্বিতীয় পর্বঃ
শাইখুল ইসলাম ইউসুফ আল-ক্বারাদাওয়ী রচিত অনন্য সাধারণ গ্রন্থ “ফিক্‌হুল জিহাদ” এর পাঠ পর্যালোচনা (পর্ব-২)

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather