All posts by মুহম্মদ মতিউর রহমান

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান এর জন্ম ৩ পৌষ, ১৩৪৪ (১৯৩৭ ইং) সন, সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তর্গত শাহজাদপুর থানার চর নরিনা গ্রামে মাতুলালয়ে। পৈত্রিক নিবাস উক্ত একই উপজেলার চর বেলতৈল গ্রামে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সনে বাংলায় এম.এ. ডিগ্রী লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি সিদ্বেশ্বরী কলেজ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে অধ্যাপনা করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকাশনা প্রকল্পে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠক হিসেবে তাঁর রয়েছে বৈচিত্রময় ভূমিকা। তিনি ঢাকাস্থ "ফররুখ একাডেমীর" প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলা একাডেমীর জীবন সদস্য। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য কথা (১৯৯০), ভাষা ও সাহিত্য (১৯৭০), সমাজ সাহিত্য সংস্কৃতি (১৯৭১), মহৎ যাদের জীবন কথা (১৯৮৯), ইবাদতের মূলভিত্তি ও তার তাৎপর্য (১৯৯০), ফররুখ প্রতিভা (১৯৯১), বাংলা সাহিত্যের ধারা (১৯৯১), বাংলা ভাষা ও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন (১৯৯২), ইবাদত (১৯৯৩), মহানবী (স) (১৯৯৪), ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি (১৯৯৫), মহানবীর (স) আদর্শ সমাজ (১৯৯৭), ছোটদের গল্প (১৯৯৭), Freedom of Writer (১৯৯৭), বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য (২০০২), মানবাধিকার ও ইসলাম (২০০২), ইসলামে নারীর মর্যাদা (২০০৪), মাতা-পিতা ও সন্তানের হক (২০০৪), রবীন্দ্রনাথ (২০০৪), স্মৃতির সৈকতে (২০০৪)। এছাড়াও তাঁর সম্পাদনায় ফররুখ একাডেমী পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
photo1

বাংলা সনের উৎপত্তি ও বিকাশ (পর্ব-২)

মুহম্মদ মতিউর রহমান | এপ্রিল ১৪, ২০১৫
Download PDF

প্রথম পর্বঃ

বাংলা সনের উৎপত্তি ও বিকাশ (পর্ব-১)

হিজরী সনের প্রবর্তন করেন মূলত রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং। দ্বিতীয় খলীফা উমর ফারূক (রা.) আনুষ্ঠানিকভাবে এটা চালু করেন। মহানবীর (সা.) ঐতিহাসিক হিজরতের ঘটনার স্মরণে হিজরী সনের উৎপত্তি। মহানবী (সা.) মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আল্লাহ্‌র নির্দেশে ৬২২ ঈসায়ীর ২০ সেপ্টেম্বর নিজ জন্মভূমি পবিত্র মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। ঐ সময় আরবদেশে বহুবিধ সনের প্রচলন ছিল। যেমন হযরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের স্মরণে ‘বন্যাসন’, আবরাহার হস্তিবাহিনী নিয়ে কা’বা ধ্বংসের অপচেষ্টার স্মরণে ‘হস্তি সন’, ‘হবুতি সন’, ‘লুই সন’, ‘খসরু সন’, মহানবীর (সা.) জন্ম সন’, ‘আম উল ফজুর’, ‘আম উল ফতেহ’ ইত্যাদি সন প্রচলিত ছিল। তবে এর অধিকাংশই ছিল আঞ্চলিক বা গোত্রীয়, ব্যাপকভাবে বা সারাদেশে এ সনগুলোর প্রচলন ছিল না। এর মধ্যে ‘হস্তি সন’ কিছুটা জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মহানবীর (সা.) জন্মের মাত্র কয়েক দিন পূর্বে ইয়েমেনের শাসক আবরাহা বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে খানায়ে কা’বা ধ্বংস করতে এসে মক্কার অদূরে মুযদালিফার ওয়াদিউন্নার (অর্থ : অগ্নি-উপত্যকা) নামক স্থানে আল্লাহ্‌ ইচ্ছায় ক্ষুদ্র আবাবীল পাখির প্রস্তরাঘাতে সদলবলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার অলৌকিক ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে হস্তি সনের উৎপত্তি। সেকালে এ ঘটনা সমগ্র আরব সমাজে ছিল এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ঘটনা। ফলে এ সন মোটামুটি ব্যাপকভাবে গৃহীত ও আদৃত হয়।

তবে এ সনটি ছিল এক অভিশপ্ত জালেম শাসকের স্মৃতিবাহক। তাই মহানবী (সা.) ইসলামের ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা হিজরতের স্মরণে হিজরী সন প্রবর্তন করেন। ঐতিহাসিক তাবারীর বর্ণনা মতে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যেদিন তদানীন্তন ইয়াসরিফ- যা মহানবীর (সা.) আগমনের সাথে সাথে ‘মদীনাতুর রাসূল’ নাম ধারণ করে- উপনীত হন, সেদিন থেকেই হিজরতের স্মরণে নতুন সন গণনার নির্দেশ দেন। তিনি নজরানের খ্রীস্টানদের সাথে যে সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করেন তাতে তারিখ হিসাবে হিজরতের পঞ্চম দিন উল্লেখ করা হয়। ঐ সময় থেকে মদীনায় হিজরতের প্রথম বছর, দ্বিতীয় বছর এভাবে লোকমুখে এ সনের প্রচলন ঘটে। কিন্তু এভাবে হিজরী সনের প্রচার ও তা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও বিধিবদ্ধভাবে এ সন প্রচলিত হয় খলিফা উমরের (রা.) শাসনামলে ৬৩৮ ঈসায়ীতে। এর পটভূমি নিম্নরূপ :

বিশিষ্ট সাহাবা আবূ মূসা আশআরী (রা.) খলীফা উমরকে (রা.) জানান যে, খলীফার ফরমান ও পত্রাদিতে নির্দিষ্ট দিন-তারিখের উল্লেখ না থাকায় তা অনেক সময় নানা রকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। ফলে খলীফা উমর (রা.) বিশিষ্ট সাহাবাদের নিয়ে এক পরামর্শ সভা ডাকেন। সভায় আলী ইবনে আবূ তালিব (রা.) হিজরতের বছর থেকে নতুন সন গণনার প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটি সকলেরই মনঃপূত হয়। কারণ স্বয়ং মহানবীর (সা.) হিজরতের দিন থেকে তারিখ গণনার পদ্ধতি চালু করেছিলেন। তবে সেটা তখনও প্রথাগত সন হিসাবে সুবিন্যস্ত হয়নি। তাই পরামর্শ সভা সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, হিজরতের বছর থেকে নতুন হিজরী সন গণনা করা হবে। এ নতুন সনে তৎকালে আরবদেশে প্রচলিত মাসসমূহের নাম বহাল রাখা হয়। কারণ এ মাসগুলির সঙ্গে আরবদেশের ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতির এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আল-কুরআনেও এ মাসগুলির উল্লেখ রয়েছে এবং হাদীস শরীফে এ মাসগুলোর ভিত্তিতে বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগীর সুস্পষ্ট বিধি-বিধান বর্ণিত হয়েছে। তাই এ মাসগুলোর নাম এবং ক্রম পরিবর্তন করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এ কারণে হিজরী সন গণনার ক্ষেত্রে কিছুটা সমন্বয় সাধনের প্রয়োজন পড়ে।

তখন আরব দেশে বছরের প্রথম মাস ছিল মুহররম। খলিফা উসমান বিন আফ্‌ফানের (রা.) প্রস্তাব ও সকলের সম্মতিতে হিজরী সনের প্রথম মাস হিসাবে এটা অপরিবর্তিত থাকে। যদিও হিজরত সংঘটিত হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসে। কিন্তু প্রচলিত রীতি ও প্রথার সাথে মিল রেখে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। এভাবে প্রচলিত আরবি সনের প্রথম মাস ও তারিখের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করার উদ্দেশ্যে হিজরতের দুই মাস আট দিন পিছিয়ে পয়লা মহররম থেকে হিজরী সন গণনা শুরু হয়। সে হিসাবে হিজরী সনের শুরু ৬২২ ঈসায়ীর ১৬ জুলাই অর্থাৎ হিজরতের বছর থেকে। ৬৩৮ ঈসায়ীতে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা তাঁর খিলাফত কালে তৎকালিন বিশিষ্ট জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শক্রমে এবং সকলের সম্মতিক্রমে হিজরী ১৭ সনে ১০ জমাদিউল আউয়াল বুধবারের দিন এক আমিরী ফরমান বলে হিজরী সন চালু করেন। সেই থেকে সমগ্র বিশ্বে বিশেষত মুসলিম বিশ্বে হিজরী সন চালু আছে।

বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ্‌ শাসনামল ও সিংহাসনারোহণ ও বিভিন্ন স্মরণীয় ঘটনা উপলক্ষ্য করে পৃথিবীতে বিভিন্ন সনের প্রচলন ঘটে। উপমহাদেশেও এভাবে বিভিন্ন সনের উদ্ভব ঘটেছে। এভাবেই শকাব্দ, হর্ষাব্দ, অশোকাব্দ, গুপ্তাব্দ, ফলাব্দ, বিক্রমাব্দ বা বিক্রম সম্বৎ, পালাব্দ, ভারত সন, শালিবন সন, জালালী সন, সেকান্দর সন ইত্যাদি সনের উৎপত্তি হয়। বাংলা সনেরও উৎপত্তি ঘটে মুঘল সম্র্রাট আকবরের সিংহাসনারোহণের সময় থেকে। বাংলার স্বাধীন নবাব হুসেন শাহের আমলে বাংলা সনের উৎপত্তি হয় বলে অনেকের ধারণা ছিল। কিন্তু বর্তমানে সকল ঐতিহাসিকগণ এ ব্যাপারে একমত যে, সম্রাট আকবরের আমলেই এ সনের উদ্ভব ঘটে। ‘আকবর নামা’র বিবরণ থেকেও এটা সন্দেহাতীত রূপে প্রমাণিত হয়।

মুঘল আমলে উপমহাদেশে সরকারীভাবে হিজরী সন চালু ছিল। যদিও সম্রাট আকবর তাঁর প্রবর্তিত ‘দ্বীনে এলাহী’র স্মরণে ‘এলাহী সন’ চালুর চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি তাতে সফল হননি। হিজরী সন চান্দ্র মাসের হিসাবে গণনা করা হয়। সেকালে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত সনের অধিকাংশই চান্দ্র মাসের হিসাবে গণনা করা হতো। তখন বাংলাদেশে অন্যান্য সনের সাথে লক্ষ্মণ সনও প্রচলিত ছিল। রাজা লক্ষ্মণ সেনের সিংহাসনারোহণের সময় থেকে এ সন গণনা করা হতো। এটাও ছিল চান্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী। চান্দ্র বছরের সাথে সৌর বছরের পার্থক্য ১০/১১ দিন। এ গরমিল দূর করে চান্দ্র বর্ষের হিসাবকে সৌরবর্ষের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য হিন্দু জ্যোতিষীগণ প্রতি তিন চান্দ্র বছরে এক মাস অতিরিক্ত যোগ করে দিতেন। এ মাসটিকে তারা বলতেন ‘মলমাস’। সন গণনার এ অসংগতি দূরীকরণার্থে এবং খাজনাদি আদায় ও রাজকীয় অন্যান্য কার্যাদি সম্পাদনের সুবিধার্থে একটি নতুন সন চালু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ফলে সম্রাট আকবর তাঁর নবরত্নের অন্যতম বিজ্ঞ আমীর ফতেহউল্লাহ শিরাজীকে নতুন সন উদ্ভাবনের নির্দেশ দেন।

‘আমীর-উল মুল্ক’, ‘আযাদ-উদ্-দৌলা’, ‘রোস্তম সানী’ প্রভৃতি উপাধিপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও পণ্ডিত ফতেহউল্লাহ সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরী বা ১৫৫৬ ঈসাব্দ পর্যন্ত হিজরী সনকে অপরিবর্তিত রেখে পরবর্তী সময় থেকে নতুন সন সৌরমাসের হিসাব অনুযায়ী গণনার ব্যবস্থা করে বাংলা সন উদ্ভাবন করেন। এভাবে হিজরী সনের ভিত্তিতে বাংলা সনের উৎপত্তি হলেও পরবর্তীতে নতুন সনের হিসাব সৌরবছরের সাথে যুক্ত হওয়ায় দুই সনের মধ্যে বছরে ১০/১১ দিনের এবং ৩৩ বছরে এক বছরের ব্যবধান তৈরি হয়। ফলে নতুন সনের প্রবর্তনের সময় থেকে বিগত ৪৫৫ বছরে (২০১১ খ্রি:) হিজরী সনের সাথে এর প্রায় ১৪ বছরের ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। কালপরিক্রমায় এ ব্যবধান ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

সম্রাট আকবর ফসল বোনা ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তাঁর রাজত্বকালের উনত্রিশতম বছর অর্থাৎ ১৫৮৫ ঈসায়ীতে শাহী ফরমান জারি করে এ নতুন সন চালু করেন। চালু করার পর এ সন ‘ফসলী সন’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশে অনেকে এটাকে বঙ্গাব্দ নামেও অভিহিত করে থাকেন। ‘ফসলী’ লকবটিও বহাল থাকে। আকবরের রাজত্বকালে ঐ সময় ফসলী সন হিসাবে উড়িষ্যা ও মহারাষ্ট্র প্রদেশে যথাক্রমে ‘বিলায়তি’ ও ‘সুরসান’ নামে আরো দুটি সন চালু হয়। এ দুটি সনকেও বাংলা সনের মতই হিজরী সনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। নির্দিষ্ট দিনে খাজনা আদায়, অন্যান্য কর সংগ্রহ ও প্রজাসাধারণের সাথে শাহী দরবারের লেনদেনের তারিখ নির্ধারণ ইত্যাদি কাজে নতুন সনগুলো ব্যবহৃত হলেও মুঘল রাজ-দরবার ও মুসলিম সমাজে সর্বত্র যথারীতি হিজরী সন চালু থাকে।

বাংলা সন হিজরী সন থেকে উদ্ভূত হলেও এর মাসগুলোর নাম তৎকালে প্রচলিত শকাব্দের সাথে মিল রেখে করা হয়। হিজরী ও বাংলা এ দু’টি সনের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার্থে এটা বিশেষ প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হয়। শুরুতে বাংলা মাসের নাম ছিল যথাক্রমে- কারওয়াদিন, আরদিভিহিসু, খারদাদ, তীর, আমরারদাদ, শাহরিয়ার, মিহির, আবান, আয়ুর, দায়, বাহমান ও ইসকান্দার মিয। পরবর্তীতে সেগুলো শকাব্দের মাসের নাম অনুযায়ী রাখা হয়। শকাব্দের নামগুলো গ্রহপুঞ্জ ও সূর্যের নামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন ‘বিশাখা’ নক্ষত্রের নামে বৈশাখ, ‘জ্যেষ্ঠা’ থেকে জ্যেষ্ঠ, ‘আষাঢ় পদ’ থেকে আষাঢ়, ‘শ্রাবণী’ থেকে শ্রাবণ, ‘ভাদ্রাদি’ বা ‘ভাদ্রপদ’ থেকে ভাদ্র, ‘অশ্বিনী’ থেকে আশ্বিন, ‘কৃত্তিকা’ থেকে কার্তিক, ‘পূষ্যা’ বা ‘পুষ্প’ থেকে পৌষ, ‘মঘা’ থেকে মাঘ, ‘ফল্গুনী’ থেকে ফাল্গুন এবং ‘চিত্রা’ থেকে চৈত্র। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা সনের প্রথম মাস কোনটি ছিল, সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ মতভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, প্রথম দিকে অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম দিন হিসাবে গণনা করা হতো। সেকালে বাংলাদেশের প্রধান দুটি ফসলের মধ্যে একটি আমন ও অন্যটি আউষ ধান। আমন ধান আগ্রহায়ণ মাসে আর আউষ ধান বৈশাখ মাসে কাটা হতো। সে অর্থে আগ্রহায়ণ মাসকেও ফসলী সনের প্রথম মাস গণ্য করা বিচিত্র নয়।

উপরোল্লিখিত মাসগুলোর মধ্যে একমাত্র অগ্রহায়ণ মাসটি কোন নক্ষত্রের নামানুসারে হয়নি। ‘অগ্র’ থেকে অগ্রহায়ণ। এ অর্থে অগ্রহায়ণকে বছরের প্রথম মাস হিসাবে গণ্য করা অসঙ্গত ছিল না। অন্য মত হলো এই যে, নতুন সন যখন প্রচলন করা হয় তখন ছিল বৈশাখ মাস। তাই বৈশাখ মাসকেই বছরের প্রথম মাস গণ্য করা হয়। ফসল কাটার মাস হিসাবেও বৈশাখের গুরুত্ব রয়েছে। অগ্রহায়ণ মাস আমন ধান কাটা ও মাস-মশুর-সরিষা আবাদের মওসুম হলেও বৈশাখে বাঙালির প্রধান ফসল আউস ধান, তিল, কাউন, প্রধান অর্থকরী ফসল পাট ইত্যাদি কাটার মওসুম। এ সময় বাংলাদেশের প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু, পেয়ারা, কলা, লেবু, আম্রা, বাঙ্গি, তরমুজ ইত্যাদি ফল পাকে। এজন্য বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠকে ‘মধুমাস’ও বলা হয়। নানারূপ ফসল ও ফল পাকার মাস হিসাবে বৈশাখ মাসে নানাবিধ উৎসব-আনন্দেরও আয়োজন হয়ে থাকে। এজন্য বাংলা সনের প্রথম মাসটির একটি আলাদা গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। যেকোন কারণেই হোক, বর্তমানে বৈশাখ মাসই বাংলা সনের প্রথম মাস হিসাবে গণ্য হয়ে আসছে। এখন এটাই সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে।

সম্রাট আকবরের সময় মাসের প্রতিটি দিনের জন্য পৃথক নাম ছিল। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে এ প্রথা বিলুপ্ত করে সপ্তাহের সাতটি দিনের জন্য সাতটি নাম নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত এ সাতটি নামের সাথে রোমান সাপ্তাহিক নামগুলোর সাদৃশ্য চোখে পড়ে।

হিজরী সনের পর অন্য যে সনের সাথে বাংলা সনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তা হলো শকাব্দ। রাজা চন্দ্রগুপ্ত খ্রিস্টপূর্ব ৩১৯ অব্দে গুপ্তাব্দ প্রবর্তন করেন। এ সন পরবর্তীতে ‘বিক্রমাব্দ’ নামে অভিহিত হয়। প্রথমে এ ‘অব্দ’ শুরু হতো চৈত্র মাস থেকে। পরবর্তীতে কার্তিক মাসকে বছরের প্রথম মাস গণ্য করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১৫ সনে ভারতে শক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। শকদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে ৭৮ খ্রিস্টাব্দে শকাব্দ চালু হয়। তখন থেকে বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারে সৌরভিত্তিক শকাব্দের প্রথম মাসের নাম রাখা হয় বৈশাখ। সেদিক থেকে শকাব্দ ও বাংলা সনের প্রথম মাসের নাম অভিন্ন। বাংলা সনের অন্যান্য মাসের নামও শকাব্দের মাসের নাম থেকে গৃহীত হয়েছে। তবে শকাব্দের বৈশাখ মাস যে দিন থেকে শুরু হয়, তার একদিন আগে শুরু হয় বাংলা সনের প্রথম মাস। একারণে আমাদের বৈশাখ আর শকাব্দের বৈশাখের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। হিন্দুদের পূজা-পার্বণ শকাব্দের তারিখ অনুযায়ী প্রতিপালিত হয়।

বাংলা সনের কোন মাস ২৯, কোন মাস ৩০, ৩১ এমনকি ৩২ দিনে গণনার নিয়ম থাকায় এবং এ সম্পর্কিত আরো কিছু সমস্যা থাকায় এ সমস্ত সমস্যা ও জটিলতা দূর করে বাংলা সনের বিভিন্ন দিন-তারিখ একটি বৈজ্ঞানিক ও স্থায়ী ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর উদ্দেশ্যে বাংলা একাডেমী প্রাচ্যের প্রখ্যাত মনীষী, বহু ভাষাবিদ, জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ঈসায়ী ১৯৬৩ সনের মে মাসে ‘বাংলা সালের বিভিন্ন মাসের তারিখ নির্ধারণ উপ-সংঘ’ নামে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। এ উপ-সংঘ বা কমিটি ছিল নিম্নরূপ :

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (সভাপতি), অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান (তদানীন্তন পরিচালক, বাংলা একাডেমী), অধ্যক্ষ আবুল কাসেম (সদস্য), শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র শিরোমণি, জ্যোতিভূষণ (সদস্য), শ্রীযুক্ত অবিনাশ চন্দ্র কাব্য-জ্যোতিষতীর্থ (সদস্য), পণ্ডিত তারাপদ ভট্টাচার্য কাব্য ব্যাকারণ পুরাণ স্মৃতিতীর্থ জ্যোতিশাস্ত্রী (আহ্বায়ক)। উক্ত উপ-সংঘ দীর্ঘ তিন বছর নানারূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা-গবেষণা-পর্যালোচনার পর সহজ পদ্ধতিতে বাংলা সনের বিভিন্ন মাসের তারিখ নির্ধারণের জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশমালা পেশ করেন :

“ক. মুঘল আমলে বাদশাহ আকবরের সময়ে হিজরী সনের সংগে সামঞ্জস্য রক্ষা করে যে বংগাব্দ প্রচলিত করা হয়েছিল তা থেকে বছর গণনা করতে হবে।

খ. ইংরেজি মাস ২৮, ৩০ কিংবা ৩১ দিনে হয়। উপসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলা মাস গণনার সুবিধার জন্য বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত পাঁচ মাসের প্রতি মাস ৩১ দিন হিসাবে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত বাকী সাত মাস ৩০ দিন হিসাবে গণ্য করা হবে।

গ. অতিবর্ষের (লিপইয়ার) চৈত্র মাস ৩১ দিনে হবে। ৪ দ্বারা যে সাল বিভাজ্য, তাই অতিবর্ষ বলে পরিগণিত হবে।” (দ্র. মুহম্মদ আবু তালিব : বাংলা সনের জন্মকথা, পৃ. ৪৮)

ঈসায়ী ১৯৬৬ সনের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত উপসংঘের শেষ বৈঠকে এ সুপারিশমালা পেশ করা হয়। এ বৈঠকে উপসংঘের সকল সদস্য ছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে বাংলা একাডেমীর জীবন-সদস্য অধ্যাপক এম. এ. হামিদ টি. কে. এম. এস-সি উপস্থিত ছিলেন। উক্ত বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হয় যেঃ “যেহেতু রাশি, নক্ষত্র এবং ঋতুর সংগে বাংলা মাসের পর্যায়ক্রম নির্ণয় হয়, সেইজন্য বৈশাখ মাস ১লা এপ্রিল হইতে গণনা করা সম্ভবপর নহে। মুঘল আমলে আকবরের সময় যে বংগাব্দ প্রচলিত করা হইয়াছিল তাহা হইতেই বৎসর গণনা করিতে হইবে এবং সেই হিসাবে আগামী পহেলা বৈশাখ হইবে ১৩৭৩ বাংলা সাল। বাংলা একাডেমীর তরফ হইতে উপরিউক্ত সিদ্ধান্তানুযায়ী ১৩৭৩ সালের জন্য একটি দেওয়াল পঞ্জি তৈয়ার করিতে হইবে।” (দ্র. পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৭-৪৮)

উপসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলা একাডেমী ১৩৭৩ বাংলা সন থেকে উক্ত সুপারিশের আলোকে যথারীতি দেয়াল পঞ্জি প্রকাশ করে। ১৩৭৭ সনে (ঈসায়ী ১৯৭০) বাংলা একাডেমী উক্ত সুপারিশের আলোকে একটি ডায়েরীও প্রকাশ করে। ১৯৭৭ ঈসায়ীতে বাংলাদেশ সরকার বাংলা একাডেমীর বর্ষপঞ্জি সর্বত্র চালু করার নির্দেশ দেন। অতঃপর ১৯৮৮ সনে বাংলাদেশ সরকার পহেলা বৈশাখকে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেন। তখন থেকে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ সরকারী ও বেসরকারীভাবে বাংলাদেশের সর্বত্র জাঁকজমকের সাথে প্রতিপালিত হয়ে আসছে।

বাংলা সনের ইতিহাসে উপরোক্ত ঘটনাক্রমগুলো ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন। বাংলা সনের উদ্ভাবক আমীর ফতেহউল্লাহ শিরাজীর নামের সাথে এভাবে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটি এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর নামও চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। বর্তমানে উক্ত সংশোধিত বাংলা সনই বাংলাদেশে প্রচলিত। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলা সন আর পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত সন এক নয়, তাদের পঞ্জিকাও ভিন্ন। মুসলমানদের দ্বারা আবিষ্কৃত ও প্রবর্তিত এবং সর্বোপরি হিজরী সনের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৪৭ ঈসায়ীতে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাংলা সনের পরিবর্তে শকাব্দ ব্যবহার করে আসছে। এরদ্বারা পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং বাংলা সনের সাথে একাধারে ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও দেশীয় ভৌগোলিক-প্রাকৃতিক যোগসূত্র প্রমাণিত হয়। বস্তুত বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলা সন বিজ্ঞানসম্মত এবং আমাদের জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট।

প্রধানত খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে মুঘল আমলে হিজরী সনকে সৌর হিসাবে পরিবর্তিত করে বাংলা সন তৈরী করা হয়। ফলে বৈশাখ থেকে চৈত্র এটা রাজস্ব-বর্ষ হিসাবে গণ্য হয়। ইংরেজ আমলে সরকারী কাজে ঈসায়ী বা গ্রেগরীয়ান বর্ষ চালু হলেও রাজস্ব আদায়ের জন্য পুরনো রাজস্ব-বর্ষই চালু থাকে। তখন সরকার এবং জমিদার শ্রেণী উভয়েই বাংলা সনের হিসাবে রাজস্ব আদায় করে। পাকিস্তান আমলে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলেও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সরকার অদ্যাবধি ভূমি-রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলা সনের হিসাব বহাল রেখেছেন।

উপরে সনের হিসাব সংরক্ষণের গুরুত্ব, বিভিন্ন সনের উদ্ভব ও বাংলা সনের জন্ম ও তার ক্রম-বিকাশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয় যে, বাংলা সনের সাথে আরবি হিজরি সনের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং এর সাথে বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া, ঋতু-পরিবর্তন, সামাজিক অবস্থা ও জীবন-বৈচিত্র্যের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
photo1

বাংলা সনের উৎপত্তি ও বিকাশ (পর্ব-১)

মুহম্মদ মতিউর রহমান | এপ্রিল ১৪, ২০১৫
Download PDF

সময়ের সাথে জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। জীবন মূলত সময়েরই সমষ্টি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়টাই জীবন। অন্তহীন প্রবহমান সময়ের একটি নির্দিষ্ট ক্ষণে দুনিয়ায় আবির্ভূত হয়ে আরেকটি নির্দিষ্ট ক্ষণে আমরা দুনিয়া থেকে বিদায় নেই। হয়তো বা রেখে যাই কিছু স্মৃতি- মহাকালের বুকে যা সঞ্চিত হয় ইতিহাসের বারিবিন্দু হিসাবে। সময়ের সাথে তাই ইতিহাসেরও একটি সম্পর্ক রয়েছে। সময়ের অতীত ধারাবাহিকতাই ইতিহাস। আমাদের ঐতিহ্য, সভ্যতা, কৃষ্টি ও বিভিন্ন বিচিত্র মানব-কৃতিও বিভিন্ন যুগ ও সময়ের ক্রমাবদান। সে হিসাবে সময় আমাদের জীবন ও কৃতির একান্ত সারথি।

অতএব, সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এ গুরুত্বের বিষয় বিবেচনা করেই সময়কে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও হিসাবের মধ্যে আনার জন্য একে নানা ক্ষুদ্র-বৃহৎ পরিধিতে বিভক্ত করা হয়েছে। পল, অনুপল, সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ, শতাব্দী, সহস্রাব্দ ইত্যাদি নানা ভাগে ও পরিচয়ে সময়কে বিভক্ত করা হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বারিবিন্দু নিয়ে সৃষ্টি হয় বিশাল অতল বারিধি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকণার সমষ্টিতে গড়ে ওঠে বিস্তীর্ণ ধূসর মরুভূমি। সময়ের পল-অনুপল, সেকেন্ড, মিনিট নিয়েও তেমনি সৃষ্টি হয় সীমাহীন অনন্ত কাল-মহাকাল। ইতিহাস সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে শত-সহস্র-কোটি পল-অনুপল-মুহূর্তের ঘন সন্নিবদ্ধ সাঁকো-বন্ধন। আমাদের জীবনও পল-অনুপল-মুহূর্তের সমষ্টি মাত্র। পদ্ম-পত্রে অস্থির, চঞ্চল নীরের মত তার অবস্থান। তবু ক্ষণস্থায়ী জীবনের সাথে সময় ও ইতিহাসের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক বিদ্যমান।

প্রতিটি মুহূর্ত বা সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষত আমাদের জীবন যেখানে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, সীমাবদ্ধকালের গণ্ডিতে আবদ্ধ সেখানে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান এবং যথাযথভাবে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের মধ্যেই এর সার্থকতা। প্রতিদিন প্রত্যূষে নিদ্রাভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে যে দিনটির শুরু হয়, সূর্যাস্তের পর সেটি আর কখনো ফিরে আসে না। পরের দিন সূর্যোদয়ের সাথে আরেকটি নতুন দিনের আগমন ঘটে, পূর্বের দিনটি অতীতের তথা মহাকালের অন্তহীন বুকে বিলীন হয়। এভাবে ক্রমাগত একটির পর একটি নতুন দিন আসে এবং বিগত দিনগুলো স্মৃতিময় অতীত বা ইতিহাসে পর্যবসিত হয়।

এভাবে বর্তমান মুহূর্তগুলো প্রতিনিয়ত অতীত বা ইতিহাসের অন্তহীন গর্ভে বিলীন হয়। একইভাবে দিনরাত্রির পর্যায়ক্রমিক আবর্তনের এক পর্যায়ে এ নশ্বর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্যদিকে, অসংখ্য নতুন জীবনের আগমন ঘটে পৃথিবীতে। ফলে মানব সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রয়েছে। অন্যান্য প্রাণীকুলের অবস্থাও তাই। সময়ের ধারা যেমন অব্যাহত, জীবনের ধারাও তেমনি। কিন্তু একটি জীবনের অবস্থান পদ্ম-পত্রে নীর সদৃশ সময়ের বক্ষপুটে অস্থির, চঞ্চল নীরের মতই ক্ষণস্থায়ী। অতএব, সময়ের আবর্তন, দিনরাত্রির আগমন-নির্গমন অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ, জীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ থেকে যেমন মানুষের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত, তেমনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সঠিক রূপে কাজে লাগানোর ব্যাপারেও বিশেষ যত্নবান হওয়া কর্তব্য। এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনাবলী রয়েছে বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য।” (সূরা আল-ইমরান : আয়াত-১৯০)

এভাবে বিশ্ব-জগতের সৃষ্টি, দিন-রাত্রির আগমন-নির্গমন, ঋতু-বিবর্তন ইত্যাদি বিষয় অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা করলে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি, সময়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সময়ের সদ্ব্যবহারে যত্নবান হতে পারি। আল্লাহর সৃষ্টি-মাহাত্ম্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারি।

জীবন মূলত সময়ের সমষ্টি, একথা শুরুতেই উল্লেখ করেছি। দিনরাত্রির বিবর্তনের এক পর্যায়ে মানুষ দুনিয়ায় আবির্ভূত হয়, আবার নির্দিষ্ট আয়ূশেষে বিদায় গ্রহণ করে। এ আবির্ভাব ও বিদায় মহান স্রষ্টার বিধান ও নির্দেশানুযায়ী এমন নীরবে-সংগোপনে সংঘটিত হয় যে, আমরা সর্বদা তা উপলব্ধি করতেও সক্ষম হই না। অথচ এ আবির্ভাব ও বিদায়ের মধ্যবর্তী সময় যেটাকে আমরা ‘হায়াত’ বলি, তা প্রত্যেকের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনটি কেমন কাটলো, দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কীভাবে ব্যয়িত হলো, এ দিনটিতে কতটা অর্জন বা সঞ্চয় হলো, এ অর্জন বা সঞ্চয় জীবনে কতটা সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে এল, অধিকাংশ সময় তা আমরা খতিয়ে দেখিনা।

এই যে সঞ্চয় বা অর্জনের কথা বললাম তা দু’রকম : একটি বস্তুগত, অন্যটি অবস্তুগত। একটি দৃশ্যমান, অন্যটি উপলব্ধিগত। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুগত প্রাপ্তিতে সকলেই পরিতুষ্ট। তবে, অবস্তুগত প্রাপ্তি হয়ত সত্যিকার জ্ঞানী-বোদ্ধাদের নিকট অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টির গুরুত্ব বুঝানোর জন্য মহান স্রষ্টা সময়ের শপথ নিয়ে বলেনঃ “কসম সময়ের, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে হকের দাওয়াত দেয় ও ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়।” (সূরা আল-আছর : আয়াত-১-৩)

সময়ের সমষ্টিই জীবন, সে সময়ের শপথ নিয়ে আল্লাহ মানুষকে দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। প্রথম শ্রেণী দ্বিতীয় শ্রেণীর বিপরীত। প্রথম শ্রেণীর সুষ্পষ্ট পরিচয় না দিয়ে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। দ্বিতীয় শ্রেণীর পরিচয়ের মধ্যেই প্রথম শ্রেণীর পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক যেসব গুণে গুণান্বিত তার বিপরীতটাই প্রথম শ্রেণীর পরিচয় জ্ঞাপক। এটা আল-কুরআনের বিশিষ্ট প্রকাশভঙ্গি। দ্বিতীয় শ্রেণীর পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন: তারা ঈমানদার (স্রষ্টায় বিশ্বাসী), সৎকর্মশীল, পরস্পরকে অর্থাৎ অন্য সকলকে হকের (সত্য দ্বীন) দাওয়াত দেয়, নিষ্ঠার সাথে হকের পথে চলার জন্য জীবন পথের সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় প্রদান করে থাকে। অন্য শ্রেণীর মানুষ এর বিপরীত। উপরোক্ত গুণাবলী থেকে তারা বঞ্চিত। আল্লাহ্ এ দু’শ্রেণীর মানুষের পরিচয় দিতে গিয়ে এবং উভয়ের চরম পরিণতির কথা বলতে গিয়ে সময়ের কসম খেয়েছেন। এতে সময়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জনৈক মনীষী জীবনকে বরফের সাথে তুলনা করেছেন। বরফ তার বিক্রেতার নিকট মূল্যবান পুঁজি। কিন্তু সময় অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে সে পুঁজি একসময় যখন গলে পানি হয়ে যায়, তখন তার পুঁজি আর অবশিষ্ট থাকে না। জীবনও তেমনি সময়ের অদৃশ্য ভেলায় চড়ে একসময় অনন্তের পথে বিলীন হয়। আমাদের মরদেহও তখন বরফগলা পানির মতোই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। তাই সময় থাকতেই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালনা করা কর্তব্য। সময়ের গুরুত্বটা এখানেই। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীসের উল্লেখ করা যায়। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন : “পাঁচটি বিষয়ের প্রতি (সময় থাকতেই) গুরুত্ব আরোপ কর : বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনের, রোগাক্রান্ত হবার পূর্বে স্বাস্থ্যের, দারিদ্র্য আসার পূর্বে স্বচ্ছলতার, ব্যস্ত হবার পূর্বে অবসর সময়ের, এবং মৃত্যু আসার পূর্বে জীবনের।”

সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরোক্ত হাদীসে বিভিন্নভাবে তাই সময়ের গুরুত্বটাই বিশেষভাবে বুঝানো হয়েছে। সময়ের সাথে জীবনের বিভিন্ন অবস্থার যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক এখানে সেটাই গুরুত্ব সহকারে বুঝানো হয়েছে এবং সময়কে যথাসময়ে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

হিসাবের সুবিধার জন্য নানা যতিচিহ্ন দিয়ে অখণ্ড সময়কে নানা ক্ষুদ্র-বৃহৎ পরিসরে বিভক্ত করা হয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনার জন্য শতাব্দী, সহস্রাব্দ ইত্যাদির হিসাবটা স্বাভাবিক, কিন্তু একটি জীবনের জন্য তা অতিশয় দীর্ঘ। সহস্রাব্দ তো অকল্পনীয়, শতায়ূ হবার নসীবই ক’জনের ভাগ্যে ঘটে? দশক, বছর, মাস বা তার চেয়েও ক্ষুদ্র সময়-পরিসরকে কেন্দ্র করেই জীবনের সকল ভাবনা, পরিকল্পনা ও কর্মায়োজন। জীবনের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মায়োজনকে একটি সুষ্ঠ নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনার জন্য সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বর্ষ ইত্যাদি গণনার সূত্রপাত। জীবনে আমাদেরকে অনেক কিছু করার প্রয়োজন হয়। হিসাব করে নিয়মমাফিক সবকিছু না করলে জীবনে সাফল্য আসে না। সেজন্যই মানুষ সময় নিরূপণের জন্য ঘড়ি আবিষ্কার করেছে, দিন-তারিখ মেলাবার জন্য পঞ্জিকা, ক্যালেন্ডার ইত্যাদি তৈরি করেছে। আমরা এখন ঘড়ি, পাঁজি-পুঁথির হিসাব অনুযায়ী চলতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি। এসব আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ দিন-রাত্রির আবর্তন, সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্রের পরিক্রমণ, ঋতুর পরিবর্তন, প্রকৃতির দৃশ্যমানতার বিবর্তন, জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল ছিল। এখন মানুষ সময়কে অতি সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে এসেছে।

মহান স্রষ্ট্রা বিশ্ব-জগৎ সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই সন গণনার সূচনা করেছেন। এদিক থেকে মানুষের যিনি স্রষ্ট্রা, তিনিই আদিকাল থেকে সনের সৃষ্টি করেছেন। দিন-ক্ষণ, মাস-বছর ইত্যাদি গণনার সূত্রপাত হয়েছে পৃথিবীর সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই। মহামহিম আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেনঃ “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট বছর গণনার মাস বারোটি, তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান।” (সূরা তাওবা : আয়াত-৩৬, আংশিক)

পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সনের উৎপত্তি হলেও প্রত্যেক সনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, প্রতি সনের মাসের সংখ্যা বারো। অবশ্য প্রত্যেক সনের মাসের সংখ্যা বারো হলেও, প্রতি মাসে দিনের সংখ্যা বা প্রতি সনে বর্ষের দিন সংখ্যায় তারতম্য রয়েছে। এর কারণ কোন সন চন্দ্রের হিসাব এবং কোন সন সূর্যের হিসাবে চলে। চন্দ্রের হিসাবে নিরূপিত সনকে চান্দ্রবর্ষ এবং সূর্যের হিসাবে নিরূপিত সনকে সৌরবর্ষ বলে। চান্দ্রবর্ষ হয় ৩৫৪ দিন ৯ ঘন্টায় এবং সৌরবর্ষ হয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টায়। ফলে চান্দ্রবর্ষ অপেক্ষা সৌরবর্ষ ১০/১১ দিন বড়। সৌরবর্ষ সূর্যের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় বাৎসরিক ঋতু-পরিক্রম বা মাস, দিন, ঘন্টা, মিনিট ইত্যাদি নির্দিষ্ট সময়ে আবর্তিত হয়। ফলে আমাদের হিসাব ও গণনার কাজে বিশেষ সুবিধা হয়। তাছাড়া, অমাবষ্যা, পূর্ণিমা, সমুদ্রের জোয়ার-ভাঁটা ইত্যাদি চন্দ্র-পরিক্রমণের সাথে যুক্ত। চান্দ্রবর্ষ চন্দ্র-পরিক্রমের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় এবং সৌরবর্ষ থেকে এটা ১০/১১ দিন কম হওয়ায় রোযা, হজ্জ ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় ইবাদতসমূহ পালনে সুবিধা হয়। বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষই বছরের সব ঋতুতে ঘুরে-ফিরে রমযান, হজ্জ, ঈদ ইত্যাদি পালনের সুযোগ পায়। অন্যথায়, কোন দেশে প্রতি বছর শুধু শীতকালেই রমযান পালিত হতো, আবার কোন দেশে শুধু গ্রীষ্মকালেই রমযানের আগমন ঘটতো। তা হতো ন্যায়বিচার বা ইনসাফের খেলাফ। কিন্তু মহান স্রষ্টার বিধানে কোন অবিচার বা বৈষম্য নেই। তাই তিনি এসব ইবাদতকে চান্দ্রবর্ষের সাথে সংযুক্ত করে পৃথিবীর সব অঞ্চলের সকল মানুষের প্রতি সুবিচার করেছেন। বান্দার প্রতি আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। এ নিয়ামত ও তার তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেনঃ “তিনিই উষার উন্মেষ ঘটান, তিনিই বিশ্রামের জন্য রাত্রি এবং গণনার জন্য সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করেছেন, এ সবই পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিরূপণ।” (সূরা আন্আম : আয়াত-৯৬)

আল্লাহ বলেনঃ “তিনিই সূর্যকে তেজষ্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং এর মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ কোন কিছুই নিরর্থক সৃষ্টি করেন নি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এসমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন। দিন ও রাত্রির পরিবর্তনে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সে সব কিছুর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে মুত্তাকীদের জন্য।” (সূরা য়ূনুস : আয়াত-৫ ও ৬)

আল্লাহ্‌ অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে সূর্য ও চন্দ্র দু’টি স্পষ্ট নিদর্শন। একটি তেজষ্কর, অন্যটি জ্যোতির্ময়। একটি জগতের তাবৎ প্রাণিকূলকে নানা কর্মের আয়োজনে সজাগ ও কর্মচঞ্চল করে তোলে, অন্যটি বিশ্রাম ও নিদ্রার স্বপ্নময় ভুবনে নিয়ে যায়। এ দু’টি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছুর সুনির্দিষ্ট পরিক্রমের ফলে দিন-রাত্রি, মাস-বছর, ঋতু-তিথির হিসাব সংরক্ষণ এমনকি, পৃথিবীর সকল সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ “সূর্য ও চন্দ্র পরিক্রম করে নির্ধারিত কক্ষপথে।” (সূরা আর-রাহমান : আয়াত-৫)

আল্লাহ রাত ও দিনের নিদর্শনদ্বয়ের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেনঃ “আমি রাত ও দিনকে করেছি দু’টি নিদর্শন; রাত্রির নিদর্শন অপসারিত (অর্থাৎ অন্ধকারে আচ্ছাদিত) করেছি এবং দিনের নিদর্শনকে আলোকপ্রদ করেছি যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বর্ষ-সংখ্যা ও হিসাব নিরূপণ করতে পার।” (সূরা বনি ইসরাঈল : আয়াত-১২)

দিন ও রাত্রি, চন্দ্র এবং সূর্যের নির্দিষ্ট আবর্তন ও তার গূঢ় তাৎপর্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ “তাদের জন্য এক নিদর্শন রাত্রি, তা থেকে আমি দিবালোক অপসারিত করি, সকল কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এবং সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চন্দ্রের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মনযিল (এ হিসাবে জ্যেতির্বিজ্ঞানীগণ চান্দ্রমাসকে ২৮টি মনযিল বা তিথিতে বিভক্ত করেছেন); অবশেষে তা শুষ্ক বক্র, পুরাতন খর্জুর শাখার আকার ধারণ করে। সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রজনীর সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা; এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (সূরা ইয়াসীন : আয়াত-৩৭-৪০)

পৃথিবীতে বিভিন্ন সন বা বর্ষপঞ্জি আবিষ্কারের পিছনে বিশেষ ঘটনা বা ইতিহাস রয়েছে। প্রাচীন মিসরীয় পণ্ডিতগণ বছরের পর বছর নীলনদের জোয়ার-ভাটা ও সন্নিহিত অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে বছর গণনার রীতি চালু করেন। রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার ঈসা-পূর্ব ৪৬ অব্দে মিসর জয় করে মিসরীয়দের মধ্যে প্রচলিত সৌরবর্ষ বা ঋতুচক্রের হিসাবে প্রণীত পঞ্জিকা সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। সিজার মিসরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী সোসিজেনিসের সহযোগিতায় রোমান বর্ষপঞ্জির ব্যাপক সংস্কার করেন। তিনি রোম-সাম্রাজ্যে সর্বপ্রথম সৌরবর্ষ পঞ্জিকার প্রচলন করেন। ইতঃপূর্বে ইংরেজি নববর্ষ ১ মার্চ থেকে গণনা করা হতো। সিজার এর রীতি পরিবর্তন করে ১ জানুয়ারি থেকে নববর্ষ গণনা শুরু করেন। তখন থেকে প্রাচীন রোমান বর্ষপঞ্জির নাম হয় সিজারিয়াস বর্ষপঞ্জি। রোম নগরীর পত্তনকালের স্মরণে রোম বা সিজারিয়াস বর্ষপঞ্জির সূত্রপাত।

বর্তমান বিশ্বে ক্রিশ্চিয়ান এরা বা খ্রীস্টাব্দ অর্থাৎ ঈসাব্দ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ সনের প্রবর্তন হয় হযরত ঈসা (আ.) বা খ্রীস্টানদের নিকট যিনি যীশু খ্রীস্ট নামে পরিচিত তাঁর স্মরণে। অবশ্য হযরত ঈসার জীবিতাবস্থায় নয়; তাঁর মৃত্যুর ৭৫০ বছর পর রোমের খ্রীস্টান পাদ্রীগণ এ বর্ষগণনা শুরু করেন। পরবর্তীতে ইউরোপ-আমেরিকা তথা সমগ্র বিশ্বের বিস্তৃত জনপদে খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারিত হবার ফলে এবং তারও পরে ইংরেজ, ফরাসী ও ওলন্দাজ সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের প্রায় সর্বত্র বিস্তৃত হবার ফলে খ্রীস্টাব্দ বা ঈসাব্দও পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ও প্রচলিত সর্বাধিক জনপ্রিয় সন এটা। ইংরেজ আমল থেকে আমাদের দেশেও এর প্রচলন ঘটেছে, এমনকি, কার্যত বাংলা সনের চেয়েও এর প্রচলন ও জনপ্রিয়তা অধিক। সরকারী অফিস-আদালত, শিক্ষায়তন ইত্যাদি সর্বত্র ইংরেজি সনের প্রচলন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। ইংরেজ আমলে এ রীতি চালু হয়েছে, স্বাধীনতার পরও তা অব্যাহত রয়েছে।

ঈসাব্দের পরেই দ্বিতীয় প্রধান আন্তর্জাতিক সন হিসাবে হিজরী সনের প্রচলন ও এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পরিলক্ষিত হয়। আগে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র রাজকার্য বা সরকারীভাবে হিজরী সনের প্রচলন থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার স্থান দখল করেছে ঈসাব্দ বা খ্রীস্টাব্দ। তবে তার পাশাপাশি হিজরী সন এখনো টিকে আছে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র। অন্য কোন কারণে না হলেও একমাত্র ধর্মীয় কারণে এ সন মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র সর্বদা অনিবার্যভাবে টিকে আছে ও থাকবে। কারণ রোযা, হজ্জসহ ইসলামের বহু ইবাদত যেমনঃ দুই ঈদ, শবে কদর, শবে বরাত, আশুরা, ঈদে মিলাদুন্নবী, আখিরী চাহার সোম্বা ইত্যাদি সরাসরি হিজরী সন বা চান্দ্রমাসের সাথে সম্পৃক্ত।

দ্বিতীয় পর্বঃ

বাংলা সনের উৎপত্তি ও বিকাশ (পর্ব-২)

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
bangla noboborsho o amader songskriti

বাংলা নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি (পর্ব-২)

মুহম্মদ মতিউর রহমান | এপ্রিল ১৩, ২০১৫
Download PDF

প্রথম পর্বঃ

বাংলা নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি (পর্ব-১)

বাংলাদেশ সর্বদাই ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। বিশেষত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি ইসলামের অনুসারী। ইসলাম মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি প্রচার করে। ফলে মুসলমানগণ সহনশীলতা, মানবিক সম্প্রীতি ও উদার ভ্রাতৃত্ববোধে বিশ্বাসী। অন্য ধর্মের উপর জোর-জবরদস্তিতে তারা বিশ্বাসী নয়। বাংলাদেশে মুসলিম শাসনামলের সাড়ে পাঁচশ বছরের ইতিহাসে একটিও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় নি। মুসলিম শাসকগণ সর্বদা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমান ও উদার ব্যবহার করতেন, কেউ ন্যায়বিচার ও রাজানুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হতো না। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনে তারা ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও নির্বিবাদে তারা স্ব স্ব ধর্ম পালন করত। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায়ও সকলে মুসলিম শাসকদের নিকট থেকে সমান পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতো।

পরবর্তীতে ইংরেজ আমলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহুলাংশে বিনষ্ট হয়। তখন মুসলমানগণ নানাভাবে বঞ্চিত, শোষিত ও নির্যাতিত হতে থাকে। অন্যদিকে, হিন্দুরা রাজানুগ্রহ পেয়ে অপরিমিত বিত্ত-বৈভব, জমিদারি-জোতদারি, চাকরি-বাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে রাতারাতি অকল্পনীয় উন্নতি লাভ করে। ইংরেজদের ভেদ-নীতির কারণে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। রাজানুগ্রহপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দ্বারা সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানগণ নানাভাবে নিগৃহীত হতে থাকে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির মূল কারণ এটাই। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাক্কালে উপমহাদেশের মুসলমানদের ন্যায্য দাবি অনুযায়ী যখন ভারত বিভক্ত হয়ে ‘পাকিস্তান’ নামে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরো ভয়াবহ রূপ লাভ করে। ইংরেজ আমলে রাজানুগ্রহ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে হিন্দুরা মুসলিম সমাজের উপর দীর্ঘকাল ধরে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক আধিপত্য বিস্তার ও শোষণ-নিপীড়ন চালিয়েছে, মুসলমানদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে হিন্দুদের সে আধিপত্য বজায় থাকবে না বলে তারা এ ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হিংসা ও নানারূপ বিদ্বেষমূলক আচরণ শুরু করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য স্বাধীন, স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে সহজে মেনে নিতে পারে নি। ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। বিভাগোত্তরকালে স্বাধীন ভারতে এ দাঙ্গা তথা সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিম নিধন-নির্যাতন অব্যাহত থাকলেও, স্বাধীন পাকিস্তানে তথা বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বদাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজমান রয়েছে।

বাঙালি হিন্দু-মুসলিম আবহমান কাল থেকে বৈশাখ মাসে নিজ নিজ ধর্মীয় বিধান ও প্রথানুযায়ী বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানের সাড়ম্বর আয়োজন করলেও বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখে তারা তেমন কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো বলে জানা যায় না। বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখ উদযাপনের রীতিটি সাম্প্রতিক কালের। প্রধানত ইংরাজি নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি-রেওয়াজের অনুসরণেই বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। ফলে প্রথমোক্তের প্রভাব আমাদের নববর্ষ উদযাপনে বহুলাংশে প্রতিফলিত। অবশ্য ইদানীং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চেয়ে হিন্দু সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব নববর্ষ উদযাপনে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাঙালি হিন্দুরা আবহমানকাল থেকে চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে যেসব উৎসব-অনুষ্ঠান বা মেলার আয়োজন করতো এখন বাঙালি মুসলমানগণ, বিশেষত শহরের একশ্রেণির মানুষ, বাংলা নববর্ষ অনেকটা সেভাবেই আনন্দ-ফূর্তির সাথে করা শুরু করেছে। একশ্রেণির মুসলিম নামধারী বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতি-কর্মীরাই এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এটাকে ‘মিশ্র সংস্কৃতি’ বা হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবজাত বলা যায়। কোন বিশেষ সংস্কৃতির স্বভাব-প্রকৃতি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন অন্য সংস্কৃতি তার উপর ভর করে। যেমন সেন আমলে বাংলাদেশে বৌদ্ধ আধিপত্য খর্ব হবার ফলে ক্রমান্বয়ে বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতিও হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে এক লোকজ ধর্ম-সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে।

১৯৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এবং ১৯৭১ সনে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আমরা যেসব উৎসব-অনুষ্ঠান করে থাকি একমাত্র সেগুলোকেই আমাদের সর্বজনীন উৎসব-আনন্দরূপে গণ্য করা চলে। এছাড়া, শতকরা ৯০ জন মুসলিম অধ্যূষিত বাংলাদেশে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকেও যৌক্তিকভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা যায়। ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশ বা বিধান পালনার্থে যে বিশিষ্ট জীবনধারা গড়ে উঠেছে সেটাই বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি। আল-কুরআন ও আল হাদীসের নির্দেশানুযায়ী তা পালিত হয়ে আসছে। তবে যুগে যুগে তার মধ্যে কিছুটা বিকৃতি ঘটেছে, ইদানীং সে বিকৃতির মাত্রা হয়তো আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা ঘটেছে মুসলমানদের অজ্ঞতা ও ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশী-বিজাতীয় প্রভাবের ফলে।

পাকিস্তান আমলে বিংশ শতকের ষাটের দশকে একটি বিশেষ ধর্ম-নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে সর্বপ্রথম ১লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। বিশেষ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির উদ্যোগে রমনার বটমূলে গান-বাজনা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা নববর্ষ করা হয়। ১৯৬৬ সন থেকে আয়োজিত সে অনুষ্ঠান দিনে দিনে ব্যাপকতর হয়। বাংলাদেশ হওয়ার পর তা আরো নানাভাবে জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ১লা বৈশাখ সরকারী ছুটির দিন ঘোষিত হবার ফলে স্বভাবতই এ দিনটির গুরুত্ব এখন আমাদের নিকট পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় অধিক। অতএব, এ দিনটি বর্তমানে নানা উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে সরকারী-বেসরকারীভাবে উদযাপিত হচ্ছে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দিনটি উদযাপনের কোন নির্দিষ্ট নীতি বা কর্মসূচী সাধারণ্যে প্রচারিত না থাকায় যে যেমন খুশী তেমনিভাবে তা উদযাপন করছে।

শুরুতে ১লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি যদিও রাজধানী শহরেই বিশেষরূপে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু ক্রমান্বয়ে তা বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। কারণ মাছের পচন তো শুরু হয় মাথা থেকেই। আবহমান বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে প্রতিফলিত নয় কেন সেটা যেমন একটি মৌলিক প্রশ্ন, তেমনি হঠাৎ করে বিজাতীয় ইসলাম-বিরোধী নানা অপসংস্কৃতি বিশেষত হিন্দু সংস্কৃতির নানা উৎকট পৌত্তলিক বা কুফরী প্রভাব আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কীভাবে, কাদের দ্বারা, কোন্ উদ্দেশ্যে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে, তা আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য তাগিদেই গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সহস্রাধিক বছর ধরে আমরা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য টিকিয়ে রেখেছি এবং তার ভিত্তিমূলেই আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে, এবং সে স্বতন্ত্র জাতিসত্তা স্বরূপ ও প্রাণশক্তিতে এতই প্রবল যে, তা শেষ পর্যন্ত উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে এক স্বতন্ত্র, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করে। সহস্রাধিক বছরের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফলে আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তার উদ্ভব ঘটে। আর একথা অস্বীকার করার কোন সঙ্গত কারণ নেই যে, ১৯৪৭ সনে বাংলাদেশের যে এলাকাসহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়, সে এলাকা নিয়েই ১৯৭১ সনে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটে। অথচ বিগত কয়েক দশকের মধ্যে আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিহ্ন করে তথাকথিত ‘সনাতন সংস্কৃতি’র নামে এক পৌত্তলিক অপসংস্কৃতি আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়ার অপতৎপরতা শুরু হয়েছে। এ অপসংস্কৃতির নগ্ন হামলা প্রতিরোধ করার জন্য আজ সকল বুদ্ধিজীবী ও সচেতন শিক্ষিত সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলা নববর্ষের নামে বর্তমানে যে সব অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হয়, বাঙালি মুসলমানদের আবহমান সংস্কৃতি ও জীবনাচারের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। বরং বাংলা নববর্ষের নামে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবী যা কিছু করছেন তা মূলত হিন্দু সংস্কৃতিরই প্রতিরূপ। ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র নামে তা চালাবার ও একে সর্বজনীন বাঙালির সংস্কৃতি বলে দাবি করা হলেও শতকরা নব্বই জন বাঙালি তথা বাংলাদেশী মুসলমানের ঈমান-আকীদা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে তা সংগতিপূর্ণ নয়। এটা আমাদের জন্য বিজাতীয় অপসংস্কৃতি। বিগত হাজার বছর ধরে আমরা এ অপসংস্কৃতির প্রভাব এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়েছি, আমাদের নিজস্ব প্রাণবন্ত সংস্কৃতির চর্চা ও উৎকর্ষতার মাধ্যমে। আমরা যদি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা না করতাম এবং সে সংস্কৃতি যদি এতটা প্রাণবন্ত ও উৎকৃষ্টতর না হতো, তাহলে আমাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার বিকাশ কখনো ঘটতো না এবং আমরা কখনো স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করতে পারতাম না। আজকের স্বাধীনতা আমাদের সে স্বতন্ত্র জাতিসত্তারই অনিবার্য ফল। স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তা এক ও অবিমিশ্র, পরস্পর নির্ভরশীল। স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ করা একান্ত অপরিহার্য। আত্মবিস্মৃতি কালক্রমে আত্মঘাতি হয়ে দেখা দেয়। তাই এ অপসংস্কৃতি তথা তৌহিদী বিশ্বাসের খেলাপ পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসন সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে এবং তা প্রতিহত করে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উজ্জীবন বা চর্চা করার জন্য সচেতন শিক্ষিত মহলকে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলা সন বাঙালি মুসলমানের ঐতিহ্য। বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চেতনা, জীবনাচার ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই বাংলা নববর্ষ চিরকাল উদযাপিত হয়ে এসেছে এবং এখনও সে ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে হবে। নববর্ষের অনুষ্ঠান আজ বিশ্বব্যাপী সর্বত্র অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রত্যেক দেশ ও জাতি তাদের স্ব স্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতির আলোকেই নববর্ষের অনুষ্ঠান করে থাকে। মুঘল আমলে তৎকালিন শাসক-সম্প্রদায়ের অনুসরণে উচ্চ পর্যায়ের অভিজাত মহলে ‘নওরোজ’ উদযাপিত হয়েছে। ইংরেজ আমলে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের রেওয়াজ শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে শুরু হয়। ইংরেজরা আমাদের দেশ থেকে বিদায় নিলেও, ইংরেজি শিক্ষা-সভ্যতা ও মন-মানসিকতায় গড়ে ওঠা একশ্রেণির বিত্তবান পাশ্চাত্যপন্থিরা এখনো তার অনুবর্তন করে চলেছে। বরং ইদানিং ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে অভিজাত হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং নব্য বিত্তবান শ্রেণির কিছুসংখ্যক তরুণ-তরুণী যে ধরনের উচ্ছৃংখল আচার-আচরণ ও অনৈতিক-সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু করেছে, তা নিউইয়র্ক-লন্ডন-প্যারিসের তথাকথিত অভিজাত লম্পটদের আচরণকেও হার মানায়। এটাও এক নিকৃষ্ট ধরনের অপসংস্কৃতি। নববর্ষ উদ্যাপনের নামে যে ধরনের লাম্পট্য শুরু হয়েছে, তা কোন সুরুচি-শালীনতার পরিচায়ক নয়, কোন ভদ্র-সভ্য সমাজের নিকটই তা গ্রহণীয় হতে পারে না।

বাংলা সনের প্রথম দিনে আগে কোন অনুষ্ঠান হতো না বলে এখন হতে পারবে না, তা নয়। অবশ্য হতে পারে। তবে তা হতে হবে আমাদের নিজস্ব গৌরবোজ্জ্বল আদর্শ-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আদলে, বিজাতীয় অপসংস্কৃতির প্রভাবে নয়। এক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাস থেকে দুটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করা যায়। একটি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সময় এবং অন্যটি তার কিছু পরে সংঘটিত হয়। কিন্তু ইসলামের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারায় তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রসঙ্গত এখানে তার উল্লেখ করা হল।

রাসূলুল্লাহ্ (স) মক্কা থেকে হিজরত করে যখন মদীনায় গেলেন, তখন দেখলেন সেখানকার মুসলিম ও অমুসলিম সকলেই বছরের একটা নির্দিষ্ট দিনে আনন্দ-উৎসব করে। এ আনন্দ-উৎসব ছিল নেহায়েতই প্রথাগত, সামাজিক রীতি-নীতি অনুযায়ী। এর মধ্যে কুফরী ও ইসলাম-বিরোধী অনেক উপাদান থাকায় তিনি মদীনার মুসলমানদেরকে ডেকে বললেন যে, তোমরা এটা কীসের উৎসব পালন করছো? উত্তরে তারা বললো, পুরুষানুক্রমে আমরা এ ধরনের উৎসব পালন করে আসছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) বললেন, আজ থেকে এ ধরনের উৎসব পালন থেকে বিরত হও। আল্লাহ এর বদলে তোমাদের জন্য বছরে দুটি উৎসবের দিন নির্ধারণ করেছেন- একটি ঈদ-উল ফিতর ও আরেকটি ঈদ-উল আযহা। এভাবে উৎসব-আনন্দ করার সুযোগ বহাল রেখে রাসূলুল্লাহ্ (স) উৎসবের মূল নীতি, প্রকৃতি ও উদ্দেশ্যকে বদলে দিলেন। কুফরী রীতি-নীতির বদলে ইসলামী রীতি-নীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা সেটাকে পরিমার্জিত, পরিশীলিত ও উৎকর্ষমণ্ডিত করলেন।

অন্য আরেকটি উদাহরণ দেয়া যায় পারস্যের ইতিহাস থেকে। ইসলাম-পূর্ব যুগে ইরানে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে ‘নওরোজ’ উৎসব পালিত হতো। সুপ্রাচীন কাল থেকে পারস্য বা বর্তমান ইরানে এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। প্রাচীন ইরানের ফারস এলাকায় জরাথুস্ত্রীয়রা নববর্ষের সূচনায় এ অনুষ্ঠান পালন করতো। অবশ্য এটা তারা পালন করত তাদের ধর্মীয় বিধান ও আচার-আচরণ অনুযায়ী। এদিনে তারা ‘আহুরমাজদার’ (স্রষ্টা) উদ্দেশ্যে নিজেদেরকে নিবেদন করে তাঁর নিকট সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ঈমান, সদুপদেশ, সৎকর্ম, সৌভাগ্য, ক্ষমা ও অমরত্ব প্রার্থনা করতো। এগুলো অবশ্য সবই মানবিক মূল্যবোধের পরিচায়ক, কিন্তু এর উৎসে রয়েছে শেরক্। তাই ইসলাম গ্রহণের পর ইরানিরা এ শেরক্ মূলোচ্ছেদ করে ইসলামী রীতি-নীতি অনুযায়ী তা পালনের ব্যবস্থা করে।

ইরানে ইসলাম আগমনের পর নওরোজ উৎসব বহাল রাখা হলেও তা ইসলামী ধারণা-বিশ্বাস অনুযায়ী প্রতিপালনের ব্যবস্থা করা হয়। ইরানিরা নওরোজকে ঈদ-ই-নওরোজ বলে। ঈদ মানে খুশী, দুই ঈদের আনন্দ-উৎসবের মতোই সেখানে নওরোজ উৎসব পালিত হয়। ইরানে শিয়া মতাবলম্বীদের প্রাধান্য। শিয়াদের নেতা, আওলাদে রাসূল (স) ইমাম জাফর সাদেকের (রা) নির্দেশ ছিল : “নওরোজে তোমরা রোজা রাখো, গোসল করো, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করো, খুশবু ব্যবহার করো, চার রাকাত নামাজ পড়ো।”

এ নির্দেশ অনুযায়ী ইরানি মুসলমানগণ নওরোজের শুরুতে অযু করে পাক-সাফ হয়ে নামায পড়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করার মাধ্যমে উৎসব শুরু করে। দোয়াতে আল-কুরআনের আয়াত উল্লেখ করে বলা হয়: ‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব ওয়াল আবসার, ইয়া মুদাব্বিরাল লাইলি ওয়ান্নাহার, ইয়া মুহাববিলাল হাল ওয়াল আহওয়াল, হাববিল হালানা ইলা আহসানিল হাল।’ অর্থাৎ ‘হে অন্তরসমূহ ও দৃষ্টিসমূহের বিবর্তনকারী, হে বৎসর ও অবস্থাসমূহের পরিবর্তনকারী, আমাদের অবস্থাকে উত্তম অবস্থায় পরিবর্তন করুন।’ এভাবে প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত একটি সামাজিক প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠানকে মুসলমানগণ ইসলামী ধারায় রূপান্তরিত করেন।

ইমান, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সালাত ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়। এটা ইসলামী সংস্কৃতিরও মৌল উপাদান। সংস্কৃতি মানে সংস্কার, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বচ্ছতা, উৎকর্ষতা, সুরুচি ও সৌন্দর্য। ইসলাম এ সবের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। সৎ, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, সুরুচিসম্পন্ন, নিষ্কলুষ জীবন গঠনই ইসলামের মূল উদ্দেশ্য। সুস্থ, উৎকর্ষমণ্ডিত সংস্কৃতি নির্মাণেরও এগুলো মৌল শর্ত। সেভাবে নওরোজ অনুষ্ঠানের রীতি-নীতি পরিবর্তন করে ইরানি মুসলমানগণ তা যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছে। ইরানে ইসলামী বিপ্লব সাধনের পরও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। যে কোন দেশের সংস্কৃতিতে সে দেশের ধর্মীয়, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জাতীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে থাকে। যা কিছু এর বিপরীত তা অবশ্যই অপসংস্কৃতি হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে। ইরানের নওরোজ উৎসবেও এ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইসলাম-পূর্ব যুগে সে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ছিল এক রকম, ইসলামের আগমনের পর তা ভিন্নরূপ লাভ করেছে। ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পরও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে।

কিন্তু বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ক্ষেত্রে আমরা বিপরীত চিত্রটিই লক্ষ্য করছি। পূর্ব থেকে বাঙালি মুসলমানগণ নিজস্ব ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী বাংলা নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠান অর্থাৎ হালখাতা, নবান্ন ইত্যাদি পালন করে আসছে। ইদানীং তাদের সে সাংস্কৃতিক রূপ-রীতি পরিবর্তন করে তথাকথিত ‘সনাতন সংস্কৃতি’র নামে বিজাতীয় রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান তাদের উপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটা আমাদের সংস্কৃতির উপর এক নগ্ন হামলা। এর দ্বারা আমাদের সংস্কৃতিকে বিকৃত করে একে এক ধরনের অপসংস্কৃতিতে পরিণত করার অপপ্রয়াস সুস্পষ্ট। বাংলা নববর্ষ বাঙালি মুসলমানগণ আগে থেকে যেভাবে প্রতিপালন করে আসছে, এখনো তা অব্যাহত থাকা উচিত। কাল-বিবর্তনে সবকিছুর মধ্যেই উন্নতি, সংযোজন, উৎকর্ষসাধন অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু তা অবশ্যই আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।

বাংলা সন যেমন আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে, বাংলা নববর্ষ উদযাপনেও তেমনি আমাদের আদর্শ-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটা বাঞ্ছনীয়। তাই বিদেশী-বিজাতীয় সংস্কৃতি তথা অপসংস্কৃতির প্রভাব থেকে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানমালাকে বিমুক্ত রাখা আমাদের একান্ত কর্তব্য। আমাদের নিজস্ব বোধ-বিশ্বাস ও আচরিত সংস্কৃতির রূপরেখা অনুযায়ী তা পালিত হওয়া বা তার চর্চা করা কর্তব্য। পৌত্তলিকতা, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, উশৃঙ্খল ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ আমাদের সংস্কৃতির সাথে অসংগতিপূর্ণ। তৌহিদী জীবনবোধসম্পন্ন সুস্থ, সুরুচিপূর্ণ সংস্কৃতিই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির মৌল পরিচয়। সুস্থ সংস্কৃতি, সুস্থ-সুন্দর-স্বাস্থ্যেজ্জ্বল জাতি গঠনের অপরিহার্য শর্ত। হীনমন্যতা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে নয়, বরং ইতিবাচক ও প্রত্যয়ী মনোভাব থেকেই সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে আমাদেরকে অপসংস্কৃতির মোকাবেলা করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, যেসব অনুষ্ঠান জাতীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের বিপরীত এবং যেসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেলেল্লাপনাকে প্রশ্রয় দেয়া হয় এবং নৈতিকতার অধঃগতি ঘটে, তা সংস্কৃতি নয়, অপসংস্কৃতি। সংস্কৃতি হলো পরিশীলিত, পরিমার্জিত, সুস্থ, বিকাশোন্মুখ চেতনার ধারক। যা কিছু অসুস্থ, অমার্জিত ও নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটায় তাই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি যুগে যুগে বিভিন্ন দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। মুসলিম জাতিরও অবক্ষয় শুরু হয়েছিল অপসংস্কৃতির প্রভাবে। স্বকীয় আদর্শ, ঐতিহ্য ও নৈতিক চেতনা বিস্মৃত হয়ে বিজাতীয়, অনৈতিক অপসংস্কৃতি গ্রহণ করার ফলেই মুসলমানদের পতন ঘটে। সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের মাধ্যমে যে স্খলন শুরু হয়, ক্রমান্বয়ে তা রাজনৈতিক-সামাজিক ও জাগতিক অবনতির পথ প্রশস্ত করে। ফলে অন্যের অধীনে মুসলিম জাতিকে দীর্ঘ কাল পরাজিত-অবহেলিত ও দুর্দশাগ্রস্ত জীবনযাপন করতে হয়।

আমরা কি অনিবার্য ধ্বংসের দিকে যেতে চাই, না সুস্থ-সুন্দর জীবনবোধে উজ্জীবিত হয়ে মহৎ ও কল্যাণময় জীবন গড়তে চাই? সে মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা করে জাতীয় সাংস্কৃতিক নীতিমালা তৈরি করে জাতিকে সুষ্ঠু-সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সমাজের সুস্থ বিবেকবান মানুষকে সচেতনভাবে বিচার-বিবেচনা করে নিজেদের কর্তব্য নির্ধারণ করতে হবে। জাতীয় গৌরব ও ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনা এর উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির মৌল স্বভাব এদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস, জাতীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, জীবন-যাপন পদ্ধতি ও আচার-আচরণের ভিত্তিতে পরিনির্মিত। সহস্রাধিক বছর ধরে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের গভীরে অন্তঃসলিলার ন্যায় এর মূল স্রোতধারা প্রবহমান। মূলধারার পাশাপাশি অনেক সময় ক্ষুদ্র প্রস্রবণ বা নির্ঝর উদ্গত হয়। এগুলোকেও উপেক্ষা করা যায় না। এগুলো তার নিজস্ব রূপ, স্বভাব ও প্রকৃতি নিয়ে সর্বদা বিরাজমান থাকে। এটা যেমন বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করে, তেমনি সৌন্দর্য সৃষ্টিতেও সাহায্য করে।

সুপ্রাচীন কাল থেকে বাংলাদেশে কখনো আর্য, কখনো অনার্য, কখনো হিন্দু, কখনো জৈন, কখনো বৌদ্ধ, আবার কখনো লোকজ মিশ্র সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। মুসলমানদের আগমনের পর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ক্রমান্বয়ে মুসলমান হবার ফলে এদেশে ইসলামী সংস্কৃতির প্রাধান্য সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের সামাজিক রূপ ও জাতীয় বৈশিষ্ট্য তার ভিত্তিতেই পরিচিহ্নিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও হিন্দু, বৌদ্ধ, বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠির সংস্কৃতিও নির্বিবাদে তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। শাসক বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ কখনো তাতে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। মুসলিম শাসনামলের সাড়ে পাঁচশ বছর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ বাঙালি শান্তি, সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতি-সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও রীতি-নীতি অনুযায়ী স্বচ্ছন্দে নিরুদ্বিগ্ন জীবন-যাপন করেছে। সৃষ্টিশীল কাজেও তারা পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করেছে। শাসন-ক্ষমতা মুসলমানদের হাতে থাকলেও এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তারা সংখ্যালঘুদের ধর্ম-বিশ্বাস ও সংস্কৃতি চর্চার উপর কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। ফলে এটা ইতিহাসে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

এটাকে একটি বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। বৃক্ষের মূলকাণ্ডের পাশাপাশি অসংখ্য ডালপালার বিস্তার ঘটে। মূলকাণ্ড মৃত্তিকার গভীরে প্রোথিত থেকে বৃক্ষকে শক্তি ও সজীবতা যোগায়। মূলকাণ্ডের সাথে অসংখ্য ডালপালা ও শাখা-প্রশাখা গজিয়ে বৃক্ষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আমাদের সংস্কৃতির মূলধারাও তেমনি একটি বৃক্ষের মূলকাণ্ডের সাথে তুলনীয়। এর পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, উপজাতীয় ইত্যাদি বিভিন্ন সংস্কৃতি বৃক্ষের ডালপালা ও শাখা-প্রশাখার মতোই বৈচিত্র্য সৃষ্টি ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে চলেছে। মূলকাণ্ড কখনো ডালপালা ও শাখা-প্রশাখার ক্ষতি করে না, বরং তার সজীবতা সৃষ্টিতে সাহায্য করে। অনুরূপভাবে, সংখ্যাগরিষ্ঠের নৈতিক দায়িত্ব হলো সংখ্যালঘিষ্ঠের সংস্কৃতির লালন, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করা। এটা শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান ও গণতান্ত্রিক ঔদার্য ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচায়ক। কিন্তু ঔদার্য প্রকাশ করতে গিয়ে সংখ্যালঘিষ্ঠের জীবনধারা ও সংস্কৃতির মধ্যে জাতীয় মূলধারাকে অবুলুপ্ত বা একাকার করে ফেলা সঙ্গত নয়। এরদ্বারা কেবল আত্ম-অবলুপ্তি ও আত্ম-বিনাশের পথই উন্মুক্ত হয়। আত্ম-সচেতনতা আত্ম-বিশ্বাস ও আত্ম-প্রত্যয়কেই সুদৃঢ় করে। স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য যা একান্ত অপরিহার্য।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
bangla noboborsho o amader songskriti

বাংলা নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি (পর্ব-১)

মুহম্মদ মতিউর রহমান | এপ্রিল ১৩, ২০১৫
Download PDF

নববর্ষ উদযাপনের রেওয়াজ বিভিন্ন দেশে প্রাচীনকাল থেকে চালু আছে। এর মধ্যে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয় বিধৃত। ‘নববর্ষ’ অর্থ বছরের প্রথম দিন বুঝায়। ঐদিন বিভিন্ন উৎসব-আনন্দের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া হয়। এ উৎসব-আনন্দের ধরণ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। এর মাধ্যমেই বিশেষ দেশ, জাতি বা জনগোষ্ঠির সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সন-তারিখ চালু আছে। প্রত্যেক সন বছরের ঠিক একই দিনে শুরু হয় না। তাই বিভিন্ন সনের প্রথম দিন বা নববর্ষও সারা বিশ্বে একই দিনে পালিত হয় না। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সন অনুযায়ী সারা বিশ্বে বিভিন্ন দিনে নববর্ষ উদযাপিত হয়।

ইংরেজগণ তথা বিশ্বব্যাপী খ্রীস্টান সম্প্রদায় ইংরাজি নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জানুয়ারি নববর্ষ হিসাবে করে। ৩১ ডিসেম্বরের রাত বারোটার পর থেকে তাদের নববর্ষ শুরু হয়। ইয়াহুদীদের নিকট নববর্ষ ‘রাশহাস্না’ নামে পরিচিত। প্রাচীন পারস্য তথা বর্তমান ইরান সাত দিনব্যাপী ‘নওরোজ’ উৎসব পালনের মাধ্যমে নববর্ষ করে। তাদের নবর্ষের প্রথম দিন শুরু হয় ২১ মার্চ তারিখে। হিজরী সন শুরু হয় আরবি মাসের ১ মহররমে। বাংলা নববর্ষ শুরু হয় ১ বৈশাখে। এভাবে বিভিন্ন সন বছরের বিভিন্ন সময়ে শুরু হয়। ফলে তা উদযাপিতও হয় বিভিন্ন দিনে।

প্রত্যেক দেশ বা জাতিই তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় বিধান ও দেশীয় প্রথানুযায়ী নববর্ষ করে থাকে। প্রত্যেকের নববর্ষ উদযাপনের রীতি-নীতি লক্ষ্য করলে এটা সহজেই বোঝা যায় যে, গোড়ার দিকে ধর্মীয় বিধি-বিধানই নববর্ষ উদযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কালক্রমে তার সাথে দেশীয় রীতি-প্রথার সংমিশ্রণ ঘটেছে। বর্তমানে একমাত্র হিজরী নববর্ষ ব্যতীত অন্য সকল নববর্ষ উদযাপনে দেশীয় রীতি-নীতি, প্রথা ও সংস্কৃতির প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মের বহিরাবরণে সাধারণ মানবিক আচার-আচরণ, প্রথা, সংস্কার ও সংস্কৃতিই এখন ক্রমান্বয়ে নববর্ষ উদযাপনের প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে।

একমাত্র হিজরী নববর্ষ এর ব্যতিক্রম। হিজরী নববর্ষ উদযাপনে দেশীয় বা আঞ্চলিক রীতি-নীতি প্রথার কোন প্রভাব নেই। শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রেরণা থেকেই বিশ্বব্যাপী মুসলমানগণ আবেগ-অনুভূতির সাথে এ দিনটি পালন করে থাকে। অন্য ধর্মাবলম্বীরা যেভাবে তাদের নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে থাকে হিজরী নববর্ষ উদযাপনের পদ্ধতি তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিজরী নববর্ষ উদযাপনে তেমন কোন জৌলুসপূর্ণ অনুষ্ঠান করার রেওয়াজ নেই। বড়জোর, ঐদিন ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে হিজরী সনের উৎপত্তি তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচনা করা হয়। কেউ কেউ দোয়া-দরূদ পড়ে, মিলাদ শরীফ পড়ে, নফল রোযা রেখে, নফল নামায পড়েও দিনটি উদযাপন করে থাকে। বাহ্যিক কোন অনুষ্ঠান বা আনন্দ-ফূর্তির ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বে ঐদিনে কেউ কখনো করে না। হিজরী সনের বিভিন্ন মাস ও তারিখ অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগী ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। সেদিক থেকে হিজরী সনের একটি আন্তর্জাতিক রূপ রয়েছে। হিজরী নববর্ষ উদযাপনের মধ্যেও এক ধরনের ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের পরিচয় পরিস্ফূট হয়ে ওঠে।

মুঘল আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে সরকারী সন ছিল হিজরী। এখনো বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয় কাজে হিজরী সনকে মান্য করা হয়। মুঘল আমলে সরকারী সন হিজরী হলেও তারা ইরানি ঐতিহ্য অনুযায়ী ‘নওরোজ’ উৎসব পালন করতো। মুঘল সম্রাট হুমায়ন সর্বপ্রথম এ উৎসবের প্রচলন করেন। এরপর সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বিশেষ জাঁকজমকের সাথে নওরোজ উৎসব প্রতিপালিত হয়। মুঘল সম্রাট আকবর খাজনাদি আদায় ও অন্যান্য রাজকর্ম সম্পাদনের সুবিধার জন্য নতুন সন তথা বাংলা সন প্রবর্তন করলেও তারা ১ মহররম বা ১ বৈশাখ এ কোনটাতেই নববর্ষ পালন করতেন না। পরবর্তীতে সম্রাট আকবর যেমন বাংলা সন প্রবর্তন করেন, তেমনি তাঁর প্রবর্তিত নতুন ধর্ম ‘দীনে-এলাহি’র স্বারক হিসাবে ‘এলাহি সন’ নামেও একটি নতুন সন প্রবর্তন করেন। এলাহি সনের প্রথম দিনে তিনি ‘নওরোজ’ উৎসব পালনেরও ব্যবস্থা করেন। নওরোজ উৎসব ছিল সম্পূর্ণ পারস্যের রীতি অনুযায়ী। এতে ইসলাম-পূর্ব পারসিক রীতি-রেওয়াজ অনুসৃত হতো, ইসলামী ভাবধারার কোন প্রতিফলন এতে পরিলক্ষিত হতো না। আকবর-প্রবর্তিত বাংলা সন বাংলায় ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও স্থায়িত্ব লাভ করলেও তাঁর প্রবর্তিত ‘দ্বীনে-এলাহি’ যেমন কেউ গ্রহণ করেনি, তেমনি দ্বীনে এলাহী সনও তাঁর সাম্রাজ্যের কোথাও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেনি। ফলে তা স্থায়ী হয় নি।

প্রায় অর্ধ সহস্র বছর পূর্বে বাংলা সনের উৎপত্তি ঘটলেও বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখ উদযাপনের কোন প্রাচীন ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে বহুজাতির বাস। প্রাচীন যুগ থেকে এখানে শক-হুন-দ্রাবিড়, আর্য-অনার্য, জৈন-বৌদ্ধ, হিন্দু-মুসলমান ইত্যাদি জাতি-ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বসবাস। এখানে বসবাসকারী কোন জনগোষ্ঠীই কখনো বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেছে বলে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে মুসলিম শাসনামলের শুরু থেকে এখানে বাঙালি মুসলমানরা ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে হিজরী নববর্ষ পালন করে এসেছে। সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা সন প্রবর্তিত হলেও বাঙালি মুসলমানগণ কখনো বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখ উদযাপন করেছেন বলে জানা যায় না। স্বাধীন বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ মুসলমান। তাদের কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাংলা নববর্ষ অনুযায়ী পালিত হয় না। ইসলামের সকল উৎসব-অনুষ্ঠান বা ধর্মীয় বিধি-বিধান হিজরী সনের সাথে সংশ্লিষ্ট। সে হিসাবে এটা আন্তর্জাতিক ও বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য এক ও অভিন্ন। পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের রেওয়াজ সম্পূর্ণ অভিনব ও সাম্প্রতিক কালের উদ্ভাবনা।

হিন্দুদের বার মাসে তের পার্বণের রেওয়াজ থাকলেও পয়লা বৈশাখে নির্দিষ্ট কোন পার্বণ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নেই। তাদের চৈত্র-সংক্রান্তির অনুষ্ঠান মূলত চৈত্রের শেষ দিনে উদযাপিত হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত মেলা অবশ্য চৈত্র মাস অতিক্রম করে অনেক সময় বৈশাখ মাসের কয়েক দিন পর্যন্ত চলতে থাকে। কিন্তু তাই বলে তা কখনো নববর্ষের উৎসব হিসাবে গণ্য হয় না, চৈত্র-সংক্রান্তির মেলা বা উৎসব হিসাবেই তা সকলের নিকট পরিচিত। তাছাড়া, চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে যে সব অনুষ্ঠানাদি সংঘটিত হয়, তা অনেকটা নিষ্ঠুর ও লোমহর্ষক। ঐদিন একজন মানুষের বুকে-পিঠে বা জিহ্বায় বর্শি বিদ্ধ করে কাঠের সাথে বেঁধে চড়কির মতো ঘুরিয়ে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ করা হয়। এ ধরনের নির্দয় অনুষ্ঠানের মধ্যে কোন আনন্দানুভূতির প্রকাশ ঘটা সম্ভব নয়। অতএব, নববর্ষের উৎসব হিসেবে তা গণ্য হবার আদৌ উপযুক্ত নয়।

বৌদ্ধদের কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানও ১লা বৈশাখে উদ্যাপিত হয় না। ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ নামে তাদের যে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান তা বৈশাখ মাসে পূর্ণিমার রাতেই উদযাপিত হয়ে থাকে। ঐদিন বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জন্ম ও মৃত্যু দিন হিসাবে এটা সারা বিশ্বে বৌদ্ধদের নিকট অতি পবিত্র দিন। তাই তারা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেই বৈশাখী পূর্ণিমা উদযাপন করে থাকে। কিন্তু ১লা বৈশাখ বা নববর্ষ হিসেবে তাদেরও কোন নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান নেই। একসময় বৌদ্ধ পাল যুগে বাংলাদেশে যখন বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতির একাধিপত্য ছিল, তখনো ১লা বৈশাখে তারা কখনো নববর্ষের কোন উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বলে জানা যায় না।

পার্বত্য উপজাতীদের একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নাম ‘বৈসাবি উৎসব’। চৈত্রের শেষ দিন থেকে বৈশাখের প্রথম দু’দিন মোট তিন দিন ধরে তারা এ উৎসব প্রতিপালন করে। সাধারণত কুমারী মেয়েরা এ অনুষ্ঠানে অবিবাহিত তরুণদের সাথে মিলে এটা উদযাপন করে। এটা মূলত পানি উৎসব অর্থাৎ পরস্পরের গায়ে পানি ছিটিয়ে তারা আনন্দ-ফূর্তিতে মত্ত হয়। অতএব, এটাও বৈশাখের প্রথম দিন উদযাপিত হয়, তা বলা যায় না।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ক্ষেত্রে মাত্র দুটি অনুষ্ঠানের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। একটি ‘হালখাতা’ ও অন্যটি ‘পূণ্যাহ’। সাধারণত জমিদারগণের বকেয়া খাজনাদি আদায়ের জন্য আগেকার দিনে মহাধূমধামের সাথে ‘পূণ্যাহে’র আয়োজন করা হতো। এখনো বিভিন্ন উপজাতীয়দের মধ্যে পূণ্যাহ উদযাপনের রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। এটা মূলত খাজনা আদায় এবং প্রজাদের নিকট থেকে নজর-নেয়াজ আদায়ের উদ্দেশ্যে উপজাতীয় রাজাদের বাড়িতে এ উৎসব পালিত হয়। এটা রাজার প্রতি প্রজা সাধারণের আনুগত্য প্রদর্শনেরও এক সুবর্ণ মুহূর্ত। ‘হালখাতা’র আয়োজন বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ব্যবসায়ী- মহাজন, সুদে টাকা লগ্নীকারী, সোনা-রূপা বন্ধককারীগণ বকেয়া পাওনা ও সুদের টাকা উসূল করার জন্য হালখাতার আয়োজন করা হয়। রাজস্ব-বর্ষের শেষ মাস হিসাবে সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে পূণ্যাহ এবং বর্ষ শুরুর মাস হিসাবে বৈশাখের প্রথমার্ধে হালখাতা পালিত হয়। ফসলাদির অবস্থা ও প্রজাসাধারণের আর্থিক সঙ্গতির কথা বিবেচনা করে এ দুটি অনুষ্ঠানের দিন-ক্ষণ ঠিক করা হয়। ‘হালখাতা’র আয়োজন তো সারা বৈশাখ মাস ধরেই চলে এবং এখনো এভাবেই চলে আসছে। কিন্তু বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখের সাথে এ দুটি অনুষ্ঠানের তেমন কোন সম্পর্ক-সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৬ সনে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করা হয়। ফলে পূণ্যাহের অনুষ্ঠানও অনেকটা অবান্তর হয়ে পড়ে। তবু পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন কোন উপজাতির মধ্যে সামাজিক রীতি ও রাজার প্রতি বিশেষ আনুগত্য প্রদর্শনের রেওয়াজ হিসাবে তা এখনো প্রচলিত আছে। হালখাতার রেওয়াজ বাতিল হয় নি। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি ব্যবসায়ীগণ দীর্ঘকাল থেকে হালখাতার আয়োজন করে আসছে। ‘হাল’ অর্থ চলতি, ‘খাতা’ অর্থ হিসাব বা হিসাবের খাতা। দুটোই ফারসি শব্দ, একত্রে এ দুটি শব্দের অর্থ হলো নতুন হিসাব বা পুরাতন বছরের দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাবের খাতা খোলা।

পুরনো বছরের বকেয়া আদায় করে নতুন বছরের শুরুতে নতুন হিসাবের খাতা খোলার পদ্ধতি হিসাবে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের জন্য হালখাতা একটি পুরনো রেওয়াজ। কিন্তু তাই বলে এটাকে নববর্ষের অনুষ্ঠান বলা যায় না। এটা একটি মহাজনী পদ্ধতি। ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে এর যতটা সম্পর্ক, বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ততটা নয়, বাংলা নববর্ষের সাথে তো নয়ই। কারণ অনিবার্যভাবে এ অনুষ্ঠান কখনো বৈশাখের প্রথম দিন উদযাপিত হয় না, আগে যেমন এখনো তেমনি বৈশাখের শুরুর দিকে অথবা বৈশাখ মাসের যে কোন দিন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাছাড়া, এ অনুষ্ঠান কেবল স্বল্পসংখ্যক ব্যবসায়ী-মহাজন ও টাকা লগ্নীকারীদের, তাদের বকেয়া টাকা উসূল বা লগ্নীকৃত টাকার সূদ আদায়ের উপলক্ষ হিসাবে এ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। বিপুল সংখ্যক দরিদ্র শ্রেণীর খদ্দের তাদের গাঁইটের পয়সা দিয়ে মহাজনের পাওনা শোধ করার বা উচ্চহারে সূদের টাকা পরিশোধ করার জন্য যে অনুষ্ঠানে যোগদান করে সেটাকে সর্বজনীন আনন্দোৎসব বলা যায় না। এ অনুষ্ঠান সকলে মিলে কোন একটি নির্দিষ্ট দিনেও পালন করে না। যার যার সুবিধামত দিন-ক্ষণ অনুযায়ী এর আয়োজন করে থাকে। সে কারণেও এটাকে সর্বজনীন বলা যায় না। তাছাড়া, হিন্দু সমাজ ও মুসলিম সমাজের ‘হালখাতা’, বৌদ্ধদের ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ ও পার্বত্য অঞ্চলে ‘পূণ্যাহ’ পালনের পদ্ধতিও ভিন্ন। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও পার্বত্য উপজাতীয়গণ তাদের ভিন্ন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। ফলে এতে কোন একক বাঙালি সংস্কৃতি নয়, বরং বাঙালি হিন্দু, বাঙালি মুসলিম, বাঙালি বৌদ্ধ ও পার্বত্য উপজাতীয়দের স্বতন্ত্র সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে থাকে।

বৈশাখ মাসে উদযাপিত আর একটি অনুষ্ঠানের নাম ‘নবান্ন’। নতুন ফসল ঘরে তোলার পর যে অনুষ্ঠান করা হয় সেটাই নবান্ন অনুষ্ঠান। কিন্তু এটা পালনেরও কোন নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ নেই। তাছাড়া, শুধু বৈশাখ মাসেই নয়, পৌষ মাসেও আমন ধান কাটাকে উপলক্ষ্য করে নবান্ন উৎসব পালিত হয়। বলাবাহুল্য, এ অনুষ্ঠানটিও হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় চিরকাল ভিন্ন রীতি-পদ্ধতিতে তাদের স্ব স্ব ধর্মীও প্রথা অনুযায়ী উদযাপন করে আসছে।

আগের দিনে ঘটা করে নবান্নের অনুষ্ঠান হতো। সাধারণত হিন্দু সমাজ এ অনুষ্ঠান পালনে অগ্রণী ভুমিকা পালন করতো। মুসলিম সমাজে এটা এতটা ব্যাপকতা পায়নি। এটা অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কাটার মৌসুমে একবার এবং বৈশাখে আউস ধান কাটার মৌসুমে আরেকবার অনুষ্ঠিত হয়। বলাবাহুল্য, এক্ষেত্রেও হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। উভয়েই তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ফলে এর মাধ্যমে উভয়ের ভিন্ন সাংস্কৃতিক জীবনধারার পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

হিন্দুরা নতুন ধান-দুর্বা, আম-জাম-কলা-লিচু ইত্যাদি ফল এবং মৌসুমী নানা ফুল দিয়ে প্রসাদ তৈরি করে মাটির তৈরি মূর্তি তথা তাদের কাল্পনিক দেব-দেবীর পাদমূলে অর্ঘ্য হিসেবে নিবেদন করে, মন্দিরের পুরোহিত নানারূপ মন্ত্রোচ্চারণ করে, পূজা-অর্চণা শেষে নিবেদিত নৈবেদ্যের সদ্ব্যবহার করে। তাদের ভক্ত-অনুরক্তরা ও মন্দিরগামীরাও প্রসাদ পেয়ে পরমার্থ লাভের আনন্দে খুশী হয়। আগেকার দিনে এসব অনুষ্ঠানে নাচ-গান, বাদ্য-বাজনার ব্যবস্থা থাকতো। মন্দিরের ঠাকুর-পুরোহিত, পূজারী ও দেবানুগ্রহ-প্রত্যাশীদের জন্য এটা ছিল রীতিমত আনন্দোৎসব। হিন্দুদের মধ্যে এখনো নবান্নের উৎসব পালিত হয়, কিন্তু আগের দিনের সেই আড়ম্বর এখন আর চোখে পড়ে না।

অন্যদিকে, নবান্ন উপলক্ষে মুসলমানগণ মোল্লা-মুনশী-মুরব্বী ও প্রতিবেশীদের জিয়াফত করে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে। নতুন ধানের তৈরি ভাত, পিঠা, মোয়া-মুড়কি-নাড়–, আম, কলা, জাম ইত্যাদি নানা রকম ফল, গাইয়ের দুধ ইত্যাদি পরিবেশন করে সংসারের আয়-বরকত, সকলের কল্যাণ ও পরলোকগত ব্যক্তিদের মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করে। মসজিদে শিরণী, পায়েশ, খিচুরী ইত্যাদি পাঠায়, মুসল্লীগণ ও গরীব-মিসকিনরা তা খেয়ে দোয়া করে। কখনো আত্মীয়-স্বজনকে বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে এনে খাওয়ায়, কখনো তাদের বাড়িতে নতুন ফসলে তৈরি পিঠা, মুড়ি, মুড়কি, নাড়–, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি পরব হিসাবে পাঠায়। এ রকম বিভিন্ন উৎসব-আনন্দে মুসলমান বাঙালিরা বছরের প্রথম মাসটি অর্থাৎ বৈশাখ মাস (অনিবার্যভাবে ১লা বৈশাখ নয়) উদযাপন করে থাকে। তবে মুসলমানদের অনুষ্ঠানে কখনো নাচ-গান, বাদ্য-বাজনার আয়োজন হয় না। আগের দিনে যেভাবে উৎসব-আনন্দ হতো, এখন বাঙালির টানা-পোড়নের সংসারে তার মাত্রা কমে গেলেও গ্রাম বাংলায় এখনও তার কিছুটা প্রচলন রয়েছে।

বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখে পূর্ব থেকে কোন উৎসব-অনুষ্ঠান চালু না থাকলেও বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখে বহু পূর্ব থেকে নানা উৎসব-অনুষ্ঠান চালু রয়েছে। বস্তুত বাংলা সন চালু হবার বহু পূর্বেই ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে বিভিন্ন ঋতু বা মাসে বিচিত্র উৎসব-অনুষ্ঠান চালু আছে। বৈশাখ মাসে নতুন ফসল ঘরে তুলে কৃষকরা যেমন সরকারী রাজস্ব আদায় করে, অন্যদিকে তেমনি ব্যবসায়ী ও দোকানীরা হালখাতার আয়োজন করে ভোক্তাদের নিকট থেকে তাদের পাওনা আদায় করে থাকে। হালখাতা উপলক্ষে ব্যবসায়ী-টাকা লগ্নীকারী ও মহাজনগণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, চিড়া-মুড়ি, দই-মিষ্টির দ্বারা তারা স্ব স্ব গ্রাহক-খদ্দের-শুভানুধ্যায়ীদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে। হালখাতা অনুষ্ঠানটি ব্যবসায়ীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জন্য বাকি-বকেয়া উসূলের এটি একটি সুবর্ণ মুহূর্ত। হিন্দু মহাজনগণ যারা আগের দিনে উচ্চ সূদে গরীব কৃষক-জনসাধারণকে টাকা ধার দিত, সোনা-রূপার গহনা, থালা-ঘটি-বাটি ইত্যাদি বন্ধক রাখতো তারাও এ সময় বিগত এক বছরের সূদের টাকা কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিত। এমন একটা সময় ছিল যখন সুদূর আফগানিস্তান থেকে লম্বা লাঠি হাতে, লম্বা পাগড়ি পরা কাবুলিওয়ালারা এসেও বাংলার গরীব কৃষকদের টাকা ধার দিত, নতুন বছরে ফসল কাটার সময় তারাও এসে সূদের টাকা উসূল করে নিত। তাই বৈশাখ মাস যেমন ফসলের মাস, প্রাপ্তির মাস, আবার তেমনি দেনা-পাওনা পরিশোধের মাস হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

বৈশাখ মাসে প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা হতো। মেলায় কৃষকের উৎপন্ন দ্রব্য-বিভিন্ন জাতীয় ফল, ফসলাদি, তাঁতীর তৈরি কাপড়-চোপড়, কামার-কুমারের বিভিন্ন তৈজষ-পত্র, কাঠ মিস্ত্রির তৈরি কাঠের আসবাবপত্র, স্বর্ণকারদের সোনা-রূপার গহনা, নানা জাতীয় মিষ্টি, তরি- তরকারি, বাঁশ-বেতের তৈরি নানা জাতীয় আসবাবপত্র, খেলনা ইত্যাদি অসংখ্য পণ্যদ্রব্য মেলায় আমদানি করা হয়। এটা বাঙালি সাধারণ মানুষের জন্য একদিকে যেমন অর্থকরী ফায়দা নিয়ে আসে, অন্যদিকে তেমনি নানারূপ প্রয়োজনীয় সামগ্রী এক সঙ্গে পাওয়ার আনন্দে সকলে মেলায় আসে। ছেলে-মেয়েদের জন্য এটা এক আনন্দের উৎসব। তাই বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত এসব মেলার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। অবশ্য এসব মেলা যে বৈশাখের ১ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় তা নয়। আবার বৈশাখ মাস ছাড়া অন্যান্য মাসেও গ্রাম-বাংলা বিভিন্ন ধরনের উৎসব-আনন্দ ও মেলার আয়োজন করা হয়।

বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম মাস হিসাবে এ মাসে একটা নবতর আবেগ অনুভূতি লাভের অবকাশ যেমন আছে তেমনি বৈশাখের অন্য একটি রূপও আমাদের নিকট অতি পরিচিত। অনেক সময় খরা, অনাবৃষ্টি অথবা অকাল বন্যা আমাদের একান্ত প্রত্যাশার ফসল বিনষ্ট করে ঘরে ঘরে বিষাদের কালো ছায়া বিস্তার করে। এছাড়া, কাল বৈশাখীর তান্ডবলীলার কথা তো সকলেরই জানা। অনেক সময় বৈশাখ মাসে প্রচণ্ড ঝড় প্রবাহিত হয়ে গ্রাম-বাংলার সুখের সুনিবিড় ছায়াঘেরা ঘর-দুয়ার ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। সে সাথে স্বপ্নভঙ্গ হয় সাধারণ অল্পবিত্ত অগণিত মানুষের। তখন বৈশাখ আনন্দ-উৎসবের মাস না হয়ে বিষাদের বেদনাঘন অনন্ত দুঃখের মাসে পরিণত হয়। এভাবে বৈশাখ শুধু যে ‘ফসলী মাস’ হিসাবে বাঙালির নিকট আনন্দের মাস তা নয়, কখনো ‘কাল-বৈশাখী’র রূপে তা ভয়াবহরূপেও ধরা দেয়।

বাঙালি হিন্দু-মুসলমান নিজ নিজ ধর্মীয় নিয়ম-নীতি ও প্রথানুযায়ী বৈশাখ মাসটি উদ্যাপন করলেও ১লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন সম্পর্কে কারোই কোন সচেতনতা ছিল না। আগেকার দিনে ১লা বৈশাখে বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো না। বৈশাখ মাস ফসল কাটার মাস। তাই এ মাসে কৃষক-কৃষাণীগণ অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটায়। অনেকে খাবার সময় পর্যন্ত পায় না, অনুষ্ঠান করার কথা ভাববার সময় কোথায়? অনেক সময় বৈশাখের নতুন পানির ঢল অকস্মাৎ কৃষকের পাকা অথবা আধা পাকা ফসল ডুবিয়ে দেয়। তখন সারাদিন এমন কি রাতের বেলায়ও ডুবন্ত ফসল কেটে ঘরে তোলার কাজে কৃষককে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই আনন্দ-ফূর্তি বা অনুষ্ঠান করার মতো মনের অবস্থা তখন কারোই থাকে না। তবে ঠিক মত ফসল ঘরে তোলার পর কৃষাণ-কৃষাণির মনে যে অনাবিল আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়, তার কোন তুলনা নেই।

অবশ্য হালখাতার অনুষ্ঠান অনেকে ১লা বৈশাখে করে, আবার অনেকে বৈশাখ মাসের প্রথম দিকে এমনকি বৈশাখ মাসের যে কোন দিন করে থাকে। এখনো ঠিক সেভাবেই চলে আসছে। হালখাতা অনুষ্ঠানের দিন হিসাবে ১লা বৈশাখ কখনো নির্দিষ্ট ছিল না। তাই বলা যায়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশ ও জাতিসমূহ বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে বা নতুন বছরের প্রথম দিনে নববর্ষ উদযাপন করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকে কখনও বছরের কোন একটি নির্দিষ্ট দিনে অথবা নববর্ষের প্রথম দিনে বর্ষবরণ করার রীতি চালু নেই। মূলত পুরো বৈশাখ মাসটাই হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ সকলে স্ব স্ব ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী উদযাপন করে আসছে।

পাঁজি-পুঁথি, দিন-ক্ষণের হিসাব অনুযায়ী যতটা নয়; তারচেয়ে মওসুম হিসাবে বাঙালির নিকট এসব উৎসব-আনন্দের কদর সর্বদা পরিলক্ষিত হয়েছে। অন্যান্য জাতি বিশেষত ইংরাজগণ যেমন বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ ধরনের উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। বছরের অন্যান্য দিন তারা কঠোর পরিশ্রম করতে অভ্যস্থ, বাঙালিরা সেদিক থেকে অন্যরকম। তারা স্বভাবগতভাবে সারা বৎসরই অল্প-বিস্তর কিছু একটা আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকতে পছন্দ করে। এ কারণেই বাঙালি হিন্দু সমাজে বার মাসে তের পার্বণের রেওয়াজ চালু হয়েছে। এটা হলো এমন কিছু প্রথা বা সংস্কার যা দীর্ঘকাল ধরে ধীরে ধীরে তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এতে ষড় ঋতুর একটি প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীতে এটা তাদের ধর্ম বা সংস্কৃতির অংগে পরিণত হয়েছে। তাই বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি প্রধানত ঋতু-বিবর্তনের সাথে বহুলাংশে সংশ্লিষ্ট। ষড়ঋতুভিত্তিক তাদের বিভিন্ন উৎসব-আনন্দ, আচার-অনুষ্ঠানের সাথে বিভিন্ন দেব-দেবীর মাহাত্ম্য যুক্ত হয়ে কালক্রমে তা ধর্মীয় গুরুত্ব লাভ করেছে। সে দিক থেকে হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতি বহুলাংশে লোকজ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন।

প্রকৃতপক্ষে, আবহমান কাল থেকে বাঙালি মুসলমানদের যেমন নিজস্ব উৎসব-আনন্দ রয়েছে, বাঙালি হিন্দু ও বৌদ্ধদেরও তেমনি নিজস্ব আনন্দ-উৎসব রয়েছে। কিন্তু মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ নির্বিশেষে বাঙালির কোন একক সর্বজনীন উৎসব-আনন্দ অনুষ্ঠানের কোন নির্দিষ্ট দিন এদেশে কখনো ছিল না। কারণ প্রত্যেকটি আনন্দ-উৎসবই প্রত্যেক ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় বিধি-বিধান অনুযায়ী করতো। অতএব, ভিন্নতা থাকবেই। তবে এ ভিন্নতা কখনো কোনরূপ বিরোধ বা সংঘর্ষের জন্ম দেয়নি। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই নির্বিবাদে ও শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ উৎসব-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছে।

দ্বিতীয় পর্বঃ

বাংলা নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি (পর্ব-২)

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
মাওলানা আকরাম খাঁ

আকরম খাঁর অবদান

মুহম্মদ মতিউর রহমান | জানুয়ারী ৩, ২০১৫
Download PDF

মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতার জনক হিসাবে খ্যাত মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ [১৮৬৮-১৯৬৮] ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক বিরল ব্যক্তিত্ব। একাধারে রাজনীতি, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। এরূপ ক্ষণজন্মা ব্যক্তির আবির্ভাব যে কোন দেশের জন্যই অত্যন্ত গৌরবের। তিনি তাঁর কর্মপ্রচেষ্টার দ্বারা দেশ ও জাতির মর্যাদা বৃদ্ধি করে গেছেন।

তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমায় মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ১৮৬৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মাওলানা হাজী আবদুল বারী খাঁ গাজী। আব্দুল বারী খাঁ নিজে ছিলেন একজন আলেম ও জিহাদী-চেতনা সম্পন্ন মানুষ। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর তিনি মাত্র ১০/১২ বছর বয়সে তৎকালীন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক সৈয়দ আহমদ শহীদ ব্রেলভীর নেতৃত্বে পরিচালিত শিখ ও ইংরেজ বিরোধী জিহাদে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে সীমান্ত প্রদেশে গমন করেন। ফলে তিনি ‘গাজী’ খেতাব লাভ করেন। এহেন একজন গাজীর পুত্র হিসাবে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁও ছিলেন জিহাদী মনোভাবাপন্ন এক লড়াকু ব্যত্তিত্ব। তার পূর্ব-পুরুষেরা ছিলেন কুর বা ব্রাহ্মণ। পরবর্তীতে তাঁরা ইসলাম ধর্মের মাহাত্ন্যে মুগ্ধহয়ে ইসলাম কবুল করেন। কথিত আছে, মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একই বংশদ্ভূত। উভয়েরই পূর্ব-পুরুষ ছিলেন কুলীন ব্রাহ্মণ।

শৈশবে পিতৃ-মাতৃহীন হওয়ার কারণে মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ ভাগ্য-বিড়ম্বিত হন। অতি কষ্ট এবং দুঃখ-দারিদ্রের মধ্যে তার শৈশব-জীবন অতিবাহিত হয়। কিন্তু তাঁর মনোবল ছিল দৃঢ় এবং তাঁর ছিল প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা। এ কারণে তিনি নানা দুঃখ-কষ্ট ও দারিদ্রের মধ্যে ও বিদ্যাশিক্ষা চালিয়ে যান এবং কঠোর নিষ্ঠা ও সাধনায় মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত কৃতিত্বের সাথে উচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯০০ সালে তিনি কলকাতা মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে এফ.এম. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঐ সময় মাদরাসার সিলেবাস অনুযায়ী আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষা শেখার সুযোগ থাকলেও বাংলা ভাষা শেখার কোন সুযোগ ছিল না। তাই ছাত্র-জীবনে তিনি ইংরেজী-বাংলা শেখার সুযোগ না পেলেও পরবর্তীতে নিজ চেষ্টায় বাংলা, সংস্কৃতি ও ইংরেজী ভাষা রপ্ত করেন। আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষায়ও তিনি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। ছাত্র জীবনেই তিনি ফারসিতে কবিতা লেখায় অভ্যস্ত ছিলেন। এ সময় কলকাতা মাদরাসার অধ্যক্ষ ছিলেন জনৈক ইংরেজ, তার নাম স্টিন। স্টিন সাহেবের উপস্থিতিতে মাদরাসার এক অনুষ্ঠানে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ স্বরচিত ফারসি কবিতা আবৃত্তি করে সকলের প্রশংসা অর্জন করেন।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ যে সময় জন্মগ্রহণ করেন সে সময় উপমহাদেশে ইংরেজদের রাজত্ব চলছিল। মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। একদিকে ইংরেজ রাজ-শক্তি, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের অত্যাচার-নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনায় বাঙ্গালী মুসলিম সমাজের দুরবস্থা চরমে গিয়ে পৌঁছে। এ অবস্থা দেখে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর হৃদয় রুধিরাক্ত হয়। তিনি এ অবস্থার পরিবর্তন সাধনের জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন। [তার জীবনের সকল কর্ম-প্রচেষ্টার মধ্যে আমরা এর প্রতিফলন লক্ষ করি]।

প্রথমত, শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে বাঙালী মুসলমান তখন ছিল অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। দ্বিতীয়্ত, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। চাকরি-বাকরী ব্যবসা-বাণিজ্য, জমিদারী-জোতদারী সবই ছিল তখন হিন্দুদের হাতে। তৃতীয়ত, সামাজিক ক্ষেত্রেও মুসলমানরা ছিল চরমভাবে উপেক্ষিত-অবহেলিত। চতুর্থত, অশিক্ষার কারণে মুসলমানরা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। নানারূপ কুসংস্কার ও অন্ধ-বিশ্বাসের দ্বারা তাদের মন-মানসিকতা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।

এ অবস্থার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ উপায় অনুসন্ধান করতে লাগলেন। এজন্য তিনি প্রথমেই চিন্তা করলেন লেখালেখি ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে জাগাতে হবে। তাঁর এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তিনি কলকাতার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হাজী আলতাফের শরণাপন্ন হন। হাজী আলতাফ একজন বড় চামড়া ব্যবসায়ী ছিলেন। কলকাতায় তার একটি প্রেসও ছিল। প্রেসটির নাম ছিল ‘আলতাফী প্রেস’। হাজী আলতাফ ছিলেন একজন সমাজ-দরদী উদারপন্থী ব্যক্তি। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁকে তিনি সহযোগিতা করতে রাজী হন। তাঁর সহযোগিতার ফলেই ‘আলতাফী প্রেস’ থেকে ১৯১০ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ প্রথমে ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ সময় থেকে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর কর্ম-জীবনের শুরু। ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশের সময় ‘বলকান’ যুদ্ধ চলছিল। এ সময় মুসলমানগণ ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মুসলমানদের এ আবেগ ও ক্ষোভের বিষয় ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় বিশেষভাবে তুলে ধরার কারণে পত্রিকাটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কিন্তু ইংরেজ সরকার এ পত্রিকাটি সহ্য করতে পারেনি। তাই সরকারের আদেশে তা অচিরেই বন্ধ হয়ে যায়। ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা সরকারের আদেশে বন্ধ হয়ে গেলে পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে এখান থেকেই মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ‘আল ইসলাম’ নামে আর একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯২২ সালে কংগ্রেসের অসহযোগিতা আন্দোলনের প্রাক্কালে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ‘মোহাম্মদী’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। কিন্তু সরকার অল্প দিনের মধ্যেই এ পত্রিকাটিও বন্ধ করে দেয়। অতঃপর ১৯৩৭ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর পরিচালনায় এবং সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সম্পাদনায় ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা বাঙালি মুসলমানের প্রথম দৈনিক পত্রিকা। এ পত্রিকার মাধ্যমে বাঙালী মুসলমানের রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক জাগরণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি চিন্তার প্রতিফলন ঘটে। স্বাধীনতা আন্দোলনেও এর ভুমিকা ছিল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ।

এভাবে ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’, ‘আল ইসলাম’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ ও ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার মাধ্যমে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক গৌরবময় অবদান রেখে গেছেন। প্রথমোক্ত দু’টি পত্রিকা স্বল্পায়ু হলেও পরবর্তী দু’টি পত্রিকা দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাঙালী মুসলিম সমাজের ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ খেদমত আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া, তার সম্পাদিত আরো দু’টি স্বল্পায়ু পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রথমটির নাম ‘সেবক’ ও দ্বিতীয়টির নাম উর্দু দৈনিক ‘জামানা’। আজাদী আন্দোলন, মুসলিম নব-জাগরণ ও মুসলমানদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য চিন্তার বিকাশে এসব পত্রিকার অবদান ছিল সীমাহীন। তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণ-সচেতনতা ও নব জাগরণ সৃষ্টির প্রয়াসেই তিনি সাংবাদিকতার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা অবলম্বন করেছিলেন। সাংবাদিকতার মহান পেশায় নিয়োজিত হয়ে তিনি অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর লেখনি যেমন ছিল ক্ষুরধার তেমনি তিনি ছিলেন নির্ভীক। বিভিন্ন সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয় লেখার মাধ্যমে তিনি দেশ ও জাতিকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দান করেছেন। তিনি নিজে যেমন লিখেছেন, তেমনি অন্যদেরকেও লিখতে উৎসাহ ও প্রেরণা যুগিয়েছেন।

এছাড়া, এসব পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ পেয়ে অসংখ্যা মুসলিম প্রতিভাবান ব্যক্তিগণ সাংবাদিকতায় হাতে-খড়ি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে স্ব স্ব ক্ষেত্রে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রবীন সাংবাদিকগণ প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তাঁদের পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর নিকট বহুলাংশে ঋণী। তাঁদের অগ্রপথিক হিসাবে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর কৃতিত্ব ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত। তাই তাঁকে যথার্থই মুসলিম বাংলার ‘সাংবাদিকতার জনক’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। সাংবাদিকতা পেশাকে সমুন্নত রাখার এবং সাংবাদিকের মর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি সর্বদা প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এমনকি এজন্য তিনি আন্দোলন-সংগ্রামও পরিচালনা করেছেন।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ একজন অতিশয় সমাজ ও রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি প্রথমে উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেসে’ [১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত] যোগদান এবং কংগ্রেসের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী হিসাবে দেশ ও সমাজের কল্যাণে এবং ইংরেজ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে যথারীতি অংশগ্রহণ করেন। কংগ্রেসে থাকাকালীন তিনি খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় মুসলমান প্রজাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে তিনি ‘বঙ্গ প্রজা সমিতি’ গঠন করেন। এ সময় তাঁর সম্পাদনায় ‘সেবক’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। [১৯২১]। ‘সেবক’ পত্রিকা ‘অগ্রসর’! অগ্রসর!!’ শিরোনামে এক উত্তেজনাপূর্ণ সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখার কারণে ইংরেজ সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করে এবং পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। অতঃপর তিনি ১৯২১ সালে ‘দৈনিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। একজন সংগ্রামী রাজনৈতিক নেতা হিসাবে তিনি সবসময় জনগণের দাবি-দাওয়ার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরতেন। দেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষেও তিনি সর্বদা ছিলেন অতিশয় সোচ্চার। তিনি ছিলেন একজন ওজস্বী ও জ্বালাময়ী বক্তা। ফলে, জনগণের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা ছিল সীমাহীন।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ১৯৩৬ সালে লক্ষ্ণৌতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ অধিবেশনে যোগদান করেন। মুসলিম লীগের ঐ অধিবেশনে সর্বপ্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপিত ও গৃহিত হয়। উক্ত প্রস্তাবের উপস্থাপক ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে-দীন ও ইংরেজ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার হযরত মাওলানা হাসরাৎ মোহানী। উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বেও কংগ্রেসের এক অধিবেশনে মাওলানা হাসরাৎ মোহানী ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি সংবলিত এক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তখন কংগ্রেসের অপ্রতিদ্বন্ধী নেতা মোহন চাদঁ করম চাদঁ গান্ধীর বিরোধীতার কারণে সে প্রস্তাব পাশ হতে পারেনি। ‘ডেমিনিয়ন স্ট্যাটাসে’র দাবি নিয়েই তখন পর্যন্ত তাঁরা সন্তুষ্ট ছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার দাবি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে মুসলিম লীগই প্রথম উত্থাপন করে। এ দাবি তখন থেকেই সর্বভারতীয় মুসলমানদের দাবিতে পরিণত হয় এবং ইংরেজ সরকারও তার ফলে মুসলমানদের প্রতি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এর অনেক পরে কংগ্রেস বা ভারতীয় হিন্দু নেতৃবৃন্দ উপমহাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেন।

অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন ও বেঙ্গল প্যাক্ট ইত্যাদি বিষয়ে কংগ্রেসের চিন্তাধারার সাথে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর চিন্তাধারায় অমিল হওয়ায় তাঁর মুসলিম লীগে যোগদান ত্বরান্বিত হয়। এ সময় আর একটি বিতর্ক হিন্দু-মুসলিম বিরোধকে ব্যাপকভাবে উস্কানী দেয়। সেটা হল, ভারতীয় হিন্দু-নেতৃবর্গ প্রায় সকলেই হিন্দুদের নিকট ‘ঋষি’ নামে খ্যাত চরম মুসলিম-বিদ্বেষী ব্রাহ্মণ লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় রচিত ‘বন্দে মাতরম’ গানটিকে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘শ্রীপদ্ম’কে ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসাবে গণ্য করার দাবি জানায়। এতে মুসলিম সমাজ ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কেননা ‘বন্দে মারতম’ হিন্দু-দেবীর বন্দনামুলক গান। আর ‘শ্রীপদ্ম’ও হিন্দু-দেবীর আসন হিসাবে পরিচিত। উভয়ই মুসলমানদের দৃষ্টিতে সুস্পষ্টভাবে শিরক হিসাবে গণ্য। ফলে, সমগ্র মুসলিম সমাজ এতে ক্ষুব্ধ হয়। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ মুসলমানদের এই আবেগ ও আকীদার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এবং তিনি এক্ষেত্রে দু’টির বিরোধীতায় মুসলমানদের নেতৃত্ব প্রদান করেন। অন্য দিকে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই গায়ের জোরেই সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের উপর তারা তাদের দাবি চাপিয়ে দিতে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে থাকে। কংগ্রেস নেতা গান্ধী ও কবি রবীন্দ্রনাথসহ সকল হিন্দু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাই তাদের দাবির ব্যাপারে অনড় ছিলেন।

এদিকে, ‘বন্দে মারতম’ও ‘শ্রীপদ্ম’-কে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজের চরম বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শ্রীপদ্ম’ অংকিত মনোগ্রামকে পাঠ্য পুস্তক ও কাগজ-পত্রে ব্যবহৃত হতে দেখে মুসলিম ছাত্ররা দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয় ও প্রতিবাদ করতে থাকে। এ সময় মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর পত্রিকা মাসিক ও সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’তে ‘শ্রীপদ্ম’ মনোগ্রাম ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসূচক নিবন্ধ লেখা হয়। ‘শ্রী’ হিন্দুদের বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী ‘সরস্বতী’ এবং ‘পদ্ম’-কে তার আসন হিসাবে মনে করা হত। এ পৌত্তলিক ভাবধারার মনোগ্রাম কখনো কোনো মুসলমান গ্রহণ করতে পারে না, এটা তাদের ঈমান ও আকীদার খেলাপ। মাওলানা আকরম খাঁ তার বিভিন্ন লেখায় এ সম্পর্কে অকাট্য যুক্তিসহ তার বক্তব্য তুলে ধরেন এবং মুসলমান সমাজ দৃঢ় ভাবে তাঁর পক্ষ সমর্থন করে। কবি রবীন্দ্রনাথসহ অনেকেই ‘বন্দে মাতরম’ অর্থে দেশ মাতৃকা ও ‘শ্রীপদ্ম’ অর্থে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ফুল বলে ব্যাখ্যা দিলেও মুসলমান সমাজ তা গ্রহণ করেননি। এ আন্দোলনের ফলে দীর্ঘকাল থেকে মুসলমানের নামের আগে হিন্দুরা ইচ্ছাকৃতভাবে যে ‘শ্রী’ শব্দ ব্যবহার করতো, মুসলমানরা সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং ঐ সময় থেকে তারা নামের আগে ‘শ্রী’র পরিবর্তে ব্যাপক ভাবে ‘জনাব’, ‘মৌলভী’ ইত্যাদি ব্যবহার করা শুরু করে। এটা ছিল মুসলমানদের এক ধরনের সাংস্কৃতিক সচেতনতা। এ সচেতনতাবোধের কারণেই মুসলমানদের মধ্যে স্বাজাত্যবোধ দৃঢ়বদ্ধ হয় এবং পাকিস্তান আন্দোলনেও তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও তিনি সদ্য স্বাধীন মুসলিম দেশকে একটি খাটিঁ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য আপ্রান চেষ্টা করে গেছেন।

১৯৩৬ সালে মুসলিম লীগে যোগদান করার পর মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। ঐ সময় থেকে তিনি সর্বতোভাবে মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ফলে ১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ঐ সময় তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিরও সদস্য নিযুক্ত হন। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন সংস্কার আইন অনুযায়ী ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ‘বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচিত হন। এভাবে মুসলিম লীগের নেতা হিসাবে দীর্ঘকাল তিনি বাঙালী মুসলমান সমাজের খেদমত করেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গিত করে দেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও প্রায় অর্ধ-যুগ পর্যন্ত তিনি মুসলিম লীগের নেতা হিসাবে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু তারপরও তাঁর ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা ও ‘মাসিক মোহাম্মদী’র মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ইসলামী দাবি-দাওয়ার সপক্ষে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ তৎকালীন ‘পাকিস্তান গণ-পরিষদ’ ও ‘তালীমাতে ইসলামিয়া বোর্ডে’র সদস্য ছিলেন। জেনারেল আইয়ুব খাঁর সামরিক শাসনামলে সরকার তাকে ইসলামী উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য নিযুক্ত করেন। ঐ সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করার অভিযোগে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং প্রায় আশি বছর বয়সে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দান করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এভাবে, সারা জীবন তিনি দেশ, জাতি, জনগণ ও ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখে ১৯৬৮ সালে তিনি ঢাকায় ইন্তিকাল করেন। তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। দেশ-জাতি ও জনগণের কল্যাণের জন্য তিনি সর্বদা কাজ করে গেছেন। ইসলামের প্রতি তাঁর কমিটমেন্ট ছিল প্রশ্নাতীত। এক্ষেত্রে তিনি সর্বদা যুক্তি ও বিবেকের অনুশাসন মেনে চলার পক্ষপাতী ছিলেন।

সাহিত্য ক্ষেত্রে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ‘মোস্তফা চরিত্র’ রাসূলুল্লাহ [সা.]-এর একটি জীবনী গ্রন্থ। বাংলা ভাষায় রচিত সীরাত গন্থসমূহের মধ্যে এ গ্রন্থটি নানা কারণে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে। এর ভাষা, সংগৃহীত তত্ত্ব-তথ্য ও বিবরণ অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। তবে দু’একটি ক্ষেত্রে বিতর্কমূলক বিষয় স্থান লাভ করায় অনেকে এ গ্রন্থটির কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর রচিত ‘তফসিরুল কোরআন’ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর রচিত ‘মোসলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ গ্রন্থটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাস, বাঙালি মুসলমানের সামাজিক অবস্থার পর্যালোচনা, তাদের অধঃপতন ও উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নির্দেশনামূলক গভীর ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এতে স্থান পেয়েছে। তাঁর-ইসলাম বিষয়ক রচনাবলী গভীর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় বহন করে। মুসলমানদের তাদের ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করে তাদেরকে নব-জাগরণে উদ্বুদ্ধ করে তোলার জন্য তিনি তার লেখনি পরিচালনা করেছেন।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ একাধারে বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত  ছিলেন। এছাড়া ইংরেজী ভাষায়ও তাঁর সামান্য দখল ছিল। মাদরাসায় বাংলা ভাষা শেখার সুযোগ না পেলেও নিজের চেষ্টায় তিনি বাংলা ভাষার চর্চা করে এক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। এটা তাঁর অসাধারণ প্রতিভারই পরিচয় বহন করে। তিনি বাংলা ভাষা আয়ত্ব করেছিলেন শুধু তাই নয়, বাংলা গদ্যের তিনি ছিলেন এক অনন্য-সাধারণ শিল্পী। বাংলা ভাষায় রচিত তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থাদি এর স্বাক্ষর বহন করে। তিনি একজন আলেম এবং আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষায় সুপণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ভাষা অনেকটা সংস্কৃতানুগ ও ক্লাসিক-ধর্মী। ফলে তা যেমন ওজস্বিতা সম্পন্ন, তেমনি অলংকারবহুল ও কাব্যগুণমণ্ডিত।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ একাধারে ছিলেন রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় নেতা, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সমাজ সংস্কারক। এ প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তাঁর বিশিষ্ট অবদান রয়েছে। তবে তাঁর সকল কর্ম-প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম সমাজের নব-জাগরণ ও উন্নয়ন। তিনি ছিলেন একজন যুক্তিবাদী। যুক্তির সাথে গভীর পাণ্ডিত্য ও প্রজ্ঞা তাঁকে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তিনি একজন আলেম হলেও অনেকের মত গোঁড়া বা পশ্চাৎমুখী ছিলেন না। সাগ্রসর চিন্তা ও আধুনিক মন-মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তাই তৎকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সকলের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অভ্যস্ত ছিলেন। সমকালীন সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সাথে তিনি গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। প্রথমে তিনি কংগ্রেসের সাথে যুক্ত হলেও পরবর্তীতে এটা উপলব্ধি করেন যে, কংগ্রেসের সাথে যুক্ত হয়ে কখনো মুসলিম সমাজের উন্নতি সাধন করা সম্ভব নয়। তাঁর এ উপলব্ধি আসার সাথে সাথে তিনি কংগ্রেস পরিত্যাগ করে ১৯০৬ সালে গঠিত ভারতীয় উপমহাদেশের একমাত্র মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ‘মুসলিম লীগে’ যোগদান করেন । মুসলিম লীগে যোগদান করার পরই তাঁকে অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের সভাপতি নিযুক্ত করা হয় এবং তার নেতৃত্বে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পাকিস্তান আন্দোলনও জোরদার হয়। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৩৭ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে বাংলায় মুসলিম লীগ বিশেষ সাফল্য অর্জন করে।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁকে মুসলিম বাংলার ‘সাংবাদিকতার জনক’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি বাংলা গদ্য-সাহিত্যের একজন কালজয়ী অমর প্রতিভা। মুসলিম বাংলার নব-জাগরণের ক্ষেত্রে তার অবদান অবিস্মরণীয়। তাই, আমাদের জাতীয় ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ও বহু মাত্রিক অবদান সম্পর্কে যথার্থ মূল্যবান হওয়া একান্ত অপরিহার্য।

সূত্রঃ সাহিত্য ত্রৈমাসিক “প্রেক্ষণ”, মাওলানা আকরম খাঁ স্মরণ, জুলাই-সেপ্টেম্বর-২০০৫

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
syed ali ashrafer kobita

সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা

মুহম্মদ মতিউর রহমান | জানুয়ারী ৩, ২০১৫
Download PDF

বাংলা সাহিত্যে শুদ্ধতম কবিদের অন্যতম সৈয়দ আলী আশরাফের জন্ম- ৩০ জানুয়ারী, ১৯২৪; মৃত্যু- ৭ আগস্ট, ১৯৯৮। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সমালোচক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী ও মহান আধ্যাত্মিক পুরুষ। তাঁর এসব পরিচিতির মধ্যে একটি সাধারণ পরিচিতি হলো তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম এবং এ পরিচিতিই তাঁকে সকল কাজে প্রেরণা যুগিয়েছে। তাঁর সকল কর্মকাণ্ডের মধ্যে আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমানের প্রতিফলন ঘটেছে। জ্ঞান-বুদ্ধি-শিক্ষা অভিজ্ঞতায় তিনি একজন অতি আধুনিক প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব হয়েও বিশ্বাসের প্রগাঢ়তায় ছিলেন অতিশয় দার্ঢ্য। সাহিত্যসহ তাঁর সকল কর্ম-কৃতীতে এর পরিচয় প্রতিবিম্বিত। তিনি তাঁর বিশ্বাস বা জীবনাদর্শকে বুদ্ধিগ্রাহ্য যুক্তি-প্রমাণের আলোকে উপস্থাপন করার প্রয়াস পেয়েছেন। অন্ধ বিশ্বাস অথবা গোড়ামীর বশবর্তী না হয়ে তিনি যুক্তি ও প্রজ্ঞার আলোকে তাঁর বিশ্বাসের দৃঢ়তাকে শাণিত করেছেন। তবে যুক্তি ও প্রজ্ঞার সাথে তাঁর ব্যক্তি-জীবনের গভীর অনুভূতির সমন্বয় সাধন করে তিনি তাঁর সাহিত্য চর্চায় প্রবৃত্ত হয়েছেন। ফলে তাঁর সাহিত্যে বিশ্বাস ও জীবনাদর্শের গভীর উপলব্ধি সঞ্জাত অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। সকল মহৎ কবি-সাহিত্যিকই এ কাজ করেছেন। টি.এস. এলিয়ট, বার্নাডশ, ইবসেন, হাফিজ, রুমি, ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ সকলেই সাহিত্যে কোন না কোন তত্ত্ব বা জীবনাদর্শ ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে তা তাঁদের ব্যক্তিগত অনুভূতির মোড়কে এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে, তাঁদের সাহিত্য কখনো তাঁদের মতাদর্শ প্রচারের বাহন বলে মনে হয়নি। ফলে তা হয়েছে নিরেট সাহিত্য। সৈয়দ আলী আশরাফও উপরোক্ত বিশ্ব-বিখ্যাত কবিদের মতোই একজন অতিশয় সচেতন বোদ্ধা কবি-ব্যক্তিত্ব। তাঁর কবিতা ও জীবনের অন্যান্য কর্মকাণ্ডেও এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ্যযোগ্য।

সাহিত্য ক্ষেত্রে সৈয়দ আলী আশরাফের আবির্ভাব চল্লিশের দশকে, যদিও তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চৈত্র যখন’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সনে। চল্লিশের দশকে আমাদের সাহিত্যে তিরিশোত্তর যুগের কবিদেরই প্রতাপ চলছিল। এ দশকের অনেক কবিও তিরিশোত্তর যুগের কবিদের পরাক্রমের কাছে নিজেদের স্বকীয়তা বহুলাংশে বিসর্জন দিয়েছিলেন। এ দশকের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন এর প্রধানতম ব্যতিক্রম। তিনি তাঁর আপন প্রতিভা, স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে তিরিশের কবিদের প্রভাবকে অনেকটা নিষ্প্রভ করে দিয়েছিলেন। ফররুখ তাঁর অপরিসীম নিষ্ঠা ও প্রতিভার বলে তাঁর স্বাতন্ত্র্যধর্মী কাব্যে স্বকীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক নতুন বর্ণাঢ্য ভুবন তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন। চল্লিশ দশকের যুগ-চেতনা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জ্বরা-মৃত্যু-মহামারী আক্রান্ত বাংলাদেশ, স্বাধীনতা আন্দোলনে উন্মুখর সমকালীন অবস্থার চিত্র ধারণ করে ফররুখ আহমদ এ সময় জীবনধর্মী সাহিত্য রচনায় সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। কবি শাহাদৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, বে-নজীর আহমদ, সুফিয়া কামাল, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন এঁরা সকলেই কম-বেশি সমসাময়িক অবস্থার বিবরণ তুলে ধরেছেন তাঁদের কাব্যে। সৈয়দ আলী আশরাফও এ চল্লিশের দশকেই কাব্যক্ষেত্রে আবির্ভূত হন।

তিরিশোত্তর যুগে আমাদের সাহিত্যে, বিশেষত কবিতার ক্ষেত্রে বিশ্বাসের ধ্বস নেমেছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব তখন তেমন প্রবল ছিল না। মূলত রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেই তিরিশের কবিরা সাহিত্য-ক্ষেত্রে আবির্ভূত হন। তিরশোত্তর যুগে আমাদের সাহিত্যে দু’টি সুস্পষ্ট ধারা প্রবহমান ছিল। একটি হলো বিশ্বাসহীন, ধর্মহীন, আপন ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতি আস্থাহীন নতুন মানবতা-সন্ধানী ধারা। এতে পাশ্চাত্য দর্শন ও চিন্তাধারার যেমন প্রভাব পরিলক্ষিত হয় আবার তেমনি কমিউনিজমের নাস্তিক্যবাদ, সামাজিক দ্বান্দ্বিকতা ও প্রগতিবাদের প্রভাবও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যটি হলো, ধর্মের মূলগত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও সেই উপলব্ধিজাত মানবতার মানদণ্ডকে নতুনভাবে বিকশিত করা এবং ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের আলোকে নতুন পৃথিবী গড়ার দৃঢ় আশ্বাসে পূর্ণ একটি আস্তিক্যবাদী ধারা।

প্রথমোক্ত ধারার কবিদের মধ্যে জীবনান্দ দাস, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমরসেন, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাঁরা একদিকে যেমন পাশ্চাত্য চিন্তা-দর্শনের অনুসারী ছিলেন, অন্যদিকে তেমনি প্রাচ্যের কমিউনিজম ও নাস্তিক্যবাদের দ্বারাও প্রভাবিত ছিলেন। তাঁদের কাব্যে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। দ্বিতীয় ধারার কবিদের মধ্যে যাঁরা সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য তাঁদের নাম আগেই উল্লেখ করেছি। তবে এঁদের পূর্বসূরী হিসাবে কাজী নজরুল ইসলামের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। ১৯২০ সনের দিকে কাব্য-ক্ষেত্রে বর্ণাঢ্য আবির্ভাবের সময় থেকেই নজরুল এক আস্তিক্যবাদী প্রবল শক্তিশালী ধারার উদ্যোগতা হিসাবে চিহ্নিত হন। তবে চল্লিশের দশকের শুরুতেই নজরুলের সাহিত্য-জীবনের অবসান ঘটে। প্রথম যৌবনের আবেগ-উচ্ছ্বাস স্থিমিত হয়ে তখন তিনি অনেকটা স্থিতধী হয়ে উঠেছেন। ১৯৪২ সনে বাক্‌রুদ্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কয়েক বছর তিনি একাধারে কবিতা, গান-গজল, গল্প, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, অভিভাষণ ইত্যাদি যা কিছু লিখেছেন তা ইসলামী ভাব, আদর্শ, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মবাদে পরিপুষ্ট। বলতে গেলে, তিরিশের কবিদের নাস্তিক্যবাদী-অবিশ্বাসী চিন্তা-চেতনা যখন এক শ্রেণীর তরুণদেরকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল, নজরুলের এসব লেখা তখন অনেককেই বিভ্রান্তির হাত থেকে মুক্ত করে। ঐ সময় নজরুল ছিলেন সর্বাধিক উচ্চকণ্ঠ। কিন্তু ১৯৪২ সনে তিনি বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়ায় এ ধারাকে তখন চলমান রাখেন ফররুখ আহমদ ও উপরোক্ত মুসলিম কবিগণ। সৈয়দ আলী আশরাফ তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই কাব্যক্ষেত্রে আবির্ভূত হন। ইসলামী ভাব, আদর্শ ও ঐতিহ্য-চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তাঁর কাব্য-কবিতা।

চল্লিশের দশকে তিরিশোত্তর যুগের নাস্তিক্যবাদী, প্রগতিবাদী কবিদের বিরুদ্ধে সর্বাধিক উচ্চকণ্ঠ কবি ফররুখ আহমদ। ফররুখের গভীর ঐতিহ্যবোধ, প্রগাঢ় আদর্শ চেতনা ও শাশ্বত মানবতাবোধের কাছে নাস্তিক্যবাদী-প্রগতিবাদীরা অনেকটা নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। ফররুখের কালজয়ী প্রতিভা তখন বিশ্বাসী কবিদের মনে এক নতুন আস্থা ও নির্ভরতা সৃষ্টি করে। এ বিশ্বাসময় প্রশ্রয়ে যাঁদের সাহিত্য-প্রতিভার স্ফূরণ ও বিকাশ ঘটে সৈয়দ আলী আশরাফ তাঁদেরই একজন।

আলী আশরাফের প্রতিভা ও অবদানের তুলনায় তিনি কম আলোচিত। এটা তাঁর জন্য যতটা নয়, আমাদের জন্য ততোধিক দুর্ভাগ্যজনক। তাঁর কবিতায় বিশুদ্ধ রুচি ও স্নিগ্ধ আবেগের প্রতিফলন ঘটেছে। সকালে সবুজ ঘাসের ডগায় স্বচ্ছ শিশিরবিন্দুর মত পরিচ্ছন্ন স্ফটিক সদৃশ তাঁর কবিতা। দুপুরের তীব্র দাহ নেই, প্রভাতের স্নিগ্ধ কোমলতা তাঁর কবিতার শরীরে নরম গোলাপের পাঁপড়ির মত ছড়ানো ছিটানো। অসাধারণ প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সাথে সংহত আবেগের সংমিশ্রণে তাঁর কবিতার সৃষ্টি। এটাকে বলে আধ্যাত্মিকতা। ইসলামের গভীর উপলব্ধি ও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের অভিপ্রায় থেকে এ আধ্যাত্মিকতার সৃষ্টি। তাঁর কবিতার প্রায় সর্বত্রই এ আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ ঘটেছে। অন্যদিকে, তাঁর গদ্য-রচনা গভীর মননশীলতা, ব্যাপক অধ্যায়ন ও তীক্ষ্ণ ধীরশক্তির পরিচয় বহন করে। তাঁর গদ্য রচনার মধ্যেও ইসলামী ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের নিম্নোক্ত তালিকা থেকে এ কথার যথার্থ প্রমাণিত হবে।

কবিতাঃ ‘চৈত্র যখন’ [১৯৫৭], ‘বিসংগতি’ [১৯৭৪], ‘হিজরত’ [১৯৮৪], ‘সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা’ [১৯৯১], ‘রূবাইয়াতে জহীনি’ [১৯৯১] ও ‘প্রশ্নোত্তর’ [১৯৯৬]। অনুবাদঃ ‘ইভানকে ক্লেয়ারগল’ [১৯৬০], ‘প্রেমের কবিতা’ [সৈয়দ আলী আহসানের সাথে যৌথভাবে কৃত]।

গদ্যঃ ‘কাব্য পরিচয়’ [১৯৫৭], ‘নজরুল জীবনে প্রেমের এক অধ্যায়’ [দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৯৯৫], ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য’, ‘সংসদ যুগঃ পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের ইতিকথা’, ‘অন্বেষা’ [আধ্যাত্মিক জীবনের বর্ণনা]।

এছাড়া, ইংরেজি সাহিত্যের কৃতি ছাত্র ও অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফের প্রায় দু’ডজন ইংরেজি গ্রন্থ রয়েছে। এগুলো সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখা। শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে নয়, আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে লেখা এসব গ্রন্থ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁকে একজন কৃতী সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ হিসাবে সুখ্যাতি দান করেছে। তাঁর চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও প্রতিভার সার্বিক পরিচয় জানার জন্য এগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন অপরিহার্য। আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সামাজিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এসব গ্রন্থ দিক-নির্দেশিকা স্বরূপ।

সৈয়দ আলী আশরাফ তাঁর কাব্য-চর্চার প্রেক্ষাপট বর্ণনা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ ‘কাব্য রচনা করেছি নিজেকে জানার জন্য, ভাষার মারপ্যাঁচ দেখাবার জন্য নয় বা কোন মতবাদ প্রচার করার জন্য নয়।…মানবিক প্রেমের আর বিরোধের রাজ্যে নিজেকে দেখেছি। কামনা, বাসনা, লোভ, হিংসার বিচিত্র দোলায় নিজেকে দোলায়িত অবস্থায় অনুভব করেছি। মানুষকে বিশ্বাস করে অকৃপণ বর্বরতার আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছি। তবু মানুষের পরম সত্যের উপর বিশ্বাস হারাইনি বরঞ্চ এমন সমস্ত মহৎ আত্মার স্পর্শে আমার সত্তা জাগ্রত, উদ্দীপ্ত এবং আলোকিত হয়েছে যে মানবতার মহত্ত্বের উপর বিশ্বাস গাঢ়তর হয়েছে, সমাজের অসঙ্গতির অন্তরালে, সঙ্গতির উৎসের সন্ধান পেয়েছি এবং মানবাত্মার কল্যাণ কামনায় অসুন্দরের বিরুদ্ধে জেহাদ করেছি।” [সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা ভূমিকাংশ, প্রকাশঃ নভেম্বর, ১৯৯১, পৃ. ৭]

উপরোক্ত উদ্ধৃতি থেকে কবির কাব্য-চর্চার প্রেক্ষিত, উদ্দেশ্য, উপলব্ধি, মানবপ্রেম ও মানব চরিত্র সম্পর্কে তাঁর ধারণা ব্যক্ত হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই প্রেম অনিবার্য। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার প্রেম, সন্তানের প্রতি বাৎসল্য, মানুষের প্রতি প্রেম, জীবজন্তুর প্রতি প্রেম ইত্যাদি প্রেমের নানা প্রকারভেদ রয়েছে। এ মানবিক প্রেম জীবনকে মাধুর্যময় করে তোলে, মানুষকে করে উদার ও মহৎ। এ মানবিক প্রেমই আল্লা-প্রেমের অতল সলিল ধারার সাথে সংমিশ্রিত হয়ে প্রেমের পূর্ণ ও সফল পরিণতি ঘটায়। কবির এ সাধারণ প্রেম বা মানবপ্রেম ক্রমান্বয়ে আল্লাহ প্রেম বা আধ্যাত্মপ্রেমের অন্তহীন সাগরে বিলীন হয়ে যায়। এখানেই কবি মানবজীবনের পরম সার্থকতা অনুভব করেন। কবি তাই বলেন:

“মেজবানি শেষ হলো? এসো তবে, এখন দুজনে মুখোমুখি বসি এইখানে। রজনীগন্ধার গন্ধে আমোদিত মলয়-কূজন-এমন নিবিড়ভাবে বহুদিন বসিনি দুজন, বসিনি নিকটে।” [জন্মদিন: চৈত্র যখন]

প্রিয়তমা পত্নীর নিবিড় সান্নিধ্যে যে মানবিক প্রেমের স্ফূলণ ঘটে, কবির নিকট সে প্রেমের পরিণতি কীরূপ তা নীচের কয়েকটি লাইনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে:

“যে মুহূর্তে প্রেম পায় বিশ্বাসের মধুর স্বাক্ষর তখনি শুধু এ নিবেদন বিশ্ব মুক্ত হয় প্রাণ হীন মরীচিকার হৃদয়হীন প্রেতনৃত্য থেকে, তখনি সৃষ্টির সত্য অনুভূত হয় শিরায় শিরায়। আমার প্রণয় তাই ঈমানের বলে বলীয়ান কর, হে রহিম, হে রহমানুর রহিম।” [আস্‌ফালা সাফেলীন: হিজরত]

কবি মানবিক প্রেমের পরিণতি সম্পর্কে ‘সকাল’ পত্রিকায় তাঁর দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন : “আমার কবিতায় প্রথম দিকে মানবিক প্রেম এবং হতাশার সঙ্গে ঐশী প্রেমের সাক্ষাৎ পাওয়া যায, যেমন ‘বসন্ত’ কবিতায়। কিন্তু ক্রমে ক্রমে আত্মিক সাধনার ফলে যে নিত্য নব অভিজ্ঞতার সন্ধান পেয়েছি তার পরিণতি ‘হিজরত’ কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে। ইসলাম আমাকে তত্ত্ব দিয়েছে আর রূহানী সাধনা আমাকে জীবনকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করেছে। এই সাধনায় অনেক দূরে অগ্রসর হয়েছিলাম বলেই বিলেতে যেয়ে তাদের ভালোটা চয়ন করতে পেরেছি এবং ইসলামের মানদণ্ড যেহেতু আমার চিত্তে এবং চরিত্রের মধ্যে একাত্মতা লাভ করেছে, আমার দৃষ্টিতে পাশ্চাত্য সভ্যতায় যা কিছু মূল্যবান এবং ইসলামী জীবন পদ্ধতির জন্য গ্রহণযোগ্য স্বীকার করে নিয়েছে।” সৈয়দ আলী আশরাফের সাক্ষাৎকার : ‘সকাল’, সৈয়দ আলী আশরাফ বিশেষ সংখ্যা-১৯৯৭, সম্পাদনা- ইশাররফ হোসেন]।

ইউরোপের শিল্প বিপ্লব পাশ্চাত্য জগতে যে হতাশা, যান্ত্রিকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় মানবিক বোধের বিপর্যয় ঘটিয়েছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সে হতাশা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়কে আরো দ্রুততর করে তোলে। এ অবসস্থার অবসান ঘটানোর আশ্বাস নিয়ে আসে কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র। ১৯১৭ সনে রাশিয়ায় এক বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু মানবতার মুক্তি সাধনের আশ্বাস নিয়ে যে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হলো তাতে লক্ষ লক্ষ লোককে অকাতরে প্রাণ দিতে হলো। মানুষের স্বাধীনতা হলো বিপন্ন, গণতন্ত্রের কণ্ঠ হলো রুদ্ধ এবং সমাজতান্ত্রিক লৌহ-যবনিকার অন্তরালে মানুষের বাক স্বাধীনতা হলো স্তব্ধ। গুটিকয়েক লোকের হাতে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবতা বিরোধী এ সমাজতন্ত্রকে পাশ্চাত্য জগত প্রত্যাখ্যান করল। অন্যদিকে পাশ্চাত্য জগতও মানুষের মুক্তির জন্য কোন কল্যাণকর ব্যবস্থা দিতে ব্যর্থ হলো। ফলে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, পুঁজিবাদী শোষণ, সামাজিক অবক্ষয়, হতাশা ও বঞ্চনা যখন পাশ্চাত্য জড়বাদী সভ্যতাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, তখন আইরিশ কবি উইলিয়ম বাটলার ইয়েটস্ [১৮৬৫-১৯৩৯] এবং ইংরেজ কবি [জন্মসূত্রে আমেরিকান পরে বৃটিশ নাগরিক] টমাস স্টিয়ার্নস্ এলিয়ট খ্রিস্টীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে হতাশা-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে মানুষের মনে আস্থা ও নির্ভরতা সৃষ্টি করার প্রয়াস পেলেন। এলিয়টের The Waste Land এবং ইয়েটস্‌-এর Sailing to Byzantium-এ খ্রিস্টীয় মূল্যবোধকে উচ্চকিত করে তোলে। তাঁদের অন্যান্য লেখার মধ্যেও এ ভাবের প্রতিফলন ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও তাঁদের কবিতা ও লেখা দেশ-বিদেশে যথেষ্ট সাড়া জাগায়।

সৈয়দ আলী আশরাফের মধ্যেও ইয়েটস্ ও এলিয়টের একটা প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। মানব-প্রকৃতি ও ইতিহাস আলোচনার মাধ্যমে তিনিও মানবিক মূল্যবোধ ও জীবনের চরম সত্য উপলব্ধি করে তার মাধ্যমে মানব-মুক্তির পথ অন্বেষণ করেছেন। বলাবাহুল্য, ইসলাম ও মহানবীর [স.] জীবনাদর্শের মধ্যেই তিনি মানবতার এ মুক্তিপথের সন্ধান পেয়েছেন। তাঁর ‘হিজরত’, ‘বনি আদম, ‘বিসংগতি’, ‘দজ্জাল’, ‘শিরী ফরহাদ’, ‘ইতিহাস’, ‘আসফালা সাফেলীন’, ‘লাব্বায়েক’ প্রভৃতি কবিতায় তাঁর এ অন্বেষার পরিচয় বিধৃত। এলিয়ট ও ইয়েটস্ যেমন আধুনিক ভাবকল্পনা, রূপক, প্রতীক ও উপমা-উৎপ্রেক্ষার মাধ্যমে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন, সৈয়দ আলী আশরাফও তেমনি তাঁদের অনুসরণে রূপক, উপমা, প্রতীক ইত্যাদি ব্যবহার করে আধুনিক কাব্য-কৌশল অবলম্বন করে কবিতা রচনার প্রয়াস পেয়েছেন। এ ব্যাপারে তাঁর সচেতনতা ও পারদর্শিতা সম্পর্কে কারো কোন সন্দেহ নেই। তাঁর প্রতীক ব্যবহারের কৌশল অনেকটা ইয়েটস্ ও এলিয়টকে, চিত্রকল্প ব্যবহারের পদ্ধতি ডিলান টমাস ও অমিয় চক্রবর্তীকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এছাড়া, চিত্রকল্প ও রূপকল্প ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি ‘আল কুরআন’, ‘মুসলিম পুঁথি সাহিত্য’, ‘রুমীর মসনবী’ ও ফারসী কবি নিজামীর ‘ইউসুফ জোলায় খাঁ’ এবং ‘লায়লা মজনু’কেও কোন কোন ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন। তবে সব ক্ষেত্রেই তাঁর নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, স্টাইল ও স্বকীয়তার পরিচয় স্পষ্ট।

সৈয়দ আলী আশরাফ ঐতিহ্য-সচেতন কবি। তাঁর কবিতায় ইসলামী আদর্শের সাথে মুসলিম ঐতিহ্যের এক অনিবার্য সংমিশ্রণ ঘটেছে। সব বড় কবিই মূলত ঐতিহ্যের অনুসারী। তাঁরা সকলেই নিজ নিজ ঐতিহ্যের অনুসরণে মহৎ কাব্য রচনা করতে সক্ষম হয়েছেন। সৈয়দ আলী আশরাফও ঐতিহ্যবাদী। তিনি তাঁর স্বকীয় ঐতিহ্যের আলোকে কবিতার সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন। প্রতীক ও রূপকের মাধ্যমে তিনি ঐতিহ্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তবে প্রতীক ও রূপকের ব্যবহার সকলের নিকট এক রকম নয়। সৈয়দ আলী আশরাফের মতে, প্রতীক দুই ধরনের- ঐতিহ্য-সংশ্লিষ্ট ও বুদ্ধিজাত। এলিয়ট যেমন তাঁর ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ কাব্যে খ্রিস্টীয় ভাবধারা, আর্থুরীয়ান রোম্যান্স এবং বিভিন্ন মধ্যযুগীয় ও গ্রীক উপকথা থেকে উপমা-প্রতীক আহরণ করে তাঁর নিজস্ব জীবনোপলব্ধির আলোকে নবরূপ দান করেছেন, ইয়েটস্ যেমন আইরিশ উপকথা থেকে প্রতীক সংগ্রহ করেছেন আবার সম্পূর্ণ নিজস্ব বুদ্ধিজাত প্রতীক-উপমাও সৃষ্টি করেছেন, সৈয়দ আলী আশরাফও তেমনি তাঁর জীবনের প্রধানতম অনুপ্রেরণার উৎস ঐশীগ্রন্থ আল কুরআন, মুসলিম ঐতিহ্য, ইতিহাস, ফারসী সাহিত্য, পুঁতিসাহিত্য থেকে অকাতরে উপমা-প্রতীক সংগ্রহ করে তাঁর নিজস্ব মনন ও আধুনিক কাব্য-ভাবনার উপযোগী করে তার প্রকাশ করেছেন। এক্ষেত্রে নজরুল-ফররুখের সাথে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কিছুটা সাদৃশ্য চোখে পড়ে। ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্য-চেতনার ক্ষেত্রে পূর্বসূরী এ দুই কবির সাথে সৈয়দ আলী আশরাফের সাজুয্য ছিল একান্তই স্বাভাবিক।

নজরুল মুসলমানদের ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে ভাব, ভাষা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। মুসলমানদের ঘরোয়া জীবনের আচার-আচরণ থেকে বিভিন্ন চিত্র গ্রহণ করেও তিনি তাঁর কাব্য-কবিতায় স্বচ্ছন্দভাবে ব্যবহার করেছেন। এছাড়া, আরবী-ফারসী আয়াত, সম্পূর্ণ বাক্য বা অসংখ্য উপযোগী শব্দ ব্যবহার করেও তিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ও বলিষ্ঠ কাব্য-ভাষা নির্মাণ করেছেন। ফররুখ আহমদ নজরুল-প্রদর্শিত এ ভাষা-রীতিকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন এবং মুসলিম ঐতিহ্য ও পুঁথি সাহিত্য থেকে বিভিন্ন শব্দ, রূপক, প্রতীক, উপমা ও রূপকল্প গ্রহণ করে আধুনিক রূপাঙ্গিকে তার অভিনব রূপ দান করেছেন তাঁর বিভিন্ন কাব্যে। তিনি ‘সিন্দবাদ’ ও ‘হাতেম তা’য়ী’ নামক মধ্যযুগীয় দুই প্রবাদ পুরুষকে সমকালীন বাঙালি মুসলমানের স্বপ্ন-কল্পনা ও আশা-প্রত্যাশার প্রতীক হিসাবে অভিনব কাব্য-সৌন্দর্যে রূপায়িত করেছেন। চল্লিশের দশকে ‘সিন্দাবাদে’র প্রতীকে ফররুখ ‘সাত সাগতের মাঝি’তে তৎকালীন বাঙালি মুসলমানের স্বপ্ন-কল্পনা ও স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্ষা প্রমূর্ত করে তুলেছেন এবং ‘হাতেম তা’য়ীর প্রতীকে তৎকালীন পাকিস্তানে মুসলিম সমাজের অবক্ষয়, নৈতিক অধঃপতন, দ্বন্দ্ব-কহল ইত্যাদির অবসান ঘটিয়ে তাদেরকে সাচ্চা মুসলমান হওয়ার ও মহৎ মানবিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সৈয়দ আলী আশরাফও অনেকটা ফররুখ আহমদের মতোই মানবতার মুক্তি কামনা করেছেন। ব্যক্তিগত জীবন থেকে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বন্দ্ব-কলহ-সংঘাত, মিথ্যা ও অন্যায়ের যে বিস্তার ঘটেছে, তার মূলে রয়েছে স্বার্থান্ধ নাফ্‌সের আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতা। একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য ও রূহানী শক্তির চর্চা বা আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমেই এ চিরন্তন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে, অন্যায়-অশান্তি-মিথ্যার বিনাশ ঘটিয়ে সত্য, ন্যায় ও শান্তির প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতে পারে। সৈয়দ আলী আশরাফের প্রায় সব কাব্যেই বিশেষত ‘হিজরত’, ‘রূবাইয়াতে জহীনি’, কাব্যে কবির এ প্রতীকী অনুভব অপরূপ কাব্যিক ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। এজন্য কবি আল মাহমুদ সৈয়দ আলী আশরাফ সম্পর্কে যে কথা বলেছেন, তা যথার্থ বলেই মনে হয়। কবি আল মাহমুদ বলেন:

“তাঁর [সৈয়দ আলী আশরাফ] কবিতায় রয়েছে এমন ধরনের রহস্যময় আধ্যাত্মিক গুণ যা তাঁর সমসাময়িক কবিগণ প্রায় উপেক্ষা করেই আধুনিকতার পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু সৈয়দ আলী আশরাফ ঐতিহ্য ও পরম আস্তিকতাকেই কবিতার উপজীব্য করে দূরে সরে যান। এই দূরে সরে যাওয়ার জন্য একটি কারণ সম্ভবত তাঁর দীর্ঘ প্রবাস যাপন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনা সূত্রে ব্যাপকতর উদার মানসিক আদান-প্রদান।…বাংলা কবিতার অন্য একটা দিক যার নাম বিশ্বাসের নির্ভরতা তা সৈয়দ আলী আশরাফ আমাদের দোদুল্যমান চিত্তচাঞ্চল্যের উপশম হিসাবে উপস্থিত করেছেন। বাংলা কবিতাকে দিগ্বিজয়ী করতে হলে এই কবিতা আমাদের একান্ত দরকার।”

এ সম্পর্কে আবু রুশদের একটি মন্তব্য অতিশয় প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন: “তিনি [সৈয়দ আলী আশরাফ] জীবনের অসংশোধনীয় অযৌক্তিকতা ও ক্ষণভঙ্গুরতার মধ্য দিয়ে এক দুর্লভ অভিজ্ঞতার দ্বন্দ্ব বিক্ষুব্ধ সন্ধানী এবং সর্বশেষ তিনি কিছুটা মরমী ধরনের অধ্যাত্মবাদের ও নিজের ধর্মের নিগূঢ় আশ্রয় সন্ধানী।…ব্যক্তিগত প্রেম অতিক্রম করে তিনি স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, জীবনের হতাশা ও গ্লানি প্রবলভাবে মনের জোরের সঙ্গে অতিক্রম করে নিজের ধর্মের স্থায়ী আশ্রয় ও শীতল ছায়ায় এসে স্বস্তি পেয়েছেন। কিন্তু যেটা কবি হিসাবে তাঁর সবচেয়ে লক্ষ্যযোগ্য গুণ সেটা হলো তাঁর নিজস্ব কণ্ঠছাপ।…দেশজ প্রভাবের বাইরে কবি মাঝে মধ্যে আন্তর্জাতিকতাও অর্জন করেছেন। সৈয়দ আলী আশরাফের কয়েকটি ধর্মীয় কবিতায়… বিশ্বাসী অবস্থায় ও খোদার ইচ্ছের প্রতি প্রত্যয়দীপ্ত সমর্পণই বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। এ ধরনের কবিতার মধ্যে ‘কাবা শরীফ’, ‘হেরা’, ‘মদীনার উদ্দেশ্যে’, ‘মদীনা’ উল্লেখযোগ্য। বস্তুত তাঁর উপরোক্ত চারটা ধর্মীয় কবিতায় বিশ্বাস, আবেগ ও নতুন কাব্যিক ভাষার সমন্বয় অনেকটা সফলতার সাথে ঘটেছে।”

সৈয়দ আলী আশরাফ ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং পরবর্তী জীবনে দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যে তাঁর দক্ষতা ছিল অগাধ। তাই তাঁর কাব্য-সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব ছিল একান্তই স্বাভাবিক। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “চৈত্র যখন”-এ কবির ইংরেজি কাব্য পাঠের স্পষ্ট স্বাক্ষর বিদ্যমান। বিশিষ্ট কবি-সমালোচক সৈয়দ আলী আহসানের মতে এ গ্রন্থের প্রথম দু’টি কবিতা ইংরেজ কবি বরার্ট ব্রাউনিং-এর মনোলোগের ধাঁচে রচিত। তিনি বলেন: “বাংলা ভাষায় এই ভঙ্গিতে কখনো কবিতা রচিত হয়নি। ভঙ্গিটি বাংলা ভাষার গতি-প্রকৃতির সঙ্গে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তাও পরীক্ষিত হয়নি। সৈয়দ আলী আশরাফই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই পরীক্ষার সূত্রপাত করেছিলেন। কিন্তু মাত্র দুটি কবিতায় এই পরীক্ষার বিবৃতি ঘটায় আমরা ভঙ্গীটির পরিণত রূপ দেখতে সক্ষম হলাম না। তবু একথা বলা যায়, এ ভঙ্গীটির সূত্রপাতের জন্য আলী আশরাশ প্রশংসা পাবার অধিকারী।” [সৈয়দ আলী আহসান: সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা]

মনোলোগ বা স্বগতোক্তি যা আমরা পূর্বে সাধারণত নাটকে প্রত্যক্ষ করেছি, কবিতায় তা সাধারণত দেখা যায় না। আলী আশরাফ কবিতায় এ বিশেষ ভঙ্গীটি ইংরেজি কবিতা থেকে বাংলায় নিয়ে এসেছেন। এটা তাঁর ইংরেজি কবিতা পাঠেরই ফল। এ সম্পর্কে সৈয়দ আলী আশরাফ বলেন:

“ইংরেজি সাহিত্যে ব্রাউনিং “ড্রামাটিক মনোলোগে” রচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বিএ অনার্সের ছাত্র ছিলাম তখন ব্রাউনিং আমার বিশেষ প্রিয় কবি ছিলেন। নিশ্চয়ই তাঁর প্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে সেই আঙ্গিকে কাব্য রচনা করি।…মনোলোগ মধুসূদন রচনা করে গেছেন- “ব্রজঙ্গনা” কাব্য। সার্থক মনোলোগ- ‘দশরথের প্রতি কৈকেয়ী’ একটি সার্থক ড্রামাটিক মনোলোগ।” [সৈয়দ আলী আশরাফের সাক্ষাৎকার, পূর্বোক্ত]

সৈয়দ আলী আশরাফের পূর্বসূরী কবি ফররুখ আহমদের মধ্যেই এ ভঙ্গীটি বিদ্যমান। তাঁর রচিত ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যের অন্তর্গত বেশ কয়েকটি কবিতা এ মনোলোগ ভঙ্গীতি রচিত। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ফররুখ আহমদেরও অনেক আগে এ মনোলোগ ভঙ্গীতে কাব্য রচনা করেছেন। একথা সেয়দ আলী আশরাফও উল্লেখ করেছেন। অতএব, সৈয়দ আলী আহসান বাংলা কাব্যে এ ভঙ্গীতে প্রথম কবিতা রচনার কৃতিত্ব সৈয়দ আলী আশরাফকে দিলেও সেটা যে যথার্থ নয়, তা উপলব্ধি করতে কষ্ট হয় না। অর্থাৎ বাংলা কাব্যে এ ভঙ্গীতে প্রথম কবিতা রচনার কৃতিত্ব মাইকেল মধুসূদনের এবং তারপর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান কবি ফররুখ আহমদ তাঁর প্রখ্যাত ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে এ ভঙ্গীতে বেশ কয়েকটি কালজয়ী কবিতা লিখে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। সৈয়দ আলী আশরাফ ইংরেজ কবি ব্রাউনিং, মধুসূদন ও ফররুখ আহমদের পরবর্তী কবি হিসাবে তাঁদেরকে সার্থকরূপে অনুসরণ করেছেন, তাতে সন্দেহ নেই।

এ কাব্যে তাঁর ব্যক্তিগত উপলব্ধি, বিশ্বাস, প্রেম, অধ্যাত্মবোধ, প্রকৃতি, স্বদেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। তবে এখানে তাঁর প্রকাশ-ভঙ্গী অনেকটা ভিন্ন ধরনের। কয়েকটি উদ্ধৃতি পেশ করছি:

“খুঁজেছি অনেক তাকে অন্ধকার মাঝরাতে বিদ্যুতের চকিত আভায় অথবা ধানের ক্ষেতে ফসলের নম্র পূর্ণতায় খুঁজেছি।” [পূর্ণমান স্বদেশ: চৈত্র যখন]

অন্বেষার মাধ্যমেই নিজেকে জানা যায়। অন্বেষার মাধ্যমেই সত্যোপলব্ধি ঘটে। অন্বেষার মাধ্যমেই বিশ্বাসের প্রগাঢ়তা সৃষ্টি হয়, প্রেমের বিভিন্ন স্তরে পূর্ণতা আসে। ব্যক্তিগত প্রেম, মানবিক প্রেম, স্বদেশপ্রেম, অধ্যাত্মপ্রেম ক্রমান্বয়ে উচ্চাঙ্গ মার্গে তথা মহান স্রষ্টার প্রতি অনাবিল প্রেমে উন্নীত হয়। মানুষ পরিণত হয় ইনসানে কামিলে। হাদীস শরীফে তাই বলা হয়েছে : ‘ফাকাদ আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু’- অর্থাৎ নিজেকে জান, তাহলে তোমার রব বা প্রভুকেও জানতে পারবে। ইংরেজিতে বলা হয়- Know thyself, অর্থাৎ নিজেকে জান। প্রত্যেক জ্ঞানের উৎসই এ অন্বেষা। হযরত ইব্রাহিম [আ.] এ অন্বেষার মাধ্যমেই তাঁর রব বা পরম সত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন। মহানবী [সাঃ] এ অন্বেষার বশবর্তী হয়েই দীর্ঘ পনের বছর হেরা পর্বতের গুহায় কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হয়েছিলেন। গৌতম বুদ্ধও সত্যানুসন্ধানে বোধিবৃক্ষের ছায়ায় দীর্ঘকাল তপস্যায় নিমগ্ন ছিলেন। আলী আশরাফের অন্বেষাও এভাবে তাঁকে এক জায়গায় এনে স্বিতধী করে। কবি বলেন :

“অসীম সসীম তার মিলে গেছে সমুদ্র-উল্লাসে। অতনু প্রবাহ তার অন্তরের অন্তরীক্ষে বাজিয়েছে প্রত্যক্ষ কিঙ্কিনি।”

‘চৈত্র যখন’ কাব্যের প্রতিটি কবিতাই বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত। এ কাব্যের প্রতিটি কবিতায়ই জিজ্ঞাসা আছে, অন্বেষা আছে এবং শেষ পর্যন্ত পাঠকের মনকে নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট উপলব্ধির প্রান্তে নিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে, যা পাঠকের মনকে আশ্বস্ত করে, পরিতৃপ্তির আনন্দে উদ্ভাসিত করে তোলে। বিশ্বাসী কবির এ এক অপরিহার্য গুণ। এ কাব্যের অন্তর্গত ‘বনি আদম’ কবিতাটি সম্ভবত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ কবিতায় কাব্যের কেন্দ্রীয় ভাব পরিব্যক্ত হয়েছে। ছয় পর্বে বিভক্ত এ কবিতায় কবি মানব-জীবনের আদি-অন্ত, এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরূপ দার্শনিক প্রজ্ঞা ও কাব্যময়তার সমন্বয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। এক মহাকাব্যিক অনুভব একটি মাত্র কবিতায় ছন্দময় ব্যঞ্জনায় অভিব্যক্ত হয়েছে। কবিতার প্রথম কয়টি লাইন এরূপ:

“হে নবী আদম আমরা ভাসন্ত চন্দ্র পৃথিবীর বুকে ক্রমশঃ বর্ধন আর ক্রমশঃ বিক্ষয় শূন্যময় আমাদের গোধুলি জীবন।” [বনি আদম: চৈত্র যখন]

সৈয়দ আলী আশরাফের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বিসংগতি’। এখানে কবির আধ্যাত্ম সাধনার বিষয় কাব্যাকারে বর্ণিত হয়েছে। সাধনার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। সূফী তত্ত্বে আধ্যাত্ম-সাধনার প্রথম স্তর হলো জিজ্ঞাসা ও অন্বেষার মাধ্যমে নিজেকে জানা। দ্বিতীয় স্তর হলো অধ্যাত্ম-গুরুর সাথে আধ্যাত্মিকভাবে একাত্ম হওয়া। তৃতীয় স্তর হলো আল্লাহর অস্তিত্বের সাথে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া। সূফীরা যেটাকে বলেন ‘ফানাফিল্লাহ’। অর্থাৎ আধ্যাত্ম-সাধনার সর্বশেষ স্তরে উপনীত হওয়ার পর সাধক তাঁর নিজের জৈব-সত্তা বিস্তৃত হয়ে পরম স্রষ্টার শাশ্বত সত্তার সাথে একাত্মতা অনুভব করেন। এটা সাধকের সর্বোচ্চ মার্গ। ‘বিসংগতি’ কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় নিসর্গ, মানুষ, মানুষের বহিরঙ্গ ও অন্তর-রাজ্যের বিভিন্ন দোলাচল, পৃথিবীর নানা বাস্তবতার কবিত্বময় বর্ণনার মাধ্যমে কবি তাঁর অধ্যাত্মবোধকেই ব্যক্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন। নানা রূপক, উপমা, প্রতীকের মাধ্যমে কবি এই বোধকে আরো তাৎপর্যময় করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যেমন :

“লঞ্চের লাঞ্ছনা শেষ। মুক্তপ্রাণ ছন্দবিদ্ধ হাওয়া; নরম বিছানা মাটি সদ্য ভেজা বর্ষণ সরস; ঝাঁ ঝাঁ দুপুরের মাঠে ভরামন আউষের সোনা; ছলছল নদীবেগ অস্পষ্ট অধরা তবু নাচে। সামনে সবুজ শাড়ি পাটক্ষেত; ভাঙা মনে জোড়া তীক্ষ্ণ-চিল; বিরহ সমৃদ্ধি ঘন কুহু, কুহু; কহু; ডাহুকও দরদী। তবুও অস্থিরচিত্ত। মনোলীন। যদিও বা ধান্যগন্ধী দেহ, মৃত্যুলগ্নী মোহের মোক্ষনে চিনেছি তো তারে।” [বিসংগতি : বিসংগতি]

‘বিসংগতি’র কয়েকটি কবিতা ইংরেজ কবি এজরা পাউন্ড, ক্যান্টো, ই.ই. কামিংস-এর অনুসরণে লেখা। এখানেও কবির ইংরেজি কাব্য পাঠের প্রভাব স্পষ্ট। ‘বিসংগতি’র মধ্যে যে ভাব ও অনুভূতি কোরক মেলেছে কবির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘হিজরত’-এ তা পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়েছে। এখানে আত্নগত অনুভব পূর্ণ আধ্যাত্ন-চেতনার রূপ পরিগ্রহ করেছে। এখানে প্রতিটি কবিতায় আল্লাহ, রাসূল [সা.] ও ইসলামের সুমহান আদর্শের আবেগঘন বর্ণনা আছে। হজ্জব্রত পালন উপলক্ষে কবি মক্কা, মদীনা, আরাফাত ও অন্যান্য ঐতিহাসিক-ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গমনকে হিজরতের সাথে তুলনা করেছেন। হিজরতের প্রকৃত উদ্দেশ্য তো আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ বা আল্লাহর দীনের জন্য স্বগৃহ পরিত্যাগ করা। হজ্জের উদ্দেশ্যও তাই। তবে কবির এ হিজরতে বিশেষভাবে আধ্যাত্মিক অভিযাত্রাই গুরুত্ব লাভ করেছে। সেদিক দিয়ে আলী আশরাফের এ কাব্য সমগ্র বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব ও অসাধারণ সংযোজন হিসাবে পরিগণিত হতে পারে। এ সম্পর্কে সৈয়দ আলী আহসানের অভিমত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন:

“এ কাব্যগ্রন্থের ‘হিজরত’ এবং ‘লাব্বায়েক’ নামক কবিতা দুটি বাংলা কাব্য সাহিত্যে একটি নতুন সংযোজন। ঠিক এ ধরনের কবিতা বাংলা কাব্যের ইতিহাসে আর কখনো লিখিত হয়নি। ‘হিজরত’ কবিতাটিতে কবির আধ্যাত্মিক যাত্রাপথের রূপচিত্র পাই। বাস্তব জগতের প্রেম, লোভ, ক্ষয়ক্ষতি সব কিছু ত্যাগ কবি হিজরত করেছেন আল্লাহএবং রাসূলের নিকটতম সান্নিধ্য লাভের জন্য। এ কবিতাটি টি.এস. এলিয়টের ‘অ্যাশ ওয়েড্‌নেসডে’ [Ash Wednesday] কবিতাটির সঙ্গে তুলনীয়। এখানেও কবি এলিয়টের মত কয়েকটি প্রতীক ব্যবহার করেছেন যে সমস্ত প্রতীক আধ্যাত্মিক অবস্থার অনুভূতি জাগ্রত করে।…চতুর্থ কবিতাটিতে [লাব্বায়েক’] ইয়েটসের ‘সেইলিং টু বাইজ্যান্টিয়াম’ [Sailing to Byzantium] কবিতার প্রভাব লক্ষ্য করি। ইয়েটস্ও সন্ধান করেছেন চিরন্তনকে, এ কবিও চাচ্ছেন আল্লাহ ও রাসূলের সান্নিধ্য লাভের পর এই ক্ষয়িষ্ণু দুনিয়াতে চিরন্তনকে। মদীনা মুনাওয়ারাকে সেই চিরন্তনের প্রতীক হিসাবে দেখেছেন এবং রাসূল (সা.]-এর মধ্যে সেই ‘নিবেদন অমরত্বে’র সন্ধান পেলেন তাই কবি সম্পূর্ণ নতুন অর্থ যোজনা করে বাংলা পুরাতন রূপকল্পকে প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করেছেন- এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।” [পূর্বোক্ত]।

‘হিজরত’ কাব্যটি কবির রূহানী পীর ‘হজরত বাবা শাহ তাজী রহমাতুল্লাহ আলায়হের স্মরণে’ উৎসর্গীকৃত। তিনি সৈয়দ আলী আশরাফের আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন। কবি তাঁর আধ্যাত্মিক গুরুর সান্নিধ্যে এসে যে উপলব্ধি ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, সেটারই পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে তাঁর এ কাব্যের বিভিন্ন কবিতায়। মূলত এটা গতানুগতিক কোন ধর্মীয় কাব্য নয়।

ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাকে কবি আধুনিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী প্রকাশ করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাই এখানে আবেগের যেমন প্রশ্রয় আছে তেমনি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতারও প্রকাশ ঘটেছে।

কবির পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের নাম : ‘রূবাইয়াত এ জহিনী’। এখানেও কবির আধ্যাত্ম-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। এ কাব্য সম্পর্কে সৈয়দ আলী আশরাফ যে কথা বলেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। কবি বলেন : “মানবিক প্রেম ও ঐশীপ্রেম এ দুয়ের প্রকাশ আমার কাব্যে রয়েছে এবং মানবিক প্রেম থেকে ঐশীপ্রেমের পথে যে যাত্রা এবং যে নতুন রূপ তা ‘রূবাইয়াত এ জহিনী’-তে ভালভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।” একটি উদাহরণ:

“প্রিয়ারে আমার শুকরিয়া দিই; শান্ত ঘরের মন্ত্রণায় আমারে কখনো বন্দী করেনি গল্পগুজব সান্ত্বনায় আগুনে পুড়িয়ে কঠিন জ্বালায় আমারে করেছে দীপ্ত শিখা সেই আলো দিয়ে তোমারে চিনব-মিলাবে মিটাবে অন্তরায়।” [রূবাইয়াৎ-ই-জহীনী]

সৈয়দ আলী আশরাফের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রশ্নোত্তর’। এ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় বলা হয়েছে: ‘প্রশ্নোত্তর’ বইতে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের পরম সত্তার সঙ্গে নিজস্ব পরিচিতির আনন্দ যেমন পরিবেশন করতে চেষ্টা করেছেন, তেমনি সেই সত্তার সঙ্গে অপরিচয়ের অন্ধত্ব এবং তার ফলগত ক্রুরতা ও স্বার্থপরতার বেদনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রশ্ন করেছেন কেন এই অপরিচয়? অন্তরাত্মায় বেদনাক্ত যে উত্তর উদিত হচ্ছে কবি তা-ই এ বইতে প্রকাশ করেছেন।”

সৈয়দ আলী আশরাফ মুসলিম ঐতিহ্য, ইসলামী জীবনবোধ ও গভীর আধ্যাত্ম-চেতনাসম্পন্ন একজন আধুনিক কবি। বাংলা কাব্যে এটা কোন নতুন বিষয় নয়; মধ্যযুগে শাহ মোহাম্মদ সগীর থেকে এর উৎপত্তি এবং বিভিন্ন যুগে অসংখ্য মুসলিম কবির কাব্য-কবিতায় এর রূপায়ণ ঘটেছে বিভিন্নভাবে। আধুনিক যুগে নজরুল-ফররুখ এ ধারার সর্বাদিক উল্লেখযোগ্য কবি। সৈয়দ আলী আশরাফ তাঁদেরই সার্থক উত্তরসূরী। তবে তাঁর আধ্যাতিত্মক বোধ ও জীবন-অভিজ্ঞতার রূপায়ণ ও নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মিতির ক্ষেত্রে তাঁর সচেতন-সক্ষম প্রয়াস তাঁকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে। এদিক দিয়ে তাঁর কাব্য-মূল্য কম নয়। এ কারণে তিনি একজন বিশিষ্ট কবি হিসাবে বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

এছাড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ উন্নয়ন ও ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর যে অসামান্য অবদান রয়েছে সেজন্য তিনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে সুপরিচিত। এসব বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় তাঁর রচিত বিভিন্ন জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থাদি তাঁকে বিশ্বে জ্ঞানী-গুণী মহলে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

সূত্রঃ সাহিত্য ত্রৈমাসিক প্রেক্ষণ অক্টবর-ডিসেম্বর ২০০৬ (সৈয়দ আলী আশরাফ স্মরণ)

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather