All posts by মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ

muslim-couple-and-sunset

বিবাহিত জীবনকে সুখী করার উপায় (পর্ব-২)

মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ | নভেম্বর ১২, ২০১৪
Download PDF

৪. অসুখী দাম্পত্য জীবনে কীভাবে সুখ ফিরিয়ে আনা যায়?

কাজটা নিঃসন্দেহে অত্যান্ত কঠিন, কারণ এর জন্য একটা পূর্বশর্ত আছে। আপনি যদি সেই পূর্বশর্তটা পূরণ করতে পারেন তাহলে অবশ্য বেশ সহজ। শর্তটা হচ্ছে, ‘আপনি কি সত্যিই চান আপনার দাম্পত্য জীবন সুখের হোক?’ কথাটি শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু আমি আমার দীর্ঘ কাউন্সেলিং জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সংসারে অশান্তির প্রধান কারণই হচ্ছে নিজেরা সত্যিকার অর্থে সুখ না চাওয়া। জীবনকে সুখময় করার ব্যাপারে তারা কেউই সচেতন ছিল না; বরং কেবল নিজেকে বা অন্যকে সন্তুষ্ট করার জন্য কিছু একটা করে বুঝ দিতে চাইছিল যে ‘তারা চেষ্টা করছে’। বাস্তবে কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা; কেননা তারা কখনোই সত্যিকার অর্থে চেষ্টা করেনি। তারা অসমাপ্ত একটা নাটকে অভিনয় করে চলেছিল মাত্র।

  আপনি যদি আন্তরিকভাবে পরিবর্তন চান তাহলে আপনার জীবনসঙ্গী যা যা পছন্দ করে তার একটা তালিকা করে ফেলুন। বিয়ের প্রথম দিকে তার কী কী গুণ আপনার যথেষ্ট পছন্দের ছিল নিশ্চয়ই মনে আছে সেগুলো? আপনি তা লিখে ফেলুন। একই সাথে সমস্যার বিষয়গুলোও লিখুন। সাধানণত এটা ম্যাজিকের মতো কাজ করে। যখন ভালো গুণগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করি না এবং অবদানগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ হই না, তখন দাম্পত্য সম্পর্কে চিড় ধরাটাই নিয়তি। আমি প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, ‘দিনে কতবার আপনারা ধন্যবাদ জানান? দিনে ক’বার তাকে জড়িয়ে ধরেন, চুমু খান? দিনে কতবার তাকে বলেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি?’

  অদ্ভুত একটা বিষয় হলো, আমরা জীবনসঙ্গীর কাজকে কমই মূল্যায়ন করি। অনেকেই মনে করেন, সমালোচনা না করাটাই যেন কাজের মূল্যায়ন। এমন চিন্তা একটি মারাত্মক ভুল। কারও কাজের সত্যিকার মূল্যায়ন করা মানে, সে আপনার জন্য যা করেছে তার সবকিছুর জন্য প্রত্যক্ষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়।’ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা একটি সুন্দর দাম্পত্য জীবনের প্রাণ। মনে রাখবেন, নিয়মিত এ কাজটা করা একটি দারুন ব্যাপার। কোনো সমস্যা হলে তা বলতে যদি আমরা দেরি না করি তাহলে সবকিছু সুন্দরভাবে চললে তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কেন কার্পণ্য করব?

৫. মনের মানুষ বলতে কি কিছু আছে?

আত্মার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, আপনাআপনি সৃষ্টি হয় না; একটু করে যত্নের সাথে গড়ে তুলতে হয়। কখনো এজন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে তাদের আপনি দেখবেন যে, তারা হয়তো কোনো বিষয় নিয়ে মুচকি হেসে যাছে, কী কারনে তারা দুজন হাসছে তা কেবল তারাই বুঝতে পারে। হয়তো দেখবেন তারা এমন একটা ভাষায় কথা বলছে যা কেবল তারাই বুঝতে পারছে। তাদের কথাগুলো হয়তো অন্যদের কাছে একেবারেই সাধারণ মনে হয়, কিন্তু তা তাদের পরস্পরের হৃদয় ছুয়ে যায়। এটা যদি আপনি গড়ে তুলতে পারেন তাহলে ৩০ বছর পরেও দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে প্রেমে পড়বেন বারবার। হাসির ব্যাপারটাও এমনই গুরুত্বপূর্ণ। হাসির কিছু পেলে সেটা অন্যজনকে জানান, যেন সে-ও আনন্দ পায়। এই আনন্দ ভাগাভাগির মাঝেই এক ধরনের নির্মল আনন্দ রয়েছে।

৬. সুখী দাম্পত্য জীবনের পেছনে কী কী বিষয় ভূমিকা রাখে?

আবারও বলছি, সত্যবাদিতা, যত্নবান হওয়া এবং পারস্পরিক সম্মানবোধই হলো দাম্পত্য-সুখের মূলসূত্র। প্রতিটি কাজ এবং উদ্যোগকে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে। আপনি কি সত্যবাদী? জীবনসঙ্গীর প্রয়োজনকে কি আপনার নিজের প্রয়োজন হিসেবে দেখেন? আপনি তার জন্য অন্তরে যে সম্মান বোধ করেন তা কি প্রকাশ করেন? আমার স্পষ্ট মনে পড়ে আমার দাদা-দাদির কথা। প্রত্যেক বেলায় দাদি আমার দাদাকে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করতেন।

তিনি দাদার প্লেটে নিজ হাতে খাবার তুলে দিতেন, তার পছন্দের গোশের টুকরোটা বেছে দিতেন, খেয়াল করে দেখতেন তার কী প্রয়োজন; চাওয়ার আগেই তিনি তা প্লেটে তুলে দিতেন। বিশেষ কোনো কারণ না ঘটলে তিনি প্রতিবেলায় দাদার সাথে খেতে বসতেন। ঘরে একধিক কাজের লোক থাকা সত্ত্বেও কারও অনুমতি ছিল না দাদার খাবার পরিবশনের। তারা ট্রে নিয়ে দাদির সামনে হাজির করত, দাদি সেখানে থেকে তুলে দাদাকে পরিবেশন করতেন। এই কাজগুলো করার সময় যে ভালোবাসা আর আন্তরিকতার ছাপ তার চোখে-মুখে ফুটে উঠত, আজ ৪০ বছর পর এবং তাদের দুজনের মৃত্যুর ২৫ বছর পরও আমার মনে স্পষ্ট গেঁথে আছে। দাদি কেমন করে এ কাজগুলো করতেন? কারণ তিনি এই কাজগুলো করতে পছন্দ করতেন।

  দাদাও এই ভালোবাসার বিনিময় দিতে কার্পণ্য করতেন না। তিনি প্রায় সব ব্যপারেই দাদির সাথে পরামর্শ করতেন। কোথাও গেলে দাদিকে সাথে নিয়ে যেতেন। দাদির পছন্দ অনুযায়ী কাপড়চোপড় পরতেন। দাদি ছিলেন দাদার চেকবইবিহীন ব্যাংক। তিনি সে টাকাপয়সা নিয়ে কখনো প্রশ্নও করতেন না দাদিকে। এতটা বিশ্বাস এখনকার সময়ে খুব কমই দেখা যায়। দাদা কখনো দাদির সাথে গলা চড়িয়ে কথা বলেননি। সবসময় ভালোবাসার দৃষ্টি বোলাতেন। বলতে গেলে দাদি ছিলেন দাদার প্রাণ। তারা যে দুজন দুজনকে খুবই ভালোবাসতেন তা তাদের আচার-ব্যবহারেই ফুটে উঠত।

  দাদি আগে মারা গিয়েছিলেন। তিন মাস পর দাদাও দাদির কাছে চলে গেলেন। কিন্তু তারা তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনীদের জন্য স্মৃতি রেখে গেলেন – কীভাবে দাম্পত্য জীবন যাপন করতে হয়, জীবনসঙ্গীর সাথে কেমন ব্যবহার করতে হয়।

সূত্রঃ সিয়ান পাবলিকেশন প্রকাশিত “বিয়েঃ স্বপ্ন থেকে অষ্টপ্রহর” গ্রন্থ

(সিয়ান পাবলিকেশনের অনুমতিক্রমে বই থেকে এই অংশবিশেষ প্রকাশ করা হল)

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
muslim-couple-and-sunset

বিবাহিত জীবনকে সুখী করার উপায় (পর্ব-১)

মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ | নভেম্বর ১২, ২০১৪
Download PDF

আপনি এখন বিবাহিত। আসুন, দেখি বিবাহিত জীবনকে কীভাবে সুন্দর করা যায়। দাম্পত্য জীবনকে কীভাবে সুন্দর করা যায় সেটা নিয়ে একজন আমাকে একবার ২০ টি প্রশ্ন করেছিল। এখানে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছি। আশা করি এর মধ্যে দাম্পত্য জীবনের প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ের আলোচনাই চলে এসেছে।

১. সুন্দর দাম্পত্য জীবনের বৈশিষ্ট কী?

সত্য বলা, যত্ন নেওয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ-এই তিনটি গুণকে আমি সুখী দাম্পত্য জীবনের মূলসূত্র হিসেবে গণ্য করে থাকি। খেয়াল করুন, এখানে আমি ‘ভালোবাসা’ শব্দটি করিনি। কারণ, ভালোবাসা মূলত সৃষ্টিই হয় এই তিনটি বিষয় থেকে। প্রচলিত অর্থে যাকে ভালোবাসা বলা হয় তা নিছক শারীরিক কামনা। শুধু কারো শারীরিক সৌন্দর্য কখনো ভালোবাসার অনুপ্রেরণা হতে পারে না। সেটা হয়তো ক্ষণিকের মোহ এবং কামনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা সত্যিকার ভালোবাসা নয়। দীর্ঘদিন এক সাথে থাকা ও জানাশোনার মধ্য দিয়ে যে ভালোবাসা গড়ে ওঠে সে ভালোবাসাই দীর্ঘস্থায়ী হয়। এমন ভালোবাসা গড়তে প্রয়োজন পরস্পরের প্রতি সততা, যত্ন ও সচেতনতা। প্রয়োজন নিজের জীবন সঙ্গীকে নিজের উপর প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।

  সম্মান ছাড়া কখনোই ভালোবাসা জন্ম নিতে পারে না। আপনাকে আপনার জীবনসঙ্গীকে সম্মান করতে হবে, তার গুণগুলোর মূল্যায়ন করতে হবে, তাকে আপনার জীবনের সঙ্গী হিসেবে পেয়ে গর্ববোধ করতে হবে। এটা হৃদয়ে এমন এক ভালোবাসার প্রদীপ জ্বেলে দেয় যা সময়ের সাথে সাথে আরয উজ্জ্বল হতে থাকে। কারণ, সম্মান করার কারণগুলোও সময়ের সাথে সাথে বেড়ে যেতে থাকে। আর শারীরিক আকর্ষণ বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমে যায়। মানুষ এভাবেই তৈরি। বয়স বেড়ে গেলে কেউ আরও বেশি সুন্দর হয় না; বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ আরো পরিণত হয়, জ্ঞানী হয়; আরও বেশি কোমল, শান্ত ও ধৈর্যশীল হয়; সম্মান পাওয়ার বেশি যোগ্য হয়। এসবের কারণে যে ভালোবাসা ‘গড়ে ওঠে’ সে ভালোবাসা সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে।

যেমনটা অনুভুত হয়, অকপটে তেমনটা প্রকাশ করাই হচ্ছে সত্য। আর যত্ন নেওয়া মানে হলো, অন্যকে সচেতনভাবে খেয়াল কারা। কেননা আপনি জানের আপনার এবং তার মাঝে কোনো বাধার প্রাচীর নেই। সম্মান হচ্ছে আপনাকে বিশ্বাস করে আপনার সঙ্গী তার হৃদয়ের মণিকোঠায় আপনাকে যে বিশেষ স্থান হয়েছে, সেই অধিকারের প্রাপ্য মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা। কোনো কারণেই এ বিশ্বাসের যেন অমর্যাদা করা না হয়।

২. দাম্পত্য জীবনে সুখী হওয়ার কি কোনো সুত্র আছে?

এমন কাউকে বিয়ে করুন যাকে দেখে অনুকরণ করতে ইচ্ছে হয়; যাকে শ্রদ্ধা করা যায় এবং যার কাছ থেকে ক্ষমা করা শেখা যায়। অসুখী দাম্পত্য জীবনের সূত্র হলো, এমন কাউকে বিয়ে করা যাকে আপনি বদলে ফেলতে পারবেন বলে মনে করেন। এমন ধারণা পোষণ করলে দাম্পত্য জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি হবেই। কারও পরিবর্তন প্রয়োজন মানে হলো, যতটা ভাল হওয়া দরকার ততটা ভালো সে নয়। তাছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনি হয়তো এটা জেনেও নেননি যে, সে আপনার পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তন হতে চায় কি না। পরবর্তী সময়ে নিজেকে বদলানোর ব্যাপারে তার নিজস্ব চিন্তাভাবনার কথা শুনে আপনি নিজেই হতবিহবল হয়ে পড়বে।

সূত্রের দ্বিতীয় অংশটি হলো ক্ষমাশীল হওয়া। পরস্পরের ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। সাধারণত দাম্পত্যজীবনে যা হয়, আমরা চাই নিজের সকল ভুলত্রুটিকে ক্ষমাসুন্দর সৃষ্টিতে দেখা হোক। জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে আমরা অনেক উঁচুমানের ব্যবহার আশা করি ঠিকই, কিন্তু আমরা নিজেরা তেমন আচরণ করতে পারি না। এমন অযৌক্তিক চিন্তা থেকে কোনো এক অজানা কারণে আমরা সরেও আসতে চাই না। বাস্তব জীবন আসলে এভাবে হয় না। মনে রাখবেন, অন্যের কাছ থেকে যেটা আশা করছেন, সেটা নিজে আগে করছেন তো?

  দুজনের জীবনের সবকিছু ভাগাভাগি করে নিন। সে যা করতে পছন্দ করে তাতে আগ্রহর প্রকাশ করুন। সব বিষয়েই হস্তক্ষেপ করবেন না; বরং চেষ্টা করুন তার কাজগুলোকে আরও সুন্দর করতে।

  কথোপকথন সুখী দাম্পত্য জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একই সাথে এটা দাম্পত্য জীবনের মধুরতার পরিমাপক। দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে পড়া শুরু হয় কথোপকথন হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। যখন ১০ মিনিট কথা বলার পরই দুজনের কারও বলার আর কিছু থাকে না; বরং একত্রে সময় কাটানো বলতে টিভির সামনে বসে থাকা, অথবা পত্রিকা পড়ায় রূপান্তরিত হয় তখন আপনি ধরে নিতে পারেন আপনাদের দাম্পত্য সম্পর্কে রোগ ঢুকেছে।‌

  সুখী দাম্পত্য সম্পর্কে একে অন্যের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য একটা ব্যাকুলতা থাকে। কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা দায়িত্ব পালন নয়; এজন্যই আপনি বাইরে থেকে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসতে চাইবেন যে আপনার স্ত্রী আপনার অপেক্ষায় রয়েছে। আপনি বাসায় এসেই আবার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে বেরিয়ে যাবেন না। কেবল অভিযোগ থেকে বাঁচার জন্য পরস্পরকে সময় দেবেন না; বরং আপনি সত্যিকার অর্থেই তার কাছে থাকতে, তার সান্নিধ্য পেতে ভালোবাসেন।

৩. একটা দাম্পত্য জীবনকে কীভাবে সফল করা যায়?

এক কথায় এর উত্তর হলো ‘কাজ করা’। আমরা বলি, ‘দাম্পত্য জীবনকে সফল করো’, কিন্তু আমরা ভুলে যাই এর অনেকটা অংশ আসলে ‘কাজ করা’। এর জন্য দরকার উদ্যোগ, সময় ও শক্তি। এটা কোনো বায়বীয় বিষয় নয়; আপনি আসলে কতটুকু করলেন তা পরিমাপ করা যায় এবং তার বিনিময়ে আপনি কী পেলেন তাও মূল্যায়ন করা যায়। যেমন ধরুন, আপনার স্ত্রীর জন্য নাস্তা তৈরি করা একটা কাজ, তেমনি তার কাজগুলো করে দিতে চাওয়া এবং সাহায্য করাও একটা কাজ। স্বামী ঘরে ফেরার সময়টাতে অগোছালো না থেকে একটু পরিপাটি হয়ে সেগেগুজে থাকাটাও একটা কাজ; অত্যন্ত মূল্যবান একটা কাজ। কোথাও যাওয়ার সময় একটু এগিয়ে গিয়ে বিদায় দেওয়া; কোথাও থেকে এলে একটু এগিয়ে অভ্যর্থনা জানানোও কিংবা নিজের পছন্দ না হলেও শুধু ‘ওর’ কথা ভেবে কিছু করাটাই হলো ‘কাজ’। আপনি যদি সত্যিই এগুলো করতে পারেন তাহলে বিনিময়ে সেটা আপনার জন্য এনে দেবে একরাশ ভালোবাসা আর আকাশছোঁয়া সম্মান।

  আপনার স্বামী বা স্ত্রী আপনাকে সময় না দিলে অভিযোগ করবেন না। কারণ, প্রথমত এক্ষেত্রে অভিযোগ করার কাজটা দুঃখজনক এবং অবমাননাকর। দ্বিতীয়ত, আমার একটা নিয়ম হচ্ছেঃ কেও যদি ভালোবেসে কোনো কাজ না করে, তাহলে নিছক কর্তব্য পালনের জন্য কাউকে কিছু করতে বলবেন না। তৃতীয়ত, সে যে অন্য কারো সঙ্গ খুঁজছে এটা আপনার জন্য একটা সতর্ক বার্তা; কাজেই নিজেকে পরীক্ষা করুন এবং সে অনুযায়ী কাজ করুন। খুঁজে দেখুন, কেন এমনটা হচ্ছে। নিজেকে শুধরে নিন। সব ঠিক হয়ে যাবে । মানুষ সবসময় আনন্দের বিষয়গুলোকেই খোঁজে। সুতরাং, আপনার সঙ্গ যদি আনন্দের চাইতে বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে অন্য কোথাও তা খুঁজে পেতে চাইবে।

  আমি প্রায়ই বলি, ‘ঝগড়াটে কাইকে বিয়ে করার চেয়ে একটি ঘোড়া কিনে আনা ভালো; ঘোড়াটি অন্তত বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে আনতে পারত। ‘ঝগড়াটে’ একটা উভয়লিঙ্গ শব্দ; নারী বা পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

  আগেই যেমনটা বলেছি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক কথাবার্তা থেকেই বোঝা যায়, তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক কেমন যাচ্ছে। কী করতে হবে, কী করা যাবে না – সেই নির্দেশনা দেওয়া, অভিযোগ করা, কোনো তথ্য জানানো, পরনিন্দা-পরচর্চা  করা কিন্তু এই কথোপকথনের মধ্যে পড়ে না। এই কথোপকথন বলতে বোঝায় – চিন্তা-ভাবনা, আশা, স্বপ্ন, ইত্যাদি শেয়ার করা; একে অন্যের কথা গুলো মন দিয়ে শোনা, সহানুভূতি দেখানো, পরস্পরকে বুঝতে চেষ্টা করা, হাসিকান্না ভাগাভাগি করে নেওয়া। দুজনে একসাথে বসে নীরবে কিছু সময় কাটানোও সুন্দর দাম্পত্য জীবনের একটি নিদর্শন। সবসময়ই যে কথা বলতে হবে এমন নয়। সাহচর্য কথা বলেও দেওয়া যেতে পারে, আবার নীরব থেকেও দেওয়া যেতে পারে; গুণগত মানটাই হলো সাহচর্যের মূল বিষয়। ব্যাপারগুলো আপনাকে কেউ ব্যাখ্যা করে না বললেও আপনি নিজেই বুঝে নিতে পারবেন। তবে খেয়াল রাখবেন, নীরবতায় কোনো দুশ্চিন্তা বা ক্লান্তি এসে ভর করছে কি না। মূল বিষয়টি হলো, একে অন্যের কথা আন্তরিকতা ও সম্মানের সাথে মন দিয়ে শুনতে ও জানতে চাওয়া।

অনুরাগ প্রকাশে কিছু পাগলামি করুনঃ

জীবনসঙ্গীকে ফুল অথবা পছন্দনীয় কিছু উপহার দিন। কিন্তু তা কেবল জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে নয়। তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে দিন-তারিখের এসব ছকবাঁধা জিনিস আজকাল আর কাউকে যত্ন করে মনে রাখতে হয় না, যন্ত্রগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়। বরং সম্ভব হলেই উপহার দিন। সবসময় যে বড়ো উপহার দিতে হবে এমনও নয়; বরং উপহার দেওয়ার ভাবনাটাই মূল বিষয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে তোমরা উপহার দাও, কারণ তা পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা বাড়িয়ে দেবে। সুতরাং একে অন্যকে উপহার দিন। যখন আপনি কিছু দিনের জন্য দূরে থাকেন, অথবা কদিন কাজে ডুবে থাকের কারণে মানসিকভাবে দুরত্ব সৃষ্টি হয় – তখন উপহার দারুণ কাজ করে। উপহার সুন্দর দাম্পত্য জীবণকে জুড়ে রাখে আঠার মতো। আর হ্যাঁ, উপহারটি আপনার সঙ্গীকে একান্তে দিবেন। উপহারটিকে র‌্যাপিং পেপারে মুড়িয়ে, রঙিন ফিতে দিয়ে বেঁধে, সুগন্ধী লাগিয়ে একগুচ্ছ ফুলসহ তার হাতে তুলে দিন। ঘটনাটিকে স্মরণীয়, বৈশিষ্টপূর্ণ ও সৃজনশীল করুন। মনে রাখবেন, উপহারের বস্তুটি কিন্তু এখানে মুখ্য নয়, এখানে মূল হলো একটি স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেওয়া। উপহারটি এমন ব্যাগ ভরা কিছু হওয়ার দরকার নেই – যা সবার সামনে বের করে দেবেন। বরং এটা এমন কিছু হবে যা কেবল সে-ই পাবে। কোনো উপলক্ষ করে বা ঘটা করে কিছু করতে যাবেন না; বরং তাকে এমন সময় এমন কিছু দিন যা সে তখন আশা করেনি। উপহারটিই আপনার সঙ্গীর  বিশেষত্ব প্রকাশ করে বলবে, ‘তুমি আমার বিশেষ একজন’। একই ঘটনা ছেলেদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মনে রাখবেন, ছেলেরাও কিন্তু উপহার পছন্দ করে; এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়েও বেশি। তাদেরকেও উদার মন নিয়ে উপহার দিন।

একসঙ্গে আনন্দ উপভোগ করাঃ

প্রবাদ আছে –  যে দম্পতি একসাথে আনন্দ উপভোগ করতে পারে, তারাই দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকতে পারে। খেলাধূলা, বিনোদন, ঘুরতে যাওয়া, ছুটির দিন কাটানো, পিকনিকে যাওয়া – বৈধতার সীমারেখার মধ্যে থেকে আপনার কাছে যেটাই আনন্দের বিষয় মনে হয় সেটি করুন। এমন কিছু করুন যেটা দুজনে মিলে উপভোগ করতে পারবেন। যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কোনো খেলা হয় তাহলে আপনি হেরে যাওয়ার চেষ্টা করুন, সঙ্গীকে জিতিয়ে দিন। মনে রাখবেন, এখানে হেরে যাওয়াটাই আপনার জন্য আনন্দের। সবসময় হয়তো বিষয়টিকে সমানভাবে উপভোগ নাও করতে পারেন, কিন্তু এর বিনিময়ে আপনার জীবনসঙ্গীর মুখে যে হাসি আপনি জোটাতে পারছেন সেটাই অনেক বড় পাওয়া। এই হাসিটাই তো সব, তাই না? তাই, হাসিটা যেন সত্যিকারের হাসি হয়। মেকি হাসি এক মাইল দূর থেকেও বোঝা যায়। সবসময় কৃতিত্ব জাহির করাটা মূল কথা নয়; সংসারে তো একেবারেই নয়। এখানে আপনার ‘কাজের মূল্যায়ন’ নির্ভর করে আপনাদের উভয়ের সন্তোষ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। দুজনে মিলেই কাজ করতে হবে, দুজনে মিলেই সফলতা অর্জন করতে হবে। না হলে বিষয়টা হবে এমন যেন, ‘অপারেশন সফল হয়েছে কিন্তু রোগী মারা গেছে’। বর্তমান যুগের এই ব্যস্ত জীবনে, আমাদের আসলে সময় হয়ে ওঠে না ‘এমনিতে’ কিছু করার। আমরা সবকিছুতেই ‘ফলাফল’ খুঁজতে থাকি। দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটা মানসিকভাবে ভীষণ পীড়া দেয়। বিয়ে হলো’ ‘সুকূন’, সুখ, মানসিক শান্তি, প্রশান্তি ইত্যাদি অমূল্য সব সম্পদ অর্জনের জন্য – বস্তুগত কোনো ‘ফলাফল’ লাভের জন্য নয়। পরস্পরকে সময় দেওয়ার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন আরও সহজ হতে পারে।

সূত্রঃ সিয়ান পাবলিকেশন প্রকাশিত “বিয়েঃ স্বপ্ন থেকে অষ্টপ্রহর” গ্রন্থ

(সিয়ান পাবলিকেশনের অনুমতিক্রমে বই থেকে এই অংশবিশেষ প্রকাশ করা হল)

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
tumblr_liw1lgnt6o1qhzcswo1_500

কার কাছ থেকে দীন শিখছেন সে ব্যাপারে সতর্ক হন

মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৪
Download PDF

অনেকেই প্রশ্ন করেন, “কোনো ‘আলিম—যিনি অনেক জানেন, কিন্তু তার মধ্যে হয়তো সেই পরিমাণ চর্চা নেই—সে কী করছে না করছে এত কিছু না-ভেবে শুধু দীন শেখার উদ্দেশ্যে তাঁর কাছে গেলে ক্ষতি কী?”

আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্নটি যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও, নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন তো, “আমি কি এমন কারও কাছ থেকে বিমান ওড়ানো শিখব, যে কিনা বিমান সম্বন্ধে সবকিছুই জানে, অথচ কখনো কোনো বিমান ওড়ায়নি?”

আসলে সমস্যাটা হচ্ছে ইসলামের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। ইসলাম কোনো মতবাদ বা কারও ব্যক্তিগত ভাবাদর্শ নয়। ইসলামের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে একে মতবাদের স্তরে নামিয়ে এনে। আর দশটা মতবাদ আর দর্শন যেভাবে শিখি ইসলামকেও আজ আমরা সেভাবে শিখছি। আমরা ইসলামের মূলনীতিগুলো শিখি, আইনের জটিল খুঁটিনাটি বিষয়গুলো শিখি, এটা ওটার মানে শিখি―কিন্তু যা শিখেছি সেটা চর্চা করার কোনো প্রয়োজন দেখি না। এটাই কি পূর্বসূরি-সালাফদের নীতি?

আপনারা অনেকেই ইব্‌ন ‘উমার (রা.)-এর সেই ঘটনাটার সাথে পরিচিত। সেখানে আমরা দেখি, সবকিছুর ওপরে তাঁরা চর্চা বা ‘আমাল করাকে গুরুত্ব দিতেন। যা শিখেছেন সেটার চর্চা করে সন্তুষ্ট না-হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ইচ্ছে করেই আর নতুন কিছু শিখতেন না। কত সুন্দর করেই না আমরা মানুষদের এ ঘটনাগুলো বলে বেড়াই কিন্তু আমাদের মধ্যে সেই চর্চা কোথায়? এটা কেমন মানসিকতা?

ইসলাম একটি জীবন ব্যবস্থা। নৈতিক মূল্যবোধের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। চর্চা ও আচার-আচরণের মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে। পরিপূর্ণভাবে ইসলাম চর্চা করছেন এমন কাউকে সরাসরি দেখে ও তাঁর সাথে থেকে ইসলাম যতটা শেখা যায়, কেবল বই পড়ে কিংবা কিছু লেকচার শুনে তার সামান্যই শেখা যায়। সাহাবাদের মর্যাদা কেন এত উঁচুতে? কারণ তাঁরা পেয়েছেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গ। তাঁর সাথে থেকে থেকে ইসলামের পাঠ নিয়েছেন সাহাবারা। নিজেদেরকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করে এভাবেই শিক্ষা দিতেন পূর্বসূরি বিদ্বানগণ।

সুতরাং একজন দীন-শিক্ষার্থীর জন্য প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে তার শিক্ষকের যোগ্যতা বিবেচনা করা। আমার মতে একজন শিক্ষকের মধ্যে নিম্নলিখিত পাঁচটি গুণ খুঁজে দেখতে হবে। এবং যার মধ্যে এই গুণগুলো পাওয়া যাবে তাকেই গ্রহণ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে এই সবগুলো গুণেরই চিহ্ন যেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কথায়, কাজে ও জীবনে চোখে পড়ে। কোনটার প্রাধান্য বেশি হবে সেই ভিত্তিতে এগুলো এভাবে সাজানো হয়েছে:

১। শিক্ষকের তাকওয়া (আল্লাহর প্রতি সদা-সচেতনতা) ও খাশিয়াতুল্লাহ (আল্লাহভীতি—তাঁর যুহ্‌দ ও ইবাদাহ, বিশেষ করে নাওয়াফিল ইবাদাহ)

২। তাঁর আকীদাহ (তাওহীদের বিশুদ্ধতা; শির্ক ও কুফ্‌রের প্রতি প্রবল ঘৃণা)

৩। সুন্নাহর অনুসরণ (প্রাত্যহিক সব কাজে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে)

৪। নাম-খ্যাতি-সম্পদের মোহ এড়িয়ে চলা (কারণ এগুলো হৃদয়ের অসুখ)

৫। জ্ঞান

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, জ্ঞানকে আমি সবার শেষে স্থান দিয়েছি। জ্ঞানের গুরুত্ব নেই, ব্যাপারটা এমন না; তবে অন্যান্য গুণাবলির তুলনায় এটাই এর প্রকৃত অবস্থান। যে-জ্ঞানীর মধ্যে তাকওয়া ও খাশিয়াতুল্লাহর অভাব রয়েছে, তাঁর আকীদা-বিশ্বাস ভ্রান্ত, সে সুন্নাহর অনুসরণ করে না, সে ছোটে অর্থহীন খ্যাতি ও সম্পদের পেছনে। যেই জ্ঞান তার নিজেরই কোনো কাজে লাগেনি, সেই জ্ঞান দিয়ে সে কীভাবে তার ছাত্রদের কল্যাণ করবে?

আল-বিশ্‌র আল-হাফি নামে ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হানবালের একজন বন্ধু ছিলেন। ইমাম আহমাদ তাঁর বন্ধুকে উস্তাদ বলতেন। কেউ একজন তাঁকে বললেন, ‘বিশ্‌র তো খুব বেশি হাদীস় জানে না; তার ইল্‌ম কম।’ ইমাম আহমাদ বললেন, “জ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে খাশিয়াতুল্লাহ। বিশ্‌রের আল্লাহভীতি প্রবল। প্রকৃত ইল্‌ম এটাই।”

ইমাম মালিকের উস্তাদের ব্যাপারে তাঁর মা তাঁকে উপদেশ দিতেন, “রাবী’ঈয়ার কাছ থেকে জ্ঞান শেখার আগে আখলাক় শিখবে।”

‘উলামার গুণাবলী বর্ণনায় আল্লাহ বলেছেন,

ফাতির ২৮:         إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاء

(অর্থের ব্যাখ্যা) যাদের মধ্যে জ্ঞান আছে আল্লাহর দাসদের মধ্যে তারাই প্রকৃত অর্থে তাঁকে ভয় করে।

তিনি আরও বলেছেন,

হুজুরাত ১৩:                إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

(অর্থের ব্যাখ্যা) তোমাদের মধ্যে যার তাকওয়া আছে আল্লাহর দৃষ্টিতে সে-ই সবচেয়ে সম্মানিত।

কাজেই দীনের জ্ঞান নেওয়ার আগে অবশ্যই শিক্ষকের যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। কারণ একজন জ্ঞান অন্বেষণকারীর জন্য এটা জীবন-মরণের প্রশ্ন নয়; এটা পরকালীন জীবনের প্রশ্ন।

ঠিক-বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য করা একজন সাধারণ মানুষের জন্য খুবই কঠিন একটা ব্যাপার। বিশেষ করে তারা যদি এমন কোনো বাকপটু তর্কবাগীশ লোকের ফাঁদে পড়েন যিনি খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে তর্কে জিততে হয়। কিংবা এমন কোনো লোক যিনি কথার মাধ্যমে নিজেকে ‘আলিম হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারেন। এরকম অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে যেখানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ভেড়ার পালের একদল ভেড়ার মতো এসব প্রতারণাকারীদের অনুসরণ করছে। অনুসরণ করতে করতে ভেড়াগুলো যে নিজেরাই স্বেচ্ছায় কসাইখানায় ঢুকছে সে ব্যাপারে এদের কোনো চিন্তা নেই। কথিত এসব ‘আলিমগণ নিজেরাই বিভ্রান্ত। আপনার পকেট থেকে টাকা খসানোর জন্য তারা এমন সব কথা বলবে যেগুলোকে আপনার কাছে খুবই যৌক্তিক মনে হবে। কারণ আপনার নিজের নাফ্‌সেরই যেখানে পরিচর্যা প্রয়োজন, সেখানে ভ্রান্ত স্কলারদের এ ধরনের কথাবার্তা আপনার ব্যক্তিগত কামনাকে আরও উসকে দেবে। আর একারণেই অনেক লোক এমন সব ‘আলিমদেরই খোঁজে যারা তাদের কামনা পূরণে সহায়তা করে, তারা যা করতে চায় সেগুলোকে ‘অনুমোদন’ দেয়, বিভিন্ন ইসলামিক আইনের ফাঁকফোকর খুঁজতে সাহায্য করে—যদিও ইসলামিক আইনে কোনো ফাঁকফোকর নেই।

দৃষ্টান্তস্বরূপ সেসকল ‘আলিমদের কথা বলা যায় যারা ইসলামের নামে সংগীত, নাচ এবং খ্রিষ্টান রিভাইভালিস্টদের ইঙ্গিতবাহী বিভিন্ন রীতিনীতির অনুমোদন দেয়। কোনো হারামকে হালাল বললেই তা হালাল হয়ে যায় না। মূলত এর ফলে যা হয়, বিচক্ষণ ও বোধসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে এসব কথিত ‘আলিমদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়। অবশ্য কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের চোখ বন্ধ করে রাখে তাদের কথা আলাদা।

জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে ইবলীস জাহান্নামে যাবে না। ইবলীস জাহান্নামে যাবে আল্লাহর প্রতি ভয় না-থাকার কারণে। সাংঘাতিক এই পীড়ার কারণে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর পরিণতি থেকে তার জ্ঞান তাকে বাঁচাতে পারবে না। যারা হাতে গোনা কিছু বই পড়েছে, অমুক-তমুক কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট হয়েছে কিন্তু তারবিয়্যার শিক্ষা পায়নি, তাদের পরিণতিও একই। তাদের মধ্যে আল্লাহভীতির চরম ঘাটতি আছে। তাদের কামনা-ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য তারা জ্ঞানের অপব্যবহার করে ইসলামিক বিধিবিধানের ফাঁকফোকর খোঁজে। তারা তাওয়ীলাত (ব্যাখ্যা ও ওজর) তৈরি করে। এবং তাদের বক্তব্যের সমর্থনে—খালি চোখেই যেটার ভুল ধরা পড়ে—কুরআন-হাদীস ব্যবহার করে। তারা যে নিজেরাই তাদের জাহান্নামের পথ সুগম করছে সে ব্যাপারে যেন একেবারেই বেখেয়াল। তাদের এই জ্ঞান তাদের জীবিকা অর্জনের একটা উপায়; আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার নয়।

একজন প্রকৃত ‘আলিম একটি বাতির মতো। ঘরে কেউ আছে কি না সেটা নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণেই তিনি ঘরটা আলোকিত করেন; কারণ এটাই যে তার স্বভাব! স্বাভাবিকভাবেই যারা তাঁর আশেপাশে থাকেন, তারা তাঁর জ্ঞানের আলোয় নিজেদের উদ্ভাসিত করেন। যদিও সেই ‘আলিম ব্যক্তিগতভাবে এগুলো নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন; বাতি কি কখনো জিজ্ঞেস করে, ‘কেউ কি আমার দিকে তাকিয়ে আছে?’ বাতির শিখা একা একাই জ্বলজ্বল করে জ্বলে ওঠে। এটাই তার প্রকৃতি। জ্বলে ওঠা ছাড়া আর কী করার আছে তার! আর এটাই ‘উলামা-উল-হাক়—প্রকৃত বিদ্বানদের বৈশিষ্ট্য। জ্ঞানের মাঝেই তাঁরা গড়ে তোলেন তাঁদের বসতি, কেননা তাদের মনে শুধু একটিই অভিলাষ: আল্লাহর সন্তুষ্টি।

প্রখ্যাত ‘আলিম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলাওয়ির ছেলে শাহ আব্‌দুল-আযিয দেহলাওয়ি একবার দিল্লির এক জামিয়া মাসজিদে লেকচার দিচ্ছিলেন। এটা এশিয়ার অন্যতম বড় মাসজিদ। হাজারো লোক এসেছিল তাঁর বক্তৃতা শুনতে। জনারণ্যের শেষ মাথা পর্যন্ত যেন তাঁর কথা শোনা যায় তেমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দেড় ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্য রাখেন তিনি। বক্তৃতা শেষ করে তিনি তার চেম্বারে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় এক লোক এসে বলল, “হাযরাত, দিল্লি থেকে বহু দূরের অমুক গ্রাম থেকে শুধু আপনার কথা শোনার জন্যই এসেছিলাম। আমি যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি সময় লেগে গেছে আসতে। অনেক কষ্ট হয়েছে। কিন্তু এসে দেখি আপনার লেকচার শেষ। খুব খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে আমার সব কষ্ট বিফলে গেল। আমি এখন কী করব?”

শাহ আব্‌দুল-আযিয তাকে বললেন, “আপনি বসুন। আমি আবার বলছি।“ তিনি উঠে দাঁড়ালেন। যে-উদ্যম ও নিষ্ঠা নিয়ে তিনি হাজারো লোকের সামনে বক্তব্য রেখেছিলেন, সেই একই উদ্যম ও নিষ্ঠা নিয়ে তিনি গ্রামের সেই লোকটির সামনে বক্তৃতা দিলেন। লোকটি তাঁর বক্তৃতা শুনে খুব মুগ্ধ হলেন। শাহ আব্‌দুল-আযিযকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে তাঁর জন্য অনেক দু‘আ করে বিদায় নিলেন তিনি।

শাহ আব্‌দুল-আযিযের ছাত্ররা এই ঘটনা দেখে তো বিস্ময়ে হতবাক। ছাত্রদের একজন জিজ্ঞেস করল, “শায়খ, খুবই আশ্চর্যজনক একটা ঘটনা দেখলাম আজকে। হাজারো লোকের সামনে আপনি যেভাবে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, গ্রামের এই লোকটির সামনে আপনি সেই একইভাবে বক্তৃতা দিলেন। লোকটি এমন এক গ্রাম থেকে এসেছিল যে গ্রামের নাম আমরা কখনো শুনিইনি, কিন্তু আপনি যেভাবে বক্তৃতা দিলেন, যে দরদমাখা কণ্ঠে, সমান নিষ্ঠা ও উদ্দীপনার সাথে বক্তৃতা দিলেন সেটা এক কথায় অভাবনীয়। কীভাবে সম্ভব এটা?”

শাহ আব্‌দুল আযিয বললেন, “এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? হাজার হাজার লোকের সামনে যখন আমি কথা বলছিলাম তখন আমি যেমন শুধু একজনকে সন্তুষ্ট করার জন্যই কথা বলেছি, এখনো আমি যখন একজন লোকের সামনে বক্তৃতা দিয়েছি আমার উদ্দেশ্য ছিল শুধু তাঁকেই খুশি করা।”

আল্লাহ যেন উনার উপর এবং সব উলামা-উল-হাক়-এর উপর সন্তুষ্ট হন।

তারবিয়্যার ফল এটাই। শাহ আব্‌দুল আযিয তাঁর বাবার কাছ থেকে সঠিক তারবিয়্যার শিক্ষা নিতে পেরেছিলেন। আল্লাহ তাঁদের সবার উপর সন্তুষ্ট হোক।

যারা এই লেখাটি পড়ছেন, তারা যা জানেন সেটা যদি চর্চা করে থাকেন, তাহলে আমার মনে হয় জান্নাতে যাওয়ার জন্য যতটুকু জানা প্রয়োজন, সম্ভবত তারা ইতিমধ্যেই তা জেনে নিয়েছেন। তারপরও ‘জ্ঞান অন্বেষণ’-এর নামে আমরা এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াই, অথচ ইতিমধ্যেই যা জেনেছি সেগুলো চর্চা করার ব্যাপারে খুব একটা পাত্তা দেই না। কে কতটুকু জানে তার ভিত্তিতে কেউ জান্নাতে যাবে না। মানুষ জান্নাতে যাবে সে কী করেছে তার ভিত্তিতে।

তাই কার কাছ থেকে দীন শিখছেন সে ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকুন। অনেক কিছু জেনে আল্লাহর বিধানকে অমান্য করার চেয়ে অল্প জেনে সেটা পালন করাই অনেক বেশি ভালো। বেশি জেনে আল্লাহর অবাধ্যতা করার মতো কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।

আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবেন না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করুন। দেখবেন, আল্লাহই আপনাকে রক্ষা করছেন।

والسّلام

ভাষান্তর: ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি – বাংলাদেশ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather