All posts by ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী

আল্লামা ইউসুফ আল-ক্বারাদাওয়ী বর্তমানে ইসলামের একজন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, কবি ও দার্শনিক। ইসলামী জ্ঞানে তাঁর গভীরতা এবং সমসাময়িক বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের কি ভূমিকা হবে সে বিষয়ে সুচিন্তিত মতামতের জন্য তিনি সারা বিশ্বে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র। তিনি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একজন অন্যতম প্রবক্তা। ১৯২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মিশরের নীল নদের পাশেই ‘সাফাত তুরাব’ গ্রামে এ মহান মনীষার জন্ম। মাত্র নয় বছর বয়সেই তিনি সম্পূর্ণ কুর’আন হেফজ করেন এবং কুর’আন তেলাওয়াতের নীতিমালা ও তাজভীদের উপর ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তিনি আল-আজহারেই লেখাপড়া করেন। ১৯৭৩ সালে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের উসূল আল দ্বীন অনুষদ হতে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। ড. ক্বারাদাওয়ী আল আজহার ইনস্টিটিউটে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশুনার সময়ই তার প্রতিভার স্বাক্ষর হিসেবে শিক্ষকদের কাছ থেকে আল্লামা বা মহান পণ্ডিত খেতাবে ভূষিত হন। ১৯৫৮ সালে আরবী ভাষা ও সাহিত্যের উপর ডিপ্লোমা করেন। এর আগে তিনি আরবী ভাষা অনুষদ থেকে শিক্ষকতার সনদ পান। ড. ক্বারাদাওয়ী মিশর সরকারের আওকাফ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বোর্ড অব রিলিজিয়াস এফেয়ার্স-এর একজন সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি আলজেরীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ইসলামিক সায়েন্টিফিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে তিনি জেদ্দাস্থ ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) ফিকাহ একাডেমী, মক্কাভিত্তিক রাবেতা আল আলম আল ইসলামীর ফিকাহ একাডেমী, রয়াল একাডেমী ফর ইসলামিক কালচার এন্ড রিসার্চ জর্ডান, ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার অক্সফোর্ড-এর সদস্য, ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া এন্ড রিসার্চ-এর প্রেসিডেন্ট এবং কাতার সীরাহ স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক। তিনি বাংলাদেশস্থ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম এর ট্রাস্টি বোর্ডেরও সদস্য ছিলেন। এ পর্যন্ত তাঁর ১২০ টিরও বেশী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আরবি ভাষায় লিখলেও তাঁর গ্রন্থসমূহ ইংরেজি, তুর্কী, ফার্সি, উর্দু ও বাংলা সহ বিশ্বের প্রায় সব ভাষাতেই অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা ভাষায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অনূদিত গ্রন্থসমূহ হল- ‘ইসলামে হালাল হারামের বিধান’, ‘ইসলামের যাকাত বিধান’, ‘ইসলামী শরীয়তের বাস্তবায়ন’, ‘ইসলাম ও শিল্পকলা’, ‘ইসলামী পুনর্জাগরণ : সমস্যা ও সম্ভাবনা’, আধুনিক যুগ : ইসলাম কৌশল ও কর্মসূচি’, ‘জেরুজালেম : বিশ্ব মুসলিম সমস্যা’, ‘ফতোয়া’, ‘আবুল হাসান আলী নদভী : এমন ছিলেন তিনি’ ইত্যাদি।
taqlid

তাক্বলীদ এবং কোন একটি মাযহাবের অনুসরণঃ বাড়াবাড়ি ও অবহেলার বিপরীতে মধ্যমপন্থী অবস্থান

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | এপ্রিল ২৬, ২০১৫
Download PDF

ভাষাতাত্ত্বিক সংজ্ঞাঃ

আরব ভাষাবিদদের মতে, ‘তাক্বলীদ’ শব্দটি এর মূল ‘ক্বালাদা’ থেকে উৎসরিত হয়েছে। ‘ক্বালাদা’ অর্থ হচ্ছে এমন একটি হার যা শক্তভাবে গলায় বেঁধে দেয়া হয়। আর এখান থেকেই এসেছে কোন পথের ‘তাক্বলীদ’ করার ধারণা। ব্যাপারটি অনেকটা এরকম যেন কোন একজন অনুসারী নির্দিষ্ট একজন মুজতাহিদের কোন রায় বা সিদ্ধান্তকে হারের মতই গলায় শক্তভাবে বেঁধে রাখে।

শরঈ সংজ্ঞাঃ

তাক্বলীদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইমাম শাওক্বানী তাঁর ‘সাইল আল জাররার’ গ্রন্থে বলেছেন তাক্বলীদ হল প্রমাণ ছাড়া অন্য একজনের কথা অনুযায়ী আমল করা। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, রাসূলের (সাঃ) হাদীসের উপর আমল করা, ইজমার উপর আমল করা, একজন মুফতীর মতানুযায়ী একজন সাধারণ মানুষের আমল করা, একজন বিচারক কর্তৃক নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য বিবেচনায় নেয়া তাক্বলীদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, এগুলোর প্রামাণ্যতা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীস এবং ইজমাকে যারা স্বীকার করে নেয় তাদের জন্য উভয়টিই স্পষ্টরূপে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস। একজন সাধারণ মানুষের জন্য কোন মুফতীর রায় অনুযায়ী আমল করা ইজমা দ্বারা স্বীকৃত। আর একজন বিচারকের বিচার প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য গুরুত্বের সাথে নেওয়ার বিষয়টি কোরআন ও সুন্নাহতে সাক্ষী নেয়ার হুকুম এবং ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

হাদীস বর্ণনাকারীদের বর্ণনা অনুসরণ করাও তাক্বলীদের গন্ডি বহির্ভূত কেননা হাদীসের শুদ্ধতা ও বৈধতা যাচাইয়ের পদ্ধতি (তাখরীজ) ইতিমধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত। এছাড়া এগুলো কেবল হাদীস বর্ণনাকারীদের উক্তি নয় বরঞ্চ এ বর্ণনাসমূহ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে সম্পর্কিত।

ইবনে আল হুমামের (মৃত্যু ৮৬১ হিজরী) ‘তাহরীর’ গ্রন্থে তাক্বলিদের আরো ভালো সংজ্ঞা পাওয়া যায়ঃ “তাক্বলীদ হচ্ছে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস হিসেবে স্বীকৃত নয় এমন কারো কথার উপর প্রমাণ ছাড়া আমল করা।” আল কাফফালের (মৃত্যু ৩৬৫ হিজরী) মতে, “এটি (তাক্বলীদ) হচ্ছে কারো বক্তব্য (ফিক্বহী রায়) গ্রহণ করে নেয়া এটা না জেনেই যে তিনি তা কোথা থেকে পেয়েছেন।” শাইখ আবু হামিদ আল আসফারাইনি (মৃত্যু ৪০৬ হিজরী) এবং উস্তায আবু মানসুর আবদুল ক্বাহির আল বাগদাদী (মৃত্যু ৪২৯ হিজরী) উভয়ের মতে, “এটি (তাক্বলীদ) হচ্ছে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস হিসেবে স্বীকৃত নয় এমন কারো ফিক্বহী রায়কে প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করে নেয়া।”

কোন মাযহাবের তাক্বলীদ করার উপর হুকুমঃ

তাক্বলীদের ব্যাপারে তিনটি মত পাওয়া যায়ঃ

১। যেকোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া

২। তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ বাধ্যতামূলক হওয়া

৩। যার ইজতিহাদ করার যোগ্যতা নেই তার জন্য তাক্বলীদ জায়েজ হওয়া

প্রথম মতঃ কোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া

প্রথম মত সাধারণ মানুষ-সুযোগ্য আলেম নির্বিশেষে সবার উপর তাক্বলীদ করাকে বাধতামূলক হিসেবে প্রতিপন্ন করে। এ মত অধুনা আলেমদের যেকোন ধরনের বা পর্যায়ের ইজতিহাদ করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ মতানুসারে ইজতিহাদ তাত্ত্বিকভাবে নিষিদ্ধ এবং প্রায়োগিক দিক থেকে অকার্যকর যার দরজা হিজরী তৃতীয় বা চতুর্থ শতক বা এর পূর্বেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে ভাবা হয়।

এ মত অনুযায়ী চার মাযহাবের যেকোন একটির তাক্বলীদ করাকে প্রত্যেক মুসলিমের উপর ধর্মীয়ভাবে আবশ্যক গণ্য করা হয়। এ মতের অনুসারীগণ অধুনা আলেমদের তাদের নিজেদের অনুসৃত মাযহাবের বাইরে কোন মতকে প্রাধান্য দেয়ার অনুমতিও দেন না। চারটি জনপ্রিয় মাযহাবের বাইরে গিয়ে অন্য কোন মাযহাব বা মত (যদিও তা সাহাবা বা তাবেয়ীদের হয়) অনুসরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এ মতের অনুসারীগণ যদি বিদ্যমান মতসমূহের একটিকে আরেকটির উপর প্রাধান্য দেয়ার অনুমতি না দিয়ে থাকেন তবে তো তারা স্বাধীন ইজতিহাদের আরো বেশী বিরোধিতা করে থাকেন যদিও সেটি কিছু বিষয়ের উপর আংশিক ইজতিহাদ হয়ে থাকে। মানুষ জীবনের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন চিন্তাধারা ও আদর্শের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তারা স্বাধীন ইজতিহাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। আর এসবই তাদের এই বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত যে, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দিতে হবে।

পরবর্তী সময়ের কিছু আলেম চার মাযহাবের যেকোন একটি অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন। ইমাম আদ দারদিরের ফিক্বহের উপর গ্রন্থ ‘আশ শারহ আস সাগীর’ ও তাফসীর আল জালালাইন উভয়ের উপর হাশিয়ার রচয়িতা শাইখ আস সাওয়ী আল মালিকি (মৃত্যু ১২৬১ হিজরী) বলেনঃ “চার মাযহাবের বাইরে কোন মতের তাক্বলীদ করা জায়েজ নয় যদিও তা কোন সাহাবার কথা, সহীহ হাদীস ও কোরআনের আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় কেননা, যে চার মাযহাবের বাইরে অবস্থান করে সে নিজে পথভ্রষ্ট এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করে। এটি কাউকে কুফরীর দিকেও নিয়ে যেতে পারে কারণ, কোরআন ও সুন্নাহতে যা ভাসাভাসাভাবে প্রতীয়মান হয় তা থেকে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কুফরীর ভিত্তিতেই গ্রহণ করার নামান্তর।”

আশ-শাওক্বানীর সমসাময়িক এই শাইখের কঠোরতার দিকে লক্ষ্য করুন! দুজনের মতের বৈপরীত্যের দিকেও খেয়াল করুন। তিনি চার মাযহাবের বাইরে কিছুর তাক্বলীদ করতে নিষেধ করেন যদিও তা সাহাবার কোন কথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। এর চেয়েও নিকৃষ্ট ব্যাপার এই যে, সহীহ হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সেটার তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এমনকি কোরআনের সাথে হলেও।

আরেকটি বাড়াবাড়ি হচ্ছে, চার মাযহাবের বাইরে অবস্থানকারী (এমনকি তা কেবলমাত্র কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে হলেও) কাউকে পথভ্রষ্ট ও পথভ্রষ্টকারী মনে করা এবং সেটা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে এমনটা ভাবা। এসবই হঠকারিতা এবং তা ইজতিহাদী আলেমদের ঐক্যমতের বিরুদ্ধে যায়।

তাক্বলীদ করা আবশ্যক এ মতটি পরবর্তী শতাব্দীতে ধর্মীয় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গৃহীত হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সালাফ (প্রথম প্রজন্মের) আলেমরা এই রেওয়াজকে খালাফদের (পরবর্তী প্রজন্মের আলেমদের) কাছে পৌঁছে দেন যারা আবার তাদের ছাত্রদের মনে বদ্ধমূল করে দেন যেঃ “যে ব্যক্তি কোন আলেমের তাক্বলীদ করে, সে সালেম (নিরাপদ) অবস্থায় আল্লাহর সাথে মিলিত হয়।”

আমার মনে আছে, আল আযহারের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উলুমুত তাওহীদ ক্লাসে আমি এটি শিখেছিলাম। আমাকে আল ক্বারনীর জাওহারাহ এবং আল বাজুরী কর্তৃক এর ব্যাখ্যা পড়তে হয়েছিল। সেখানে লেখক বলেন,

“মালিক এবং বাকি ইমামগণের

যেমনটি আবুল কাসিমের মত উম্মাহর পথপ্রদর্শক বলেন,

জ্ঞানীদেরও যেকোন একজনের তাক্বলীদ করা প্রয়োজন

কেননা মানুষ যে শব্দ বুঝে তাতেই বর্ণনা করে”

আবুল কাসিম বলতে এ ছত্রে বিখ্যাত সূফী আল জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদকে (মৃত্যু ২৯৭ হিজরী) বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করুক। এটি এদিকেই ইঙ্গিত করে যে, ফিক্বহের চার মাযহাবের ইমামগণের মধ্যে যেকোন একজনের তাক্বলীদ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর বাধ্যতামূলক।

এখানে ইমাম মালিককে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কারণ লেখক একজন মালিকী। লেখকের মতে, তারবিয়্যাতের (আত্মশুদ্ধি) ক্ষেত্রে যেমনটি সূফী ইমামদের অনুসরণ করা হয়, ঠিক তেমনিভাবে ফিক্বহের ইমামদেরকেও অনুসরণ করতে হবে। আলেমদের প্রতি জুনাইদ এমনই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন – তরীক্বার (পদ্ধতি) নিষ্ঠা, তাঁর দিক-নির্দেশনার গভীরতা, চরমপন্থা ও বিদা’আত থেকে তাঁর সুদূর অবস্থান।

কিছু আলেম আবার আক্বীদার ব্যাপারেও আবুল হাসান আল আশ’আরী বা আবুল মানসুর আল মাতুরিদীর মত সুপরিচিত যেকোন ইমামের অনুসরণ করার কথা বলেন।

মাগরেবে (লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, মৌরিতানিয়া) আমাদের ইলমী ভাই এবং যায়তুনা, কায়রাওয়ান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বহুল প্রচলিত প্রথা হচ্ছে আক্বীদায় আশ’আরী মাযহাব, ফিক্বহে মালিকী মাযহাব ও আদাবের ক্ষেত্রে জুনাইদের মাযহাব বা সূফী তরীক্বা অনুসরণ করা। আল্লাহ তাঁদের সবার উপর সন্তুষ্ট হন।

এ মতের খুঁটিনাটি ও সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

১। সবার উপর এমনকি আলেমদের উপরও তাক্বলীদ আবশ্যক হওয়া

২। কেবলমাত্র চার মাযহাবের ইমামদের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া। চার মাযহাবের বাইরে অন্য কোন ফিক্বহী রায় গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হওয়া।

৩। এই চার ইমামের মধ্যে কেবলমাত্র যেকোন একজনের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া। তাই এই চার মাযহাবের মধ্যে কোন একটি মাযহাবের কিছু মত সুস্পষ্টভাবে দুর্বল প্রতিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও চার মাজহাবেরই অন্য কোন একটি মাযহাব থেকে মত গ্রহণ করা জায়েজ না হওয়া।

৪। ইজতিহাদের দরজা বন্ধ রাখা এবং ইজতিহাদের দিকে আহবানের পথ রুখে দাঁড়ানো যদিও তা আংশিক ইজতিহাদ হয়।

৫। নিজের মাযহাবকে অন্য মাযহাব থেকে উত্তম মনে করা আর এভাবে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক মনমানসিকতার কাঠামোতে আটকে যাওয়া।

তাক্বলিদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গীকে অনেক আলেম খন্ডন করেছেন যেমনঃ ইবনে আবদুল বার, ইবনে হাযম, ইবনে তাইমিয়া, ইবনিল ক্বায়্যিম, আস-সান’আনি, আশ-শাওক্বানী, আদ দেহলভী প্রমুখ।

দ্বিতীয় মতঃ তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ বাধ্যতামূলক

দ্বিতীয় মতটি প্রথম মতের ঠিক উল্টোঃ সকলের জন্য তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ করা বাধ্যতামূলক। এ মতের অনুসারীগণ প্রত্যেক মুসলিমের উপর সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহ থেকে ফিক্বহী রায় গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক মনে করেন। তাঁরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে চার মাযহাবের অনুসরণকে বাতিল গণ্য করেন এবং যারা চার মাযহাব অনুসরণ করার পক্ষে তাদেরকেও প্রচন্ডভাবে আক্রমণ করেন। সম্ভবত তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ তাক্বলীদের উপর আক্রমণ করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে থাকেন যেহেতু তাঁরা মাযহাবগুলোকেই আক্রমণ করে থাকেন। কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাদেরকেই আক্রমণ করে বসে থাকেন।

ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, এ মতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রস্তাবক হচ্ছেন বিখ্যাত যাহেরী ফক্বীহ আবু মুহাম্মাদ ইবনে হাযম। তিনি ফিক্বহের উসূলী মূলনীতির উপর ‘আল ইহকাম ফি উসূল আল-আহকাম’, তুলনামূলক ফিক্বহের উপর ‘আল মুহাল্লা’, বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মীয় ফেরকার ইতিহাসের উপর ‘আল ফাসল ফিল মিলাল ওয়ান নিহাল’ সহ বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।

পরবর্তী সময়ের আরেকজন বিখ্যাত আলেম ইমাম শাওক্বানী তাঁর ‘ইরশাদ আল ফুহুল’, ‘আস সাইল আল জাররার’ এবং তাঁর রিসালা ‘আল ক্বাওল আল মুফিদ ফিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ’ সহ অনেক লেখনীতে এ মতের প্রচার ও প্রসার করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে তাক্বলীদের ধারণাকে প্রত্যাখান করেন যদিও তা ইবনে হাযমের তুলনায় কম আক্রামণাত্মক ছিল।

আমাদের সময়ে আহলে হাদীসদের থেকে একটি দল এ মতের সমর্থক যাদের সম্মুখভাগে রয়েছেন শাইখ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী ও তাঁর অনুসারীগণ।

এই মতানুসারীদের প্রতিপক্ষগণ তাঁদের নাম দিয়েছেন ‘আল লা-মাযহাবিয়্যুন’ তথা লা-মাযহাবী, কেননা এ মতের অনুসারীগণ আলেম-সাধারণ মানুষ নির্বিশেষে সবার জন্য কোন মাযহাব অনুসরণের বিরোধিতা করে থাকেন। এ মতের প্রতিপক্ষগণ বহু প্রবন্ধ ও গ্রন্থের মাধ্যমে এই মতের খন্ডন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ তুরস্কের বিখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ যাহিদ আল কাওছারীর প্রবন্ধ ‘আল লা মাযহাবিয়া ক্বেনতারা ইল্লা আল-লা দ্বীনিয়্যাহ’, হামাওয়ী আলেম শাইখ মুহাম্মাদ আল হামিদের লেখা ও শাইখ মুহাম্মাদ সাঈদ রামাদান আল বুতীর বই ‘আল লা মাযহাবিয়াহ আখতার বিদা’আহ তাহাদ্দাছ আশ-শারীয়াহ আল ইসলামিয়্যাহ’ প্রভৃতির কথা বলা যেতে পারে।

এই আরেকটি প্রান্তিক মতের খুঁটিনাটি ও সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতাগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

১। সবার জন্য তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এমনকি সাধারণ মানুষের জন্যও যাদের কাছে ইজতিহাদের কোন জ্ঞান নেই।

২। তরুণদের এমন প্রাচুর্য (যারা জ্ঞানে ভাসা ভাসা এবং আচরণে রুক্ষ) যারা মুজতাহিদের পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার দাবী করে থাকে।

৩। তরুণদের দ্বারা পূর্বযুগের বিখ্যাত আলেম ও মুজতাহিদগণকে বাতিল বলে গণ্য করার ধৃষ্টতা।

৪। উম্মাহর ফিক্বহী মাযহাবগুলোর প্রতি অবজ্ঞাভাব যদিও এই মাযহাবগুলো প্রচুর পরিমাণ উপকারী জ্ঞানের উৎস।

৫। এ মতের কিছু কিছু অনুসারীদের মাযহাবসমূহ এবং এগুলোর ইমামদের নিন্দায় সীমা অতিক্রম করা।

৬। এ মতের অনুসারীদের মধ্যে যাহেরী (আক্ষরিক) ধারা এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে কেউ কেউ তাদের ‘নব্য-যাহেরী’ হিসেবেও নামকরণ করেছেন।

৭। ফিক্বহের ছোটখাটো মতপার্থক্য নিয়ে উম্মাহর তর্কে-বিতর্কে লিপ্ত থাকা যা অনেক অন্তর্বিরোধের জন্ম দিয়েছে।

৮। এ মতের অনুসারীগণ তাদের সাথে মতভিন্নতা পোষণকারীদের বাতিল হিসেবে গণ্য করে। তারা এ দাবী করে যে, একমাত্র তারাই কোরআন ও সুন্নাহর যথার্থ অনুসরণ করে থাকে।

ইমাম আশ-শাওক্বানী এবং তাক্বলীদঃ

ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আলী আশ শাওক্বানী (মৃত্যু ১২৫০ হিজরী) ছিলেন হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পুনর্জাগরণ এবং ইজতিহাদের প্রাণপুরুষ যা তাঁর ইজতিহাদের উপর লেখা গ্রন্থসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর ‘আস সাইল আল জাররার’ গ্রন্থটির কথা বলা যেতে পারে যা ‘আল আযহার’ (যায়েদী বা হাদুয়ী ফিক্বহের মৌলিক বই) বইয়ের ব্যাখ্যা যেখানে তিনি স্বাধীন ইজতিহাদের পথে হেঁটেছেন। তিনি কোরআন ও সুন্নাহর উপর ভিত্তি করে নিজের ফিক্বহী রায় ব্যক্ত করেন যেগুলো তাঁর সময়কার চার অথবা আট মাযহাবের পরিধির বাইরে ছিল। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে তাঁর ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থটি যেখানে তিনি ইবনে তাইমিয়াহর ‘মুনতাক্বাল আখবার মিন আহাদীস সায়্যিদ আল আখবার’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা করেছেন। এ বইটি সুন্নী এবং অসুন্নী উভয় মাযহাবের জন্য আধুনিক ফিক্বহের উপর গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদে পরিণত হয়েছে। আরেকটি উদাহারণ হচ্ছে তাঁর গ্রন্থ ‘আল দারারী আল মুদিয়্যাহ’ (‘আল দুরার আল বাহিয়্যাহ’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা) যেখানে তিনি তাঁর স্বাধীন ফিক্বহের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।

প্রকৃতপক্ষে ইমাম শাওক্বানী তাঁর একের বেশী গ্রন্থে তাক্বলীদের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং স্বাধীন ইজতিহাদের দিকে আহবান করেন। এগুলো হচ্ছেঃ

১। ফিক্বহের উসূলী মূলনীতির উপর তাঁর বিখ্যাত বই ‘ইরশাদ আল ফুহুল’

২। তাঁর বিখ্যাত রিসালাহ ‘আল ক্বাওল আল মুফিদ ফি আদিল্লাতিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ’

৩। তাঁর বই ‘আদাব আল তালিব ওয়া মুনতাহা’ল আরাব’

৪। তাঁর সুবিস্তারিত বই ‘আল সাইল আল জাররার’

তাক্বলীদের সমর্থকগণ তাক্বলীদের সমর্থনে যেসব দলিল পেশ করেন আশ শাওক্বানী এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দান করেন যেসব দলিলের মধ্যে রয়েছে কোরআনের আয়াতঃ “তোমরা যদি না জেনে থাকো তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর।” (১৬:৪৩) আর রাসূলের (সাঃ) হাদীছঃ “তারা যদি না জেনে থাকে তবে কি তারা জিজ্ঞাসা করে না? ভ্রান্তির প্রতিষেধক হচ্ছে জিজ্ঞাসা করা”। আশ শাওক্বানী এটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, এসব দলিল সব বিষয়ে কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির তাক্বলীদ করার কথা বলে না বরং জ্ঞানীদের মধ্যে যার কাছেই যাওয়ার সুযোগ আছে তাকেই জিজ্ঞাসা করার দিকে ইঙ্গিত করে। এটাই নবী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীদের সময়ের চর্চা ছিল।

আশ-শাওক্বানী ইবনিল কায়্যিম, ইমাম ইবনি আবদিল বার, ইবনে হাযম এবং তাঁর আগের অন্যান্য আলেমদের লেখা থেকে উপকৃত হন যারা তাক্বলীদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে নিন্দনীয় বিদা’আত হিসেবে গণ্য করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহর নেয়ামত সুবিস্তৃত এবং এ নেয়ামতকে কোন নির্দিষ্ট যুগের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না বা নির্দিষ্ট এক দল মানুষও এর একচেটিয়া অধিকারী নয়। বরং আল্লাহ যাদেরকেই এ যোগ্যতা দান করেছেন তাদের সবার জন্য এটি উন্মুক্ত।

আশ-শাওক্বানী ইজতিহাদের ডাক দেন এবং নিজেও পুরোপুরিভাবে স্বাধীন ইজতিহাদের চর্চা করেন। তিনি সুপরিচিত কোন মাযহাবেরই অনুসরণ করেন নি – না ফিক্বহের উসূলী মূলনীতিতে না মূল ফিক্বহে – যদিও তিনি শুরুতে ছিলেন একজন যায়েদী। তিনি এমনকি তাঁর নিজের ফিক্বহী মূলনীতি প্রণয়ন করেন যা তিনি ‘ইরশাদ আল ফুহুল ইলা তাহক্বীক আল হাক্ব মিন আল ইলমি আল উসূল’ গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন।

তিনি ফিক্বহের ক্ষেত্রে স্বাধীন আইনী যুক্তিতর্ক (legal reasoning) এবং মতের (রায়) ব্যবহারের বিরোধিতা করেন এবং আহলুর রায় এর ফিক্বাহকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরিবর্তে তিনি পরিপূর্ণভাবে ওহীর উপর নির্ভরতার ব্যাপারে জোর দেন এই ভিত্তিতে যে দ্বীন ইমামদের মতের ভিত্তিতে নির্মিত হয়নি বরং এটি দ্বীনের মোহর (Seal of the Religion) আল্লাহর রাসূল (সা) এর বর্ণনার ভিত্তিতেই গঠিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একজন সাধারণ মানুষ যে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা রাখে না তাকে অবশ্যই আলেমদের শরণাপন্ন হতে হবে যারা কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করবেন, নিজেদের মতের ভিত্তিতে নয়।

আমি শাওক্বানীর সাথে কিছু ব্যাপারে একমত আর কিছু ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করি। যে সব বিষয়ে আমি তাঁর সাথে একমত পোষণ করি সেগুলো হচ্ছেঃ

১। আলেমদের প্রতি তাঁর স্বাধীন ইজতিহাদের আহবান

২। উম্মাহর সকলের উপর যারা তাক্বলীদ চাপিয়ে দিতে চান তাদের প্রত্যাখ্যান করা

৩। যারা প্রত্যেকটি বিষয়েই যেকোন একটি মাযহাবের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকাকে প্রয়োজনীয় মনে করে তাদের বিরোধিতা করা

৪। তাদের বিরোধিতা করা যারা কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট মাযহাবকে কঠোরভাবে অনুসরণ করেন এমনকি সে মাযহাবের কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে ঐ মাযহাবের উৎসসমূহের দুর্বলতা তাদের সামনে পরিস্কারভাবে তুলে ধরার পরেও

৫। দ্বিতীয় বা তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর পর ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে এমন ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা

৬। মানুষের মতের উপর কোরআন ও সুন্নাহকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য উম্মাহ্‌র প্রতি তাঁর আহবান

যাহোক, সাধারণ মানুষের উপর তাক্বলীদ ও যেকোন একটি মাযহাব অনুসরণ করার উপর তাঁর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে আমার দ্বিমত রয়েছে। সাধারণ মানুষের আবু হানিফা, মালিক, শাফিঈ, আহমেদ, যাইদ, আল হাদি, জাফর, জাবির এবং অন্যান্য যেকোন একজন ইমামকে অনুসরণ করা ও তাঁর মাযহাব আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে আমি কোন সমস্যা দেখি না। শরীয়াহ অনুসারে তা বৈধ কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণ মানুষের কোন মাযহাব নেই- এ মতটিই অগ্রাধিকার পায়। বরং আলেমদের মধ্য থেকে যার কাছ থেকে সে জিজ্ঞাসা করছে সে আলেমের মাযহাবই তার মাযহাব। এভাবে সে তার মাযহাব থেকে অন্য মাযহাবে যেতে পারে এবং আলেমদের মধ্যে থেকে যাকে ইচ্ছা তাকেই যেকোন প্রয়োজনীয় বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারে। এমনকি সে ক্ষেত্রবিশেষে নিজের মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাবও অনুসরণ করতে পারে যদি সে বিশ্বাস করে অন্য মাযহাবের আরো শক্ত দলিল রয়েছে।

ফিক্বহে স্বাধীন আইনী যুক্তিতর্ক (legal reasoning) এবং মত (রায়) ব্যবহারকে শারীয়াহ বিরোধী প্রতিপন্ন করে ইমাম শাওক্বানী যে অবস্থান নিয়েছেন সে ব্যাপারেও আমার দ্বিমত রয়েছে। প্রকৃত বাস্তবতা এটাই যে, মত বা রায় ছাড়া কোন ফিক্বহ নেই। নিন্দনীয় রায় হচ্ছে সেটিই যা সুস্পষ্টভাবে নুসুসের (কোরআন ও সুন্নাহ) বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু যে সকল বিষয়ে নুসুসের কোন বক্তব্য নেই সে সকল বিষয় বুঝতে এবং নুসুসকে এর বুনিয়াদী ভিত্তি ও মাক্বাসিদ আশ-শারীয়াহর আলোকে অনুধাবন করতে রায় অপরিহার্য। এছাড়াও রায় আবশ্যক যেখানে আইনী প্রশস্ততা বিদ্যমান থাকার দরুণ কিছু নির্দিষ্ট বিষয় এড়িয়ে যাওয়া যায় অথবা যেসব বিষয়ে অবশ্য পালনীয় এমন পরিষ্কার নির্দেশনামূলক (কাতঈ) আয়াত ও হাদীস বিদ্যমান নেই। আর এই রায় গঠিত হয় নিম্নরূপেঃ

১। কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তি করে ক্বিয়াসের (সাদৃশ্যতার উপর ভিত্তি করে যুক্তিতর্কের একটি পদ্ধতি) মাধ্যমে অথবা

২। ইসতিহসানের (আইনী অগ্রাধিকার) মাধ্যমে যা হচ্ছে একটি শক্তিশালী কিন্তু অস্পষ্ট ক্বিয়াসের জন্য দুর্বল কিন্তু স্পষ্ট ক্বিয়াসকে এড়িয়ে যাওয়া অথবা

৩। ইসতিসলাহের (বৃহত্তর কল্যাণের খোঁজ করা) মাধ্যমে যা হচ্ছে আইনী শর্তসমূহ মাথায় রেখে সার্বজনীন কল্যাণের জন্য কাজ করা বা

৪। ‘উরফের (প্রচলিত প্রথা) মাধ্যমে, একে নিজের স্থানে রেখে অথবা

৫। সাদ আল-জারাঈ (খারাপের দিকে ধাবিত করে এমন পথ রুদ্ধ করা) অথবা

৬। ইসতিসহাবের মাধ্যমে (ধারবাহিকতার অনুমতি) ইত্যাদি।

এ সবগুলোর প্রয়োগে রায়ের ব্যবহার জড়িত। ফক্বীহগণ কি আসলেই এটি ব্যবহারের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন? একইভাবে উমর, উসমান, আলী, ইবনে মাস’উদ, যায়েদ, ইবনে আব্বাস এবং অন্যান্যদের ফিক্বহ কি রায় থেকে মুক্ত?

এমনকি রায় ছাড়া কি কোরআন-সুন্নাহ সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব? রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীরা বনু কুরাইজার পথে আসরের সালাত আদায় করার সময় কি রায়ের ব্যবহার করেন নি? ইবনে তাইমিয়্যাহ এর মতে, তারা তাদের চাইতে বেশী সঠিক ছিলেন যারা সালাতের সময় অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পর গন্তব্যে পৌঁছে সালাত আদায় করেছিলেন।

মাক্বাসিদ আস শারীয়াহ কি কোরআন-সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে রায় ব্যবহারের উদাহারণ নয়?

দুর্ভিক্ষের সময় উমর (রাঃ) কর্তৃক চুরির হদ্দের সাময়িক রহিতকরণ কি রায়ের উদাহরণ নয়? রক্তপণের দায়িত্ব গোত্র থেকে রাষ্ট্রের উপর স্থানান্তরের তাঁর যে সিদ্ধান্ত তা কি রায়ের উদাহরণ নয়? ইরাকের কিছু বিজিত এলাকা মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে বন্টন করার বিরুদ্ধে উমরের সিদ্ধান্ত কি রায়ের নমুনা নয়? মুসলিম নারীদের উপর প্রভাবের ভয়ে তাঁর কর্তৃক আহলে কিতাবের নারীদের বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা কি রায় ছিল না? বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত দেয়ার পরও উত্তরাধিকার আইনে আপন ভাইদের সাথে মায়ের দিক থেকে সৎ ভাইদের অন্তর্ভুক্তিকরণ কি রায়ের একটি নমুনা ছিল না?

স্বামীর মৃতপ্রায় মুমূর্ষ অবস্থায় দেয়া তালাক কার্যকর হয় না- উছমান (রাঃ) এর এই মত কি রায়ের উদাহারণ ছিল না? এ বর্ণনা কি পাওয়া যায় না যে, আবু বকর ও অন্যান্য সাহাবীরা বলতেন, “আমি আমার রায় দ্বারা ফতোয়া দেই। যদি তা সঠিক হয় তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যদি তা ভুল হয় তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সকল ত্রুটির ঊর্ধ্বে।”

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কি মুয়াযকে (রাঃ) ইয়েমেনে পাঠানোর সময় তাঁর জবাব গ্রহণ করেন নি? তিনি (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি কি দ্বারা বিচারকর্ম সম্পাদন করবে?” মুয়ায (রাঃ) জবাব দিলেন যে, তিনি আল্লাহর কিতাব দ্বারা বিচার করবেন, অতপর রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ দ্বারা বিচার করবেন। যদি আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহতে সমাধান পাওয়া না যায় সেক্ষেত্রে তিনি বলেন, “আমি আমার রায় দ্বারা ইজতিহাদ করবো।”

সাহাবারা কি নিজেদের রায় এবং বোঝাপড়ার ভিন্নতার কারণে কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন নি?

তৃতীয় মতঃ যারা ইজতিহাদ করার যোগ্যতায় পৌঁছেনি তাদের জন্য তাক্বলীদের অনুমতি দেয়া

এই মতটি এর অনুসারীদের উপর প্রথম মতের মত তাক্বলীদ চাপিয়ে দেয় না আবার দ্বিতীয় মতের মত একে নিষিদ্ধও গণ্য করে না। বরং, এটি কারো কারো জন্য তাক্বলীদের অনুমতি দেয় এবং অন্যদের জন্য তা নিষিদ্ধ করে। ইমাম হাসান আল বান্না এ বিষয়টি তাঁর ‘বিশটি মূলনীতি’ প্রবন্ধের একটি মূলনীতির আলোচনায় আলোকপাত করেছেনঃ

“ফিক্বহ ও ফিক্বহী রায় আহরণ করার পেছনের যুক্তি বোঝার যোগ্যতা অর্জন করে নি এমন প্রত্যেক মুসলিমের উচিত ইসলামী ফিক্বহের মহান ইমামদের অনুসরণ করা। একজন ইমামকে অনুসরণ করার সময় তাঁর যুক্তিতর্ককে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। একবার যখন সে ইমামের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, তখন সে ইমামের যথার্থ যুক্তির ভিত্তিতে দেওয়া যেকোন পথনির্দেশ মেনে চলা উচিত। একইসাথে একজন মুসলিমের উচিত ফিক্বহ ও ফতোয়া আহরণের যুক্তিতর্ক বোঝার পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য দরকারী চেষ্টাসাধনা করা।”

এভাবে হাসান আল বান্না তাক্বলীদ বা মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক করেন নি আবার একে নিষিদ্ধও করেন নি। বরঞ্চ তিনি এর অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু তা সবার জন্য নয়। এটি বৈধ “এমন সব মুসলিমদের জন্য যারা ফিক্বহী রায় আহরণ করার পর্যায়ে পৌঁছে নি” তথা সাধারণ মানুষ এবং তাদের মত লোকদের জন্য যারা কোরআন ও সুন্নাহ থেকে হুকুম আহরণের যোগ্য নয় অথবা ইজমা, ক্বিয়াস এবং মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য পদ্ধতি যেমন ইসতিসলাহ, উরফ, ইসতিসহাব ও পূর্ববতী সময়ের শরীয়াহ এসব সম্পর্কে জানার যোগ্যতা রাখে না।

অনুসরণ (ইত্তেবা) বনাম অন্ধ অনুকরণ (তাক্বলীদ)

উস্তায হাসান আল বান্না প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে তাঁর “মূলনীতি” প্রবন্ধে ‘তাক্বলীদ’ শব্দটির জায়গায় ‘ইত্তিবা’ শব্দটির প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মুসলিমরা ফিক্বহের মহান ইমামদের যেকোন একজনকে অনুসরণ (ইয়াত্তাবি’উ) করবে।” কোরআনও নানা প্রসঙ্গে ‘ইত্তিবা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে যা একে প্রশংসনীয় ও আইনগতভাবে বৈধ করে তুলেছে।

এটি ইব্রাহীম (আঃ) এর উদ্ধৃতিতেও দেখা যায়ঃ “হে আমার পিতা, নিশ্চয়ই আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসে নি। অতএব আমাকে অনুসরণ করুন। আমি আপনাকে সোজাপথের দিকে ধাবিত করবো।” (কোরআন ১৯:৪৩)। এই আয়াত কোন নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে জ্ঞানহীন একজনকে আহবান করছে অন্য এমন একজনকে অনুসরণ করতে যে ঐ বিষয়ে জ্ঞানী।

আমরা মূসা (আঃ) এবং আল্লাহর বিখ্যাত সৎকর্মশীল বান্দা খিযির এর কাহিনীতেও দেখিঃ “তাঁরা আমার বান্দাদের মধ্য থেকে একজনকে খুঁজে পেল যাঁকে আমি নিজের অনুগ্রহ দান করেছিলাম এবং নিজের পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলাম। মূসা তাঁকে বলল, “আমি কি আপনাকে অনুসরণ করতে পারি যাতে আপনাকে হিদায়াতের যা কিছু শেখানো হয়েছে তা থেকে আমাকেও কিছু শেখাবেন?” (কোরআন ১৮:৬৫-৬৬)

মূসা (আঃ) খিযিরকে অনুসরণ করার (ইত্তিবা’ইহি) অনুমতি চাইলেন যাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে যে জ্ঞান দিয়েছেন তা থেকে শিখতে পারেন। এটা প্রমাণ করে, ক্ষেত্র বিশেষে জ্ঞানীকে অনুসরণ করা নিন্দনীয় নয়।

ইমাম আবু উমার ইবনে আবদুল বার বলেন, “জ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিষ্কার ধারণা অর্জন; কোন জিনিসকে এর প্রকৃতরূপে অনুধাবন করা। যখন কোন জিনিসকে কারো সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়, সে তা জানতে পারে। আলেমরা বলেন, যারা তাক্বলীদ করে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই।”

আবু আবদুল্লাহ বিন খুয়াইজ মিনদাদ আল বাসরী আল মালিকী বলেন, “তাক্বলীদ হচ্ছে এমন কোন মতকে অনুসরণ করা যা কোন দলিল দ্বারা সমর্থিত নয়। কিন্তু ইত্তিবা’ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে এই মতটি আইনী ন্যায্যতার ভিত্তিতে গৃহীত। দ্বীনে ইত্তিবা অনুমোদিত কিন্তু তাক্বলীদ অনুমোদিত নয়।”

তথ্যসূত্রঃ

১। প্রবন্ধটি মূলত ‘কাইফা নাতা’আমাল মা’আত তুরাছ ওয়াল তামাযুব ওয়াল ইখতিলাফ’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে (পৃষ্ঠা ৬২-৭৩)

২। এটি ইসলামী উত্তরাধিকারী আইনের একটি বিশেষ পরিস্থিতি (আল মাসলাহা আল হিমারিয়াহ)

৩। এটিকে তালাক্ব আল ফার্‌ (এড়ানোর জন্য তালাক্ব) বলে যেখানে কেউ স্বীয় উত্তরাধিকার থেকে তার স্ত্রীর অংশ লাভের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যেতে চায়

সূত্রঃ VirtualMosque.com

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
ogradhikarer fiqh

অগ্রাধিকারের ফিকাহ

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | এপ্রিল ১১, ২০১৫
Download PDF

অগ্রাধিকারের ফিকাহ
অগ্রাধিকারের ফিকাহ বলতে আমরা বুঝি প্রত্যেকটি ইস্যু সত্যিকার প্রেক্ষিতে বিবেচনা করা। কোনো বড় ইস্যুকে স্থগিত রাখা যাবে না, কোনো ছোটখাটো ইস্যুকে বড় করে দেখা যাবে না, কোনো বড় বিষয়কে খাটো করে দেখা উচিত নয়। আবার কোনো ক্ষুদ্র বিষয়কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া ঠিক হবে না। প্রাকৃতিক বিধান ও শরীয়াহর বিধান এ দিকনির্দেশই দেয়। আমি মনে করি, আল্লাহর সৃষ্টি ও বিধান এ প্রকৃত প্রেক্ষিত মেনে চলা অবশ্যম্ভাবী করে গিয়েছে। সূরা আল আ’রাফের ৫৪ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছেঃ নিশ্চয় তারই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা।

নবীর জীবনে অগ্রাধিকারের ফিকাহ
মক্কী পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মিশন একটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। আর এ মিশনের সর্মসূচি ছিল কেবল আল্লাহর রাস্তায় মানুষকে দাওয়াত দেয়া এবং এমন একটি বিশ্বাসী দল গড়ে তোলা যারা পরবর্তীতে সেই দাওয়াত আরবদের কাছে, অতঃপর বিশ্বের চারদিকে ছড়িয়ে দেবে। এ পর্যায়ে দ্বীনি আকীদা প্রতিষ্ঠা, তাওহীদের অনুশীলন, বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা নির্মূল এবং নেক ও সৎকর্মের চর্চার ওপর রাসূলের (সাঃ) কাজ কেন্দ্রীভূত ছিল।

এপর্যায়ের কর্মধারার প্রতি কোরআনের সমর্থন ছিল বিধায় কোরআন মুসলমানদেরকে কোনো বিশেষ গৌণ বিধিবিধানের দিকে মনোযোগ দিতে বলেনি বরং সূরা আল আসরে বর্ণিত ইসলামী ভাবধারা গড়ে তোরার ওপর সকল প্রচেষ্টা নিবদ্ধ করার তাগিদ দিয়েছে। এ সূরার ৩ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছেঃ কিন্তু যারা ঈমান আনে, যারা সৎকর্ম করে এবং একে অন্যকে সত্য ও ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতে থাকে।

মক্কী পর্যায়ে দাওয়াতি কাজের সময় মুসলমানরা প্রতিদিন কাবা ঘরে যে মূর্তি দেখত সেগুলো ধ্বংস করার জন্যে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাদের হাতে কুঠাল নেয়া অথবা তাদের ও আল্লাহর শত্রুর বিরুদ্ধ লড়াই করার জন্যে তলোয়ার তুলে নেয়ার অনুমতি দেননি অথচ কাফেররা এ মুসলমানদের উপর নিপীড়ন চালাচ্ছিল। সে সময় মার খেয়ে ও জখম হয়ে তারা যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে আসতেন, কোরআনের ভাষায় তিনি তাদেরকে এটিই বলতেনঃ স্বীয় হাতকে বিরত রাখ এবং নামাজ কায়েম কর। (সূরা আন-নিসাঃ ৭৭)

সব কিছুর জন্যে একটি উপযুক্ত সময় আছে। সেই নির্ধারিত মুহূর্তের আগেই যদি কিছু পাওয়ার আশা করা হয় তাতে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির আশষ্কা থাকতে পারে।

অগ্রাধিকারের ফিকাহ ও ভারসাম্যের ফিকাহর পারস্পরিক সম্পর্ক
অগ্রাধিকারের ফিকাহ ভারসাম্যের ফিকাহর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উভয়েই একসঙ্গে জড়িয়ে যায় অথবা একে অপরে সমান্তরাল হয়ে দাঁড়ায় এবং আবার ভারসাম্যের প্রক্রিয়া অগ্রাধিকারের দিকে ঝুকে যায়। এভাবে এটি তখন অগ্রাধিকারের ফিকাহর আওতায় পড়ে।

অনুপাত বজায় রাখায় প্রয়োজনীয়তা
অগ্রাধিকারের ফিকাহ অনুযায়ী শরীয়াহর হুকুম-আহকাম (তাকলিফ) ও আমলের ক্ষেত্রে অনুপাত রক্ষা করা আবশ্যক। শরীয়াহর ইসলাম নির্ধারিত অনুপাতে ব্যত্যয় ঘটলে দ্বীনি ও পার্থিব উভয় জীবনে দারুণ ক্ষতি হবে।

ইসলামে আমলের আগে ঈমানের স্থান। যেহেতু ঈমান হচ্ছে ভিত্তি আর আমল হচ্ছে ইমারত। ভিত্তি ছাড়া কোনো ইমারত হয় না। আমলের আগে ঈমান। আমল বহুমুখী। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটি সহীহ হাদিসে বলেছেনঃ ঈমান ৭৭টি শাখায় বিভক্ত, সর্বোচ্চ স্থান হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই আর সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে রাস্তা থেকে ক্ষতিকর জিনিস সরানো।

আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে আল্লাহর নিকট আমল কেবল একটি স্তরেই নয়, উচ্চ ও নিম্ন স্তরে বিভক্ত। সর্বশক্তিমান আল্লাহ বরেনঃ তোমরা কি হাজীদের পানি পান করানো এবং মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করাকে সেই ব্যক্তির কাজের সমান সাব্যস্ত করে নিয়েছ- যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে? তারা আল্লাহর সমীপে সমান নয়। আর যারা অত্যাচারী, আল্লাহ তাদেরকে সুবুদ্ধি দান করেন না। আর যারা ঈমান এনেছে ও হিজরত করেছে এবং জানমাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে তারা মর্যাদায় আল্লাহ তায়ালার সমীপে অতি বড়। আর তারাই হচ্ছে সফলকাম। (সূরা তওবাঃ১৯-২০)

এ কারণে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, হজ্ব সম্পাদনের চেয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ অধিকতর উত্তম। হাম্বলী ফকিহগণ এবং অন্যান্য ফকিহ তো জিহাদকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে করণীয় সর্বোত্তম শারীরিক আমল বলে অভিহিত করেছেন। অনেক হাদিসে জিহাদের প্রশংসা করা হয়েছে। এর মধ্যে আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদিসও রয়েছে। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জনৈক সাহাবি একটি সঙ্কীর্ণ উপত্যকা অতিক্রম করছিলেন- যেখানে একটি মিঠাপানির ঝর্ণা ছিল। উপত্যকাটি তার ভালো লাগে এবং বলেন, আমি আল্লাহর বন্দেগীর জন্যে কি করে অন্য লোকদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারি। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে আমি এটি করবো না। সেই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট তার ইচ্ছে ব্যক্ত করল এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, এরূপ করো না। তোমার ঘরে সত্তর বছর ইবাদত করার চেয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করা অনেক উত্তম। (তিরমিজি ও আল হাকিম)

সালমান (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদিসে কাফেরদের হাত থেকে মুসলমানদের পাহারার (রিবাত) গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ একদিন ও একরাতের রিবাত একমাসের রোজা ও রাত্রিকালীন ইবাদতের চেয়ে উত্তম এবং রিবাতের অবস্থায় কেউ ইন্তেকাল করলে তার অনুকূলে আমলে সালেহ’র হিসাব জারি থাকবে যেন সে জীবিত আছে, আর যদি জীবিত থাকে সে শয়তানের প্রলোভন থেকে নিরাপদ থাকবে। (মুসলিম)

আবদুল্লাহ ইবনুল মোবারকের মতো একজন ইমাম জিহাদের সময় এক সৈন্যশিবির থেকে আল ফুজায়েল ইবনে ইয়াদ নামক তার এক বন্ধুকে কবিতা লিখছেন যিনি সব সময় দুই পবিত্র স্থান মক্কা ও মদিনার মধ্যে সফর করতেন। পঙ্‌ক্তিমালা হচ্ছেঃ

ওহে দুই পবিত্র স্থানে ইবাদতকারী,
তুমি যদি আমাদেরকে দেখতে,
তাহলে তুমি জানতে তোমার ইবদত কেবলি খেলা।
কেউ কেউ তাদের অশ্রু দিয়ে গণ্ডদেশ ভেজায়;
আর আমরা নিজেদের রক্তে বুক ভিজাই……।

প্রচলিত ফিকাহ অনুসারে নফল ইবাদতকে (ঐচ্ছিক আমল যা ফরজ ইবাদতের মতো বাধ্যতামূলক নয়) ফরজের ওপর গুরুত্ব দেয়া উচিত নয়; সামষ্টিক বাধ্যবাধকতার (ফরজে কেফায়া) চেয়ে ব্যক্তির বাধ্যবাধকতা (ফরজে আইন) বেশি গুরুত্বপূর্ণ; যে সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা আদৌ কারো দ্বারা সম্পাদিত হয় না সে কাজ অগ্রাধিকার পাবে সেই দায়-দায়িত্বের ওপর যা সম্পন্ন করার জন্যে পর্যাপ্ত লোক আছে। আবার একটি গ্রুপ বা জাতির সাথে সম্পর্কিত দায়িত্ব ব্যক্তির অধিকারের চেয়ে গুরুত্ব পাবে এবং যে কাজ সম্পন্ন করার মেয়াদ সীমিত, সেই কাজ ঐ কাজের চেয়ে আগেই করে ফেলতে হবে যে কাজ করার যথেষ্ট সময় আছে।

শরীয়াহর বর্ণিত স্বার্থের গুরুত্বের ব্যাপারে ফিকাহতে বর্ণিত হয়েছে কোন বিষয়টি অধিকতর অগ্রাধিকার পাবে। যেহেতু প্রয়োজনীয় (আল মাসালিহ আল হাজিয়াহ) ও সৌন্দর্যবোধক (আল মাসালিহ আল তাহসিনিয়াহ) স্বার্থের চেয়ে অপরিহার্য (আল মাসাহিল আল দুরুরিয়াহ) স্বার্থের প্রাধান্য রয়েছে। আবার প্রয়োজনীয় স্বার্থকে তাহসিনিয়াহর চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। অথচ জাতি ও ব্যক্তির স্বার্থের মধ্যে যখন সংঘাত দেখা দেয় তখন জাতীয় স্বার্থই অগ্রাধিকার পাবে। এখানে ভারসাম্যের ফিকাহ ও অগ্রাধিকারের ফিকাহ এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে।

অগ্রাধিকারের ফিকাহর প্রতি অবহেলা
ইসলামী পুনর্জাগরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু গ্রুপকে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে তাদের কাছে অগ্রাধিকারের ফিকাহ’র কোনো অস্তিত্ব নেই, যেহেতু তারা প্রায়শ মুখ্য বিষয়ের আগে গৌণ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়। সামগ্রিক স্বার্থ অনুধাবনের চেয়ে কোনো বিশেষ দিক নিয়ে গবেষণায় লেগে যায়। আর প্রতিষ্ঠিত বিষয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করার পরিবর্তে বিতর্কিত বিষয় আঁকড়ে ধরে থাকে। দুঃখের বিষয়, আমরা পিঁপড়ার রক্তপাতের বিষয়ে আলোচনা করি, কিন্তু ইমাম হোসাইন (রা.) এর রক্তপাতের ব্যাপারে মাথা ঘামাই না। অথবা নফল রক্ষার জন্যে মারমুখী হয়ে উঠি যখন মানুষ ফরজকে অবহেলা করছে। সারবস্তুর পরোয়া না করে খোলস নিয়ে ঝগড়া করি।

সার্বিকভাবে এ হচ্ছে আজকের মুসলমানদের অবস্থা। আমি দেখি প্রতি বছর রমযানে কিংবা অন্যান্য মাসে লাখ লাখ লোক উমরাহ পালন করে এবং কেউ কেউ দশ বার এমন কি বিশবারের মতো হ্জ্ব পালন করে। তারা যদি এসব নফল কাজে ব্যবহৃত অর্থ সঞ্চয় করতো, তাহলে কোটি কোটি টাকা জমা করতে পারতো। আমরা ইসলামী সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে এক হাজার মিলিয়ন ডলার তহবির সংগ্রহে বছরের পর বছর ছুটোছুটি করি। কিন্তু এ অর্থের ১০ ভাগ এমন কি ২০ ভাগ বা ৩০ ভাগের এক ভাগও সংগ্রহ করতে পারি না। যদি এসব অতিরিক্ত হজ্ব ও উমরাহ পালনকারীকে তাদের ঐচ্ছিক সফরের খরচের টাকা এশিয়া ও আফ্রিকায় খৃষ্টধর্মে দীক্ষিতকরণ প্রতিরোধে বা দুর্ভিক্ষপীড়িতদের কাজে লাগানোর জন্যে চান, তারা কিছুই দেবে না। এটি এমন এক পুরানো রোগ যে কোনো হৃদরোগ চিকিৎসক কখনো এর চিকিৎসা করতে পারবে না।
অগ্রাধিকারের ফিকাহ প্রয়োগ করলে আমরা জানতে পারি অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় কোন ইস্যুটির দিকে বেশি নজর দেয়া দরকার- যাতে এ ইস্যুটির জন্যে আমরা আরো বেশি শ্রম ও সময় দিতে পারি। অগ্রাধিকারের ফিকাহর আওতায় আরো জানা যায়, কোন শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তি আরো বেশি কাজে লাগিয়ে তার বিরুদ্ধে আমাদের আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করতে হবে এবং তুলনামূলকভাবে কোন লড়াই চালানোর যোগ্য। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের কয়েকটি প্রকারভেদ রয়েছেঃ মুসলমান, কাফের ও মুনাফিক।

কাফেরদের মধ্যে শান্তিকামী ও জঙ্গী মনোভাবাপন্ন শ্রেণী রয়েছে। এদের মধ্যে শুধু কাফেরই নয় বরং আল্লাহর রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন কাফেরও আছে। মুনাফিকদের মধ্যে কম মুনাফিকী করে এমন লোক রয়েছে, আবার বেশি মাত্রায় মুনাফিকীতে লিপ্ত এমন লোকও রয়েছে। তাহলে কোথা থেকে শুরু করব? কোন ক্ষেত্রটি কাজের জন্য অধিকতর উপযোগী? কোন ইস্যুটির দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে?

অগ্রাধিকারের ফিকাহ সময়ের দাবি অনুযায়ী কাজ করার ব্যাপারে আমাদেরকে সচেতন করে, যাতে নির্দিষ্ট কাজটি কাল বিলম্ব না করে যথাযথভাবে সম্পন্ন করা যায়। কেননা সুযোগ একবার হাতছাড়া হলে তা পুনরায় আসতেও পারে আবার নাও পারে। আর আসলেও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। একজন কবি সময়ের মূল্য সম্পর্কে বলেছেনঃ

সুযোগ কাজে লাগাও, একটি সুযোগ
যদি হাতছাড়া করো, আসবে দুঃখ হয়ে।

আরবি এক প্রবচনে বলা হয়েছেঃ আজকের কাজ কালকের জন্যে ফেলে রেখো না।
ওমর ইবনে আবদুল আজীজকে (রা.) কিছু কাজ আগামী দিনের জন্যে রেখে দেয়ার পরামর্শ দিলে তিনি জবাব দিয়েছিলেনঃ আমি তো ইতোমধ্যে একদিনের কাজ করেই ক্লান্ত, তাহলে আগামীকাল দুদিনের কাজ করতে হলে কি অবস্থা হবে।

ইবনে আত’র (রা.) একটি জ্ঞানগর্ভ উক্তি হচ্ছেঃ অনেক কাজ আছে যেগুলো করার প্রচুর সময় থাকে, সেই সময়ের মধ্যে এগুলো করে ফেলা যায়। কিন্তু এমন কাজও থাকে যা নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে না করলে আর করা হয়ে উঠে না। কারণ প্রত্যেক নতুন সময়ের সাথে থাকে নতুন নতুন দায়িত্ব আর আল্লাহ নির্ধারিত নতুন নতুন কাজ।

গাজ্জালী ও অগ্রাধিকারের ফিকাহ
ইমাম গাজ্জালী (র.) ‘আল এহিয়া’ গ্রন্থে যারা সৎকর্মের দিকে মনোযোগ না দিয়ে কেবল ইবদত-বন্দেগীতে সন্তুষ্ট থাকে তাদের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আরেক দল নফলের ব্যাপারে যতোটা আগ্রহী ফরজের ব্যাপারে ততোটা নয়। আমরা দেখি তারা সকালের নফল ও রাতের তাহাজ্জুদসহ অন্যান্য নামাজ পড়ে খুব খুশি, কিন্তু ফরজ কাজ করে আনন্দ পায় না। কিংবা তারা সময় মতো ফরজ নামাজ আদায়েও তৎপর নয়। তারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বর্ণিত হাদিসের কথা ভুলে যায়ঃ আমি যে সব কাজ ফরজ হিসেবে করার আদেশ দিয়েছি সেগুলো ছাড়া আমার বান্দার আর কোনো কাজ আমার অধিকতর নৈকট্য লাভের জন্যে অধিক উত্তম হবে না। (বুখারী) আমলে সালেহ’র গুরুত্বভিত্তিক ক্রমবিন্যাস অবহেলা করা অসদাচারের আওতায় পড়ে। এক ব্যক্তির দু’টি বাধ্যতামূলক কাজের মধ্যে মাত্র একটি করার মতো পরিস্থিতি আছে, অথবা একটি কাজ অল্প সময়ের মধ্যে করতে হতে পারে এবং আরেকটি কাজের জন্যে প্রচুর সময় আছে, এক্ষেত্রে সে যদি ক্রমবিন্যাস রক্ষা না করে তাহলে সে বিভ্রান্ত।

এ ধরনের বহু উদাহরণ রয়েছে সেখানে আল্লাহর হুকুমের বাধ্যতা ও অবাধ্যতা উভয়ই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে বিষয়টি বাস্তবিকই দ্ব্যর্থবোধক সেটি হচ্ছে কিছু কিছু বাধ্যতামূলক কাজকে অন্যান্য কাজের ওপর গুরুত্ব দেয়া। যেমন নফলের চেয়ে ফরজ আমলকে অগ্রাধিকার দেয়া, ফরজে কেফায়া’র চেয়ে ফরজে আইনের প্রতি গুরুত্বারোপ, কম দরকারী কাজ যা স্থগিত করা যায় তার চেয়ে স্থগিত করা যায় না এমন কাজের ওপর গুরুত্ব দেয়া এবং পিতার প্রয়োজনের চেয়ে মায়ের চাহিদা পূরণের ওপর অগ্রাধিকার দেয়া।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ কে আমার অধিকতর সেবাযত্ন পাওয়ার হকদার? তিনি জবাব দিলেনঃ তোমার মা। লোকটি বলল, এরপর কে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কে এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তোমার মা। লোকটি চতুর্থবার প্রশ্ন করল, তার পর কে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তোমার পিতা। লোকটি আবারো জিজ্ঞেস করর এরপর কে? এবং রাসূল (সাঃ) জবাব দিলেনঃ তোমার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে যিনি নিকটতম এবং এরপর নিকটতর যিনি। কোনো ব্যক্তি আত্মীয়তার ঘনিষ্ঠতা অনুযায়ী এ সম্পর্কের হক আদায় করবে। যদি তার আত্মীয়দের দুজন সমমর্যাদার হন, তাহলে যার সাহায্য বেশি প্রয়োজন তাকে সাহায্য করতে হবে। আর উভয়ের চাহিদা যদি সমান হয় তবে যে বেশি দ্বীনদার তাকে সাহায্য করা উচিত।

একইভাবে কেউ যদি পিতার ব্যয়ভার মিটাতে না পেরেও আবার হজ্ব পালন করতে চায়, সে ক্ষেত্রে তার হজ্বে যাওয়া উচিত নয়। যদি যায় তবে সে মূর্খের মতো কাজ করবে। কারণ তার উচিত পিতার স্বার্থ রক্ষার ওপর অগ্রাধিকার দেয়া। এভাবে সে একটি নিম্নক্রমের ধর্মীয় কর্তব্যের চেয়ে অপর একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার ওপর গুরুত্ব দেবে।

অধিকন্তু কারো যদি পূর্ব নির্ধারিত কাজের সময় জুমার নামাজের ওয়াক্ত হয়ে যায় তাহলে জামায়াতে শরিক হতে হবে। যদি সে পূর্ব নির্ধারিত কাজে যায় তাহলে সে আল্লাহর অবাধ্যতা করবে- যদিও প্রতিশ্রুত কাজ সম্পন্ন করাটাও একটি বাধ্যতামূলক বিষয়। কেউ যদি তার পোশাকে কিছু নাপাকী দেখে পিতামাতার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, নাপাকী অগ্রহণযোগ্য ঠিকই কিন্তু পিতামাতাকে আঘাত দেয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। নাপাকী পরিহারে সাবধান হওয়ার চেয়েও পিতামাতাকে আঘাত দেয়া থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া বেশি জরুরী।

নিষিদ্ধ কাজ ও বাধ্যতামূলক দায়িত্বের পারস্পরিক সম্পর্কের অসংখ্য নজির রয়েছে। যে এসবের মধ্যে কোনো একটি বিষয়েও অগ্রাধিকারের ধারা উপেক্ষা করে সে নিশ্চিতই বিভ্রান্ত।

ইবনুল কাইয়েমের মত
কোন ইবাদত করা উত্তম- যে বন্দেগী করা খুব কঠিন সেগুলো, না যেগুলো খুব কল্যাণকর সেগুলো? এসব প্রশ্নে ইমাম ইবনুল কাইয়েম বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।
তিনি মত দিয়েছেন, একমাত্র পছন্দের ইবাদত বলতে কিছু নেই। তবে কোনো কোনো সময় কোনো কোনো ইবাদত করা পছন্দনীয় হতে পারে। দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য দ্রব্য প্রদান করা সর্বোত্তম কাজ, এতে একজন মুসলমান আল্লাহর অধিক নৈকট্য লাভ করে। যখন কুফরী শক্তি কোনো মুসলিম দেশে হামলা চালায়, তখন জিহাদ সর্বোত্তম আমল। এর পরের স্থান হচ্ছে মুজাহিদদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করা। যখন কোনো আলেম ইন্তেকাল করেন অথচ তাদের কোনো উত্তরাধিকারী থাকে না, তখন দ্বীনি এলেম অর্জন করা সর্বোত্তম কাজ। এজন্যে একজন মুসলমান আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কারের প্রত্যাশা করতে পারে এবং তারা আল্লাহ ও ঈমানদারদের প্রশংসাও অর্জন করে। এভাবেই ভালো ভালো কাজগুলোর বৈশিষ্ট্য অনুসারে একে অপরের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যেতে পারে।

১। সূরা আল ইমরানের শেষ আয়াতটির তাফসীরে ইবনে কাছীর এ কাহিনী বর্ণনা করেছেন। অন্যান্য ইতিহাসবিদগণও একই কাহিনী বর্ণনা করেছেন।
২। বাশার আল হাফী’র এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা ‘আল এহিয়া’ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে ৪০৯ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করা হয়েছে।
৩। দেখুন ‘আল এহিয়া’, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০০-৪০৪, আমার বইও দেখুনঃ ‘ইমাম আল গাজ্জালীঃ বিটুইন হিজ প্রেইজারস এন্ড ক্রিটিকস’, পৃষ্ঠা ৮৭-৯৩।
৪। মাদারিজ আল সালিকীন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫-৯০, আমার বই ‘ইবাদাত ইন ইসলাম’।

সূত্রঃ নতুন সফর প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত “আধুনিক যুগ ইসলাম কৌশল ও কর্মসূচি” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
varsammer fiqh

ভারসাম্যের ফিকাহ

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | এপ্রিল ১১, ২০১৫
Download PDF

যে ফিকাহ প্রয়োজন
আমাদের কোন কোন ধরনের ফিকাহ প্রয়োজন, তার মধ্যে বেশ কয়েকটি আমার ‘ইসলামিক এয়োকেনিং বিটুইন রিজেকশন এন্ড এক্সট্রিমিজম’ বইয়ে আলোচিত হয়েছে। তাতে আমলের ফিকাহ এবং কর্মের ক্রমবিন্যাসের ফিকাহ প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হয়েছে।

বক্তব্যের আরেকটি অংশ আমার ‘ইসলামিক এয়োকেনিং বিটুইন পারমিটেড ডিফারেন্সেস এন্ড ব্লেমওয়ার্দি ডিজইউনিটি’ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে আমাদের অন্যতম প্রধান প্রয়োজনীয় ‘মতানৈক্যের ফিকাহ’ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয় যে, আমাদের পাঁচ ধরনের ফিকাহ দরকার। এখানে এরমধ্যে মাত্র দু’টি ফিকাহর ওপর আলোচনা করা হয়েছেঃ

১)ভারসাম্যের ফিকাহ (ফিকহ উল মুয়াজানাত)
২) অগ্রাধিকারের ফিকাহ (ফিকহ উল আওলাইয়াত)
এ ধরনের ফিকাহর প্রত্যেকটির ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

ভারসাম্যের ফিকাহ
ভারসাম্যের ফিকাহ বলতে আমরা কয়েকটি বিষয় বুঝিঃ
১. আকার ও সামর্থ্য, মূল্য ও ফলাফল এবং সহনক্ষমতার আলোকে কোনটির চেয়ে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ সে ব্যাপারে ভারসাম্য রক্ষা করা যাতে কোনটির উপর অগ্রধিকার দেয়া যায় এবং কোনটি স্থগিত রাখা যায় তা নির্ণয় করা যায়।
২. ভালো বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার মতো মন্দ বিষয়গুলোর মধ্যেও ভারসাম্য রক্ষা করা, যেন কোনটি গ্রহণ এবং কোনটি পরিহার করতে হবে তা নির্ধারণ করা যায়।
৩. ভালো ও মন্দ বিষয়গুলো যদি সাংঘর্ষিক হয়, তবে ভালো লাভের চাইতে মন্দ বিষয় পরিহারের উপর অগ্রাধিকার দেয়া এবং ভালো লাভের স্বার্থে কোন কোন ক্ষেত্রে মন্দকে কখন উপেক্ষা করা যায় তা স্থির করা।

দু’ধরনের ফিকাহ
এ প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রয়োজন দু’পর্যায়ের ফিকাহঃ

শরীয়াহর ফিকাহ
প্রথম হচ্ছে শরীয়াহর ফিকাহ। শরীয়াহর প্রকৃত মর্ম গভীরভাবে অনুধাবনই হবে এর ভিত্তি। এর লক্ষ্য হচ্ছে উপরোক্ত ‘ভারসাম্য নীতিমালার’ অকাট্যতা প্রতিপন্ন করে এর প্রামাণিকতা নির্ণয় করা। এটি তাদের কাছে স্পষ্ট হতে হবে যারা শরীয়াহর মূল উৎস ও হুকুম-আহকাম অনুধাবন এবং এগুলোর গূঢ় তত্ত্ব উদঘাটনে সচেষ্ট।

শরীয়াহ কেবল মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণে কয়েক ধরনের সহজাত চাহিদাকে সামনে রেখেই পাঠানো হয়েছে। এর কল্যাণকর পর্যায়গুলো হচ্ছেঃ অপরিহার্য (আল দুরুরিয়াহ), প্রয়োজনীয় (আল হাজিয়াহ) ও সৌন্দর্যবোধক (আল তাহসিনিয়াহ)।

বাস্তবতার ফিকাহ
দ্বিতীয় পর্যায়ের এ ফিকাহ আসলে ইতিবাচক যার ভিত্তি হচ্ছে সমকালীন বাস্তবতা নিয়ে গবেষণা। অত্যন্ত সঠিক তথ্য উপাত্ত নির্ভর গবেষণা সতর্কতার সঙ্গে ব্যাপক ক্ষেত্রে চালাতে হবে। এ ব্যাপারে প্রচারমূলক উপাত্ত ও প্রশ্নমালা ভিত্তিক বিভ্রান্তিকর ও অবাস্তব তথ্য পরিসংখ্যানের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এসবের পেছনে, একটি মতলব কাজ করে। এতে সামগ্রিকভাবে সত্য প্রকাশের উদ্দেশ্য থাকে না।

ফিকাহর সমন্বয়
শরীয়াহর ফিকাহ ও বাস্তবতার ফিকাহ উভয়ের মধ্যে সমন্বয় দরকার। যাতে করে আমরা যথাযথ তাত্ত্বিক ভারসাম্যকরণ প্রক্রিয়ায় পৌঁছতে পারি, যা একই সাথে উগ্রতা ও ঔদাসীন্য মুক্ত হবে। নীতিগতভাবে এখানে শরীয়াহর ফিকাহ’র বিষয়টি স্পষ্ট। এ বিষয়ে উসূল আল-ফিকাহ গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘আল-মুসতাসফা’ (ইমাম গাজ্জালী) থেকে শুরু করে ‘আল-মুয়াফাকাত’ (ইমাম আল-শাতিবি) পর্যন্ত এবং নিয়মবিধি, সাদৃশ্য ও ভিন্নতা সংক্রান্ত বই-পু্স্তকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

যখন নানামুখী স্বার্থের সংঘাত হয়, তখন উচ্চতর স্বার্থে নিম্নতর স্বার্থ এবং সাধারণের স্বার্থে ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করতে হয়। অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থের মালিককে তার ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া উচিত। পরস্পর বিরোধী স্বার্থের ক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদীর স্থলে দীর্ঘ মেয়াদী অথবা স্থায়ী স্বার্থ, তুচ্ছ স্বার্থের স্থলে প্রকৃত স্বার্থ এবং অনিশ্চিত স্বার্থের পরিবর্তে সুনিশ্চিত স্বার্থের ওপর অগ্রাধিকার দেয়া আবশ্যক।

আমরা দেখেছি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হুদায়বিয়ার সন্ধিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত, মৌলিক ও ভবিষ্যত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন যা অন্য কেউ হলে কখনোই ছাড় দিতে চাইতো না। তিনি এমন শর্ত মেনে নিয়েছিলেন যা প্রথম নজরেই মুসলমানদের জন্যে অন্যায্য ও অবমাননাকর মনে হয়েছিল। তিনি ‘পরম করুণাময় আল্লাহর নামে’ বাক্যটি তুলে ফেলতে সম্মত হয়েছিলেন। সে স্থলে লেখা হয়েছিল ‘হে প্রভু আপনার নামে’। তিনি চুক্তিতে ‘আল্লাহর রাসূল’ কথাটি উল্লেখ না করে কেবল তার নাম ‘মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ’ লিখতেও রাজী হন। এরকম বহু উদাহরণ রয়েছে।

ক্ষতিকর বিষয়গুলো পরস্পর বিরোধী হলে এবং এগুলোর মধ্যে কোনোটি যদি অপরিহার্য হয় তবে দু’টি মন্দের কম মন্দটি এবং অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর মন্দ বিষয়টি বেছে নেয়া উচিত। মুসলিম মনীষীরা ক্ষতিকর বিষয় যথাসম্ভব নির্মূল করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে কোনো বড় ধরনের ক্ষতিকর বিষয়ের স্থলে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর বিষয় নির্মূল করা উচিত নয়। একটি ছোট ক্ষতি সহ্য করা উচিত যদি তাতে একটি বড় ক্ষতি পরিহার করা সম্ভব হয়। আবার সাধারণের ক্ষতি এড়ানোর স্বার্থে ব্যক্তির ক্ষতি স্বীকার করে নেয়া উচিত। এর বহু উদাহরণ ‘আল কাওয়ায়িদুল ফিখিয়া’ ও ‘আল আসবাহ্ ওয়ান নাজায়ের’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদি লাভ ও ক্ষতির সংঘাত দেখা দেয় তবে আকার, ফলাফল ও মেয়াদের নিরিখে তার বিচার করতে হবে। একটি বৃহত্তর স্বার্থ অর্জনের লক্ষ্যে সামান্য ক্ষতি উপেক্ষা করা যায়। দীর্ঘমেয়াদী অথবা স্থায়ী স্বার্থের জন্যে কোনো সাময়িক ক্ষতি মেনে নেয়া উচিত। এমন কি কোনো বড় ক্ষতিকেও মেনে নেয়া যায় যদি এর চেয়েও বড় ক্ষতি নির্মূলের সম্ভাবনা থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় স্বার্থ আদায়ের আগেই ক্ষতিকর বিষয় এড়ানোর চেষ্টা করা উচিত।

এ ভাবধারা কেবল তত্ত্ব হিসেবে মনে করা উচিত নয়, বরং এগুলো আমাদেরকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। কারণ, সক্রিয় ইসলামী গ্রুপগুলোর মধ্যে এসব ভারসাম্যকে ঘিরেই নানা মতপার্থক্য বিদ্যমান।

বৈরী শক্তির সাথে জোট বাধা
যেসব সরকার ইসলামের প্রতি বিশ্বস্ত নয় তাদের সঙ্গে সমঝোতা বা সন্ধি স্থাপন কি মেনে নেয়া যায়?

যে ক্ষমতাসীন সরকার বিশুদ্ধ ইসলামী চরিত্রের সরকার নয়, ক্রটিপূর্ণ সংবিধান দ্বারা পরিচালিত অথবা যার প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন নেই- সেই সরকারে অংশগ্রহণ করা কি উচিত?

একটি ধর্মবিরাধী, স্বেরাচারী ও অত্যাচারী অসৎ সরকারকে হটানোর জন্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিয়ে গঠিত বিরোধী ফ্রন্টে আমাদের যোগদান করা কি উচিত?

সুদভিত্তিক মানব রচিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাবাধীন পরিবেশে আমরা কি ইসলামী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে পারি?

সাধারণভাবে মুসলমানদেরকে সুদভিত্তিক ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে দেয়া অথবা ইসলামের শিক্ষা অনুসরণকারী দ্বীনদার লোকদেরকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করা থেকে বিরত রাখা কি উচিত?

বাস্তব জীবনে প্রয়োগ
নীতিমালা প্রণয়ন করা সহজ, কিন্তু এগুলো মেনে চলা কঠিন। সাধারণ মানুষ এবং যারা সামান্য কারণে শোরগোল করেন তাদের পক্ষে ভারসাম্যের ফিকাহ অনুধাবন করা সহজ নয়।

মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী এবং তাঁর দল জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ষাটের দশকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানের স্থলে ফাতেমা জিন্নাহকে নির্বাচনে সমর্থন করা ভারসাম্যের ফিকাহর আলোকে কম ক্ষতিকর বলে মত প্রদান করায় তিনি ও তাঁর অনুসারীরা তীব্র প্রতিরোধ ও হয়রানির সম্মুখীন হয়েছিলেন। একটি জাতি কোনো মহিলাকে তাদের নেতা নিযুক্ত করলে কখনোই উন্নতি করতে পারবে না-এ হাদিসকে ভিত্তি করে তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালানো হয়। তাহলে সেই জাতির কী হবে যারা কোনো স্বৈরশাসককে তাদের নেতা হিসেবে বরণ করে নেয়? তারা কী কাজটা খুব ভালো করবে? কখনোই না। এখানেই ভারসাম্যের ফিকাহর কাজ হচ্ছে দু’টি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্টকে বেছে নিয়ে বৃহত্তর ক্ষতি পরিহার করা।

সুদানের ইসলামী আন্দোলনের নেতা ড. হাসান আল তুরাবী এবং তার সহযোগীবৃন্দ সোস্যালিস্ট ইউনিয়নে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নেয়ায়, এমন কি সুদানে ইসলামী শরীয়াহ চালু করার ঘোষণা দেয়ার আগেই তারা জাফর নুমায়ের সরকারের পদ গ্রহণ করায় কোনো কোনো ইসলামপন্থী তাদের কঠোর সমালোচনা করে।

সিরিয়ায় আমাদের সহযোগী ভ্রাতৃবৃন্দ তাদের সমূলে ধ্বংসে উদ্যত স্বৈরশাসনের প্রতিরোধে কোনো কোনো অনৈসলামী শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে একই রকম বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। অথচ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) স্বয়ং বহু ঈশ্বরবাদী খুজয়াহ গোত্রের সঙ্গে মিত্রতা করেছিলেন এবং কখনো কখনো বহু ঈশ্বরবাদী এক গ্রুপের বিরুদ্ধে অপর এক গ্রুপকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

অবশ্য আমি এখানে কোনো পক্ষ নিচ্ছি না। আমি কেবল একটি নীতি তুলে ধরছি, সেটি হচ্ছে ভারসাম্যের ফিকাহ- যার ওপরে ‘শরীয়াহ রাজনীতির’ কাঠামো র্নিমাণ করা উচিত। অনৈসলামী শাসনে অংশগ্রহণ অথবা অমুসলিম শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধা অনুমোদনযোগ্য- এ বক্তব্যের সমথনে রাসূলুল্লাহ (সা:) ও তাঁর সাহাবিদের গৃহীত অবস্থান এবং আমাদের সুবিস্তৃত শরীয়াহর বিধানে বহু দলিল রয়েছে।

ভারসাম্যের ফিকাহ’র প্রমাণ
আমরা যদি আল-কোরআনের মক্কী ও মাদানী সূরাগুলো সতর্কতার সঙ্গে অধ্যয়ন করি তাহলে ভারসাম্যের ফিকাহর অনেক প্রমাণ এবং একটি বিষয়ের সাথে আরেকটির গুরুত্ব পরিমাপের উপায় দেখতে পাব।

আমরা ভারসাম্যের স্বাথের উদাহরণ দেখতে পাই হযরত মূসা (আ.) এর প্রশ্নে হযরত হারুনের (আ.) জবাবে বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যেঃ হে আমার মাতৃতনয়। তুমি আমার দাড়ি ধরো না, মাথাও স্পর্শ করো না, আমি এ আশঙ্কা করেছিলাম যে তুমি বলবে, তুমি বনি ইসরাইলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ, আর তুমি আমার কথার সম্মান দাওনি। (সূরা ত্বাহাঃ ৯৪)

আবার অনিষ্টকর বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্যের নজির দেখা যায় খিজির (আ.) কর্তৃক নৌকা ফুটো করে দেয়ার ব্যাখ্যার মধ্যেঃ আর নৌকাটির ব্যাপার হচ্ছে, বস্তুত তা ছিল কতিপয় গরীব লোকের যা দিয়ে তারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করত, সুতরাং তাতে ফুটো সৃষ্টি করতে চাইলাম এবং তাদের অপর দিকে ছিল এবং বাদশাহ যে প্রত্যেকটি নিখৃঁত নৌকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিত। (সূরা আল কাহ্ফঃ ৯৪)

নৌকাটি পুরোপুরি হারানোর চেয়ে ফুটো নৌকাটি রাখাই মালিকের জন্যে কম ক্ষতিকর। অর্থাৎ সব কিছু হারানোর পরিবর্তে নিঃসন্দেহে কিছুটা বাঁচিয়ে নেয়া অনেক ভালো।

আল্লাহর কালামেও ভারসাম্যের ফিকাহর বিষয়টি স্পষ্ট রয়েছেঃ মানুষ আপনাকে সম্মানিত মাসে যুদ্ধ করার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, এ সময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধ করা আল্লাহ তায়ালার কাছে গুরুতর অপরাধ। আর মানুষকে আল্লাহর পথে চলতে বাঁধার সৃষ্টি করা এবং আল্লাহর সাথে কুফরি করা, মসজিদে হারামের পথে বাধা দেয়া এবং মসজিদে হারামের অধিবাসীদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কৃত করা আল্লাহর নিকট তার চেয়ে গুরুতর অপরাধ। আর ফেতনা সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষা অধিক জঘন্য। (সূরা আল বাকারাঃ ২১৭)

সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বলছেন, নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা গুরুতর অপরাধ, কিন্তু এর চেয়েও কোনো মারাত্মক অপরাধের প্রতিরোধে যুদ্ধ করা যেতে পারে।

মূর্ত ও বিমূর্ত স্বাথের মধ্যে তুলনার লক্ষ্যে আসুন আমরা পড়ি সেই আয়াত যেখানে আল্লাহ তায়ালা বদরের যুদ্ধের পর মুসলমানদের ভৎসনা করেছেনঃ নবীর পক্ষে শোভনীয় নয় যে তাঁর কাছে যুদ্ধবন্দী রয়েছে এবং তা তিনি মুক্তিপনের বিনিময়ে মুক্তি দেন অথচ তিনি ভূমিতে কাফেরদের প্রচুর রক্তপাত ঘটাননি; তোমরা তো দুনিয়ার ধনসম্পদ চাইছো, কিন্তু আল্লাহ চাইছেন আখেরাত; আর আল্লাহ অতি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সুরা আল আনফালঃ৬৭)

ভালো ও মন্দের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে আসুন আমরা দেখি মহান আল্লাহ কি বলছেনঃ তারা আপনাকে মদ ও জুয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, উভয়ের ব্যবহারের মধ্যে গুরুতর পাপ রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু কল্যাণও আছে। আর এ দুটোর মধ্যে কল্যাণ অপেক্ষা পাপই অধিক গুরুতর। (সূরা আল বাকারাঃ২১৯)

বিভিন্ন অমুসলিম গ্রুপ ও চক্র একে অপরের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে সূরা আল রুমের প্রারম্ভিক কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পারসিকদের উপর রোমকদের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এ সূরায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঐ দিন ঈমানদাররা আনন্দিত হবে। যদিও উভয় পক্ষই অমুসলিম। তবুও অগ্নিপূজক পারসিকদের তুলনায় রোমানরা মুসরমানদের ঘনিষ্ঠ। তারা আহলে কিতাব বলে মুসলমানদের অধিক কাছাকাছি।

ইবনে তাইমিয়ার মত
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া একটি অনৈসলামিক রাষ্ট্রে কোনো মুসলমানের সরকারী পদ গ্রহণ অনুমোদনযোগ্য বলে দৃঢ় মত প্রকাশ করেছেন, যদি সংশ্লিষ্ট পদাধিকারী ব্যক্তি কিছু কিছু অন্যায় অবিচারের প্রতিকার অথবা অসৎ কাজ ও দুর্নীতি দমনে ইচ্ছুক হন। (পরিশিষ্ট-১)

তিনি ভালো ও মন্দের দ্বন্দ্ব অথবা দু’টোই যদি একসাথে সামনে আসে এ দু’য়ের সমন্বয় এবং আলাদা করা সম্ভব না হলে সাময়িকভাবে গ্রহণ অথবা বর্জনের ওপরে একটি বিস্তারিত অনুচ্ছেদও রচনা করেছেন। (পরিশিষ্ট-২)

ইসলামী অর্থনীতির ওপরে আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে  অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকজন ফিকাহবিদ ও অর্থনীতিবিদ মত প্রকাশ করেন, মুসলিম দেশগুলোতে অনুমোদিত খাতে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠনের শেয়ার বেচাকেনা করা শরীয়াহর দৃষ্টিতে জায়েজ। যদিও এরূপ লেনদেনে সুদ-সংশ্লিষ্টতার কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকে। ভারসাম্যের ফিকাহর আলোকে এ ইস্যু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিম্পোজিয়ামে মত প্রকাশ করা হয়, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর খাত অমুসলিম অথবা অধার্মিক মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। কেননা এ পদক্ষেপ বিশেষত কোনো কোনো দেশে মারাত্মক বিপদ সৃষ্টি করবে। বরং শেয়ার হোল্ডারগণ সুদ-সংশ্লিষ্ট লেনদেন থেকে যে লভ্যাংশ পান বলে মনে করেন আনুপাতিকভাবে সেই অংশটি সাদাকাহ বা জনহিতকর কর্ম হিসেবে দান করে দিতে পারেন।

এ ফিকাহ অনুসারে বিবেকবান মুসলিম তরুণদেরকে ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্সের মতো কোম্পানিগুলো থেকে চাকরি না ছাড়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এতে অবশ্যই কিছু গুনাহর আশঙ্কা থাকলেও তারা সেখান থেকে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন তা ইসলামী অর্থনীতির বিকাশে কাজে লাগাতে পারেন। এভাবে তারা মনে মনে ক্ষতির দিকটা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি গোটা পদ্ধতি ইসলামীকরণের প্রচেষ্টায় যারা নিয়োজিত তাদের সঙ্গেও অংশ নিচ্ছেন।

ভারসাম্যের ফিকাহর অনুপস্থিতি
আমরা যদি ভারসাম্যের ফিকাহ প্রয়োগ না করি তাহলে আমরা বহু কল্যাণ ও লাভের দরজা নিজেরাই বন্ধ করে দেব। পরিণামে সব ব্যাপারে প্রত্যাখ্যানের দর্শনই একটি হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে, ঝামেলা এড়ানোর অজুহাতে একঘরে হয়ে যাব এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার নিজের যুক্তি মোতাবেক সংঘর্ষে না জড়ানোর পথ বেছে নেব। তখন ইজতেহাদ সাপেক্ষ প্রত্যেক ব্যাপারে আমাদের পক্ষে ‘না’ বলা অথবা ‘এটি হারাম’ বলা সহজ হয়ে যাবে।

কিন্তু আমরা যদি ভারসাম্যের ফিকাহ প্রয়োগ করি তাহলে এক পরিস্থিতির সাথে আরেক পরিস্থিতির তুলনা, স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে এবং ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক পর্যায়ে ক্ষতির স্থলে লাভের পরিমাপ করার উপায় খুঁজে পাব। আর এভাবে আমরা সম্ভাব্য সর্বোত্তম উপায়ে কল্যাণ লাভ ও অকল্যাণ পরিহারের পথ বেছে নিতে পারব।

১৯৮০ সালে কাতার থেকে প্রকাশিত ‘দোহা’ ম্যাগাজিনে লেখার অনুরোধ পেয়েছিলাম। এটি একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রকাশনা এবং এর অধিকাংশ সম্পাদকীয় কর্মী সেক্যুলারপন্থী। এর মূলনীতি ইসলাম বিরোধী না হলেও ইসলামপন্থী বা ইসলামের সমর্থকও নয়। আমি অনেক দিন ধরে ইতস্তত করার পর ভারসাম্যের নীতিতে প্রস্তাবটি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেই পত্রিকাটি বয়কট না করে এতে লেখা দেয়াই বেশি ভালো হবে। কারণ এর পাঠকরা এক ব্যাপকভিত্তিক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন যারা সাধারণত ইসলামী পত্র পত্রিকা পড়েন না। ‘আল উম্মাহ্‌’র মতো সাময়িকীর যে ধরনের পাঠক রয়েছে এ পত্রিকার পাঠকরা সেই শ্রেণীর নন বিধায় আমরা যখন সুযোগ পাচ্ছি তখন তাদের কাছে আমাদের কথা পৌঁছে দেয়া দরকার। আর এটি আল্লাহ প্রদত্ত আমাদের প্রতি দায়িত্ব।

এ কারণে এসব পত্র পত্রিকার নীতি আমাদের মতের অনুকূল না হলেও তাদেরকে সাক্ষাতকার বা লেখা দিতে রাজী হওয়া উচিত। যে সব দৈনিক পত্রিকা স্পষ্টভাবে ইসলামী ধারা অনুসরণ করে না সে সব পত্রিকায় লেখালেখি করলে অনেকে এখনো দোষারোপ করেন। অনেকে আমার ‘ইসলামিক এয়োকেনিং বিটুইন পারমিটেড ডিফারেন্সেস এন্ড ব্লেমওয়ার্দি ডিজইউনিটি’ বইটি সউদী দৈনিক ‘শারক আল আওসাত’ এ ধারাবাহিকবাভে প্রকাশের জন্যেও আমাকে দোষারোপ করেছেন। কারণ তারা এ পত্রিকার কোনো কোনো দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেন না। কিন্তু আমি বহুল পঠিত এ পত্রিকায় বইটি ছাপানোর সুফলের দিকই বেশি বিবেচনা করেছি।

এমন অনেক লোক রয়েছেন যারা বিশ্বাস করেন, বিপথগামী চিন্তা চেতনার কারণে অডিও-ভিডিওসহ সকল গণসংযোগ মাধ্যম বর্জন করা উচিত। তারা ভুলে যান গণসংযোগ মাধ্যম বর্জন করা মানে এগুলো আরো জঘন্য রূপ নেবে এবং সেক্যুলার ও নোংরা মানসিকতার লোক ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ করে নাশকতামূলক কাজ চালানোর সুযোগ পাবে। আর আমরা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হব যার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি ভারসাম্যের ফিকাহ’র আলোকে বিষয়টি পরীক্ষা করি তাহলে দেখব এ অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিতে কাজ করা কেবল জায়েজ ও বাঞ্ছনীয় নয় বরং অত্যাবশ্যক। কারণ এটি আমাদের দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যাওয়া এবং অশুভ কর্মকাণ্ডের যথাসাধ্য মোকাবিলার ন্যায্য একটি হাতিয়ার হতে পারে।

১। আলজারিয়ায় ১৯৯০ সালের ২-৫ মার্চ ৬ষ্ঠ বারাকাত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আরো কয়েকজন ফকীহর সঙ্গে আংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলাম। তারা হচ্ছেন, শায়খ আব্দুল হামিদ আল সায়েহ, শায়খ জুখতার আল সালামী, ড. আবদুস সাত্তার আবু গুদ্দাহ, ড. সাইয়েদ দার্শ ও ড. তালাল বাফাকীহ।

সূত্রঃ নতুন সফর প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত “আধুনিক যুগ ইসলাম কৌশল ও কর্মসূচি” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
buddibrittik o giyaner khetre

ইসলামী আন্দোলনঃ বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | এপ্রিল ১১, ২০১৫
Download PDF

বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রই প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কারণ ইসলামী শিক্ষা ও দাওয়াত প্রসারের এটিই হচ্ছে ভিত্তি। বস্তুত বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটই প্রধান সমস্যা। অনেক লোকের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে যেমন পরিষ্কার ধারণার অভাব রয়েছে, তেমনি ইসলামের শিক্ষা ও এসব শিক্ষার পর্যায়ক্রমিক গুরুত্ব অর্থাৎ কোনটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি সাধারণ গুরুত্বের এবং কোনটি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয় এসব ব্যাপারে জ্ঞানের গুরুতর অভাব রয়েছে।

আমরা বর্তমানে যে যুগে বাস করছি তার পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কেও জ্ঞানের গুরুতর অভাব দেখা যায়। অন্যদের সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা এমন হয় যে তাদেরকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেই নয় তো খাটো করে দেখি। অথচ অন্যেরা আমাদের সব ধরনের খবর রাখে এবং তারা আমাদের বিষয়ে গভীরভাবে অবহিত।

এমনকি নিজেদের সম্পর্কেও আমাদের অজ্ঞতা রয়েছে। আজ পর্যন্ত আমরা আমাদের শক্তি ও দুর্বলতার দিকগুলো পুঙ্খানুভাবে খতিয়ে দেখিনি। বরং প্রায়শই ক্ষুদ্র বিষয়কে বড় করে দেখি অথবা চায়ের কাপে ঝড় তুলি। আমাদের শক্তি সামর্থ অথবা দোষ ত্রুটি যে দিকেই দেখি না কেন, উভয়ক্ষেত্রে একই অবস্থা। এ অজ্ঞতা কেবল সাধারণ মুসলমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের স্বার্থ এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব যাদের উপর নির্ভর করে সেই অগ্রণী দল, যাদের মৌলিক কাজের ওপর ইসলামী আন্দোলন গড়ে উঠবে তার সঙ্গে সংশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উভয়ের এ অজ্ঞতা প্রকট।

নতুন ফিকাহ
বস্তুত আমাদের দরকার এক নতুন ফিকাহ যাতে করে আমরা আল্লাহ যাদেরকে সমঝদার লোক বলে বর্ণনা করেছেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা লাভ করতে পারি। এখানে ফিকাহ বলতে ইসলামী পরিভাষায় ব্যবহৃত ফিকাহ বোঝানো হয়নি। অর্থাৎ সেই আইনশাস্ত্র যা অজু, পাক-পবিত্র, ইবাদত-বন্দেগী, লেনদেন, বিবাহ, তালাক, শিশু লালন-পালনের শর্তাবলীর মতো বিস্তারিত বিশেষ বিধিবিধান নির্ণয় করে। এসব বিধিবিধান যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, আমরা এখানে তা বোঝাতে চাই না। কোরআন ও হাদিসেও ফিকাহ শব্দটি এ প্রসঙ্গে যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে আমরা সে অর্থেও বোঝাতে চাই না। যেহেতু, এটি এমন সব শব্দ ও ভাবের মধ্যে উচ্চারিত হয়েছে যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন ইমাম গাজ্জালীও তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘এহিয়া উলমুদ্দীন’-এর জ্ঞান অধ্যায়ে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

আল-কোরআনের মক্কী সূরাগুলোতে শরীয়াহর আওতায় আদেশ নিষেধের বিস্তারিত বিধান এমন কি সকল ফরজ, হুদুদ (দণ্ডবিধি) ও বিচারের আইন প্রবর্তনের পূর্বেই মূল শব্দ ফিকাহর উল্লেখ দেখা যায়।

মক্কায় অবতীর্ণ সূরা আল-আন’আমের ৬৫ নং আয়াতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেছেনঃ বলুন তিনি এতই শক্তিমান যে তোমাদের উপর আযাব প্রেরণ করতে আসমান এবং যমীন থেকে বিংবা তোমাদেরকে দলে উপদলে বিভক্ত করে দ্বিধায় ফেলতে। এবং তোমাদের এককে অপরের উপর আক্রমণের স্বাদ গ্রহণ করান; লক্ষ্য কর! আমরা কিরূপে প্রমাণসমূহকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করছি, যাতে তারা বুঝতে পারে।

একই সূরার ৯৪ নং আয়াতে আরো উল্লেখ রয়েছেঃ আর তিনি এমন যে, যিনি তোমাদেরকে এক সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন; থাকার জন্য দিয়েছেন একটি স্থান (পৃথিবীতে বা মাতৃগর্ভে) আর একটি হচ্ছে গচ্ছিত স্থান। নিশ্চয়ই আমরা প্রমাণসমূহের বিশদরূপে বর্ণনা করেছি ঐ সকল লোকের জন্যে যারা উপলব্ধি করে।

এ দু’টি আয়াতে ফিকাহ শব্দের অর্থ হলো আত্মা, অন্তর ও অভিজ্ঞতার আলোকে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় বিধান, তাঁর সৃষ্টি এবং তাঁর নির্ধারিত সঠিক পথ থেকে যারা সরে যায় তাদের জন্যে তাঁর শাস্তি গভীরভাবে উপলব্ধি করা।

মক্কী সূরা আল আ’রাফের ১৭৯ নং আয়াতে যে সব লোক জাহান্নামে যাবে বলে মহান আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন তাদের সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তাদের সম্পর্কে বলছেনঃ তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। এরপর এদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ এ সকল লোক চতুষ্পদ জন্তুর মতো বরং এরা তার চেয়েও বেশি পথভ্রষ্ট। এসব লোক হচ্ছে গাফেল।

বিভিন্ন সূরায় কোরআনের প্রতি বহু ঈশ্বরবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলছেনঃ আর আমরা তাদের অন্তরের উপর আবরণ রেখে দিয়েছি, যাতে তারা কোরআনকে না বোঝে এবং তাদের কানে তালা লাগিয়ে দিয়েছি। (আল আন’আমঃ ২৫, বানি ঈসরায়ীলঃ ৪৬, আল কাহফঃ ৫৭)

আল-কোরআনের বেশ কয়েকটি মাদানী সূরায় ফিকাহ শব্দটি বহু ঈশ্বরবাদী ও মুনাফিকদের বোধশক্তি না থাকার অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা ‘আল-আনফালের’ ৬৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূল (সাঃ) ও ঈমানদারদের সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমাদের মধ্যে যদি বিশ জন দৃঢ়তাসম্পন্ন ব্যক্তি থাকে, তবে তাঁরা দুইশ’র উপরে জয়লাভ করবে, আর তোমাদের মধ্যে যদি একশ ব্যক্তি থাকে, তবে এক হাজার অবিশ্বাসীর উপর জয়লাভ করবে, এ কারণে যে তারা এমন লোক যারা বোঝে না।

এখানে অবিশ্বাসীদের জ্ঞান না থাকার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় বিধিবিধান এবং পালাক্রমে সকল লোককে কিভাবে তিনি বিভিন্ন রকম সৌভাগ্যের দিন প্রদান করেন সে সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে।

সূরা-তাওবার ৮৭ নং আয়াতে আল্লাহ মুনাফিকদের নিন্দা করে বলেছেনঃ এরা অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের সাথে থাকতে তৃপ্তিবোধ করল এবং তাদের অন্তরের ওপর মোহর লাগানো হলো, যাতে তারা উপলব্ধি না করে।

এখানে উপলব্ধি অর্থ হচ্ছে জিহাদের প্রয়োজনীয়তা এবং দ্বীন রক্ষার উপলব্ধির অর্থ হচ্ছে জীবন, ইজ্জত, সম্পত্তি ও সামগ্রিক অর্থে সমাজকে রক্ষার জন্যে সচেষ্ট থাকার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা। এসব কাজ যে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ- তা যতোই জরুরী হোক তার চেয়েও অগ্রাধিকার পাবে।

একই সূরার ১২৭ নং আয়াতে সবশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা (যাদের বোধশক্তির অভাব রয়েছে) এ ধরনের লোকদের সম্পর্কে বলছেনঃ আর যখন কোনো সূরা নাজিল করা হয়, তখন তারা একে অপরের দিকে তাকাতে থাকে; (এবং বলে যে) তোমাদেরকে কি কেউ দেখে না? অতঃপর তারা সরে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্তরগুলোকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, কারণ তারা হচ্ছে নির্বোধ সমাজ মাত্র।

এসব নির্বোধ লোক ভুলে যায় যে কোনো মানুষ তাদেরকে দেখার আগেই আল্লাহ তাদেরকে দেখতে পান। আসলেই তারা তাদের ফিকাহ এবং বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
সূরা আল হাশরের ১৩ নং আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদেরকে লক্ষ্য করে মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেনঃ নিশ্চয় তাদের অন্তরে আল্লাহর অপেক্ষা তোমাদের ভয় অধিক; এটি এ কারণে যে তারা বুঝতে পারে না।

সূরা আল মুনাফিকুনের ৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেনঃ এটি এ কারণে যে তারা ঈমান এনেছে, অতঃপর কাফের হয়েছে। তাই তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে, অতএব তারা বুঝতে পারছে না।

একই সূরার ৭ নং আয়াতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ তারাই বলে, আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে যারা রয়েছে তাদের জন্যে কিছুই ব্যয় করো না, যতক্ষণ না তারা তাকে পরিত্যাগ করে। অথচ আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদরাজি আল্লাহরই অধিকারে আছে, কিন্তু মুনাফিকরা বোঝে না।

এতে দেখা যায়, ‘সে সব লোক যারা বোঝে না’- এ মুনাফিকদের সম্পর্কেই কোরআনের একটি বিরাট অংশ জুড়ে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ, মুনাফিকদের ধারণা তারা বুদ্ধিমান। তাই তারা পক্ষাবলম্বন না করে সুবিধাবাদী অবস্থান নেয়, দ্বিমুখী নীতি নিয়ে আল্লাহ ও ঈমানদারদের ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করে। বিশ্বাসীদের সঙ্গে মিলিত হলে তারা বলে, আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু যখন তাদের দুষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে একত্রিত হয় তখন তারা বলে, আমরা তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি।

কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহ বহু আয়াতে তাদের রহস্য দ্বিধা এবং ধোঁকাবাজি প্রকাশ করে দিয়েছেন। সূরা আল-বাকারার ৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে বলে মনে করে, বস্তুত তারা নিজেদের সাথেই ধোঁকাবাজি করে এবং তারা তা অনুধাবন করতে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা ও মানুষের সামনে তাদের মুনাফিকী ধরা পড়েছে। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনকে তারা হারিয়েছে এবং নিশ্চিতই তারা দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে নিক্ষিপ্ত হবে। এর চেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি আর কী হতে পারে?

সুতরাং এ বর্ণনা অনুযায়ী কারো মধ্যে মুনাফিকীর লক্ষণ পরিলক্ষিত হলে, নিঃসন্দেহে বুঝতে হবে তার মধ্যে ন্যূনতম পরিমাণ বোধশক্তি নেই।

উপসংহার
আল-কোরআনের বাচনভঙ্গি অনুযায়ী ফিকাহ শব্দটি আজকের ভাষায় আইনশাস্ত্রের পারিভাষিক অর্থ বোঝায় না। বরং আল্লাহর কালাম এবং সৃষ্টি জগত, জীবন ও সমাজ সম্পর্কিত তাঁর বিধিবিধান উপলব্ধি ও জ্ঞান আহরণ বোঝায়।

এমন কি সূরা তওবার ১২২ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ তাদের প্রত্যেক দলের মধ্যে হতে একটি করে অংশ যেন জিহাদে যায়। যাতে অবশিষ্ট লোক দ্বীনি জ্ঞান-গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে পারে এবং জিহাদে যোগদানকারীরা নিজ কওমে ফিরে এলে যাতে তারা অসৎ কাজ সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে।

এ আয়াতের ফিকাহ শব্দটি প্রচলিত অর্থে ব্যবহার করা হয়নি। আইনশাস্ত্র সম্পর্কিত এরূপ অর্থ করলে তাতে সেই হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হবে না যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অর্থের হেরফের করা অথবা নিজেকে রক্ষা এবং দাওয়াতি কাজের প্রাথমিক দায়িত্ব পালনে গাফিলতির ব্যাপারে সতর্ক করতে পারে।

আল-কোরআনের উপরোক্ত আয়াতে ‘ফিকাহ’ শব্দের যে ব্যবহার এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর একটি হাদীসেও এর ব্যবহারের মধ্যে সাযুজ্য রয়েছে। হাদিসটি হচ্ছেঃ আল্লাহ যদি কোনো ব্যক্তির কল্যাণ করতে চান তবে তিনি তাকে দ্বীনি এলেমে পারদর্শী করেন। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা তার দৃষ্টিকে আলোকিত করবেন যাতে করে সে কেবল শব্দাবলী আর ভাসাভাসা অর্থ নিয়ে আত্মতৃপ্তির পরিবর্তে দ্বীনের সত্যতা, গূঢ়তত্ত্ব ও লক্ষ্য আরো ভালোভাবে অনুধাবনের জন্যে গভীর সাধনা চালাতে পারে।

সূত্রঃ নতুন সফর প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত “আধুনিক যুগ ইসলাম কৌশল ও কর্মসূচি” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
558085_3233974682804_1069783068_2961157_452771132_n

মুসলিম তরুণদের প্রতি উপদেশ (পর্ব-৩)

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | জুলাই ১২, ২০১৪
Download PDF

 আমি আরো কয়েকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই:

ক. মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য অবশ্যই পালন করতে হবে। মাতাপিতা, ভাইবোন, কারো সাথেই এই অজুহাতে কর্কশ ব্যবহার করা যাবে না যে, তারা ধর্মের সীমালংঘন করছে। তারা যদি এরূপ করেও তবুও তাদের সম্মান-স্নেহ পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন হয় না। কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে : “তোমার পিতামাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সমকক্ষ দাঁড় করাতে যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তুমি তাদের কথা মানবে না। তবে পৃথিবীতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করবে এবং যে বিশুদ্ধ চিত্তে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর।” (৩১ : ১৫)।

অনুরূপভাবে পিতা ইবরাহীম (আ)-এর আচরণ থেকেও আমরা শিক্ষা নিতে পারি। কুরআনে এর বর্ণনা আছে। পিতাকে সত্য পথে আনার জন্যে তিনি পিতার রুঢ়তা সত্ত্বেও তাকে কোমলতারসাথে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তাহলে মুসলমান পিতামাতাদের সাথে কিরূপ আচরণ করতে হবে?

খ. সকল মানুষ এক, ইসলাম এই শিক্ষা দেয়। কিন্তু এ সম্পর্কে ভুল ধারণা থাকা উচিত নয়। মানুষে মানুষে অনেক পার্থক্য আছে। তার মধ্যে বয়স একটি। এজন্যে শিষ্টতা ও সম্মানের দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি, শাসকের অধিকারের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যুবক সম্মান করবে বৃদ্ধকে, ইসলাম এই শিক্ষা দেয়। এ সম্পর্কে অনেক হাদীস আছে। যেমন: “বৃদ্ধ মুসলমানের প্রতি সম্মান আল্লাহর গৌরব।” (আবু দাউদ) এবং “যে ব্যক্তি ছোটদের প্রতি স্নেহ, বৃদ্ধদের প্রতি সম্মান ও জ্ঞানীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আমার (উম্মতভুক্ত) নয়।” (আহমদ, তাবরানী, হাকিম)

গ. যারা দাওয়াতী কাজে অভিজ্ঞ, এক সময় খুব সক্রিয় ছিলেন, কোনো কারণে এখন ঝিমিয়ে পড়েছেন তাদের প্রতি সদয় দৃষ্টি রাখতে হবে। তাদের অবদানের কথা ভুলে গিয়ে তাদের নিন্দা মুখর হওয়া উচিত নয়। এটাও রাসূল্লাহ (সা)-এর সুন্নাহ। হাতিব ইবনে আবু বালতাহ (রা)-এর ঘটনা থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায়। তিনি মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি সম্পর্কে খবর সরবরাহের বিনিময়ে মক্কায় অবস্থিত তাঁর পরিবার-পরিজনকে রক্ষার অনুরোধ করে পৌত্তলিক কুরায়েশদের কাছে বার্তা পাঠান। বার্তাটি ধরা পড়লে হাতির স্বীকার করেন। তখন হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) তার বিশ্বাসঘাতকতায় এতোই ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন যে, তিনি তার শিরচ্ছেদ করার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তা নাকচ করে দিয়ে বলেন, “তুমি কিভাবে জানো, আল্লাহ সম্ভবত বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ভাল কাজ দেখেছেন এবং তাদেরকে বলেছেনঃ ‘তোমরা যা খুশী তাই করো। কেননা আমি মাফ করে দিয়েছি তোমাদেরকে (তোমাদের অতীত-ভবিষ্যতের পাপকে)।” প্রাথমিক যুগে হাতিবের ইসলাম গ্রহণ, বদরের যুদ্ধে তার শৌর্যবীর্যের কথা স্মরণ করে রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে ক্ষমা মঞ্জুর করলেন। এভাবে তিনি বদরের যোদ্ধাদের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কেও সকলকে সচেতন করে দিলেন।

ঘ. আমি মুসলিম তরুণদেরকে দিবাস্বপ্ন ও অবাস্তব ভাববাদিতা পরিহার করার উপদেশ দিচ্ছি। তাদেরকে ধূলোর ধরণীতে নেমে বড় বড় শহরে বস্তি ও গ্রামের নিপীড়িত মানুষের সাথে মিশতে হবে। এখানেই নির্ভেজাল পুণ্য, সরলতা ও পবিত্রতার উৎস নিহিত আছে। এসব মানুষ অভাবের তীক্ষ্ণ খোঁচায় দিশেহারা হয় না। এখানে সমাজ পরিবর্তন, পুনর্গঠন ও আন্দোলনের বিপুল উপাদান ছড়িয়ে আছে। এদের সাথে মেলামেশা করে তাদের অশিক্ষা-কুশিক্ষা দূর করে এবং তাদের খারাপ দিকগুলো বর্জন ও সুকৃতির বিকাশে উদ্যোগী হতে হবে। এজন্যে সংঘবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রয়াস চাই। নিপীড়িতদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা এবং তাদেরকে সঠিক পথে এনে জিহাদের কাতারে শামিল করার প্রচেষ্টাও ইবাদাহর মধ্যে গণ্য। ইসলামে দাতব্য কাজে উৎসাহ দেয়া হয়, এটি ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কর্তব্যের অন্তর্ভূক্ত।

আবু হুরায়রাহ (রা) একটি হাদীসে বলেন : “মানুষের প্রতিটি সন্ধির জন্যে সাদাকাহ তার কাছ থেকে প্রাপ্য, প্রতিদিন যখন সূর্য ওঠে। দুই ব্যক্তির মধ্যে মীমাংসা করে দেয়াও সাদাকাহ, পশুর পিঠে চড়তে কাউকে সাহায্য করা অথবা মাল তুলে দেয়াও সাদাকাহর অন্তর্ভূক্ত এবং একটি মধুর বচনও সাদাকা এবং কল্যাণের দিকে প্রতিটি পদক্ষেপ একটি সাদাকাহ, পথ থেকে ক্ষতিকর জিনিস সরানোও সাদাকাহ।” (সকল প্রামাণ্য সূত্রে সমর্থিত)

ইবনে আব্বাস (রা) আরেকটি হাদীসে বলেন, “প্রতিদিন একটি মানুষের প্রতিটি সিন্ধির জন্যে তার কাছ থেকে একটি ভাল কাজ প্রাপ্য।” শ্রোতাদের একজন বলল, “এটা আমাদের জন্যে খুবই কঠিন।” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমাদের ভাল কাজের আদেশ, খারাপ ও অবাঞ্ছিত কাজ থেকে বারণ একটি সালাহ, দরিদ্রের জন্যে সাহায্য একটি সালাহ, রাস্তা থেকে ময়লা সরানোরও একটি সালাহ ও সালাহর পথে তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ একটি সালাহ।” (ইবনে খুজায়মা)

বুরায়দা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “মানুষের ৩৬০টি অস্থি-সন্ধি আছে। তাকে অবশ্যই প্রতিটির জন্যে সাদাকাহ দিতে হবে।” তারা (সাহাবীরা) বললেন, “হে নবী, এটা কার পক্ষে সম্ভব?” তারা মনে করেছিলেন যে, এটা অর্থনৈতিক সাদাকাহ। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বললেন, “মসজিদে শ্লেম্মার ওপরে কেউ যদি মাটি চাপা দেয় তাও সাদাকাহ, পথ থেকে বাধা সরানোও সাদাকাহ।” (আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে খুজায়মা, ইবনে হাব্বান)

এ রকম তথ্য আরো বহু হাদীসে আছে। অন্ধ, বোবা, দুর্বলের ও দুস্থের প্রতি দয়া প্রদর্শনের উপদেশ রয়েছে এবং এসব কাজকে সাদাকাহ ও ইবাদাহ বলে গণ্য করা হয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে মুসলমান সর্বদা পুণ্য কাজের উৎস হিসেবে বিরাজমান। এভাবে অন্যেরও উপকার করছে, নিজের মধ্যেও সদগুণের বিকাশ ঘটাচ্ছে, সেই সাথে অসৎবৃত্তি অনুপ্রবেশের আশঙ্কা থেকে নিরাপদ থাকছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “সেই ব্যক্তি রহমতপ্রাপ্ত যাকে আল্লাহ সৎকর্মের চাবি এবং অসৎকর্মের তালা বানিয়েছেন।” (ইবনে মাজা)

অবশ্য অনেক ভাববাদী মনে করতে পারেন এতে দাওয়াতী কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি মনে করি সামাজিক সম্পর্কটাই একটা বাস্তব দাওয়াহ। এই দাওয়াহ মানুষ আপন পরিবেশে পেয়ে থাকে। ইসলাম কেবল বুলি নয়। দাওয়াহ অর্থ মানুষের সমস্যার সাথে একাত্ম হওয়া, এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। ইমাম হাসান আল বান্নাহ (র) এ ব্যাপারে সচেতন ছিলেন বলে ইসলামী আন্দোলনের সমাজ সেবা বিভাগ খুলেছিলেন সর্বত্র। তিনি মনে করতেন মুসলমানকে যেমন সালাতের মাধ্যমে ইবাদতের তাগিদ দেয়া হয়েছে : “হে বিশ্বাসিগণ, তোমরা রুকু কর, সিজদা কর এবং তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর ও সৎকাজ কর যাতে সফলকাম হতে পার এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে যেভাবে করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি।” (২২ : ৭৭-৭৮)

উপরিউক্ত আয়াত মুসলিম জীবনের ত্রিমুখী ভূমিকার সংজ্ঞা দিয়েছে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক হচ্ছে ইবাদতের মাধ্যমে তার সেবা; সামাজিক ভূমিকা হচ্ছে দাতব্য কাজের মাধ্যমে সমাজের সেবা; বাতিল শক্তির সাথে সম্পর্ক হচ্ছে তার বিরুদ্ধে জিহাদ চালানো। এরপরেও হয়তো ভাববাদীরা আগে ভাগে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথাই বলবে এই যুক্তিতে যে, এটা হয়ে গেলে তো সব সমস্যারই সমাধান অটেমেটিক হয়ে যাচ্ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা  তো সমগ্র উম্মাহর দায়িত্ব। এজন্যে তো সময় ও অধ্যবসায় প্রয়োজন। এই প্রিয়তম উদ্দেশ্য অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত তো আমাদেরকে সমাজের সেবা ও উন্নতির চেষ্টাও করতে হবে। এই তৎপরতা একাধারে ভবিষ্যত বংশধরদের গঠন, প্রস্তুতি ও উম্মাকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতারও পরীক্ষা। এটা হচ্ছে এই রকম যে, একজনের এক্ষুণি চিকিৎসা দরকার, কিন্তু একজন ইসলামী ডাক্তার ইসলামী রাষ্ট্রের ইসলামী হাসপাতাল ছাড়া রোগীর চিকিৎসা করতে নারাজ। অতএব ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম না হওয়া পর্যন্ত সমাজ বা মানবতার সেবা কিংবা কোনো বিতর্কিত বিষয়ের মীমাংসা স্থগিত রাখার যুক্তি হাস্যকর।

পক্ষান্তরে মুসলমানের আসল কর্তব্য যেভাবে হোক, যতটুকু হোক, সাধ্য মতো অন্যায়-অনাচারের উৎপাটনে  ও সৎকর্মে প্রবৃত্ত হওয়া। কুরআন বলছে : “তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর।” (৬৪ : ১৬)

কাঙ্খিত ইসলামী রাষ্ট্রের রূপ সম্পর্কে আমার ধারণা: একটি জলপাই ও খেজুর গাছের বাগান ফল উৎপাদনে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময় নেয়। এর অর্থ কি এই যে বাগানের মালিক আর কোনো উৎপাদনমুখী কাজের চেষ্টা না করে জলপাই ও খেজুর ফলনের আশায় বসে থাকবে, এটা কি যুক্তিসঙ্গত? তাকে জীবিকার্জনের জন্যে অন্য কাজও করতে হবে, সেই সাথে কাঙ্খিত ফলের জন্যে জলপাই ও খেজুর গাছেরও যত্ন নিতে হবে।

ঙ. তরুণদের প্রতি আমার সর্বশেষ পিতৃ স্নেহসুলভ উপদেশ হচ্ছে : হতাশার শৃঙ্খল থেকে নিজেদের মুক্ত করুন এবং মুসলমানদের মধ্যে নির্মল ও সচ্চরিত্রের নমুনা হোন। অবশ্য এই আশাবাদের জন্যে আরো কয়েকটি বিষয়ে সচেতন দৃষ্টি দিতে হবে:

প্রথম : মানুষ ফেরেশতা নয়। পিতা আদম (আ)-এর মতো তারাও ভুল করতে পারে। আল-কুরআন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, “আমি তো আগেই আদমের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, আমি তাকে সংকল্পে দৃঢ় পাইনি।” (২০ : ১১৫)

মানুষের ভ্রান্তি প্রবণতা ও প্রবৃত্তির প্রতি প্রলোভন স্বীকার করে নিলে আমরা অন্যের ভুল ত্রুটির প্রতি সহনীয় ও সহৃদয় মনোভাব পোষণের পাশাপাশি তাদেরকে আল্লাহ ক্রোধ ও শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করতে পারবো এবং তার প্রতি আল্লাহর ক্ষমারও আশা করতে পারব। আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে উদ্দেশ্য করে বলছেন : “বল, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের ওপর যুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৩৯ : ৫৩)

উক্ত আয়াতে ‘আমার’ বান্দা বলার মাধ্যমে বান্দাদের জন্যে আল্লাহর উদ্বেগ ও দয়ার চিত্রই ফুটে উঠেছে।

দ্বিতীয় : এটা বোঝা আবশ্যক যে, মানুষের মনের গহীনে কী আছে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ আর জানেন না। অতএব তার বক্তব্যের আলোকে তাকে বিচার করতে হবে। তাই কেউ যদি কালিমা পাঠ করে তাহলে তাকে মুসলমান হিসেবেই গণ্য করা উচিত। এটাও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাহ। তিনি বলেন “আমি আদেশ প্রাপ্ত হয়েছি (আল্লাহর দ্বারা) সেই সব লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার যতোক্ষন না তারা স্বীকার করবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল এবং সুচারুরূপে নামায পড়বে, যাকাত দেবে। তারা সকলে যদি এরূপ করে তারা আমার কাছ থেকে (ইসলামী আইনপ্রদত্ত শাস্তির বিধান ব্যতীত) জীবন ও সমাজ রক্ষা করে এবং আল্লাহ তাদের হিসাব নেবেন।”

এ কারণেই তিনি মুনাফিকুনকে শাস্তি দেননি অথচ তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, তারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তাদেরকে হত্যা করার পরামর্শ এলে তিনি বলেন: “আমি ভয় করি লোকে বলবে যে, মুহাম্মদ (সা) তাঁর সাহাবীদের হত্যা করে।”

তৃতীয় : আমাদেরকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস করে, সে যতো খারাপ করুক একেবারেই জন্মগতভাবে ভালোশূন্য হতে পারে না। বড় ধরনের পাপ করলে সে একেবারে ঈমানশূন্য হয়ে যায় না যতোক্ষণ না সে ইচ্ছাকৃত আল্লাহকে অস্বীকার করে ও তাঁর আদেশ অবজ্ঞা করে। রাসূলুল্লাহ (সা) পাপাচারীকে চিকিৎসার দৃষ্টিতে দেখতেন যেমন রোগীকে দেখা হয়। পুলিশের মতো তিনি অপরাধীকে দেখতেন না। ইনশাআল্লাহ নিচের ঘটনা থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে:

একজন কোরায়শী যুবক একদিন রসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চাইল। সাহাবীরা ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হলেন; কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শান্ত সমাহিত চিত্তে তিনি যুবকটিকে তার আরো কাছে আসতে বললেন। তারপর বললেন,“তুমি কি তোমার মায়ের জন্যে এটা (ব্যভিচার) মেনে নেবে?” যুবকটি জবাব দিল, “না।” রাসূল্লাহ (সা) বললেন, “(অন্য) লোকেরাও তাদের মায়েদের জন্যে এটা অনুমোদন করবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) বারবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন সে তার কন্যা, বোন ও চাচীর জন্যে এটা অনুমোদন করবে না।” তারপর তিনি যুবকটির হাত ধরে বললেন, “আল্লাহ তার (তরুণের) পাপ মার্জনা করুন, তার অন্তর পবিত্র করুন এবং তাকে সহিষ্ণু করুন (তার এই কামনার বিরুদ্ধে)।” (আহমদ, তাবারানী) এই সহৃদয় অনুভূতি সুস্পষ্ট সদিচ্ছা ও মানুষের জন্মগত সুমতির প্রতি আস্থার পরিচায়ক যা মানুষের খারাপ বৃত্তিগুলোকে বিদূরিত করতে সক্ষম। আর খারাপ প্রবৃত্তি ক্ষণস্থায়ী। সুতরাং তিনি ধৈর্যের ও যুক্তির সাথে তার সাথে আলাপ করে তার ভুল চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। চরমপন্থীরা যুক্তি দেখাতে পারে যে, যুবকটি যেহেতু ব্যভিচার করেনি তাই তার প্রতি উদারতা দেখানো হয়েছে। তাহলে আরো একটি উদাহরণ দেখা যাক: এক মহিলা ব্যভিচারিণী গর্ভবতী হয়ে রাসূলুল্লাহর (সা)-এর কাছে এসে দোষ স্বীকার করে তাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলে পাপমুক্ত করার জন্যে বারবার চাপ দিতে লাগলো। তাকে পাথর মারার সময় খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা) তাকে অভিশাপ দিচ্ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে বললেন, “খালিদ নম্র হও। যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, সে এমন অনুশোচনা করেছে যে, এমনকি একজন দোষী খাজনা আদায়কারীও যদি অনুতপ্ত হতো তবে তাকেও ক্ষমা করা হতো।” (মুসলিম ও অন্যান্য)

কেউ কেউ যুক্তি দেখাবেন মহিলাটি পাপ করেই অনুতাপ করেছে। তাহলে আরো একটি উদাহরণ দিচ্ছি : রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবদ্দশায় একজন মদ্যপায়ীকে বার বার রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে আনা হলো এবং বার বার তাকে শাস্তি দেয়া হলো, কিন্তু সে নেশা করতেই থাকলো। একদিন যখন তাকে একই অভিযোগে আবার হাযির করে তাকে বেত্রাঘাত করা হলো তখন এক ব্যক্তি বললো, “আল্লাহ তাকে অভিশপ্ত করুন! কতোবার তাকে শাস্তি দেয়ার জন্যে আনা হলো?” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তাকে অভিশাপ দিও না, আল্লাহর শপথ, আমি জানি সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে।” রাসূলুল্লাহ (সা) আরো বলেন, “তোমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে শয়তানকে সাহায্য করো না।” রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে অভিশাপ দেয়া থেকে বারণ করলেন এ কারণে যে, এতে ঐ মানুষটি এবং তার মুসলিম ভাইয়ের মধ্যে মনোমালিন্য ও রেষারেষি সৃষ্টি করতে পারে কারণ-তার পাপ তাকে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। উপরিউক্ত ঘটনাবলী গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা বুঝতে পারব যে, মানুষের অন্তর্নিহিত সুকৃতির প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কী গভীর অন্তর্দৃষ্টি ছিল। অতএব যেসব চরমপন্থী কেউ ভুল করলেই তাকে নির্বিচারে কুফর-শিরকের ফতোয়া দেয়, তা তাদের সম্পূর্ণ অজ্ঞতাপ্রসূত। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি একদা বলেছিলেন : “অন্ধকারকে অভিশাপ দেয়ার পরিবর্তে রাস্তায় একটি মোমবাতি জ্বালানোর চেষ্টা করো।”

এই হচ্ছে আমার প্রিয় তরুণ মুসলমানদের প্রতি উপদেশ। আমার উদ্দেশ্য কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হযরত শুয়াইব (আ)-এর ভাষায়: ‘আমি আমার সাধ্য মতো সংস্কার করতে চাই। আল্লাহর মদদেই কিন্তু কাজসম্পন্ন হয়; আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী।’ (১১: ৮৮)

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
558085_3233974682804_1069783068_2961157_452771132_n

মুসলিম তরুণদের প্রতি উপদেশ (পর্ব-২)

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | জুলাই ১২, ২০১৪
Download PDF

মুসলিম তরুণদেরকে গোঁড়ামি ও বাড়াবাড়ি পরিহার করতে হবে। একজন মুসলিম ঈমানে-আমলে সতর্ক হবে; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ধর্মীয় সহজ বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে ধর্মকে  স্রেফ একটি কঠোর সতর্কবাণীতে পরিণত করবে। কুরআন, সুন্নাহ, রাসূলুল্লাহ (সা)  ও তাঁর সাহাবীরা বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন: কেননা বাড়াবাড়ি আমলের বিষয়গুলোকে ঈমানদারদের জন্যে কষ্টকর করতে পারে। এ প্রসঙ্গে সিয়াম, পাকসাফ, বিবাহ ও কিয়াস সংক্রান্ত কুরআনের আয়াতগুলো লক্ষণীয়:

“আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান এবং যা তোমাদের জন্য কঠিন তা চান না।” (২:১৮৫)

“আল্লাহ তোমাদেরকে কষ্ট দিতে চান না।” (৫ : ৬)

“আল্লাহ তোমাদের ভয়ের লঘু করতে চান, মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই দুর্বল।” (৪ : ২৮)

“হে ঈমানদারগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে। মুক্ত ব্যক্তির বদলে মুক্ত ব্যক্তি, ক্রীতদাসের পরিবর্তে ক্রীতদাস ও নারীর পরিবর্তে নারী। কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কিছুটা ক্ষমা করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও সততার সাথে তার প্রাপ্য আদায় বিধেয়। এটা তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ।” (২ : ১৭৮)

রাসূলের সুন্নায়ও নমনীয়তা ও ভারসাম্যের পক্ষে ও বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছে : “ধর্মে বাড়াবাড়ি থেকে সাবধান। তোমাদের পূর্বের (জনগোষ্ঠী) বাড়াবাড়ির জন্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।” (আহমদ, নাসাঈ, ইবনে মাজা) তারা ধ্বংস হয়েছে যারা চুল ছেঁড়াছেঁড়িতে লিপ্ত এবং রাসুলুল্লাহ (সা) এ হাদীসটি তিনবার উচ্চারণ করেন। (মুসলিম)

এছাড়া আবু হুরায়রাহ (রা) বর্ণনা করেন, “একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রসাব করেছিল। লোকজন তাকে মারতে গেল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে আদেশ দিলেন, “তাকে ছেড়ে দাও (প্রসাবের জায়গায়) এক বালতি অতবা এক গালমা পানি ঢেলে দাও। তোমাদেরকে সব কিছু সহজ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠিন করার জন্য নয়।” (বুখারী)

এটা সত্য যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সব সময় দু’টির মধ্যে সহজটিকে বেছে নিতেন যদি তা পাপ না হয়। যখন জানতে পারেন যে, মুয়াজ (রা) নামায দীর্ঘায়িত করেন, তখন তিনি মুয়াজ (রা)-কে বলেন, “হে মুয়াজ! তুমি কি মানুষকে পরীক্ষা করছ?” (বুখারী)

রাসূলুল্লাহ (সা) একথা তিনবার বললেন, “কেউ যদি কঠোরতর মাধ্যমে উৎকর্ষ অর্জনে আগ্রহী হয় তবে সে করতে পারে, কিন্তু অন্যকে বাধ্য করতে পারে না। এটা করতে গিয়ে সে অবচেতনভাবে অন্যকে ধর্ম থেকে সরিয়েও দিতে পারে।” রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপরেই জোর দিয়েছেন। এজন্যে রাসূলুল্লাহ (সা) একাকী নামায দীর্ঘায়িত করতেন, কিন্তু ইমামতির সময় সংক্ষিপ্ত করতেন। এ সংক্রান্ত একটি হাদীস ইতিপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে।

মুসলিম (র) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইমামতির সময় কুরআনের ছোট ছোট আয়াত পড়তেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) সহিষ্ণুতার নিদর্শন হিসেবে একাদিক্রমে রোযা রাখার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন। কিন্তু লোকেরা তাঁকে বলল, “আপনি এরূপ করেন।” তিনি বলেন, “আমি তোমাদের মতো নই, আমার ঘুমের মধ্যে আমার প্রভু আমাকে খাদ্য ও পানীয় দান করেন।” ধর্মীয় বিষয়গুলো সহজরূপে তুলে ধরা এখন আগের চেয়েও বেশি প্রয়োজন। আমরা যে যুগে বাস করছি, সে যুগটি পাপপূর্ণ বস্তুবাদে নিমজ্জিত। এর মধ্যে ধর্মপালন দুঃসাধ্য বটে। এজন্যেই ফুকাহা কঠোরতার পরিবর্তে নমনীয়তার সুপারিশ করেছেন। দাওয়াতী কাজে কি পদ্ধতি অবলম্বন করা দরকার তা আগেই উল্লেখ করেছি। কুরআন বলছে : “তুমি মানুষকে তোমার প্রভুর পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সদ্ভাবে।” (১৬ : ১২৫)। স্পষ্টত উক্ত আয়াতে শুধু মধুর কথা নয় সদয় অভিব্যক্তির কথাও বলা হয়েছে। এই লক্ষ্যে প্রথমে মতানৈক্যে নয়, মতৈক্যের সূত্র ধরে আলোচনা শুরু করতে হবে। আল কুরআন বলছে : “তোমরা উত্তম পন্থা ব্যতীত আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না, তবে তাদের সাথে করতে পার, যারা তাদের মধ্যে সীমালংঘনকারী এবং বলো, আমাদের প্রতি ও তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস করি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ তো একই এবং আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী। (২৯ : ৪৬)

কোনো মতানৈক্যের বিষয় থেকে গেলে তা আল্লাহ স্বয়ং বিচার করবেন, “যদি তারা তোমার সাথে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয় তবে বলো: “তোমরা যা কর সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক অবহিত। তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ কিয়ামতের দিনে আল্লাহ পাক সে বিষয়ে তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন।: (২২ : ৬৮-৬৯)

এই যদি অমুসলমানদের সাথে আচরণের পদ্ধতি হয় তাহলে মুসলমানের সাথে মুসলমানের  কথাবার্তা কি রকম হওয়া উচিত। আমরা তো অনেক সময় আচার-আচরণে ‘আন্তরিক’ ও ‘কর্কশে’র  তফাতও ভুলে যাই। প্রকৃত দাইয়াকে মধুর ভাষণ ও সদয় অভিব্যক্তি দিয়ে দাওয়াতী কাজ চালাতে হবে। এমন প্রমাণ আছে যে, কর্কশ আচরণের ফলে আসল বিষয় বিকৃত বা বিলীন হয়ে গেছে। এগুলো থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। এজন্যেই বলা হয়েছে : ‘যে ভাল পথের আদেশ করে সে যেন তা ঠিক পথে করে।’

ইমাম গাজ্জালী (র) তাঁর ‘আমরু বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার বইয়ে লিখেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভাল কাজের আদেশ দেয় এবং নিষেধ করে খারপ কাজ থেকে তার ধৈর্য, সহানুভূতি, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকতে হবে।’ প্রসঙ্গত তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। একবার এক ব্যক্তি খলীফা আল-মামুনের দরবারে এসে কর্কশ ভাষায় পাপ পুণ্য বিষয়ক পরামর্শ দান শুরু করল। ফিকাহ সম্পর্কে আল-মামুনের ভাল জ্ঞান ছিল। তিনি লোকটিকে বললেন, ‘ভদ্রভাবে কথা বলো। স্মরণ করো আল্লাহ তোমার চেয়েও ভাল লোককে আমার চেয়েও একজন খারাপ শাসকের কাছে পাঠিয়েছিলেন এবং তাকে  নম্রভাবে কথা বলার আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি মূসা (আ) ও হারুন (আ)-কে যারা তোমার চেয়ে ভাল ফিরাউনের-যে আমার চেয়েও খারাপ ছিল-কাছে পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁদেরকে আদেশ দিয়েছিলেন : ‘তোমরা দু’জন ফিরাউনের কাছে যাও, সে সকল সীমালংঘন করেছে, কিন্তু তার সাথে নম্রভাবে কথা বলো। হয়তোবা সে হুঁশিয়ারির প্রতি কর্ণপাত করবে অথবা (আল্লাহ্কে) ভয় করবে।” (২০ : ৪৩-৪৪)

এভাবে মামুন তর্কে জয়ী হলেন। আল্লাহ পাক মূসা (আ)-কে ভদ্র ভাষায় ফিরাউনের কাছে দাওয়াত পেশ করার শিক্ষা দিয়েছেন।

মূসা (আ) ও ফিরাউনের মধ্যেকার সংলাপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ফিরাউনের ঔদ্ধত্য, নিষ্ঠুরতা ও লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সত্ত্বেও মূসা (আ) অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দাওয়াত পেশ করেছেন। সূরা আশশূরায় এ বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়।

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবন ও সুন্নাহ অধ্যয়ন করলেও আমরা দেখি দয়া, মায়া, নম্রতা-সেখানে কর্কশতা ও কঠোরতার কোনো অবকাশ নেই। তাই কুরআন বলছে : “এখন তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল এসেছেন। তোমরা ধ্বংস হয়ে যাও এটা তাঁর জন্যে বেদনাদায়ক এবং তিনি তোমাদের ব্যাপারে খুবই উদ্বিগ্ন। তিনি ঈমানদারদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও করুণাশীল।” (৯ : ১২৮)

সাহাবীদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে কুরআন বলছে : “আল্লাহ দয়ায় তুমি তাদের প্রতিকোমল হৃদয় হয়েছ, তুমি যদি দৃঢ় ও কঠোর হৃদয় হতে তাহলে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে যেতো।” (৩ : ১৫৯) একদিন একদল ইহুদী এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে সম্ভাষণ জানাল, “আস সামু আলাইকুম’ যার আক্ষরিক অর্থ ‘আপনার মৃত্যু হোক।’ হযরত আয়েশা (রা) ক্রুদ্ধ হয়ে জবাব দিলেন, ‘আলাইকুমুস সামু ওয়া আলানাহ” অর্থাৎ “তোমাদেরও মৃত্যু হোক, অভিশপ্ত হও তোমরা।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) কেবল বললেন, ওয়া আলাইকুম (তোমাদের ওপরেও)” তারপর আয়েশা (রা)-কে লক্ষ্য করে বললেন, “যে সকল বিষয়ে দয়া করুণা করে আল্লাহ তাকে ভালবাসেন।” (সকল প্রামাণ্য সূত্রে সমর্থিত)  তিনি আরো বললেন, ‘দয়া সব কিছু সুন্দর করে। হিংসা সেগুলোকে ত্রুটিপূর্ণ করে।” (মুসলিম)

জুবায়ের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছেন: “যে কোমলতা থেকে বঞ্চিত সে সকল ভাল থেকে বঞ্চিত।” (মুসলিম) সকল ভাল থেক বঞ্চিত হওয়ার চেয়ে বড় শাস্তি আর কী থাকতে পারে!

আশা করা যায়, উপরের উদ্ধৃতিগুলো আমাদের বাড়াবাড়ি পরিহার করে প্রজ্ঞার পথে চালিত হওয়ার জন্যে যথেষ্ট।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
558085_3233974682804_1069783068_2961157_452771132_n

মুসলিম তরুণদের প্রতি উপদেশ (পর্ব-১)

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | জুলাই ১২, ২০১৪
Download PDF

‘আলউম্মাহ’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আমার প্রবন্ধে আমি মুসলিম তরুণদের পুনর্জাগরণের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। তাতে আমি পরিশেষে দু’টি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছি।

প্রথম : এই পুনর্জাগরণ একটি স্বাভাবিক ও সুস্থ চেতনার ইঙ্গিতবাহী। এর মাধ্যমে আমরা প্রকৃতি  ও মূলের দিকে অর্থাৎ ইসলামের দিকে ফিরে যাচ্ছি। ইসলামই হচ্ছে আমাদের জীবনে প্রথম ও শেষ। এখানেই আমরা বিপদে আশ্রয় নিই, এখানে থেকেই আমরা শক্তি সঞ্চয় করি।

আমাদের সমাজ পূর্ব ও পশ্চিমের কাছ থেকে ধার করা মতবাদ দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। কিন্তু আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক উন্নতিসহ সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এখন আমাদের জনগণ ইসলামের অনিবার্য সমাধানের বিশ্বাস করে অর্থাৎ জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী শারীয়াহর বাস্তবায়ন চায়। অতএব এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, মুসলিম তরুণদের সাহস ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

দ্বিতীয় : আমাদের কিছু কিছু তরুণদের মধ্যে যে গোঁড়ামি রয়েছে তা হিংসা ও হুমকি দিয়ে পরিশুদ্ধ করা যাবে না। আল্লাহর দ্বীনের প্রতি এদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় আমাদের কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে তাদের সাথে মেলামেশা করে তাদের মন-মানসিকতা উপলব্ধি করা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে উদ্যোগী হওয়া।

আমি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মুসলিম তরুণদের এ ব্যাপারে অনেক উপদেশ দিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, ঈমানদারদের একে অপরের সাথে সর্বদা পরামর্শ করা উচিত এবং ধৈর্যের সাথে সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং অসৎ ও অবাঞ্ছিত কাজ থেকে বিরত থাকা। ইহলৌকিক ও পরলৌকিক জীবনে পুরস্কার লাভের জন্যে এটি আবশ্যকীয় শর্ত। নিচে আমি আরো কিছু উপদেশ দিচ্ছি:

আমরা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের যুগে বাস করছি। জ্ঞানের একটি শাখায় ব্যুৎপত্তির মানে আরেকটি শাখায়ও পারদর্শী হওয়া নয়। যেমন একজন ইঞ্জিনিয়ারের সাথে চিকিৎসা বিষয়ে পরামর্শ করা যায় না অথবা একজন চিকিৎসকের সাথে আইনের পরামর্শ চাওয়া হাস্যকর। অতএব শারীয়াহর জ্ঞানও সকলের সমান মনে করা ভুল। এটা ঠিক যে, ধর্মীয় জ্ঞানে শ্রেণী বিশেষের একচেটিয়া অধিকার ইসলাম স্বীকার করে না, যেমন খৃস্টানরদন যাজক গোষ্ঠী রয়েছে বা হিন্দুদের ব্রাহ্মণবর্গ। কিন্তু ইসলামধর্মীয় জ্ঞানে বিশেষজ্ঞদের অস্তিত্ব স্বীকার করে যারা কোনোভাবেই একটি বিশেষ গোষ্ঠী, শ্রেণী বা উত্তরাধিকারসূত্রে বংশগত নয়। বাস্তব কারণেই ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কুরআন বলেছে: “সকল মুমিনকে এক সাথে অভিযানে বের হওয়া উচিত নয়, তাদের প্রতিটি দলের এক অংশ বহির্গত হয় না কেন, যাতে তারা দ্বীন সম্বন্ধে জ্ঞান অনুশীলন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে, যাতে তারা সতর্ক হয়।” (৯: ১২২)

কুরআন ও সুন্নাহর যেসব বিষয়ে আমাদের জ্ঞান নেই তা বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ লোকদের কাছ থেকে শিখতে বলেছে: “তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ মানুষই পাঠিয়েছিলাম, তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।” (২১ : ৭) এবং “যখন শান্তি অথবা শঙ্কার কোন সংবাদ তাদের কাছে আসে তখন তারা তা প্রচার করে থাকে। যদি তারা তা রাসূল অথবা তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী তাদের গোচরে আনত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে তারা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত।” (৪ : ৮৩)

আরেকটি আয়াতে আল্লাহ্ বলেন, “সর্বজ্ঞের ন্যায় তোমাকে কেউই অবহিত করতে পারে না।” (৩৫ : ১৪)

রাসূলুল্লাহ (সা)-কে যখন জানানো হলো যে, একজন আহত ব্যক্তিকে এই ফতোয়া দেয়া হয়েছে যে, অযু ও নামাযের আগে তার গোটা শরীর ধুয়ে ফেলতে হবে, যার ফলে তার মৃত্যু হয়েছে। তখন তিনি বললেন : “তারা তার মৃত্যু ঘটিয়েছে, আল্লাহ তাদেরও মৃত্যু ঘটান। সঠিক জানা না থাকলে তাদের কি জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল না?”

এটা খুব বেদনাদায়ক যে, কোনো কোনো লোক অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও জটিল বিষয়েও ফতোয়া দিতে অভ্যস্ত যা অতীত বর্তমান আলিমদের ফতোয়ার বিরোধী। তারা আগের আলিমদেরকে অজ্ঞ বলতেও কসুর করে না। তারা দাবী করে ইজতিহাদের দরজা সকলের জন্যে খোলা। এটা সত্য, কিন্তু ইজতিহাদের কতকগুলো শর্ত আছে যা এদের মধ্যে নেই। আমাদের পূর্ববর্তীরা তো অনেক বিজ্ঞ লোককেও সতর্ক বিবেচনা ছাড়া তাড়াতাড়ি ফতোয়া দেয়ার জন্যে সমালোচনা করেছেন। তারা বলেন, “কিছু কিছু লোক এত দ্রুত ফতোয়া দেয় অথচ তা হযরত উমার (রা)-এর কাছে পেশ করা হলে তিনি বদরের যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী সকলের সাথে পরামর্শ করতেন এবং তারা আরো বলেন, “তোমাদের মধ্যে যারা ফতোয়া দেয়ার ব্যাপারে দুঃসাহসী তারা দুঃসাহসী (পাপ করে) দোযখে  যাওয়ার ব্যাপারেও।” গভীর জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা জটিল বিষয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করতেন। যেসব ফতোয়া মৌনভাবে দেয়া হতো ইসলামের প্রাথমিক যুগে সেগুলোকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত বলে মেনে নেয়া হতো। কারো কাছে ফতোয়া চাওয়া হলে তারা পারত পক্ষে বিরত থাকতেন। আবার কেউ কেউ জানেন না বলে এড়িয়ে যেতেন।

উতবান ইবনে মুসলিম (রা) বলেন যে, একবার তিনি ৩০ মাস উমর (রা)-এর সঙ্গী ছিলেন। সে সময় উমর (রা)কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় এবং তিনি প্রায়শ বলতেন যে, তিনি জানেন না। ইবনে আবুলায়লা (রা) ১২০ জন সাহাবীর, (এঁদের মধ্যে অধিকাংশই আনসার), সম্পর্কে বলেছেন, “তাঁদের মধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি আরেকজনকে দেখিয়ে দিতেন, তিনিও আরেকজনকে দেখিয়ে দিতেন, তিনিও আরেকজনকে, এভাবে পালাক্রমে চলতো যতোক্ষন না প্রশ্নকর্তা আবার প্রথম ব্যক্তির কাছেই ফিরে যেতো।”

আতা ইবনে আস সাবির (র) বলেন যে, তিনি তার সমসাময়িক অনেককে ফতোয়া দিতে গিয়ে কাঁপতে দেখেছেন। তাবিয়ুনদের মধ্যে সাঈদ ইবনে আল মুসাইয়েব (র)কে  কদাচিৎ ফতোয়া দিতে দেখা গেছে। অথচ তিনি ফিকাহতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। যদি কখনো দিতেনও তাহলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন তাকে রক্ষা করতে যদি তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে  ভুল করে থাকেন এবং তাদেরকেও রক্ষা করতে যারা সেই ফতোয়া অনুসরণ করবে। মাযহাব চতুষ্টয়ের ইমামগণও অনুরূপ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কোনো ব্যাপারে নিশ্চিত না হলে তারাও বলতেন যে, জানি না। ইমাম মালেক (র) বিশেষভাবে সতর্ক ছিলেন। তিনি বলেন, “কাউকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তার ‘জান্নাত ও জাহান্নাম’ সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত এবং  জবাব দেয়ার আগে নিজের পারলৌকিক মুক্তি সম্পর্কে ভাবা উচিত।” ইবনে আল কাসিম (র) ইমাম মালিক (র)কে বলতে শুনেছেন, “আমি একটা বিষয়ে দশ বছর ধরে গবেষণা করছি কিন্তু এখনো মনঃস্থির করতে পারিনি।” ইবনে আবু হাসান (র) বলেন, “মালিককে ২১টি বিষয়ে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল, তিনি মাত্র দু’টির ফতোয়া দিয়েছিলেন। তারপর বার বার বলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সাধ্য বা ক্ষমতা নেই।”

জ্ঞানের অন্বেষা থেকে তরুণদের নিরুৎসাহিত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ করা আমাদের জন্যে ফরয। আমি যা বলতে চাই তা হচ্ছে তাদের জ্ঞান যতোই হোক, বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে তারা বাধ্য। আশ-শারীয়াহর জ্ঞানে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা ও উসুল আছে যা জানা ও বোঝার সময় বা উপায় এই তরুণদের নেই। আমি বলতে চাই যারা কলেজে ভালো লেখাপড়া করে তাদেরকে সেটা ছেড়ে দিয়ে আশ-শারীয়ায় বিশেষজ্ঞ হতে হবে এমন প্রবণতা আমি অনুমোদন করি না। জ্ঞানের অন্বেষা ফরযে কিফায়া-এ বিষয়টি অনেকে বুঝতে চায় না। আরেকটি বিষয় বুঝতে হবে, এখন বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জনের জোর প্রতিযোগিতা চলছে। কোনো মুসলমান যদি আল্লাহর জন্যে বিজ্ঞানে বুৎপত্তি অর্জনের সাধনায় নিমগ্ন হয় সে আসলেই ইবাদাহ ও জিহাদে অংশ নেয়। এখানে স্মর্তব্য, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে ওহী নাযিল হওয়ার কালে তাঁর সাহাবীদের বিভিন্ন পেশা ছিল। তিনি তাদেরকে নিজ নিজ পেশা ত্যাগ করে ইসলাম অধ্যয়নের তাগিদ দেননি; অবশ্য তারা বাদে যাদেরকে এরূপ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল কিংবা যাঁদের এ ব্যাপারে স্বাভাবিক ঝোঁকছিল। আমার ভয় হয় অনেকে হয়তো জনপ্রিয়তা বা নেতৃত্ব লাভের খায়েশে শরীয়ার জ্ঞানে দখল চাইতে পারে। মানুষকে প্রলুব্ধ করার জন্যে শয়তানের বহু রাস্তা আছে। অতএব আমাদের চিন্তা, উদ্দেশ্য ও কৌশল সম্পর্কে সতর্ক পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আত্মপ্রতারণার ফাঁদে পড়ে আমরা স্বচ্ছ চিন্তাকে যেন আচ্ছন্ন করে না ফেলি। আমাদেরকে সর্বদা কুরআনের এই আয়াত স্মরণ করা উচিত : “কেউ আল্লাহ্কে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করলে সে সরল পথে পরিচালিত হবে।” (৩ : ১০১) যেহেতু জ্ঞানের প্রতিটি শাখা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচিতি লাভ করে, অতএব তরুণদেরকে সৎ ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলিম ও ফকীহদের কাছ থেকে ধর্মীয় জ্ঞান হাসিলের উপদেশ দিচ্ছি। তাদের দেয়া ব্যাখ্যা ছাড়া সুন্নাহর ধর্মীয় জ্ঞানের প্রধান উৎস-জ্ঞানের সমৃদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। তাদেরকে অশ্রদ্ধা করা মুর্খতা ও ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কিছুই নয়। যারা আমাদের এই বিজ্ঞ পূর্বপুরুষদের এড়িয়ে নিজেরাই কুরআন-হাদীসে পরাদর্শী হতে চান তাদের ইসলামী শিক্ষার ওপর নির্ভর করা যায় না। একইভাবে যারা উলামা ও ফুকাহার সিদ্ধান্তকে প্রধান অবলম্বন বানায়, কুরআন ও হাদীসকে উপেক্ষা করে, তাদের জ্ঞানের অবস্থাও হৃদয়বিদারক!

আবার অনেক আলিম আছেন যারা সরাসরি কুরআন হাদীসে অধ্যয়ন করেননি, কিন্তু ইসলামের ইতিহাস, দর্শন ও পুঁজিবাদ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ । কিন্তু এরা অন্যকে শরিয়াহ শিক্ষা দেয়া অথবা ফতোয়া দেয়ার যোগ্য নন, কারণ তারা তাদের ভাষণে-বিবরণে প্রায়শ সত্যের সাথে পুরান, বিশুদ্ধকে শুদ্ধ, সারকে অসারের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। তারা এমন ভুল ফতোয়া দিয়ে বসেন যা হয়তো তারা নিজেরাও বোঝেন না।

এছাড়া যার আমল নেই তার শিক্ষা বা নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার নেই। সততা, সাধুতা ও আল্লাহ ভীতি হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানের ফল। কুরআনুল কারীম বলছে, “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই তাকে ভয় করে।” (৩৫ : ২৮)

এরূপ সাধুতা ও আল্লাহ ভয় একজন আলিমকে মুর্খতাসুলভ কাজ এবং শাসক অথবা সরকারের সেবা দাস হওয়া থেকে বিরত রাখে।

বিজ্ঞানের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভারসাম্য। এটা ইসলামরেই অনুপম বৈশিষ্ট্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দু’টি প্রান্তিক প্রবণতা আমাদের রয়েছে: চরমপন্থা, শিরক, অবহেলা, গোঁড়ামি কিংবা বিচ্ছিন্নতা। আল-হাসান আল-বসরী (র) সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, “চরমপন্থী উদাসীনদের কার্যকলাপের দরুণ ধর্ম হারিয়ে যাবে।” প্রথমোক্ত দল সবকিছু নিষিদ্ধ করবে আর শেষোক্ত দল সবকিছু বৈধ করবে। প্রথম পক্ষ মাযহাব মানবে কিন্তু ইজতিহাদের দরজা রুদ্ধ করে দেবে। দ্বিতীয় পক্ষ মাযহাব অস্বীকার করে তার সকল নীতি খন্ডনে প্রয়াসী হবে। এছাড়া আরেক দল কুরআন-হাদীসের আক্ষরিক অর্থ মেনে চলতে চায়। যা হোক দুই চরমের মাঝে আসল ইসলাম হারিয়ে যায়। অতএব আমাদের দরকার ভারসাম্যময় সাধু ও সৎ চরিত্রের অধিকারী ফকীহ যারা সুচিন্তিতভাবে যুগের চাহিদাকে সামনে রেখে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রায় দেবেন যা সাধারণ মানুষের জন্যে কল্যাণকর হবে। ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী বলেন, “সুস্পষ্ট যুক্তির ভিত্তিতে কোনো কিছুকে বৈধ করা জ্ঞানের পরিচায়ক, আর গোঁড়ামি তো যে কেউ নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারে।”

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
hadith selection

হাদীস চয়নের তিনটি নিয়ম

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | জুলাই ১২, ২০১৪
Download PDF

ইসলামে কুরআনের পরেই দ্বিতীয় উৎস হল সুন্নাহ। সুন্নাহর নির্দেশনা আকীদা, আমল, শরীয়াহ ও আখলাকে গ্রহণ ও প্রয়োগ করতে হবে। এক কথায় সুন্নাহ হল ইসলামী শরীয়তের অপরিহার্য উৎস।

যখন শরীয়ার কোন বিধান প্রণয়নে সুন্নাহকে উদ্ধৃত করা হয় তখন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবেঃ

১. হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাই করতে হবে এবং মুহাদ্দিসগণের দেয়া মানদন্ডের বিচারে তা পর্যালোচনা করতে হবে।

২. যে প্রেক্ষিতে এটি উদ্ধৃত করা হয়েছে হাদীসটি প্রকৃতপক্ষে সে অর্থই বুঝায় কিনা তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিছু লোক আছে যারা হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করে এবং হাদীসের এমন সব অর্থ দাঁড় করায় যা কখনোই হাদীসে বলা হয়নি কিংবা ইংগিতও দেয়া হয়নি। তারা শব্দের বিকৃত উপস্থাপনার মাধ্যমে এমন উপসংহার টানেন। অন্যদিকে কিছু কট্টরপন্থী আছে যারা হাদীসকে আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শরীয়াহর উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) বা তার সাধারণ মূলনীতিসমূহের প্রতি কোন দৃষ্টিপাতই করে না।

৩. নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যে হাদীস উদ্ধৃত করা হয়েছে তার বিপরীতে এমন কোন প্রমাণ নেই যার জন্য ঐ হাদীসটির ভাবগত ব্যাখ্যার দরকার, যা কোন সাধারণ (আম) বিষয়কে নির্দিষ্ট (খাস) করে দেয়, শর্তহীন (মুতলাক) বিষয়কে শর্তযুক্ত (মুকাইয়্যাদ) করে এবং মানসূখ (রদ) হাদীস প্রয়োগের শর্ত পরিবর্তন করে দেয়। উপস্থাপিত প্রমাণটি অবশ্যই প্রাসঙ্গিক বা যৌক্তিক হতে হবে। উপস্থাপিত প্রমাণটি হতে পারে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক অথবা উসূলী যুক্তিভিত্তিক যা কুরআন, সুন্নাহ অথবা শরীয়াহর মূলনীতি থেকে উৎসরিত অথবা হতে পারে প্রাসংগিক ঐতিহাসিক কিংবা সাম্প্রতিক কোন নিশ্চিত সত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত।

উল্লেখিত তিনটি বিষয় বুঝতে হলে হাদীসশাস্ত্রের শাখা-প্রশাখা, এর উৎসসমূহ এবং মুহাদ্দিসগণের রেখে যাওয়া জ্ঞানভাণ্ডার সম্বন্ধে গভীর জ্ঞান রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি সুন্নাহর প্রকৃত অনুধাবনের জন্য শরীয়াহর উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) ও তার সাধারণ মূলনীতি যা কুরআনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা (কাতঈ) থেকে পাওয়া যায় সে সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা প্রয়োজন। এছাড়াও আরবী ভাষা ও তার অর্থ নির্ণয়ে পারদর্শিতা থাকা দরকার। এক্ষেত্রে উসূল আল-ফিকাহ, উসূল আত-তাফসীর এবং উলুম আল-কুরআন এর গভীর অধ্যয়ন প্রয়োজন। এসব বিষয়সমূহ কুরআন এবং সুন্নাহর বোঝাপড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সূত্রঃ OnIslam.net এ প্রকাশিত “আল মারজিয়াতুল ‘উলিয়াহ ফিল ইসলাম লিল ক্বুরআন ওয়া সুন্নাহ” গ্রন্থ থেকে নেওয়া অংশবিশেষের ইংরেজী অনুবাদ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather