All posts by ফাহমিদ-উর-রহমান

ফাহমিদ-উর-রহমান একজন মননশীল প্রাবন্ধিক ও বুদ্ধিজীবী। পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হলেও ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, সমাজ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তিনি লিখছেন। সমাজ ও সংস্কৃতি সচেতন বিধায় তিনি আধুনিকতার সমস্যা নিয়ে লিখেছেন। আধুনিকতা ও সাম্রাজ্যবাদের সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। তার ঋদ্ধ লেখালেখি নতুন আঙ্গিকে বাঙালি মুসলমানের জাতিসত্তার উপরে আলোকপাত করেছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের নামঃ ১। ইকবাল মননে অন্বেষণে (১৯৯৫) ২। অন্য আলোয় দেখা (২০০২) ৩। উত্তর আধুনিকতা (২০০৬) ৪। সেকুলারিজমের সত্য মিথ্যা (২০০৮) ৫। উত্তর আধুনিক মুসলিম মন (২০১০) ৬। সাম্রাজ্যবাদ (২০১২) ৭। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ (২০১৩) ৮। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বাংলাদেশ (২০১৪) পাশাপাশি তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ১। জামাল উদ্দীন আফগানী: নব প্রভাতের সূর্য পুরুষ (২০০৩) ২। মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭ (২০০৯) ৩। ফরায়েজী আন্দোলন : আত্মসত্তার রাজনীতি (২০১১)
download (24)

ভাই গিরিশচন্দ্র সেন – শতবর্ষ পরে ফিরে দেখা

ফাহমিদ-উর-রহমান | জুন ১৭, ২০১৫
Download PDF

২০১০ খ্রিষ্টাব্দ ছিল ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের মৃত্যু শতবার্ষিকী। গিরিশচন্দ্র সেন বাংলা ভাষার কোরআন শরীফের প্রথম তরজমা করে মশহুর হয়েছেন- এ তথ্য সবার জানা। বাঙালি মুসলমান সমাজে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তার কারণও এটা। তিনি শুধু কোরআন শরীফের তরজমা করেননি, তিনি যে ৪২ টি পুস্তক রচনা করেছিলেন তার সিংহভাগই ছিল মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে লেখা। সাধারণ বাঙালি মুসলমানরা আরবি-ফার্সি-উর্দু জানে না। ফলে তাদের প্রিয় কেতাবগুলো পড়তে পারে না। ওইসব গ্রন্থে যেসব মূল্যবান বাণী আছে তাও তাদের অন্যের মুখে শুনে পরিতৃপ্ত হতে হয়। গিরিশচন্দ্র সেন পবিত্র কোরআন শরীফের তরজমা করে এবং মুসলিম সংস্কৃতি ও মনীষার ওপর বিভিন্ন গ্রন্থ লিখে আজ থেকে শতাধিক বছর আগে বাঙালি মুসলিম সমাজের জন্য প্রভূত উপকার করে গেছেন। যখন কোরআন শরীফের কোনো বাংলা তরজমা ছিল না, এমনকি ইসলাম সম্পর্কে বাংলা ভাষায় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচিত হয়নি, তখন গিরিশচন্দ্র তাঁর নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ফল দিয়ে বাঙালি মুসলিম সমাজকে কতভাবে ঋণী করে গেছেন, তা লিখে প্রকাশ করা যাবে না।

গিরিশ চন্দ্র ছিলেন পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক ও সর্বধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ। উনিশ শতকের বঙ্গীয় সমাজে যখন ধর্মীয় মোহগ্রস্ততা ও সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত, সেই কালে নিজে অসাম্প্রদায়িক হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ মনোযোগ, ঐকান্তিকতা ও আগ্রহ দিয়ে তিনি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়েও মুললিম সমাজ ও সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। ইসলাম ধর্মশাস্ত্রের ওপর পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁকে সেইকালে ‘মৌলভী গিরিশচন্দ্র সেন’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছিল। সমকালে এবং পরবর্তী সময়ে গিরিশ চন্দ্র কৃত বাংলা কোরআন শরীফ বাঙালি মুসলমান সমাজে বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল।

অনুবাদকের জীবদ্দশাতেই এটির একাধিক সংস্করণ সেই জনপ্রিয়তার প্রমাণ। বহুদিন পর মাওলানা আকরাম খাঁ গিরিশ চন্দ্রের সেই ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন এভাবে- সমকালে আরবি-ফার্সি ভাষায় সুপণ্ডিত বাঙালি মুসলমানের অভাব না থাকলেও এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার কথা তাদের মাথায় আসেনি। তাদের অবহেলিত জরুরি কর্তব্য কর্মটি সম্পাদন করলেন বাংলার একজন হিন্দু সন্তান। ভাই গিরিশচন্দ্র সেন। গিরিশচন্দ্রের এই অসাধারণ সাধনা ও অনুপম সিদ্ধিকে জগতের অষ্টম আশ্চর্য বলিয়া উল্লেখ করা যাইতে পারে।

গিরিশচন্দ্র কোরআন বা মুসলিম সংস্কৃতি নিয়ে অন্যান্য তরজমা বা লেখাজোখা না করলে সেগুলো কি লিখিত হতো না? হতো অবশ্যই। কিন্তু তাতে হয় তো আরও কয়েক দশক লেগে যেত। এই দীর্ঘ সময় শুধু বাঙালি মুসলমানরাই নয়, অন্য ধর্মের উদারপন্থী মানুষও কোরআন বা মুসলিম সংস্কৃতি ভিত্তিক লেখাজোখা থেকে বঞ্চিত হতো। তাই গিরিশ চন্দ্রের এই পরিশ্রম বাঙালি মুসলমান সমাজকে এগিয়ে আনতে সাহায্য করেছিল বলা যায়, তেমনি তা ধর্মীয় সহনশীলতা ও আন্তধর্মীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক বড় অবদান রেখেছিল।

অথচ এই মহান, অসাম্প্রদায়িক ‘মৌলভী’ সম্পর্কে ধর্ম হিসেবে মুসলমানরা যেমন উদাসীন, তেমনি জাতি হিসেবেও আমরা নির্লিপ্ত। গিরিশচন্দ্রের প্রিয় শহর ছিল ঢাকা। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন সেই কালের ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার রূপগঞ্জ থানার পাঁচদোনা গ্রামে। মৃত্যুর আগে অসুস্থ গিরিশচন্দ্র প্রিয় শহর ঢাকায় জীবনের শেষ ক’টা দিন কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। মৃত্যুর আগে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বহু মানুষ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। তেমনি ১৯১০ সালের ১৫ আগষ্ট তাঁর মৃত্যুর পর উভয় সম্প্রদায়ের বহুমানুষ তাঁর শ্মশানযাত্রী হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর একজন ভক্ত মুসলমান ব্রাহ্ম সমাজের দফতরে চিঠি লিখে এভাবে আক্ষেপ করেছিলেনঃ আজ বঙ্গীয় মুসলমানদিগের একজন সুহৃদ তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া অনন্ত ধামে চলিয়া গিয়াছেন। হায়! কে আর এখন আরব্য ও পারস্য ভাষা হইতে উৎকৃষ্ট ও উপাদেয় গ্রন্থ বঙ্গভাষায় অনুবাদিত করিয়া মুসলমানদিগকে ইসলামের বিষয়ে শিক্ষা দিবেন?

গিরিশচন্দ্রের প্রিয় শহর ঢাকায় তাঁর মৃত্যু শতবার্ষিকীতে কোনো অনুষ্ঠান হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। পত্রপত্রিকায় তাঁর সম্পর্কে খুব কিছু উল্লেখযোগ্য লেখাজোখা হয়েছে বলে চোখে পড়েনি। ইসলামের বন্ধু এই প্রাতঃস্মরণীয় মানুষটির স্মৃতিবার্ষিকী নীরবে বিদায় নিয়ে আমাদেরই লজ্জিত করে গেছে।

ভাই গিরিশচন্দ্র সেন হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করে পরে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর অপরিসীম আগ্রহী হয়ে উঠার পেছনে এই ব্রাহ্মধর্মটাই ছিল বড় কারণ। ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি মূল আরবী ভাষায় কোরআন-শরীফ পড়ে এবং অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদ প্রথা মানবিক কাণ্ডজ্ঞান ও যুক্তি ধর্মের অনুকূল নয়। তাই এসবের প্রতি তাঁর একধরনের অশ্রদ্ধা জন্মে। তিনি হিন্দু ধর্ম ও সমাজকে সংস্কারের চেষ্টা করেন এবং উপনিষদকে ভিত্তি করে একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মধর্মের পত্তন করেন। রাজা রামমোহন রায়ের ধর্ম সংস্কারমূলক আন্দোলন সেকালের হিন্দু সমাজে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল এবং হিন্দু সমাজের বহু প্রতিভাবান, প্রভাবশালী ও গুণীব্যক্তি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল অন্যতম। ব্রাহ্মসমাজের একজন বিখ্যাত নেতা ছিলেন কেশব চন্দ্র সেন। মূলত কেশব চন্দ্রের প্রভাবে গিরিশচন্দ্র ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন এবং তাঁর এক জীবনীকারের ভাষায় উগ্র হিন্দু থেকে সমন্বয়বাদী ব্রাহ্মে রূপান্তরিত হয়েছিলেন।

গিরিশচন্দ্র যখন জন্ম গ্রহণ করেছিলেন (১৮৩৫) তখন বঙ্গদেশে ইংরেজ শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, ইংরেজী ভাষার প্রচলন শুরু হয়েছে এবং তাঁর পরিবারেও তা গ্রহণের দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু তখন বাংলার সমাজ জীবনে আরবি-ফার্সির ব্যবহার একেবারে উঠে যায়নি। গিরিশ চন্দ্রের এক পূর্ব পুরুষ ছিলেন মুর্শিদাবাদের নওয়াবদের প্রভাবশালী দেওয়ান। গিরিশচন্দ্রের পরিবারের সঙ্গে তাই মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতির ভালোমতো পরিচয় ছিল। এ কারণেই গিরিশচন্দ্র রীতিমত ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ বলে ভাষা শিক্ষা আরম্ভ করেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেনঃ

আমার মনে হইতেছে বিধাতার বিধানের চক্রে এই ঘটনা ঘটিয়াছে। আমি ইংরেজি শিক্ষায় নিরন্তর রত থাকিলে সময়ে একটা বড় কেরানি হইয়া বড়লোক হইয়া বসিতাম, আমাকে আর পরিণত বয়সে লক্ষ্ণৌ নগরে যাইয়া কষ্ট করিয়া আরব্য ভাষার চর্চা করিতে হইত না। কোরআন ও হাদিস ইত্যাদির অনুবাদ আমার দ্বারা হইয়া উঠিত না।

গিরিশ চন্দ্র যে কোরআন শরীফের তরজমা করেছিলেন ও ইসলাম ধর্ম বিষয়ে অন্যান্য গ্রন্থ লিখেছিলেন, তার মূল প্রেরণাদাতা ছিলেন কেশব চন্দ্র সেন। তিনি মনে করতেন উপনিষদ, বাইবেল ও কোরআনের মূল কথা হচ্ছে একেশ্বরবাদ। ঈশ্বর নিরাকার, এক ও অভিন্ন। তিনি আরবি-ফার্সি ভাষা ভালোভাবে জেনে ইসলামের মূলতত্ত্ব বাংলায় অনুবাদ ও প্রকাশের দায়িত্ব দেন গিরিশ চন্দ্রের ওপর। তখন তাঁর বয়স বিয়াল্লিশ। গিরিশ চন্দ্র তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন;

যে ভারবহন যোগ্য সবল অশ্বপৃষ্ঠ, ঈশ্বর সেই ভার দুর্বল গর্দভপৃষ্ঠে স্থাপন করিয়াছেন।
এক বিনয়ী জ্ঞানতাপসের হৃদয়রক্ত মোক্ষণ করা অনিবার্য আত্মস্বীকৃতিই বটে।

আরবি ও ফার্সি ভাষা ভালোভাবে আয়ত্ত করার জন্য গিরিশচন্দ্র লক্ষ্ণৌ জান এবং সেখানে পণ্ডিত মৌলভী এহসান আলীর কাছে আরবী ব্যাকরণ ও ফার্সী দিউয়ানে হাফিজের চর্চা করেন। এরপর কলকাতায় এসে আরও কয়েকজন মাওলানার কাছে এই দুই ভাষার চর্চা করেন। পরে ঢাকায় এসে মৌলভী আলিমুদ্দীনের কাছে আরবী ভাষা ও সাহিত্যের পাঠ নেন। এভাবে তিনি কোরআন শরীফ তরজমা করার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু মুসলমান বিক্রেতা তাঁর কাছে এই পবিত্র গ্রন্থ বিক্রি করবে না বলে তিনি তা বন্ধু জালালুদ্দীনের সাহায্যে জোগার করেন। একই ভাবে তিনি বিদ্যালয়ের দফতরী মারফত হাদীস গ্রন্থ সংগ্রহ করেন।

গিরিশচন্দ্রের এই অসাধারণ সাধনার সঙ্গে তুলনা চলে একালের মুসলিম পণ্ডিত মোহাম্মদ আসাদ ও ইসলাম বিষয়ক লেখক মরিস বুকাইলির। মোহাম্মদ আসাদ কোরআন শরীফের তফসীর লিখে এবং মুরিস বুকাইলী Bible, Quran and Science নামক বই লিখে মশহুর হয়েছেন। কিন্তু এই কাজের জন্য পূর্ব প্রস্তুতি স্বরূপ আরবী ভাষা আয়ত্ত করার জন্য দীর্ঘ দিন তাঁরা আরবে গিয়ে বসবাস করেছেন। এমনকি বেদুইনদের সঙ্গে চলাফেরা করে আরবী ভাষার ডায়ালেক্ট বুঝার চেষ্টা করেছেন। সেইকালে গিরিশ চন্দ্র শত প্রতিকূলতার মুখে যে সাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন তা ভাবলে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।

গিরিশচন্দ্র ব্রাহ্ম হওয়ার জন্য রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তাঁকে এক ঘরে করেছিল। তাঁর আত্মীয়স্বজন তাকে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিল।

যাই হোক গিরিশচন্দ্র সেন জীবনের একটা সময় ময়মনসিংহ শহরে কাটিয়েছিলেন। কোরআন শরীফ তরজমা করার সময় তিনি এখানেই ছিলেন। কোরআন শরীফের প্রথম খণ্ডের তরজমা মুদ্রিত হয় শেরপুরের চারুযন্ত্রে।

গিরিশচন্দ্র শুধু কোরআন শরীফের তরজমা করেন নি। তিন পর্বে হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সম্পূর্ণ জীবন চরিত তিনি রচনা করেছেন। ৯৬ জন ওলী-আওলিয়ার জীবনী নিয়ে তিনি লিখেছেন তাপসমালা।

এটি সুবিখ্যাত তাজকিরাতুল আওলীয়া গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ। এই অনুবাদের ভুমিকায় ইসলাম দরদী এই মহাপ্রাণ মানুষটি লিখেছেনঃ মুসলমান জাতি সম্পর্কে বদ্ধমূল কুসংস্কার লোকের অন্তর হইতে দূর করিবে- এই উদ্দেশ্যে আমি তাহা ভাষান্তরিত করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি।

গিরিশচন্দ্র মিশকাত শরীফের অনুবাদ করেছেন, রুমীর মসনবী শরীফ অবলম্বনে লিখেছেন তত্ত্বরত্নমালা, গুলিস্তা ও বুস্তা অবলম্বনে হিতোপদেশমালা। ইমাম হাসান ও হোসেনের অনুবাদভিত্তিক জীবনী, কয়েকজন ধর্মনেতার নামে খলিফাদের জীবনী এবং সাধ্বী মুসলমান নারীদের জীবনবৃত্তান্তও রচনা করেছেন। এমনকি উর্দু ভাষায় তিনি ইসলাম সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়েছেন। দুঃখের বিষয় গিরিশ চন্দ্রের রচনাবলীর অধিকাংশ আজ দুষ্প্রাপ্য। বাংলা একাডেমীর মতো প্রতিষ্ঠনের উচিত তাঁর রচনাবলী প্রকাশ করে একটা জাতীয় কর্তব্য পূরণ করা।

গিরিশচন্দ্র মৃত্যুর আগে প্রস্তুত করা উইলে নিজের বই-পুস্তক সম্পর্কে যা লিখেছেন তাতেও ফুটে উঠেছে এক সংবেদনশীল মানবিক মনের চিত্রঃ পুস্তক বিক্রয়ে এক্ষণেও লাভ হইতেছে না, যে টাকা পাওয়া যায়, নূতন মুদ্রাষ্কনে তাহা ব্যয়িত হয়।… সময়ে পুস্তকে লাভ হইতে পারে। লাভ হইলে তাহার এক চতুর্থাংশ প্রচার ভাণ্ডারে প্রদত্ত হইবে, অবশিষ্টাশে দুঃখী জন্মভূমির অভাবমোচনে ব্যয়িত হইতে থাকিবে।

গিরিশচন্দ্র কখনো সক্রিয় রাজনীতি করেননি। তবে মানুষ হিসেবে তাঁরও রাজনৈতিক বিশ্বাস কিছুটা ছিল সেটা আমরা দেখতে পাই ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ প্রতিষ্ঠার পর তাঁর বিশিষ্ট প্রতিক্রিয়ার মধ্যে।

একজন সৎ ধার্মিক, নীতিবান প্রতিবেশী হিসেবে তিনি পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বিষয়ে আন্তরিক ছিলেন এবং তাদের অধিকারের ব্যাপারেও ছিলেন সহানুভূতিশীল। বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের কল্যাণ হবে জেনেও তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁকে সমর্থন করেন এবং এটাই তাঁর কাছে সেদিন ন্যায়সঙ্গত মনে হয়েছিল। সেকালে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কাছে মুসলমানরা সামাজিকভাবে নানা রকম লাঞ্ছনার শিকার হতো। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য যুক্ত হয়ে এ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছিল। পূর্ববঙ্গের একজন ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ হিসেবে গিরিশচন্দ্র এটা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন।

ফলে বঙ্গভঙ্গের মধ্যে তিনি পূর্ববঙ্গের মানুষের এক ধরনের মুক্তি আশা করেছিলেন। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় জানাচ্ছেনঃ

পূর্ববঙ্গের কল্যাণ হইবে, যে দেশ নানা বিষয়ে পশ্চাৎগামী ও অনুন্নত, এক্ষণ অগ্রসর হইবে।… আমার জন্মস্থান ঢাকা জিলায়। সে স্থানে আমার বাসগৃহ আমি ঢাকা নিবাসী। ঢাকা রাজধানী হইল, ঢাকা অঞ্চলের অনেক বিষয়ে উন্নতি হইতে চলিল, ইহাতে আমার দুঃখ না হইয়া আনন্দ হওয়াই স্বাভাবিক।

তিনি মনে করতেন পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রতি বর্ণহিন্দুদের ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করা উচিত। তিনি লিখেছেন উড়িষ্যাবাসীকে ‘উড়িয়া’ ও বিহারীদের ‘মাড়ুয়া’ বলার মতো পূর্ব বঙ্গবাসীকে যদি ‘বাঙাল’ বলে অবজ্ঞা ও বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং ছত্রিশ ধরনের জাতিভেদকে দূর করা না যায়, তাহলে জাতীয় ঐক্য কোনোদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না।

কলকাতা থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে অধ্যাপক রঞ্জন গুপ্তর লেখা গবেষণাধর্মী বই ভাই দিরিশচন্দ্র সেন। রঞ্জন গুপ্ত পূর্ব বাংলার মানুষ। জন্ম নরসিংদীর বাবুরহাট গ্রামে। বিভাগ-উত্তরকালে তখনকার সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কারণে তিনি ওপারে পাড়ি জমান। বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে তিনি স্বদেশের মাটির প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়া অনুভর করেন।

গিরিশ চন্দ্রের রাজনৈতিক চিন্তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, পূর্ব বঙ্গ ও আসাম প্রদেশ টিকে থাকলে এবং উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন না করলে ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি কখনই খারাপ হত না। আর সে অবস্থায় ভারত বিভাগ, একই সঙ্গে বাংলা বিভাগ কোনটাই হত না। তাঁর এ মন্তব্যের সঙ্গে অনেকে একমত নাও হতে পারেন, কিন্তু এটা সত্য, বর্ণহিন্দুদের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে সেদিন বাঙালিদের জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বলা হলেও এটা ছিলো পুরোপুরি হিন্দু সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে এটা কোন সেক্যুলার আন্দোলন ছিল না। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তাদের শ্রেণী সার্থে এই আন্দোলনের সূচনা করেছিল এবং কৌশলগত কারণে এটিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের শাড়ি পড়ানো হয়েছিল। এর ভেতর দিয়েই সেদিন হিন্দু-মুসলমান বাংলা ভাষীদের মধ্যে তৈরী হয়েছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজন। হিন্দু উচ্চ বর্ণে জন্মগ্রহণ করেও গিরিশচন্দ্র সেদিন সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে, ঔপনিবেশিক যুগের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঝড়ঝঞ্ঝার বিপরীতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। আজ তাই স্বাভাবিকভাবে বলা যেতে পারে, ভারত ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত পূর্ববঙ্গে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় গিরিশচন্দ্রের বিলম্বিত স্বপ্ন পূরণ মাত্র। কিন্তু গিরিশ চন্দ্র যে সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, অন্য সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকে জানা এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মধ্যদিয়ে সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্ত্বের যে পরিবেশ তিনি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, তা যেনো আজও অধরা রয়ে গেছে। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই আজ ‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিশাক্ত নিঃশ্বাস।’

সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার পতন এবং হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাততত্ত্ব প্রকাশের পর খ্রিস্টীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদের এত দিন দস্তানার আড়ালে থাকা হিংস্র নখ আর গোপন থাকছেনা। সাম্রাজ্যবাদ বর্তমান বিশ্ববাসীর ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারই এক বীভৎস রূপ আমরা দেখছি ইরাক, আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিনে।

এই সাম্প্রদায়িক সংঘাতের যুগে আমাদের বুশ-ব্লেয়ার ও তাঁর ছানাপোনাদের দরকার নেই। দরকার মরহুম মৌলভী গিরিশচন্দ্র সেনের মত মানুষ, যাঁরা সভ্যতার সংঘাত নয়, আন্তসভ্যতার ভেতরে আদান-প্রদান, ভাব বিনিময়ের ওপরে জোর দিয়েছিলেন। কেবল এই পথেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব এবং আমাদের আরাধ্য এক বিশ্বমানবতা ও বিশ্ব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাও হয়ত সম্ভব।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
Syed-Ali-Ashraf

সৈয়দ আলী আশরাফের কাজ

ফাহমিদ-উর-রহমান | ডিসেম্বর ৩১, ২০১৪
Download PDF

সৈয়দ আলী আশরাফের সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে তিনি ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে প্রত্যাখ্যান করে বিকল্প একটি সংস্কৃতির রেখাচিত্র নির্মাণ করার স্বপ্ন তার ছিল। এটি ছিল তাঁর দিক দিয়ে এক হিসাবে সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। রাজনৈতিক বিদ্রোহের কথা তিনি ভাবেননি। কারণ তিনি জানতেন সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে যদি মানুষের অন্তর্জগতে পরিবর্তন আনা যায়, তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন অবধারিতভাবে আসবে। সবার অলক্ষ্যে তাই তিনি মুসলিম দুনিয়ায় প্রচলিত সাম্রাজ্যবাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে অগ্রসর হয়েছিলেন। এটা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার যদি পরিবর্তন সম্ভব না হয়, তবে মুসলিম দুনিয়ার আরদ্ধ সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা আসবে না। আর সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জিত না হলে যেটুকু রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়া গেছে তাও বিপন্ন হবে।

এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে আলী আশরাফ সাহেব শুধু প্রচলিত কলোনির শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন চাচ্ছেন না, তিনি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তনের কথা ভাবছেন যা হবে ইসলামের জীবনাদর্শনভিত্তিক। মুসলিম দুনিয়ায় কি ধরনের শিক্ষা সংস্কার প্রয়োজন তার প্রতিবেদন ও ভূমিকা রচনা করতে গিয়ে আলী আশরাফ একেবারে প্রথম কর্তব্য হিসেবে যার উল্লেখ করেছিলেন তা অন্য কিছু নয়, সেটি হচ্ছে একটি বিশ্বাস ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা [Faith based education]। আবার শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তনের কথা বলেই তিনি ক্ষান্ত হননি, এই ব্যবস্থাকে অবলম্বন করে তিনি নতুন মানুষ তৈরি করার কথাও ভাবছেন। এইভাবে সাংস্কৃতিকভাবে নবচেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠা মানুষ সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়াবে। আলী আশরাফ সাহেব সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার এই ক্ষেত্রটিকে প্রশস্ত ও উর্বর করতে চেয়েছিলেন শিক্ষার সংস্কার ও মুসলিম মানস তৈরি করার ভেতর দিয়ে।

শিক্ষার ভিতর দিয়ে মুসলিম মানস তৈরী করার প্রয়োজনীয়তা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন তার কাছে? কারণ কলোনির শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার ভেতর দিয়ে যে সংস্কৃতি দেশবাসীর জীবনে প্রতিষ্ঠি করতে চায় তা হল পরাধীনতার সংস্কৃতি । এই পরাধীনতার সংস্কৃতি একালের মুসলমানের মনোজগৎকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আলী আশরাফ সাহেব চেয়েছিলেন আজকের মুসলমানের মনোজাগতিক উপনিবেশকে শিক্ষার ভেতর দিয়ে নির্মূল করতে।

কলোনির শিক্ষা মানে হচ্ছে সেক্যুলার শিক্ষা। পশ্চিমারা এটিকে বড় আদরের নাম দিয়েছে আধুনিক শিক্ষা। এ শিক্ষা কি অর্থে আধুনিক এবং আমাদের সমাজের জন্য কতখানি উপকারী তা কখনও আমরা অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখিনি। আলী আশরাফ সাহেবই আমাদের মধ্যে প্রথম এ রকম শিক্ষার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং এই নীতি শিক্ষা দেয়া যে ছাত্রদের জন্য ক্ষতিকর, সেই অর্থে জাতির জন্যও যে শুভ নয় সে কথাটি তিনি সরাসরি বলেছেন। এ রকম শিক্ষার ক্ষতিকর প্রভাবটি নষ্ট করার জন্য পাঠ্যসূচীতে ইসলামের নীতি ও দর্শনের পাঠ নেয়া জরুরী বলে সাব্যস্ত করেছেন। আর এভাবেই তিনি সাম্রাজ্যবাদের সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং নিজের অবস্থানকে সুস্পষ্ট করে দিলেন।

সেক্যুলার শিক্ষার মূল প্রতিপাদ্য কী? ওহী বা প্রত্যাদেশভিত্তিক যে জ্ঞান, যার উপরে সব ধর্মের বুনিয়াদ দাঁড়িয়ে আছে তার নিয়ন্ত্রণ থেকে মানুষের চেতনার মুক্তি এবং এই শক্তিকেই বলা হয় ধর্মনিরপেক্ষকরণ বা সেক্যুলারাইজেশন। এ কালের পণ্ডিতরা বলে থাকেন সমাজের, রাষ্ট্রের এবং ব্যক্তিমনের এই সেকুলারাইজেশন হচ্ছে মানব ইতিহাসে আধুনিকতার সবচেয়ে বড় অবদান। আবার এইখানে এসে আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতাও মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পশ্চিমের পণ্ডিতদের মতে ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া আধুনিকতা হয় না। অন্যদিকে আধুনিকতা সেক্যুলারাইজেশনের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়। ধর্মের যে আধ্যাত্মিক ভিত্তি আধুনিকতা তা স্বীকার করে না। মানুষের সাথে তার সৃষ্টি-কর্তার যে সম্পর্ক, যার ভেতর দিয়ে ধর্মের স্বরূপ উন্মোচিত হয় তা আধুনিকতার কাছে একান্তই গুরুত্বহীন। কোন মূল্যবোধই আধুনিকতার কাছে চূড়ান্ত নয়, সবই আপেক্ষিক। ধর্ম বলছে মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ। আধুনিকতা বলছে মানুষ এসেছে এক জৈব বিবর্তনের পথ ধরে। ধর্ম বলছে সুদ নির্মূলের কথা। আজকের আধুনিকতা দাঁড়িয়ে আছে সুদী অর্থনীতির উপর। ধর্ম মানুষকে খলিফাতুল্লাহর [Vicegerent of God] মর্যাদা দিয়েছে। আধুনিকতা বলছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মনির্ভরতার কথা। এই জীবন দৃষ্টির পার্থক্যের জন্যই আধুনিকতাকে ধর্ম পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি। বিশেষ করে ইসলামের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতাকে হজম করা আদৌ সম্ভব হয়নি। সৈয়দ আলী আশরাফ সাহেব লিখেছেন:

“It is impossible to compromise between Islam and Secularism. Where Secularization means a modern scientific approach to knowledge and way of life no adjustment is acceptable. What the Qur’an says in a similar context is true. Muslims can not be modern in the above sense. They can not be a compromise between kufr and iman, faithlessness and faith, secularism and Islam.” [New Horizons in Muslim Education]

আমাদের এখানে কেউ কেউ দাবী করেন ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ঠিক ধর্মহীনতা নয়। এ কথাটা স্রেফ অজ্ঞতার নামান্তর। ধর্মনিরপেক্ষতার যে মৌলিক দর্শন, যার উদ্ভব মধ্যযুগে ইউরোপে চার্চ ও রাষ্ট্রে পৃথকীকরণের ভেতর দিয়ে, তা কিন্তু ধর্ম বস্তুটাকে বরাবর পাশ কাটিয়ে যেতে আগ্রহী। এই জাতের ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের প্রতিদিনের জীবনধারাকে অর্থ, কাম ও উচ্চাশার গহ্বরে ঠেলে দেয়। এগুলো আমাদের জীবনে প্রয়োজন আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু ধর্মের প্রতি উদাসীনতার এই সেক্যুলারিজম আমাদের সুকুমারবৃত্তি ও প্রবণতাগুলোকে ভোগবাদের দিকে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি, যে সমাজ, যে রাষ্ট্র এই সেক্যুলারিজমকে সারকথা বলে গ্রহণ করতে চায়, তা কিন্তু অনায়াসে হয়ে উঠতে পারে দুর্নীতির প্রতারণাজাত কার্যসিদ্ধির ও সমবেত চরিত্র হননের মাধ্যম। ধর্ম না থাকলে নীতির খুঁটি মজবুত হয় না। পশ্চিমের ইঙ্গিতে আমাদের কালের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে সেক্যুলারিজম চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কিন্তু তার পরিণতি যে আমাদের কারও কাছেই আদর্শস্থানীয় হয়ে উঠতে পারেনি তা তো চোখের সামনেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে আধুনিকতার শক্তির পেছনে যে প্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে তাকেই একালে আমরা ভেবে নিয়েছি সর্বশক্তিমান হিসেবে। ফলশ্রুতিতে আল্লাহর সর্বশক্তিমানত্ব নিয়ে আমাদের সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। এই বিশ্বাস মানুষের মধ্যে তৈরি করছে এক ধরনের ঔদ্ধত্য। অন্যদিকে ধর্ম বলছে, মানুষ প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ করে বটে, কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তার আল্লাহ প্রদত্ত। এই অনুভূতি মানুষকে নম্র ও বিনয়ী করে তোলে।

আজকের সেকুল্যার শিক্ষা তাই কতটা ঔদ্ধত্য ও দুর্বিনীত করে তোলার শিক্ষারও বটে। আধুনিকতার এই রূপের দিকে ইঙ্গিত করেই বোধ হয় ইয়েটস লিখেছিলেন : Things fall apart; the centre can not hold. আমাদের দেশে কলোনির সময় চালু হয়েছিল সেক্যুলার শিক্ষা। সেই শিক্ষার সুবাদে আমাদের এখানে অনেকেই সমাজের নানা স্তরে নানানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, কিন্তু পশ্চিমের নীতি ও দর্শনের কবলে পড়ে তাদের মাথা একরকম ধোলাই হয়ে গেছে। তারা এখন নিজেদের ধর্ম, রাষ্ট্র ও সমাজকেও ঐ পশ্চিমের চোখ দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এই রকমভাবে দেখার ফলে সমাজের প্রকৃত ছবিটা তাদের চোখে ধরা পড়ে না। সমাজের মূল স্রোত থেকে দূরে তারা একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে অবস্থান করেন এবং এখান থেকেই তারা পুরো সমাজটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। আর তখনই সমাজে শুরু হয় নানা রকমের বিশৃঙ্খলা।

অন্যদিকে আছে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তার অনুসারীরা। এই দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা দু’টি জীবন দর্শনের প্রতীক। দু’টি ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে এ দু’টি ব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশ। তাই স্বভাবতই দু’টি ভিন্ন দর্শনাশ্রিত মানুষের লক্ষ্যও অভিন্ন হতে পারে না। মুসলিম দুনিয়ায় এ দু’টি পরস্পর বিরোধী মতানুসারীরা আজ রীতিমত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। আলী আশরাফ সাহেবের ভাষায়:

The two systems are creating conflicting groups who have already started fighting among themselves. [New Horizons in Muslim Education]

একালের সেকুলারিষ্ট ও ইসলামপন্থীদের এই দ্বন্দ্ব কোন কোন ক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। এ অনেকটা সাম্প্রদায়িক সমস্যার মতো। ইউরোপে ক্যাথলিক প্রোটেষ্ট্যান্টদের লড়াই কিংবা উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের চেয়ে এ তীব্রতা আজকাল কোন অংশেই কম নয়। এই বিভেদ-বিভাজনের নীতি পুরো মুসলিম উম্মাহকে খণ্ডিত ও দুর্বল করে ফেলেছে। সাম্রাজ্যবাদের বড় সাফল্য হচ্ছে মুসলিম সমাজের এই আদর্শিক বিভাজন। যার প্রেক্ষাপটে আজ মুসলিম দেশগুলোর উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরকম একটা সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য মুসলিম সমাজের আদর্শিক ঐক্য ও সংহতি দরকার। সেই ঐক্য ও সংহতি আসতে পারে এসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে। কলোনির চাপিয়ে দেয়া শিক্ষা ব্যবস্থা নয়, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বর্তমান চাহিদা ও আবেগকে নির্ভর করে এমন একটা ব্যবস্থার বিকাশ হওয়া দরকার যাতে যুগের প্রয়োজন যেমন মিটবে, তেমনি জনগণের আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রবৃদ্ধির দিকটাও যথার্থ অর্থে প্রতিফলিত হবে। এ কারণেই আলী আশরাফ সাহেব শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যেয়ে প্রযুক্তির মানবিকীকরণের কথা বলেছেন। শুধুমাত্র প্রযুক্তিক জ্ঞান মানুষকে দুর্বিনীত করে তোলার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে মানবীয় কল্যাণের পথে পরিচালিত হওয়া চাই।

আলী আশরাফ সাহেব লিখেছেন:
It is an attitude which must be changed from being one which is totally technological; to one which restrains science and technology and redirects it is an instrument for moral benefit. The humanization of technology is possible only if man accepts the principle that he must worship his Creator and not his own achievements, that he must live in harmony with nature and learn to control his passions and live without conflict or war or being swayed by policies of self-aggrandizement and love of power. [New Horizons in Muslim Education]

এমনি প্রেক্ষাপটে ‘জ্ঞানের ইসলামীকরণের’ কথাটা এসেছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ইসলামীকরণের এই আন্দোলনে সৈয়দ আলী আশরাফ একালে অন্যতম পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে গেছেন। মুসলিম দেশগুলোতে সেক্যুলার শিক্ষা কাজ করছে না, আর এ শিক্ষার ফলে মুসলিম উম্মাহ পরস্পর বিরোধী দলে ও মতে বিভক্ত হয়ে হানাহানিতে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এমন একটি শিক্ষা চাই যা শিক্ষার্থীর জীবনে, মননে, কর্মে ও সিদ্ধান্ত প্রণয়নে ইসলামের মূল্যবোধকেই চূড়ান্ত বলে প্রতিষ্ঠিত করবে। যেহেতু সেক্যুলার শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ নয়। আমাদের আংশিক প্রয়োজনই মাত্র পূরণ করে, আমাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রগতির সম্ভাবনা যেহেতু এর মাধ্যমে অসম্ভব এবং সবচেয়ে বড় কথা এই শিক্ষার মাধ্যমে আমরা পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক গোলামীকে একরকম কবুল করে নিচ্ছি; তাই মুসলিম দুনিয়ার জন্য এ কোন রকমই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই গোলামী থেকে মুক্তির স্পৃহার সঙ্গে যুক্ত আলী আশরাফের জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। জ্ঞানের ইসলামীকরণ। যার লক্ষ্য তার ভাষায় :

The aim of education, according to the Ummah in general, is to produce a good Muslim who is both cultured and expert-cultured in the sense that knows how to use knowledge for his spiritual, intellectual and material progress, and expert in the sense that he is a useful member of the community[New Horizons in Muslim Education].

সৈয়দ আলী আশরাফের এই চেষ্টা নামকাওয়াস্তা ছিল না, ছিল অনেকখানি সংহত ও ফলপ্রসূ। শিক্ষার জন্য শুধু ক্যাম্পাস, দালানকোঠা কিংবা সুযোগ সুবিধার কথা না বলে তিনি কার্যকর অর্থেই ইসলামী কারিকুলাম তৈরি, টেক্সটবুক প্রণয়ন এবং ইসলামী নীতির আলোকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর উপর কাজ করেছিলেন। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি ভালো করে বুঝতে পেরেছিলেন এই সমস্ত প্রাথমিক ও মৌলিক কাজগুলো সুসম্পন্ন না করা গেলে ইসলামী শিক্ষার ধারণা কার্যকরী করা কঠিন হবে। ইসলামী শিক্ষা তারাই দিতে পারবেন যাদের অন্তর ও মন একই সাথে ইসলামী নীতির আলোয় উজ্জীবিত, অন্যদিকে জ্ঞানের বিশেষ শাখায় যাদের থাকবে যথেষ্ট দখল ও কর্তৃত্ব। শুধুমাত্র কোরআন ও হাদীস জ্ঞানার্জনের উপর জোর দিয়েছে এই কারণে সব জ্ঞানই ইসলামী হয়ে উঠবে এমন ভাবা যেমন অমূলক- তেমনি কোন প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারোপযোগিতা বাড়ালেই সেটি ইসলামী রং ধারণ করবে সেটিও তেমনি ভুল। আলী আশরাফ সাহেব বলেছেন আজকের মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের নানা রকম জ্ঞানের বিশ্লেষণ ও সমন্বয় করতে হবে শুধুমাত্র তা গ্রহণ বা অন্ধ অনুকরণ করে নয় বরং তার যথাযথ সমালোচনাও দরকার গ্রহণ-বর্জনের একটি সুনির্দিষ্ট ইসলামী নীতিমালার ভিতর। যখন এই বিষয়টি মাথায় রেখে কোন বিষয় নিয়ে টেক্সট রচনা করা যাবে তখনই তা কেবলমাত্র ইসলামী হয়ে উঠতে পারে। এই প্রক্রিয়া ছাড়া মুসলিম বিশ্বের শিক্ষায়তনগুলোর নাম সর্বস্ব ইসলামী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে। এর বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্তর্শক্তি ব্যতীত ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এখান থেকে সত্যিকারের মুসলিম বেরিয়ে আসবে না।

ইরানী বুদ্দিজীবী সৈয়দ হোসাইন নসর সৈয়দ আলী আশরাফের এইসব কাজকে বলেছেন Intellectual Jihad- বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। প্রকৃত অর্থেই একালের মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের এই জিহাদ ছাড়া গত্যন্তর নেই এবং এটি ছাড়া মুসলিম বিশ্বের ভাগ্যও ফেরানো সম্ভব নয়। আলী আশরাফ সাহেব নিজের জীবনে কাজে কর্মে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের জন্য এই নমুনা সৃষ্টি করে গেছেন। তার শিক্ষা দর্শন ভিত্তিক ব্যবস্থাপনাগুলো মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের জন্য এখনো উজ্জ্বল পথের ইশারা দিয়ে চলেছে।

আলী আশরাফ সাহেব মুসলিমবুদ্ধিজীবীদের মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন এই বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে আধুনিক পশ্চিমী জ্ঞানের মূলে যে দার্শনিক চিন্তাধারা রয়েছে তার প্রাচীর ভাঙ্গা যাবে না। আাজকের পৃথিবীর সংগে খাপ খাওয়ানোর বিদ্যার কথা তিনি বলেননি। তিনি বলেছেন, ইসলামের বিশ্ব দৃষ্টি ও এর শিক্ষা দর্শনের ভিত্তিতে একটি নুতন পৃথিবী নির্মাণের, যেখানে বস্তুগত অগ্রগতি, নতুন ধরনের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আহরণ ও যুক্তিবাদী ব্যবস্থার পাশাপাশি আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানের প্রতি বাধ্যবাধকতাও থাকবে। এক্ষেত্রে তিনি ইমাম গাজ্জালীর পথ অনুসরণ করার পক্ষপাতী ও মানুষের কল্যাণের জন্য জ্ঞানের উৎস বিশ্বাসের পুন:প্রতিষ্ঠা জরুরী বলে মনে করেছেন।

নবজাগরণের এই বিবেকী পথিকৃৎ ও বিদ্রোহী তাই রাষ্ট্রের কথা ভাবেননি, সাম্রাজ্যবাদের তোয়াক্কা করেননি। তিনি ভেবেছেন তার উম্মাহর মুক্তির কথা, স্বপ্নের কথা। সেই অর্থে তিনি একজন বিশ্ব নাগরিকতাবাদীও বটে। ইসলামের বিশ্বদৃষ্টি তাকে হাত ধরে নিয়ে গেছে ক্ষুদ্রতর গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকতার বৃত্তে। এইভাবেই তিনি বিশ্বের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তুলবার চেষ্টা করেছেন এবং সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে চেয়েছেন যা মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, আর এক গোলামীর শিকলে বেঁধে ফেলে। সৈয়দ আলী আশরাফ এখানেই একটি পথের নির্দেশ রেখে গেছেন একালের মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের জন্য।

সূত্রঃ সাহিত্য ত্রৈমাসিক প্রেক্ষণ অক্টবর-ডিসেম্বর ২০০৬ (সৈয়দ আলী আশরাফ স্মরণ)

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
william dulrimple

উইলিয়াম ডালরিম্পলের বই, ১৮৫৭’র লড়াই এবং সমকালীন সাম্রাজ্যবাদ (পর্ব-২)

ফাহমিদ-উর-রহমান | ডিসেম্বর ২, ২০১৪
Download PDF


১৮৫৭’র বিপ্লবের একাধিক কারণ আলোচিত হয়েছে এবং ঐতিহাসিকরা তাদের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি মিলিয়ে সেসবের বিচার করার চেষ্টা করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত এটি যে বিদেশী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আজাদীর লড়াই ছিল সে সম্বন্ধে দেশপ্রেমিক মানুষের মনে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। বৃটিশরা শুধু নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদীই ছিল না, ওরা একই সাথে ছিল ক্রুসেডার ও সাম্প্রদায়িক। স্পেনে মুসলিম শাসন অবসানের পর রাণী ইসাবেলা কলম্বাসের নেতৃত্বে যে সমুদ্রাভিযান শুরু করেছিলেন তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল লুণ্ঠনের পাশাপাশি খৃস্ট ধর্মের বিজয় ডঙ্কা এগিয়ে নেয়া। এরপর ইউরোপ থেকে এশিয়া-আফিকার দিকে দলে দলে অভিযানকারীরা ছুটে এসেছে সমরূপ চিন্তা-ভাবনা নিয়েই। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সাথে খৃষ্ট ধর্মের সম্পর্ক গভীর এবং ইতিহাসে পরসস্পরের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। জেমো কেনিয়াত্তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি আমরা মনে করতে পারিঃ When the Europeans came to Africa, Europeans had the Bible in their hands and the Africans lands in their hands. Europeans asked Africans to close their eyes and pray; when they opened their eyes the Africans had the Bible in their hands and the lands in the hands of the Europeans.

এ দেশে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী বণিকরা যখন আসে তখন তার সঙ্গী হয়ে আসে খৃস্টান মিশনারীরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর এজেন্ডা ছিল ভারতবর্ষ লুণ্ঠনের পাশাপাশি খৃস্ট ধর্ম প্রচার করা। এসব মিশনারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন ইংরেজ রাজ কর্মচারীরা। অনেক রাজকর্মচারী মনে করতেন ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই হচ্ছে খৃস্ট ধর্মকে ভারতবর্ষে শক্তিশালী ও পরমন্ত করে তোলা। লর্ড সলিসবেরি বলেছিলেন, ভারতীয়দের সবাইকে খৃস্ট ধর্মে দীক্ষিত করা হয়নি বলেই সিপাহী বিদ্রোহের মত ঘটনা ঘটে। সেক্যুলার ইউরোপের অদ্ভুত চেহারায় নয় কি? মিশনারীরা হচ্ছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের অগ্রবাহিনী। প্রথমে তারা কোথাও এসে হাজীর হয়, শান্তির কথা বলে, পরে সেখানে একটা মজবুত ভিত্তি ও ভাবমূর্তি প্রস্তুত হলে সাম্রাজ্যবাদ সশরীরে আবির্ভূত হয়। ভারতবর্ষে সাতশ’ বছর মুসলমানরা শাসন করেছিল কিন্তু জোর করে ধর্মান্তরের কোন ঘটনা ঘটেনি। এ রকম হলে ভারতবর্ষের জনসংখ্যার প্রধান অংশ হিন্দু থাকতে পারতো না। ঔপনিবেশিক শাসনে হিন্দু ও মুসলমান যুগপৎভাবে স্বধর্ম হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। আমাদের মুন্সী মেহেরুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে এই সাম্রাজ্যবাদী মিশনারীদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন সে কথা আমরা জানি। ইতিহাসের গতিতেই মুন্সী মেহেরুল্লাহর মত মানুষেরা সেদিন দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন।

১৮৫৭’র বিপ্লবের পিছনে তাই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারণ যেমন আছে তেমনি আছে ধর্মীয় কারণ। সেদিন এই অভ্যুত্থান না হলে ভারতবর্ষের ভাগ্য হয়তো অন্য রকম লেখা হতো- এটি একটি স্পেন বা ফিলিপাইনের মতো খৃষ্টান দেশে পরিণত হতো।

বৃটিশরা শুধু জোর করে ধর্ম প্রচার করার চেষ্টাই করেননি, তারা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে এ দেশের সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে চুরে ফেরতে উদ্যত হয়, তেমনি নিষ্ঠুরভাবে খাজনা আদায় করে জনগণকে পথে বসায়। এই খাজনা আদয়ের প্রকৃতি এতই নিষ্ঠুর ছিল যে, তার ফলশ্রুতিতে ’৭৬’র মন্বন্তরের মত দুর্বিষহ ঘটনা ঘটে। একদিকে জোর করে খাজনা আদায়, অন্যদিকে দেশীয় শিল্প, বাণিজ্য ধ্বংস করে ভারতবর্ষকে বৃটিশের বাজারে পরিণত করে সাধারণ মানুষের দুর্দশাকে সীমাহীন করে তোলা হয়। এইভাবে খাজনা আদায় থেকে শুরু করে যত প্রকার অত্যাচার-অবিচার সম্ভব ইংরেজা দেশের মানুষের উপর নির্বিবাদে চালিয়ে যায়। ফলে ইংরেজের উপর তাদের ক্ষোভ ধূমায়িত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে দেশীয় রাজা ও নওয়াবরাও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নানা অজুহাতে তাদের রাজ্যগুলো গ্রাস করার কূটচালে অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। এমনি করে ১৮৫৭’র পরিস্থিতি যখন উপস্থিত হয় তখন রাজা-প্রজা নির্বিশেষে সকলে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে এবং গোলামীর বন্ধন কাটবার জন্য সবাই একত্র হয়।


বাংলা ভাষীদের মধ্যে ১৮৫৭’র বিপ্লবী ঘটনা নিয়ে ভুলে বুঝাবুঝির একটা কারণ অবশ্যই ইংরেজদের অপ্রচার। কিন্তু তার চেয়ে ভয়াবহ কারণ হচ্ছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে এদেশে একটি দাসসুলভ, সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণী সৃষ্টি করতে সমর্থ হয় ইংরেজরা। এদের ১৮৫৭’র স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি কোন সহানুভূতি ছিল না। বৃটিশ শাসনের সুবাদে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী সেদিন কলকাতাকে কেন্দ্র করে বাংলার সামাজিক-সাংষ্কৃতিক নেতৃত্ব দেয়ায় তারা নির্বিচারে ১৮৫৭’র মত বিপ্লবী ঘটনাকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী একদিকে যেমন ছিল বৃটিশ অনুগত, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক ও মুসলমানবিদ্বেষী। এরা পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্ভাবনা আঁচ করতে পারলেও ভারতবর্ষের মুক্তির জন্য ধর্ম নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যের কথা ভাবতে পারেননি এবং সত্যিকার অর্থে দেশের জনজীবন থেকে তারা ছিলেন বিচ্ছিন্ন। বৃটিশের কলোনি বিস্তারে এরা ছিলেন বিশ্বস্ত সহায়ক শক্তি। এরাই ইংরেজের ভারত জয়কে ভগবানের মঙ্গলময় বিধান এবং ইংরেজ শাসনকে ঈশ্বরের শাসন হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিলেন। ১৮৫৭’র অভ্যুত্থানের সময় কলকাতাকেন্দ্রিক ইংরেজী শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী ও জমিদার শ্রেণীর ভূমিকাকে দাসত্ববৃত্তির নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবেই উল্লেখ করা যায়। এদের ভূমিকার সাথে মীর জাফরের ভূমিকার কোন তফাৎ নেই।

ইংরেজের উপর ভরসা করেই এই মধ্যবিত্ত কলকাতায় বাংলার রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছিল। ইংরেজরও সহযোগিতা দিয়েছিল যাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আনুগত্য ধরে রাখা যায়। যুদ্ধের সময় হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সহযোগিতার পুরস্কারস্বরূপ বৃটিশরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল।

নামে বাংলার রেনেসাঁস হলেও এটা ছিল মূলত হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের উৎকৃষ্ট নমুনা। এই পুনরুজ্জীবনবাদের পথ ধরেই তথাকথিত বাংলার রেনেসাঁর পুরোধারা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটান কালে যা সর্বভারতীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, ঈশ্বর গুপ্ত, নবীন সেনদের জাতীয়তাবাদ সেকুলার ছিল না। সঙ্গত কারণেই তাদের কর্মযজ্ঞ অসাম্প্রদায়িক ও বৃটিশবিরোধী হতে পারেনি। এই হিন্দু রেনেসাঁর শ্রেষ্ঠতম রত্ন রবীন্দ্রনাথও বৃটিশ শাসককে শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের শাসনের বাইরে অন্য কিছু ভাবতে পারেননি। কলোনি বিস্তারের এমন বিচিত্র ব্যাখ্যায় কৌতুক বোধ করা ছাড়া আমাদের উপায় নেই। বৃটিশের সহযোগিতায় কলকাতায় সাম্প্রদায়িকতার যে বিষফল রোপিত হয়েছিল তাই কালে কালে মহীরুহে পরিণত হয় এবং ভারতবর্ষ জুড়ে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। মনে রাখা দরকার মিঃ জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের জাতীয়তাবাদের বিকাশ একদিনে ঘটেনি। আনন্দ মঠের অভীষ্ঠ জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয় মুসলিম জাতীয়তাবাদ সে কথা যেন আমরা ভুলে না যাই। আজকাল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের নামে নানা রকম সমন্বয় পন্থার কথা শোনা যায় কিন্তু আনন্দ মঠের জাতীয়তাবাদে এর আদৌ কোন স্থান ছিল কি? এই রকম সাম্প্রদায়িকতার তোড়ে একদিন ভারতবর্ষই দু’টুকরো হয়ে যায়। হয়তো বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের অভীষ্ঠও ছিল তাই।

১৮৫৭ সালে বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র, নবীন সেন, ঈশ্চরন্দ্র বিদ্যাসাগর ও তাদের সমগোত্রীয়রা এ লড়াইকে সমর্থন করেননি। কারণ তারা মনে করেছিলেন এতে আবার মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। মহাবিদ্রোহের সমর্থনে ও মুসলিমবিরোধিতায় এ শ্রেণীর লেখালেখি, বক্তৃতা-বিবৃতি রীতিমত লজ্জাজনক। সাম্প্রদায়িকতা যে চিন্তাশীল মানুষদেরও কতখানি কলুষিত করে দেয় এ তার বড় প্রমাণ। মুসলিমবিদ্বেষ, বৃটিশের দালালি ও সাম্প্রদায়িকতা যেন এক সাথে গলাগলি করছে!

একটা উদাহরণ নেয়া যাকঃ
একেবারে মারা যায় যত চাঁপ দেড়ে (দাড়িওয়ালা)।
হাঁসফাঁস করে যত প্যাঁজখোর নেড়ে।।
বিশেষতঃ পাকা দাড়ি পেট মোটা ভুঁড়ে।।
রৌদ্র গিয়া পেটে ঢোকে নেড়া মাথা ফুঁড়ে।
কাজি কোল্লা মিয়া মোল্লা দাঁড়িপাল্লা ধরি।।
কাছা খোল্লা তোবাতাল্লা বলে আল্লাহ মরি। (ঈশ্বর গুপ্ত)

এই সাম্প্রদায়িকতার পরিণাম যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে মোটেই প্রীতিকর হয়নি তাতো ইতিহাস অনুরাগী পাঠকবৃন্দের জানা। ভারতবর্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বড় অবদান যে এই সাম্প্রদায়িকতা তা বলাই বাহুল্য।


১৮৫৭’য় দিল্লী, লাখনৌ, মিরাট, বুন্দেলখণ্ডে যা ঘটেছে আজ তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বাগদাদ, বসরা, কাবুল, কান্দাহারে। সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। সেদিন বৃটিশরা ভারতবর্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল লুণ্ঠন করতে, খৃষ্ট ধর্ম প্রচার করতে আর স্বাধীনতা কেড়ে নিতে। একালে তাদের জায়গায় আমেরিকা বসেছে। এরা ইরাকে, আফগানিস্তানে, হানা দিয়েছে একইভাবে লুণ্ঠন করতে, স্বাধীনতা কেড়ে নিতে আর খৃস্ট ধর্মের জয়ডঙ্কা বাজাতে। প্রেসিডেন্ট বুশ বরেছেন, তিনি যীশুর প্রেরণায় ক্রুসেডে নেমেছেন। তবে হানাদাররা সারা দুনিয়াকে যতই বোকা বানাবার চেষ্টা করুক না কেন, ঔপনিবেশিক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক যুদ্ধ বলেই ধরা পড়বে।

লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, সেকালের মত একালেও সাম্রাজ্যবাদের দাস আর গোলামের কোন অভাব হয়নি। সেকালের মত একালেও সুশীল সমাজ আছে যারা মোটেই তখনকার তুলনায় সাম্রাজ্যবাদের কম গুনগান করছে না। চিরকালই পশ্চিমা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী উদার নীতির মুখোশ পরে সাম্রাজ্যবাদের দালালি ও মোসাহেবী করে। ১৮৫৭’র বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে যারা সেদিন দাঁড়িয়েছিল, তাদের বক্তব্য বিবৃতির সাথে আজকের দিনের সাম্রাজ্যবাদী সমর্থকদের মতামতের কি আশ্চর্য মিল এবং যুগপৎভাবে তা অশ্লীল ও হাস্যকর।
১৮৫৭ আমাদের জন্য একটা পথের দিশা রেখে গিয়েছিল। সেটি পুরোপুরি সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী। কোন সন্দেহ নেই আজও মানব জাতির প্রধান সংকট সাম্রাজ্যবাদ এবং তার থেকে মুক্তির জন্য ১৮৫৭’র শিক্ষা সমান গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৫৭’র বিপ্লব পরাস্ত হয়েছিল, তার অনেক কারণ ছিল, দুর্বল নেতৃত্ব, দুর্বল সাংগঠনিক ভিত্তি, অসমন্বিত পরিকল্পনা, প্রাযুক্তিক অনগ্রসরতা প্রত্যেকটি ১৮৫৭’র বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। তারপরও বলতে হবে ১৮৫৭’র চেতনা সাম্রাজ্যবাদ উৎখাতের সংগ্রামে অনন্ত প্রেরণা হয়ে আছে।

১৮৫৭’র সার্ধ শতবার্ষিকীতে ডালরিম্পলের বই পড়বার পর মনে হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের ঔচিত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি উনিশ শতকের গোলাম বুদ্ধিজীবীদের ভাষণকে পরিহার করে শোভন, সজ্জন ও শরীফ ভদ্রলোকদের মেজাজ ও যুক্তিকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাতে কি সাম্রাজ্যবাদের ঔচিত্য ভাঙ্গবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে? এর একটাই উত্তর, না।

সূত্রঃ বদ্বীপ প্রকাশন প্রকাশিত “মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
william dulrimple

উইলিয়াম ডালরিম্পলের বই, ১৮৫৭’র লড়াই এবং সমকালীন সাম্রাজ্যবাদ (পর্ব-১)

ফাহমিদ-উর-রহমান | ডিসেম্বর ২, ২০১৪
Download PDF

১৮৫৭’র বিপ্লব, অভ্যুত্থান ও জিহাদ সম্বন্ধে আজতক অজস্র রচনা প্রকাশিত হয়েছে। এর অধিকাংশের লেখক আবার বিদেশীয়। এবার এর সার্ধ শতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতবর্ষের সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিচিত্র ও নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল তার পুনরালোচনা ও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। লব্ধপ্রতিষ্ঠ স্কটিশ লেখক উলিয়াম ডালরিম্পল ১৮৫৭’র রক্তরাঙ্গা ইতিহাসকে সামনে রেখে একটি মূল্যবান বই লিখেছেন যার নাম The Last Mughal: The fall of a dynasty, Delhi, 1857.

ডালরিম্পল ইতিমধ্যে মোঘলদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে লেখালেখি করে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। অনেকেই বলে থাকেন, এই স্কটিশ লেখক মোঘল সংস্কৃতির একজন নিবিড় রসপিপাসু ও অনুগ্রাহীও বটে।

ভারতবর্ষে মোঘলরা এক গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছিল। নাগরিক মনন আর রুচি বলতে এখন যা আমরা বুঝি ভারতবর্ষে তা এই সভ্যতারই কতকটা দান সেটা নিঃসন্দেহে বলা চলে। গোলাপ, গজল, কাসিদা আর দৃষ্টিনন্দন চিত্রকলা ও স্থাপত্যশৈলী যেমন মোঘলদের একান্ত নিজস্ব, তেমনি রসনালোলুপ সুস্বাদু মোঘলাই খাবার ও পশমি জরিদার পোশাক-পরিচ্ছদও মোঘলরা ভারতবর্ষে আমদানি করেছিল। কিন্তু এসব কিছু ছাড়িয়ে মোঘল শাসনের যে বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে উল্লেখ করবার মতো তা হচ্ছে এটা ছিল পুরোপুরি উদার, অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী মনমানসিকতাসম্পন্ন। এই হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতির অলিগলি দিয়ে ডালরিম্পল হাঁটাহাঁটি করেছেন বিস্তর। এই হাঁটাহাঁটির খবর আমরা পাই তার কৃত আর দু’টি জনপ্রিয় বই City of Djinns ও White Mughals-এ। এ বই দু’টিও তার খ্যাতির বিপুল বিস্তার ঘটিয়েছে।

 

 

ডালরিম্পলকৃত The Last Mughal ১৮৫৭’র বিপ্লবের কোন পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নয়। কেবল বিপ্লব চলাকালীন বাহাদুর শাহ জাফরকে ঘিরে দিল্লীতে যে খুনরাঙ্গা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যে অভাবনীয় মহাবিপর্যয় দিল্লীর মানুষকে পেঁচিয়ে ধরেছিল তার এক অশ্রুসিক্ত, অথচ সুখদ বর্ণনা। লেখকের বর্ণনার মধ্যে এক ধরনের আপাতনিরপেক্ষতা আছে যার কারণে পাঠক সহজে পীড়িত হয় না, বিশেষ করে মোঘলদের দিল্লীর সংস্কৃতির সাথে লেখকের নিবিড় সম্পর্ক এবং সেই সময়ের দিল্লীকে নিয়ে তার মৌলিক পড়াশোনা, গবেষণা ও কাজকর্ম বইটির মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে সন্দেহ নেই। তবে এ বইটির লেখনশৈলী হচ্ছে উল্লেখ করার মতো জিনিস। রাজরাজাদের কাহিনী কিংবা যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস যেভাবে লেখা হয় সেই প্রচলিত ধারা থেকে ডালরিম্পল সরে এসেছেন। বইটি পড়তে গেলে পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন ইতিহাসের চরিত্রগুলো কিভাবে লেখকের লেখার কারুকার্যে জীবন ফিরে পেয়েছে এবং পাঠক সেই সব ঐতিহাসিক চরিত্রের ভিতরে হারিয়ে গেছেন, তাদের দুঃখ-বেদনা, হাসি-কান্না, আশা-আকাক্ষা আর দুঃসহ স্মৃতিকাতরতার সাথে শরীক হয়েছেন। মাঝে মাঝে ধাঁধায় পড়তে হয় ইতিহাস না ফিকশন পড়ছি! এ বই যে কোন হৃদয়বান পাঠককে শুধু আকর্ষণই করবে না, বাহাদুর শাহ জাফরের ট্রাজিক পরিণতি তার চোখে আঁসুর দরিয়াও বইয়ে দেবে, বিশেষ করে বৃটিশরা দিল্লী পুনরুদ্ধারের পর যে অমানুষিক ও বীভৎস অত্যাচার করেছিল যা সাদা চামড়ার ঐতিহাসিকরা প্রায়শই এড়িয়ে গেছেন কিংবা এই ঘটনাকে বিপ্লবী সিপাহীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ হিসেবে পুরো ঘটনাটির সরলীকরণ করতে চেয়েছেন ডালরিম্পল সেই পর্দা সরানোর কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিপ্লবী সিপাহীদের পরাজয়ের পর বৃটিশরা দিল্লীতে শুধু গণহত্যার উৎসবে মেতে ওঠেনি, মোঘল সংস্কৃতির শেষ চিহ্নকে উপড়ে ফেলার কাজেও তাদের ক্লান্তিহীন উদ্যম রীতিমত পীড়াদায়ক। মোঘল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শনগুলো পরিকল্পিতভাবে তারা কামানের গোলা আর বিস্ফোরক দ্রব্য দিয়ে ধ্বংস করে দেয়্। বৃটিশরা শুধু গণহত্যা করেনি, তারা একটা সংস্কৃতিকেও হত্যা করার চেষ্টা করে।

১৮৫৭-৫৮ সালে দিল্লীতে বৃটিশরা যা করেছিল তা আমাদের স্পেনের Reconquista’র ধ্বংসযজ্ঞ ও হাল জামানর বসনিয়ার Ethinic cleansing-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। স্পেনে মৌলবাদী খৃস্টানরা মুসলমানদের বিতাড়িত করবার পর সেখানকার বিখ্যাত মস্ক অপ কর্ডোভার স্থাপত্য শৈলীকে বিকৃত করে দিয়ে এটিকে চার্চে পরিণত করে যা দেখে পরবর্তীকালে রিলকে অক্ষেপ করেছিলেন এবং বর্বর খৃস্টানদের নিন্দা জানিয়েছিলেন। দিল্লির এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখবার জন্য বেঁচেছিলেন ১৮ শতকের শোঘল সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠতম রত্ন মীর্জা গালিব। দিল্লীর রক্তস্নানের ভিতর দিয়ে বেঁচে যোওয়া কবি নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘রক্তসমুদ্রে ভাসমান এক সাঁতারু।’ অন্যত্র এক বন্ধুর কাছে পাঠানো তাঁর অন্তর মথিত বেদনাশ্রু এভাবে প্রকাশ পেয়েছে:

Every armed British soldier
Can do whatever he wants.
Just going from home to market
Makes one’s heart turn to water.
The chowk is a slaughter ground
And homes are prisons.
Every grain of dust in Delhi
Thirsts for Muslim’s blood.
Even if we are together
We could only weep our lives.


১৮৫৭’র সার্ধ শতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত ডালরিম্পলের বইটি ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে যা যে কোন লেখকের জন্য বিরাট প্রাপ্তি। অমর্ত্য সেন, কুলদীপ নায়ার, জিয়াউদ্দীন সর্দারে মত পণ্ডিতেরা বইটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। গৌরবোজ্জ্বল মোঘল সংস্কৃতি অবসান হবার ট্রাজিক ঘটনাই বোধ হয় পাঠককে টেনেছে বেশি এবং ডালরিম্পল এক অদ্ভুত স্মৃতি কাতরতার মধ্যে পাঠকের অনুভূতিকে নাড়া দিয়েছেন।

কিন্তু ১৮৫৭ সালে এই যে এত বড় ঘটনা ঘটলো তার পটভূমির বিস্তার ও বৃটিশ অত্যাচারের স্বরূপ সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে অবহিত থাকবার পরও ডালরিম্পল কি পুরোপুরি গতানুগতিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন? পাঠককে স্মৃতিকাতরতার মধ্যে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে এক ধরনের ঔপন্যাসিক সফলতা থাকতে পারে কিন্তু ঐতিহাসিক হিসেবে অভ্যুত্থানের গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ে তিনি সনাতনী ধারার বাইরে আসতে পারেননি বলেই মনে হয়্। সাদা চামড়ার ঐতিহাসিকরা বা এখনকার নিওকন ঐতিহাসিকরা যে ধারার অনুবর্তী, তার সঙ্গে ডালরিম্পলের মৌলিক পার্থক্য বড় একটা নেই, অথচ তার নিজের লেখার মধ্যেই বহু তথ্য আছে যার থেকে ভিন্ন কোন সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারত। বইটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিবিড় পাঠে যে ধারণা গড়ে ওঠে তা হলো বাহাদুর শাহ জাফর কিংবা তাঁর বিপ্লবী সিপাহীদের কর্মকাণ্ডকে তিনি উপনিবেশকারীর বিরুদ্ধে উপনিবেশিতের লড়াই কিংবা সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের আজাদী সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করেননি। বিপ্লবী সিপাহীদের কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও সুখপাঠ্য সামরিক বর্ণনা তিনি দিয়েছেন কিন্তু তাদেরকে স্বাধীনতার সৈনিক ভাবতে ডালরিম্পলের মন আটকেছে। বইটির বহু স্থানেই তিনি সিপাহীদের mutineers বলে উল্লেখ করেছেন যা পীড়াদায়ক। যারা বিদ্রোহে যোগ দেয়নি তাদেরকে ‘loyal’ বলাটাও দৃষ্টিকটু। উপরন্তু ডালরিম্পল ভারতবর্ষব্যাপী ১৮৫৭’র পুরো ঘটনাকে দেখতে চেয়েছেন দু’টি সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব হিসেবে, যাতে কিনা এর বিপ্লবী তাৎপর্যকে অনেকটা খাটো করা হয়েছে। সেদিনকার ভারতবর্ষের ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম শক্তির সাথে আগন্তুক জবরদখলকারী খৃস্টান শক্তির একটা প্রচ্ছন্ন দ্বন্দ্ব অবশ্যই কাজ করেছিল সত্য কিন্তু সেটিই এ ঘটনার পুরো চিত্র মাত্র নয়। শেষ পর্যন্ত এটি ছিল জবর দখলকারীর বিরুদ্ধে দেশের মানুষের আজাদীর লড়াই।

১৯৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে মরহুম মওলানা আবুল কালাম আজাদ লিখেছিলেন, ১৮৫৭’র লড়াই সম্বন্ধে বেশির ভাগ বইয়ের মধ্যে পাওয়া যায় সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর এ উক্তি মিথ্যা নয় এবং আজতক এ অবস্থার কোন মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি বলেই মনে হয়। উপমহাদেশের ঐতিহাসিকদের একটা বিরাট অংশের মনে সাম্রাজ্যবাদের সেই দেখবার ধরনটি অনেক ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। নানা রকম তত্ত্বজাল বিস্তার করে সাম্রাজ্যবাদ ও তার গোলাম ঐতিহাসিকরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন উপনিবেশবাদ ছিল উপনিবেশিত জনণের জন্য কল্যাণকর। এর পক্ষে তারা ভূরি ভূরি নজিরও তুলে ধরার কোশেশ করেছেন। সেসব যুক্তিকে কি কুযুক্তি বলা যায়? যেমন সাম্রাজ্যবাদ ভারতীয়দের কাছে পশ্চিমা সভ্যতার আশীর্বাদ বহন করে এনেছিল অথবা ভারতবর্ষের বদ্ধ ও কুপমণ্ডুক সমাজে সংস্কারের নবতরঙ্গ বইয়ে দিয়েছিল কিংবা আজকে যেমন বলা হচ্ছে সভ্যতার দ্বন্দ্ব। সাম্রাজ্যবাদীরা উপনিবেশগুলোতে তাদের অপকর্মকে বৈধতা দেয়ার জন্য এসব তত্ত্ব হাজির করেছিল। বৃটিশ রাজকবি রাডইয়ার্ড কিপলিং সাম্রাজ্যবাদীদের সেসব কাজকর্মকে নতুন মাত্রা দিয়ে বলেছিলেন White Men’s Burden ভাবটা এমন – সাম্রাজ্যবাদীরা না এলে উপনিবেশের মানুষগুলোর মুক্তি ঘটতো না, সভ্যতার আলো থেকে তারা চিরবঞ্চিত হয়ে রইতো। বড় রকম করুণা দেখিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা উপনিবেশগুলোতে সভ্য করবার মিশন নিয়ে এসেছে। ১৮৫৭’র মহাবিদ্রোহের কারণ সম্বন্ধে এ বইয়ে ডালরিম্পলের গভীর কোন বিশ্লেষণ নেই। সাবেকি রচনার মতো চর্বি মেশানো টোটার ফলে উদ্ভূত সিপাহী অসন্তোষের তিনি কিছুটা হালকা বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু লেখকের হয়তো বিশ্বাস এই আলোড়নের মধ্যে সিপাহীদের বি্দ্রোহী আচরণ ছাড়া অন্য কিছুর বিশেষ তাৎপর্য নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধর্মনির্বিশেষে দলে দলে এই সব বিপ্লবী সেনা বাহাদুর শাহ জাফরকে সম্রাট কবুল করে দিল্লীর দিকে বৃটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার জন্য ছুটে গিয়েছিল। এ কি কোন তাৎপর্যহীন ঘটনা ছিল কিংবা বিশেষ কোন পটভূমি ব্যতীত এত বড় অভ্যুত্থান ঘটে গেলো তা ভাবা বেশ কঠিন বৈকি!
ভারতে ‘পশ্চিমা সভ্যতার আশীর্বাদের’ তুলনায় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের জুলুম, লুণ্ঠন, উৎপীড়ন যে অনেক বেশি ছিল তা দেশপ্রেমিক ঐতিহাসিকরা ইতিমধ্যে সপ্রমাণ করেছেন, অথচ বিদ্রোহের কারণ বিশ্লেষণে গ্রন্থকার এর উপর কিছুমাত্র জোর দেননি। বিদেশী আধিপত্যের বিরুদ্ধে এ ধরনের সংগ্রাম যে অবধারিত ছিল তা নিয়ে সংশয় নেই। শুধু অবস্থা বৈগুণ্যে সিপাহীরা নেতৃত্ব নিয়ে এগিয়ে এসেছিল, পরে সর্বস্তরের জনগণ্য এই অভ্যুস্থানে অংশ নেয়। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করবার মতো ১৮৫৭-তে দিল্লীর যুদ্ধচলাকালে ডালরিম্পল অহেতুক ‘ওহাবী’ ও ‘জেহাদী’ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেছেন। বৃটিশরা ওহাবী শব্দটা ব্যবহার করতো গাল হিসেবে, যেমন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজকাল জিহাদ শব্দটা একই অর্থে ব্যবহার করে। ওহাবীরা ছিল পিউরিটান ইসলামী ভাবধারায় বিশ্বাসী, একই সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। বৃটিশবিরোধিতার অপরাধেই সাম্রাজ্যবাদের মিডিয়া তাদের চরিত্র হননে লিপ্ত হয় এবং তাদের পিউরিটান আদর্শের জন্য ফ্যানাটিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়্ আজকালকার সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়া যেমন করে ইরাকে বা আফগানিস্তানের স্বাধীনতাকামীদের ‘মৌলবাদী’ হিসেবে গাল পাড়ছে।

প্রকৃত সত্য হলো বাহাদুর শাহ জাফরের আনুগত্য কবুলকারী ফৌজদের অধিকাংশই ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু। তাদের কথা মতো ‘দেশ ও ধর্ম’ রক্ষার জন্য তারা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল। ওহাবীরা এদের সাথে গলাগলি করে আজাদীর যুদ্ধে শরীক হয়েছিল মাত্র। ধর্মাশ্রিত আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার নমুনা পৃথিবীতে একেবারে বিরল নয়। হিন্দু ধর্মের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়ে আমাদের সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম প্রমুখেরা বৃটিশবিরোধিতায় নেমে পড়েছিলেন। বৃটিশরা এদেরকে টেররিষ্ট বলতো। আমাদের কোন প্রগতিশীল লেখক, বুদ্ধিজীবীরা এজন্য তাদেরকে ‘সাম্প্রদায়িক’, ‘ধর্মান্ধ’, ‘মৌলবাদী’ বলেছেন শুনিনি। তাহলে ওহাবী, ফরায়েজীরা সাম্প্রদায়িক, মধ্যযুগীয় হন কোন যুক্তিতে? ১৮৫৭’র অভ্যুত্থানের একটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল ‘হিন্দু মুসলমান’ ঐক্য এবং এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। দলে দলে হিন্দু ফৌজরা এসে মুসলমান বাহাদুর শাহর আনুগত্য কবুল করেছে এই কারণে যে, তারা অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছিল, বৃটিশের চেয়ে মোঘল শাসন ছিল উদার, অসাম্প্রদায়িক, প্রজাবৎসল ও মানবতাবাদী চরিত্রসম্পন্ন। এই কারণেই তারা মোঘল শাসনের পুনরুদ্ধারের জন্য জানবাজী রেখে লড়াই করেছিল।

মওলানা আজাদ লিখেছেন, মোঘল আমলে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা দেখা যায়নি এবং সাম্প্রদায়িকতা ব্যাপারটিও মোঘল সংস্কৃতির কাছে পরিত্যাজ্য ব্যাপার ছিল। কেবল বৃটিশরা এসেই তাদের সাম্রাজ্যিক স্বার্থে ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতাকে বাড়-বাড়ন্ত করে তোলে।

বইটি পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হয় ১৮৫৭ সম্বন্ধে সবচেয়ে বড় কথা এই যে, শাসকদের বোকামী ও ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং শাসিতদের মনে সন্দেহ ও ভুল বোঝার একটা গুরুতর সংযোগ ঘটেছিল। এই কারণে বিপ্লবের আগুন দ্রুত বিস্তারের সুযোগ পেয়েছিল। ডালরিম্পলের এই বিবেচনা অসম্পূর্ণ মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। ঘটনার বর্ণনায় ডালরিম্পল যে মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন ঘটনার মূল্যায়নে তার সীমাবদ্ধটাও একেবারে ফেলনা নয়।


সেই যুগে পৃথিবীর অন্যত্র যেভাবে সাম্রাজ্য বিস্তার চলেছিল ভারতে ইংরেজ রাজত্ব যে সেই উপনিবেশ গঠনের রকমফের তা বলাই বাহুল্য। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে উপনিবেশকারীরা ঠাণ্ডা মাথায়, হিসেব কষে তাদের যাবতীয় কুকর্মকে নৈতিক ভিত্তি দেয়ার জন্য নতুন নতুন তত্ত্ব হাজীর করে এবং একটা ইতিহাসের কারখানা গড়ে তোলে। এই কারখানায় বসে তারা উপনিবেশের মানুষের ইতিহাসকে ইচ্ছামত বিকৃত, বিচ্যুত ও বিধ্বস্ত করে। তারা এসেছিল নতুন রকমের দাসপ্রথা চালু করতে, অথচ এসবের নাম দিয়েছিল স্বাধীনতা। একালে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হানা দেয়ার সময় বলেছিল Operation Iraq Fredom। এসব কান ফাটানো ঘৃণা উদ্রেককারী আজব চিজের তাহলে অর্থ কি? অর্থ একটাই, উপনিবেশকারী হানাদাররা সব সময়ই নিজেদের জনগণের মুক্তিদাতা বলে পরিচয় দেয়।

বৃটিশরা আমাদের তিতুমীরকে বলতো ‘বোকা ও ধর্মোন্মাদ’। ফকির সন্ন্যাসীদের সেকালের বৃটিশ সিভিল সার্ভেন্টরা সরকারি গেজেটিয়ারে Raiders-ডাকাত বলে রিপোর্ট করেছেন। দেশের জন্য যারা লড়াই করছে, জানবাজী রাখছে তারা বোকা, ডাকাত হতে যাবে কেন? উপনিবেশ পন্থার নৈতিক প্রতারণাই এ রকম। অন্যথায় তাদের অবৈধ কর্মযজ্ঞের বৈধতা মিলবে কোথায়?

সিপাহী বিদ্রোহ কথাটা ইংরেজরাই তাদের কারখানায় উদ্ভাবন করেছিল। ১৮৫৭ সালের ঘটনাকে বৃটিশ শাসক, ঐতিহাসিক ও বৃটিশের অনুগত দেশীয় ঐতিহাসিকরা সিপাহী বিদ্রোহ, ভারতীয় বিদ্রোহ, দ্যা ইন্ডিয়ান মিউটিনি বলে প্রচার করে। এতে মনে হতে পারে দেশের মানুষ নয়, এটা ছিল গুটি কয়েক পাগলা সিপাহীর উল্টা পাল্টা কাণ্ডকারখানা, কোনো দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে বিক্ষুব্ধ হয়ে তারা বিদ্রোহ করেছিল। তার সঙ্গে জনগণের স্বাধীনতার লড়াইয়ের কোন সম্পর্ক ছিল না।

১৮৫৭ সালের ঘটনার বহুদিন পরও বৃটিশরা পত্র-পত্রিকায় পাঠ্যপুস্তকে এভাবে প্রচার প্রপাগান্ডা চলায়। শুধু তাই নয়, কলোনির শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত দেশীয় বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত এ ঘটনাকে স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে মেনে নেননি। এদের মধ্যে এম. এন. রায়, রজনী পামে দত্ত, যদুনাথ সরকার, আর. সি. মজুমদার, অন্নদাশঙ্কর রায়ের মত বুদ্ধিজীবীরাও আছেন। এরা কলোনাইজারদের মত এ ঘটনাকে নিছক সামন্তশ্রেণীর নেতৃত্বে ফিউডাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে চালিয়েছেন এবং ধ্বংসোন্মুখ অভিজাতদের মৃত্যু যন্ত্রণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এদের মতে সিপাহীদের লক্ষ্য নাকি ছিল প্রতিবিপ্লব, তারা ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। এটা পরিষ্কার এ রকম তত্ত্বীয় কুয়াশা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হলো এই বিপ্লবের বিরাটত্ব ও মাহাত্ম্যকে খাটো করা। এসব দেশী সাহেব সেদিন কলোনির শিক্ষায় এতখানি প্রাণিত হয়েছিলেন, বৃটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইকেও তারা ফিউডাল প্রতিক্রিয়ার ঊর্ধ্বে চিন্তা করতে পারেননি। কারণ একটাই তাদের মন-মানসও ঐ শিক্ষায় উপনিবেশিত হয়ে পড়েছিল। এইসব উপনিবেশিত বুদ্ধিজীবী যেটা বুঝতে পারেননি সেটা হলো বিদেশী শৃঙ্খল থেকে মুক্তি এবং যে শাসনকে বহু লোক জুলুম মনে করে তার উচ্ছেদ চেয়েছিল- ১৮৫৭’র এই বিপ্লবী লক্ষকে সেদিনের প্রেক্ষাপটে কোনভাবেই ফিউডাল প্রতিক্রিয়া বলা যায় না। ইংরেজ শাসনের মৌল বৈশিষ্ট্যই ছিল শোষন ও লুণ্ঠন, তবে তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের লড়াইকে প্রগতিবিরোধী বলি কোন যুক্তিতে?
তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এত বড় বিপ্লবী অভ্যুত্থান আর কখনো দেখা যায়নি, যা সাম্রাজ্যবাদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। এটা ছিল ভারতীয় জাতীয় স্বাধীনতার লড়াই, বিদেশী শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তির চেষ্টা। এই যুদ্ধে সাধারণ মানুষের ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ, যুদ্ধের প্রতি সাধারণ মানুষের বিপুল সহানুভূতি, হিন্দু-মুসলমান ঐক্য এই লক্ষণগুলো কিন্তু পুরোপুরি জাতীয় ভাবাপন্ন। এখানে স্বতঃস্ফূর্ত এক জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটেছে। শুধু সামন্ত রাজা ও নওয়াবরা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে বলে এটা ফিউডাল ও প্রতিক্রিয়াশীল সেটা ভাবা অযৌক্তিক, তাহলে তো একই যুক্তিতে দখলদার ইংরেজকে হটিয়ে দেশোদ্ধারের চেষ্টায় যেভাবে জোয়ান অব আর্ক ফরাসী অভিজাত ও জনগণকে একত্রিত করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তাকেও আমরা প্রতিক্রিয়াশীল ও জাতীয় ভাবাপন্ন না বলে প্রত্যয়ন করতে পারি। কিন্তু সেই আন্দোলনকে তো কখনো জাতীয় আখ্যা থেকে বঞ্চিত করা হয়নি।

১৮৫৭’র লড়াই যখন চলছে তখন কার্ল মার্কস এ ঘটনাটিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তার কাছে মনে হয়েছিল এ লড়াই মূলত আন্তর্জাতিক উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াইয়ের অংশ। ভারতবর্ষে উপনিবেশ লুণ্ঠনই ছিল সাম্রাজ্যবাদের প্রধান দায়িত্ব। সুতরাং ভারতীয় জনগণের মুক্তির একমাত্র উপায় ছিল বৃটিশ উপনিবেশকে ধ্বংস করে ভারতীয়দের স্বাধীন-সার্বভৌম জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা। মার্কসের এই বিশ্লেষণকে সেদিনের প্রেক্ষিতে যথেষ্ট প্রগতিশীল মনে করা সঙ্গত। কেননা তিনি এই যুদ্ধের স্বরূপ চিনতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, মার্কস সেই সব দেশীয় রাজার নিন্দা করেছেন যারা ইংরেজকে সহযোগিতা করেছিল। তিনি তাদেরকে ইংরেজদের পোষা কুকুর হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। তবে মার্কস শেষ পর্যন্ত বৃটিশদের আগ্রাসনকে পুঁজিবাদের আগ্রাসন হিসেবেই দেখেছেন এবং তিনি তার বিশ্ব দৃষ্টিকে তার তত্ত্বের বাইরে নিতে চাননি। ঔপনিবেশিক যুদ্ধগুলোর পিছনে পুঁজিবাদের একটা বড় ভূমিকা আছে সন্দেহ নেই কিন্তু এটা যে একই সাথে একটা বর্ণবাদী, সাংস্কৃতিক ও সাম্প্রদায়িক লড়াইও তা মার্কস গণনার মধ্যে নেননি বা নিলেও তা তার তত্ত্বের আলোয় বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন মাত্র।

 

 

সূত্রঃ বদ্বীপ প্রকাশন প্রকাশিত “মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
M. N. Roy

ইসলামের বন্ধুঃ এম. এন. রায় প্রসঙ্গে

ফাহমিদ-উর-রহমান | নভেম্বর ১৫, ২০১৪
Download PDF

মনস্বী, বিপ্লবী ও ভাবুক এম এন রায়ের ইসলাম ভাবনা তার রোমাঞ্চকর জীবনের মতই এক চমকপ্রদ ঘটনা। আজীবন ভ্রাম্যমাণ এই বিপ্লবী মানবমুক্তির সাধনায় দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন এবং একই লক্ষ্যে নানা বিপরীত ধর্মী চিন্তা নিয়ে বিভিন্ন সময় তাকে কাজ করতে দেখা গেছে। জীবনের একটি মূহূর্তে এসে তিনি ইসলামকে নিয়েও কিছুটা চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন বলে মনে হয়। সম্ভবতঃ এটি ছিল তার মানবমুক্তির সূত্রগুলো নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার একটি অংশ। মুক্তি সাধনায় এই ভ্রাম্যমাণতার জন্য তার জীবনীকার তাকে বলেছেন Restless Brahmin.

 বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা লেলিন, ট্রটস্কি ও স্ট্যালিনের সহকর্মী এই রায়ের পৈত্রিক নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, যিনি বঙ্গভঙ্গের সময় খুব তরুণ বয়সে বাঘা যতিনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদী বৈপ্লবিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তখনকার মতো বঙ্কিমচন্দ্র ও বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ও তার সহকর্মীরা জার্মানীর সহায়তায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভারত স্বাধীন করবেন বলে পরিকল্পনা করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি অস্ত্র সংগ্রহের জন্য সাগর পেরিয়ে বাটাভিয়াতে যান। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় নরেন নিরাশ না হয়ে অস্ত্রের সন্ধানে ইন্দোনেশিয়া, জাপান, কোরিয়া, চীন, ফিলিপিন প্রভৃতি নানা দেশ ঘুরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হাজির হন। উদ্দেশ্য ছিল জার্মান সাবমেরিনে ইউরোপ পৌঁছুবেন এবং বার্লিনে গিয়ে জার্মান সরকারের সাথে অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে পাকাপাকি আলোচনা করবেন। কিন্তু মার্কিন সরকার যুদ্ধে ইংরেজের পক্ষে যোগ দেয়াতে তিনি মেক্সিকোয় পালিয়ে যান। পালিযে যাওয়ার সময় তিনি নতুন নাম নেন মানবেন্দ্রনাথ রায় এবং এই নামেই তিনি বিশ্ববিখ্যাত হন। রায় তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন এই ভাবে তার পুনর্জন্ম ঘটে এবং এই নাম তাকে ব্যর্থ অতীত থেকে রোমান্টিক ও কৃতিত্বপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেই তার সোশালিস্টদের সাথে পরিচয় ঘটে এবং সেই সূত্রে মার্কসের রচনাবলীর দ্বারা তিরি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। সোশালিস্টদের সংস্পর্শে তার ভাবজগতে এক ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তিনি বদলে যেতে থাকেন এবং অস্ত্রের চিন্তা ত্যাগ করে মার্ক্সবাদের আওতায় মানুষের মুক্তির সন্ধান করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন।

 রায় মেক্সিকোর রাজনীতিতে খুব দ্রুত মিশে যান, সেখানে আড়াই বছর ধরে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন এবং এল পার্তিদো কমুনিস্তা দ্যা মেহিকো (মেক্সিকোর কমুনিস্ট পার্টি) প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর রায় লেনিনের আমন্ত্রণে মস্কো আসেন এবং কম্যুনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে তিনি তার বিশ্লেষণী প্রতিভা ও স্বাধীন চিন্তার পরিচয় দেন। সেই সূত্রে লেনিন ও অন্যান্য মার্ক্সবাদী নেতাদের কাছে তিনি তাত্ত্বিক হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। লেনিন তখন রাশিয়ার সর্বাধিপতি ও কম্যুনিস্ট জগতে তার প্রভাব অপ্রতিহত। তার সাথে ভিন্নমত পোষণ করার কথা রাশিয়ায় তখনকার মতো কারো চিন্তায়ও আসেনি। কিন্তু মানবেন্দ্রের সাথে লেনিনের উপনিবেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধিতার কৌশল নিয়ে এই কংগ্রেসে কিছুটা মতানৈক্য হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে লেনিনের পরই রায়ের স্থান- যিনি মার্ক্সবাদের সংশোধন করার চেষ্টা করেছিলেন।

 এই সময় রায় রাশিয়ার নতুন কমিউনিস্ট বিপ্লবকে সংহত করার জন্য মধ্য এশিয়ায় কাজ করেন। পরে পার্টির সিদ্ধান্ত অনুসারে তিনি চীনে যান সেখানকার কমিউনিস্ট বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে আসার কাজে সাহায্য করতে। চীনে বিপ্লব ঘটানোর পথ ও পদ্ধতি নিয়ে রায়ের সাথে রাশিয়ার নতুন নেতা স্ট্যালিনের মতবিরোধ হয়। এই মতবিরোধের পথ ধরে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু স্ট্যালিন রায়কে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিস্কার করেন। এ ঘটনাকে রায় উগ্রবামপন্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

  এইভাবে রায়ের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারেন কমিউনিজম আদর্শ হিসেবে আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তব রূপায়ণে এটি একটি কর্তৃত্বপরায়ণ ও স্বৈরাচারী ব্যবস্থা এবং মানবিকতার ক্ষেত্রে ব্যবহারিক কমিউনিজম পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে গুণগত শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করতে পারে না। এক্ষেত্রে রায় কমিউনিজমের যে শ্রেষ্ঠতা আশা করেছিলেন অসীম বেদনার সঙ্গে তাকে নৈরাশ্য কবুল করতে হয় এবং কমিউনিজম নিয়ে তার স্বপ্নভঙ্গ সম্পন্ন হয়।

 শেষ পর্যন্ত রায় ভারতে ফিরে আসেন। তিনি জানতেন দেশে ফেরামাত্রই ব্রিটিশ তার রাজবিরোধী সংগ্রামের জন্য জেলে পাঠাবে। তিনি ঝুঁকি নেন এবং অবশেষে গ্রেফতার হন। জেলে বসে রায় তার অসাধারণ উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে চিঠিপত্র, ইস্তেহার, প্রবন্ধ এমনকি কয়েকটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। বহুভাষী এই পণ্ডিত জেলের ভিতরেই নতুন করে লেখাপড়া ও ভাবনা চিন্তা শুরু করেন এবং মার্ক্সবাদ, লেনিন, স্ট্যালিন, দর্শন, বিজ্ঞান, জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি বিষয়কে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করেন। এভাবে তিনি পূর্বেকার ভাবনা থেকে সরে আসেন। তিনি বুঝতে পারেন মার্ক্সসীয় চিন্তার মধ্যে স্ববিরোধিতা ও মৌলিক ত্রুটি রয়েছে। তিনি মানবমুক্তির নতুন উপায় খুঁজতে শুরু করেন এবং এই পর্যায়ে সত্যিকার অর্থে তার ইসলামের সাথে পরিচয় ঘটে। এই পরিচয়ের ফল হচ্ছে তার সুবিখ্যাত Historical Role of Islam বইটি। জেলে বসেই তিনি এটি রচনা করেন এবং ১৯৩৯ সালে তার জেল থেকে মুক্তি পাবার পর এটি পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। শিক্ষিত ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে রায়ের যে জনপ্রিয়তা তা মূলত এই বইটির কারণে।

 মানবেন্দ্র এই বইটিতে ইতিহসের রঙ্গমঞ্চে ইসলামের ভূমিকাকে একজন জড়বাদী, যুক্তিবাদী হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত একজন জড়বাদীই থেকে যান। ভাববাদে তার কখনোই রূপান্তর ঘটেনি। কিন্তু এই বইটিতে দেখবার বিষয় হলো জড়বাদী কমিউনিস্ট কিংবা পাশ্চাত্যের উদার নৈতিক চিন্তা-ভাবনার প্রাণিত মানুষেরা যেমন করে ধর্ম বিশেষ করে ইসলামকে সচরাচর সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা ও প্রগতিবিরুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন মানবেন্দ্র এই বই লিখতে গিয়ে সে কাজটি করেননি। এখানেই তার উদার ও মুক্ত মন-মানসিকতার পরিচয় মেলে।

 এই বইটি যখন লেখা হয় তখন ভারতের হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক সমস্যা জটিল ও কূটিল হয়ে উঠেছে। বাইরের রাজনৈতিক তাপ ও চাপ এ বইতে আদৌ কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখকের এক অসাম্প্রদায়িক চিত্ত কর্তৃত্ব করেছে। রায়ের এই বইটিতে আর একটি দেখার বিষয় হলো তিনি ইসলামের ভূমিকাকে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু আধুনিককালে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম কোন প্রগতিশীল ভূমিকা রাখতে পারে কিনা সে সম্বন্ধে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। তার মত ভাবুকের দৃষ্টিতে যে ইসলাম পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে একদিন বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছিল তা আজকের যুগে কেন সেই জীবনীশক্তি নিয়ে পুনরায় হাজির হতে পারবে না তার বিশ্লেষণ থাকলে বইটি অবশ্যই আরো মূল্যবান হতে পারতো। হয়তো তৎকালীন ইসলাম প্রধান জনগোষ্ঠীর উপনিবেশিত অবস্থা, মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তির দৈন্যদশা, মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি তার সামনে কোন প্রতিশ্রুতি সৃষ্টি করেনি। ‍ শুধুমাত্র ইতিহাসের ইসলামই তাকে আকর্ষণ করেছে। পরবর্তীকালে রেডিক্যাল হিউম্যানিজমের দিকে তার ঝুঁকে পড়াও এর একটা কারণ হতে পারে।

রায় তার এই বইয়ে কাব্যিক ভঙ্গীতে ও অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় ইসলামের বিজয় কাহিনী বিবৃত করেছেন। রায় ইসলামকে নিছক ধর্ম হিসেবে না দেখে একে একটি রাজনৈতিক ও সমাজদর্শন হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তার মত হচ্ছে দুনিয়ার এক জরাজীর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল। এই কারণেই ইসলামের নতুন বাণী সেদিন শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের সামনে প্রতিশ্রুতি সৃষ্টি করেছিল। ইসলাম ধর্মের সাম্যবাদী প্রেরণা ও মানুষের জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত মানবিক ও সমাধিকার সম্পন্ন সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় মানুষকে কাছে টেনেছিল সবচেয়ে বেশি। রায় ইতিহাস থেকে নজির তুলে এনে বলেছেন, সমকালীন সমাজের দুর্নীতি, অবিচার, স্বেচ্ছাচার, জুলুম, কুসংস্কার থেকে বাঁচবার জন্য মানুষ ইসলামকে ত্রাণকারী হিসেবে অভিনন্দন জানিয়েছিল। রায়ের নিজের কথা হচ্ছে The Revolt of Islam Saved Humanity. রায় বরং ইসলামের সেই সব নিন্দুক ও সমালোচকদের এক হাত নিয়েছেন যারা নাকি বলে বেড়িয়েছে ইসলাম তরবারীর জোরে প্রচারিত হয়েছিল। রায়ের কথা হচ্ছে ইসলাম ইতিহাসের প্রয়োজনে এসেছিল এবং মানবপ্রগতির ক্ষেত্রে এক বড় ভূমিকা রেখেছিল। এর আদর্শ একটি নতুন সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করেছিল এবং ফলস্বরূপ মানুষের ভাবজগতে এক বৈপ্লবিক রূপান্তরের সূচনা হয়েছিল। ইসলামের আগমন ছাড়া পূর্বতন সমাজগুলো ইতিহাসের সচলতা এগিয়ে নিতে পারতো না। রায় তার বইতে যে ইসলামকে আবিষ্কার করেছেন তার মধ্যে ধর্মের ডক্ট্রেনিয়ার বা থিয়লজিকাল উপাদান তেমন একটা নেই। সেখানে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাসে ইসলাম কি গৌরবউজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল তাই। সামাজিক বিবর্তনের ভিতর দিয়ে ইসলামকে ব্যাখ্যা করার মধ্যে তার উপর ইতিহসের সমাজতান্ত্রিক ব্যাখ্যারও একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

 রায় লিখেছেন, ইসলাম আসার আগে সামাজিক ন্যায়ের ধরণাটা তৎকালীন পরিবেশে একরকম অজানাই ছিল। শোষিতদের আরো শোষিত হওয়াই ছিল নিয়তি। মানুষ হিসেবে তাদের কোন মর্যাদাই ছিল না। ইসলামের নীতি সামাজিক সম্পর্কের চিরাচরিত ধারণাগুলো উল্টো-পাল্টা করে দেয়।  নতুন নীতি উৎপাদন ও ভোগের পুরনো ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সৃষ্টি করে। উৎপাদক তার উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ ভোগ করার ন্যায়সঙ্গত অধিকার পায়- যা পূর্বে  সে পেতো না। এর ফলে নতুন ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যবসা বাণিজ্যের দ্রুত স্ফীতি ঘটে। আরব ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষেত্রে প্রস্তুত হয়। রায়ের ব্যাখ্যা হচ্ছে এইভাবে একদিকে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার, সম্পদের আহরণ আর অন্যদিকে সকলের সহযোগে করা যায় এমন একটা কাজের ভেতর দিয়ে উম্মাহর ঐক্য ধরে রাখাই ছিল ইসলামের খলিফাদের একটা বড় উদ্দেশ্য। তার মতে নতুন রাষ্ট্রের দ্রুত বর্ধনশীল ব্যবসা বাণিজ্য মুসলমানদের ভেতরে একটা কসমোপলিটানিজমের মনোভাব সৃষ্টি করে। নতুন নতুন মানুষ ও তাদের আচার ও রীতি-নীতির সাথে তাদের পরিচয় হয়। এর ফলে তাদের পুরনো সংস্কার ও সীমাবদ্ধতাগুলো খসে পড়ে। তারা সহনশীলতা, সহানুভূতি, অন্যকে বুঝবার ক্ষমতা, সবকিছুর গভীরে গিয়ে তার সরোৎসার আহরণ করার দক্ষতা, বিশ্লেষণী মন প্রভৃতি অর্জন করায় তাদের ভেতরে একটা দার্শনিক প্রত্যয় সৃষ্টি হয়। এইভাবে ইসলামের ইতিহাসে দেয়া ও নেয়ার যে রেওয়াজ তৈরি হয় তাই দিয়ে মুসলিমরা যেমন নিজেদের সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় তেমনি ভিনদেশী সভ্যতাকেও অনেকখানি সমৃদ্ধ করে। তবে রায়ের এইভাবে ইসলামের মানবতাবাদী প্রত্যয়কে উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করার পদ্ধতিতে সবাই খুশী হবেন না অথবা সে ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হবেন না- এটা স্পষ্ট। কারণ ইসলামে মানবতাবাদ ও ভ্রাতৃত্বের ধারণার বিকাশ হয়েছে তৌহীদের নীতির ভিত্তিতে। মুসলিম সমাজের মানবতাবাদের ধারণাটা ঠিক ভাষার, রক্তের, বর্ণের, শ্রেণীর, অঞ্চলের বা উৎপাদন ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে নাই। এটা গঠিত হয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে।

 তবে বাণিজ্যিক প্রসারণের তত্ত্বের সাথে ইসলামের বিজয়কে মিলিয়ে দেখার পাশাপাশি রায় ইসলামের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার অন্য কারণ হিসেবে এর সহনশীলতা ও সমতাবাদী বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। আসল কথা হচ্ছে ইসলাম এই সহনশীল ও সমতাবাদী বৈশিষ্টের পূর্বশর্ত তৈরি করেছিল- যা আরব ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক প্রসারণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল, এই কথাটা রায় উল্লেখ করলে তার ইতিহাসের ব্যাখ্যা আরও সমৃদ্ধ হতো বলে মনে হয়।

 তবে রায় এই বইতে বিভিন্ন প্রসঙ্গে ইসলামের সমতাবাদী ও ভ্রাতৃত্ববাদী বৈশিষ্ট্যের কথা বার বার উচ্চারণ করেছেন। তার মতে তৎকালীন রোমান, বাইজেন্টাইন, পারসিক ও ভারতীয় সমাজের শোষণমূলক বর্ণবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে ইসলাম স্বাধীনতা ও সাম্যের কথা বলেছিল। যার কথা ঐসব এলাকার জনগণ প্রায় ভুলতে বসেছিল। প্রাচীন সভ্যতারগুলোর শাসকশ্রেণীর নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক অবক্ষযের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষ এক মুক্তির আগ্রহ নিযে অপেক্ষা করছিল। ইসলাম তাদের কাছে সেই মুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে এবং একে একে সিরিয়া, পারস্য, ইজিপ্ট, আফ্রিকা ও আন্দালুসিয়ার নির্যাতিত মানুষ ইসলামকে স্বাগত জানায়। শুধুমাত্র সামরিক শক্তির জোরে এই বিপুল এলাকার জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করা সম্ভব ছিল না।

 রায় সামাজিক শক্তি হিসেবে ইসলামের অভূতপূর্ব ভূমিকার কথা বললেও এর পিছনে যে মানুষটির অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ক্রিয়াশীল ছিল সেই ইসলামের নবীর ভূমিকাকে সত্যিকারের মূল্যায়ন করতে পারেননি। কারণ ইউরোপের রেশনালিস্টদের মতই তিনি নবুয়ত, তৌহীদ, ওহী ও কোরআন শরীফের বাণীকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শুধু শুধু গলদঘর্ম হয়েছেন। তবে যুক্তির জগত যতই শক্তিশালী হোক না কেন তা কিন্তু ভাবজগতকে পরোপুরি ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। আবার ভাবজগতের অস্তিত্বের পিছনেও এমন একটা সামর্থ্য আছে যার কারণে পৃথিবীর কোটি কোটি নর-নারী আজও ধর্মের কাছ থেকে অনন্ত শক্তির প্রেরণা পেয়ে থাকে। রায় স্বাভাবিকভাবে ইসলামের যুক্তিবাদী ধারা এবং ইতিহাসে এর ভূমিকা দেখে উল্লসিত হয়েছেন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ইসলামের যুক্তিবাদী ধারা ভাববাদী ধারাকে বাদ দিয়ে কখনোই প্রবাহিত হয়নি। ইসলামকে বুঝতে হলে এই দুই ধারাকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে হবে- যা রায় করতে পারেননি। ইসলামের ইতিহাসে যেমন একদিকে রয়েছে আল কিন্দি, আল হাসান, আল ফারাবী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদের বুদ্ধিবাদী ধারা তেমনি আছে ইমাম গাজ্জালী, ইবনে তাইমিয়া, ইমাম আবু হানিফা, মাওলানা রুমীর মানবিক ইসলামের ধারা। এই দুই ধারা নিয়েই ইসলামের জ্ঞান কাঠামো গড়ে উঠেছে। ইসলামের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক স্রোতধারা স্পেনের ভেতর দিয়ে ইউরোপে গিয়ে আঘাত হানে। সেই আঘাতে রোজার বেকনের মতো মানুষ জেগে ওঠে এবং ইউরোপের নবজাগরণ বা রেনেসাঁর শুরু হয়। রায় অবশ্য ইসলামের এই বু্দ্ধিবাদী ধারার নতুন করে বিকাশের প্রয়োজনীয়তার কথা গোপন করেননি। এ বইতে রায় ভারতে ইসলামের বৈপ্লবিক ভূমিকার কথাও আলোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন ইসলামের সামাজিক কর্মসূচীই সেদিন অধিকার ভেদের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের নিপীড়িত মানুষকে কাছে টেনেছিল বেশি। নচেত ইসলাম ভারতের গণজীবনের গভীরে প্রবেশ করতে পারতো না। রায় লিখেছেন, ভারতের হিন্দুরা যদি ইসলামের এই বৈপ্লবিক অবদানকে সহজে স্বীকার না করে নেয় তাহলে হিন্দু-মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্ক কখনোই গভীর হবে না। তখনকার হিন্দু-মুসলমান রাজনীতির তিক্ত সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে রায়ের এই মতামত যে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল তা বলাই বাহুল্য। বইটি লেখা হয়েছিল ভারতীয় ইতিহাসের একটি ক্রান্তিকালে যখন হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক এক অবিশ্বাসের দোলায় দুলছিল। তখন এই সন্দেহের প্রাচীন ভেঙ্গে অপর সভ্যতাকে বুঝবার রায়ের এই চেষ্টা তার উদার ও সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি সামজিক ন্যায়, বহুত্ব ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও জরুরী। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমে ইসলামকে মধ্যযুগীয় ও বর্বর ধর্ম হিসেবে তুলে ধরার যে চেষ্টা দেখি, ক্লাস অব সিভিলাইজেশনের তত্ত্ব প্রচারের নামে ইসলামের বিরুদ্ধে যে ঘৃণার প্রকাশ দেখি তা আসলে সেখানকার নীতিনির্ধারকদের অসহনশীল ও উগ্র মনমানসিকতার ফসল বলা যায়। সেকুলার জড়বাদী বলে পরিচিত পশ্চিমা বিশ্বের এই যুক্তিহীন আচরণের ব্যাখ্যা কোথায়? রায়ের বইটি আজকের দিনে মুসলমানের সমস্যাদি সমাধানে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না সত্য, কিন্তু তার খোলা মন মানসিকতা যে পারস্পারিক সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার পক্ষে অনেকের চোখ খুলে দেয়ার ক্ষমতা রাকে তা অবশ্য বলা যায়। আজকের দিনে বইটির মূল্য এখানেই।

 কারামুক্তির পর রায় ভারতীয় মুক্তি আন্দোলনকে সক্রিয় করতে স্বল্পকালের জন্য কংগ্রেসে যোগ দেন বটে, কিন্তু কংগ্রেসের আধা সামন্ততান্ত্রিক নেতৃত্ব বিশেষ করে গান্ধীর যুক্তি বিমুখ, আপসপন্থী, অতীতমুখী চিন্তাভাবনার মধ্যে তিনি নিজেকে কখনোই মেলাতে পারেননি। তাই কংগ্রেসেও শেষ পর্যন্ত তার থাকা হয়নি। এরপর থেকে মানবেন্দ্র ভারতীয় জনগণের মুক্তির জন্য সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজন বোধ করতে থাকেন এবং তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসে এক নব্য দর্শন রচনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। এই নব্য দর্শনের নামই ছিল রেডিক্যাল হিউম্যানিজম। এটা সত্য তার এই দর্শনের প্রভাব ভারতীয় জনসমাজে তেমন একটা পড়েনি।

 যাই হোক রেডিক্যাল হিউম্যানিজমের প্রবক্তা হলেও মানবেন্দ্র কিন্তু ভারতবর্ষের প্রধান সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মুসলমানদের সমস্যাগুলো গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে রায় যখন ঢাকা আসেন তখন অনেক তরুণ শিক্ষিত মুসলমান তার মানবতন্ত্রী চিন্তাভাবনায় কিছুটা অনুপ্রাণিতও হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে তমু্দ্দুন মজলিস আয়োজিত এক সভায় রায় ইসলামের উপর এক চমৎকার বক্তৃতা দিয়েছেন বলে জানা যায়। শেষ পর্যন্ত রায় ইসলামকে রাজনীতির একটি বিকল্প পথ হিসেবে সাব্যস্ত না করলেও তিনি ইসলামের একজন প্রগতিশীল বন্ধু থেকে যান।

 

সূত্রঃ বিবা প্রকাশনী প্রকাশিত “ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা” গ্রন্থের পরিশিষ্ট-২

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
7cdd1e2195.jpg.600.0x407.8125_q85_crop-smart

ঢাকাঃ বাঙ্গালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক রাজধানী

ফাহমিদ-উর-রহমান | সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৪
Download PDF

ওআইসি (ইসলামী সম্মেলন সংস্থা) যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এর পেছনে উদ্যোক্তাদের যে আবেগ ও স্বপ্ন ছিল, তা বোধ হয় এতোদিনে অনেকখানি ফিকে হয়ে গেছে। যে ফিলিস্তিনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসর ইসরাইলের আগ্রাসনের মুখে ওআইসি’র জন্ম, সেই আধিপত্যবাদ বহাল তবিয়তে চলছে। কিন্তু ইসলামী দুনিয়ার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের তেমন কিছুই এখন আর দৃশ্যমান নয়। আজকের একমেরু বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপ্রতিহত তর্জন-গর্জনের সামনে মুসলিম দেশগুলোর সমবেত সংগঠনের স্বর যেন একেবারে নিচু হয়ে গেছে। এই ওআইসির একটি অঙ্গসংগঠনের নাম হচ্ছে Islamic Educational, Scientific and Cultural Organization, সংক্ষেপে ISESCO, অনেকটা জাতিসঙ্ঘের UNESCO-র মতো। মুসলিম দুনিয়ার শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক জাগরণের জন্য এটির প্রতিষ্ঠা। বাস্তবে এটি কী করতে পেরেছে, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। এই ISESCO এবার ঢাকাকে ঘোষণা করেছে ইসলামী সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে। ISESCO-র এবারকার থিম হচ্ছে Dhaka: The Capital of Islamic Centre for Asian Region ২০১২। ISESCO-র ঘোষিত এই থিমের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ার যে ভূমিকা নেয়া উচিত ছিল, তার কিছুই হয়নি। বাংলাদেশের আপামর মানুষও এই থিমের বিষয়টি খুব সম্ভব কিছু জানে না। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় দায়সারাভাবে একটি ইসলামী বইমেলার আয়োজন করেছিল জাতীয় গ্রন্থাগার চত্বরে। মেলায় গিয়ে দেখেছি, ইসলামী সংস্কৃতি কিংবা মুসলিম সংস্কৃতির রাজধানী ঢাকার ওপর তেমন কোনো বইই নেই। জরাজীর্ণ ISESCO-র মতো আমাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়েরও জরাজীর্ণ অবস্থা।

যাই হোক ISESCO-র থিমটি চমৎকার। এর আছে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। একদিনেই ঢাকা একটি মুসলিম অধ্যুষিত জনপদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইতিহাসের বিচিত্র পথ চলা ও বিবর্তনের ভেতর দিয়ে ঢাকা আজকে একটি স্বাধীন মুসলিম দেশের রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের সেকুলার বন্ধুরা মুসলিম দেশ বললে ভ্রুকুঞ্চিত করতে পারেন, কিন্তু ইতিহাসের নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত জনপদে পরিণত হয়েছে, এটা কি অস্বীকার করা যাবে? অনেক বছর ধরেই পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশ মুসলমানপ্রধান। আর পূর্ববঙ্গের কেন্দ্র ছিল ঢাকা। সপ্তদশ শতকে মোগলরা তাদের সুবে বাংলার রাজধানী করে ঢাকাকে। সুবে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান মোগল বাদশাহ জাহাঙ্গিরের নামে এই শহরের নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। মোগল রাজধানী ঢাকার সাংস্কৃতিক মেজাজ কিছুটা আঁচ করা যায় হাকিম হাবিবুর রহমানের আসুদে গান ‘এ ঢাকা ও ঢাকা পাচাস বারাস পাহলে’ এবং সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুরের ‘Glimpses of Old Dhaka’ পড়লে। আরও লিখেছেন মশহুর অধ্যাপক আহমদ হাসান দানী ও আবদুল করিম সাহেব।
মোহররমের মিছিল, রমজানের কাসিদা-সরগাই, ইফতারির রকমারি বাহার, ঈদের আনন্দ উল্লাস-নহবত, পোলাও-কোরমা-বিরিয়ানি-কাবাব-বাকরখানি-মসলিন-জামদানি এসবের মধ্যে মোগল ঢাকার এক নিভৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বড় ভাই বিশিষ্ঠ নন্দনতাত্ত্বিক ও শিল্প সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দী রন্ধন বিষয়ে একটি বই লিখেছিলেন, যা প্রকাশ করেছিল বিখ্যাত প্রকাশক থ্যাকার স্পিংস। এখানে তিনি ঢাকার রান্না বিষয়ে মনোজ্ঞ সব আলোচনা করেছিলেন।

ইংরেজরা বাংলা দখল করার পর অষ্টাদশ শতকে কলকাতার উত্থান ঘটতে থাকে। আর ঢাকা নিমজ্জিত হয় অন্ধকারে। ঊনবিংশ শতকে কলকাতাকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালি মুসলমানের নেতৃত্ব দেন নওয়াব আব্দুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকা স্বল্প সময়ের জন্য পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ঢাকা আবার রাজধানীর মর্যাদা হারায়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ভিতর দিয়ে ঢাকার যেমন সাংস্কৃতিক জাগরণ শুরু হয়, তেমনি বাঙ্গালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশলাভের পথ সহজ হয়। ১৯৪৭ সালে ঢাকা হয় নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর স্বাধীন দেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্রুতগামী হয়। বিশেষ করে গত প্রায় ৬৫ বছরে (১৯৪৭-২০১২) ঢাকাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এক সামগ্রিক জাগরণ তৈরি হয়েছে। রাজনীতি-অর্থনীতির পাশে সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পকলার জগতে নতুন নতুন মুখ ও ধারা তৈরি হয়েছে।

বাঙ্গালি মুসলমানের ইতিহাস লিখতে গেলে ইসলামের বিপুল প্রসার ও তার বৈপ্লবিক ভূমিকার মধ্যে আমাদের চোখ ফেরাতে হবে। ইসলাম নিয়ে একসময় লেখালেখি করেছিলেন মনস্বী বিপ্লবী এম এন রায়। তিনি তার বিখ্যাত বই Historical Role of Islam-এ বলেছেনঃ
ইসলাম তলোয়ারের জোরে প্রচারিত হয়েছিল, এ কথাটা সত্য নয়। মূলত ইসলাম একটি নতুন সমাজ ও নতুন চিন্তাধারার পথকে উন্মুক্ত করেছিল, যেখানে ছিল মানবমুক্তির নিশ্চয়তা। এই কারণেই ঘুণেধরা প্রাচীন সভ্যতার জনগণের কাছে ইসলাম এতো আদরণীয় হয়েছিল, অন্যদিকে তার অসাধারণ বিস্তার সম্ভব হয়েছিল।

বিশ্বসভ্যতায় ইসলামের এই অবদা্ন প্রসঙ্গে এম এন রায়ের বিশ্লেষণ, অকপট স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধাঞ্জলির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ইসলাম বা বাঙ্গালি মুসলমান সম্পর্কে দু-একটি কথা বলতে চাই। ইসলাম তার অবিশ্বাস্য বিস্তারের যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন কেন্দ্রে গড়ে তুলেছিল ইসলামী সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্র। দামেশক, বাগদাদ, কর্ডোভা, ইস্পাহান, বোখারা, দিল্লি, আগ্রা, লাহোরের মতো ঢাকাও এমনি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এসব কেন্দ্র বিকশিত হয়েছিল ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে স্থানগত-কালগত রঙ ও রূপের সংমিশ্রণে। পন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন তার ‘ইসলাম ধর্মের রূপরেখা’ বইয়ে বলেছেন, উদারতার কারণেই স্থানিকতাকে স্বীকার করে নেয়ার ফলে ইসলাম ভূমন্ডলে সম্প্রসারিত ও প্রভাবশালী হয়েছে। এ উক্তি বাঙ্গালি মুসলামানের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। এইভাবে বাঙ্গালি মুসলমানের একটি নিজস্ব জীবনচেতনা ও জীবনধারা গড়ে উঠেছে। বাঙ্গালি মুসলমানের জীবনধারায় বাংলা ভাষা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যভ্যাস, আচার-আচরণ, সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, ঈদ, মোহররম, শবেবরাত, রমজান মিশে আছে। এগুলোর সম্মিলিত রূপ হচ্ছে আমাদের বাঙ্গালি মুসলমানের সংস্কৃতি। ইসলাম আবির্ভূত হয়েছে সপ্তম শতাব্দীতে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলায় মুসলিম প্রশাসন কাজ শুরু করে বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের ভেতর দিয়ে। কিন্তু বঙ্গবিজয়ের আগেই পীর, আউলিয়া, দরবেশ ও আরব ব্যবসায়ীরা বাংলার গণজীবনে প্রবেশ করে ইসলামের সাম্য-মৈত্রীর বাণী প্রচার শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাদের কিছু স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) রক্ষিত আছে। এগুলো খলিফা আল-মানসুর, হারুন-অর-রশীদ, আল মামুনের জামানার। এগুলো পাওয়া গেছে বাংলাদেশের চাঁদপুর জ়েলায়। এ থেকে মনে করার সংগত কারণ আছে, বখতিয়ার খিলজি আসার আগে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ইসলামের পরিচয় ঘটেছিল।

সেই থেকে আজ পর্যন্ত আটশ’ বছর হলো বাঙ্গালি মুসলমানের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। মধ্যযুগজুড়ে একচ্ছত্র রাজত্ব করেছে ইসলাম। ছয়শ’ বছরের বেশি সময় ধরে এদেশের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। ১৮৩৭ পর্যন্ত ফারসি ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বহাল থাকার কারণে বাঙ্গালি মুসলমান ও বাংলা ভাষার ওপর আরবি-ফারসির একটি বড় প্রভাব রয়েছে। মধ্যযুগের আলাওল এমনই একজন কবি, যার ওপর ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। আলাওল তার কাব্যের কাহিনী গ্রহণ করেছেন ফারসি কাব্য ‘সিকান্দার নামা’ ও ‘হফত পয়কর’ থেকে। আলাওল বাংলা লিখেছেন ফারসি অক্ষরে, আমাদের মতো বাংলা অক্ষরে নয়। ইংরেজের পৃষ্ঠপোষকতায় ফোর্ট উইলিয়ামের সাম্প্রদায়িক পন্ডিতরা বাংলা ভাষা থেকে এই মুসলমানি প্রভাব হঠানোর বহু চেষ্টা করেছিলেন।

মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিল। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো। দীনেশ চন্দ্র সেনের মতো পন্ডিতরাও সে কথা মুক্তমনে স্বীকার করেছেনঃ
ব্রাহ্মণগণ প্রথম বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলেন। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে ইহারা ‘সর্বনেশে’ উপাধি প্রদান করিয়াছিলেন। … আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হইতেই আসুক না কেন, এদেশে আসিয়া সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হইয়া পড়িলেন। (দীনেশ চন্দ্র সেনঃ বঙ্গভাষা ও সাহিত্য)

ভাষা এক হলেও বাঙ্গালি হিন্দু ও বাঙ্গালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক চেতনা কিন্তু একই ধারায় প্রবাহিত হয়নি। কারণ তাদের ধর্মবিশ্বাস ও ইতিহাসের ধারা এক নয়। এই সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কথাটা ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তার বাংলার ইতিহাস বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা কতেছেন। এই সাংস্কৃতিক পার্থক্যের জন্যই বাঙ্গালি মুসলমান একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, রাষ্ট্র তৈরি করেছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতার ভেতর দিয়ে বাঙ্গালি মুসলমান একটি পৃথক রাজনৈতিক সত্তা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। বাঙ্গালি হিন্দুরা সেটা করেনি। তারা বিশ্বাস করেছেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদে; কারণ ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতিকেই তারা ভেবেছেন আপন সংস্কৃতি হিসেবে। কিন্তু বাঙ্গালি মুসলমানের পক্ষে সেটা ভাবা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হলে আজকের পৃথক রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদ্ভব হতো না। ভারতের সঙ্গে একত্রিত হয়ে এক মহাজাতির আশ্রয়ে তারা থাকতে চাইতেন। একটি জনসমাজ তখনই একটা পৃথক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়, যখন সেই জনসমাজ মনে করে তার শান্তি, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্যে একটি পৃথক রাষ্ট্রের প্রয়োজন। একটি জনগোষ্ঠী পৃথক রাষ্ট্র গড়তে চায় তখনই, যখন সে মনে করে অন্যান্য জনগোষ্ঠী থেকে সে আলাদা। এই পার্থক্য চেতনার মূলে কাজ করে তার সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধের অনুভব। বাঙ্গালি মুসলমানের এই যে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, তা গত আ্টশ’ বছর ধরে বিকশিত হয়েছে। জাতীয়তা, জাতীয়তাবোধ ও জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে উঠতে সময় লাগে। তা হলো বহু মানুষের চেষ্টার ফল। আজকে বাংলাদেশী সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের কথা বলা হচ্ছে। এটি কিন্তু বহু মানুষের চেষ্টায়, বহু শতাব্দী পাড়ি দিয়ে আজকের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে রাতারাতি এর অভ্যুদয় ঘটেনি।

উত্তর ভারতে যখন বৌদ্ধ ধর্মের বিলুপ্তি ঘটছে, বাংলায় তখন বৌদ্ধ রাজারা শাসন করছেন। গোঁড়া, সাম্প্রদায়িক সেনরাজাদের সময় বৌদ্ধরা হন লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত। পরবর্তীকালে এই লাঞ্ছিত বৌদ্ধরাই দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর ফলে এদেশে বৌদ্ধ সংস্কৃতির সঙ্গে মধ্য এশিয়া থেকে আগত মুসলমানদের সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটে। হিন্দু আর বৌদ্ধ স্থাপত্য একরকম নয়। বৌদ্ধরা খোলামেলা ঘরে সমবেতভাবে প্রার্থনা করে। হিন্দুদের সমবেত প্রার্থনা নেই। হিন্দু মন্দিরে পূজা করার অধিকার কেবল হিন্দু পুরোহিতদের। হিন্দুরা পূজায় বিগ্রহ দর্শন করে। মন্দিরের ছোট ঘরে থাকে সেই বিগ্রহ। হিন্দু মন্দিরের স্থাপত্য ও বৌদ্ধ মন্দিরের স্থাপত্য এক নয়। বাংলাদেশের সুলতানি আমলের মসজিদগুলোতে পড়েছে কিছুটা বৌদ্ধ স্থাপত্যের ছাপ। প্রাচীন মসজিদগুলোর গম্বুজের আকৃতি মনে করিয়ে দেয় বৌদ্ধ স্তূপের আকৃতির কথা। প্রাচী্ন মসজিদগুলোর নকশাকলায় (Motif) দেখা যায়, বৌদ্ধ নকশাকলার প্রভাব। বাংলাদেশের প্রাক-মুসলিম পর্বে হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি একরকম ছিল না। ছিল হিন্দু-বৌদ্ধ বিরোধ। বাংলাদেশে তুর্কি সুলতানদের আমলে যে সংস্কৃতির বিকাশ হয়, তাও কিন্তু ছিল হিন্দুদের থেকে আলাদা। এই পৃথক সংস্কৃতিকেই বলা যায়, আজকের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি। অর্থাৎ বাঙ্গালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হচ্ছে এদেশের প্রাচীন সংস্কৃতি ও মুসলিম মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্যের সমন্বয়। পরে মোগল আমলে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাফাভিদ ফারসি সংস্কৃতির প্রভাব। তুর্কি সুলতানরা মোগলদের মতো এতোখানি ফারসি সংস্কৃতি প্রভাবিত ছিলেন না। তুর্কি আমলে ফারসির চেয়ে আরবি ভাষায় লিখিত শিলালিপি বাংলাদেশে বেশি পাওয়া গেছে।

সাবেক পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার অনেক কারণ ছিল, কিন্তু এর মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে, বাঙ্গালি মুসলমানদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য চেতনা ও দু অঞ্চলের ভৌগলিক তফাৎ। এক একটি জাতি গড়ে উঠে ইতিহাসের ধারায়। আমাদের আজকের জাতীয়তাবাদকে তাই বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করতে হবে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই আমাদের সংস্কৃতি চেতনার সমগ্র স্বরূপকে বুঝতে হবে। এই ইতিহাসের শুরুটা হয়েছিল বৌদ্ধ পাল রাজাদের সময় থেকে। কারণ বৌদ্ধ সাধকদের হাতে বাংলা ভাষার প্রাথমিক রূপটা তখন আত্মপ্রকাশ করছে।

আবার বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছে। এই ধর্মের সমতাবাদী, মানবপ্রেমী চরিত্র তাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল। আর তাই তারা চেয়েছিল এই নতুন ধর্মমতের ভিত্তিতে তাদের জীবনযাত্রাকে পরিচালিত করতে। এ ছিল তাদের স্বাধীন ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। আজকের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে ব্যাখ্যা করতে হলে তাই ইসলামের ভূমিকাকে যথেষ্ট মূল্য দিতে হবে।

সংস্কৃতির দুটো অংশ থাকে। একটি আদর্শিক, অন্যটি স্থানিক। ইসলাম দেশে দেশে এই স্থানিক সংস্কৃতি অনায়াসে আত্মস্থ করে নিয়েছে, যতক্ষন না তার আদর্শিক ভিত্তিকে আঘাত করে। যেমন, বাঙ্গালি মুসলমান স্থানীয় পোশাক নিয়েছে, স্থাপত্য নিয়েছে, খাবার নিয়েছে। পুলিপিঠা, পাটিসাপটা, ইলিশভাজা, আলুভর্তা, শুঁটকিভর্তা, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, মুর্শিদি তার সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু সে প্রতিমা পূজা করে না। তৌহিদ হচ্ছে বাঙ্গালি মুসলমানের মূল। এর সঙ্গে আছে বাঙ্গালি মুসলমানের সংগ্রামশীলতা, স্বাধীনতাপ্রিয়তা, ধর্মীয় সহনশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা বোধ।

বাঙ্গালি মুসলমানের সংস্কৃতিতে এসবের ছাপ। বাঙ্গালি মুসলমান তার ধর্মও ছাড়েনি, ভাষাও ছাড়েনি; মুসলমানিত্ব ও বাঙ্গালিত্বের সমন্বয় করেছে। বাঙ্গালিত্বকে প্রবাহমান রেখে সে বিশ্ব মুসলমানের সঙ্গে একাত্ববোধ করেছে। আমাদের জাতীয় কবি নজরুল তার গানে যেমন বলেছেন, তুরানী-মিশরী-ইরানীর সঙ্গে আজ বাঙ্গালি মুসলমানও জামাতবদ্ধ হয়েছে। এই সংস্কৃতির রাজধানী হচ্ছে ঢাকা। ISESCO-র ঘোষণার তাৎপর্য এখানেই।

সূত্রঃ বুকমাস্টার প্রকাশিত “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
rabi_7277

লালন ফকির, রবীন্দ্রনাথ ও ইসলাম

ফাহমিদ-উর-রহমান | সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৪
Download PDF

লালন ফকিরের আজ যে দেশজোড়া খ্যাতি তার পিছনে আছে কবি রবীন্দ্রনাথের একটা বড় ভূমিকা। কবি তার অক্সফোর্ডে দেয়া বক্তৃতায় লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানের ইংরেজি তরজমা করে তার বিদেশী শ্রোতাদের শুনিয়েছিলেন। কবির সেই বক্তৃতা পরে ‘মানুষের ধর্ম’ হিসেবে প্রকাশিত হয়। সেই বক্তৃতায় কবি লালনকে উপনিষদের ঋষিদের সাথে তুলনা করেছিলেন। রবীন্দ্রের এই ভূমিকার ফলেই লালন সম্বন্ধে শিক্ষিত শ্রেণির কৌতুহল বেড়ে যায়। কোনো সন্দেহ নেই এর ফলে লালন এক নিরক্ষর পল্লী এলাকার ফকির থেকে রাতারাতি উন্নতমানের সাধক, গায়ক ও কবি হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন।

শুধু তাই নয় – রবীন্দ্রনাথ লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানটি আর বিখ্যাত গোরা উপন্যাসেও উদ্ধৃত করেছেন। এর আগে তিনি লালনের অজস্র গানের ভিতর থেকে ২০টি গান বেছে ‘প্রবাসীতে’ প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন যা সুধী মহলের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কবির এসব কাজকর্ম প্রকারান্তরে লালনকে বিখ্যাত করে দিয়েছে। লালন ফকিরকে নিয়ে কবির এই উৎসাহ দেখে মনে হয় তিনি হয়তো কিছুটা তার গান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। কুষ্টিয়া অঞ্চলে লালন ফকিরের শিষ্যদের মধ্যে এখনও অনেকের বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের হাতে পড়ে লালনের গানের খাতাই গীতাঞ্জলিতে রূপান্তরিত হয় এবং রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজোড়া খ্যাতি তথা নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তির মূলে আছেন বাংলার লালন ফকির। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আরো একটা গল্প জারি আছে ফকিরদের মধ্যে। কবি নাকি লালন ফকিরকে শিলাইদহের কুঠিতে ডেকে নিয়ে তাঁর স্বকণ্ঠে গান শুনেছিলেন। এসব ঘটনার সত্যাসত্য নির্ধারণ করার দায়িত্ব বর্তেছে আজ গবেষকদের উপর। তবে লালন ফকিরের আখড়া ছেউড়িয়া আর রবীন্দ্রের কুঠি শিলাইদহ কুষ্টিয়ার কুমারখালি থানায় খুবই স্বল্প দূরত্বের মধ্য। শুধু মাঝখানে গড়াই নদী দুটি স্থানকে পৃথক করে রেখেছে। তাছাড়া লালনের ছেউড়িয়া ছিল রবীন্দ্রের জমিদারীর মধ্যে। সেই হিসেবে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ কোনো অসম্ভব ব্যাপার ছিল না। কিন্তু কথা হচ্ছে রবীন্দ্রের উপর লালনের প্রভাব কতটুকু। লালন ও তার শিষ্য বাউলরা দেহতত্ত্বে বিশ্বাসী। যে অর্থে আমরা মিস্টিক শব্দটা ব্যবহার করে থাকি বাউলদের গান সেরকম নয়। সে গানকে বলা যায় বড়জোর এসোটেরিক (Esoteric)। তার মর্ম ভেদ করা সকল শ্রোতার পক্ষ সম্ভব নয়। এটা পারে দীক্ষিত শিষ্যরা। বাউলদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক আছে। কিন্তু এরা কোনো জনপ্রিয় শাস্ত্রীয় ধর্ম মানে না। বাউলরা বেদ-কোরআন মানে না, মন্দির-মসজিদে যায় না, পূজা-রোজা নামাজ করে না, দেবদেবী-অবতার পয়গম্বর মানে না, এমনকি ইশ্বর-আল্লাহকেও ডাকে না। এরা কোনো ধর্মানুসারী নয়। এদেরকেই ইংরেজিতে বলে Non-conformist। আলেম-ওলামারা এজন্যই এদেরকে বলেছেন বে-শরা ফকির। এদের জীবনযাত্রা সামাজিক মুসলমান বা হিন্দুর মতো নয়। এই কারণে হিন্দু-মুসলমান কোনো ধর্মই এদেরকে গ্রহণ করেনি।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রহ্মনিষ্ঠ, চেতনার দিক দিয়ে উপনিষদীয়। তাই তিনি বাউলদের মতো দেহতত্ত্ববাদী হননি। বাউল সাধনার প্র্যাকটিস ছাড়া শুধুমাত্র তত্ত্ব দিয়ে কেউ বাউল হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ এরকম কোনো বাউল সাধনার প্র্যাকটিস করেননি কিংবা দেহতত্ত্বের পক্ষে তার কোনো লেখালেখিও নেই। সম্ভবত কবি লালনের কিছু কিছু গানের বাণী ও সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। হয়তো সেটাই তার লালন-আকর্ষণের কারণ। কোনো সন্দেহ নেই লালনের কিছু কিছু গান প্রাণস্পর্শী, মনকাড়া- যে কাউকেই টানে। কিন্তু একজন ব্যক্তির স্বল্প কয়েকটি মানোত্তীর্ণ গান দিয়ে তার ব্যক্তিত্বের বিচার চলে না। তার সমগ্র জীবনের কর্মকান্ড দিয়েই এর বিচার করতে হয়।

লালন দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন – ১১৬ বছর। এই বিপুল জীবনে তিনি অজস্র গান রচনা করেছেন। সবই মুখে মুখে। তার জীবদ্দশায় শিষ্যও ছিল পাঁচ থেকে দশ হাজার। এদের তিনি কি উপদেশ দিতেন তা আর জানা যায় না। লালনের গান অজস্র হলেও সবই শ্রবণ সুখকর নয় – সব গানই কিন্তু আমাদের কানের ভিতরে যেয়ে মরমে পশে না। অধিকাংশ গানই ক্লান্তিকর। হয়তো কয়েক পঙক্তি মুগ্ধ করার মতো। তাছাড়া পুনরাবৃত্তিও প্রচুর। এই জন্যেই রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশটি গান পছন্দ করেছিলেন। লালন হিন্দু না মুসলমান এ নিয়েও নানা মুনির নানা মত। কারো মতে তিনি হিন্দুর ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমান ফকিরের কাছে দীক্ষা নেন। কারো মতে জন্মসূত্রেই মুসলমান। কিন্তু লালন মনে হয় এসব সংশয় তার জীবদ্দশায় ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। আসলে ব্যক্তিজীবনে তার নিজস্ব বাউল মত ছাড়া আর কোনো ধর্মের তিনি অনুসরণ করেননি।

তার বিখ্যাত গানেই তিনি বলেছেনঃ

সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে,
লালন ভাবে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।

এই কারণেই তার শেষকৃত্য কোনো ধর্মমতে হয়নি। তার শিষ্যরা তার মৃতদেহ মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিলেন মাত্র।

লালনের গানে যে আকর্ষণ থাকুক না কেন তার সাধনার ক্ষেত্র হচ্ছে দেহতত্ত্ব। একটি চিন্তার গুরুত্ব বোঝা যায় তার প্রায়োগিক ফলাফলের উপর। লালনের দেহতত্ত্ব সেই অর্থে বিপজ্জনক ও ভয়ংকর। লালনের সাধনা দেহবর্জিতও নয়। এই সাধনা নারীবর্জিতও নয় অথচ সন্তানবর্জিত যা নিয়ে সামাজিক মানুষের সন্দেহ ও অশ্রদ্ধা স্বাভাবিক। বাউলরা সমাজে থাকে না, গৃহীত হয় না। এদের সম্পত্তি থাকে না। দিনভর গান গেয়ে বেড়ায়। রাত্রে আখড়ায় মিলিত হয়। এরা ভিক্ষাজীবী। এই সাধনায় নারী হচ্ছে অপরিহার্য সঙ্গিণী। এদের সাথে মিল আছে বৌদ্ধ সহজিয়া ও হিন্দু বৈষ্ণব সাধনার। কিন্তু মিল নেই মুসলিম সুফিদের। সুফিদের সাধনা নারীবর্জিত। ভগবত প্রেমই হলো সুফিদের আসল কথা।

লালনের গানে আছে ‘এই মানুষে দেখ সেই মানুষ আছে।’ লালনের ভাষায় সেই মানুষ হচ্ছে আলেক মানুষ বা অলখ মানুষ। এই অলখ মানুষ ঠিক আল্লাহ, ঈশ্বর বা গড নন। সেদিক দিয়ে লালন ও তার বাউল সম্প্রদায় হিউম্যানিস্ট – মানবিকবাদী। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু বাউলরা এই মানবিকবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়েছেন এক কুশ্রী কাম সাধনার পথ, যাকে এক ধরনের ব্যাভিচারের সংস্কৃতি বলা যেতে পারে।

লালনের একটা গানে আছেঃ

করি কেমনে শুদ্ধ প্রেম রসের সাধন
প্রেম সাধিতে কেঁপে ওঠে কাম নদীর তুফান…।
বলবো কী হইলো প্রেমের কথা
কাম হইলো প্রেমের লতা
কাম ছাড়া প্রেম যথা, তথা নাইরে আগমন।

এই মানুষে সেই মানুষকে দেখার কথা বলে বাউলরা দেহের ভিতর দেহাতীতের সন্ধান করেন নরনারীর যুগল সাধনার মাধ্যমে। দেহের সাথে দেহের মিলন না হলে মাধুর্য ভজন হয় না। মাধুর্য ভজন না হলে মানুষ হয়ে জন্মানোর স্বার্থকতা কোথায়? এই হলো বাউলদের মৌল জিজ্ঞাসা। এই জিজ্ঞাসার উত্তর তারা খোঁজেন বিকৃতরুচি কাম সাধনায়। এই কারণে বাউলরা জোড়ে জোড়ে থাকেন। বাউল সাধনা একাকী পুরুষের বা একাকী নারীর সাধনা নয়। একে এক ধরনের পাশ্চাত্যের ‘লিভিং টুগেদারের’ সাথেও তুলনা করা চলে। লালনের ধর্মমতের ‘চারিচন্দ্রভেদ’, ‘ষড়চক্র’, ‘দ্বিদলপদ্ম’, ‘মূলধারাচক্র’, ‘সহস্রদলপদ্ম’, ‘অধর মানুষ’, ‘ত্রিবেণী’, ‘সাধনসঙ্গিণী’, ‘প্রেমভজা’ প্রভৃতি কাম আরাধনার ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দের তাৎপর্য জানলে বা শুনলে যে কোনো মানুষের লালনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যাবে।

বাউলদের এই ব্যাভিচারী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ায় কয়েকবার বাউল-খেদাও আন্দোলন হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৪২ সালের বাউল-খেদাও আন্দোলন খুবই বিখ্যাত। লালনের বাউল সাধনা সেদিন হিন্দু-মুসলমান উভয় সমাজেরই নিন্দা কুড়িয়েছে।

লালন যতো না ফকির তার চেয়ে বেশি বাউল। কারণ ফকির, দরবেশ, আউলিয়া, সুফি শব্দগুলো হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতিজাত। মুসলিম মিস্টিকদের বুঝাতে এসব শব্দ ব্যবহার করা হয়। বাউলরা সেরকম কোনো সুফি ধারার অনুসারী নয়। সুফিবাদের প্রথম কথা হচ্ছে নিজের কামনার বিরুদ্ধে লড়াই করে পরিশুদ্ধ হওয়া, সদভ্যাস গড়ে তোলা এবং আল্লাহর প্রেমে এমনভাবে নিমজ্জিত হওয়া যাতে দুনিয়ার কোনো কিছুই তাকে আকর্ষণ না করে। সুফি পরিভাষায় একে বলে ফানা। আজকে জেহাদ শব্দটা নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়া এমনভাবে হৈচৈ শুরু করেছে যাতে এর মৌলবাণী হারিয়ে যেতে বসেছে। এ শব্দটাকে এখন খুনোখুনি, সন্ত্রাসের সমার্থক বানিয়ে ফেলা হয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন নিজের কামনার বিরুদ্ধে লড়াই করা হচ্ছে সর্বোত্তম জেহাদ। ইসলামী পরিভাষায় একে বলে জেহাদে আকবর। সুফিরা জেহাদের এই তাৎপর্যকে গ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান। সুফিদের পরিভাষায় একে বলে সুলহিকুল- সকলের জন্য শান্তি।

সুফিদের যে সাধন পদ্ধতি সেটা এতো সহজ নয়। সংযম, কৃচ্ছসাধন ও পরিশুদ্ধ জীবন-যাপন এগুলো হচ্ছে সুফি জীবনধারার অপরিহার্য অংশ। সক্রেটিস একবার বলেছিলেন Having the fewest wants, I am nearest to the gods। এ অনেক পুরনো চিন্তা। পার্থিব আকর্ষণকে যে জয় করতে পারে না, সে কখনো সুফি হতে পারবে না।

সুফি সাধনমার্গের তিনটি স্তর আছে – শরিয়ত, তরিকত ও হাকিকত। সুফিদের রাস্তায় হাঁটতে হলে প্রথমেই ইসলামী শরিয়তের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করতে হবে। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে তরিকত- সুফি সাধনার বিশেষ ধারা। সুফিদের মধ্যে চিশতিয়া, নকশাবন্দিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া এরকম বহু তরিকা আছে। এই তরিকার পথে যারা হাঁটেন তাদেরকে বলা হয় সালিক- পরিব্রাজক। এই সুফি পরিব্রাজনা নানা অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে, নানা মঞ্জিল অতিক্রম করে (সুফি পরিভাষায় মাকাম) হাকিকত – আল্লাহর দর্শনে সমাপ্তি ঘটে। এই দর্শনকে বস্তুজগতের অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। সুফিরা তখন নিরবে আল্লাহর জিকির করেন, আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলী নিজেদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করে উন্নত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেন। সুফি সাধনার সাথে তাই বাউল সাধনার তফাৎটা মৌলিক। বাউল সাধন পদ্ধতিতে যে যৌন বিকারগ্রস্ত মনের প্রতিচ্ছবি আমরা পাই, সুফি সাধনায় এসব কল্পনাই করা যায় না। তাই বাউল দর্শনকে কোনোক্রমেই ইসলামী সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত করা চলে না। সেই অর্থে লালনও মুসলিম সংস্কৃতির কেউ নন।

আমাদের কিছু সেকুলার বুদ্ধিজীবী আছেন যারা অনবরত বুঝাতে ব্যস্ত ইসলামের সাথে সম্পর্কহীন এদেশে যা কিছু আছে তাই অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এবং এখানকার সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার ভিত্তি। এদের কথা শুনলে মনে হতে পারে বাউল ধর্ম একটা প্রবল জনপ্রিয় ও বিপ্লবী ধর্ম যার বন্যায় অবগাহন করে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তির আস্বাদ পেয়েছে। আসল কথা হচ্ছে বাউল ধর্ম হিন্দু-মুসলমান উভয়ের দ্বারা বর্জিত হয়েছে। কারণ বাউল দর্শনের মধ্যে মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক-আধ্যাত্মিক মুক্তির কথা নেই, মানুষের স্বাধীনতার কথা নেই। এর মধ্যে নেই মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা মোকাবেলা করার কথা। জীবনের সাথে অসম্পৃক্ত এরকম দর্শন নিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে না। বাউলের চিন্তাভাবনা দিয়ে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কোনো কৌশল উদ্ভাবন। মাত্র কয়েক হাজার লোকের একটি সম্প্রদায় বা তাদের কয়েকটি গান কিংবা যৌন বিকারগ্রস্ততা একটি জাতির প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হতে পারে না।

লালন যে ঊনিশ শতকে জন্মেছিলেন সেই সময় পূর্ববাংলার লোক-মানসে এক বড় ধরনের অভ্যুত্থান ঘটেছিল। এখানকার মানুষ ওহাবী ও ফরায়েজী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সামাজিক সংস্কার, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক গভীর লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিল। সামাজিক শক্তি হিসেবে দেশে ইসলাম যে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের পূর্বশর্ত তৈরি করেছিল ওহাবী ও ফরায়েজী আন্দোলন তার নমুনা। এ আন্দোলনের তাৎপর্য নিয়ে আমাদের এখানে বেশি আলোচনা হয়নি। কারণ তখন বাংলার সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দিয়েছে হিন্দুরা। এ আন্দোলন ছিল প্রকৃতিগতভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। এই ‘অপরাধে’ ব্রিটিশ ও তার অনুগত হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা এ আন্দোলনকে অবমূল্যায়ন করে এবং আন্দোলনের নেতাদের চরিত্র হননে লিপ্ত হয়। ফরায়েজী আন্দোলনের অন্যতম নেতা দুদুমিয়া ব্রিটিশ ও তার দালাল জমিদার শ্রেণির অত্যাচার থেকে দরিদ্র কৃষকদের মুক্ত করার জন্য এক আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ঘোষণা দেন-জমির মালিক জমিদার নয়, আল্লাহ। সেই জমিতে কৃষক, শ্রমিক, উৎপীড়িতের সবার অধিকার আছে। এর চেয়ে বিপ্লবী কথা আর হতে পারে না। আজ যারা লালনকে পূর্ববাংলার মানুষের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার সাথে জুড়ে দিতে চাচ্ছেন তারা জানেন না ঊনিশ শতকে পূর্ববাংলার লোক-মানসকে সত্যিকারভাবে উজ্জীবিত করেছিল বাংলার এই ওহাবী ও ফরায়েজীদের ক্রিয়াকাণ্ড – কোনোভাবেই বাউল ধর্ম নয়। ঊনিশ শতকে আমাদের জাতিসত্তার শিকড় খুঁজতে হবে ওহাবী, ফরায়েজী ও ফকির বিদ্রোহের মধ্যে।

একটা জিনিস বোঝা দরকার যে লোক-সংস্কৃতি সব দেশে থাকে। কিন্তু সে দেশের সংস্কৃতি বলতে কেবল লোক-সংস্কৃতিকে বোঝায় না। তার চেয়ে উঁচু স্তরের সংস্কৃতিও একটা থাকে। সেই সংস্কৃতি দেশের মানুষের মননশীলতার প্রতীক। সেই সংস্কৃতি হয় ঐ দেশের জাতিসত্তা, রাষ্ট্রসত্তার ভিত্তি। আমাদের এখানকার এই ভিত্তিটা হচ্ছে ইসলাম। এটাই হচ্ছে পূর্ববাংলার মুসলিম জনমানসের আইডেন্টিটি।

লোক-সংস্কৃতি লোকরঞ্জণের অনুপম উৎস। লালনের গান লোকরঞ্জণকারী হিসেবে বহুদিন বেঁচে থাকবে। একে আমাদের আইডেন্টিটির সাথে তুল্য করে তোলা বাহুল্য মাত্র। বিশেষ করে লালনের ধর্মের ফলিত দিকগুলোর মধ্যে যে যৌন বিকারগ্রস্ততা দৃশ্যমান তা একেবারেই অগ্রহণীয়।

বাংলাদেশের জনমানসে লোক-সংস্কৃতির যে জায়গা আছে সেটা সব সময় থাকবে। সেই জায়গায় লালনের স্থান। লোক-সংস্কৃতিকে ইসলামের প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে খাড়া করার চেষ্টা পণ্ডশ্রম, যা আমাদের সেকুলারবাদীদের আরাধ্য। লোক-সংস্কৃতির জায়গায় লোক-সংস্কৃতি থাকবে, ইসলামের জায়গায় ইসলাম।

আজ আমাদের সেকুলারবাদী বুদ্ধিজীবীরা লালনকে নিয়ে হৈচৈ করছেন। কারণ তারা চান আমাদের জাতিসত্তা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে। তারা চান লালনকে দিয়ে পূর্ববাংলার মুসলিম জনমানসে বিপন্নতা তৈরি করতে। এরকম চেষ্টা অতীতেও হয়েছে এবং আমাদের জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির মতো বহু ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ইসলামের স্বাতন্ত্র্য চেতনা সেইসব বিপন্নতাকে বার বার জয় করেছে। আমাদের বিবেচনায় থাকতে হবে বাংলাদেশের মুসলমানদের কারণেই বাংলাদেশের উদ্ভব হয়েছে। তাই পূর্ববাংলার মানুষের জাতিসত্তা ইসলামের ধারার বাইরে খুঁজতে যাওয়া বৃথা।

সূত্রঃ বুকমাস্টার প্রকাশিত “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
image_4521

নজরুল কেন জাতীয় কবি

ফাহমিদ-উর-রহমান | জুলাই ১৪, ২০১৪
Download PDF

একজন কবির সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তার ভাষা। এই ভাষা দিয়েই তিনি তার পাঠককে সচকিত করেন। শিল্পীর পরিচয় যেমন তার গায়কীতে, তেমনি কবির পরিচয় তার ভাষারীতিতে। বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধান কবি মাইকেল মধুসূদন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উভয়েই প্রচলিত ভাষাররীতিকে দুমড়ে মুচড়ে নিজেদের প্রতিভা ও মানসিকতা প্রকাশের উপযোগী ভাষা হিসেবে নির্মাণ করেছিলেন।

এর পরবর্তীতে আবির্ভাব নজরুল ইসলামের। তার কাব্যভাষা নির্মাণের আয়োজনটা আরো অনন্য। অনন্য বলছি এই কারণে যে তিনি শুধু ভাষার নতুন শরীর নির্মাণ করেননি, ভাষার নবনির্মাণের ভিতর দিয়ে তিনি এক ধরনের সামাজিক বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন। একজন কবি শুধু কবিমাত্রই নন, তিনি তার যুগের প্রতিনিধিও। নজরুল তার যুগের প্রতিনিধি হিসেবে তার সামাজিক দায়বদ্ধতার ব্যাপারটি উপেক্ষা করেননি। এর কারণ হচ্ছে নজরুল যে সম্প্রদায়ের ভিতর জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, সে সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও বৈষয়িক পরাজয়ের ক্ষোভকে তিনি হৃদয়ের অন্তঃস্থলে ধারণ করেছিলেন।

ভারতে মোগল রাজশক্তির অবক্ষয় এবং সিপাহী বিদ্রোহের পরাজয়ের ভিতর দিয়ে যখন মুসলিম সমাজের সবরকমের আশা-ভরসাই নিরাশার ধূলিতে ম্রিয়মান হয়ে পড়লো তখন থেকেই তাদের ভিতর এক ধরনের ক্ষুদ্ধ বিবেক কাজ করে চলছিল।

তারপরে আমরা দেখেছি সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহ শক্তি সম্বন্ধে অবগত হওয়ার পরও বাঁশের কেল্লা নিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। নিজের অবশ্যম্ভাবী বিনাশ জেনেও তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন এটুকু জানিয়ে দেয়ার জন্য যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জুলুম ও বেঈনসাফী আমরা মানি না। এ হলো বিদ্রোহের একটি দিক – মুসলিম সমাজের ক্ষুদ্ধ বিবেকের খাড়া হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা মাত্র। বিদ্রোহের এই চরিত্রটি ছিল রাজনৈতিক। বিদ্রোহের একটি ধর্মীয় দিকও ছিল। সেদিকে এগিয়ে এসেছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। তিনি এমন এক আন্তরিক শক্তিতে ডাক দিলেন যে গ্রামের নিম্নবিত্ত চাষী পরিবারগুলো তাদের বিশ্বাসের শক্তি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠলো। এই সচেতনতার সামনে সাম্রাজ্যবাদপোষিত অত্যাচারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাৎক্ষণিকভাবে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। এই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিরোধের বেশ কিছুদিন পর এগিয়ে আসেন কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি এক সাহিত্যিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তখনকার বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ যে বিক্ষোভ-বিদ্রোহের মনোভাব বহন করে চলেছিলেন নজরুল ইসলাম সাহিত্যের ভাষায় তা রূপ দেন। এ কারণে তার বিস্তার ঘটে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়।

আধুনিক বাংলা ভাষা তৈরী হয়েছে ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিতদের হাতে। সেই ভাষা বিকশিত হতে হতে রবীন্দ্রনাথ অবধি এসে এটি প্রমত্তা যৌবনা নদীর আকার নেয়। এতদিনে এই ভাষা সৃজনশীলতার ভার বহন করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু উপমহাদেশের মুক্তির উপযোগী ভাষা কিংবা ঔপনিবেশিক শাসনে জর্জরিত বাঙালি মুসলমান সমাজের বেদনা প্রকাশের উপযোগী এই বাংলা ভাষা ছিল না। উপমহাদেশের মুক্তির জন্য স্বাধীনতা ও মুক্তির ভাষা উচ্চারণকারী কবির নাম হচ্ছে কাজী নজরুল ইসলাম। আধুনিক বাংলা ভাষায় তিনি যেমন প্রথম সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কবি, একই সাথে তিনি মুসলিম রেনেসাঁর কবি। আবার অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও কবি।

ফোর্ট উইলিয়ামী পণ্ডিতদের কল্যাণে বাংলা ভাষার মধ্যে যে রূপান্তর এসেছিল সেই ভাষারীতিতেই তৈরী হয়েছিল ঊনিশ আর বিশ শতকের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যগুলো। কিন্তু সে ভাষারীতিতে অধিকাংশ বাংলাভাষী মুসলমানের সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেনি। সে দায়িত্ব বর্তেছিল নজরুলের উপর। সচরাচর সাহিত্য সমালোচকরা বলে থাকেন নজরুল বাংলা ভাষায় এন্তার বাঙালি মুসলমানের প্রতিদিনের ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দকে ব্যবহার করেছেন। এরকম ব্যবহারতো সত্যেন্দ্রনাথ, মোহিতলালরাও করেছেন। কিন্তু তাদের ব্যবহার ছিল নিছক রুচি পাল্টানোর মতো ব্যাপার। নজরুলের আরবি-ফারসি ব্যবহারের মধ্যে ছিল প্রগাঢ় অঙ্গীকার। তিনি যেসব ইসলামী সংস্কৃতি সংলগ্ন শব্দ ব্যবহার করেছেন মনে হয় এগুলো যেন তার সত্তার গভীর থেকে উঠে এসেছে। একেবারে ভিতর থেকে উঠে না আসলে মাতৃভাষার মতো এসব শব্দগুলো এতো স্বাভাবিকভাবে তার সৃষ্টিতে বিচরণ করতে পারতো না। কাজী নজরুলের মধ্যে কাজ করেছিল একটি ঐতিহাসিক কর্তব্যবোধ। ঐ কর্তব্যবোধের দায় থেকে তিনি তার বিশিষ্ট কাব্যভাষা নির্মাণ করতে গিয়ে তাকে যেমন নিজের প্রবল ভাষাজ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হয়েছে তেমনি দ্বারস্থ হতে হয়েছে অতীতের পুঁথি সাহিত্যের ভাণ্ডারের। নজরুল পুঁথি লেখেননি, পুঁথি সাহিত্যের নবজীবন দান করেছেন।

পলাশীর বিপর্যয়ের পর যখন বাঙালি মুসলমানরা গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হলেন এবং এর অব্যবহিত পর ফোর্ট উইলিয়ামের সাম্প্রদায়িক পণ্ডিতরা যখন বাংলা ভাষা থেকে ‘যবন’ উৎখাতে আত্মনিয়োগ করলেন তখন তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন এই পুঁথির ভাষার মধ্যে। বাংলার শ্রমজীবী, কৃষিজীবী মুসলমান জনগণের জীবন জিজ্ঞাসা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আচরণ, রসপিপাসা এসব পুঁথিসমূহের উপজীব্য বিষয় হয়েছিল। বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক যোগসূত্র হিসেবে এই বিশেষ ভাষাটি সেদিন ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। নজরুল এই ঐতিহাসিকতার পরম্পরাকে অস্বীকার না করে নিজের সৃষ্টির সাথে একে যুক্ত করেছিলেন। নজরুলের আগেও অনেক মুসলিম কবি-সাহিত্যিক এসেছিলেন। তারাও বাংলা ভাষায় নানা গদ্য-পদ্য রচনা করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের পর তারা গ্রহণ করেছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম সৃষ্ট ভাষার প্রকাশভঙ্গিটিকে। ঐ ভাষায় তাদের সৃষ্ট সাহিত্য যথেষ্ট মূল্যবান হওয়া সত্ত্বেও বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির ভাষা এটা ছিল না। তাই এটা বাঙালি মুসলিম চিত্তে আশানুরূপ দোলা দিতে পারেনি। ঊনিশ শতকের সবচেয়ে শক্তিমান মুসলিম কথাশিল্পী মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ পুঁথি সাহিত্য থেকে উপজীব্য গ্রহণ করলেও কলকাতার সেই নগরলালিত ভাষাটিতেই তিনি এটি রচনা করেছিলেন। ‘বিষাদ সিন্ধুর’ অভাবিত জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে মুসলিম সমাজে পুঁথির প্রভাব কতোটা ব্যাপক ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র বিষাদ সিন্ধু পড়ে মন্তব্য করেছিলেনঃ ‘এই লেখকের রচনায় পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ বেশি পাওয়া যায় না।’ এটাই গ্রন্থ রচনার সবচাইতে বড় প্রশংসা বলে সেদিনের মুসলমান লেখকেরা কবুল করে নিয়েছিলেন। কিন্তু কাজী নজরুলের ব্যাপারে ঘটলো অন্যরকম ব্যাপার। তিনি কলকাতাকেন্দ্রিক ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করলেও ঐ ভাষাটিকে তিনি শক্তভাবে মোচড় দিতে পেরেছিলেন। তার রচনায় আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দগুলোর শৈল্পিক ব্যবহার এক অসাধারণ মাত্রা অর্জন করলো, অন্যদিকে গভীর প্রাণোচ্ছ্বাসে বাংলা ভাষা জেগে উঠলো। এটা কেন ঘটেছিল, নজরুল কেন এ সব শব্দের ব্যবহার করেছিলেন তার তিনি কৈফিয়াৎ দিয়েছেন বড়’র পিরীতি বালির বাঁধ প্রবন্ধে। এখানে তিনি লিখেছেন বিশ্বে কাব্যলক্ষীর একটি মুসলমানী ঢং আছে। ঐ মুসলমানী ঢংটা তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন এবং সে কাজে তিনি অভূতপূর্ব সফলতা পেয়েছিলেন। তিনি তার সৃষ্টিতে পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ নিয়ে এসেছিলেন। সেটা তিনি গোপন করতে চাননি। সেটা যদি কারো নাসারন্ধ্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে তাতেও তিনি কুপিত হননি। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সমাজকে, তার আত্নপরিচয়কে তো ফুটিয়ে তুলতে হবে। কলকাতাকেন্দ্রিক পণ্ডিতরা যতোই নাসিকা কুঞ্চন করুন না কেন, বাঙালি মুসলমানের ভাষা বাংলা ভাষারই একটি রূপ এবং এটা এই সমাজের অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতাসমূহকে নিবিড় যত্নের সাথে প্রকাশ করেছে। শেষ পর্যন্ত নজরুলের এই ‘যাবনী মিশাল’ ভাষাভঙ্গিকে পণ্ডিতকুল মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় ঋণ হচ্ছে, নজরুল তাদের হীনমন্যতা ছুড়ে ফেলে তাদের সামাজিক ভাষাকে, সংস্কৃতির ভাষাকে সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। মুসলমান লেখকরা যে ‘যাবনী মিশাল’ ভাষা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতেন, নজরুল তাদেরকে মুক্তি দিয়ে ও বাঙালি মুসলিম পাঠকদের প্রাণের আবেগকে অর্গল মুক্ত করে ঐতিহাসিক কর্তব্য পালন করেছেন।

বাঙালি মুসলিম পাঠকরা নজরুলের লেখায় তাদের প্রাণের স্পন্দন শুনেছিল। ভাষা ও সংস্কৃতির জাগরণের ভিতর দিয়ে একটি জাতির জাগরণ ঘটে। নজরুল বাঙালি মুসলমানের ভাষাকে পুনঃনির্মান করে তাদের জাগরণের পথকে উন্মুক্ত করে দেন ও তাদের আত্মপরিচয়কে শনাক্ত করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম অসংখ্য ইসলামী বিষয় নিয়ে কবিতা, গান লিখেছেন। এটা কোনো উদ্দেশ্যহীন খাপছাড়াভাবে তিনি করেননি। নজরুল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে বাঙালি মুসলমানের ভাষাকে পুনঃনির্মাণ করেছেন। তেমনি যেসব বিষয় মুসলমানদের প্রিয়, যেগুলো নিয়ে তারা গর্ব করতে পারে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভিতর দিয়ে উপস্থাপন না করলে যেসব বিষয় আত্মাকে নাড়া দিতে পারে না, সেসব বিষয় তিনি বাংলা সাহিত্যে উপস্থাপন করলেন। তার রচিত মোহররম, কোরবানী, ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম, উমর ফারুক এসব কারণেই তৈরী হয়েছে। তিনি কুরআনের আংশিক অনুবাদ করেছেন। রাসূলের কাব্য জীবনী লিখেছেন। প্রচুর পরিমাণে ইসলামী গানও তিনি একই উদ্দেশ্যে রচনা করেছেন। হাফিজ, খৈয়াম অনুবাদ করেছেন। শুধু তাই নয় বাংলা সঙ্গীতের জগতে তিনি আরবি-ফারসি সুরের ধারাও নিয়ে এসেছেন। বাঙালি মুসলিম সমাজে যে হীনমন্যতাবোধের শিকড় প্রোথিত হয়েছিল তার মূলে আঘাত করে তিনি তাদের বিপুল প্রাচুর্যময় ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত করে দিয়েছিলেন। তার সাধনার ভিতর দিয়ে বাঙালি মুসলিম সমাজ একটি নতুন দিগন্তের সন্ধান পেয়েছে। বলা চলে আজকে যে বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির আধুনিক রূপটি এটা নজরুলের হাতেই কতকটা তৈরী হয়েছে। বাঙালি মুসলিম সমাজ সংস্কৃতি চিন্তার ক্ষেত্রে নজরুলের মতো আর কারো কাছে এতো ঋণী নয়। এই কারণেই তিনি আমাদের জাতীয় কবি।

প্রখ্যাত সংস্কৃতি বিশ্লেষক আবুল মনসুর আহমদ নজরুলের এই ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা চিন্তা করেই ১৯৪০-এর দশকে বলেছিলেনঃ
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর বিশ্বে কতবার শারদীয়া পূজায় আনন্দময়ী মা এসেছে গিয়েছে, কিন্তু একদিনের তরেও সে বিশ্বের আকাশে ঈদ-মোহাররমের চাঁদ ওঠেনি। সে চাঁদ ওঠাবার ভার ছিল নজরুল ইসলামের উপর। এতে দুঃখ করবার কিছু নাই, কারণ এটা স্বাভাবিক, কাজেই কঠোর সত্য। (বাংলাদেশের কালচার)

যাই হোক নজরুলকে বাঙালি মুসলমানের জাতীয় কবি বললে অনেকে সাম্প্রদায়িকতা ও পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ পেতে পারেন। কিন্তু নজরুলই একমাত্র কবি যিনি হিন্দু-মুসলমানকে এক সাথে হ্যান্ডশেক করাতে চেয়েছিলেন, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলমান ইসলামী সঙ্গীত-শ্যামা সঙ্গীত, হামদ-নাত-গজল, কীর্তন, খালেদ-ভীমকে একসাথে মেলানোর এক রোমাঞ্চকর স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন চারণ কবির মতো উদার। কবিতা লিখতে যেয়ে হিন্দু আর মুসলমান পূরাণ তার কাছে সমান তাৎপর্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। ‘পিনাক পানির ডম্বরু ত্রিশূল ধর্মরাজের দণ্ড’ এরকম একটি পংক্তি যে কোনো মুসলমান কবি দূরে থাক, কোনো হিন্দু কবির পক্ষেও রচনা করা সহজ নয়। শুধু তাই নয়, কবি তার পারিবারিক জীবনেও এই ঐকাত্মের সাধনা করেছিলেন। সুভাষ চন্দ্র বসু তাকে জাতীয় কবি করতে চেয়েছিলেন, তার গান গেয়ে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে যেতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু তারপরেও ইতিহাস কিন্তু নজরুলের মতো এগোয়নি। সুভাষের মতো করেও না। ভারত ভাগ হয়ে গিয়েছে, বাংলা ভাগ হয়ে গিয়েছে। নজরুল জাতীয় কবি হয়েছেন পূর্ববঙ্গের, পশ্চিমবঙ্গের নয়। এটাই ইতিহাসের রায়। এ রায় নিষ্ঠুর হলেও বাস্তব এটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

সূত্রঃ বুকমাস্টার প্রকাশিত “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather