All posts by Admin

1jpg

হুমায়ূন আহমেদের নবীজি ও শেষ দিনগুলোতে মুহিউদ্দীন খানের প্রভাব

সৈয়দ আনোয়ার আব্দুল্লাহ | নভেম্বর ৩, ২০১৭
Download PDF

[কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে ‘বিশ্বাসী হুমায়ূন ও ঐতিহ্য চিন্তা’ নামে দৈনিক ইত্তেফাকে আমার নেয়া একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল আজ থেকে ১১ বছর আগে। এতে হুমায়ূন আহমেদের জীবনের একটি চমৎকার বিশ্বাসী দিক ফুটে উঠেছিল, তার আলোচনার অনেকটা অংশ জুড়ে ছিলো মাসিক মদীনার সম্পাদক মুহিউদ্দীন খান। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি তাঁর মতের একেবারে উল্টো দিকের লোকটিকেও কাছে টেনে নিতে পারতেন। এটা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। আকাশের মতো উদার হৃদয়ের এই মহান মানুষটির কাছে যেই আসতেন তিনি প্রভাবিত না হয়ে পারতেন না। জীবনের শেষ দিনগুলোতে প্রভাবিত হয়েছিলেন নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদও। তাই এখানে তুলে ধরা হলো।]

হুমায়ূন আহমেদের সাথে দেখা আর কথা বলার ইচ্ছেটা ছিল বেশ পুরানো। শ্রদ্ধেয় সম্পাদক রাহাত খান স্যার আমাকে ও সাংবাদিক সাদী ভাইকে নির্দেশ দিলেন হুমায়ূন স্যারের একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য। ফোন করে তাঁর থেকে সময় নিয়ে পরদিন যথা সময় হাজির হই- ধানমন্ডির ৩/অ নম্বর সড়কে, ৪৮ নাম্বার বাসার ৬ষ্ঠ তলা ৬/ঋ নাম্বারের তার ‘দখিনা হাওয়া’য়। এই বাড়িটির মালিক ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিনের দাদা ইসলামি চিন্তাবিদ প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ। মুহিউদ্দীন খানের একান্ত কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। মুহিউদ্দীন খানের সাহিত্যের হাতেখড়ি প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর এই বাড়িতেই। এই বাড়ির অনেক গল্প শুনেছি খান সাহেবের কাছে। তার ‘জীবনের খেলাঘরে’ বইটিতে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর অনেক কথা আছে। আমি ঘরে বসে বাড়িটি সম্পর্কে অনেক কিছু ভাবছিলাম। কিছুক্ষণ পর লুঙ্গি আর ফতুয়া গায়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করলেন নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ। সাইমুম সাদী ভাই স্যারের পূর্ব পরিচিত। তাই বললেন, সাদী, কি প্রয়োজন এসবের? আমার তো মিডিয়ার আড়ালে থাকতেই ভাল লাগে।

এরপর শুরু হলো আড্ডা রূপকথার এই নায়কের সাথে। কথার পিঠে কথা। চলছে রেকর্ডিং। সাক্ষাৎকার শেষ কিন্তু আড্ডাপ্রিয় হুমায়ূন স্যারের কথা বলা যেন শেষ হয় না। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কলম জাদুকর আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। বললেন, পড়ালেখা কোথায়? উত্তর দিলাম মাদরাসায়। জানতে চাইলেন, কওমী না আলীয়া? বললাম কওমী। চমকে উঠে বললেন, কওমীতে পড়ালেখা! পেশা সাংবাদিকতা! লিখ কবিতা! অদ্ভূত মানুষ তো? আপনার হিমুর চেয়েও? হেসে উত্তর দিলেন – কমও নও।

তারপর বললেন, ‘এই শহরে একজন আলেম আছেন। দারুণ লিখতে পারেন। বেশ শক্ত তাঁর কলম। সমীহ করি। বাবার মতো শ্রদ্ধা করি সেই মনীষাকে। বললাম কে তিনি? লেখক সম্রাট বললেন, খান সাহেব। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। মাসিক মদীনার সম্পাদক। তিনি আমার পিতার প্রতিচ্ছবি।

আমার বাবা একাত্তরের শহীদ ফয়জুর রহমান ছিলেন মদীনা পত্রিকার পাঠক। মা’ও মদীনা পড়তেন। প্রতি মাসে ডাক পিয়ন বাসায় মদীনা দিয়ে যেত। কদিন আগে হুজুরকে দেখতে তাঁর অফিসে গিয়েছিলাম মোহনলালের মিষ্টি নিয়ে। পা ছুঁয়ে কদমবুছি করতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আমি কেঁদে দিয়েছিলাম। যেন বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এই সেলফটা দেখছ না, এখানে সবগুলো গ্রন্থ মুহিউদ্দীন খানের লেখা। গুলতেকিন ছিলেন খানের ভক্ত। কারণ তাঁর দাদা প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ’’র ঘনিষ্ট এই একজন মানুষই এই শহরে আছেন। বইমেলায় সবাই আমার বই নিয়ে ব্যস্ত থাকে আর আমি খুঁজি মুহিউদ্দীন খানের লেখা নতুন বই। এই যে তাঁর লেখা ‘কুড়ানো মানিক’ এটা আমার পড়া সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ।

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান

হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন ঐতিহ্য সচেতন ও গভীর অনুসন্ধিৎসু মানুষ। শেকড় আর ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর প্রবল টান ছিল। যদিও জনপ্রিয়তার মোহ তাঁকে বরাবরই উল্টো পথে পরিচালিত করতে উৎসাহিত করেছিল। হুমায়ূন আহমেদ একবার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে মুহিউদ্দীন খানের কাছে গিয়ে বললেন- ‘ইনি তোমাদের দাদু ভাই, আমার পিতা’। হুমায়ূনের এই সম্বোধনের কারণ ছিল তাঁর পিতা শহীদ ফয়েজ উদ্দীন আহমদ ছিলেন মুহিউদ্দীন খানের একান্ত কাছের মানুষ। ‘মাসিক মদীনা’র একনিষ্ঠ ভক্ত পাঠক। তার বাবা চাচাদের কথা খান সাহেবের আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘জীবনের খেলাঘরে’ রয়েছে।

তেমনি হুমায়ূন আহমেদের দাদা শ্বশুর প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর অসংখ্য স্মৃতি এবং হুমায়ূন আহমেদের মামা ফজলুর রহমান, ফুফা সৈয়দ আব্দুস সুলতানের কথাও এসেছে জীবনের খেলাঘরে। ফলে এই বইটার প্রতি কলম জাদুকরের একটু অন্যরকম আকর্ষণ ছিল। আমাদের সাথে গল্প করতে করতে শেলফ থেকে ‘জীবনের খেলাঘরে’ নামিয়ে এনে কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে শোনালেন।

হুমায়ূনের পিতা ফয়েজ উদ্দীন আহমেদ ‘নয়া যামানা’ পত্রিকায় চাকুরী জীবনের শুরুতে মুহিউদ্দীন খানের সাথে কাজ করেছেন। হুমায়ূন নাকি তখন হাফপ্যান্ট পরে বাবার সাথে অফিসে এসেছিলেন। খান সাহেব তাকে কোলে নিতেই বুকের কলমটা টান দিয়ে নিয়ে এসে আঁকতে থাকেন হুমায়ূন আহমেদ। খান সাহেবের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবন্ধের উপর দাগ দিতে দিতে নষ্ট করে ফেলেন সেটি। খান সাহেব কিছু না বলে ছোট্ট খোকার সাহস ও দুষ্টুমি দেখে কেবল হাসছিলেন। হুমায়ূনের বাবার চেহারা লজ্জা আর রাগে লাল হয়ে এলো। ‘কর কি, কর কি? হুজুর আমার ছেলেকে আমার কাছে দেন’ বললেন হুমায়ূনের বাবা।

কবি তালিম হুসেন তখন হাসতে হাসতে বললেন, এই ছেলে এখনি যে কাজ করেছে, বড় হয়ে না জানি কলম দিয়ে কি করে। খানের পকেট থেকে কলম নিয়ে লেখা শুরু করেছে, বাপরে বাপ! এই ঘটনা হুমায়ূন আহমেদ জেনেছেন তাঁর বাবার কাছে। সেদিন এই ঘটনাটি তিনি আমাদের শোনালেন।

হুমায়ূনের শেষ জীবনে ধর্মচিন্তার প্রভাব পড়েছিল। আর তা ছিল মুহিউদ্দীন খানের সাহচর্য লাভের ফল। কলম জাদুকরের শেষ লেখা ছিল ‘নবীজি’। কেন নবীজির সীরাতে নিয়ে উপন্যাস লিখা শুরু করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ? কার প্রভাবে? এজন্য তিনি কি কি গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন? সে এক বিস্ময়কর ঘটনা।

সীরাত বিষয়ক রচনা ‘নবীজি’ লিখতে লিখতে ইহলোক ত্যাগ করেন। হুমায়ূন আহমেদ নবীজির জীবন লিখা শুরু করেই হঠাৎ লেখা বন্ধ করে দিলেন। এই খেয়ালে যে ‘যাকে নিয়ে লিখব, তাকে স্বপ্নে অনেকেই দেখেছেন। আমিও দেখতে চাই’।

এই ছেলেমানুষি আর জেদ নিয়ে সর্বশেষ হাজির হয়েছিলেন, নবীপ্রেমিক, সীরাত সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের কাছে। এটাই শেষ দেখা।

‘নবীজি’ লেখার ব্যাপারে হুমায়ূন আহমেদ একাধিকবার মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মোস্তফা জামান আব্বাসী, অন্যপ্রকাশের মাসুম ভাই ও আমার সাথে আলাপ-আলোচনা করেছেন। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে কোনো এক বিকেলে নুহাশ পল্লীর লীলাবতী দিঘির ঘাটলাতে হাজির হলাম। নবীজি লিখা কবে শেষ করছেন? জানতে চাইলে পুকুরে বরশি ফেলতে ফেলতে তিনি বলেছিলেন, ‘ধুর মিয়া, আগে নবীজিকে দেইখ্যা লই। তারপর ‘নবীজি’ আবার শুরু করব’।

নবীজি লেখার পেছনে মূল ঘটনা হল, প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশ যখন বাংলাবাজারের পূর্বতন বিক্রয়কেন্দ্র পরিবর্তন করে বৃহৎ পরিসরে বর্তমান বিক্রয়কেন্দ্র উদ্বোধনের জন্য হুমায়ূন আহমেদকে অনুরোধ করে, তিনি তাতে সম্মতি দেন। লেখালেখির শুরুর দিকে প্রকাশনাসংক্রান্ত কাজে প্রায়ই বাংলাবাজারে এলেও পরে দীর্ঘদিন আর ওমুখো হননি তিনি। অন্যপ্রকাশের নতুন বিক্রয়কেন্দ্র উদ্বোধন উপলক্ষে বহুদিন পর তিনি বাংলাবাজারে এলেন। যথাসময়ে ফিতা কেটে উদ্বোধন করা হলো বিক্রয়কেন্দ্র। একজন মাওলানা সাহেব হৃদয়াগ্রহী দোয়া করলেন।

তারপর কী ঘটল সেটা হুমায়ূন আহমেদ নিজেই বিভিন্ন পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছেন। সর্বশেষ দৈনিক কালের কন্ঠে’র সাময়িকী ‘শিলালিপি’তে [২১ অক্টোবর, ২০১১] হুমায়ূন আহমেদের নিজের ভাষায়,

 ‘আমি খুবই অবাক হয়ে তাঁর প্রার্থনা শুনলাম। আমার কাছে মনে হলো, এটি বইপত্র সম্পর্কিত খুবই ভালো ও ভাবুক ধরণের প্রার্থনা। একজন মাওলানা এত সুন্দর করে প্রার্থনা করতে পারেন যে আমি একটা ধাক্কার মত খেলাম। মাওলানা সাহেবকে ডেকে বললাম, ‘ভাই, আপনার প্রার্থনাটা শুনে আমার ভালো লেগেছে।’ মাওলানা সাহেব বললেন, আমার জীবনের একটা বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল আপনার সঙ্গে একদিন দেখা হবে। আল্লাহ আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছে।‘

আমি তাঁর কথা শুনে বিস্মিত হলাম।

আমি বললাম, ‘এই আকাঙ্ক্ষাটি ছিল কেন? মাওলানা সাহেব বললেন, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই, কারণ আমি ঠিক করেছি, দেখা হলেই আপনাকে একটা অনুরোধ করব।‘

‘কী অনুরোধ শুনি?’

‘আপনার লেখা এতলোক আগ্রহ নিয়ে পড়ে, আপনি যদি আমাদের নবী-করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীটা লিখতেন, তাহলে বহু লোক লেখাটি আগ্রহ নিয়ে পাঠ করত। আপনি খুব সুন্দর করে তাঁর জীবনী লিখতে পারতেন।‘

মাওলানা সাহেব কথাগুলো এত সুন্দর করে বললেন যে, আমার মাথার ভেতরে একটা ঘোর তৈরি হলো। আমি তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললাম, ‘ভাই, আপনার কথাটা আমার খুবই মনে লেগেছে। আমি নবী-করিমের জীবনী লিখব।‘

‘এই হলো ফার্স্ট পার্ট। চট করে তো জীবনী লেখা যায় না। এটা একটা জটিল ব্যাপার, কাজটা বড় সেনসেটিভ। এতে কোথাও একটু উনিশ-বিশ হতে দেওয়া যাবে না। লিখতে গিয়ে কোথাও যদি আমি ভুল তথ্য দিয়ে দিই, এটি হবে বড় অপরাধ। আমি নবীজির সীরাত পড়তে শুরু করি। মদীনা পাবলিকেশন্স থেকে খান সাহেব হুজুরের লিখা সব সীরাত গ্রন্থ সংগ্রহ করলাম। তাঁর পরামর্শ নিয়ে কাজ শুরু করি। আমার জানামতে এদেশে নবীজির জীবনী মুহিউদ্দীন খানই সবচেয়ে ভালো জানেন। এনিয়ে তিনি ব্যাপক কাজ করেছেন।

আমি অন্যদিন-এর মাসুমকে বললাম, ‘তুমি একটা সুন্দর কাভার তৈরি করে দাও তো। কাভারটা চোখের সামনে থাকুক। তাহলে আমার শুরু করার আগ্রহটা বাড়বে।‘ মাসুম খুব চমৎকার একটা কাভার তৈরি করে দিল।বইটার নামও দিলাম ‘নবীজি’।

অল্প কয়েক লাইন লেখার পরেই একটা ছেলেমানুষি ঢুকে গেল মাথার মধ্যে। ছেলেমানুষিটা হলো, আমি শুনেছি বহু লোক নাকি আমাদের নবীজিকে স্বপ্নে দেখেছেন। কিন্তু আমি তো কখনো তাকে দেখি নি। আমি ঠিক করলাম, যেদিন নবীজিকে স্বপ্নে দেখব, তার পরদিন থেকে লেখাটা শুরু করব। স্বপ্নে এখন পর্যন্ত তাকে দেখি নি। যেহেতু এক ধরণের ছেলেমানুষি প্রতিজ্ঞার ভেতর আছি, সে কারণে লেখাটা শুরু করতে পারি নি। ব্যাপারটা হাস্যকর। তবু আমি স্বপ্নের অপেক্ষায় আছি।‘

অতঃপর নবীজিকে দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মুহিউদ্দীন খানের কাছে ফের হাজির হন। খান সাহেব তাঁকে নিজের লেখা জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘স্বপ্নযোগে রাসূল সা.’ পড়তে দিলেন। হুমায়ূন বইটি হাতে নিয়ে আবেগী হয়ে উঠেন। বাসায় এসে বারবার পড়তে থাকেন। এই মুহূর্তে তাঁর শরীরে ধরা পড়ে মরণব্যাধি ক্যান্সার। তিনি চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় চলে যান। যাবার সময় নিজের পছন্দের তিনটি জিনিস শাওনের হাতে দিলেন। ‘এগুলো ব্যাগে ভরে রেখ।‘ কি ছিল সেই জিনিসগুলো? সাথে নিয়েছিলেন একটিমাত্র গ্রন্থ। কোন সে বই…? হ্যাঁ, বলছি।

যাবার আগের রাতে তিনি শাওনকে বললেন, ‘আমার জায়নামাজ, তাসবিহ আর মুহিউদ্দীন খানের ‘স্বপ্নযোগে রাসূল সা.’ গ্রন্থটি লেদারে ভরে রেখ।‘ আমেরিকায় গিয়ে এই একটি মাত্র গ্রন্থ তাঁর প্রিয় সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। মুহিউদ্দীন খানের সীরাত চর্চা, সীরাতপ্রেম জীবন সায়াহ্নে এসে তাঁর প্রিয় হয়ে উঠেছিল।

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এসময় নিউইয়র্কে চিকিৎসা করাতে এসে নিয়মিত নামাজ পড়তেন। হুমায়ূন আহমেদকে নামাজ পড়ায় উৎসাহিত করেন তার ভায়রা [গুলতেকিনের ফুপাতো বোনের স্বামী] জামাল আবেদীন খোকা। জামাল আবেদীন হুমায়ূন আহমেদকে নামাজ পড়া দেখে একটি নতুন জায়নামাজ এবং তসবিহ উপহার দিয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকে তিনি নানান দোয়া দরুদ শিখে নিয়েছিলেন তখন। অধিকাংশ সময় নামাজ শেষে জায়নামাজে ধ্যান করে একাকী দীর্ঘ সময় বসে থাকতেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীনাবস্থায় হুমায়ূন নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। একদিন বললেন, ‘আমি একটি জিনিসের অপেক্ষায় আছি।‘ সেই ইচ্ছেটা পূরণ হলে লিখতে বসব। তুমি আমার জন্য কাগজ কলম এনে রেখ। জীবনের শেষ লেখাটা শুরু করতে হবে হয়তো।‘ এ কথা মৃত্যুর পর বিভিন্ন মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন জামাল আবেদীন।

নিজের উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মতোই রহস্য রেখে গেলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। মৃত্যুর আগে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কালজয়ী বাংলা সাহিত্য রচনা করতে চান তিনি। শেষ একটা লেখা তার মাথায় আছে। সেটা লিখে তিনি মরতে চান। বলেছিলেন- কি লিখবেন তা তাঁর মাথায় আছে। কিন্তু তিনি বলবেন না। সেটা লিখার জন্য অনেক বেশি সাধনা আর চর্চা করতে হয়। মৃত্যুর কয়েকমাস আগে তার ওই সাক্ষাৎকারটি নেন বিবিসি’র অর্চি অতন্দ্রিলা। আমরা সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরছি।

Nobiji

বিবিসঃ আচ্ছা, আপনি লেখালেখি থেকে অবসর নেয়ার কথা কখনও ভেবেছেন কী?

হুমায়ূন আহমেদঃ যখন খুব লেখালেখির চাপ যায়, যেমন ধরো বইমেলার সামনে বা ঈদ সংখ্যার সামনে। যখন খুব চাপের ভেতর থাকি তখন দেখা যায়। [লেখাটা যখন] শেষ হয় সেদিন মনে হয় এখন থেকে আমি অবসরে। আর লেখালেখি নাই। বাকী সময়টা আরামে থাকবো। সিনেমা দেখবো। গল্পের বই পড়বো। সেদিন মনে হয় এটা। তারপরের দিন মনে হয় না। দ্বিতীয় দিন থেকে আমার মনে হয় আমার যেন কিছুই করার নেই। আমি মারা যাচ্ছি। এক্ষুণি কিছু একটা লেখা শুরু করতে হবে। লেখা শুরু করি। তখন একটা স্বস্তি ফিরে আসে। হ্যাঁ, আমি অবসর নেবো। ঠিক করেছি মৃত্যুর ঘন্টাখানেক আগে আমি অবসর নেবো। তার আগে নেবো না। আমি চাই মৃত্যুর এক ঘন্টা বা দু’ঘন্টা আগেও আমি যেন এক লাইন বাংলাগদ্য লিখে যেতে পারি।

বিবিসিঃ এটা যে মৃত্যুর সময় আপনি কিভাবে বুঝতে পারবেন?

হুমায়ূন আহমেদঃ বোঝা যায় তো, বোঝা যায় না! অনেকে তো বলে দেয়। টের পায় আমি মারা যাচ্ছি। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। শেষ নিঃশ্বাস ফেলার জন্য শারীরিক প্রস্তুতি। মৃত্যু তো শুধু হার্ট বন্ধ হয়ে যায় তা না। প্রতিটি কোষই মারা যায়। সেই প্রতিটি কোষের মৃত্যু একটা ভয়াবহ ব্যাপার। এটা বুঝতে পারার তো কথা। [তিনি গুনগুনিয়ে গাইলেন] মরিলে কান্দিস না আমার দায়, শিয়রে বসিয়া সুরায়ে এয়াসিন পড়িও…খাছায়।

বিবিসিঃ তো আপনি শেষ পর্যন্ত লেখালেখি চালিয়ে যেতে চান?

হুমায়ূন আহমেদঃ আমি পারবো কিনা জানি না। আমার গোপন ইচ্ছা এবং প্রগাঢ় ইচ্ছা হচ্ছে- মৃত্যুর এক-দু’ঘন্টা আগেও বাংলাগদ্য লিখতে পারি, যেন হা-হুতাশ করে না মরি। আল্লাহকে স্মরণ করে মরতে পারি। আমি সেই গদ্যটি লিখার জন্য অনেক সাধনা ও স্ট্যাডি করছি।‘

নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদের সেই শেষ বাংলা গদ্যটি ছিল ‘নবীজি’। আমার কাছে মনে হয় তিনি হয়তো ভাবতেন, ‘নবীজি’ লেখার মতো যোগ্যতা তাঁর নেই। কিন্তু তিনি এক মাওলানা আর তাঁর পিতাতুল্য মুহিউদ্দীন খানের কাছে ওয়াদা করেছিলেন ‘নবীজি’ লেখার। রহস্যপুরুষ হুমায়ূন শেষ পর্যন্ত একটি গভীর প্রেমের রহস্যে ডুব দিয়েছিলেন। তা হলো নবীজি স্বপ্নে দেখার প্রবল ইচ্ছে জেগেছিল তাঁর ভেতরে। মৃত্যুর আগে যতোটা না ‘নবীজি’ শেষ করার ইচ্ছে ছিল, তার চেয়েও বেশি ইচ্ছে ছিল নবীজি লিখতে লিখতে যেন তাঁর মৃত্যু হয়। মনে হয় তাঁর সেই ইচ্ছে পুরো করেছিলেন মহান প্রভু।

নিচের এই অংশটি লিখে তিনি নবীজি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। নবীজিকে স্বপ্নে দেখে বাকিটুকো লেখার ইচ্ছে নিয়ে। স্বপ্নে দেখার ইচ্ছের আগের অংশটুকু হলো-

‘আরব পেনিনসুয়েলা। বিশাল মরুভূমি। যেন আফ্রিকার সাহারা। পশ্চিমে লোহিত সাগর, উত্তরে ভারত মহাসাগর, পূর্বে পার্শিয়ান গালফ। দক্ষিণে প্যালেস্টাইন এবং সিরিয়ার নগ্ন পর্বতমালা। সমস্ত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটি অঞ্চল। এখানে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা বলে কিছু নেই। সারা বৎসরই মরুর আবহাওয়া। দিনে সূর্যের প্রখর উত্তাপ সব জ্বালিয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। সারা দিন ধরে বইছে মরুর শুষ্ক হাওয়া। হাওয়ার সঙ্গে উড়ে আসছে তীক্ষ্ণ বালুকণা। কোথাও সবুজের চিহ্ন নেই। পানি নেই। তারপরেও দক্ষিণের পর্বতমালায় বৃষ্টির কিছু পানি কীভাবে যেন চলে আসে মরুভূমিতে। হঠাৎ খানিকটা সবুজ অঞ্চল হয়ে ওঠে। বালি খুঁড়লে কাদা মেশানো পানি পাওয়া যায়। তৃষ্ণার্ত বেদুঈনের দল ছুটে যায় সেখানে। তাদের উটগুলির চোখ চকচক করে ওঠে। তারা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কাঁটাভর্তি গুল্ম চিবায়। তাদের ঠোঁট কেটে রক্ত পড়তে থাকে। তারা নির্বিকার। মরুর জীবন তাদের কাছেও কঠিন। অতি দ্রুত পানি শেষ হয়। কাঁটাভর্তি গুল্ম শেষ হয়।

বেদুঈনের দলকেও আবারো পানির সন্ধানে বের হতে হয়। তাদের থেমে থাকার উপায় নেই। সব সময় চলতে হবে। এর মাঝেই যুদ্ধ। এক গোত্রের সঙ্গে আরেক গোত্রের হামলা। পবিত্র কোরান শরীফে সূরা তাকবীরে জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যা বিষয়ে আয়াত নাজেল হলো। কেয়ামতের বর্ণনা দিতে দিতে পরম করুণাময় বললেন-

‘সূর্য যখন তার প্রভা হারাবে, যখন নক্ষত্র খসে পড়বে, পর্বতমালা অপসারিত হবে। যখন পূর্ণগর্ভা উষ্ঠী উৎক্ষেপিত হবে, যখন বন্যপশুরা একত্রিত হবে, যখন সমুদ্র স্ফীত হবে, দেহে আত্মা পুনঃসংযোজিত হবে, তখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে- কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’

যে মহামানব করুণাময়ের এই বাণী আমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন, আমি এক অকৃতী তাঁর জীবনী আপনাদের জন্য লেখার বাসনা করেছি। সব মানুষের পিতৃঋণ-মাতৃঋণ থাকে। নবীজির কাছেও আমাদের ঋণ আছে। সেই বিপুল ঋণ শোধের অতি অক্ষম চেষ্টা।

ভুলভ্রান্তি যদি কিছু করে ফেলি তাঁর জন্য ক্ষমা চাচ্ছি পরম করুণাময়ের কাছে। তিনি তো ক্ষমা করার জন্যই আছেন। ক্ষমা প্রার্থনা করছি নবীজির কাছেও। তাঁর কাছেও আছে ক্ষমার অথৈ সাগর।

একরাতে হুমায়ূন আহমেদ ঘুম থেকে উঠে অযু করে নামাজ পড়লেন। তারপর গোসল করে লিখতে বসলেন। সে রাতে কি ঘটেছিল, কি লিখেছিলেন সেটা লিখেছেন তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন।

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তাঁর অপ্রকাশিত কিছু রচনা নিয়ে ‘লীলাবতীর মৃত্যু’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেই গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। ভূমিকাতে হুমায়ূন আহমেদের শেষ কাজ হিসাবে গ্রন্থটির প্রধান আকর্ষণ উল্লেখ করেছেন নবীজিকে। তিনি সেখানে নবীজি লিখার ঘটনা প্রবাহ চিত্রায়িত করেছেন।

এছাড়া গ্রন্থটি প্রকাশের পর তিনি মিডিয়াকে বলেছেন। হুমায়ূন আহমেদ ‘নবীজি’ কিছু লেখার পর নবীজিকে স্বপ্নে দেখার ইচ্ছায় লেখাটি বন্ধ করে দেন। আমেরিকাতে চিকিৎসাধীন এক রাতে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে ‘নবীজি’ লেখা ফের শুরু করেন। এটি লিখাবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এটাই হুমায়ূন সাহিত্যের শেষ কাজ। হুমায়ূন নবীজিকে সে রাতে সম্ভবত স্বপ্নযোগে দেখেছিলেন। না হয় নবীজি ফের শুরু করার কথা নয়। কিন্তু রহস্যমানব নবীজিকে দেখেছেন কি না এটা কাউকে বলে যান নি।

নিচে পাঠকের জন্য নবীজির অসমাপ্ত অংশ তুলে ধরা হল-

‘ তখন মধ্যাহ্ন।

আকাশে গনগনে সূর্য। পায়ের নিচে বালি তেতে আছে। ঘাসের তৈরি ভারী স্যান্ডেল ভেদ করে উত্তাপ পায়ে লাগছে। তাঁবুর ভেতর থেকে বের হওয়ার জন্য সময়টা ভালো না। আউজ তাঁবু থেকে বের হয়েছে। তাকে অস্থির লাগছে। তার ডান হাতে চারটা খেজুর। সে খেজুর হাত বদল করছে। কখনো ডান হাতে কখনও বাম হাতে।

আউজ মনের অস্থিরতা কমানোর জন্যে দেবতা হাবলকে স্মরণ করল। হাবল কা’বা শরিফে রাখা এক দেবতা যার চেহারা মানুষের মতো। একটা হাত ভেঙ্গে গিয়েছিল বলে কা’বা ঘরের রক্ষক কোরেশরা সেই হাত সোনা দিয়ে বানিয়ে দিয়েছে। দেবতা হাবলের কথা মনে হলেই সোনার তৈরি হাত চোখে চকচক করে।

দেবতা হাবলকে স্মরণ করায় তার লাভ হলো। মনের অস্থিরতা কিছুটা কমল। সে ডাকল, শামা শামা। তাঁবুর ভেতর থেকে শামা বের হয়ে এল। শামা আউজের একমাত্র কন্যা। বয়স ছয়। তার মুখ গোলাকার। চুল তামাটে। মেয়েটি তার বাবাকে অসম্ভব পছন্দ করে। বাবা একবার তার নাম ধরে ডাকলেই সে ঝাঁপ দিয়ে এসে তার বাবার গায়ে পড়বে।

শামার মা অনেক বকাঝকা করেও মেয়ের এ অভ্যাস দূর করতে পারেন নি। আজও নিয়মের ব্যতিক্রম হলো না। শামা এসে ঝাঁপ দিয়ে বাবার গায়ে পড়ল। সে হাঁটতে পারছে না। তার বাঁ পায়ে খেজুরের কাঁটা ফুটেছে। পা ফুলে আছে। রাতে সামান্য জ্বরও এসেছে।

শামা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাবার কাছে আসতেই তার বাবা এক হাত বাড়িয়ে তাকে ধরল। এক হাতে বিচিত্র ভঙ্গিতে শূন্যে ঝুলিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল। শামা খিলখিল করে হাসছে। তার বাবা যেভাবে তাকে কোলে তোলেন অন্য কোনো বাবা তা পারে না।

আউজ বলল, মা খেজুর খাও।

শামা একটা খেজুর মুখে নিল। সাধারণ খেজুর এটা না। যেমন মিষ্টি স্বাদ তেমনই গন্ধ। এই খেজুরের নাম মরিয়ম।

আউজ মেয়েকে ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। রওনা হয়েছে উত্তর দিকে। শামার খুব মজা লাগছে। কাজকর্ম না থাকলে বাবা তাকে ঘাড়ে নিয়ে বেড়াতে বের হন। তবে এমন কড়া রোদে বেড়াতে কখনও না। আউজ বলল, রোদে কষ্ট হচ্ছেরে মা?

শামা বলল, না।

তার কষ্ট হচ্ছিল। সে না বলল শুধু বাবাকে খুশি করার জন্যে।

বাবা!

হুঁ।

আমরা কোথায় যাচ্ছি?

তোমাকে অদ্ভূত একটা জিনিস দেখাব।

সেটা কী?

আগে বললে তো মজা থাকবে না।

তাও ঠিক। বাবা, অদ্ভূত জিনিসটা শুধু আমি একা দেখব? আমার মা দেখবে না?

বড়রা এই জিনিস দেখে মজা পায় না।

আউজ ঘাড় থেকে নামাল। সে সামান্য ক্লান্ত। তার কাছে আজ শামাকে অন্যদিনের চেয়েও ভারী লাগছে। পিতা এবং কন্যা একটা গর্তের পাশে এসে দাঁড়াল। কূয়ার মতো গর্ত, তবে তত গভীর না।

আউজ বলল, অদ্ভূত জিনিসটা এই গর্তের ভেতর আছে। দেখো ভালো করে। শামা আগ্রহ এবং উত্তেজিত হয়ে দেখছে। আউজ মেয়ের পিঠে হাত রাখল।

তার ইচ্ছা করছে না মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলতে। কিন্তু তাকে ফেলতে হবে। তাদের গোত্র বনি হাকসা আরবের অতি উচ্চ গোত্রের একটি। এই গোত্র মেয়ে শিশু রাখে না। তাদের গোত্রের মেয়েদের অন্য গোত্রের পুরুষ বিবাহ করবে? এত অসম্মান?

ছোট্ট শামা বলল, বাবা, কিছুতো দেখি না।

আউজ চোখ বন্ধ করে দেবতা হাবলের কাছে মানসিক শক্তির প্রার্থনা করে শামার পিঠে ধাক্কা দিল।

মেয়েটি ‘বাবা’ ‘বাবা’ করে চিৎকার করছে। তার চিৎকারের শব্দ মাথার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। আউজকে দ্রুত কাজ সারতে হবে। গর্তে বালি ফেলতে হবে। দেরি করা যাবে না। এক মুহূর্ত দেরি করা যাবে না। শামা ছোট্ট হাত বাড়িয়ে ভীত গলায় বলছে, বাবা, ভয় পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি।

আউজ পা দিয়ে বালির একটা স্তুপ ফেলল। শামা আতঙ্কিত গলায় ডাকল, মা! মাগো!

তখন আউজ মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, উঠে এসো।

আউজ মাথা নিচু করে তাঁবুর দিকে ফিরে চলেছে। তার মাথায় পা ঝুলিয়ে আতঙ্কিত মুখ করে ছোট্ট শামা বসে আছে। আউজ জানে সে মস্ত বড় ভুল করেছে। গোত্রের নিয়ম ভঙ্গ করেছে। তাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। তাকে অবশ্যই গোত্র থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। এই অকরুণ মরুভূমিতে সে শুধুমাত্র তার স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে বাঁচতে পারবে না। জীবনসংগ্রামে টিকে থাকতে হলে তাকে গোত্রের সাহায্য নিতেই হবে। গোত্র টিকে থাকলে সে টিকবে।

বেঁচে থাকার সংগ্রামের জন্যে গোত্রকে সাহায্য করতেই হবে। গোত্র বড় করতে হবে। পুরুষশিশুরা গোত্রকে বড় করবে। একসময় যুদ্ধ করবে। মেয়েশিশুরা কিছুই করবে না। গোত্রের জন্যে অসম্মান নিয়ে আসবে। তাদের নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে যাওয়াও কষ্টকর। আউজ আবার গর্তের দিকে ফিরে যাচ্ছে। ছোট্ট শামা ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। মরুভূমিতে দিকচিহ্ন বলে কিছু নেই। সবই এক। আজ থেকে সতেরো শ’ বছর আগে।

সূত্রঃ ত্রৈমাসিক হেরার জ্যোতি, ৪র্থ বর্ষ, ৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী, ২০১৭। মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. এর স্মরণে বিশেষ সংখ্যা।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
WARREN-3-Maydan-Image-1-595x300

মুসলিম ব্রাদারহুড ও কাতারের সম্পর্কঃ শাইখ ইউসুফ আল-ক্বারাদাওয়ীর প্রভাব

ডেভিড ওয়ারেন | অক্টোবর ১৩, ২০১৭
Download PDF

কাতারের উপর প্রতিবেশী রাষ্ট্র সৌদি আরবের নেতৃত্বে সংযুক্ত আরব আমিরাত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার ফলে যে সংকট তৈরী হয়েছে তা নিরসনের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যারা উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতির সাথে পরিচিত, তারা কাতার বিরোধী অঞ্চলগুলোর ঘোষিত বর্তমান সঙ্কটের কারণগুলোর ব্যাপারেও হয়ত অবগত থাকবেন: ইরানের সাথে কাতারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, তাদের জনপ্রিয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল জাজিরা এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি দেশটির সমর্থন। বস্তুত, সৌদি আরব ও এর মিত্ররা কাতারের প্রতি ১৩টি দাবির যে তালিকা প্রকাশ করেছে তার সময়সীমা সোমবার ৩ জুলাইয়ে শেষ হয়ে যাবে, যা ভবিষ্যতে সংকটটির আরো গুরতর আকার ধারণ করারই ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর দাবিগুলো কাতার মেনে নিলে এটি কার্যকরভাবে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

৫ জুনে সৃষ্ট এই সঙ্কটের প্রাক্কালেই বিশ্লেষকরা কাতার ও এর প্রতিবেশী গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) পররাষ্ট্র নীতির পার্থক্যের উপর জোর দিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কাতার ইরানের সাথে তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায়ে রেখে এসেছে, এবং তারা যৌথভাবে বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রগুলি নিয়ে কাজ করছে। কাতারের নিউজ নেটওয়ার্ক আল-জাজিরা ২০১১ সালের গণজাগরণকে উৎসাহিত করেছিল, যেখানে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সেই বিপ্লবের বিরোধি ধারার নেপথ্যে ছিল। এই নানানধর্মী নীতিগুলোর মধ্যে পার্থক্য আরো ব্যাপকভাবে পরিষ্কার হয় মিশরের ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩ জুলাই ২০১৩ তে সংঘটিত ক্যু এর শক্তিশালী সমর্থক ছিল, যে ক্যু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে আর অন্যদিকে কাতার মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি তার সমর্থন অব্যহত রেখেছে।

মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি কাতারের সমর্থনের ব্যাখ্যা: ক্বারাদাওয়ী ফ্যাক্টর

শেষ এই বিষয়টিই আমি এখানে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব। কাতারের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি এবং মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, গাজা (হামাসের মাধ্যমে) এবং লিবিয়া ও সিরিয়ায় ব্রাদারহুড সংশ্লিষ্ট মিলিশিয়াদের প্রতি রাষ্ট্রটির সমর্থনের উপর জোর আরোপ করা হলেও এত চড়া মূল্য দিয়ে কাতার কেন এই নীতি অনুসরণ করে যাচ্ছে সে ব্যাপারটি আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অনেকেই এই সমর্থনগুলোকে অবশ্যম্ভাবী ধরে নেন কিংবা গতানুগতিক রাজনীতি বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের পেশীশক্তি প্রদর্শনের রাজনীতির অংশ হিসেবে ধরে নেন। প্রকৃতপক্ষে, সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি কাতারের সমর্থন এই ধারণার বিপরীত। কারণ গণতন্ত্রের প্রতি ব্রাদারহুডের সমর্থন কাতারের রাজতন্ত্র ব্যবস্থার বিপরীত, এমনকি তার জন্য সম্ভাব্য হুমকিস্বরূপ বললেও ভুল হবে না। উপরন্তু, ওয়াহাবিজম সংশ্লিষ্ট বহু রক্ষণশীল মূল্যবোধের বিষয়ে কাতারের সাথে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামঞ্জস্যতা রয়েছে, যা আবারও মুসলিম ব্রাদারহুডের মত একটি সামাজিক আন্দোলনের প্রতি এই দেশের সমর্থনকে অনাকাঙ্খিত প্রমাণ করে।

আমার প্রস্তাবনা হল মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি কাতারের সমর্থনের পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং তা শুরু হয়েছে সেদেশে শাইখ ইউসুফ আল-ক্বারাদাওয়ী আগমনের সময়। ক্বারাদাওয়ী আরব বিশ্বজুড়ে একটি পরিচিত নাম এবং তিনি এ অঞ্চলের সবচেয়ে স্বীকৃত ‘আলেম।

তিনি ১৯২৬ সালে মিশরে জন্মগ্রহণ করেন এবং হাসান আল-বান্নার আদর্শ তাঁকে আকৃষ্ট করে। সেই উলামাদের মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন যারা মিশরের বিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-আজহারে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন পদগ্রহণের বদলে মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ক্বারাদাওয়ীকে দুইবার ব্রাদারহুডের মুর্শিদে ‘আমের পদ দেয়া হয়, দুইবারই তিনি তা নিতে অস্বীকার করেন। কিন্তু তিনি বহুদিন ধরেই আন্দোলনের জন্য একজন রুহানী দিকনির্দেশক বা শিক্ষক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। কাতারের সমাজ ও স্থানীয় ধর্মীয় দৃশ্যেপটের উপর ক্বারাদাওয়ীর প্রভাব এটাই নির্দেশ করে যে ব্রাদারহুডের জন্য কাতারের বৃহত্তর সমর্থন কেবল ক্ষমতার রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় নয় বরং এটি ব্যক্তিগত এবং সামাজিক।

গামাল আবদুল নাসেরের শাসনকালে ব্রাদারহুড আন্দোলনকে দমনের যে চেষ্টা করা হয় সে সময়ে ১৯৬১ সালে ক্বারাদাওয়ী মিশর ছেড়ে নির্বাসনে যান। ব্রাদারহুডের সাথে সংশ্লিষ্ট তার অনেক সহযোদ্ধা উলামা যখন একই সময়ে দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে আশ্রয় গ্রহণ করেন যেখানে বাদশা ফয়সাল (মৃত্যু ১৯৭৫) নাসের সমর্থিত ও প্রচারিত আরব সমাজতন্ত্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘ইসলামিক সলিডারিটি ক্যাম্পেইন’ বা ইসলামী ঐক্যের প্রচারের অংশ হিসেবে ব্রাদারহুডের উলামাদের স্বাগত জানাচ্ছিলেন)। অন্যদিকে ক্বারাদাওয়ীকে পাঠানো হয় কাতারে। [১]

এটি ছিল তাঁর প্রথম বিমানভ্রমণ। সেই সময়ে, কাতার ছিল সবকিছু থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন এবং ব্রিটিশরা তখনও এর নিয়ন্ত্রনে ছিল। প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রগুলি আবিষ্কারের ফলে মাথাপিছু আয় বিবেচনায় কাতারের বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ হয়ে উঠাও তখনো বহুদুরের কথা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাতারে প্রকৃত অর্থে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় উলামাদের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান বলতে কিছু ছিলনা। হামিদ এ. হামিদ তার পিএইচডি গবেষণায় কাতারের ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর পর্যালোচনা করেছিলেন। তিনি তার থিসিসে কাতারি ইমামদের গুণমানের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন: “কাতারের দ্বা’য়ী বা প্রচারকরা তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালন করার যোগ্য নন। বেশিরভাগের যোগ্যতা কেবল ন্যুনতম পড়তে ও লিখতে পারা, ফলে তারা কাতার সমাজের সমস্যা মোকাবিলা বা সমাধানে সক্ষম নন। শুক্রবারের জুমার খুতবার জন্য তারা বছরের প্রতি সপ্তাহের জন্য একটি করে মোট ৫২টি খুতবা সম্বলিত একটি পুরাতন বইয়ের উপর নির্ভরশীল ছিল”। [২] ক্বারাদাউয়ি, যিনি ছিলেন ঐ সময়ের একজন সম্মানিত ফকীহ্‌, তাঁর স্মৃতিকথায় স্মরণ করেন যে, সেই পরিস্থিতিটি মোকাবেলা করার জন্য তাকে সেই দেশে যেন ধার হিসেবে পাঠানো হয়।

সৌদী আরব ও ঐ অঞ্চলের অন্যান্য দেশে ব্রাদারহুডের যে উলামাগণ নির্বাসনে গিয়েছিলেন তাদেরকে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় উচ্চপর্যায়ের উলামাগণের সাথে অবস্থান ভাগাভাগি করে নিতে হচ্ছিল। অন্যদিকে কাতার যেন ছিল একটি অলিখিত স্লেট, যেখানে ক্বারাদাওয়ী যেভাবে উপযুক্ত বুঝেছেন সেভাবেই প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কারিকুলাম তৈরী করতে পারছিলেন। তাঁর আগমনের পরপরই তিনি কাতার শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের প্রথম ইসলামী শিক্ষা ইনস্টিটিউটের (মা‌হাদ দ্বীনি) ডাইরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রতিষ্ঠানটিকে মাত্র এক বছর আগে গড়ে তোলা হয়েছিল এবং তখন তা নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ক্বারাদাওয়ী ও অন্যান্যরা মিশরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তা কাতারে বাস্তবায়ন করার জন্য সেখানকার ধর্মীয়-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব যুবক ক্বারাদাওয়ীর জন্য এক অনন্য সুযোগ হিসেবে আসে।

তাঁর আত্মজীবনীতে ক্বারাদাওয়ী স্মরণ করেছেন তিনি কিভাবে শিক্ষাসূচী নতুন আঙ্গিকে প্রণয়ন করেছিলেন, ইসলামী আইন এবং ইসলামী ভাষার অলংকারশাস্ত্র, ব্যাকরণ বা গঠনতন্ত্রের উপর একচ্ছত্র মনোযোগ সরিয়ে তিনি সেখানে বিদেশী ভাষা, বিজ্ঞান ও গণিতের উপর জোর আরোপ করেন। এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ক্বারাদাওয়ী তার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিকূলতার মুখোমুখী হন, কিন্তু তিনি অবিচল থাকেন এবং এর স্বপক্ষে যুক্তি দেন যে আধুনিক সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য ভবিষ্যত উলামাদের যথাযথভাবে তৈরী করতে এই পরিবর্তনগুলো প্রয়োজনীয়। ক্বারাদাওয়ী মনে করেন যে এই বিষয়গুলো অধ্যয়ন করলে তা ছাত্রদেরকে “সামাজিক বাস্তবতার গভীর ও সত্যিকার উপলব্ধি” প্রদান করবে যা উলামা, ইমাম ও নেতা হিসেবে কাতারের গণজীবনের সমস্যার সাথে সম্পৃক্ত হতে সাহায্য করবে। [৩]

ক্বারাদাওয়ী যে পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়ন করছিলেন তা তৎকালীন আমীর আহমাদ বিন ‘আলী আল সানীর (মৃত্যু ১৯৭৭, বর্তমান আমীরের পিতামহের চাচাত ভাই) মনোযোগ আকর্ষণ করে। ক্বারাদাওয়ী আমীরের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তুলেন এবং রমজান মাসে তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে আমীর ক্বারাদাওয়ীকে কাতারি নাগরিকত্ব প্রদান করেন। কাতারের রাজপরিবার ক্বারাদাওয়ীর একজন প্রধান সমর্থক হয়ে ওঠে এবং পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এমনকি জাপান, দক্ষিন কোরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্রাদারহুড সংশ্লিষ্ট তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলো পরিদর্শনের জন্য ক্বারাদাওয়ীকে অনুদানও প্রদান করে।

ক্বারাদাওয়ী এবং কাতারে নতুন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ

১৯৭৭ সালে ক্বারাদাওয়ী আরেকটি ইসলামী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, সেটি হলো কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া অনুষদ, যেখানে তিনি ডীন নিযুক্ত হন। এই প্রতিষ্ঠানসহ দুটি কেন্দ্র থেকেই কাতারের ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ ক্বারাদাওয়ীর প্রকল্পের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এই স্নাতকদের কিছু অংশের প্রভাব এবং অবদান বেশ গুরত্বপূর্ণ ছিল।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মরিয়ম আল-হাজারি যিনি শরিয়া অনুষদে ক্বারাদাওয়ীর ছাত্রী ছিলেন। স্নাতক শেষে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ফতোয়ার ওয়েবসাইট IslamOnline.net প্রতিষ্ঠা করেন। [৪] জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার সময়ে, IslamOnline.net ওয়েবসাইটটি আরবী ভাষায় সবচেয়ে বেশী সার্চ করা ওয়েবসাইটে পরিণত হয়। ক্বারাদাওয়ীর অধীনে পড়াশোনার করার সময়ের কথা স্মরণে হাজারির বক্তব্য ইঙ্গিত করে যে, কাতারিদের মধ্যে ব্রাদারহুডের প্রতি সমর্থনের কারণ ছিল ইসলামের ব্যাপারে জন্য ব্রাদারহুডের লক্ষ্যভিত্তিক সক্রিয়তা, যেখানে ইসলামী আইনকে দৈনন্দিন জীবনের প্রাসঙ্গিক করার পাশাপাশি ইসলামী আইনের নৈতিক ভিত্তির উপর জোর দেয়া হয়েছে। হাজারী স্মরণ করেন ক্বারাদাওয়ীর সাথে যাকাত বিষয়ে অধ্যায়ন করার কথা, তিনি বলেন: “আপনি কিভাবে আপনার জ্ঞান বিলিয়ে দেবেন? এটি আমার জন্য একটি নতুন ধারণা ছিল। আগে আমি ভাবতাম যাকাত শুধুমাত্র অর্থের মাধ্যমেই প্রদান করা যায়। তাই, আমি ভাবলাম, আমার অনেক জ্ঞান অর্জন করেছি, আমি শীর্ষ একজন ছাত্রী ছিলাম, আমি এই জ্ঞান দিয়ে কি করতে পারি [...] আমি এটি সম্পর্কে দীর্ঘদিন চিন্তা করলাম।”[৫] তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, ব্রাদারহুডের ইসলামী পুনর্জাগরণের যে ভিশন তার অনেক দিক আছে।

গণতান্ত্রিক শাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের উপর ব্রাদারহুডের জোরপ্রদানের বিষয়টি সাধারণ কাতারিদের আগ্রহী করেনি। ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ইসলামী আইনকে প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ করার প্রচেষ্টা তাদের প্রতি সাধারণ জনগণের সমর্থন জোগানোর পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

আরব বসন্ত, ক্বারাদাওয়ী, আল-জাজিরা এবং আইইউএমএস

১৯৯৬ সালে আল-জাজিরা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ক্বারাদাওয়ীকে “আরব বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তি” হিসেবে সম্বোধন করা হতে থাকে। বিখ্যাত সাংবাদিক এন্থনি শাদিদ (মৃত্যু ২০১২) এর এমন অবস্থানের পেছনে রয়েছে আল-জাজিরার জনপ্রিয় ইসলামী টক শো ‘আশ-শারিয়া ওয়াল হায়াত’-এ (শরিয়া এবং জীবন) অতিথি হিসেবে ক্বারাদাওয়ীর উপস্থিতি। দোহায় উমর ইবনে আল-খাত্তাব মসজিদে তাঁর শুক্রবারের খুতবা আল-জাজিরা নিয়মিত প্রচার করতে শুরু করে। ‘আশ-শারিয়া ওয়াল হায়াত’ অনুষ্ঠানে ক্বারাদাওয়ী প্রতি সপ্তাহে ৩৫ লাখ দর্শকের সামনে উপস্থিত হতে থাকেন। এই সম্মানের হাত ধরেই ২০০৪ সালে কাতারি আমীর International Union of Muslim Scholars – IUMS (আল-ইত্তিহাদ আল-‘আলামি লিল ‘উলামা আল-মুসলিমিন) প্রতিষ্ঠায় সমর্থন প্রদান করেন, যেখানে ক্বারাদাওয়ীকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়। সেই সময়ে উলামাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক অনেকটা আল-জাজিরার মতই ছিল। এটির স্বাধীন একটি অস্তিত্ব সবার সামনে ছিল কিন্তু একইসাথে এর সাথে কাতারের সফট পাওয়ার এবং পররাষ্ট্র নীতিমালার লক্ষ্যগুলির সাথে সূক্ষ্ম সংযোগ ছিল।

২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় ক্বারাদাওয়ী আল-জাজিরায় তাঁর অবস্থান এবং IUMS-এ তাঁর নেতৃত্বকে ব্যবহার করে প্রতিবেশী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া গণজাগরণের ব্যাপারে ইসলামী আইনী দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধতা প্রদান করেন (বাহরাইনে যদিও এর বাত্যয় ঘটে, যেখানে তিনি ক্ষমতাসীন সুন্নি সরকারকে সমর্থন করেছিলেন )। তবে তখনকার ঘটনার মোড় ঘুরে গিয়ে যখন জুলাই ৩, ২০১৩ তারিখে মিশরে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ব্রাদারহুড নেতৃত্বাধীন সরকারকে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, তার পরপর আল-জাজিরার মাধ্যমে ক্বারাদাওয়ীর ক্যু বিরোধিতার বিষয়টি কাতার এবং মিশরের নতুন শাসনের সমর্থক গোষ্ঠি, বিশেষত সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এ সময় কাতারে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ক্বারাদাওয়ীর কাছ থেকে কাতারি নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নিয়ে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে।

২০১৩ সালের আগস্ট মাসে, ‘আশ-শারিয়া ওয়াল হায়াত’ প্রোগ্রামটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয় এবং তাঁর জুম্মার খুতবাও ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেয়া হয়। GCC-এর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি মোকাবেলায় ২৩শে নভেম্বর ২০১৩ তারিখে ১ম রিয়াদ চুক্তি সাক্ষরিত হয় যেটি পাল্টা বিপ্লবের মাধ্যমে হলেও পূর্বের ক্ষমতাসীনদের পুনরায় ক্ষমতায় এনে আরব বসন্তের প্রভাব থেকে এই অঞ্চলকে মুক্ত রাখার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল।

উত্তেজনা বেড়েই চলছিল এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন, কাতার থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয় ২০১৪ সালের ৫ই মার্চ। ১৬ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে রাষ্ট্রদূতেরা দোহায় ফেরত গেলেও এটি একটি স্পষ্ট সংকেত ছিল যে সংকট নিরসন হয়নি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে ইন্টারপোলের মাধ্যমে মিশর ক্বারাদাওয়ীর বিরুদ্ধে হত্যার উসকানি দেয়ার অভিযোগে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করে (খুব সম্ভবত ২০১৩ সালের গণজাগরণের বিরোধীতা করার জন্য)। গ্রেফতারি পরওয়ানাকে কোন পাত্তা দেয়া হয়নি এবং ২০১৪ সালে মসজিদে ক্বারাদাওয়ীর জুমার খুতবা আবারো শুরু হয়।

উপসংহার

উপসংহারে বলা যায়, যে সমস্যাগুলোর কারণে ২০১৪ সালের শুরুতে কাতার ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্কের ভাঙ্গন শুরু হয় সেগুলো সমাধান করতে ব্যর্থতার কারণেই বর্তমান সংকটের জন্ম হয়েছে। কাতারের মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি সমর্থনই এর সাথে জিসিসির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ, যার প্রমাণ ২০১৩ সালে মিশরের ক্যু এর ব্যাপারে এর প্রতিবেশীদের থেকে কাতারের ভিন্নধর্মী অবস্থান থেকেই পাওয়া যায়। তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের জন্য কাতারের সমর্থন কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলভিত্তিক ক্ষমতার রাজনীতির ফসল নয়। বরং এই সমর্থনের পেছনে দেশটির একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা কাতারে ক্বারাদাওয়ীর ব্যক্তিগত ইতিহাস থেকে অনুধাবন করা যায়। ক্বারাদাওয়ী ১৯৬১ সাল থেকে কাতারে বসবাস শুরু করেন এবং ১৯৬৯ সালে সেখানকার নাগরিকত্ব লাভ করেন। তিনি শূন্য থেকে কাতারের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে গড়ে তুলেছেন এবং মরিয়ম আল-হাজারির মত তাঁর শিক্ষার্থীরা গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছেন বিভিন্ন স্তরে।

রাজপরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পাশাপাশি, শারিয়া অনুষদের ডীন হিসেবে দায়িত্বপালন, আল জাজিরার ‘আশ-শারিয়া ওয়াল হায়াত’ অনুষ্ঠানে তাঁর অবস্থান এবং IUMS-এর নেতৃত্বদানের মাধ্যমে ক্বারাদাওয়ী কাতারের সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। কাতারে ব্রাদারহুডের উপস্থিতির একটিমাত্র দিক চোখে পড়লেও, ক্বারাদাওয়ীর জীবনীটি পড়লে বোঝা যায় কাতারে ব্রাদারহুডের ইতিহাস কত দীর্ঘ এবং কত গভীরে এর শিকড় প্রোথিত। ৯ জুন, ২০১৭ সালে সৌদি আরব, মিশর, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কাতারের প্রতি ক্বারাদাওয়ীসহ ব্রাদারহুডের নির্বাসিত নেতাদের নামের একটি তালিকা ইস্যু করে এবং তাদের বহিষ্কারের দাবি জানায়। যাহোক, এই দাবীর প্রতি কাতারের নতিস্বীকার অত সহজে আসবে আশা করা যায়না। ব্রাদারহুডের জন্য কাতারের সমর্থন কেবলমাত্র ক্ষমতা বা পেশীশক্তির রাজনীতির চেয়েও অনেক বেশিকিছু। আর ক্বারাদাওয়ী এবং তার ব্রাদারহুডের সহকর্মীদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনার মত সরল কিছু হবে না।

[১] যদিও ক্বারাদাওয়ী তাঁর স্মৃতিচারণায় স্পষ্ট করেননি কেন অন্য কোন দেশের পরিবর্তে তিনি কাতার গিয়েছিলেন, সম্ভবত এই সিদ্ধান্ত ব্রাদারহুডের মুর্শিদে ‘আম হাস্‌সান আল-হুদাইবির (মৃত্যু ১৯৭৩) সমর্থনেই নেওয়া হয়েছে।

[২] Hamed A. Hamed, “Islamic Religion in Qatar During the Twentieth Century: Personnel and Institutions” (Doctoral Dissertation, University of Manchester, 1993), 120. See also, Yūsuf al-ʿAbd Allāh, Taʾrīkh al-Taʿlīm fi al-Khalīj al-ʿArabī1913-1971 (Doha: n.p., 2003), 305–80.

[৩] Yusuf al-Qaradawi, Ibn al-Qarya wa-l-Kuttāb: Sīra wa-Masīra, vol. 2 (Cairo: Dār al-Shurūq, 2004) 234–5, 440–2.

[৪] মরিয়ম আল-হাজার আরেকজন কাতারি বংশোদ্ভূত সহকর্মী হামিদ আল-আনসারিকে নিয়ে ১৯৯৯ সালে IslamOnline.net প্রতিষ্ঠা করেন। আল-আনসারি ঐ সময় শরিয়া অনুষদের লেকচারার ছিলেন। Bettina Gräf, “IslamOnline.net: Independent, Interactive, Popular.” Arab Media & Society, 2008, 1–21.

[৫] প্রাগুক্ত., ৩-৪।

সূত্রঃ The Maydan.com

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
Rohingya-girl

গণহত্যার রূপে ইসলামোফোবিয়া: রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা

সালমান সায়্যিদ | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৭
Download PDF

এপ্রিল ১৯, ১৯৪৩ সালে ‘ভারসাভা (Warsaw) ঘেটো আন্দোলন’ শুরু হয়েছিলো ঘেটোর অবশিষ্ট বাসিন্দাদের কন্সেন্ট্রেশান ক্যাম্পে নির্বাসন প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ-প্রয়াস হিসেবে। গুটিকয়েক আগ্নেয়াস্ত্র ও হাতে বানানো বোমায় সজ্জিত সাতশ পঞ্চাশেক লোকের এই বিদ্রোহ এক মাসের মতো টিকেছিলো। এই প্রতিরোধ দমনের পর জার্মানরা পুরো ঘেটোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়, আর পর্যায়ক্রমে সকল বাসিন্দাদেরকে ডেথ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নয়া-নাৎসিরা ক্ষমতাবান জালেমের সহিংসতা ও জুলুমবিরোধী (এমনকি অসার) প্রতিরোধের মাঝে এক প্রকার নৈতিক সমতুল্যতা টানতে গিয়ে তর্ক উঠাতো যে ‘ভারসাভা ঘেটো বিদ্রোহ’ হলোকস্টকে যৌক্তিক বৈধতা দেয়।

আগস্টের ২৫ তারিখে, বর্মি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য মোতাবেক, শত শত রোহিঙ্গা লাঠিসোটা, হাতে বানানো বিস্ফোরক ও কিছু আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেশ কয়েকটি পুলিশ চৌকি আক্রমণ করে। এই সংঘাতে বারোজন বর্মি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও ডজনখানেক রোহিঙ্গা নিহত হয়। রেঙ্গুনের সরকার এই ঘটনাকে অজুহাত করে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আরেক দফা রাষ্ট্র-পরিচালিত রোহিঙ্গা গণহত্যা শুরু করে । কোন সংবাদ বা বিশ্লেষনী মতামতে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ সংগ্রাম ও বর্মি সরকারের জুলুমের মাঝে কোন প্রকার কার্যকারণ সম্পর্ক দেখালে, তা প্রকারান্তরে বর্মি কর্তৃপক্ষ সমর্থিত জাতিগত নিধনেরই সহায়ক হয়ে উঠে।

রোহিঙ্গাদের উপরে এই জাতিগত নিপীড়ন কয়েক দশক ধরেই চলছে। তাদের নাগরিকত্বের অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে; বিচ্ছিন্নকরণ প্রকল্পে দেশব্যাপী কয়েক ডজন গ্রামে তাদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ভ্রমণের ক্ষেত্রে গুরুতর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে; ইবাদতের জায়গাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, বিয়ের ক্ষেত্রে বাধানিষেধের সম্মুখীন হতে হয়েছে, এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ড, ধর্ষন, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ , ও গণ উচ্ছেদ সহ বিভিন্ন নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা।

বর্মি নেত্রী, নোবেল শান্তিপদকপ্রাপ্তা এবং গণতন্ত্রের আইকন অং সান সু চি কেবল চুপ থেকেছেন তা নয়; তিনি উৎপীড়ণের সংবাদগুলোকে “ভুয়া খবর” হিসেবে উড়িয়ে দিয়ে সচেতনভাবে এই উৎপীড়নকে সমর্থন দিয়েছেন। “ভুয়া সংবাদ” পরিভাষাকে মূলত বিখ্যাত করেছিলেন ট্রাম্প;; সেই লোক যিনি আমাদের জন্য “মুসলিম ব্যান” পলিসি নিয়ে এসেছেন। শুধু এই পরিভাষা ব্যবহারই সুচির সাথে ট্রাম্পের সাদৃশ্য বহন করে তা নয়, এখানে আদর্শিক ঘনিষ্টতাও বিদ্যমান।

২০১১ সালে আনার্শ ব্রাইভিক সত্তর জন নরওয়েজীয় সমাজতন্ত্রবাদীকে হত্যা করে। সে তার এই গণহত্যাকাণ্ডের ন্যায্যতা এভাবে দেখিয়েছে যে, এটা ‘মার্ক্সবাদী, মাল্টিকালচারালিস্ট , ও মুসলিমদের’ অপবিত্র ত্রিত্বের বিরুদ্ধে ক্রুসেডের একটা অংশ। ঠিক এভাবেই ব্রাইভিকের শাদা আধিপত্যবাদী চিন্তাধারা শুধু বর্ণবাদ ও সেমিটীয়বিদ্বেষবাদের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়নি, বরং অন্যান্য অনেক অল্ট-রাইট (অলটার্নেটিভ ডানপন্থী) গোষ্ঠির আদলে ইসলামোফোবিয়ার মধ্য দিয়েও হয়েছে। তখন থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, ইসলামোফোবিয়া আর চরমপন্থী ডান ঘরানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গিয়েছে।

ইসলামোফোবিয়া মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি কেবল একগুচ্ছ নেতিবাচক মনোভাবের সমষ্টি না। সুবিধা ও নিষ্ঠুরতার এই বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মানে ইসলামোফবিয়া যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তাতেই এর মূল গুরুত্ব নিহিত। এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, অং সান সু চি মনে করেন রোহিঙ্গারা বহিরাগত সন্ত্রাসী। এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, ইন্ডিয়ার নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি সুচির সাথে রেঙ্গুনে মোলাকাত করেছেন যখন তার আর্মি রাখাইনে জাতিগত নিধন চালাচ্ছিলো, যে রাখাইনে রোহিঙ্গারা শতকের পর শতক ধরে বাস করে আসছে। এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, হত্যা, ধর্ষন ও নির্যাতনের সংবাদগুলোকে সুচি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছেন ভুয়া খবর হিসেবে। এই সুচি, মোদী, ও ট্রাম্প – এদের সবাই কথা বলছেন ইসলামোফোবিয়ার ভাষায়।

বিশ্বব্যাপী জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পের যে সঙ্কট প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাকে সামাল দিতে জেনোফোবিক জাতীয়তাবাদীরা ইসলামোফোবিয়ার যে ভাষা ব্যবহার করছে এটি সে-ই ভাষা। নিছক মুসলিমদের অস্তিত্বই এই দুনিয়ায় জাতীয়তাবাদী মুক্তি অর্জনের অসম্ভাব্যতার স্মারক হয়ে উঠেছে যারা কোন গোষ্ঠী বা দেশের ছোট মুঠোয় জায়গা করে নিতে পারবেনা। জাতীয় মুক্তি ও পুনর্জাগরণের প্রকল্প প্রস্তাবনায় জাতীয়তাবাদী উদ্দীপণার যে ব্যর্থতা তার জন্য নিছক মুসলমানদের অস্তিত্বকেই দায়ী করা হচ্ছে। তো এই ইসলামোফোবিক দুনিয়ায় মুসলিমরা বর্বর বহিরাগত ছাড়া কিইবা হতে পারে যারা সভ্যতাকে নিছক তাদের অস্তিত্ব দিয়েই হুমকি দিয়ে যাচ্ছে?

জেনফোবিক আধিপত্যবাদের শক্তিশালী হওয়াটা ক্রমাগতভাবে মুসিলম বশীভূতকরণ প্রচেষ্টার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহুর্তে মুসলিমরা বিশ্বব্যাপী ট্রান্স-ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ উৎরে যাওয়ার একটি সিগ্নিফায়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে (ভাষাবিদ ফার্দিনান্দ দ্য স্যুসুরের ভাষ্যমতে, ‘সিগনিফায়ার’ যেই অর্থদ্যোকতা হাজির করে তার উপর ‘সিগনিফাইড’ তৈরী হয় – সম্পাদক)। ট্রান্স-ন্যাশনালিজমের এই দাবীটা চিহ্নিত হয় (নৈতিকতার দিক থেকে) দ্বৈত আনুগত্য, পরদেশীতা, সীমানা-উত্তর সম্পর্ক ও সম্বন্ধ শীর্ষক চিহ্ন দিয়ে। সুতরাং জাতিরাষ্ট্রের অসম্ভব পূর্ণতার পথে বাধা হিসেবে, বিশ্বায়নের চিহ্নায়ক হিসেবে, এবং হোমোজেনাস সমাজের আকাঙ্ক্ষিত সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বরাবর মুসলিমরা প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশ্বায়ন কর্তৃক সৃষ্ট অস্থিরতা ও নয়া-উদারনৈতিক যুক্তিকাঠামোর শাসনে বিশ্বব্যাবস্থার কাঠামোগত যে রূপান্তর তার উপর থেকে নজর সরিয়ে মুসলিমদের অস্তিত্বের উপর নজর আনা হচ্ছে। এই মুসলিমরা বর্তমানে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ডায়াসপোরা (Diaspora) কেননা তাদেরকে কোন জাতিরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোন নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত পরিচয়ে ধারণ করতে পারেনা।

জাতির শরীরে বাসা বাধা বহিরাগত বিষাক্ত উপাদানগুলো সারানোর প্রতিষেধক হিসেবে পরিণত হয়েছে ইসলামোফোবিয়া। মুসলিমরা হচ্ছে নির্দিষ্ট নৃতাত্ত্বিক কাঠামোতে (Ethnos) জনগণকে (Demos) ধারণ করার চুড়ান্ত অক্ষমতার রূপক।

রাষ্ট্রনীতি আকারে ইচ্ছাকৃত নির্বিচার হত্যাকান্ড হিসেবে গণহত্যা ঘটে থাকে জাতি এবং ঐ সকল গোষ্ঠীর ছেদবিন্দুতে যারা জাতির সীমানা ভেঙ্গে দিয়ে সংকট তৈরী করে। ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে বিশ্বের সকল প্রধান ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মুসলিম সংখ্যালঘু রয়েছে যারা ‘হালের নৃতাত্ত্বিক-জাতীয়তাবাদের ধারা এবং নাগরিকতা ও নৃতাত্ত্বিকতার মাঝে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে তার সাথে জড়িয়ে পরেছে। বহুল আকাঙ্ক্ষিত নৃতাত্ত্বিকভাবে ‘বিশুদ্ধ জাতিরাষ্ট্র’ বাস্তবায়নের পথে তাই তাদেরকে প্রধান বাঁধা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদেরকে তাদের আদিবাসস্থান গ্রামগুলো থেকে বিতাড়িত করে দেয়া হচ্ছে এবং হত্যা করা হচ্ছে কারণ তাদেরকে বিদেশী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে যারা বহিরাগত । ইসলামোফোবিক দুনিয়ায় মুসলিমরা কোথাও-ই থাকার যোগ্য নয়। জাতিগত বিভাজনের উপর ভিত্তি করে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, বৈশ্বিকভাবে মুসলিম আইডেন্টিটির উত্থান এক্ষেত্রে সীমালংঘন হিসেবে পরিণত হয়েছে; সাংস্কৃতিক সমজাতীয়তার আন্দোলনগুলোর চোখে তারা পাপী; এনলাইটেনমেন্ট টেলিওলজির চোখেও তারা পাপী।

ইসলামোফোবিয়া শুধু মুসলিমদের প্রতি বৈরীভাব নয়, বরং এটি হচ্ছে সেই আঠা যা এমন একটি জোটকে একসাথ করে রাখছে যারা বিশ্বকে আরো প্রশস্ত একটি সহাবস্থানের জায়গা হিসেবে গড়ে উঠতে বাঁধা দিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের উপর চালানো জাতিগতনিধন তাই নিতান্তই দুরবর্তী কোন ছোট সংখ্যালঘু একটি গোষ্ঠীর উপর আক্রমণ নয়। বার্মার জঙ্গলে যা-র উপরে হামলা করা হচ্ছে, তা আরেক প্রকার নয়া দুনিয়ার সম্ভাবনার উপরেই হামলা।

সূত্রঃ Daily Sabah

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
rtr4odfn

প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিভাজনের উর্ধে

ইব্রাহিম কালিন | সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৭
Download PDF

মক্কায় যখন মুসলিমদেরকে প্রথম নামাজের আদেশ দেওয়া হয়, তারা পূর্ব দিকে জেরুজালেমের দিকে ফিরেই নামাজ আদায় করেছিল। ৬২২ হিজরীতে মুহাম্মদ (সা) মদীনায় হিজরত করার পর প্রায় দেড় বছর ধরে এভাবেই চলে আসছিল। পরে তাদেরকে মক্কায় কা‘বার দিকে ফিরে নামাজ আদায় করতে আদেশ দেওয়া হয়। আজও তারা সেদিকে ফিরেই নামাজ আদায় করছে। নামাজের এই দিকবদল নিয়ে লোকেরা যখন প্রশ্ন করেছিল, আল্লাহ তখন কুর’আনে তাদের উত্তর দিয়েছেন এই বলে যে, “পূর্ব-পশ্চিম আল্লাহরই। যেদিকেই ফেরো, সেদিকেই তোমরা আল্লাহকে খুঁজে পাবে। আল্লাহ সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ (সূরা বাকারা, ২:১১৫)।” সপ্তম শতাব্দী ও এর পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে আজকের মতো “প্রাচ্য” এবং “পাশ্চাত্য” বলতে আমরা যা বুঝি তা বুঝানো হত না। ইসলামের অনুসারীদের জন্য কা‘বা পূর্বদিকে অবস্থিত না। মুসলিম ও ইহুদিদের জন্য জেরুজালেমের ব্যাপারেও একই কথা খাটে। কোনো ভৌগলিক সীমারেখা দিয়ে এসব পবিত্র জায়গাগুলোকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। পূর্ব-পশ্চিমের উর্ধে এগুলো মানুষের জন্য নামাজ ও বরকতের কেন্দ্রবিন্দু।

আধুনিকতার উত্থানের পূর্বে, ইসলামের সার্বজনীন ভাষা পৃথিবীকে বোঝার জন্য প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য এরকম কোন সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরী করেনি। পূর্ব-পশ্চিম সবই আল্লাহর। এর মানে একটাই: বাস্তবতার এমন এক পর্যায় আছে, যা পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণকে ছাড়িয়ে যায়। জ্ঞানের সন্ধানে মুসলিম ‘আলেম, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকেরা সারা পৃথিবী চষে বেরিয়েছেন। জ্ঞান নিয়েছেন গ্রিক, ভারতীয়, চাইনিজ, আফ্রিকান, সাসানিদ, ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে। প্রাচীন লোকবিদ্যাগুলো ছেঁকে যেগুলোকে তারা প্রয়োজনীয় ও উপকারী মনে করেছেন সেখান থেকে সেগুলো নিয়েছেন। ধর্ম, বর্ণ বা ভৌগলিক অবস্থানের ভিত্তিতে গৎবাঁধা সরলীকরণ, বৈষম্য বা হেয় করার প্রবণতা ছিল না।

আল-কিনদিকে বিবেচনা করা হয় প্রথম মুসলিম দার্শনিক হিসেবে। জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন এই বলে যে, “[আমি তাঁদের সবার কাছে ঋণী,] যারা আমার পূর্বে এসেছেন এবং মানবকল্যাণের জন্য জ্ঞান রেখে গেছেন।” পরবর্তী চিন্তাবিদেরা প্রাচীন গ্রিক ও গ্রিক দর্শন, চাইনিজ জ্ঞানসাধক এবং ভারতীয় বিজ্ঞানীদের কাজের উপর ক্রিটিকাল পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু এগুলোকে “প্রাচ্যের” বা “পাশ্চাত্যের” এভাবে অভিহিত করেননি। তাদের নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিচয়কে অগ্রাহ্য করে, তাঁরা এই সকল জ্ঞানী ব্যক্তিদের সৃষ্টিকর্মের উপকারী দিকগুলোর উপর নজর দিয়েছেন। বর্তমানে মুসলিমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে ফেলেছে এবং বাইনারি চিন্তার ফাঁদে পা দিয়েছে। প্রাচ্যের প্রশংসা কিংবা পাশ্চাত্যের নিন্দায় তারা হারিয়ে বসেছে কোনো সিরিয়াস বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থেকে। বাইনারি চিন্তা আমাদের অন্তরকে ঢেকে রাখে এবং সৃষ্টি করে বিভ্রান্তি, দূরত্ব আর অজ্ঞতা।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, উপরে আমরা যে আয়াতটি উদ্ধৃত করেছি তা মধ্যযুগে এবং এর পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ইউরোপীয় চিন্তাবিদদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জার্মান কবি গ্যোথে পূর্ব-পশ্চিমের বিভাজন কাঠিয়ে উঠার জন্য উপরের আয়াতটি উল্লেখ করেন এবং তাঁর একটি কবিতার বইয়ের নামকরণ করেছেন “West-östlicher Diwan” বা পূর্ব-পশ্চিম দিওয়ান। ১৮ শতকের একজন বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান ঐতিহাসিক ও প্রাচ্যবিদ জোসেফ হামার-পার্গস্টল (Joseph Hummer-Purgstall)-এর মনে এই আয়াতের ভাবার্থ এতটাই ছাপ ফেলেছিল যে, তিনি তাঁর বিভিন্ন কর্মে এর উদ্ধৃতি দিতেন। তবে তিনি একটা বেশ নাটকীয় কাজও করেছেন। তাঁর সমাধিপ্রস্তরে এ আয়াতটি খোদাই করে রেখে দিয়েছেন।

ট্র্যাডিশনাল মুসলিম স্কলারদের প্রাচ্যদেশীয় হিসেবে অভিহিত করাটা একটু অদ্ভূত ঠেকবে। বর্তমানে যাকে মধ্যপ্রাচ্য বলা হয়, ইব্ন সিনা সেখানকার বাসিন্দা ছিলেন বলে তিনি যেমন প্রাচ্যের দার্শনিক হয়ে যাননি; তেমনি ইব্ন রুশদ আন্দালুসিয়ায়—বর্তমানে যার নাম স্পেন—সেখানে ছিলেন বলে তিনি পশ্চিমা দার্শনিক হয়ে যাননি।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য এসব আধুনিক ক্যাটাগরি। ১৮ শতক থেকে এগুলো মুসলিম এবং নন-মুসলিমদের চিন্তাভাবনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। গুচ্ছ গুচ্ছ সমজাতীয় বিশ্বাস, মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গিসহ এগুলো পরিণত হয়েছে এমন ক্যাটাগরিতে যার ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই। এগুলো থেকে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিমদের এ থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক অবিচার, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ অথবা অর্থনৈতিক শোষণ মোকাবিলায় তাদেরকে দায়িত্ব-জ্ঞানহীন সরলীকরণ ও অগভীর শ্রেণিবদ্ধকরণ এড়াতে হবে। সুবিচার, সমতা ও মর্যদার জন্য অধিকারচ্যুত ও বঞ্চিত বোধগুলোকে গঠনমূলক ডিসকোর্সের দিকে ধাবিত করতে হবে। “আমরা বনাম ওরা” এ ধরনের অবস্থান ক্ষতিকর। সেটা আমেরিকা, ইউরোপ বা মুসলিম যাদের থেকেই আসুক।

মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে “পাশ্চাত্যবাদ”-এর (Occidentalism) ফাঁদে না পড়ে ইউরো-কেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসা। এর মানে হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা হাজির করতে হবে কিন্তু তাই বলে নিজের দুর্বলতাকে ঢেকে রাখা যাবে না। অর্থাৎ অন্যকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং আত্ম-সমালোচনাকে ভয় করলে চলবে না। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক সময়ে যারা প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শ্রেণীকরণকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তাদের মধ্যে যে গুটিকয়েক মুসলিম ইনটেলেকচুয়াল ছিলেন প্রয়াত আলিয়া ইজ্জেতবেগোভিচ (Alija Izzetbegovic) তাদের অন্যতম। তাঁর বই “ইসলাম বিটউইন ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট”-এ প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য কাউকে হেয় প্রতিপন্ন না করে এসবের উর্ধে ইসলামকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

অনেক মুসলিম ‘আলিম ও চিন্তাবিদেরাও এ ধরনের কাজ করেছেন। সায়্যিদ হুসাইন নাসের, তারিক রমাদান, হামযা ইউসুফ, টিমোথি উইন্টার (আবদুল হাকিম মুরাদ), সায়্যিদ নাকিব আল-আত্তাস, খালিদ আবু আল-ফাদ্ল, ইংরিদ ম্যাটসন এবং এরকম আর অগণতি বিজ্ঞ ব্যক্তিরা আছেন যারা কোনো ধরনের ভ্রান্তি সৃষ্টি ছাড়াই ইসলামি শাস্ত্র ও আধুনিক বিশ্বের উপর ক্রিটিকালি পড়াশোনায় নিমগ্ন। প্রচারমাধ্যম যেখানে আইএসআইএসের হত্যাযজ্ঞের বিজ্ঞাপন নিয়ে ব্যস্ত, এই স্কলাররা তখন প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করে মধ্যপন্থা অক্ষুণ্ণ রাখছেন। কারণ, তাঁরা ভাবেন পূর্ব-পশ্চিম সবই আল্লাহর।

মুসলিম সমাজগুলোকে ভীতসন্ত্রস্ত মনোভাব এবং নিজেদেরকে সবসময় বলির পাঠা ভাবা—এ ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যা বর্তমান বিশ্ব ও এখানে তাদের অবস্থান নিয়ে তাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করছে। চরম জুলুম আর অবিচারের সম্মুখীন হয়েও জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ধৈর্য ও নৈতিকতার উপর নিজেদের ভিত্তি নির্মাণ করা উচিত। অন্য কাউকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পূর্বে মুসলিমদের উচিত প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিভাজন থেকে সরে আসা। কেননা, এটা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা ও নৈতিক দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই দেয়নি।

সূত্রঃ Daily Sabah

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
maxresdefault

জিহাদ আন্দোলনে বাংলার ভূমিকা

Download PDF

রায়বেরেলীর সৈয়দ আহমদ শহীদ কর্তৃক পরিচালিত ‘জিহাদ আন্দোলন’ উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ এবং ব্যাপক-ভিত্তিক এক গণ-অভ্যুত্থানরূপে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এ আন্দোলন ছিল প্রধানত পারিপার্শ্বিক নানা অপ-প্রভাবে কলুষিত মুসলিম জনগণের ঈমান-আকীদাকে শির্‌ক, বিদ’আত, বিজাতীয় অনুকরণ প্রভৃতি নানা জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে পূর্ণ ঈমানী জৌলুস ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিচালিত।

মোগল সালতানাতের পতন যুগ শুরু হওয়ার সাথে সাথে জাঠ, মারাঠা, শিখ প্রভৃতি মুসলিমবিদ্বেষী শক্তিগুলোর ব্যাপক অভ্যুত্থান শুরু হয়। পূর্বদিকে বাংলার শাসন ক্ষমতা ইংরেজ বণিকেরা দখল করে নেয়। শিখ সামন্তরাজা রঞ্জিত সিং ইংরেজদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সমগ্র পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ দখল করে লাহোরকেন্দ্রিক একটা শক্তিশালী শিখ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে বসে। নবোত্থিত এই শিখ শক্তির আগ্রাসী থাবায় পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশের মুসলিম জনগণ পর্যায়ক্রমে পর্যুদস্ত হতে থাকে।

অপরদিকে সমগ্র উপমহাদেশব্যাপী মুসলমানদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনে নেমে আসে মারাত্মক অধঃপতন। ঈমান-আকীদার স্থান দখল করে বসে নানা কুসংস্কার ও বিজাতীয় ধ্যান-ধারণা। মুসলিম জনগণ পরিণত হয় নামসর্বস্ব মুসলমানে। সমাজের উচ্চবিত্তদের মধ্যে শিয়া ধ্যান-ধারণা, পীর পূজা, গোর-পূজাসহ অগণিত শির্‌ক-বিদ’আত স্থায়ীভাবে শিকড় গেড়ে বসে। জাতীয় জীবনের সর্বস্থরে নেমে আসা ক্রমবর্ধমান অধোগতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ হয়ে এ স্তরের লোকেরা ভোগ-বিলাসের আত্মঘাতী পথে গা ভাসিয়ে দেয়।

অপরদিকে নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মুসলিম জনগণ পার্শ্ববর্তী হিন্দু সমাজের নানা আচার-আচরণে ব্যাপকভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক এলাকার মুসলিম জনগণ নামের সংগে হিন্দু পদবী গ্রহণ করাকে গৌরবজনক কৌলিন্যের লক্ষণ বলে বিবেচনা করতে শুরু করে।

পাঞ্জাব এবং সীমান্ত প্রদেশের বহু লুণ্ঠিত জনজপদের মুসলিম নারীদেরকে শিখেরা বাঁদীরূপে ব্যবহার এবং প্রকাশ্য হাট-বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করতে থাকে। মসজিদে আযান এবং জুমা-জামাত বন্ধ হয়ে যায়।

ইমামুল হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহর সুযোগ্য সন্তান এবং সার্থক উত্তরাধিকারী শাহ আবদুল আজীজ তখন জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত হয়েছেন। হযরত মুজাদ্দিদে আল্‌ফেসানী (রঃ)-এর যে সংগ্রামী উত্তরাধিকার তাঁর ধমনীতে প্রবহমান ছিল, সে উত্তরাধিকারের দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে তিনি একটা ব্যাপক সংস্কার আন্দোলন শুরু করার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে তিনি আগ্রাসী শিখ ও মারাঠাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করারও পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু বার্ধক্যের কারণে এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। তাই তিনি তাঁর প্রিয় শাগরেদ মাওলানা সৈয়দ আহমদ শহীদের উপর এ দায়িত্ব অর্পণ করেন। ঐতিহ্যবাহী এক বুযুর্গ পরিবারের সন্তান সুঠামদেহী যুবক সৈয়দ আহমদের অসীম মনোবল এবং আধ্যাত্মিক শক্তি লক্ষ্য করে এ গুরুদায়িত্ব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তাঁর সঙ্গে ভ্রাতুষ্পুত্র শাহ ইসমাঈল, জামাতা মাওলানা আবদুল হাই লাক্ষ্ণৌভী এবং অন্য এক প্রিয় শাগরেদ মাওলানা ইমামুদ্দিন বাঙালীকে যুক্ত করে দেন।

বলাবাহুল্য, সৈয়দ আহমদ শহীদের এ মহৎ আন্দোলন সংগঠন, পরিচালনা এবং প্রাণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বাংলার বীর সন্তান মাওলানা ইমামুদ্দীনের দুঃসাহসী ভূমিকা বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে।

সৈয়দ সাহেব প্রথমে মুসলিম জনগণের ধর্মীয় সংস্কারের লক্ষ্যে ব্যাপক তাবলিগী সফর শুরু করেন। এক পর্যায়ে তিনি অনুধাবন করেন যে, বৈরী শক্তির মুকাবিলা করার মতো বাস্তব পদক্ষেপ ব্যতীত শুধু ওয়াজ-নসিহতের দ্বারা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হবে না, তখন তিনি শিখদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ শুরু করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হন। জিহাদ শুরু করার আগে নিবেদিতপ্রাণ একদল মুজাহিদ তৈরী করা এবং জনগণের মধ্যে এ ব্যাপারে ব্যাপক সাড়া জাগানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

পর্যাপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন মুজাহিদ তৈরী করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটা অংশ হিসেবেই সদলবলে তিনি হজ্জের সফরে রওনা হওয়ার কথা ঘোষণা করেন। তখনকার দিনে এ সফর ছিল যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনি সময়সাপেক্ষ। সৈয়দ সাহেব অন্তত তিন বছরে এই সফর সমাপ্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

আগেই উল্লিখিত হয়েছে যে, সৈয়দ আহমদ শহীদ তাঁর আন্দোলন শুরু করার সূচনাতে স্বীয় উস্তাদ শাহ আবদুল আজীজের যে কয়জন শাগরেদকে তাঁর উপদেষ্টা এবং সার্বক্ষণিক সংগীরূপে পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন মাওলানা ইমামুদ্দিন বাঙালী। এছাড়া জিহাদ আন্দোলনের আর একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সংগঠক ছিলেন সূফী নূর মুহাম্মদ নামক বিশিষ্ট সাধক আলেম। এঁরা উভয়ই ছিলেন সৈয়দ সাহেবের বিশিষ্ট খলীফা এবং জিহাদ আন্দোলনের প্রথম কাতারের নেতা ও সংগঠক। এ দুই মহান সাধক বীর পুরুষের মাধ্যমেই জিহাদ আন্দোলনের সাথে বাংলার জনগণের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। এঁদের মধ্যে মাওলানা ইমামুদ্দিন ছিলেন নোয়াখালী জেলার হাজীপুরের অধিবাসী এবং সূফী নূর মুহাম্মদ ছিলেন চট্টগ্রামের লোক। এছাড়া হজ্জের সফরে রওনা হয়ে কলিকাতায় দীর্ঘ তিনমাস অবস্থান করেও সৈয়দ সাহেব বহুলোককে প্রত্যক্ষভাবে এ আন্দোলনের সাথে যুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

সৈয়দ সাহেব হিজরী ১২৩৬ সনের ১লা শওয়াল (১৮২০খৃ.) ঈদের নামায বাদ রায়বেরেলী থেকে চারশ’ সংগীসহ নৌকাযোগে কলকাতার পথে রওনা হন। উদ্দেশ্য, কলকাতা থেকে জাহাজ ভাড়া করে জেদ্দায় যাওয়ার ব্যবস্থা করা।

পথে পথে বিভিন্ন স্থানে মনযিল এবং তাবলীগী সমাবেশ করার পর দীর্ঘ চারমাস পর রাজমহলের পথে এই কাফেলা বাংলার জমীনে এসে প্রবেশ করে। বাংলার সীমান্তে কাফেলার অভ্যর্থনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘ওয়াকায়ে-এ আহ্‌মদী’র লেখক বলেনঃ রাজমহল থেকে মুন্সী মুহাম্মদী আনসারী নামক একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হযরত সৈয়দ সাহেবকে দশ-বারো ক্রোশ দূরবর্তী তাঁর গ্রামে নিয়ে যান। সেখানে মুন্সী মুন্সী মুহাম্মদী আন্‌সারীর পিতা মুন্সী রউফউদ্দীন, মুন্সী মখদুম বখশ, হাসান আলী, ফজলুর রহমান এবং মুন্সী আযীযুর রহমান সৈয়দ সাহেবের হাতে বায়আত হন। এঁদের মধ্য থেকে মুন্সী রউফউদ্দীন ও মুন্সী ফজলুর রহমান কাফেলার সংগে শরীক হন।

রাজমহল থেকে রওনা হয়ে ৫ই সফর কাফেলা মুর্শিদাবাদ পৌঁছে। মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট লোকদের অধিকাংশই ছিল তখন শিয়া মতের অনুসারী। তাযিয়া এবং বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারপূর্ণ অনুষ্ঠান ছিল তাদের প্রধান উপজীব্য। সৈয়দ সাহেব মাওলানা আবদুল হাইকে ওয়ায করার নির্দেশ দিলেন। ওয়াযের প্রভাবে শত শত লোক সৈয়দ সাহেবের হাতে বায়আত হয়ে সকল কুসংস্কার মুক্ত হন। মুর্শিদাবাদ থেকে রওনা হয়ে কাফেলা একরাত কাটোয়ায় অবস্থান করে। সেখান থেকে কাফেলা হুগলী বন্দরে উপনীত হয়। হুগলীতে সাতদিন অবস্থান করে কয়েক হাজার লোককে মুরীদ করা হয়।

কাফেলা হুগলী বন্দরে থাকতেই কলকাতার বিশিষ্ট আইনজীবী মুন্সী আমিনউদ্দীন নৌকাযোগে এসে হযরত সৈয়দ সাহেবের সংগে সাক্ষাৎ করেন এবং কাফেলার সব লোককে তাঁর মেহমান হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

মুন্সী আমিনউদ্দীন ছিলেন কলকাতার একজন প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি। মুন্সী সাহেবের আন্তরিক ভক্তি এবং আগ্রহ লক্ষ্য করে সৈয়দ সাহেব তার মেহমানদারী কবুল করতে সম্মত হন। মুন্সী আমিনউদ্দীন হযরত সৈয়দ সাহেবের কাফেলার মেহমানদারীর জন্যে শহরের উপকণ্ঠে একটা সুপ্রশস্ত বাগানবাড়ী ক্রয় করে রেখেছিলেন। কাফেলার নারী-পুরুষ সকলের জন্যেই এই বাড়ীতে ভালভাবে সংকুলান হয়ে গেল। পথে পথে যারা কাফেলায় এসে শরীক হয়েছিলেন, তাঁদের নিয়ে তখন লোকসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল পাঁচশতের মতো।

সৈয়দ সাহেবের কাফেলা দীর্ঘ তিনমাস কলকাতায় অবস্থান করেছিল। এ সময়কালের মধ্যে প্রতিদিন বাদ ফযর কাফেলার অবস্থান স্থলে ওয়ায-মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো। ভক্তদের অনুরোধে সৈয়দ সাহেব বিভিন্ন লোকের বাড়ীতে আয়োজিত মজলিসে গিয়েও শরীক হতেন। বাংলার মুজাহিদীনের জামাত এখান থেকেই সংগঠিত হতে শুরু করে।

‘ওয়াকায়ে-এ আহমদী’র বর্ণনা অনুযায়ী প্রতিদিন শত শত লোক এসে মুন্সী আমিনউদ্দীনের বাগান বাড়ীতে সমবেত হতো। সৈয়দ সাহেবের ওয়ায-নসীহত শুনত এবং বায়আত গ্রহণ করে শির্‌ক-বিদ’আদ থেকে তওবা করতো।

বাংলার প্রত্যন্ত এলাকায় সৈয়দ সাহেবের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য মওলানা ইমামুদ্দীন তাঁর জন্মভূমি নোয়াখালী এবং সূফী নূর মুহাম্মদ চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকায় রওনা হয়ে যান। মাওলানা ইমামুদ্দীনের সংগে নোয়াখালী, কুমিল্লা এবং মোমেনশাহী এলাকায় অর্ধশত বিশিষ্ট ব্যক্তি এসে উপনীত হন। সূফী নূর মুহম্মদ নিয়ে আসেন সিলেট ও চট্টগ্রামের কিছু বিশিষ্ট লোক। সূফী সাহেবের এই কাফেলার সংগেই এসেছলেন বাংলার অন্যতম মুজাহিদ সংগঠক মাওলানা আবদুল হাকীম চাটগামী, ময়মনসিংহের মুন্সী ইবরাহীম ও সৈয়দ হামযা আরাকানী প্রমুখ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।

কলকাতার সফরেই মৌলভী বরকতুল্লাহ্‌ এবং মৌলভী এনায়েতুল্লাহ্‌ ওরফে কাযী মিয়াজান নামক আরও দু’ব্যক্তি হযরত সৈয়দ সাহেবের খিলাফত লাভ করেছিলেন বলে জানা যায়।

দীর্ঘ দু’বছর হজ্জের সফরে কাটানোর পর সৈয়দ সাহেব বোম্বে হয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। ফেরার পথেও সৈয়দ সাহেব কলকাতায় কিছুকাল অবস্থান করে বাংলার জামাতকে সুসংঘবব্ধ করার ব্যবস্থা করেন। মাওলানা ইমামুদ্দীন পূর্ব বাংলার নোয়াখালী, কুমিল্লা, ঢাকা ও মোমেনশাহী এলাকায় প্রেরিত হন। মৌলভী বরকতুল্লাহ্‌ উত্তর বঙ্গ এবং সূফী নূর মুহাম্মদ কলকাতার আশেপাশে প্রচার ও সংগঠনের কাজ শুরু করেন।

আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম জনসাধারণের আকীদা ও আমলের সংস্কার। দ্বিতীয় জনসাধারণের মধ্যে ইস্‌লামী জীবনধারা সম্পর্কে তীব্র অনুভূতি সৃষ্টি করা। তৃতীয় পর্যায়ে সর্বপ্রকার বৈরী শক্তির মুকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা। চতুর্থ পর্যায়ে জান-মাল দিয়ে কেন্দ্রীয় মুজাহিদ আন্দোলনকে সহযোগিতা দান করার অংগীকার গ্রহণ করা।

মাওলানা ইমামুদ্দীন, সূফী নূর মুহাম্মদ, মৌলভী বরকতুল্লাহ্‌ এবং মাওলানা আবদুল হাকীমের নেতৃত্বে বাংলার মাটিতে আন্দোলনের চারটি পর্যায়েই ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছিল। ইংরেজ আমলা হান্টারের ভাষায়- “বাংলায় এমন কোন জনপদ ছিল না, যেখানকার মুসলমানদের মধ্যে সৈয়দ সাহেবের সংস্কারের বাণী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। প্রতিটি ধার্মিক পরিবারের যুবকরা সীমান্তে গিয়ে জিহাদ করার করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো, বৃটিশ সরকারের গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে হঠাৎ করে একদিন তারা সীমান্তের মুজাহিদ কাফেলায় যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যেত। জমির খাজনা পরিশোধ করতে অসমর্থ কৃষকরাও জিহাদের জন্য নিয়মিত অর্থ প্রদান করতে কুণ্ঠিত হতো না।”

দু’বছর এগারো মাস হজ্জের সফর সমাপ্ত করে সৈয়দ সাহেব রায়বেরেলী পৌঁছেন। ততদিনে বার্মা সীমান্ত থেকে শুরু করে দিল্লী পর্যন্ত তাঁর দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ লোক তাঁর সংস্কার প্রচেষ্টার ফলে শির্‌ক ও বিদ’আতের সকল জঞ্জাল থেকে মুক্ত হয়ে খালেস তওহীদের বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্দীপিত হয়ে উঠেছিল।

সৈয়দ সাহেবের সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল উপমহাদেশের প্রতিটি জনপদের মুসলিম জনগণের জন্য মুক্ত স্বাধীন পরিবেশে আল্লাহ্‌র বন্দেগী করার মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। হজ্জ থেকে ফিরে যখন তিনি শুনতে পেলেন যে, আগ্রাসী শিখ সামন্ত শাসকেরা পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশের সর্বত্র মসজিদে আযান  এবং জামাত বন্ধ করে দিয়েছে, স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম করার সকল সুযোগ রুদ্ধ করা হয়েছে, অনেক এলাকার মুসলিম নারী-শিশুদের জবরদস্তি করে ধরে এনে গোলাম-বাঁদীতে পরিণত করা হচ্ছে, তখন আর কালবিলম্ব না করে তিনি শিখ শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার দৃঢ সংকল্প ঘোষণা করলেন। মওলানা ইসমাঈল শহীদ, মাওলানা আবদুল হাই, মাওলানা ইমামুদ্দীন বাঙালী ও সূফী নূর মুহাম্মদ প্রমুখ প্রথম সারির খলীফাগণকে জিহাদের কাফেলায় লোকজন সমবেত করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হলো। উর্দু সাহিত্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কবি মোমেন দেহলভী ছিলেন সৈয়দ সাহেবের একজন বিশিষ্ট মুরীদ ও খলীফা। তিনি জিহাদের গীত রচনা করলেন। মুরীদগণের মুখে মুখে তা সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়লো।

সৈয়দ সাহেবের হজ্জ থেকে ফেরার পথে এনায়েতুল্লাহ্‌ নামক ভাগীরথী তীরের এক নওজোয়ান তাঁর কাফেলায় শরীক হয়ে খিলাফত লাভ করেছিলেন। তিনি বাংলার গ্রামে-গঞ্জে মোমেন দেহলভীর জিহাদী কাসীদা পাঠ করে লোকজনকে উদ্দীপিত করার দায়িত্ব নিলেন।

সৈয়দ সাহেব তাঁর আসন্ন জিহাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে একটা ইশতেহার রচনা করলেন। ইশতেহারের বক্তব্য ছিল নিম্নরূপঃ

“শিখ জাতি বেশ কিছুকাল যাবত লাহোর এবং আশপাশের এক বিস্তীর্ণ এলাকার উপর জবর দখল কায়েম করে বসে আছে। এদের অত্যাচার নির্যাতন সভ্যতার সকল সীমা অতিক্রম করেছে। এরা হাজার হাজার নিরপরাধ মুসলমানকে হত্যা করেছে। অগণিত মুসলমানকে লাঞ্চিত করেছে। মসজিদে আযান দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গরু জবেহ করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে।

অত্যাচার নির্যাতন সীমাতিক্রম করার পর সংশ্লিষ্ট মুসলিম জনগণকে জাগ্রত ও সুসংগঠিত করে আগ্রাসী শিখ শক্তির মুকাবেলায় দাঁড়ানোর জন্য জিহাদ ঘোষণা করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার মুজাহিদ জিহাদে অংশ গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে সীমান্ত প্রদেশের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছেন। ইন্‌শা-আল্লাহ্‌ খুব শীঘ্রই সশস্ত্র জিহাদ শুরু হচ্ছে। প্রত্যেক মুসলমানকে স্ব স্ব সাধ্য অনুযায়ী এই মহত্তম কাজে অংশ গ্রহণ করার জন্যে দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে।”

মুজাহেদীনের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সাজানো মোকদ্দমার নথিপত্র অনুযায়ী সশস্ত্র জিহাদ ঘোষণা করার সেদিনটি ছিল ১৮২৬ ধৃষ্টাব্দের ২১শে ডিসেম্বর। সেদিন থেকেই সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র মুজাহিদগণ সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

মাওলানা জাফর থানেশ্বরি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেনঃ “মাওলানা সৈয়দ আহমদ যখন শত শত মাইল দূরে গিয়ে শিখদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার সংকল্প ঘোষণা করেন তখন অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করেছিল যে, দেশের অভ্যন্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে সুদূর সীমান্ত এলাকায় গিয়ে শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অর্থ কি?

সৈয়দ সাহেব জবাবে বলেছিলেন, “প্রথমত ইংরেজরা এখনো মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় প্রত্যক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেনি। শিখেরা ধর্মকর্মে হস্তক্ষেপ করছে। দ্বিতীয়ত এদেশে ইংরেজ আধিপত্য মজবুত করার পিছনে শিখদের সক্রিয় সহযোগিতা সর্বজনবিদিত। তৃতীয়ত সীমান্ত মুসলিম আধিপত্য কায়েম হলে পরবর্তী পর্যায়ে সমগ্র উপমহাদেশকে সর্বপ্রকার শত্রুর কবলমুক্ত করা সহজ হবে।”

উপরোক্ত সুনির্দিষ্ট কতগুলো লক্ষ্য সামনে নিয়ে হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ হিজরী ১২৪১ (১৮২৫ধৃঃ) সনের প্রথমদিকে জন্মস্থল রায়বেরেলী থেকে যাত্রা শুরু করলেন, তাঁর সংগী-সাথীর সংখ্যা ছিল পাঁচ থেকে ছয় হাজার। এর মধ্যে কাফেলার রোজ-নামচা লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী বাংলার মুজাহিদ সংখ্যা ছিল এক হাজারের কাছাকাছি। তন্মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত নেতৃস্থানীয় লোক ছিলেন চল্লিশ জনের মতো। পাঞ্জাব ও সীমান্ত এলাকার মুসলমানদের হৃত ধর্মীয় অধিকার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অগ্রসরমান এই দীনি কাফেলা যাতে যাত্রা পথেই বাধাপ্রাপ্ত না হয়, সেজন্যে পাঞ্জাবের পথ পরিহার করে তাঁরা সিন্ধুর পথে অগ্রসর হতে থাকেন। পথে পথে হায়দারাবাদ, সিন্ধু, বাহওয়ালপুর হয়ে বোলান উপত্যকা অতিক্রম করে প্রথমে কান্দাহার ও পরে কাবুল গিয়ে উপনীত হন। পথিমধ্যে সিন্ধুর হায়দারাবাদ ও বাহওয়ালপুর এলাকার মুসলমানদের মধ্যেও জিহাদের দাওয়াত চলতে থাকে। মাওলানা ইসমাঈল শহীদ, মাওলানা আবদুল হাই, মাওলানা ইমামুদ্দীন বাঙালী, সূফী নূর মুহাম্মদ প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় আলেম ও বুযুর্গগণ স্থানে স্থানে ওয়ায-নসিহত করে জনগণকে জিহাদের মন্ত্রে উদ্দীপিত করতে থাকেন।

 হিন্দুস্তান থেকে কাবুল পর্যন্ত নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা এবং নতুন লোক ও অর্থ পৌঁছানোর সুব্যবস্থাও সম্পন্ন করা হয়।

কাবুলে কিছুকাল অবস্থান করে খায়বার গিরি পথ হয়ে কাফেলা এসে পেশোয়ার পৌঁছে। পেশোয়ারে তখন রঞ্জিত সি’এর তরফ থেকে একজন সুবেদার নিয়োজিত ছিলেন। তিনি রাজস্ব আদায় করে লাহোরে প্রেরণ করতেন। শিখ সেনাদের ছাউনী ছিল আটক দরিয়ার পূর্বপারে পাঞ্জাব সীমান্তে অবস্থিত একটি দুর্গে। দুর্গ থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত নিয়মিত সশস্ত্র প্রহরায় ডাক চলাচল করতো।

কোন কসবা বা শহরের লোকেরা অবাধ্যতা শুরু করলেই দুর্গ থেকে সৈন্য প্রেরণ করা হতো। চালানো হতো অবাধ লুণ্ঠন এবং অগ্নি সংযোগ। নির্বিচারে হত্যা করা হতো সে এলাকার লোকজনকে।

হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ সীমান্ত প্রদেশের কেন্দ্রস্থলে পেশোয়ারের সাথে শিখদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাফেলাসহ পেশোয়ার উপত্যকা পিছনে রেখে নওশেরায় গিয়ে উপনীত হলেন। এখানে দরিয়া আবাসীনের তীরে অবস্থান গ্রহণ করে নিজস্ব একজন দূতের মারফত রঞ্জিত সিং-এর লাহোর দরবারে একটা বিস্তারিত পত্র প্রেরণ করলেন। পত্রে তাঁর এই অভিযানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে মুসলিম জনগণের সংগে এ পর্যন্ত যে সব জুলুম করা হয়েছে তা বন্ধ করার নিশ্চয়তা বিধান এবং জবর দখলকৃত মুসলিম এলাকাগুলো মুক্ত করে দেওয়ার দাবী জানানো হলো।

উদ্ধত লাহোর দরবার একজন সংসারত্যাগী ফকীরের এ পত্রের কোন জবাব না দিয়ে মুজাহিদীণের এ কাফেলাকে শায়েস্তা করার হুকুম দিয়ে সরদার বুধসিং-এর নেতৃত্বে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে দিল। মুজাহিদগণের সংগে বুধসিং-এর মুকাবেলা হয় নওশেরা থেকে সাত-আট মাইল দূরবর্তী আকোড়াখটক নামক স্থানে। প্রথম এই মুকাবেলায় সরদার বুধসিং-এর বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।

আকোড়াখটকের যুদ্ধে বুধসিং-এর পরাজয়ের ফলে পেশোয়ারের সাথে শিখদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পেশোয়ারের সুবেদার ইয়ার মুহাম্মদ খান এবং তার ভাই পীর মুহাম্মদ খান এ খবর শোনার পর পত্র মারফত মুজাহিদগণের সংগে যোগাযোগ করতে শুরু করেন।

সরদার বুধসিংকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর থেকেই মুজাহিদগণ শিখদের তরফ থেকে একটা বড় ধরনের আক্রমণের আশংকা পোষণ করে আসছিলেন। নওশেরার পূর্বদিকে সিদোতে সম্ভাব্য সেই আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্যে প্রস্তুতি শুরু করলেন। ইতিমধ্যে হাযরো নামক স্থানে শিখদের একটা সমাবেশের খবর আসলো। ‘মনযুরা’ নামক রোজনামচার বর্ণনা অনুযায়ী বাংলার মুজাহিদগণ দ্বারা গঠিত একটা নৈশ অভিযানকারী দল অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে সে সমাবেশটা সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করে দেয়। এ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এবং রসদপত্র মুজাহিদগণের হস্তগত হয়।

পরপর দু’টি সংঘর্ষে জয়লাভ করার পর মুজাহিদগণের মনোবল বৃদ্ধি হওয়ার সাথে সাথে এলাকার জনগণের আস্থাও অনেকটা বর্ধিত হলো। এলাকার বিশিষ্ট আলেম এবং গোত্র সরদারগণের এক সমাবেশে ১৮২৭ সনেও ১১ই জানুয়ারী হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদকে “আমিরুল মুমেনীন” রূপে ঘোষণা করে তাঁর হাতে জিহাদ এবং ইমামতের বায়আত গ্রহণ করা হলো। পেশোয়ারের আমীর সরদার ইয়ার মুহাম্মদ খান দূত মারফত পত্র প্রেরণ করে “আমীরুল মুমেনীন”-এর প্রতি আনুগত্য বহাল রেখে বিশিষ্ট আলেমগণের একটি পরামর্শ মজলিশ কায়েম করে সমগ্র সীমান্ত প্রদেশে ইসলামী আইন কানুন জারী করার সুব্যবস্থা করেন। ‘মনযুরার’ লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী পেশোয়ারকেন্দ্রিক ইসলামী হুকুমতের পরামর্শ সভায় যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মাওলানা ইমামুদ্দিন বাঙালী।

পাঠান গোত্রপতিদের একটা অংশ প্রথম থেকেই হযরত সৈয়দ আহমদের কর্মতৎপরতার সাথে ঐকমত্য পোষণ করতে পারছিল না। শিখদের সাথে এদের নানা ধরণের বৈষয়িক স্বার্থ জড়িত ছিল। তাছাড়া দীর্ঘকালের নানা কুসংস্কারের ভাগাড়ে নিমজ্জিত মন-মানসিকতায় সৈয়দ সাহেবের কঠোর সংস্কার আন্দোলন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে শুরু করেছিল। পাঠানরা সাধারণতঃ পীরভক্ত জাতি। এদের এই স্বাভাবিক প্রবণতার সুযোগ নিয়ে প্রতি এলাকায় গড়ে উঠেছিল অসংখ পীরের গদী। এসব পীরের অধিকাংশ ছিল শরীয়তের অনুশাসনের সাথে সম্পর্কহীন এবং আকণ্ঠ নানা কুসংস্কারে নিমজ্জিত। সৈয়দ সাহেবেরর সংস্কার আন্দোলন তাদের গদিভিত্তিক স্বার্থ বিপন্ন করার উপক্রম করেছিল। তাই তারা তাঁর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার শুরু করলো। লাহোর দরবারের ইংরেজ উপদেষ্টারা এ বিরোধিতার আগুনে নানাভাবে ঘৃতাহুতি দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করলো না। পাঞ্জাব এবং সীমান্তের এক শ্রেণীর পেশাদার আলেমকে দিয়ে মুজাহিদ আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ফতওয়াবাজী শুরু করানো হলো। শিখদের কিছু অনুচরকে কৌশলে মুজাহিদগণের কাফেলার মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট করানো হলো। সিন্দুর যুদ্ধ যেদিন শুরু হয়, তার আগের রাত্রে হযরত সৈয়দ সাহেবের খাদ্য বিষ মিশিয়ে দেওয়া হলো। সকাল বেলায় মাওলানা মুহম্মদ ইসমাঈল সৈয়দ সাহেবের শয়ন কক্ষে গিয়ে দেখতে পেলেন তিনি অচেতন হয়ে পড়ে রয়েছেন। তাঁর মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছে। তড়িৎ চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে কিছুটা উপশম দেখা দিল। ইতিমধ্যে সিন্দুর ময়দানে বিরাট শিখ বাহিনীর হামলা শুরু হয়ে গিয়েছেল। আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত এ বাহিনীর মুকাবেলা করার মত অস্ত্র বা লোকবল মুজাহিদগণের ছিল না। স্বয়ং সৈয়দ সাহেব ছিলেন বিষক্রিয়ায় মৃতপ্রায়। এ অবস্থার মধ্যেই মুজাহিদগণ যুদ্ধ শুরু করলেন। সৈয়দ সাহেব একটু সুস্থ বোধ করলে কয়েকজন লোকের কাঁধে ভর করে তিনি ঘোড়ার উপর সওয়ার হলেন এবং ময়দানে চলে গেলেন। তুমুল যুদ্ধের পর মুজাহিদগণের আংশিক পরাজয় হলো এবং ময়দান ছেড়ে তাঁরা কিছুটা পিছু হট্‌তে বাধ্য হলেন। কিন্তু শিখ সৈন্যও অগ্রসর হতে পারলো না।

সিন্দুর যুদ্ধের ফলাফল প্রতিকুলে যাওয়ার পর থেকে মুজাহিদগণের সামনে একের পর এক নানা সঙ্কট ঘনীভূত হয়ে আসলো। শিখ এবং ইংরেজদের নিয়োজিত অনুচরবৃন্দের নানা অপপ্রচারের তাণ্ডবের মুখে আন্দোলনের গতি মূল হিন্দুস্তানের অনেকটা শ্লথ হয়ে পড়লো। কাফেলার খাদ্য এবং অন্যান্য রসদ মূলত হিন্দুস্তানীর সরবরাহ থেকেই আসতো। শিখেরা এ সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। ইতিমধ্যে এমন কয়েকটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল যার ফলশ্রুতিতে মূল আন্দোলন মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হলো। মৌলবী মাহবুব আলী নামক একজন মুজাহিদ নেতার নেতৃত্বে বিহারের এবং বাংলার একদল মুজাহিদ পেশওয়ারের পথে রওনা হয়ে সীমান্ত প্রদেশে প্রবেশ করার পর দুররানী পাঠানদের দ্বারা আক্রান্ত হন এবং লুণ্ঠিত ও সর্বস্বান্ত হয়ে মূল কাফেলা পর্যন্ত এসে উপনীত হন। পাঠানদের দুর্ব্যবহারে মৌলভী সাহেব এতই মর্মাহত হয়েছিলেন যে, কাফেলার লোকজনকে তিনি দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যে তুমুল প্রচারণা শুরু করেন। ফলে কিছুলোক মনঃক্ষুণ্ন হয়ে তাঁর সাথে দেশে ফিরে আসে। এতে মুজাহিদ বাহিনীর অপূরণীয় ক্ষতি হয়। ইতিমধ্যে প্রচণ্ড শীতে ও খাদ্যাভাবে মুজাহিদগণ চরম দুর্দশার সম্মুখীন হন। অনেক সময় দিনের পর দিন তাঁরা গাছের পাতা সিদ্ধ করে ক্ষুণ্নিবৃত্তি নিবারণ করতেন। এ সঙ্কটময় অবস্থার মধ্যেই হযরত সৈয়দ সাহেবের অন্যতম প্রিয় সাথী এবং সর্বাপ্রেক্ষা প্রাজ্ঞ উপদেষ্টা বলে পরিচিত মাওলানা আবদুল হাই লাখনৌভী ইন্তেকাল করেন (২৪শে ফেব্রুয়ারী, ১৮২৮খৃঃ)।

‘ওয়াকায়ে-এ আহমদী’র লেখকের মতে মুজাহিদ আন্দোলনের এই চরম দুর্দিনে সর্বপ্রথম নতুন লস্কর এবং অর্থ-সাহায্য এসেছিল বাংলাদেশ থেকে। ঢাকার মুজাহিদগণের দ্বারা প্রেরিত এই সাহায্য পৌঁছার পর থেকে একটানা উপবাসের অবসান হয়। মুজাহিদগণ নতুন করে উদ্দীপনা লাভ করেন।

জন্মভূমি এবং পরিবার-পরিজন থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অপরিচিত অনভ্যস্ত দুর্গম পার্বত্য এলাকার প্রতিকূল পরিবেশে সীমাহীন আপদ-বিপদের মধ্যেও মুজাহিদগণ শিখদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে যেতে লাগলো। মাওলানা ইসমাঈল শহীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এসব অভিযানের প্রতিটিতেই বিপুল সাফল্য অর্জিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত রাজা রঞ্জিত সিং সৈয়দ সাহেবের আবাসীন দরিয়ার বাম দিককার সমগ্র এলাকা ছেড়ে দিয়ে তাঁর সংগে আপোষ-মীমাংসা করার প্রস্তাবসহ হাকীম আজীজুদ্দিন ও সরদার ওজীর সিংকে দূতরূপে প্রেরণ করে। সৈয়দ সাহেব মৌলবী খায়রুদ্দীন শিরকুটী ও হাজী বাহাদুর খানের মাধ্যমে সন্ধির শর্তাদি লিখে পাঠান। তাঁর দাবী ছিল, সীমান্তের যেসব এলাকায় ইসলামী হুকুমত কায়েম হয়ে গেছে, সেসব এলাকায় শিখেরা আর আক্রমণ করবে না। শিখ শাসিত অবশিষ্ট এলাকায় মুসলমানদিগকে পূর্ণ ধর্মীয় আজাদী দিতে হবে। দখলীকৃত মসজিদগুলো ছেড়ে দিতে হবে।

রঞ্জিত সিং এসব শর্ত মেনে নিয়েই মুজাহিদগণের সংগে একটা সম্মানজনক সন্ধি করার জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু লাহোর দরবারের ইংরেজ উপদেষ্টা জেনারেল ভিন্টোরা সন্ধির প্রস্তাবে একমত না হয়ে নানা কূটকৌশলের পথে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দিল। এরা এমন একটা ষড়যন্ত্রের নীলনক্‌শা তৈরী করলো, যদ্দ্বারা পাঠান সর্দার এবং মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে হানাহানি সৃষ্টি করে দেওয়া যায়। ফলে দেখা গেল, কিছুদিনের মধ্যেই শিখদের পরিবর্তে মুজাহিদগণ পাঠান সর্দারদের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। পেশওয়ারের আমীর সরদার বাহাদুর খান জেনারেল ভিন্টোয়ার উস্কানীতে মুজাহিদগণের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করলো। কিন্তু প্রথম হামলাতেই বাহাদুর খান নিহত এবং সৈন্যবাহিনী পর্যুদস্ত হয়ে গেল। তার কনিষ্ঠ সহোদর সর্দার সুলতান মুহাম্মদ খান আরবাব ফয়জুল্লাহর মাধ্যমে সৈয়দ সাহেবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় এবং পেশওয়ারের আমীর পদে তাকে বহাল করা হয়। মাওলানা সৈয়দ মাজহার আলী আজিমাবাদীকে প্রধান কাজী নিযুক্ত করে শাসন ও বিচার বিভাগের সর্বক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়ত জারী করা হয়। কিন্তু ব্যাপক ষড়যন্ত্রের মুখে এ ব্যবস্থা বেশী দিন টিকে থাকতে পারলো না। ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত পাঠান সর্দারদের মধ্যে শরীয়তের স্বচ্ছ জীবন-ব্যবস্থা নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো। এ সুযোগে লাহোর দরবারের উপদেষ্টা জেনারেল ভিন্টোরা পাঠান সর্দারদের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বণ্টন করে সৈয়দ সাহেবের তরফ থেকে নিয়োজিত ওশর আদায়কারী মুজাহিদ নেতৃবৃন্দকে একই রাতে হত্যা করার ব্যবস্থা করে। বার্মা সীমান্ত থেকে শুরু করে সমগ্র হিন্দুস্তান থেকে আগত আল্লাহর পথে নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদ নেতৃবৃন্দ, যাঁরা বাড়ীঘর পরিবার-পরিজন ত্যাগ করে সীমান্তের জনগণকে শিখ নির্যাতনের যাঁতাকল থেকে উদ্ধার করার জন্য ছুটে এসেছিলেন, তাদের সবাইকে একই রাতে এশার নামাযে রত অবস্থায় অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।

এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের খবর সৈয়দ সাহেব এমন মর্মাহত হয়েছিলেন যে, পাঠানদের মধ্যে কাজ করার সকল উৎসাহ তিনি হারিয়ে ফেললেন। মুজাহিদগণকে ডেকে স্ব স্ব জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুমতি দিলেন। কিছুলোক তাঁর অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে দেশে ফিরে এলো। কিন্তু অন্যান্য অনেকের সংগেই বাংলার মুজাহিদগণ সৈয়দ সাহেবের সংগত্যাগ করতে প্রস্তুত হলেন না। ‘ওয়াকায়ে-এ আহমদী’র লেখকের মতে এই সঙ্কটজনক অবস্থায় মাওলানা ইমামুদ্দিন বাঙালীর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি এবং মৌলবী এনায়েতুল্লাহ উরফে মিয়াজান কাজীর উদ্দীপনা মুজাহিদগণের মধ্যে নতুন মনোবলের সৃষ্টি করেছিল।

পেশোয়ার উপত্যকায় অবস্থান অর্থহীন বিবেচনা করে সৈয়দ সাহেব কাগানের পার্বত্য এলাকার দিকে যাওয়ার সিন্ধান্ত গ্রহণ করে সেদিকে অগ্রসর হতে থাকেন। কিন্তু পথিমধ্যে বালাকোটের সন্নিকটে উপনীত হওয়ার সাথে সাথে সর্দার শেরসিং-এর নেতৃত্বে একটি বিরাট শিখ সৈন্যবাহিনী এসে সমগ্র এলাকা ঘিরে ফেললো। বালাকোটের ময়দানে অনুষ্ঠিত হলো শেষযুদ্ধ। এ যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে জয়ী হয়েও সংগীয় কিছু লোকের বিশ্বাসঘাতকতায় আমীরুল মুমেনীন হযরত সৈয়দ আহমদ বেরেলবী এবং তাঁর প্রধান সহচর মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল শহীদ হলেন। (৬ই মে, ১৮৩১খৃঃ)। সমাপ্ত হলো জিহাদ আন্দোলনের এক অধ্যায়।

বালাকোট যুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, তাদের সংখ্যা দু’শতাধিক বলে বর্ণনা করা হয়। তন্মোধ্যে নেতৃস্থানীয় একশো একচল্লিশ জনের নাম যুদ্ধের রোজনামচা থেকে সংগ্রহ করে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য কিতাবাদিতে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এই অমর শহীদানের তালিকায় বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় অন্ততঃ নয়জন মুজাহিদের নাম এ পর্যন্ত সংগ্রহ করা সম্ভবপর হয়েছে। এরা হচ্ছেন- রাজমহলের মুন্সী মুহাম্মদী আনসারী, মাওলানা শরফুদ্দীন বাঙালী, নোয়াখালীর মাওলানা লুৎফুল্লাহ, মোমেনশাহীর মুন্সী ইবরাহীম, কলিকাতার নওমুসলিম মুহম্মদ আবদুল্লাহ, ঢাকার সৈয়দ মুজাফফর হোসাইন ও মৌঃ করিম বখশ, চট্টগ্রাম এলাকার মৌলবী আলীমুদ্দিন এবং চব্বিশ পরগণার মৌলবী ফয়জুদ্দিন।

মাওলানা ইমামুদ্দীন বাঙালীসহ বাংলাদেশের যেসব মুজাহিদ গাজী গুরুতররূপে আহত হয়েছিলেন, তাদের সংখ্যা চল্লিশ জনের মতো বলা হয়। কিন্তু অনেক তালাশ করেও আহত গাজীগণের তালিকা সংগ্রহ করা সম্ভবপর হয়নি।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বালাকোটের ময়দানে কাফেলার ভিতরে কিছু সংখ্যক বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্তের ফলেই আমিরুল মুমেনিন হযরত সৈয়দ আহমদ এবং তাঁর শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীগণ শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু এই শাহাদাত জিহাদ আন্দোলনকে এক মুহূর্তের জন্যেও স্তব্ধ করতে পারেনি। হতাবশিষ্ট মুজাহিদ্গণ সৈয়দ সাহেবের আকস্মিক শাহাদাতের শোক ভুলতে না পারলেও অবিশ্বাস্যরকম দ্রুততার সাথে পুনঃগঠিত হয়েছিলেন এবং পশ্চিমদিকে গভীর পার্বত্য এলাকায় সরে গিয়ে সিতানায় কেন্দ্র স্থাপন করে জিহাদ অব্যাহত রেখেছিলেন।

বাংলার মুজাহিদ গাজীগণ মাওলানা ইমামুদ্দিনের নেতৃত্বে দেশে ফিরে আসলেন। ছুফী নূর মুহাম্মদ সিতাকুন্ড পাহাড়ের পাদদেশে নেজামপুরে এসে আস্তানা স্থাপন করলেন। মাওলানা আদুল হাকীম স্থান নির্বাচন করলেন চট্রগ্রাম থেকে আরো দূরে আরাকান সড়কের পাশে গভীর অরণ্যানী ঘেড়া চূনতী গ্রামে। মৌলবী এনায়েতুলাহ উরফে মিয়াজান কাজী দেশে ফেরার পথে পানিপথে গ্রেফতার হয়ে ফাসীর মঞ্চে শাহাদাত বরণ করেছলেন। মাওলানা ইমামুদ্দিন বাঙ্গালী দীর্ঘকাল সিতানার কেন্দ্রে অবস্থান করার পর নোয়াখালীর হাজীপুরে ফিরে এলেন। এদিকে ঢাকার বংশাল এলাকায় গড়ে তোলা হলো আন্দোলনের গোপন কেন্দ্র। এখান থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে পাটনা এবং পাটনা থেকে বাহওয়ালপুরের খানপুর হয়ে মুজাহিদগণএর কাফেলা নিয়মিত সিতানায় যাতায়াত করতে লাগলো। প্রায় এক শতাব্দিকাল ধরে অব্যাহত ছিলো এই যোগাযোগ। বংশালের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বদরুদ্দিন ছিলেন অত্র অঞ্চলের মুজাহিদগণের অন্যতম প্রধান মুরুব্বী। তিনি নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করে পাটনার কেন্দ্রে প্রেরণ করতেন। পাটনা থেকে সে অর্থ চলে যেতো মুজাহিদগণের সিতানার ছাউনীতে। লোক-লস্কর সংগৃহীত হতো এবং তাঁরাও হাজী সাহেবের লেখা নিয়ে চলতেন পাটনায় ফুলওয়ারীতে।

হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদের আন্দোলন ছিল মূলত সংস্কারধর্মী। সীমান্তে মুজাহিদ অভিযান ছিল এর একটা অধ্যায় মাত্র। একটা বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে তিনি মুজাহিদীনের কাফেলাকে সীমান্তের দূর্গম পার্বত্য এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সে উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছিল। মুজাহিদীনের রক্তদানের বদলায় সীমান্ত এবং পাঞ্জাবের মুসলমানগণ আগ্রাসী শিখ শক্তির নির্যাতন থেকে অনেকটা রক্ষা পেয়েছিলেন। উপরন্তু পেশোয়ারকেন্দ্রিক একটি ইসলামী খিলাফত কায়েম করে চার বছরাধিকাল তা পরিচালনা করার মাধ্যমে পরবর্তী যুগের ঈমান-সম্বৃদ্ধ মুসলমানদের সামনে নবুওতের আদর্শে খিলাফতের এমন এক বাস্তব নমুনা তিনি পেশ করে গেছেন, যা আজ পর্যন্ত ইসলামী হিলাফত প্রতিষ্ঠাকামীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

হযরত সৈয়দ সাহেবের সংস্কার আন্দোলনের উত্তরাধিকার যাঁরা এ বাংলার জমিনে বহন করে গেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাপ্রেক্ষা স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব তাঁর অন্যতম বিশিষ্ট খলীফা মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী। ইনি সারা জীবন বাংলা-আসামে ঈমান-আখলাক সংস্কারের প্রচেষ্টা চালিয়ে এ বাংলার মাটিতেই চির নিদ্রায় শায়িত রয়েছেন। তাঁর সে প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা তাঁর সুযোগ্য বংশধর এবং বহুসংখ্যক অনুসারীর মাধ্যমে এদেশে আজো অব্যাহত রয়েছে। মাওলানা ইমামুদ্দিন ও মাওলানা আবদুল হাকীম প্রধানত মুজাহিদ সংগঠনের কাজেই নিয়োজিত থাকেন। জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তাঁরা এ কাজ করে গেছেন। মুসলিম জনগণের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও তাঁদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো।

সূফী নূর মুহাম্মদের সংস্কার আন্দোলনের প্রধান উত্তরাধিকারী ছিলেন কলকাতার সূফী ফতেহ্‌ আলী। সূফী ফতেহ্‌ আলীর খলীফা বাংলার মোজাদ্দেদ ফুরফুরার মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক এবং তাঁর খলীফাগণের মধ্যে শর্ষিনার মাওলানা নেছারউদ্দিন ও চব্বিশ পরগণার মাওলানা রুহুল আমীন সাহেবের দীনি খেদমত এদেশে সর্বজনবিদিত।

উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন যে, হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদের এসব অনুসারীর কর্মপ্রচেষ্টা শুধু ওয়ায-নসিহতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এদেশের পর্যুদস্ত মুসলমানের ঈমান-আকীদার সংস্কার করার সাথে সাথে শিক্ষা বিস্তার এবং শোষিত-নৈরাজ্য-পীড়িত জনগণের মধ্যে অধিকার সচেতনতা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রেও তাঁদের অবদান ছিল সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ। অপরদিকে বালাকোট পরবর্তী সশস্ত্র সংগ্রাম সিপাহী বিপ্লব থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সনে উপমহাদেশ থেকে ইংরেজ বিতাড়ন পর্যন্ত যতগুলো গণ-আন্দোলন হয়েছে, তার প্রতিটি আন্দোলন সংগঠনে সৈয়দ আহমদ শহীদের মুজাহিদ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করার মতো।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
al farabi and the lost concept of civilization

আল-ফারাবি এবং সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া ধারণা

ইব্রাহিম কালিন | ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০১৭
Download PDF

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দার্শনিকদের অন্যতম একজন হলেন আবু নাসর মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ আল-ফারাবি (৮৭২-৯৫০)। অধিবিদ্যা (metaphysics), জ্ঞানতত্ত্ব অথবা রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা কখনো হারিয়ে যায় না। ইবনে ফারাবির ‘নৈতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত নগর’ (আল-মাদিনাহ্‌ আল ফাদিলাহ্‌) ধারণাটি ইসলামী এবং গ্রীক নীতিশাস্ত্র ও রাজনৈতিক চিন্তাব্যাবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায় প্রতিনিধিত্ব করে।

তিনি নগর জীবন, সভ্যতা এবং অধিবিদ্যার মাঝে একটি সংযোগ সৃষ্টি করেছেন। যদিও এই ধারণাগুলো সঠিক অর্থে আমাদের পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছে, কিন্তু মানুষের উপযুক্ত আবাস হাজির থাকার জন্যে এই ধারণাগুলোর পারস্পারিক সংযোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আল-ফারাবির এই সংযোগ প্রচেষ্টাকে তাই পুনরুদ্ধার করার প্রয়োজন রয়েছে।

১৭৫৭ সালে ‘সভ্যতা’ শব্দটি প্রথম যখন ভিক্টর রিকেতি মিরাবু তার “মানুষের বন্ধু বা জনগণের চুক্তিনামা” (L’ami des hommes ou traité de la population) শীর্ষক গ্রন্থে ব্যবহার করেছিলেন, তখন থেকেই এই শব্দটির সাথে একটি বাজে ইতিহাস জড়িত ছিল। শব্দটির এহেন খারাপ পরিচয় ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। উপনিবেশবাদীরা তাদের তথাকথিত “সাদা মানুষের গুরুদায়িত্ব” এবং “সভ্যায়ণ কর্মসূচি”–কে ন্যায্যতা প্রদানের জন্যে ‘সভ্যতার’ ধারনাটি ব্যবহার করেছিল।

১৮ শতাব্দীতে এসে পৃথিবীটা সুস্পষ্টভাবে ‘সভ্য’ ও ‘অসভ্য’ দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এটি আশ্চর্যজনক নয় যে, ইউরোপ প্রতিনিধিত্ব করেছিল সভ্যতার, এবং পৃথিবীর বাকি অংশটা আদিমতা আর বর্বরতার। সভ্য জাতিগোষ্ঠীর মাঝে শামিল হবার জন্য অসভ্য জাতিগুলোর প্রয়োজন হয়েছিলো পশ্চিমা সভ্যতার যাদুকরী এবং প্রায়ই কঠোর স্পর্শের।

প্রায় দুই শতাব্দী পর একবিংশ শতাব্দীতে যখন স্যামুয়েল হান্টিংটন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর তাঁর বিখ্যাত একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন, সেখানে সভ্যতার পরিবর্তে সরাসরি “সংঘাত”-কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। হান্টিংটন পুরাতন উপনিবেশবাদীদের মত ছিলেন না ঠিক, কিন্তু তাঁর ‘সংঘাত তত্ত্বটি’ শেষে গিয়ে ক্লাসিক্যাল পশ্চিমা উপনিবেশবাদেরই কাছাকাছি একটি ধারণাকে সমর্থন দিয়েছে। তাঁর সংঘাত তত্ত্বের বাজারীকরণের ফলে যে প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে, আমরা এখনো তা মোকাবেলা করছি।

সভ্যতা শব্দটির আজ যে অপব্যবহার হচ্ছে, সেখানে একজন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারক হিসাবে আল-ফারাবিকে আনা যেতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক মডেল যেটিকে তিনি ‘নৈতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত নগর’ (আল-মাদিনাহ্‌ আল ফাদিলাহ্‌) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তা প্লেটো-এরিস্টটলীয় চিন্তার এবং সেইসাথে ইসলামের উন্নত জীবন, সুখ ও অধিবিদ্যা ধারণাগুলোর ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হয়েছে। তাঁর মৌলিক প্রস্তাবনাটা হল অধিবিদ্যা এবং নৈতিকতার ভিত্তি ব্যতীত কোনো সভ্যতা ও নগর জীবন হতে পারে না।

শহর হচ্ছে মানব জীবনের সার্বিক মানোন্নয়নের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট একটি সামষ্টিক ব্যাবস্থা। শহর মানুষের সত্ত্বাগত একটি প্রয়োজন; কারণ, কোনো মানুষ একা একা বাস করতে পারে না, এবং একা একা তার নিয়তি পূর্ণ করতে পারে না। ‘একজন মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং তার সর্বোচ্চ উৎকর্ষ সাধনের জন্যে’ তার অন্য মানুষের প্রয়োজন হয়।

মানুষের সমষ্টিগত জীবনের উদ্দেশ্য হোলো তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নৈতিক উৎকর্ষ সাধন করা। এ কারণে মানুষের সত্ত্বা ও নৈতিকতার ধারণা একটি অর্থপূর্ণ শহরের আকার গড়ে তুলতে ভুমিকা রাখে, যেখানে কেবল পাশবিক বাসনা পূরণ এবং অন্যের উপর আধিপত্য জাহির করা প্রধান নয়, বরং একটি সুখী জীবনযাপন করাই উদ্দেশ্য – এরিস্টটলের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘উন্নত জীবন’।

আর যাই হোক না কেনো, সমষ্টিগত জীবন জরুরীভাবে একাই কল্যাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। মানুষের সকল কার্যক্রমই নৈতিক পছন্দ ও অপছন্দের দ্বারা পরিচালিত হয়, তাই, শহর ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সত্য এবং পারস্পারিক সহানুভূতির উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে যে শহরের বাসিন্দারা তাদের বুদ্ধিমত্তা ও ইচ্ছাশক্তির ব্যবহার করে এবং সর্বসাধারণের ভালোর জন্যে কাজ করে সেটাই একটি ভালো শহর। অর্থনৈতিক শক্তিমত্তা, সামরিক বা তথ্যপ্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠতার কারণে একটি শহর, দেশ বা সাম্রাজ্য মানব আবাসস্থল হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠে না, বরং নৈতিক সংশোধন ও আধ্যাত্মিক সুখের অঙ্গিকারই মানব আবাসস্থলকে আকাঙ্খিত করে তোলে।

ন্যায়-নীতিপূর্ণ একটি শহর এবং বৃহত্তর ক্ষেত্রে একটি সভ্যতার সবার আগে বস্তুগত ভিত্তিমূলের পরিবর্তে বরং একটি অধিবিদ্যিমূলক ভিত্তিমূল থাকে। আল-ফারাবীর সংজ্ঞা অনুসারে, সুখ ও উন্নত জীবন কেবল তখনি লাভ করা যায়, যখন কেউ সত্যের সন্ধান পায় এবং ‘বিমূর্ত বুদ্ধিমত্তার (disembodied intellect) সাথে একতাবদ্ধ হয়’ অর্থাৎ বস্তুগত আবেদন ও কামনার বেড়াজালে আবদ্ধ এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর বাইরে বোধগম্য সত্যের দুনিয়া।

‘সত্য’ ব্যতীত আমরা না পারব প্রকৃতির হক আদায় করতে, আর না পারব মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতে। যদিও মানব সমাজ তাদের নগর জীবনের বস্তুগত ভিত্তিকে অগ্রাহ্য করতে পারে না; সুতরাং, বিষয়টি পৃথিবীকে বর্জন করার ব্যাপারে না, বরং পৃথিবীকে তার উপযুক্ত স্থানে রাখা এবং এর ভিতরে নিমজ্জিত না হওয়া।

আল ফারাবি নগর জীবন ও সভ্যতার অধিবিদ্যামূলক ভিত্তির উপর এতই জোরালোভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন যে তাঁর রাজনৈতিক লেখনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনি অধিবিদ্যা (metaphysics), সৃষ্টিতত্ত্ব (cosmology) এবং তত্ত্ববিদ্যার (ontology) জন্যে উৎসর্গ করেছেন। তিনি তাঁর পাঠকদেরকে রাজনীতি বুঝার আগে সত্তা ও অস্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ ক্রমধারাটা (great chain of being) বুঝার আহবান জানিয়েছেন। ইসলামী বুদ্ধিভিত্তিক ঐতিহ্যের প্রকৃতি অনুসারে এটা বোধগম্য যে আসমানি আদেশের মৌলিক রীতিনীতি অনুধাবন করা ব্যতীত কোনো ধরণের রাজনৈতিক ব্যাবস্থাই টিকে থাকতে পারে না।

মানবজাতি তার অস্তিত্বের সার্বিক প্রাসঙ্গিকতা যে প্রেক্ষাপটে আমরা বুদ্ধিমান ও স্বাধীন মানুষ হিসেবে বসবাস করি তা বোঝাপড়াই না আনলে কোন সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন সুখ বয়ে আনবে না এবং জীবন পরিপূর্ণতা পাবে না। সত্য, প্রজ্ঞা ও ন্যায়-নীতি এই ধারণাগুলোর সাথে বিভিন্ন জাতি একমত না হলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না।

ইবন সিনা তাঁর মাস্টারপিস ‘শিফা’-এর মধ্যে এই বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, কিছু ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা ব্যতীত মানুষের পারস্পারিক সহযোগিতাগুলো অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে না; আর তা তখনি কেবল সম্ভব হয়, যখন মানুষ সঠিক পথ (সুন্নাহ্‌) এবং ন্যায়-নীতি (‘আদল)-এর দ্বারা পরিচালিত হয়। দেখুন, ইবনে সিনা এখানে সমষ্টিগত জীবন, নগরায়ন এবং সভ্যতাকে উচ্চতর নৈতিক ভিত্তির উপর স্থাপন করার জন্যে ‘সুন্নাহ’ শব্দটি ব্যাবহার করেছেন। এখানের ‘সুন্নাহ্‌’ শব্দটি এবং রাসূল (স)–এর সুন্নাহ্‌—শব্দ দুটি একই। রাসূল (স)–এর সুন্নাহ্‌ হোলো এমন একটি সঠিক পথ যা বিশ্বাস, বুদ্ধিমত্তা ও সৎকাজের উপর ভিত্তি করে জীবন পরিচালনার রূপরেখা প্রদান করে।

ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (স)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি সঠিক পদ্ধতিতে মদিনায় একটি ইসলামী শহর গড়ে তোলেন। মদিনার মুসলিম শাসনের একদম শুরুর দিকের মুসলিম সমাজ সেখানে শুধু নগর জীবনের স্বাদ-ই পায়নি, বরং একটি সভ্যতার ভিতরে থাকার অভিজ্ঞতাও লাভ করেছিলো। মদিনার এই অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যৎ ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি তৈরি করেছিল। শাব্দিক উৎপত্তির দিক থেকে আরবি ও পশ্চিমা ভাষাগুলোতে ‘শহর’ ও ‘সভ্যতা’ শব্দ দুটি সাদৃশ্য রাখে যেটি ন্যায়নীতিপূর্ণ শহর ও সভ্যতার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখে। ইবনে সিনা শাব্দিক এ বিষয়টা খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন, এবং একটি অর্থপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের জন্যে সত্য-ন্যায়বিচারের সঠিক পথের গুরুত্ব কেমন তা উল্লেখ করেছেন।

আমরা আজ বৈশ্বিক যে দুর্যোগের মুখে আছি, সেখানে নগর জীবন এবং সভ্যতার এই অর্থগুলো আমাদের পুনরুদ্ধার করা উচিত। সভ্যতাকে সাম্রাজ্যবাদ ও দখলদারিত্বের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে আমাদেরকে সত্য, পুণ্য, বোঝাপাড়া ও সহমর্মিতার মূলনীতির উপর ভিত্তি করে সভ্যতা গড়ে তুলতে হবে।

সূত্রঃ Daily Sabah

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
islam and enlightenment

ইসলাম এবং এনলাইটেনমেন্ট

ইব্রাহিম কালিন | অগাস্ট ২৫, ২০১৬
Download PDF

ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের পর বিশ্ববাসী ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ, আফ্রিকার দাসপ্রথা, দু দুটো বিশ্বযুদ্ধ এবং রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার প্রত্যক্ষ করেছে। এসব ঘটনাসমূহকে পটভূমিতে রাখলে পাশ্চাত্য কর্তৃক মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং অজ্ঞতার অভিযোগটি হালে পানি পায় না।

ISIS, আল কায়েদা, বোকো হারাম এবং অন্যান্য অনুরূপ সংগঠনের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে শেষমেশ ইসলামিক এনলাইটেনমেন্টের আহবান জানানো হয়। বলা হয়ে থাকে যে, ইসলামের ভেতরে এনলাইটেনমেন্টের আন্দোলন সহিংসতা হ্রাস এবং সহিষ্ণুতা, যুক্তিবাদিতা ও স্বাধীনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। এই আহবান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী-মানবতাবাদী (secularist-humanist) পূর্বানুমানের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে যার কথা হল ধর্ম সহিংসতার জন্ম দিয়ে থাকে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা শান্তি নিশ্চিত করে। কিন্তু ব্যাপারটি অতো সরল নয়, বরং আধুনিক সহিংসতার ইতিহাস আমাদের সামনে এর চেয়ে অনেক বেশী জটিল একটি চিত্র উপস্থাপন করে।

মিডিয়ার সংবেদনশীল শিরোনামের আড়ালে এনলাইটেনমেন্টের অর্থ নিয়ে বিতর্ক এখন ইসলাম এবং ভবিষ্যৎ ইসলাম-পাশ্চাত্য সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। লুই দুপ্রে তাঁর বই ‘The Enlightenment and the Intellectual Foundations of Modern Culture’ এর  ভূমিকায় ১১ সেপ্টেম্বর এর আক্রমণ দ্বারা হতভম্ভ হয়ে মন্তব্য করেন, “এমন একটি সময়ে এনলাইটেনমেন্টের কথা লিখে কি লাভ-ই বা আছে যখন নিষ্ঠুরভাবে এর মূল্যবোধ এবং আদর্শের সমাপ্তি ঘোষিত হচ্ছে।” দুপ্রে অবশ্য ইসলামী সংস্কৃতিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন বলছেন না। কিন্তু তাঁর পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, “ইসলামকে কখনোই এর রূহানী দর্শনের যৌক্তিকতা চুলচেরা বিশ্লেষণ করার জন্য দীর্ঘ সময় অতিক্রম করতে হয় নি, যেমনটি কিনা পাশ্চাত্যকে অষ্টদশ শতাব্দীতে করতে হয়েছে।”

কেউ কেউ তো আরো বেশী দূরদর্শী ভূমিকা পালন করতে গিয়ে ইসলামিক এনলাইটেনমেন্ট এবং মুসলিমদের সংস্কারের কথা বলেছেন। ১৬ই ডিসেম্বর ২০০১-এ নিউইয়র্ক টাইমসের শিরোনাম ছিলঃ ‘Wanted, an Islamic enlightenment to end religious tolerance’। ১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর রক্ষণশীল পত্রিকা ‘দ্য ন্যাশনাল রিভিউ’ এর সম্পাদকগণ আফসোস করেছেন এজন্য যে, ইসলাম  ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের মত ‘শুদ্ধিকরণের অভিজ্ঞতার’ মধ্য দিয়ে যায় নি।

এনলাইটেনমেন্ট এবং আধুনিক সহিংসতা

সৌভাগ্যক্রমে, এখনো কিছু কিছু যৌক্তিক কন্ঠস্বর বিদ্যমান যারা এনলাইটেনমেন্ট প্রকল্পের আভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং ইসলামিক ও পাশ্চাত্য সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জন এম. ওয়েন চতুর্থ এবং জে. জুড ওয়েন বলেন, “এনলাইটেনমেন্ট পাশ্চাত্যে সহিংসতা এবং আত্মঘাত বন্ধ করেনি (যেমন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ফ্যাসিজম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধ)। ইসলামিক বিশ্বে এনলাইটেনমেন্টের ডাক দিতে গিয়ে সচরাচর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়; বিশেষ করে এই ব্যাপারটি যে, ইসলামী বিশ্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজেদের এবং পাশ্চাত্যের এনলাইটেমেন্টের বিষয়টির সাথে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করে যাচ্ছে।”

ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টকে আলিঙ্গন করে নিলে সহিংস চরমপন্থাকে দমন করা যাবে এই দাবীটি মোটেই বাস্তবতা দ্বারা সমর্থিত নয়। হান্নাহ এরেন্ডট আরো অর্ধশতাব্দী পূর্বে প্রকাশিত হওয়া তাঁর মৌলিক গ্রন্থ ‘The Origins of Totalitarianism’-এ নাৎসি জার্মানী এবং স্ট্যালিনের রাশিয়ার আধুনিক একনায়কতন্ত্রের আদি উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে এসব একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা মূলত এনলাইটেনমেন্ট কল্পিত আধুনিক রাজনৈতিক প্রকল্প থেকে উঠে এসেছে।

ইহুদী বিদ্বেষ (anti-semitism) ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে শুরু করে আণবিক বোমার ব্যবহার ও শয়তানের অক্ষশক্তি সবকিছু একই বিন্দুতে মিলিত হয়ে সাম্প্রতিক মানব ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ, আফ্রিকান দাসপ্রথা, দুটো বিশ্বযুদ্ধ, হলোকস্টের ভয়াবহতা, বলকান এবং আফ্রিকায় জাতিগত নিধন এবং জৈব-রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার মত সব বিভীষিকাই সংঘটিত হয়েছে এনলাইটেনমেন্টের পরবর্তী সময়ে।

মৌলিকভাবে এসব বিপর্যয়ের খুব কমই ধর্মের সাথে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও একই কথাই বলছে। গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্স ২০১৪ এর মতে, পুরো পৃথিবীজুড়ে নরহত্যা জনিত ঘটনায় সন্ত্রাসবাদের চেয়ে প্রায় ৪০ গুণ বেশী লোক নিহত হয়েছে। ২০১২ সালে নরহত্যার কারণে ৪৩৭০০০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যেখানে সন্ত্রাসের কারণে প্রাণ হারিয়েছে ১১০০০। একই রিপোর্ট অনুযায়ী, “ধর্মীয় আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারটি আংশিকভাবে একটি বৈশ্বিক ব্যাপার। ধর্মানুপ্রাণিত সন্ত্রাসের ঘটনা সাব-সাহারান আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তার লাভ করলেও বিশ্বের বাকি অংশে সন্ত্রাসবাদের পিছে চালকশক্তি হিসেবে কাজ করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক অথবা জাতীয়তাবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলো।”

গবেষণাগুলোতে দেখা গিয়েছে যে, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আলকায়েদা সম্পর্কিত চরমপন্থীদের চেয়ে ডানপন্থী চরমপন্থীদের হাতে বেশী লোক নিহত হয়েছে।

কিন্তু বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসবাদের উপর গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনের মাত্রার ভিন্নতা বেশ সাধারণ একটি ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহারণস্বরূপ বলা যায়, বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে পিকেকের সন্ত্রাসবাদ বেশ উঠতির দিকে রয়েছে। পিকেকের সন্ত্রাসবাদের কারণে ১৯৮০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারেরও বেশী লোক প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু এরপরেও পিকেকের সন্ত্রাসবাদী কলাকৌশলকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এর মার্ক্সিস্ট-লেনিনিষ্ট এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শকে খুব সামান্যই সামনে আনা হয়। এর চেয়েও বড় ধান্দাবাজি হল, সিরিয়ায় আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অজুহাতে পাশ্চাত্যের বড় বড় গণমাধ্যমগুলো দ্বারা পিকেকের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপসমূহকে আড়াল করার প্রচেষ্টা।

প্রকৃতপক্ষে, সহিংসতাকে জায়েজ করার জন্য ধর্মকে টেনে আনা জরুরী নয়। ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদীধর্ম বা বৌদ্ধধর্মের নামে সহিংসতা করা হলেও, আধুনিক বিশ্বে ধর্ম সহিংসতার একমাত্র চালক নয়। এনলাইটেনমেন্টের অন্যতম একটি প্রতিশ্রুতি যদি যুক্তিবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকরণের মাধ্যমে অধিকতর শান্তি এবং কম সহিংসতা নিশ্চিতকরণ হয়ে থাকে, তবে তার বাস্তবায়ন খুব কমই হয়েছে।

এনলাইটেনমেন্ট কি ছিল? 

অষ্টাদশ শতাব্দীতে এনলাইটেনমেন্টের সংজ্ঞা নির্ধারণের বিষয়টি যখন সামনে আসে তখন তা যথেষ্ট জটিলতার সৃষ্টি করে। কান্ট এনলাইটেনমেন্টকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেনঃ “স্ব-আরোপিত অভিভাবকত্ব থেকে মানুষের মুক্তি। এ অভিভাবকত্ব হচ্ছে অন্যের পথনির্দেশ ব্যতীত মানুষের নিজের বুদ্ধিবৃত্তিকে ব্যবহার করার অক্ষমতা।” মানব ইতিহাসে অনেক নিপীড়ন এবং অজ্ঞতার কারণ হচ্ছে মানুষের অপরিপক্বতা। কান্ট মানুষের নিজের জন্য স্বাধীনভাবে চিন্তা করার মত সাহসী হওয়াকে এনলাইটেনমেন্টের নির্যাস হিসেবে বৈশিষ্টমণ্ডিত করেন। “জানার সাহস করো (Sapere aude)! নিজের যুক্তিবোধ ব্যবহার করার ব্যাপারে সাহসী হও। এটিই এনলাইটেনমেন্টের মূলমন্ত্র।”

এ থেকে আমরা এনলাইটেনমেন্টের দুটো অপরিহার্য উপাদান পাইঃ যুক্তিবোধের ব্যবহার এবং প্রথা ও কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মনোভাব। এ দুটোই আধুনিক বিশ্বের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এতদসত্ত্বেও, প্রথমটির স্থূল যুক্তিবাদিতায় এবং দ্বিতীয়টির ধ্বংসাত্মক প্রথাবিরোধীতায় (anti-traditionalism)  ফিরে যেতে বেশী সময় লাগে নি। এনলাইটেনমেন্ট অনুপ্রাণিত নতুন যুক্তিবোধ নিজেকে ব্যতীত অন্য কোন কিছুকেই কর্তৃত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানায়। যার ফলে আধুনিক স্বকেন্দ্রিকতা মধ্যযুগের ধর্মকেন্দ্রিকতার জায়গা দখল করে নেয়।

তবে যে ব্যাপারটি যথেষ্ট কৌতুহলোদ্দীপনার সঞ্চার করে তা হলো, অক্সফোর্ড ইংরেজী অভিধানের দ্বিতীয় সংস্করণে এনলাইটেনমেন্টের এর সংজ্ঞায় এই দিকটি উঠে এসেছে যে এনলাইটেনমেন্ট “দুর্বল ও দাম্ভিক বুদ্ধিবৃত্তিকতা এবং প্রথা ও কর্তৃত্বের প্রতি অযৌক্তিক মাত্রার ঘৃণা” দ্বারা নির্মিত। এ অভিধানের রচয়িতাগণ নিশ্চিতভাবেই এনলাইটেনমেন্টের প্রতি কোন রকমের তোষামদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন না। তবে তাদের এই সমালোচনামূলক মনোভাব দ্বারা এনলাইটেনমেন্টের সবচেয়ে আকাঙ্খিত মূলনীতি ‘বিশ্লেষণী মনন’ এর স্ব-আরোপিত সীমাবদ্ধতা দৃষ্টিগোচর হয়। যদি স্বীকৃত সকল প্রথা, ধর্ম, ইতিহাস অথবা সমাজের প্রতি সমালোচনামূলক মনোভাব রাখতেই হয়, তবে সেই একই সূত্র কেন খোদ এনলাইটেনমেন্টের উপর খাটবে না?

এছাড়াও, গত শতাব্দীতে এনলাইটেনমেন্ট অনুপ্রাণিত যুক্তিবোধ এবং প্রথাবিরোধিতা বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আমাদের বস্তুগত এবং মানসিক ও নৈতিক জগতের জন্য সুদূরপ্রসারী কিছু ফলাফল বয়ে এনেছে।

ইসলামের কি এনলাইটেনমেন্টের প্রয়োজন রয়েছে?

চিন্তার দিগন্ত উন্মুক্ত রেখেই মুসলিম বিশ্বের উচিত তার নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং নৈতিকতাকে পুনরুদ্ধার করা। একটি আগ্রাসী ধর্মনিরপেক্ষ ও আপেক্ষিকতাবাদী বিশ্বে নিজেদের ধর্ম ও ঐতিহ্যের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে উনবিংশ শতাব্দী থেকেই মুসলিমরা নিজেদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্কে লিপ্ত রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ইসলামী তত্ত্ববিদ্যার (ontology) ভিত্তিতে গড়ে উঠা মুসলিম বিশ্বদৃষ্টি (worldview of the Muslims) এবং মডার্নিটির শেষ পর্যায়ের দিকে গড়ে উঠা ব্যক্তিকেন্দ্রিক (subjectivist) জ্ঞানবিদ্যা এবং ভিত্তিবাদবিরোধী (anti-foundational) তত্ত্ববিদ্যা সাংঘর্ষিক অবস্থানে উপনীত হয়েছে। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় অতীন্দ্রীয়তার (transcendence) এক বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের মধ্যে সব কিছুকে বিবেচনা করার মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গীর আবেদন নিতান্তই গৌণ। মুসলিমরা নিজেরাই নিজেদের গৌরবময় অতীত, হতাশাময় বর্তমান এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝে ছিন্নিবিচ্ছিন্ন।

সমকালীন মুসলিমদেরকে অবশ্যই ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের অভিজ্ঞতাকে অধ্যয়ন করতে হবে এবং এর লাভ ও ক্ষতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে শতাব্দী ধরে মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য যুক্তিবোধ এবং ঐতিহ্যের যে ধারণা হাজির করেছেন তাকে এমনভাবে পুনরুদ্ধার করা যা বর্তমান মুসলিম বিশ্বকে পথের দিশা প্রদান করতে সক্ষম হবে।

ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য যেমন ধর্মের নামে যুক্তিবোধকে উৎখাত করেনি তেমনি মানবমুক্তির নামে একে দৈবরূপও দান করেনি। বরঞ্চ, যুক্তিকে সত্তা এবং চিন্তার এক বৃহৎ প্রসঙ্গে এমনভাবে স্থান দেয়া হয়েছিল যা মানবজীবনকে এবং মহাবিশ্বকে অর্থবহ করে তুলেছিল যেই মহাবিশ্বের সে নিজেই একটি অংশ। এতে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দূরদর্শীতা এবং নৈতিক উৎকর্ষতার সাথে যুক্তিবোধ একই সুরে কাজ করেছে। আমি আমার বই ‘Reason and Rationality in the Quran’ -এ যেমনটি দেখিয়েছি, এই যুক্তিবোধ জ্ঞান ও বিশ্বাসের সঙ্কট সৃষ্টি না করেই যৌক্তিক-দার্শনিক জ্ঞান ও নৈতিক-আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি উভয়েরই জন্ম দিয়েছে।

স্বাধীনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের (autonomy) নামে ঐতিহ্যের আপাদমস্তক প্রত্যাখ্যান কর্তৃত্ব ও বৈধতার সঙ্কট তৈরী করে। বহু মুসলিম পন্ডিত, বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকগণ তাদের নিজ নিজ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সাথে একটি পরিমিত নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। প্রকৃতপক্ষে এভাবেই তারা যুগে যুগে ঐতিহ্যের প্রাণশক্তি বজায় রেখেছেন। আধুনিক চরমপন্থীরা যে এই ঐতিহ্যকে অস্বীকার এবং বিকৃত করতে চায়, এ ব্যাপারটি ঐতিহ্যের অপরিহার্য গুরুত্বকে একটুখানিও কমায় না।

ইসলামী ঐতিহ্য এবং এনলাইটেনমেন্ট উভয়ের সাথে গভীর বোঝাপড়াই হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের বর্তমান সমস্যা থেকে উত্তরণের চাবিকাঠি। মুসলিম বিশ্বকে যদি সৃজনশীল এবং গঠনমূলক উপায়ে এর বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হয়, তবে তা কেবলমাত্র এর সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যের মধ্য থেকে যুক্তিবোধ, বিশ্বাস এবং স্বাধীনতার যে নির্যাস বিদ্যমান সেটি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সম্ভব।

এককথায়, মুসলিম বিশ্ব এমন একটি বিশেষ সভ্যতানির্ভর তত্ত্ববিদ্যাকে মেনে নিতে পারে না যা এ দুনিয়াতেই সবকিছু শেষ এমন মনে করে। মুসলমানগণ তাদের জ্ঞান, বিশ্বাস ও নৈতিকতার ভিত্তি হিসাবে এমন কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থাকে (epistemic system) গ্রহণ করতে পারে না যা বস্তুবাদী খণ্ডতাবাদ (material reductionism) ও দৃষ্টবাদ (positivism) কিংবা প্রতিবাস্তববাদ (anti-realism) ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (subjectivism) হতে উৎসরিত। উপযোগিতাকেই সর্বোচ্চ গুণ হিসাবে বিবেচনা করে এমন কোনো জড়বাদী নৈতিক ধারণাকে (instrumentalist notion of ethics) এটি প্রত্যাখ্যান করে।

ঐতিহ্যের উপর দৃঢ় ভিত্তি রেখে চিন্তার দিগন্ত উন্মুক্ত রাখার মত দুঃসাধ্য কাজের ভার আজ মুসলিম পন্ডিত এবং বুদ্ধিজীবিদের কাঁধের উপর। একদিকে আধুনিক বিশ্বের বাতুলতার বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে হাল জামানার ধর্মীয় চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বাস্তবতা তাদের এই ভারবাহী কাজকে আরো কঠিন করে তুলেছে। তবুও এ লক্ষ্যবিন্দুতে পৌঁছুতে পারা মোটেই অসম্ভব কিছু নয়। এমন একটি অর্জন আমাদের মনন এবং হৃদয়কেই আলোকিত করবে।

সূত্রঃ Daily Sabah

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
hyderabad tragedy

হায়দারাবাদ ট্র্যাজেডি

ফাহমিদ-উর-রহমান | জুলাই ১০, ২০১৬
Download PDF

উনিশ আর বিশ শতককে বলা যায় মুসলমানদের জন্য এক ক্ষয়িষ্ণুতার যুগ। এ কালে এসে মুসলমানরা যা পেয়েছে তার চেয়ে হারিয়েছে অনেক বেশি। সাম্রাজ্যবাদের রক্তাক্ত থাবা একালে মুসলমানদের যতো বেশি রক্ত ঝরিয়েছে বোধহয় এর নজির ইতিহাসে খুব একটি পাওয়া যাবে না। দেখতে দেখতে মুসলমান দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদের করতলগত হয়েছে। শত শত বছরের মুসলিম ঐক্যের প্রতীক খেলাফত খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেছে আর সে সাথে মুসলমানদের উপর নির্যাতন আর নিবর্তনের দীর্ঘ ট্র্যাজেডি রচিত হয়েছে। এরকম এক ট্র্যাজেডির নাম ‘হায়দারাবাদ’।

সাম্রাজ্যবাদের প্রধান পুরোহিত বৃটেন শুধু মুসলিম দুনিয়ায় তার খবরদারি আর রক্তক্ষয় করেই ক্ষান্ত হয়নি, উপনিবেশগুলো থেকে বিদায় নেবার সময় তারা এমনসব সমস্যা জিইয়ে রেখে গেছে যার মাশুল আজও মুসলমানদের গুণতে হচ্ছে। এর একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে আজকের কাশ্মির। কিন্তু কাশ্মিরের সাথে হায়দারাবাদের পার্থক্য হচ্ছে কাশ্মিরের জনগণ অদ্যাবদি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী জিহাদ জারি রেখেছে আর হায়দারাবাদের আজাদী-পাগল মানুষের সংগ্রামকে অত্যাচার আর নিবর্তনের স্টিমরোলারের তলায় স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে। স্বাধীন হায়দারাবাদের নাম পৃথিবী মনে রাখেনি। হায়দারাবাদ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল, তার ছিল স্বাধীন প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা – এসব আজ বিস্মৃত – প্রায়, ইতিহাসের গর্ভে আশ্রয় পেয়েছে।

মীর লায়েক আলীর লেখা ‘The Tragedy of Hyderabad’ গ্রন্থে হায়দারাবাদের আজাদী-পাগল মানুষের সে বেদনাঘন কাহিনীর বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায়। মীর লায়েক আলী ছিলেন স্বাধীন হায়দারাবাদের শেষ প্রধানমন্ত্রী। আগ্রাসী ভারতের বিরুদ্ধে হায়দারাবাদের প্রতিরোধ যুদ্ধে এই লায়েক আলী তাঁর দেশের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার জন্য শেষাবধি লড়াই চালিয়েছিলেন। এ লড়াই যখন চলছিল, ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতের সুসজ্জিত সশস্ত্র বাহিনী স্বাধীন হায়দারাবাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন বিশ্বশান্তির মন্ত্র উচ্চারণকারী পুরোহিত দেশগুলো এ অবিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে টু শব্দটিও করেনি। এমনকি জাতিসংঘও না।

হায়দারাবাদের মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিকে। তখন থেকেই হায়দারাবাদকে কেন্দ্র করে মুসলিম শিল্প-সংস্কৃতির যে বিকাশ ঘটে, তা পুরো দাক্ষিণাত্যকে প্রভাবিত করেছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও হায়দারাবাদ পুরোপুরি স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়নি। ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তি সাপেক্ষে একটি দেশীয় রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের বিদায়ক্ষণেই হায়দারাবাদের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই সাম্রাজ্যবাদী বৃটেন বুঝতে পেরেছিল পৃথিবী জুড়ে তার কারবার করবার দিন শেষ হয়ে এসেছে। তখন তারা ভারত ত্যাগের একরকম প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছিল। ভারতে বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হিন্দুদের সহযোগিতায়। তাই বিদায়ের কালেও তারা পুরনো মিত্রকে অসন্তুষ্ট করতে চায়নি। ভারত বিভক্ত হোক এবং ভারতের বুক জুড়ে মুসলিম লীগের দাবি মোতাবেক একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক মুসলিম বিদ্বেষী বৃটেন কখনোই চায়নি।

ভারতের শেষ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তিনি ছিলেন নেহেরুর ব্যক্তিগত বন্ধু। তিনিও চাননি ভারত বিভক্ত হোক। কেবলমাত্র কায়েদে আযমের প্রবল ব্যক্তিত্ব ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সামনে ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের দাবিকে অখণ্ডনীয় বাস্তবতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাকিস্তানের দাবিকে যখন ধূলিসাৎ করা গেল না, তখন নেহেরু ও তার সাম্রাজ্যবাদী বন্ধু মাউন্টব্যাটেন র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদের মাধ্যমে বিকলাঙ্গ পাকিস্তান দেয়ার ব্যবস্থা করলো। মুসলমানদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার প্রতি উপেক্ষা ও ষড়যন্ত্র করে তাদেরকে খর্বাকৃতির পাকিস্তান দেয়ার এসব গোপন পরামর্শের কথা পরবর্তীকালে ল্যারি কলিন্স ও ডোমিনিক লাপিয়ের কৃত ‘Freedom at Midnight’ গ্রন্থে বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। দেশ বিভাগের সময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, দেশীয় রাজ্যগুলো তাদের ইচ্ছানুসারে ভারত অথবা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে অথবা তাদের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে পারবে। মীর লায়েক আলী জানিয়েছেন, এ সিদ্ধান্ত অনুসারেই হায়দারাবাদের নিজাম মাউন্টব্যাটেনের কাছে চিঠি লিখে জানিয়েছিল, হায়দারাবাদ ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রেই যোগ দিবে না, সে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই থাকবে।

মাউন্টব্যাটেন উত্তরে নিজামকে জানান যে, তিনি তার পত্র যথাযথভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রেরণ করেছেন এবং তিনি খুব শিগগিরই তার উত্তর আশা করছেন। মীর লায়েক আলী লিখেছেন- উত্তরপত্রটি অবশ্য কখনোই আসেনি। কেননা, মাউন্টব্যাটেন পরবর্তীকালে স্বীকার করেছেন, তিনি নিজামের পত্রটি ব্রিটিশ সরকারের নিকট আদৌ প্রেরণ করেননি। মাউন্টব্যাটেনের এই স্বীকৃতির সাথেই যোগ রয়েছে হায়দারাবাদকে নিয়ে ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দের গভীর ষড়যন্ত্রের। ভারত বিভাগের পরেও কংগ্রেস মাউন্টব্যাটেনকে স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্ণর জেনারেল নিয়োগ করেছিল। এ ছিল তার মুসলমানদের সাথে বেঈমানীর পুরস্কার।

মাউন্টব্যাটেনকে কংগ্রেস কর্তৃক গভর্ণর জেনারেল নিয়োগের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় রাজ্যগুলোকে সুচতুর দক্ষতার সাথে ভারতভুক্ত করা। দেশীয় রাজ্য হিসেবে কাশ্মির ও হায়দারাবাদের গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক এবং নেহেরুর দৃষ্টি বেশি করে পড়েছিল এ দুটি রাজ্যের ওপর। দেশ বিভাগের সাথে সাথে হায়দারাবাদ নিজেকে স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা করে। সেখানে একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একটি স্বাধীন সরকারের জন্য যা যা প্রয়োজন তাও চালু করা হয়। কিন্তু অখণ্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা নেহেরু এটা মেনে নিতে পারেননি- ভারতের হৃৎপিণ্ডের মধ্যে পাকিস্তানের মতো আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্র মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। তাই তিনি একে সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে রাতারাতি দখল করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আগ্রাসনের তারিখ নির্ধারিত হয় ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮। এ দিনটি নির্ধারণ করার পেছনে একটি কারণ ছিল। এর মাত্র দুদিন আগে কায়েদে আযম ইন্তেকাল করেছিলেন- সমগ্র পাকিস্তান তখন শোকে মুহ্যমান। ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষ মনে করেছিল, এ সময় হায়দারাবাদে অভিযান চালালে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তেমন কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না। কার্যত তাই হয়েছিল। আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত ভারতীয় বাহিনীর সাথে হায়দারাবাদের সেনাবাহিনী টিকে থাকতে পারেনি। হায়দারাবাদ ভারতের পদানত হয়েছিল। মাত্র পাঁচ দিনের যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী ৭০,০০০ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। লুটতরাজ, নারী ধর্ষণ এগুলো তো ছিলই। এই যে সার্বিক গণহত্যা, ভারতীয় বাহিনীর মানবতা বিরোধী রক্তক্ষয় ও লোকক্ষয়ের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেক চোখ তুলে তাকায়নি।

জাতিসংঘ থেকে খবর এলো- হায়দারাবাদ সংক্রান্ত যে আলোচনা সভা ১৬ সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা ছিল, তা ২০ তারিখ পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম দমনের যে চিত্র একালে আমাদের সামনে স্পষ্ট হচ্ছে, তা একটিই ইঙ্গিত করে, মুসলিম নিবর্তনের ক্ষেত্রে সারা দুনিয়ার সব শক্তিই এক ও অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। তাই হায়দারাবাদে ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের চালিকাশক্তিগুলো নিস্ক্রিয়তার অভিনয় করে গেছে।

হায়দারাবাদের যুদ্ধ থেকে আরেকটি জিনিস স্পষ্ট হয়ে ওঠে- মুসলমানের বিপর্যয় তার ভিতর থেকেই যুগে যুগে সূচিত হয়েছে। যুদ্ধে নিজাম বাহিনীর পরাজয় এতো ত্বরিত গতিতে সম্ভব হতো না, যদি হায়দারাবাদ বাহিনীর প্রধান এল এদরুস বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন। পলাশীর যুদ্ধে মীর জাফর যে ভূমিকা পালন করেছিলেন সাঈদ আহমদ এল এদরুস তার পুনরাভিনয় করেছিলেন মাত্র। এ আলোচনা সম্পূর্ণ হবে না, যদি বিশ্বাসঘাতক এল এদরুসের পাশে দেশপ্রেমিক কাশেম রিজভীর নাম উচ্চারিত না হয়। এই দেশপ্রেমিক নিজস্ব উদ্যোগে দুই লাখ সদস্যের এক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেছিলেন যারা ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল।

হায়দারাবাদ আজ ইতিহাস হয়ে গেছে। কিন্তু সে ইতিহাস আমাদের জন্য কতকগুলো দিক নির্দেশনাও রেখে গেছে। অখণ্ড ভারত তত্ত্বের প্রবক্তরা উপমহাদেশব্যাপী ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য বিস্তারের স্বপ্ন এখনো বিসর্জন দেয়নি। এ স্বপ্নের কথা সেই দশম শতাব্দীতে আলবেরুনী তার ‘কিতাবুল হিন্দ’-এ পরিস্কারভাবে লিখে গেছেন। মনুসংহিতার সমাজের প্রধানরা যে অন্যের ন্যায্য দাবি-দাওয়াকে কখনোই মেনে নেয় না, তার কথা আলবেরুনীর চেয়ে সুন্দরভাবে কেউ বলতে পারেননি। আধুনিককালে জওয়াহেরলাল নেহেরু তা ‘Discovery of India’  গ্রন্থে দক্ষিণ এশিয়াব্যাপী সে স্বপ্ন বিস্তারের কথা পুনরায় উচ্চারণ করেছেন। এ ইতিহাসের পাতাগুলো আজ আমাদের নেড়ে-চেড়ে দেখবার প্রয়োজন আছে বৈকি! কারণ যে শক্তি হায়দারাবাদের বুক চিরে রক্তের বন্যা ছুটিয়েছিল, তারা যে আমাদের আজাদীকে পায়ের তলে পিষে মারবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই। সে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে কাশেম রিজভীর মতো দেশপ্রেমিকদের কোমর বেঁধে দাঁড়ানোর সময় আজ এসেছে।

সূত্রঃ বুকমাস্টার প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত “সাম্রাজ্যবাদ” গ্রন্থ।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
nobijir somaje nari purus

নবীজির সমাজে নারী-পুরুষ সম্পর্ক

Download PDF

অনেককেই আফসোস করতে দেখা যায় যে আমরা আর রাসূল (সা) -এর সাহাবিদের মতো নই; তাদের সময় ও পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আমরা কখনোই যেন তাদের মতো হতে পারব না। এই ধারণাটি সেসব সময়েই বেশি টেনে আনা হয় যখন মুসলিম যুবক-যুবতীদের সাপেক্ষে নারী-পুরুষের সম্পর্কের বিষয়টি আলোচনা করা হয়। বলা হয় সেই মহান প্রজন্ম থেকে আজকের প্রজন্ম কতটা দূরে!

কিন্তু যে ধারণাটি আমাদের মধ্যে অধিক প্রচলিত, প্রকৃত সত্য তার বিপরীত। নবীজি (সা)-এর সমাজের তরুণ-তরুণীদেরও তাদের কামনার সঙ্গে লড়তে হয়েছে। তাঁরাও হোঁচট খেয়েছিলেন, তাঁদেরও ভুল হয়েছিল। তাঁদের পরিবেশ-পরিস্থিতির ভেতর দিয়েই নবী (সা) তাঁদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, শিখিয়েছেন আর সাহায্য করেছেন মহৎ মানুষে পরিণত হতে।

তো আসুন আমরা দেখি নবীজি (সা) কীভাবে তাঁর সমাজে নারী-পুরুষ সম্পর্কের বিষয়টি মোকাবিলা করেছিলেন। এতে করে আমরা আজকের দিনে অনুসরণের জন্য সেখান থেকে কিছু শিখতে পারব।

ইবন ‘আব্বাস (রা) বলেছেন, “সবচেয়ে সুন্দরী নারীদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর এক নারী রাসূল (সা)-এর পেছনে নামাজ আদায় করতেন। কিছু কিছু লোক প্রথম কাতারে নামাজ আদায় করতেন যাতে সেই নারীকে তাদের দেখতে না-হয়। অন্যদিকে কিছু লোক পুরুষদের শেষ কাতারে নামাজ আদায় করতেন, আর বগলের নিচ দিয়ে সেই নারীকে দেখতেন। তাদের এই কাজের জন্য আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন, “আমি তোমাদের মধ্যে পূর্বে আগমনকারীদেরকেও জানি আর পরে আগমনকারীদেরকেও জানি।” [সূরা আল-হিজ্‌র, ১৫:২৪] [১]

এই হাদীস থেকে আমরা দেখি যে, নবীজি (সা)-এর শহরে বসবাসকারী এবং তাঁর মাসজিদে নামাজ আদায়কারী কিছু লোকও হোঁচট খেয়েছিলেন, তারা একজন নারীকে দেখতেন। কিন্তু তারপরও রাসূল (সা) এ ব্যাপারে কী করেছিলেন?

তিনি কি নারী ও পুরুষের মধ্যে দেওয়াল তৈরি করেছিলেন? না। নারীরা যাতে পুরুষদের প্ররোচিত করতে না-পারে সেজন্য নারীদেরকে মাসজিদে আসতে বারণ করেছিলেন? কখনো না। বরং তিনি (সা) এর উল্টোটাই করেছিলেন। আল্লাহর ঘরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের যাতে বাধা দেওয়া না-হয় সেই আদেশই দিয়েছিলেন তিনি। [২]

নারী ও পুরুষ যেন একই সমাজের অংশ হতে পারে, একই সমাজের হয়ে একত্রে কাজ করতে পারে, পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে সেটাই করেছিলেন তিনি। তবে একই সঙ্গে তিনি (সা) তাঁর সমাজকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন যাতে তারা তাদের কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

নিচে আমরা এমন কিছু ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরছি যা থেকে আমরা বুঝতে পারব কীভাবে তিনি এ কাজগুলো করেছেন:

১. ‘আবদুল্লাহ ইব্‌ন ‘আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন, “কুরবানির ঈদের দিনে রাসূল (সা) সঙ্গী হিসেবে তাঁর উটনীর পেছনে উঠেছিলেন আল-ফাদ্‌ল বিন ‘আব্বাস। সে ছিল খুবই সুদর্শন এক পুরুষ। রাসূল (সা) এক জায়গায় থামলেন মানুষদের বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান দেবার জন্য। এদিকে খাসাম গোত্রের এক সুন্দরী নারী এল আল্লাহর রাসূল (সা) এর কাছে সিদ্ধান্ত জানতে। সেই নারীর সৌন্দর্য আল-ফাদ্‌লকে এতটাই আকর্ষণ করেছিল যে, সে তার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিল না। আল-ফাদ্‌ল যখন সেই নারীর দিকে তাকিয়ে ছিল, রাসূল (সা) পেছন ফিরে তা দেখলেন। তিনি তার হাত পেছন দিকে বের করে আল-ফাদ্‌লের চিবুক (থুতনি) ধরে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন যাতে সে তাকে আর দেখতে না পারে…” [৩]

খেয়াল করে দেখুন রাসূল (সা) আল-ফাদ্‌লকে কীভাবে প্রশিক্ষণ দিলেন যাতে তিনি একজন দায়িত্বশীল পুরুষে পরিণত হতে পারে। সে তার কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি দেখে তিনি কিন্তু তাকে কোনো ধমক দেননি। এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তিনি কিন্তু আল-ফাদ্‌লকে এমন কোনো কথা বলেননি যে, যাতে তার মনে এই বিশ্বাস জাগে যে, সমস্যার গোড়া হচ্ছে ঐ নারীর অস্তিত্ব; আর এখানে আল-ফাদ্‌লের কোনো দায়িত্ব ছিলো না। উল্টো তিনি আলতো করে আল-ফাদ্‌লের মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। তাকে শিখিয়েছেন যে তার কাজের জন্য তাকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

নারীদের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হবে তাও তিনি উম্মাহর বাকী অংশকে শিক্ষা দিলেন।

সেই নারীকে রাসূল (সা) “ফিতনা” হওয়ার কারণে কোনো অভিশাপ দেননি। তাকে এজন্য দায়ীও করেননি যে, সে আল-ফাদ্‌লকে প্ররোচিত করেছে। তিনি তাকে দূরেও সরিয়ে দেননি। বরং সে যাতে রাসূল (সা)-কে প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারে তার জন্য সেই কাজটিকে সহজ করে দিলেন। আবার একই সঙ্গে কেউ যেন তাকে দেখতে না পারে সে ব্যবস্থাও করে দিলেন।

এখানে আমরা এটাও দেখছি না যে, নবী কিংবা অনাত্মীয় পুরুষদের কাছে আসার সময় মুখ না ঢাকায় সেই নারীকে নবী তিরস্কার করছেন। এই বর্ণনায় আমরা এটাও দেখছি না যে, পুরুষরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না বলে, কিংবা তাঁর সৌন্দর্য পুরুষদের প্ররোচিত করতে পারে বলে তাকে ভবিষ্যতে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বরং উল্টোটাই ঘটেছে এখানে। রাসূল (সা) আল-ফাদ্‌লকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় দেখলেন এবং তার দৃষ্টি ঐ মহিলার দিক থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দিলেন। আল-ফাদ্‌লকে তিনি এটাই শিক্ষা দিলেন সে যেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। যে নারী তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তাকে ধমকালেন না বরঞ্চ তিনি আল-ফাদ্‌লের ঘাড়েই এই ঘটনার দায় দিলেন।

আল-ফাদ্‌লও নবীজির কাজের বিরোধিতা করেননি। আল-ফাদ্‌ল বলেননি যে, “কিন্তু নবীজি, ঐ নারীই তো ফিতনা (প্ররোচনা)!” বা “হে আল্লাহর রাসূল, তাকে বলুন সে যেন নিজেকে ঢেকে রাখে ও আড়াল করে রাখে, যাতে অন্য পুরুষের দৃষ্টি কখনো তার উপর না পড়ে!”

আমাদের সমাজে পুরুষদের অধঃপতনের জন্য প্রায়ই নারীদের দিকে আঙুল তোলা হয়। নারীরা অন্য নারীদের অভিযোগ করে অশালীন পোশাক পরার দায়ে, অতিরিক্ত মেক-আপ করার জন্য কিংবা পুরুষদের সঙ্গে রসিয়ে কথা বলার জন্য। পুরুষরাও নারীদের ওপর একই ধরণের দোষ চাপায়। দোষটা সব সময় নারী হওয়ার ওপর এসেই দাঁড়ায়, আমরাই শেষ পর্যন্ত নারী-পুরুষ সম্পর্কের বোঝা হিসেবে হাজির হই। কিন্তু আল্লাহর রসূল (সা) আমাদের কী শিখিয়েছেন?

নিশ্চয় আমাদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাকের নীতিমালা ও মেলামেশার নীতিমালা রয়েছে, কিন্তু তা এখানেই শেষ নয়। উপরে আমরা যে নারীর ব্যাপারে কথা বললাম (আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট থাকুন) তিনিও কিন্ত সুন্দরী ছিলেন। তা সত্ত্বেও রাসূল (সা) তাঁর সৌন্দর্যের নিন্দা করেননি। কিংবা তাঁকে প্রশ্ন করা, তাঁর সাথে কথা বলা থেকে বারণ করেননি। তাহলে আমাদের সমাজে কেন এমনটা করা হয়? আসুন শুধু নারীদের উপর দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসি। সত্যিকার অর্থেই নবীর আদর্শ অনুসরণ করি, যেখানে প্রত্যেক নর-নারীই তার কাজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল হবে—একে অপরকে দোষারোপ করবে না।

২. আমরা আরেকটি উদাহরণ দেখি। অন্য আরেক পুরুষ সাহাবি কেবল দেখেই ক্ষান্ত হননি। তিনি বরং এক নারীকে চুমু খেয়েছিলেন! নিচের বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারব আল্লাহ কীভাবে সেই ব্যক্তির আন্তরিক দোষ স্বীকার এবং রাসূল (সা) এর কাছ থেকে ক্ষমা ও দিকনির্দেশনা চাওয়ার ব্যাপারটিকে নির্দেশ করেছেন।

“এক লোক এক নারীকে চুমু খেয়েছিল। তো সে পরে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে তাঁকে ব্যাপারটা জানায়। এরপর আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, ‘নামাজ আদায় করো: দিনের দুই প্রান্তে আর রাতের কিছু সময়ে। ভালো কাজ নিঃসন্দেহে খারাপ কাজকে মুছে দেয়,’ [সূরা হুদ, ১১:১১৪] লোকটি আল্লাহর রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞেস করলেন এটা কি কেবল তার জন্য প্রযোজ্য? আল্লাহর রাসূল জবাবে বললেন, ‘এটা আমার উম্মাহর সবার জন্যে প্রযোজ্য।’” [৪]

এই ঘটনা থেকে আমরা কী বুঝতে পারি? এই ঘটনা থেকে আমরা শিখি যে, আল্লাহ—যিনি আমাদের স্রষ্টা, আমাদের প্রিয় পালনকর্তা—আমাদের কাছে এটাই চান যে, আমরা যদি কোনো অপরাধ করেই বসি, তাহলে যেন সাথে সাথে তাঁর সঙ্গে আমরা সম্পর্ক জোরদার করি। তিনি একটি আয়াত পাঠিয়ে আমাদের এটাই বললেন যে, আমরা যদি কোন ভুল করে বসি তাহলে আমরা যেন তাঁর কাছে ফিরে যাই, আমাদের দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বজায় রাখি। দৈনন্দিন নামাজ “সকল অশ্লীলতা ও খারাপ কাজ থেকে আমাদের দূরে রাখে।” [৫] আর এই সম্পর্ক ধরে রাখলে তা লাগাতার ক্ষমার পাথেয়ও হয়ে উঠবে। [৬]

তার মানে কিন্তু আমি এটা বলছি না যে, যারা অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত আছে, তারা দৈহিক মিলন করে সাথে সাথে নামাজ পড়ে নেবে। এরপর আবার পুরোনো পাপে ফিরে যাবে। ঐ সাহাবি রাসূল (সা)-এর কাছে অনেক পরিতাপ ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। রাসূল (সা)-এর কাছে নিজের দোষ স্বীকার করে তিনি সমাধান খুঁজছিলেন। তবে আমরা এখান থেকে যা বুঝতে পারি, তা হচ্ছে অনেক মহামানুষদেরও ভুল হয়। কখনো কখনো মানবিক প্রবৃত্তির কাছে তারা হেরে বসেন।

কিন্তু আমরা যখন তাদের কারও কারও মতো কোনো ভুল করে বসব, তখন পরিবর্তনের জন্য তারা যা করেছিলেন, আমাদেরও তা-ই করতে হবে। আমাদেরকে পরিতাপ করতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। পরে যেন আর কখনো এমন ভুলে না জড়াই সেজন্য দৃঢ়চিত্ত হতে হবে। আর যদি আবার ভুল করেই ফেলি তাহলে ক্ষমা চাওয়ার এই চক্র পুনরায় শুরু করতে হবে।

৩. কিন্তু কেউ যদি পুরোপুরি সীমালঙ্ঘন করতে চায় তার বেলায় কী হবে? সত্যি সত্যিই এমন কাজ করতে চেয়েছিলেন এমন একজনকে রাসূল (সা) কীভাবে বাধা দিয়েছিলেন? একবার এক যুবক রাসূল (সা)-এর কাছে এলেন এই অনুরোধ করতে যে, তাকে যেন বিবাহ বহির্ভূত দৈহিক মিলন করার অনুমতি দেওয়া হয়। আশেপাশের লোকেরা একথা শুনে বিষম খেলেন। যুবককে চুপ করাতে চাইলেন। রাসূল (সা) তাকে একাধারে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন করলেন: “তোমার মা’র সঙ্গে কেউ এমন করতে চাইলে তুমি কি এটা পছন্দ করতে?” তিনি (সা) তাকে এরপর জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, তার মেয়ের সঙ্গে, তার বোনের সঙ্গে, তার কোনো মহিলা আত্মীয়ের সাথে এরূপ করা হলে কি সে তা পছন্দ করত? যুবকটি প্রতিটি প্রশ্নেরই নেতিবাচক উত্তর দিলেন। রাসূল (সা)-এর যুক্তির সামনে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আশ্বস্ত হলেন। অবশেষে রাসূল (সা) তার বরকতময় হাত যুবকটির উপর রাখলেন এবং আল্লাহর কাছে দু‘আ করলেন, “আল্লাহ, আপনি তার অপরাধ মার্জনা করে দিন, তার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে দিন। এবং তাকে পবিত্র করে দিন।” বর্ণনা করা হয়েছে যে, সেই যুবক এই ঘটনার পর কখনো তিনি যা করতে অনুরোধ করেছিলেন তাতে জড়াননি। [৭]

যুবকটি রাসূল (সা)-এর যুক্তি সংস্পর্শ ও দু‘আ দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যত্মিকভাবে রহমতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরামর্শ দেওয়ার ব্যাপারে আমাদেরকেও রাসূল (সা)-এর মতো হতে শিখতে হবে। আমি অনেক মুসলিম নারীদের জানি যারা বিয়ে করতে প্রচণ্ড ভয় পান। কারণ, যৌনতার ব্যাপারটা তাদের বাবা-মা’রা এমন নিষিদ্ধ এক বিষয় বানিয়ে রেখেছেন যে, বিয়ের পর দৈহিক অন্তরঙ্গতার প্রতি তাদের মনে রয়েছে প্রচণ্ড ভয়।

আমি এমন অনেক তরুণ ছেলে ও মেয়েদের ব্যাপারেও জানি যারা বিয়ে করতে চায় কিন্তু তাদের বাবা-মা তাদেরকে বিয়ে দিতে আপত্তি জানায় শুধু একারণেই যে তাদের বংশ মেলে না। অবশেষে এসব ছেলে-মেয়েরা নিজেদের আর নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বিয়ে-বহির্ভূত দৈহিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।

অভিভাবক হিসেবে, যৌনতা ও শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারগুলো আলোচনার সময় আমাদেরকে রাসূল (সা)-এর কর্মপন্থা বিবেচনা করতে হবে। রাসূল (সা) জনসম্মুখে যুবকটির যৌনতা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করেছেন। একে কোনো নিষিদ্ধ বিষয় বানাননি। রাসূল (সা) যদি প্রকাশ্যে মানুষের সামনে এ ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তাহলে ঘরের নিভৃতে আপনার সন্তানদের সঙ্গে একাকী কেন আপনি এসব বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে পারবেন না?

তবে, তাই বলে ব্যাপারটাকে তাদের সামনে বিব্রতকরভাবে তুলে ধরারও প্রয়োজন নেই। তারা বড় হয়ে ওঠার আগেই তাদের সঙ্গে আন্তরিক ও উন্মুক্ত সম্পর্ক গড়ে তুলুন যাতে করে পরবর্তীকালে যখন এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন তখন ব্যাপারটা বিব্রতকর বা অস্বস্তিকর হবে না। যদি আপনাদের মধ্যে উন্মুক্ত সম্পর্ক থাকে তাহলে এ ধরনের আলোচনাও হবে গঠনমূলক, ইনশা’আল্লাহ।

উপরন্তু, সমাজের নেতা হিসেবে সমাজের সদস্যদের সঙ্গে এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। যৌনতা এবং এ সম্পর্কিত বিষয়গুলো আলোচনার জন্য আমাদের পরিবারগুলোতে যদি প্রয়োজনীয় পরিবেশ না থাকে, তাহলে আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যাতে করে আমরা সমাজের জন্য দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করতে পারি।

৩. আজকের দিনে যেমনটি ঘটে রাসূল (সা)-এর সময়েও বিবাহিত নারী-পুরুষ সাহাবিরা ব্যাভিচার করেছেন। ব্যাভিচার ইসলামে খুবই সাংঘাতিক এক ইস্যু। কারণ এটা পরিবারের অনুভূতিকে আঘাত করে। কিন্তু এ সংক্রান্ত যে ঘটনাগুলো বর্ণিত হয়েছে তাতে দেখা যায় যে, রাসূল (সা) তড়িঘড়ি করে কাউকে শাস্তি দেননি। একবার এক নারী এসে তাঁকে বারবার বলছিলেন যে তাকে শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে তিনি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারেন। রাসূল (সা) তাকে অনেক সুযোগ দিচ্ছিলেন যাতে সেই নারী আর তাঁর কাছে শাস্তির অনুরোধ করতে না আসেন এবং কোনো শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি না হন। শুধু তাওবা করেই যেন কাটিয়ে দেন। কিন্তু সেই নারী অন্য আর সকলের মতোই বারবার এসে শাস্তি মাথে পেতে নেওয়ার অনুরোধ করেছেন। আর ফলস্বরূপ তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। [৮]

এই ঘটনা উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে এটাই দেখানো যে, রাসূল (সা)-এর সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা প্রজন্মের মধ্যেও এগুলোর অস্তিত্ব ছিল। তারাও ভুল করেছিলেন। কিন্তু তারপরও তারা ছিলেন প্রকৃত পুরুষ বা প্রকৃত নারী যাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো সাহস ছিল। ছিল ভুল স্বীকার করার মানসিকতা। আর এধরনের ভুলত্রুটি হওয়ার পরও, এবং বিয়ে-বহির্ভূত দৈহিক মিলনের মতো কাহিনী হওয়ার পরও রাসূল (সা) নারী-পুরুষের একত্রে কাজ করার ক্ষেত্রকে নিষিদ্ধ করেননি। বরং তিনি তাদের শিখিয়েছেন কীভাবে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে শ্রদ্ধার সঙ্গে তারা একসাথে কাজ করতে পারেন। আবার একইসাথে নারী-পুরুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ভগিনীত্বও বজায় থাকে।

নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব দৃষ্টান্ত আমি উল্লেখ করেছি, তার অধিকাংশতেই পুরুষদেরকে তাদের কামনাতাড়িত হয়ে কাজ করতে বা কাজ করতে চাওয়ার উল্লেখ থাকলেও নারীদের বেলায়ও একই কথা সত্য। নারীদের জৈবিক চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা ব্যাপারে যখন কথা বলা হয় তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদেরকে এক্ষেত্রে সক্রিয় মনে করা হয় না। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করা হয় যে, অনেক নারীদের মধ্যেও জৈবিক তাড়না শক্তভাবে কাজ করে। এবং এগুলোর সঙ্গে লড়াই করেই তাদের চলতে হয়।

রাসূল (সা)-এর সমাজে বসবাসরতদের যেসব ঘটনা আমরা উল্লেখ করেছি, আজকের দিনে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এ থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। নিজেদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা, স্রষ্টার সঙ্গে ক্রমাগত সংযোগ এবং প্রবৃত্তি মোকাবিলা করার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যত্মিক শক্তি দিয়ে অথবা অনুশোচনা করে এবং পদস্খলন হলেই সাথে সাথে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ধারণা বাস্তবায়ন করতে পারেন।

আমাদের আজকের সমাজে অনেকের মধ্যেই নারী-পুরুষ সম্পর্কের ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা নেই। কখনো কখনো নারীদেরকে মসজিদে এই ভয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না যে, তারা হয়তো পুরুষদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষদের বিচ্যুত হওয়ার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদেরকে মূল কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, খুব কম সময়েই পুরুষদের এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। নারীদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা কিংবা তারা যাতে পুরুষদের জন্য ফিতনা না হয়ে উঠে তা নিশ্চিত করার জন্য নারীদেরকে মসজিদের দেয়ালের বাইরে রাখা বাদ দিয়ে নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের যে দায়িত্ব আছে তা পালনের জন্য পুরুষদের খুব কমই বলা হয়। আমার মতে নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাসূল (সা)-এর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি আর যাই হোক কম্যুনিটির সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ ছিলো না।

আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক কীভাবে মোকাবিলা করব সে জন্য কিছু সাধারণ পরামর্শ: [৯]

১. নিজের জন্য: আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, আমাদের নিজেদের ব্যাপারে, নিজেদের পোশাক ও কাজের ব্যাপারে আমরা নিজেরাই দায়ী। নারী-পুরুষ উভয়েরই রয়েছে মেলামেশা ও পোশাকের ব্যাপারে নির্দিষ্ট নীতিমালা। প্রত্যেককেই সেসব নির্দেশনা মেনে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। তবে কাউকে যদি এই নির্দেশনা মেনে চলতে সংগ্রাম করতে হয়, তাহলে সে জন্য কখনোই অন্য কেউ তাকে দায়ী করতে পারেন না। কারও প্রতি যদি আপনার আকর্ষণ জাগে, তা সে যেভাবেই পোশাক পরুক না কেন, নারী কিংবা পুরুষ হিসেবে এটা আপনার নিজের দায়িত্ব: অন্যকে দোষ না দিয়ে চোখ সরিয়ে নেওয়া। আপনার কাজের হিসাব আপনাকেই দিতে হবে। যদি আপনি ভুল করেন, তাহলে সেজন্য আপনিই দায়ী।

২. পুরুষদের জন্য: আপনার পুরুষ হিসেবে যে সুবিধা আপনি পান তা এমনভাবে ব্যবহার করুন যাতে নারীরা এগিয়ে যেতে পারে, জ্ঞান অর্জন করতে পারে, দাওয়াহ দিতে পারে, মসজিদে উপস্থিত হতে পারে। নারীদের অস্তিত্ব কোনো সমস্যা নয়। আপনি যদি তাদের সঙ্গে শ্রদ্ধাপূর্ণ ও পেশাদার সম্পর্ক বজায় রাখতে না পারেন তাহলে এজন্য তাদের অস্তিত্বকে দায়ী করবেন না। নবীজির পদ্ধতি অনুসরণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। নিজের কাজের জন্য নিজেকেই দায়ী করুন। ঠিক যেভাবে সাহাবিরা তাদের কৃতকর্মের দায়-দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আপনারা যেমন নারীদের ‘সঙ্গী’ [১০] নারীরাও তেমনি আপনাদের সঙ্গী – এটি উপলব্ধ করুন।

৩. নারীদের জন্য: সাধারণভাবে সমাজ আমাদেরই দায়ী করে। আর তাই দায়িত্বের বোঝা আমাদেরই নিতে হবে। নারী হিসেবে দাবি করতে হবে আমাদের জন্য যাতে সেই জায়গা তৈরি করা হয় যাতে আমরা জ্ঞান অর্জন ও প্রসার করতে পারি। সমাজের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারি। অন্য কারও মানসিক ও মৌখিক আচরণ যেন আপনাকে মসজিদে উপস্থিত হতে কিংবা জ্ঞান অর্জনে বাধা না দেয়। প্রতিনিয়ত আমরা যেসব ঘটনার মুখোমুখি হই, সেগুলো মোকাবিলার জন্য আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে, জায়গা করে নিতে হবে। আল্লাহ চায় তো, এবং আমাদের পুরুষ সঙ্গীদের সাহায্যে আমরা দেখব নতুন দিগন্ত, যেখানে রাসূল (সা)-এর সমাজের মতো শ্রদ্ধাশীল সহাবস্থান ও ক্ষমতায়ন হবে ।

৪. তরুণদের জন্য: আমরা জানি আপনাদের অধিকাংশের হরমোন এখন উন্মত্ত। আর বাস্তবতা হচ্ছে আপনাদের ভুল ও কামনাকে মোকাবিলা করার জন্য আলাপ-আলোচনার যথেষ্ট খোলা পরিবেশও নেই। অভিভাবকদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার পরিবেশ না থাকায় ভারসাম্য বজায় রাখা বেশ কঠিন। কাজেই আপনাদের সমাজ থেকে এমন কোনো মেনটরকে খুঁজে বের করুন যাঁর সঙ্গে আলাপ করতে পারবেন, সহায়তা পাবেন। আর আপনি যদি ভুল করেই থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন তাওবার দরজা, আল্লাহর কাছে যাওয়ার দরজা সবসময় খোলা!

৫. অভিভাবক ও সমাজের নেতাদের জন্য: আমাদের কিশোর তরুণদের যাতে সুস্থ বিকাশ ঘটে সেজন্য আপনাদের প্রয়োজন। আপনাদের প্রজন্ম থেকে তাদের প্রজন্মে সফল পরিবর্তনের জন্য চাই উন্মুক্ত আলাপ। তাদেরকে সফল নারী-পুরুষ সম্পর্কের ব্যাপারে বাস্তব উদাহরণ দেখান। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানোর পরামর্শ দিন। ব্যক্তিগত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়া এবং নারীদের ক্ষমতায়নে সাহায্য করার মাধ্যমে পুরুষরা কীভাবে নিজেদের ক্ষমতায়িত করতে পারে সে দিক-নির্দেশনা দিন। আপনাদের প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে নেতৃত্ব হস্তান্তরের জন্য এ বিষয়গুলো খুব জরুরী।

৬. সবার জন্য: আমরা সবাই ভুল করি, এমনকি সাহাবিরাও করেছেন! প্রতিটা ভুলকে যেন আল্লাহর কাছে যাওয়ার সুযোগে পরিবর্তন করতে পারি সেই চেষ্টা করুন। তিনি সবসময় আমাদের জন্য প্রস্তুত।

নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা অর্জন করে সাহাবিরা জন্মগ্রহণ করেননি। পেছনের ভুলত্রুটি নিয়েই তারা ইসলামে প্রবেশ করেছিলেন। সেগুলোর কিছু কিছু মুসলিম জীবনে তারা টেনেও এনেছিলেন।

নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কুর’আনের একটি আয়াত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি প্রস্তাব করে। তাদের প্রচেষ্টা দ্বারা সাহাবীরা এই আয়াতকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন দ্বিধা, সাংস্কৃতিক ভুল বোঝাবোঝি ও অনেক কাঠ-খোড় পোড়াতে হলেও আমাদেরকেও এক্ষেত্রে এই আয়াতটিই বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করতে হবে।

“আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী।” [১১]

১. ইব্‌ন মাজাহ, আবু দাউদ, তায়ালিসি, বায়হাকি, আহমাদ, তিরমিযি ও নাসা’ই। আল-আলবানি একে সহীহ বলেছেন (দেখুন সিলসিলাত আল-আহাদীস আল-সহীহ, ৩৪৭২)
২. বর্ণনাটি পাওয়া যাবে সহীহ মুসলিমে
৩. সহীহ বুখারি
৪. সহীহ বুখারি
৫. আল-কুর’আন ২৯:৪৫
৬. “পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এবং এক জুমু’আহ থেকে আরেক জুমু’আহ এর মধ্যবর্তী সময়ে করা অপরাধের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ; যদি না কোনো বড় অপরাধ (কবিরা গোনাহ) করা হয়ে থাকে।” [সাহীহ বুখারি]
৭. আল-হাকিম
৮. সহীহ মুসলিম
৯. আমার প্রিয় বন্ধু সানা ইকবাল থেকে অনুপ্রাণিত
১০. রাসূল (সা)-এর শেষ খুতবা থেকে: “তোমাদের নারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো, তাদের প্রতি সদয় হও, কারণ তারা তোমাদের সঙ্গী ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সহযোগী।” [সহীহ বুখারি]
১১. আল-কুর’আন ৯:৭১

সূত্রঃ VirtualMosque

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
muslim bisse sonkot

মুসলিম বিশ্বে সংকট

ইব্রাহিম কালিন | জুন ১২, ২০১৬
Download PDF

মুসলিম বিশ্ব সংকটপূর্ণ অবস্থায়। সংকটটা অত বেশি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়। যদিও বর্তমান অবস্থায় এগুলোর বেশ ভালোই প্রভাব আছে। তবে সেটা অস্তিত্বসম্বন্ধীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের মতো নয়। মুসলিম বিশ্ব নিজেদের ব্যাপারে স্বচ্ছ না। বিশ্বকেও তারা গঠনমূলকভাবে গড়তে পারছে না। তারা নিজেরা নিজেদের কর্মকাণ্ডের কর্তা হিসেবে হাজির হতে পারছে না। অতীতের সোনালি ইতিহাস আর বর্তমানের উদাসীনতা আর দুর্দশার মধ্যে দোদুল্যমান মুসলিম বিশ্ব।

বহু মুসলিম দেশগুলো রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা, দুর্বল অবকাঠামো, নিম্নমানের শিক্ষাব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে প্রতিযোগিতার অভাব, দূষিত ও বাজে ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শহর ও পরিবেশগত বিপর্যয় প্রভৃতি সমস্যায় ভুগছে। তারা আজ পঙ্গু হয়ে আছে সামাজিক অসাম্যতা, নারীদের প্রতি অবিচার, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, চরমপন্থা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদে। পার্থিব ক্ষমতার নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতার কবলে শান্তি, সাম্যতা ও সহানুভূতি ইত্যাদি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা হারিয়ে গেছে।

রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় স্কলার এবং বুদ্ধিজীবিরা মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয় বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। হয় তারা ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করেছেন, নয়তো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন। এগুলোর পেছনে যদিও বিশ্বশক্তি এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দোষারোপ করার যথেষ্ঠ যৌক্তিকতা রয়েছে, এটাও সত্য যে মুসলিমেরা নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

যেমনটা আমি আগেও লিখেছি, “সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ধারা, ব্যর্থ রাষ্ট্র, দারিদ্র্যতা, নিরক্ষরতা এবং অধিকারচ্যুত ও বিচ্ছিনতার বোধ মধ্যপ্রাচ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে সৃষ্টি করেছে গভীর ক্ষত। বিভেদসৃষ্টিকারী আইডেণ্টিটির রাজনীতি শক্তিশালী ভাবাদর্শিক উপকরণে পরিণত হয়েছে। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ বা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নামে রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ও চরমপন্থীরা সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহার করেছে।”

এগুলো তো সত্যই, সাথে আছে পশ্চিমা গণতন্ত্র। তারা তাদের নিজেদের মূল্যবোধ ও মূলনীতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা দেখেছে কিভাবে ফিলিস্তিনকে বেদখল করা হয়েছে এবং প্রায় ৫০ বছর ধরে তা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। তারা সমর্থন করেছে মিশরের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকে। ইরাকে তৈরি করেছে সর্বনাশা পরিস্থিতি। সিরিয়ান নাগরিকদের সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়েছে। মায়ানমার, সোমালিয়া ও অন্যান্য জায়গার লাখ লাখ মানুষের দুর্দশা যেন তাদের নজরে আসে না। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরিবেশ দূষণকারী হিসেবে তারা ধ্বংস করেছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। এরাই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অস্ত্রের বৃহত্তম উৎপাদনকারী। আর তারা এগুলো বিক্রি করছে দরিদ্র দেশগুলোতে। তারা এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে যাতে কেবল ধনীরা বিশেষ সুবিধা পায়, আর গরিবেরা নিচেই পড়ে থাকে। আন্তর্জাতিক আইনকে তারা নিজেদের স্বার্থে নিশ্চিত করে। অন্যদের ব্যাপারে তোয়াক্কা করে না। কেউ কেউ মুসলিমদের সঙ্গে এই বৈষম্য ও  বর্ণবাদকে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে সমর্থন করে। এগুলো সবই সত্য এবং এই তালিকা আরও দীর্ঘ।

তবে অন্যকে দোষারোপ করলেই আমাদের সমস্যা সমাধান হয়ে যায় না। বরং এটা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা এবং নৈতিক প্রথানুবর্তিতার দিকে নিয়ে যায়। ক্ল্যাসিকাল ইসলামি সভ্যতার অর্জন নিয়ে গর্ব করা এক জিনিস, আমাদের তা করা উচিত এবং এর থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। কিন্তু তাকে নতুন করে আজকের সময়ে ফুটিয়ে তোলা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। এটি একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার কাজ হওয়া উচিত। মুসলিম সমাজের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বন্ধ না করে নিজেদের দুর্ভাগ্যের জন্য পশ্চিমা বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দায়ী করা অর্থহীন।

একটু চিন্তাভাবনা করলেই তিক্ত সত্য বের হয়ে আসে: শক্তিধর দেশগুলোর মতো মুসলিমরাও তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। অবিচার, অসাম্য, দারিদ্র্যতা, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদকে সুযোগ করে দিয়েছে নিজেদের মধ্যে পচন ধরানোর জন্য। মুসলিমদের মধ্যকার যৌক্তিক ক্ষোভগুলোকে নৈতিকভাবে অর্থপূর্ণ ও যুক্তিসম্মত কার্যকর উপায়ে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। জ্ঞান ও ধৈর্যের সঙ্গে সমস্যাগুলো নিরসন করার চেয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছে অসহিষ্ণুতা, উগ্রপন্থা ও সহিংসতার। আর এর ফলাফল হচ্ছে আল-কায়েদা, আইএসআইএস ও বোকো হারামের মতো সংগঠনগুলোর ব্যাপক বিস্তৃতি।

শেষ হয়ে আসছে পবিত্র রামাদান মাস। মুসলিমদের এখন প্রয়োজন বর্তমান অবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। আর তার শুরু হওয়া উচিত নিজেদের ভেতর থেকেই। ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য “গোপন” (আল-বাতিন) ও “প্রকাশ্য” (আয-যাহির) দুটো দিককেই সমান গুরুত্ব দেয়। বাইরে যা প্রকাশ পায় সেটা আপনার ভেতরের অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ। আপনার ভেতর যে ভালোত্ব আছে, বাইরের জগতে সেটাই শান্তি, সুবিচার ও রহমত প্রতিষ্ঠার জন্য বেরিয়ে আসা উচিত। আল-কুর’আনে আল্লাহ বলেছেন, “যতক্ষণ লোকেরা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে না, ততক্ষণ আল্লাহ তাদের অবস্থা বদলান না।”

মুসলিম নেতা, স্কলার, শিক্ষিত নারী ও পুরুষ, ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী—সবার এগিয়ে আসা উচিত এবং বিশ্বাস, যুক্তি ও উত্তম গুণাবলীর উপর ভিত্তি করে সংস্কৃতি নির্মাণ করা উচিত। তাদের উচিত অহংকার এবং অন্য ধর্মের প্রতি বৈষম্য ছাড়াই মুসলিমদের বিশ্বাসের আত্ম-মর্যাদা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা। এটা তাদের পক্ষে সম্ভব। আল-ফারাবি ও ইবনে সিনা যেমনটা করেছিলেন দর্শনের ক্ষেত্রে, বিরুনি ও ইবনে আল-হায়সাম যেমনটা করেছিলেন বিজ্ঞানে, ইবনে আল-আরাবি ও মাওলানা জালাল আদ-দীন রুমি যেমনটা করেছিলেন আধ্যাত্মিকতায়, আন্দালুসিয়ার শাসকেরা যেমনটা করেছিলেন দক্ষিণ ইউরোপে এবং অসংখ্য মুসলিম শাসক, বিজ্ঞানী ও শিল্পীরা যেমনটা করেছিলেন তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে, তারাও তেমনি সৃজনশীল ও গঠনমূলকভাবে কিভাবে এই বিশ্বে কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করতে হবে সেটা দেখাতে সক্ষম হবেন।

মুসলিম দেশগুলো প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে অনুগৃহীত। তাদের উচিত দারিদ্র্যতা দূরীকরণ, শিক্ষা, সুশাসন, নগর উন্নয়ন এবং যুবক ও নারীর ক্ষমতায়নের মতো ব্যাপারগুলোতে বিনিয়োগ করা। হাতে গোনা কিছু মুসলিম দেশ রয়েছে যারা এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে বিনিয়োগ করে। কিন্তু মুসলিম ভূমিগুলো আবারও যেন শান্তি, সুবিচার, ঈমান এবং গুণের আধার হতে পারে, সেজন্য আরও বেশি সংখ্যক মুসলিম দেশগুলোর উচিত তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের যথোপযুগী ব্যবহার করা। এজন্য প্রয়োজন উন্নততর শাসন, রাজনীতি ও পরিকল্পনা। কিন্তু সবকিছুর উপরে প্রয়োজন আমাদের মানসিক বিপ্লবের—যেখানে দুনিয়ার সঙ্গে আমরা আমাদের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করব, এবং একে বিবেচনা করব আমাদের প্রতি এক “আমানাত” হিসেবে। আর আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে এবং স্রষ্টার সৃষ্টিকে সহানুভূতি আর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করে এসবের সূচনা করতে হবে।

সূত্রঃ Daily Sabah

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
islam jevabe europe

ইসলাম যেভাবে ইউরোপ সৃষ্টি করেছিল

Download PDF

ইউরোপ অপরিহার্যভাবেই ইসলাম দ্বারা সংজ্ঞায়িত ছিল। ইসলাম আবারো ইউরোপকে পুনঃসংজ্ঞায়নে কাজ করছে। প্রাচীনযুগের প্রাথমিক এবং মধ্যবর্তী সময়ে কয়েক শতাব্দীকাল জুড়ে ইউরোপ বলতে ভূমধ্যসাগর দ্বারা বেষ্টিত বিশ্বকেই বুঝাতো। যাকে রোমানদের সুবিদিত ভাষায় “Mare Nostrum” বা  “আমাদের সাগর” বলে অভিহিত করা হত। তখনকার ইউরোপ উত্তর আফ্রিকা পর্যন্তও বিস্তৃত ছিল। প্রকৃতপক্ষে, পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম দিকে সেইন্ট অগাস্টিন যখন আজকের উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়াতে বাস করতেন তখন তা ছিল ইতালি এবং গ্রিস এর মতই খ্রিস্টবাদের একটি কেন্দ্র।

 কিন্তু সপ্তম এবং অষ্টম শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকা জুড়ে ইসলামের দ্রুত অগ্রগতি সাধনের ফলে সেখানে খ্রিস্টবাদের কার্যত অবসান ঘটে। ফলশ্রুতিতে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল দুটো সভ্যতায় বিভক্ত হয়। ভূমধ্যসাগর সভ্যতা দুটোর মধ্যে ঐক্যের শক্তি হবার পরিবর্তে তাদের মধ্যে এক কঠিন সীমান্তরেখা হয়ে দেখা দিল। স্পেনীয় দার্শনিক হোসে অরতেগা ওয়াই গ্যাসেত এর মতে সেই সময় থেকেই ইউরোপের সকল ইতিহাস ব্যাপকভাবে উত্তরমুখী হতে শুরু করল।

 রোমান সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যাবার পর সেই উত্তরমুখীতা একটি বিষয় প্রত্যক্ষ করল। তা হ্ল জার্মানিক (গোথ, ভ্যান্ডাল, ফ্র্যাংক এবং লোম্বার্ড) জাতির মানুষ ক্লাসিকাল গ্রিক ও রোমের ঐতিহ্যকে সাথে নিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার মূলশিকর গড়ে তুলল যা অনেক পরেই আবিস্কৃত হয়েছিল। আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার উন্নতির জন্য আরো অনেক শতাব্দী সময় লেগে গিয়েছিল। ধীরগতি সত্ত্বেও, সামন্ততন্ত্রের সম্মতিসুচক লেনদেন পদ্ধতি ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের পথে এবং স্বৈরতন্ত্রের বিপক্ষে কাজ করেছিল যা গোড়ার দিকে আধুনিক সাম্রাজ্য এবং সময়ের সাথে জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের জন্য পথ সুগম করে দিয়েছিল। এই পথ ধরে নব্য স্বাধীনতা এনলাইটমেণ্টকে কর্তৃত্বের আসনে আসীন করে। সংক্ষেপে, উত্তর ইউরোপে খুব ধীর এবং জটিল প্রক্রিয়ায় “পশ্চিম” এর যে আবির্ভাব হয়েছিল তা মূলত ইসলাম ভূমধ্যসাগরকে বিভক্ত করার পর সংঘটিত হয়।

ইসলাম ভৌগলিক দিক থেকে ইউরোপ কে নির্ধারণ করা ছাড়াও আরো অনেক বেশি কিছু করেছে। ডেনিস হায় নামের একজন বৃটিশ ইতিহাসবিদ ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত তার অসাধারণ কিন্তু কিছুটা ঘোলাটে বই “ইউরোপ: দি ইমারজেন্স অফ এন আইডিয়া” তে  ব্যাখ্যা করেছেন ইউরোপীয় ঐক্য খ্রিষ্টবাদের ধারণা উপর ভিত্তি করে শুরু হয়েছিল যার একটি উদাহরণ The Song of Ronald. এটা ইসলামের বিপক্ষে “অনিবার্য বিরোধিতা” ছিল যা ক্রুসেডের সময় চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিল।

এডওয়ার্ড সাইদ মত স্কলার ১৯৭৮ সালে তার বই “ওরিয়েন্টালিজম” এ ইউরোপের ইসলাম বিরোধিতা দেখানোর মাধ্যমে বলেন যে ইসলাম ইউরোপকে সাংস্কৃতিক ভাবে নির্মান করেছে। অন্যভাবে বলতে গেলে ইউরোপের নিজস্ব পরিচয় উল্লেখযোগ্যভাবে তার প্রান্তসীমায় অবস্থিত আরব মুসলিম বিশ্বের বিপরীতে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা অবলম্বন করে গড়ে উঠেছিল। সাম্রাজ্যবাদ এই বিবর্তনের চূড়ান্ত প্রকাশকে প্রমাণ করেছে। প্রাথমিক অবস্থায় আধুনিক ইউরোপ শুরু হয়েছিল নেপোলিয়নের সময়। তিনি মধ্যপ্রাচ্য জয় করেছিলেন এবং স্কলার ও কুটনিতিকদের সেখানে পাঠালেন ইসলামি সভ্যতা নিয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য। যেই সভ্যতাকে তিনি শ্রেনীভুক্ত করেছিলেন সুন্দর, আকর্ষণীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচু শ্রেনীর বলে।

উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে উত্তর আফ্রিকা ও লেভান্তের নতুন পুলিশ রাষ্ট্রগুলো ইউরোপের সাংস্কৃতিক উৎকৃষ্টতাকে শক্তিশালী করেছিল। এই স্বৈরশাসনের মাধ্যমে দেশগুলো নিজেদের জনগণকে একটি সুরক্ষিত সীমানার মধ্যে বন্দি হিসেবেই রাখতো। আর এই সীমানাগুলো ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিকতাবাদের প্রতিনিধিরাই কৃত্রিমভাবে নির্ধারণ করেছিল। যার ফলে ইউরোপিয়ানরা যেকোন ধরনের নোংরা গণতান্ত্রিক পরীক্ষার সম্ভাবনার দুশ্চিন্তা ছাড়াই আরবদের মানবাধিকার বিষয়ে মুরব্বিয়ানা করতে পারতো। এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অভিবাসনের ঘটনা ঘটত। কারণ আরবদের মধ্যে মানবাধিকারের ঘাটতি ছিল যা ইউরোপিয়ানদের আরবদের থেকে শ্রেষ্ঠ এবং নিরাপদ ভাবার অনুভূতি এনে দেয়।

ইসলাম আজ তাই ভাঙ্গছে যা সে একসময় নিজে সৃষ্টি করেছিল। একটি ধ্রুপদি ভৌগলিক কাঠামো আবারো নিজেকে সাংগঠনিকভাবে তুলে ধরছে। সন্ত্রাসবাদ এবং অভিবাসন- এ দুয়ের জোয়ার উত্তর আফ্রিকা ও লেভান্তসহ ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকায় অবস্থিত ভূ-অঞ্চলকে আবারো ইউরোপের সাথে যুক্ত করছে। অবশ্য মহাদেশটি এর আগেও অনেক জাতিকে আত্নীভূত করেছিল। প্রকৃতপক্ষে পূর্ব থেকে গণবিস্ফোরনের ন্যায় আগত জনগোষ্ঠীর দ্বারা ইউরোপ নাটকীয়ভাবে প্রভাবিত হয়েছে। মধ্যযুগে বিপুল পরিমানে স্লাভ এবং ম্যাগীয়াররা ইউরেশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপে দেশান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু উত্তরের পোল্যান্ড থেকে দক্ষিণের বুলগেরিয়া পর্যন্ত সেই মানুষগুলো খ্রিষ্টধর্ম গ্রহন করেছিল এবং বিকাশমান ইউরোপীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছিল যদিও এর জন্য অনেক রক্তপাতও হয়েছে।

স্নায়ুযুদ্ধ সময়কালীন আলজেরিয়ান সল্পমেয়াদী শ্রমিক যারা ফ্রান্সে গমন করেছিল এবং তুর্কি ও কুর্দি সল্পমেয়াদী শ্রমিক যারা জার্মানিতে গমন করেছিল তারা বর্তমান অভিবাসন জনগোষ্ঠীর অগ্রদূত বলা যেতে পারে।

আজ হাজার হাজার মুসলিম অর্থনৈতিকভাবে স্থবির ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে প্রবেশ করছে যাদের খ্রিস্টান হবার বিন্দুমাত্র আকাঙ্ক্ষা নেই। ইউরোপের ভঙ্গুর সামাজিক শান্তির জন্য তারা হুমকিস্বরুপ দেখা দিচ্ছে। যদিও ইউরোপের এলিটরা যুগ যুগ ধরে এক ধরণের আদর্শবাদী বয়ানের মাধ্যমে বরাবরই ধর্ম এবং জাতির এই শক্তিকে অস্বীকার করে আসছে, তথাপি এটা হচ্ছে সেই শক্তি যা ইউরোপের দেশগুলোকে তাদের আভ্যন্তরীণ বন্ধন গঠনে সাহায্য করেছিল।

ইতিমধ্যে, এই নতুন অভিবাসন প্রক্রিয়া যা রাষ্ট্রগুলোর ভঙ্গুর অবস্থা এবং যুদ্ধের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে তা সাম্রাজ্যবাদের কেন্দ্র এবং তাদের সাবেক উপনিবেশগুলোর মধ্যকার দুরত্ব মুছে দিচ্ছে। প্রাচ্যবাদ, যার মাধ্যমে একটি সংস্কৃতি অপর একটি সংস্কৃতিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে এবং প্রাধান্য বিস্তার করে তা এই বিশ্বজনীন যোগাযোগ ও তুলনামূলক অধ্যয়নের পৃথিবীতে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যা সাইদ পূর্বেই অনুমান করেছিলেন। একসময় শাসন করা সভ্যতাগুলো থেকে আসা হুমকির ফলশ্রুতিতে ইউরোপ তার জাতীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তীব্র ডান অথবা বাম পন্থায় অনেকটা কৃত্রিমভাবে পুনর্গঠন করছে।

যদিও সব ধরনের জাতিগত এবং আঞ্চলিক বিবাদের ইতিহাস সমাপ্তের ধারণা অনেকটা কল্পনায় পরিণত হয়েছিল, কিন্তু এই উপলব্ধি জাতীয়তাবাদের ধারণায় পুনরায় ফিরে আসার কোন অজুহাত হতে পারেনা। মুসলিম শরনার্থী আগমনের মুখে ইউরোপের সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা রক্ষার যে আবেদন তা ক্রমবর্ধমান মানবিক যোগাযোগের বিশ্বে স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব।

ভৌগলিক কাঠামোর বাহিরে পশ্চিমা বিশ্ব বলে যদি কোন অর্থ থেকে থাকে তাহলে তা আরো বেশি সহনশীল লিবারেলিজমের চেতনা ধারণ করে। উনবিংশ শতকে যেমন কেউ সামন্তবাদে ফিরে যায়নি আজও তেমনি কেউ জাতীয়তাবাদে ফিরে যাচ্ছেনা যদি না কোন দুর্যোগ ডেকে আনতে চায়। বিখ্যাত রাশিয়ান বুদ্ধিজীবী আলেকজান্ডার হার্জেন বলেন, “ ইতিহাস ফিরে আসেনা….সব পুনঃনির্মাণ ও পুনরুদ্ধার সবসময় শুধুই মুখোশধারী ছলনা।”

এভাবে প্রশ্নের সূচনা হয় যে, সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে কে তাহলে রোমের স্থান গ্রহণ করবে? সাইদ বলেন, সাম্রাজ্যের অবশ্যই খারাপ দিক আছে। কিন্তু ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিশাল বহুজাতীয় মানুষকে শাসনের যে সক্ষমতা তা এই ক্ষেত্রে একটা সমাধান ছিল যার অস্তিত্ব আজ আর নেই।

ইউরোপের উচিত এমন কিছু বিকল্প সন্ধান করা যাতে সে দ্রুততার সাথে মুসলিম বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে একাত্ম করে নিতে পারে। যার ফলে উত্তর ইউরোপে গড়ে ওঠা আইনের শাসনের প্রতিও তাদের নিবেদনে কোন ভাটা পড়বেনা। এটা হচ্ছে সেই ব্যবস্থা যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত অধিকারকে চাহিদার ক্রমধারায় সবার শীর্ষে রাখা হয়। এটা যদি সার্বজনীন মুল্যবোধের পথে বিবর্তিত না হয় তাহলে আদর্শ ও নিকৃষ্ট জাতীয়তাবাদের উন্মত্ততা দিয়েই শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে। এবং এটাই হবে ইউরোপে “পশ্চিম” এর পরিসমাপ্তির ইঙ্গিত।

সূত্রঃ The Atlantic

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
sovvota o adhunikayon

সভ্যতা ও আধুনিকায়ন

আলী শরীয়তি | এপ্রিল ২৮, ২০১৬
Download PDF

কে সভ্য আর কে আধুনিকায়িত (modernized) এই প্রশ্নের আলাপ ইসলামী মতবাদের আলোকে ভালোভাবে করা যেতে পারে। বিশেষ করে ইসলামী সমাজের শিক্ষিত শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ যাদের উপর উম্মাহর নেতৃত্ব ও দায়িত্বের ভার অর্পিত তাদেরকে কেন্দ্র করে এই প্রশ্নের পাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আরোপিত আধুনিকায়ন ও প্রকৃত সভ্যতার সম্পর্ক নির্ণয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সভ্যতার ছদ্মবেশে আমাদের মত নন-ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠিগুলোর উপর আধুনিকতাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তী আলাপের পূর্বে কিছু প্রত্যয়ের (Term) সংজ্ঞায়ন জরুরিঃ

১। বুদ্ধিজীবী (intellectual): একজন বুদ্ধিজীবী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও ঐতিহাসিক স্থান ও কালপর্বে তার “মানবিক মর্যাদা” (humanistic status) সম্পর্কে সচেতন। তার এই আত্মসচেতনতা তার উপর একটি দায়িত্বের ভার অর্পণ করে। তিনি দায়িত্ববান ও আত্মসচেতন হয়ে বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন। (আরো দেখুন ড. আলী শরীয়তি রচিত “From where shall we begin” এবং “The Intelectual and his responsibility”)

২। আত্মীকরন (assimilation): আত্মীকরন বলতে ব্যক্তির এমন ধরনের কর্মকাণ্ডকে বুঝায় যার মাধ্যমে সে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য একজনের আচার-আচরণকে অনুকরন করতে শুরু করে। এই ধরনের দুর্বলতা প্রদর্শনকারী ব্যক্তি তার নিজস্ব অতীত, জাতীয় চরিত্র ও সংস্কৃতিকে ভুলে যায়। অথবা যদি সে এই বিষয়গুলো মনেও রাখে, সে এগুলোকে স্মরণ করে ঘৃনা ও অবজ্ঞার সাথে। কোন রাখঢাক ছাড়াই আত্মপরিচয় রূপান্তরের স্বার্থে সে নিজেকেও অস্বীকার করে। যে উচ্চভাব ও স্বাতন্ত্র্য সে অপরের মাঝে খুঁজে পায় তা অর্জন করার আশায়, একজন অনুকারক (assimilator) তার প্রকৃত সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে তার লজ্জাজনক সংযুক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চায়।

৩। বিচ্ছিন্নতা (alienation): কোন ব্যক্তির আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়া বা নিজের সাথে অপরিচিত হয়ে উঠা কিংবা নিজের প্রতি উদাসীন হয়ে উঠার প্রক্রিয়াকে বিচ্ছিন্নতা বলে। অর্থাৎ এর ফলে একজন ব্যক্তি আত্মপরিচয় হারিয়ে অপর কোন ব্যক্তি বা বস্তুর দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা নিজস্ব মতামত গঠন করে।

তাহলে “সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা” বলতে কী বোঝায়? আমরা জানি বিচ্ছিন্নতা হলো এমন একটি অবস্থা যখন ব্যক্তি তার নিজেকে সে যেমন তেমনভাবে না দেখে তার স্থলে অন্য কোন কিছু কল্পনা করে। সংস্কৃতি কী? যে ভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন, সংস্কৃতি হলো একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক, অবস্তুগত শৈল্পিক, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক, ধর্মীয় ও আবেগীয় প্রকাশের (যেমন- প্রতীক, ঐতিহ্য, প্রথা) সমষ্টি যা ঐতিহাসিক পথপরিক্রমার মধ্য দিয়ে একটি স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছে।

যখন আমি নিজের ধর্ম, সাহিত্য, আবেগ, প্রয়োজন এবং বেদনাকে নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে অনুভব করি, তখন আমি আপন সত্ত্বাকে অনুভব করি। এটি হলো সেই সামাজিক ও ঐতিহাসিক সত্ত্বা যা থেকে সংস্কৃতি উৎসরিত হয়েছে। কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভিন্ন একটি সমাজ, ভিন্ন একটি অতীত ও ভিন্ন একটি চেতনা থেকে উৎসারিত কিছু সন্দেহজনক কৃত্রিম অনুঘটক ধীরে ধীরে একটি সমাজে প্রবেশ করে। এই কৃত্রিম অনুঘটকসমূহ প্রকৃত সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে তার স্থলে এমন একটি মিথ্যা সংস্কৃতি আরোপ করে যা সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন একটি পরিস্থিতি, ভিন্ন একটি ঐতিহাসিক পর্যায় এবং ভিন্ন একটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর জন্যে প্রযোজ্য।

ফলে যখন আমি আমার আপন সত্ত্বাকে অনুভব করতে চাই, আমি নিজস্ব সংস্কৃতির স্থলে আরেকটি সমাজের সংস্কৃতিকে কল্পনা করি এবং এমন কিছু সংকট নিয়ে বিলাপ করি যেগুলো আদতে আমার নয়। আমি এমন কিছু আকাঙ্খা, আদর্শ ও বেদনা লালন করি যা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন পরিস্থিতির অপর একটি সমাজের। নিজ সত্ত্বা সম্পর্কিত আমার ধারনা তখন আমি বাস্তবিকভাবে যেমন তেমনটি না হয়ে “অপর” (they) যেমন তেমনরূপে প্রতিভাত হয়।  অর্থাৎ আমার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা (alienation) জন্ম নেয়। এটা কি হাস্যকর নয় যে চরম দারিদ্র্যতা-উপবাস ও সমজাতীয় সাধারণ অনুভূতির একটি সমাজে আমেরিকান, ইংরেজ অথবা ফরাসি নাগরিকদের মতো আকাঙ্খা ও আচরণ বিরাজ করবে।

এভাবে নন-ইউরোপীয় সমাজগুলো ইউরোপীয় সমাজ দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের বুদ্ধিজীবীরা আর প্রাচ্যভুক্ত থাকে না। একজন প্রাচ্যের মানুষের মতো তারা আর্তনাদ করে না কিংবা প্রাচ্যের জনগণ হওয়ার আকাঙ্খাও লালন করে না। একজন বুদ্ধিজীবী তখন আর তার নিজস্ব সামাজিক সংকট দ্বারা তাড়িত হয় না। বরঞ্চ পুঁজিবাদী ও বস্তুবাদী সাফল্য ও ভোগের সর্বশেষ ধাপে অবস্থানকারী একজন ইউরোপীয় ব্যক্তির বেদনা, কষ্ট, অনুভূতি ও প্রয়োজনকে সে নিজের বলে কল্পনা করে। এভাবে আজকে নন-ইউরোপীয় দেশগুলোতে বেদনাদায়ক এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নন-ইউরোপীয়রা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলার শিকার হচ্ছে যাদের স্বতন্ত্র একটি স্বরুপ থাকার পরেও তারা তা অস্বীকার করছে। তাদের মনোজগতে এমন কিছু বিরাজ করে যা তাদের নিজস্ব নয়। তারা অপরকে কল্পনা করে এবং অন্ধভাবে তাকে অনুকরণ করে।

এই নন-ইউরোপীয় দেশগুলো ধরা যাক ২০০ বছর পূর্বে হয়তোবা আজকের পশ্চিমা সভ্যতার মতো ছিলো না, কিন্তু তাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী একটি সভ্যতা ছিলো। উদাহরণসরূপ ধরুণ আমি যদি ভারত অথবা আফ্রিকার কোন দেশে যেতাম আমি জানতাম যে তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র রুচি ও কাঠামো রয়েছে। তারা তাদের নিজস্ব কবিতা রচনা করেছে যা ছিলো তাদের সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাদের জীবনের সাথেও সম্পৃক্ত। তাদের নিজস্ব সামাজিক রীতি ও ধর্ম ছিলো। তাদের যা কিছু ছিলো সবকিছুই ছিলো তাদের নিজস্ব। হয়তোবা তারা দরিদ্র ছিলো কিন্তু তারা রুগ্ন ছিলো না। দারিদ্র্যতা ও রুগ্নতা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।

কিন্তু আজকে পাশ্চাত্য সমাজ তার দর্শন, চিন্তা-প্রক্রিয়া, তার আকাঙ্খা, তার আদর্শ, তার রুচি ও রীতি নন-ইউরোপীয় দেশগুলোর উপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। একইভাবে তারা এই দেশগুলোর উপর তাদের সভ্যতার প্রতীক (প্রযুক্তি উদ্ভাবন) সমূহ চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে যে দেশসমূহ কেবল নতুন পণ্য ও গ্যাজেটের ভোক্তা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দেশগুলো কখনোই ইউরোপীয় রীতি, আকাঙ্খা, রুচি ও চিন্তা-প্রক্রিয়ার সাথে মিলিয়ে নিতে পারবে না।

আমরা ভিন্ন ভিন্ন অংশ জোড়াতালি লাগিয়ে একটি আধুনিক কিন্তু কাঠামোবিহীন সমাজ নির্মাণ করছি যার কোন লক্ষ্য কিংবা উদ্দেশ্য নেই। দিনশেষে আমরা এমন একটা কিম্ভূতকিমাকার জিনিস পাচ্ছি যেখানে সবকিছু থেকেই কিছু না কিছু আছেঃ কিছু স্থানীয়, কিছু ইউরোপীয়, কিছু প্রাচীন আবার কিছু আধুনিক। এ সমস্ত কিছু মিলিয়ে এমন একটা কাঠামোবিহীন উদ্দেশ্যহীন ধাঁধাঁ তৈরি হচ্ছে যার পরিণামে একটি কাঠামোবিহীন উদ্দেশ্যহীন সমাজও তৈরি হচ্ছে। এ সমাজগুলো হলো নন-ইউরোপীয় সমাজ যারা গত শতাব্দীতে পাশ্চাত্য থেকে সভ্যতার নামে তাদের কাঠামো আমদানী করেছে।

নন-ইউরোপীয় দেশসমূহে বিশেষ কাঠামো ও সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যবিহীন মোজাইক সভ্যতার এই যে উত্থান তার গোড়া কোথায়? ইউরোপে সপ্তাদশ, অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে পুঁজিপতি ও ধনীদের হাত ধরে যন্ত্রের উদ্ভব ও উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। যন্ত্রের বৈশিষ্ট হলো কার্যকর অবস্থায় এটি সবসময় ক্রমবর্ধমান উৎপাদন দাবি করে। এটি হলো যন্ত্রের বলপূর্বক শাসন। ফলে উৎপাদিত পণ্যের অযাচিত মজুদ এড়ানোর লক্ষ্যে বর্ধিত হারে ভোগের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করতে হয়। কিন্তু মানুষের ভোগের পরিমাণ উৎপাদনের মতো একই হারে বৃদ্ধি পায় না। তাহলে এই অতিরিক্ত উৎপাদন বা উদ্বৃত্ত নিয়ে কী করা যেতে পারে? ভোগের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টিই এর একমাত্র সমাধান।

ইউরোপের দেশগুলোর জনসংখ্যা সর্বসাকুল্যে ৪০ থেকে ৬০ মিলিয়নের বেশী হবে না। ক্রমবর্ধমান উৎপাদনের হার মানুষের ভোগের আকাঙ্খার মাত্রাকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে। এভাবে যেহেতু যন্ত্র বলপূর্বকভাবে অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন করে তাকে জাতীয় সীমানার বাইরে পা রাখতে হয়। ফলে উদ্বৃত্ত পণ্যসমূহ আফ্রিকা ও এশিয়াতে পাড়ি জমায়। এই পণ্যসমূহ কি সত্যিকারভাবে প্রাচ্যে নেওয়া সম্ভব যেখানে মানুষের জীবনাচার ও জীবনকাঠামোতে এই পণ্যগুলোর কোন দরকারই নেই? পণ্যসমূহের ভোগ কি চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব? অসম্ভব! এশিয়ার সমাজে দেখা যায় একজন এশীয়ের পোষাক তার স্ত্রী কর্তৃক অথবা স্থানীয় কোন জায়গায় বানানো হয়। তারা ঐতিহ্যবাহী পোষাক পরিধান করে। এখানে যন্ত্র নির্মিত কারখানার পণ্য অথবা হাই ফ্যাশনের পোষাক কিংবা ইউরোপের আধুনিক ফ্যাব্রিক্সের কোন চাহিদা-ই নেই।

একজন আফ্রিকান অথবা এশীয় নারীর নিজের সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিধানের জন্য ইউরোপীয় কসমেটিকস কিংবা অলংকারের কোন প্রয়োজনই ছিল না। তার নিজস্ব কসমেটিকস, নিজস্ব সামগ্রী এবং নিজস্ব সাজ-সামগ্রী আগে থেকেই বিরাজমান ছিল। সে এগুলোই ব্যবহার করতো এবং সবাই এগুলোরই প্রশংসা করতো। কোন পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাও সে অনুভব করতো না।

তার এই দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে পুঁজিবাদী পণ্য সামগ্রী অবিক্রীতই থেকে গেলো। এই চিন্তা-প্রক্রিয়ার জনগণ, যাদের স্বতন্ত্র প্রয়োজনীয়তা ও রুচি রয়েছে, যাদের নিজস্ব জীবন-পদ্ধতি রয়েছে এবং যারা নিজস্ব প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিজেরাই উৎপাদন করে তারা ১৮ শতকের পুঁজিপতিদের উৎপাদিত পণ্য ভোগ করার মতো লোক ছিলো না। তাহলে কি করা যেতে পারে? সমস্যাটা ছিলো এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণকে ইউরোপীয় পণ্যের ভোক্তা বানানো নিয়ে। তাদের সমাজকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে তারা ইউরোপীয় পণ্য ক্রয় করে। এর অর্থ দাঁড়ালো আক্ষরিকভাবেই একটি জাতিকে পরিবর্তন করা। তাদের একটি জাতিকে পরিবর্তন করতে হয়েছে এবং একজন মানুষের পোষাক, তার ভোগের ধরন, তার অলংকার, তার বাসগৃহ এবং তার শহর পরিবর্তনের জন্য তাদের একজন মানুষকে আপাদমস্তক রূপান্তরের প্রয়োজন দেখা দেয়।

তার কোন অংশটির পরিবর্তন সবার আগে করা দরকার? তার নীতি ও চিন্তা-প্রক্রিয়া। আলোকিত ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীদের উপর কাজ বর্তায় এমন একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন করা যার মাধ্যমে নন-ইউরোপীয় জনগণের মনন, রুচি ও জীবন-পদ্ধতি পাল্টে দেওয়া যায়। প্রজেক্টটি ছিলো অনেকটা এরকমঃ পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে সমজাতীয় হতে হবে; তাদের জীবন-ধারণ হবে একই রকমের, তাদের চিন্তা-পদ্ধতি হবে একই রকমের।

একজন মানুষ ও একটি জাতির ব্যক্তিত্ব ও চেতনার নির্মানে কোন উপাদানগুলো ভূমিকা রাখে? ধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি, অতীত সভ্যতা, শিক্ষা এবং ঐতিহ্য – এগুলোই হলো একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও চেতনা এবং সাধারণভাবে একটি জাতির চরিত্র নির্মানের গাঠনিক উপাদান। এই উপাদানগুলো সমাজ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়। তারা ইউরোপে একভাবে হাজির হয় আবার এশিয়া ও আফ্রিকাতে ভিন্নভাবে হাজির হয়। তাদের সবাইকে একই রকম হতে হবে। মানুষকে সমজাতীয় করতে হলে চিন্তা ও চেতনার যে ভিন্নতা তা ধ্বংস করতে হবে। তারা যেখানেই থাকুক না কেন একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুযায়ীই তাদের চলতে হবে।

এই কাঠামোটি কি? এটি ইউরোপের বাতলে দেওয়া কাঠামো। এটি দেখায় কিভাবে সমগ্র এশীয় জাতিগোষ্ঠীকে এবং আফ্রিকানদের চিন্তা করতে হবে, কিভাবে পোশাক পরিধান করতে হবে, কিভাবে আকাংখা পোষণ করতে হবে, কিভাবে দুঃখ করতে হবে, কিভাবে তাদের গৃহ নির্মান করতে হবে, কিভাবে তাদের সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে, কিভাবে ভোগ করতে হবে, কিভাবে তাদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশ করতে হবে এবং সর্বশেষ কিভাবে পছন্দ করতে হবে ও কি পছন্দ করতে হবে? শ্রীঘ্রই এটি প্রতিয়মান হয় যে আধুনিকায়ন বলে একটি নয়া সংস্কৃতি পৃথিবীতে হাজির হয়েছে।

ইউরোপীয়রা বুঝতে পারে প্রাচ্যের একজন অধিবাসীকে আধুনিকায়নের অমোঘ আকাঙ্খা দ্বারা প্রলুব্ধ করার মাধ্যমেই তার নিজস্ব অতীতকে অস্বীকার করানো যেতে পারে। তখনই সে নিজ হাতে তার স্বতন্ত্র সংস্কৃতির গাঠনিক উপাদান সমূহ, তার ধর্ম ও ব্যক্তিত্ব ধ্বংস করতে সাহায্য করবে। ফলে আধুনিকায়নের এ প্ররোচণা ও আকাঙ্খা দূর-প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য, নিকট প্রাচ্য, ইসলামী ও ব্ল্যাক দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়ে এবং আধুনিকায়িত হওয়ার অর্থ দাঁড়ায় একজন ইউরোপীয়র মতো হয়ে উঠা।

সরাসরি বলতে গেলে আধুনিকায়িত হওয়ার অর্থ হলো ভোগের ক্ষেত্রে আধুনিকায়িত হওয়া। একজন ব্যক্তির আধুনিকায়িত হয়ে উঠার অর্থ হলো তার চাহিদা পূরণের জন্য তার রুচি “আধুনিক” বস্তুসামগ্রী আকাঙ্খা করে। অন্যভাবে বলতে গেলে সে ইউরোপ হতে নতুন জীবন-প্রণালী ও আধুনিক পণ্য আমদানি করে এবং তার নিজস্ব স্বতন্ত্র ও জাতীয় অতীত থেকে উৎসারিত নতুন ধরনের পণ্য ও জীবন-প্রণালী গ্রহণ করে না। নন-ইউরোপীয়দের  আধুনিকায়িত করা হয় ভোগের খাতিরে। অবশ্য পশ্চিমারা প্রতিরোধ ও জাগরণের ভয়ে এ কথা বলতে পারে না যে, তারা তাদের (প্রাচ্যবাসীর) বুদ্ধি, মনন ও ব্যক্তিত্বকে পুনর্গঠন করছে।

ফলে ভোগের নতুন এই রুপরেখা চাপিয়ে দিতে ইউরোপীয়দের নন-ইউরোপীদেরকে এটা ভাবাতে হয় যে আধুনিকায়ন ও সভ্যতা সমার্থক। কেননা সভ্যতার প্রতি সবারই একটা আকাঙ্খা থাকে। “আধুনিকায়ন”কে ‘সভ্যতা’ আকারে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং এভাবে জনগণ আধুনিকীকরণের ইউরোপীয় পরিকল্পনায় সাহায্য করে। যেহেতু নন-ইউরোপীয়রা নতুন পণ্য উৎপাদন করতে পারে না, তারা স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যা তাদের জন্য পণ্য উৎপাদন করে এবং যাই উৎপাদন করা হোক না কেন তা-ই তারা কিনবে এই আশা ধারণ করে।

আধুনিকায়ন ঐতিহ্য, ভোগের ধরণ ও বস্তুগত জীবনকে পুরাতন থেকে নতুনের দিকে পরিবর্তন করছে। সমস্ত নন-ইউরোপীয়দের আধুনিকায়িত করার জন্য সর্বপ্রথম তাদেরকে ধর্মের প্রভাব অতিক্রম করতে হয়। কেননা ধর্ম যেকোন সমাজে একটি স্বাতন্ত্রবোধের জন্ম দেয়। ধর্ম একটি উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিকে স্বীকার্য ধরে নেয় যার সাথে সবাই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঐক্য অনুভব করতে পারে। যদি এই বুদ্ধিবৃত্তির বিনাশ সাধন করা যায় এবং এর অবমাননা করা যায় তবে এর সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিও অপমানিত হয় এবং ধ্বংসের অনুভূতি তারিত হয়। ফলে স্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা “ধর্মীয় উন্মত্ততা” (Fanaticism)–এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।  ফ্রাঞ্জ ফানো যেমনটি বলেছেন, “ইউরোপ নন-ইউরোপীয়দের যন্ত্র দ্বারা বন্দী করতে চেয়েছিলো। একজন ব্যক্তি কিংবা কোন সমাজকে কি যন্ত্র অথবা নির্দিষ্ট কিছু ইউরোপীয় পণ্য দ্বারা দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা সম্ভব যদি তার কাছ থেকে তার ব্যক্তিত্বকে ছিনিয়ে নেওয়া না হয়?” না। সম্ভব না। অবশ্যই সর্বপ্রথম ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে ধ্বংস করতে হবে।

তারা তাকে তার ব্যক্তিত্ব হতে বঞ্চিত করে। নিজের ভিতর যতোগুলো ‘আমি’ সে অনুভব করে সবগুলো থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। তাকে অধিকতর বিনম্র সভ্যতা ও সামাজিক কাঠামোর অংশ হিসেবে নিজেকে ভাবতে বাধ্য করতে হবে। এটিও স্বীকার করতে বাধ্য করতে হবে যে, ইউরোপীয় সভ্যতা, পশ্চিমা সভ্যতা এবং পশ্চিমা জাতি শ্রেষ্ঠতর। আফ্রিকাকে একথা বিশ্বাস করতে হবে যে, একজন আফ্রিকান হলো বর্বর বা অসভ্য যাতে সে ‘সভ্য’ হওয়ার জন্য প্ররোচিত হয় এবং নিজেকে ইউরোপীয়দের হাতে তুলে দেয় যারা তার ভ্যগ্য নির্ধারণ করবে। বেচারা বুঝতে পারে না যে, সে সভ্য হওয়ার স্থলে আধুনিকায়িত হচ্ছে। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই হঠাৎ করেই আঠারো এবং উনিশ শতকে আফ্রিকানদের বর্বর, অসভ্য ও নরখাদক হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। শতশত বছর ধরে ইসলামী সভ্যতার সাথে লেনদেন করা আফ্রিকানরা কখনোই নরখাদক হিসেবে পরিচিত ছিল না। হঠাৎ করেই একজন কালো আফ্রিকান নরখাদক হয়ে গেলে। তার গায়ে বিশেষ গন্ধ, বিশেষ জাতির রঙ লাগানো হলো। বলা হলো তার মস্তিস্কের ধূসর অংশটি কাজ করে না এবং সামনের অংশটি একজন এশীয়ের মতোই পশ্চিমাদের তুলনায় খাটো।

তারপর আমরা দেখতে পেলাম “পশ্চিমা শ্রেষ্ঠত্ব” এবং এর “সভ্যতা ও জনগণের শ্রেষ্ঠত্বে”র উপর ভিত্তি করে একটি নয়া সংস্কৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। তারা আমাদের এবং পুরো বিশ্বকে বুঝালো যে ইউরোপীয়রা মানসিকভাবে ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অসাধারণভাবে মেধাবী যেখানে প্রাচ্যীয় জনগণ হলো অদ্ভুত আবেগ ও নস্টিক (gnostic) মেধার অধিকারী আর নিগ্রোদের দৌড় কেবল নাচ, গান, ছবি আঁকা আর ভাস্কর্য নির্মাণ পর্যন্তই। এরপর নন-ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠীর আধুনিকীকরনের বৈধতা প্রদানের জন্য জন্ম নেয়া এই চিন্তা-প্রক্রিয়াটিই নন-ইউরোপীয় এলিট শ্রেনীদের চিন্তা-কাঠামোর ভিত্তিতে পরিণত হলো। আধুনিকায়ন কিসের? ভোগের, মননের নয়। সভ্যতার নামে আধুনিকায়নের প্রচারণা চলতে থাকে এবং ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নন-ইউরোপীয় সমাজগুলো নিজেরাই তাদের মেধাবী বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে আধুনিকায়িত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করতে উঠে পরে লাগলো।

এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর উৎপত্তি ও গঠন বিবেচনা করা যাক। জ্যাঁ পল সার্ত্রে “The Wretched of the Earth” গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছেন, “আমরা আফ্রিকান অথবা এশীয় যুবকদের একটি দলকে আমস্টারডাম, প্যারিস, লন্ডনে নিয়ে আসবো… কিছু মাস তাদেরকে এদিক সেদিক ঘুরতে নেওয়া হবে, তাদের পোশাক ও অলংকার পাল্টানো হবে, তাদেরকে আদব-কায়দা, সামাজিক রীতি এবং কিছুটা ভাষা শিক্ষা দেওয়া হবে। সংক্ষেপে, তাদেরকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূল্যবোধমুক্ত করে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে। তারা আর ঐ ব্যাক্তি থাকবে না যে নিজের মনের কথা বলতে পারে; বরঞ্চ তারা আমাদের মুখপাত্র হয়ে উঠবে। আমরা চিৎকার দিয়ে মানবতা ও সাম্যের স্লোগান ধরবো আর তারা আফ্রিকায় আমাদের কণ্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে “মানবতা” “সাম্য” এসবের গান গাইবে।

এরা হলো সেইসব ব্যক্তি যারা তাদের জনগণকে নিজেদের ধর্মনিষ্ঠা পাশে সরিয়ে রাখতে, ধর্ম পরিত্যাগ করতে এবং স্থানীয় সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হতে প্রলুব্ধ করেছিলো। কেননা তাদের ধারণা ছিলো এগুলো তাদেরকে আধুনিক ইউরোপীয় সমাজ থেকে পিছিয়ে রেখেছিলো। তারাই তাদের জনগণকে প্ররোচিত করেছিলো আপাদমস্তক পশ্চিমা হওয়ার জন্য।

রপ্তানি ও বিনিময়ের মাধ্যমে কীভাবে ইউরোপীয় হওয়া সম্ভব? সভ্যতা কি এমন কোন পণ্য যা রপ্তানি করা যায়? অবশ্যই না। কিন্তু আধুনিকতা হলো আধুনিক পণ্যের একটি সমষ্টি যা কোন সমাজ ১, ২ অথবা ৫ বছরের মধ্যেই আমদানি করতে পারে। একটি নির্দিষ্ট সমাজকে কয়েক বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে আধুনিকায়িত করা সম্ভব। একইভাবে একজন ব্যক্তিকেও সম্পূর্ণরূপে আধুনিকায়িত করা সম্ভব। এমনকি একজন ইউরোপীয়র চাইতেও বেশী আধুনিক করা সম্ভব। তার ভোগের ধরন পরিবর্তন করলেই সে আধুনিকায়িত হয়ে উঠবে। ঠিক এটাই ইউরোপীয়রা আশা করেছিল।

কিন্তু একটি জাতি অথবা সমাজকে সভ্য করা এতো সহজ নয়। সভ্যতা ও সংস্কৃতি কোন ইউরোপীয় নির্মিত পণ্য নয় যে তার মালিকানাই কাউকে সভ্য বানিয়ে দেবে। কিন্তু তারা আমাদের বিশ্বাস করালো যে আধুনিকায়নের নামে এইসব ছাইপাশ হলো সভ্যতার বহিঃপ্রকাশ এবং আমরাও আগ্রহের সাথে আমাদের যা কিছু ছিলো সব ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। এমনকি আমাদের সামাজিক মর্যাদা, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিও ত্যাগ করলাম, কেবলমাত্র আমাদের মুখে ইউরোপের দেওয়া ফোঁটা ফোঁটা পানির তৃষ্ণার্ত চোষক হওয়ার জন্য।

এটাই হলো আধুনিকতার প্রকৃত অর্থ। এভাবেই কোন ধরনের প্রেক্ষাপটবিহীন একটা সত্ত্বা নির্মিত হলো যে তার ইতিহাস ও ধর্ম হতে বিচ্ছিন্ন; সে তার জাতি, তার ইতিহাস ও তার পূর্বপুরুষরা এই পৃথিবীতে যা কিছু নির্মান করেছে তার ব্যাপারে পুরোপুরি অজ্ঞ। সে তার নিজস্ব মানবিক গুনাবলী হতে বিচ্ছিন্ন; সে কেবলমাত্র একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড ব্যক্তিত্ব যার ভোগের ধরন পালটে দেওয়া হয়েছে। যার মনন পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে; যে তার পুরনো মূল্যবান চিন্তা, সমৃদ্ধ অতীত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে এবং ভেতর থেকে সম্পূর্ণরূপে শুন্য হয়ে গেছে। জ্যাঁ পল সার্ত্রে এভাবে বলেছেন, “এই সমাজগুলোতে একজন অনুকারক (assimilate) (অর্থাৎ একজন আধা–চিন্তাবিদ (quasi thinker) ও আধা-শিক্ষিত (quasi-educated))  সৃষ্টি করা হয়, কোন প্রকৃত চিন্তক কিংবা বুদ্ধিজীবী নয়।”

একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবী হলেন তিনি যিনি তার সমাজকে জানেন, এর সমস্যা সম্পর্কে সচেতন, তার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারেন, এর অতীত সম্পর্কে জানেন, এবং যিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন। এই আধা-বুদ্ধিজীবীগণ অবশ্য জনগণকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

ইউরোপ এবং আমেরিকাতে জ্যাজ গাওয়া হচ্ছে এমন জায়গায় গিয়ে গান পছন্দ না হলে তারা স্পষ্টভাবে সরাসরি তা বলে দেয়। কিন্তু প্রাচ্যীয় দেশগুলোতে কেউ একথা বলার সাহস রাখে না যে, “জ্যাজ খারাপ” এবং আমি জ্যাজ পছন্দ করি না”। কেন? কারণ তারা তার মধ্যে এতোটুকু ব্যক্তিত্ব অবশিষ্ট রাখেনি যার ভিত্তিতে সে তার পোশাকের রং কিংবা খাবারের স্বাদ বাছাই করবে। ফলে ফ্রাঞ্জ ফানো যেমনটি বলেছেন, “প্রাচ্যের দেশগুলো যাতে  ইউরোপকে অনুকরণ করে এবং বানরের মতো তাকে অনুকরণ করে সে লক্ষ্যে তাদের নন-ইউরোপীয়দের কাছে প্রমাণ করতে হতো যে তারা ইউরোপীয়দের মতো একই মানবিক মূল্য ধারন করে না। তাদের ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্ম এবং শিল্প এ সমস্ত কিছুকে খাটো করার দরকার ছিলো যাতে করে তারা এ বিষয়গুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আমরা দেখি যে, ইউরোপীয়রা ঠিক তাই করেছে।”

তারা এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরী করে যারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতো না কিন্তু তারপরও একে ঘৃণা করার জন্য ছিলো সদা প্রস্তুত। তারা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে বাজে কথা বলে বেড়ায়। তারা নিজেদের ইতিহাস বুঝে না কিন্তু এর নিন্দা করার জন্য এক পায়ে খাড়া। অন্যদিকে কোন ব্যতিক্রম ছাড়া যা-ই ইউরোপ থেকে আমদানি করা হয় না কেন তারা তার প্রশংসায় মেতে উঠে। ফলত এমন একটি সত্ত্বার জন্ম হলো যে প্রথমে তার ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তারপর এগুলোকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করতে শুরু করে। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, সে একজন ইউরোপীয় হতে নিম্নতর। যখন এই বিশ্বাস তার ভেতরে শেকড় গাড়তে শুরু করে সে নিজেকে খণ্ডন করার চেষ্টা করে। তার সাথে সম্পৃক্ত সমস্ত কিছুর সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করার চেষ্টা করে এবং চেষ্টা করে যে কোন উপায়ে নিজেকে একজন ইউরোপীয়র মতো বানাতে যাকে অবজ্ঞা করা হয় না এবং খাটো করে দেখা হয় না। যে অন্তত বলতে পারে, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আমি নিজেকে একজন ইউরোপীয়র পর্যায়ে পৌঁছার মতো আধুনিক করতে পেরেছি।”

এবং একজন নন-ইউরোপীয় যখন নিজেকে আধুনিকায়িত করার সুখ-বিলাস করতে থাকে ইউরোপীয় পুঁজিপতি ও বুর্জোয়ারা তাকে নিজেদের উদ্বৃত্ত্ব উৎপাদনের ভোক্তায় রূপান্তরের সাফল্যে হাসতে থাকে।

সূত্রঃ Civilization and Modernization

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
5460-m

মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ

ফাহমিদ-উর-রহমান | এপ্রিল ২৩, ২০১৬
Download PDF

এক

মোহাম্মদ হামিদুল্লাহকে বলা হতো স্বাধীন হায়দারাবাদের শেষ নাগরিক। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন হায়দারাবাদ রাষ্ট্র গায়ের জোরে ভারত দখল করে নেয়। সেই থেকে মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ একজন রাষ্ট্রবিহীন ব্যক্তিতে পরিণত হন এবং আমৃত্যু তিনি পাসপোর্টবিহীন অবস্থায় রাজনৈতিক মুহাজির (Political Refugee) হিসেবে কাটিয়ে দেন। হায়দারাবাদের অবলুপ্তির পর তিনি কোন দেশের নাগরিকত্ব নেননি। এমনকি তখনকার পরিস্থিতিতে অনেক হায়দারাবাদী মুসলিম পাকিস্তানকে তাদের নতুন রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করলেও হামিদুল্লাহ তাও করেননি। নতুন মুসলিম পাকিস্তানের প্রতি তাঁর ভালবাসার কমতি ছিল না। কিন্তু হায়দারাবাদ ছিল তাঁর জন্মভূমি, তাঁর বিশ্বাস ও স্বকীয়তার প্রতীক। তাঁর হায়দারাবাদ সংকীর্ণ ও সাম্প্রদায়িক ছিল না, ছিল তার বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির মতো উদার। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বহুত্ব ও সহিষ্ণুতার এক তীর্থস্থান এবং মোগল সাম্রাজ্যের পর উপমহাদেশের প্রধান মুসলিম শক্তিকেন্দ্র।

মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ তাই ভারত কর্তৃক তার প্রিয় হায়দারাবাদের জবরদখল ও আগ্রাসনকে কখনোই মেনে নিতে পারেননি বিশেষ করে হায়দারাবাদের ঐশ্বর্যময় সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে যে নির্মমতার সাথে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে তা তাঁর জন্য হজম করা ছিল সত্যিই কঠিন ও মর্মস্পর্শী ব্যাপার। (পাঁচ দিনের এই পরিকল্পিত দখল অভিযানে ভারতীয় বাহিনী দুই লক্ষের উপর নিরীহ হায়দারাবাদী মুসলমানকে হত্যা করে। এই অভিযানের মূল পরিকল্পক ছিলেন ভারতের তৎকালীন মুসলিম বিদ্বেষী উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভ ভাই পাটেল)।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে  বতৃতা দিতে গিয়ে হায়দারাবাদের বিপর্যয়কে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত সেদিন বলেছিলেনঃ The march of the Indian troops on the capital of Hyderabad reminds me of the march of Italian troops towards the Abyssinian capital.

যদিও সাম্রাজ্যবাদের মোড়লরা স্বাধীন হায়দারাবাদের জন্য এরপরে তেমন কিছুই করেনি। ভারতীয় আগ্রাসনের পরে নিরাপত্তা পরিষদে হায়দারাবাদকে নিয়ে যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল তাও আর কখনো হয়নি। হায়দারাবাদের শেষ প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক আলী তাঁর দেশের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে যে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলেন ভারতীয় আগ্রাসনের পর তখনকার পরিস্থিতিতে সেই প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও পিছু হটে আসেন ও গোপনে ভারতীয় এসট্যাবলিশমেন্টের সাথে বোঝাপড়া করে ফেলেন।

এই প্রতিনিধিদলের একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ যার কাছে হায়দারাবাদ কোন ভুলে যাওয়ার বিষয় ছিল না। আন্তর্জাতিক আইনের ছাত্র হিসেবে তিনি এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছিলেন যে, তাঁর দেশ এক অন্যায় আগ্রাসন ও জবরদখলের শিকার। তিনি কোন সরকারের সাথে যুক্ত ছিলেন না বা তাঁর তেমন কোন শক্তিও ছিল না। একজন বিনম্র জ্ঞানসাধক হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটক্যাচালও তিনি ভালভাবে বুঝতে পারেননি। তবুও ব্যক্তিগতভাবে তিনি শেষ পর্যন্ত এই অবৈধ জবরদখলকে কখনোই স্বীকৃতি দেননি এবং তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রামও বাদ দেননি।

হায়দারাবাদ দখলের পর তিনি ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রিত হিসেবে থেকে যান এবং তাঁর ভাষায় তিনি কুফরিস্থানে (ভারত) আর কখনো ফিরে যাননি। তিনি সেখানে একটি মাসিক বুলেটিন বের করে হায়দারাবাদে ভারতের অবৈধ জবরদখল ও মুসলিম হত্যার প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের কাছে বুলেটিন পাঠিয়ে হায়দারাবাদ ইস্যুকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করেন এবং হায়দারাবাদ লিবারেশন সোসাইটি তৈরি করে কিছু আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করারও চেষ্টা চালান। বলা হয়ে থাকে এর সবকিছুই তিনি করেছিলেন নিজের পকেট থেকে এবং তাঁর টাইপরাইটারের সাহায্যে। এ কাজে হামিদুল্লাহ ছিলেন বরাবর একা। কেউ তাঁকে তেমন একটা সাহায্য করেনি এমনকি হায়দারাবাদের এলিটশ্রেণী যারা করাচীতে আশ্রয় নেন তাঁরাও এটিকে বাতিল বিষয় (Lost Case) হিসেবে গণ্য করেছিলেন।

কিন্তু হামিদুল্লাহ কোদালকে কোদালই বলেছেন এবং শেষ পর্যন্ত অন্যায়কে অন্যায় বলেই জেনেছেন। হামিদুল্লাহকে জানতে হলে তাই হায়দারাবাদকে জানা চাই। হায়দারাবাদ ট্রাজেডীর মধ্যে তাঁর রক্তাক্ত আত্মা মুখ লুকিয়ে আছে। ভারতের জবরদখলের আগ পর্যন্ত হামিদুল্লাহ হায়দারাবাদের বিখ্যাত উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ততদিনে তিনি ধীমান বুদ্ধিজীবী হিসেবেও আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। বিশেষ করে মুসলিম আইন, সিরাত ও হাদিস শাস্ত্রে তাঁর বুদ্ধিজীবিতা ছিল ঈর্ষণীয়।

১৯০৮ সালে হায়দারাবাদ রাজ্যের শহর হায়দারাবাদের পুরনো এলাকা মুহাল্লা ফিলখানায় হামিদুল্লাহর জন্ম। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হামিদুল্লাহর আব্বা ছিলেন ঐ রাজ্যের সহকারী রাজস্ব সচিব। যাকে হায়দারাবাদের সরকারি পরিভাষায় বলা হতো মদদগার মুতামিদ মালগুজারী। শৈশবে পারিবারিক পরিবেশে তাঁর লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। তারপর ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষা তিনি পান হায়দারাবাদের বিখ্যাত দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে। এখান থেকে তিনি মৌলভী কামিল ও দরসে নিজামী ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৩০ সালে হামিদুল্লাহ উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক আইনে এম.এ. ও এলএলবি ডিগ্রি নেন, এরপরে ১৯৩৩ সালে জার্মানীর বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.ফিল এবং ১৯৩৫ সালে প্যারিসের সোরবোর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট ডিগ্রি পান তিনি। ১৯৩৬ সালে দেশে ফিরে উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে যোগ দেন ড. হামিদুল্লাহ।

দুই

বুদ্ধিবৃত্তি ও জ্ঞানচর্চার জগতে ড. হামিদুল্লাহ একালে ইসলামের সোনালী যুগের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং আল ফারাবী, আল গাজালী ও শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তাভাবনার ধারাকে পুনর্জীবিত করেছিলেন। জ্ঞান সাধনায় একাগ্রতা, সত্যনিষ্ঠা, বিশ্বকোষসদৃশ পাণ্ডিত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানসাধনার ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ অবদান এই ঐতিহ্যের কয়েকটি গুনগত বৈশিষ্ট্য। ১৬৫টি গ্রন্থের রচিয়তা এবং প্রায় ১০০০টি গবেষণাপত্রের নিবন্ধকার হিসেবে ইসলামের জ্ঞানজগতের বিভিন্ন দিকের উপর তিনি আলোকপাত করেছেন। আইনের ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। খুব তরুণ বয়সে আইনবিদ হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং আইন বিষয়ের উপর লেখালেখি শুরু করেন। এসব লেখায় তাঁর যুক্তিবাদী ও বিশ্লেষণধর্মী মনের পরিচয় স্পষ্ট, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে ইসলামী উৎস থেকে পাওয়া প্রাসঙ্গিক কোন তথ্যকে তিনি সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।

যদিও ড. হামিদুল্লাহ জ্ঞানের ইসলামীকরণ জাতীয় অলঙ্কারিক শব্দ ব্যবহার করেননি কিন্তু তাঁর লেখালেখি নীরবে এই চেতনাকে সমর্থন করে গেছে। আন্তর্জাতিক আইনের উপর তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে International Law: Its Principles and Precedents. ২৫০ পৃষ্ঠার এ ছোট বইটি কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত ধারণার চর্বিত চর্বণ নয়। ইসলামী প্রেক্ষাপট থেকে দেখা আন্তর্জাতিক আইনের এক গভীর সমালোচনামূলক বই এটি। এর মাধ্যমে হামিদুল্লাহ সাহেব আন্তর্জাতিক আইনের একটি নতুন ভাষ্য রচনা করেন। এই বিষয়ে তাঁর অধিকার এবং প্রাথমিক কাজকর্ম পরবর্তীকালে তাঁকে মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন, ইসলামী পরিভাষায় যাকে বলা হয় সিয়ার, নিয়ে অধিকতর গবেষণায় আগ্রহী করে তোলে।

এক্ষেত্রে তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে Neutrality in Islamic International Law । এটি তিনি জার্মান ভাষায় লিখেছিলেন এবং ১৯৩৩ সালে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিসারটেশন (Dissertation) হিসেবে জমা দেন। মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনে Laws of Neutrality নিয়ে এটি হচ্ছে প্রথম সুবিন্যস্ত ও মৌলিক রচনা। বইটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের কয়েকটি দিক এখানে এমনভাবে আলোচিত হয়েছে যা এতকাল ইসলামী ও পশ্চিমী দুনিয়ার কোথাও জানা ছিল না। দ্বিতীয়ত এ বই ইসলামী আন্তর্জাতিক আইনে ইসলামী রাষ্ট্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একমাত্র দারুল ইসলাম ও দারুল হরবের শ্রেণী বিভাজনকে ভুল প্রমাণ করেছে। তৃতীয়ত এ বইয়ে ইসলামী আইনে Concept of Neutrality’র একটি নতুন প্রত্যয় সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। এবং সবশেষে মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনে, আইনী ব্যাখ্যার সময় সমকালীন ঐতিহাসিক ধারণা ও প্রেক্ষাপটকে সামনে এনে মূল্যায়নের উপর জোর দেয়া হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে বইটি মুসলিম আইনের উপর একালে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

সিয়ার শাস্ত্রে হামিদুল্লাহ সাহেবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছেঃ Muslim Diplomacy in the Time of the Prophet of Islam and His Orthodox Successors. এটি তিনি ফরাসী ভাষায় লেখেন এবং সোরবোর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিসারটেশন হিসেবে ১৯৩৪ সালে জমা দেন। বইটির দুটি খণ্ড। প্রথম খণ্ডে তিনি রসূল (সঃ) ও তাঁর পুণ্য খলিফা চতুষ্টয়ের সাথে সমকালীন শাসক ও উপজাতীয় প্রধানদের সম্পর্কের কথা বলেছেন। সেদিক দিয়ে এ বইটি প্রথম যুগের ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রক্ষাপট সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছে।

দ্বিতীয় অংশে তিনি রসুল (সঃ) ও তাঁর চার খলিফার সময়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংবিধানিক দলিলগুলো সংযোজন করেছেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে আহরণ করে এই মূল্যবান ও বিরল দলিলগুলো তিনি সমানুক্রম অনুসারে সাজিয়েছেন এবং ফরাসী ভাষায় তরজমা করেছেন। দ্বিতীয় অংশটি কয়েক বছর পর ড. হামিদুল্লাহ অন্যান্য অনেক দলিলপত্র সংযোজন করে আরো বর্ধিত আকারে বৈরুত থেকে আরবীতে পৃথকভাবে আল ওয়াতায়েক আল সিয়াসাহ নামে প্রকাশ করেন এবং এর বহু সংস্করণ বাজারে আসে। প্রাথমিক যুগের মুসলিম কূটনীতি সম্বন্ধে জানতে এ বইয়ের আজো বিকল্প নেই।

মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে হামিদুল্লাহ সাহেবের ক্লাসিক গ্রন্থ হচ্ছে The Muslim Conduct of State. মূলতঃ উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতোকত্তর অভিসন্দর্ভ হিসেবে তিনি এটা জমা দেন এবং ১৯৪১ সালে লাহোর থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে তিনি মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের সব খুটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করেন। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে নতুন বিশ্বপরিস্থিতি ও সমস্যার আলোকে বিশ শতকের প্রথম থেকেই মুসলিম চিন্তাবিদরা ইসলামী আইনের পুনর্গঠনের কথা ভেবে আসছিলেন। এ দিক দিয়ে ইকবাল ছিলেন অগ্রগণ্য। কিন্তু তিনি কিভাবে এটিকে পুনর্বিন্যস্ত করতে চেয়েছিলেন তা ঠিক এখন বোঝা না গেলেও, হামিদুল্লাহর The Muslim Conduct of State যদি তিনি দেখে যেতে পারতেন তবে এর মধ্যে হয়তো তাঁর স্বপ্নের কিছুটা বাস্তবায়ন দেখতে পেতেন। হামিদুল্লাহ তাঁর Muslim Conduct of State লিখতে গিয়ে Oppenheim এর International Law কে আধুনিক মডেল হিসেবে ধরেছেন এবং এই বইয়ে আলোচিত আন্তর্জাতিক আইনের শ্রেণীবিভাগ ও নানা প্রশ্নসমূহ ইসলামী প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন।

ডঃ হামিদুল্লাহ পরিশ্রমী গবেষক। এই বইয়ের পাতায় পাতায় তাঁর নিষ্ঠা ও শ্রমের ছাপ রয়েছে। নানা ভাষার ও দেশের নানা তথ্য তিনি সংগ্রহ করেছেন। তিনি শুধু ইসলামী আইন নিয়েই নাড়াচাড়া করেননি। ইতিহাস, দর্শন, নৌবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা, জীবনচরিতও পর্যালোচনা করেছেন। বিশেষ করে কুরআন শরীফের বিভিন্ন তফসীর ও হাদীসের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের নমুনা এ বইতে রয়েছে। ফিকাহর বিষয়বস্তু ছাড়াও ডঃ হামিদুল্লাহ মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনে নতুন বিষয়বস্তু ঢুকিয়েছেন। বিশেষ করে যেখানে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে সেখানে তিনি গতানুগতিক তথ্য ও ধারণার পাশাপাশি ফিকাহর ভিন্ন উৎস থেকে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া তিনি প্রচলিত বিষয়ের নতুন ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। এই ভাবে এই বই হয়ে উঠেছিল বিপুল তথ্য সমৃদ্ধ এবং ইসলামী আইন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এক মাইলফলক।

মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের উপর এ ধরনের বড় বড় কাজ করার পাশাপাশি তিনি অনেক বই নতুন করে সম্পাদনা করেছেন যা কিনা ইসলামের প্রাথমিক যুগের যুদ্ধকৌশল ও আন্তঃগোত্রীয় সম্পর্কের উপর আলো ফেলেছে। তিনি ইবনে ইসহাকের বিখ্যাত রসুল চরিত ও আল ওয়াকিদির কিতাব আল রিদ্দাও সম্পাদনা করেছেন। হামিদুল্লাহ সাহেব বিখ্যাত মদীনা সনদকে বলেছেন First Written Constitution of the World. এ শিরোনামে তিনি একটি পুস্তিকাও লেখেন এবং সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি হাম্বলী আইনবিদ ইবন আল কাইয়েমের বিখ্যাত ‘আহকাম আহলাল জিম্মা’ বইটিরও সম্পাদনা করেন। ফিকাহ শাস্ত্রে ইসলামী আন্তর্জাতিক আইনের উপর এটি একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

ড. হামিদল্লাহকে আধুনিককালে তাই মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের নব নির্মাতা বলা যেতে পারে। যদি ইমাম মোহাম্মদ ইবন আল হাসান আল শায়বানীকে মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের জনক বলা হয় তবে ড. হামিদুল্লাহকে আধুনিক মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের জনক বলতে হবে।

তিন

ড. হামিদুল্লাহর আর একটি প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল ‘সিরাহ’। মুসলিম দুনিয়ায় হযরত রসুল (সঃ)-এর জীবনকে কেন্দ্র করে যে বিপুল সাহিত্য রচিত হয়েছে ড. হামিদুল্লাহ আধুনিককালে তার সমৃদ্ধিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সম্ভবতঃ এ বিষয়ে তার আগ্রহের জন্ম যখন তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগের কূটনৈতিক পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।

‘সিরাহ’ বিষয়ে ড. হামিদুল্লাহর প্রথম উল্লেখযোগ্য গবেষণামূলক বই হচ্ছেঃ The System of Government in the Time of the Prophet. মদীনাকে কেন্দ্র করে যে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল তিনি তাকে বলতেন City State of Madinah. আলোচ্য বইয়ে এই নগর রাষ্ট্রের বিচার ও সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। বইটির বিষয়বস্তু চমৎকার। বিশেষ করে অতীতের সিরাহগুলোতে এই বিষয়ে কোন তথ্য না থাকার কারণে বইটির মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিষয়ে ড. হামিদুল্লাহর আর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছেঃ The Political Life of Noble Messenger.

এরপরে ড. হামিদুল্লাহ লেখেন The Battle fields of Holy Prophet. বইটিতে রসু্ল (সঃ) তাঁর জীবনের শেষ আট বছরে যে লড়াইগুলো লড়েছিলেন তার স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯৩০ এর দশকে ইউরোপ থেকে দেশে ফেরার সময় ড. হামিদুল্লাহ মক্কা, মদীনা ও তায়েফ সফর করেন এবং বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের স্থানগুলো প্রাথমিক যুগের ইসলামী বইপত্র ঘেঁটে তথ্য সংগ্রহ করে সুচিহ্নিত করেন। বইটিতে যুদ্ধগুলোর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট যেমন বর্ণিত হয়েছে তেমনি এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

সিরাহ বিষয়ে ড. হামিদুল্লাহর সবচেয়ে মূল্যবান বইটি ফরাসী ভাষায় লেখা। এর নাম Le Prophet de L’Islam, যা ১৯৫৯ সালে প্রকাশ পায়। বইটির দুটি অংশ। প্রথমটিতে রসুলের জীবন, মিশন ও তাঁর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে রসুলের বাণী ও শিক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বইটিতে অন্যান্য বিষয়ের সাথে তখনকার আরবের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতি ও পদ্ধতির উপর আলোকপাত করা হয়েছে এবং ইসলামের সাথে প্রাসঙ্গিক তখনকার দিনের আন্তঃরাষ্ট্র ও আন্তঃগোত্রীয় সম্পর্কের ধরণগুলো তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে রসুলের মিশনের সফলতার পিছনে বিভিন্ন গোত্রের ভূমিকা নিয়ে ড. হামিদুল্লাহর আলোচনা যেমন মৌলিক তেমন প্রতিভাদীপ্ত। এটা পাঠককে রসুল (সঃ)-এর বিভিন্ন সময়ে নেওয়া সিন্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা বুঝতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে ড. হামিদুল্লাহ দেখিয়েছেন কিভাবে রসুল (সঃ) এক গোত্রের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন, অন্যটির সাথে হননি। এটা পরবর্তীকালে ইসলামের বিকাশে সাহায্য করেছে। ড. হামিদুল্লাহর আগে পৃথিবী কেবল গ্রীসের নগর রাষ্ট্রগুলো সম্বন্ধে অবগত ছিল। তিনিই প্রথম বুদ্ধিজীবী যিনি মক্কা ও মদীনার নগর রাষ্ট্রের কথা সবার সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি এই দুটি নগর রাষ্ট্র সম্পর্কে বিপুল পরিমান বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন এ বইয়ে। বিশেষ করে মদীনা নগর রাষ্ট্রের সংবিধানের কথা বলেছেন, যা আগেই উল্লিখিত হয়েছে।

চার

ড. হামিদুল্লাহর আগ্রহের আরো একটি বিষয় ছিল কুরআন, বিশেষ করে হাদীসের ঐতিহাসিকতা। ফরাসী ভাষায় তাঁর লিখিত রসুল চরিত এবং পরবর্তীকালে ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত তাঁর বই Emergence of Islam এ কুরআন সম্পাদনা ও গ্রন্থনার ঐতিহাসিক যথার্থতা নিয়ে তিনি বিস্তারিতভাবে লিখেছেন।

তিনি হাদিস সংগ্রহের ঐতিহাসিকতা ও যথার্থতা নিয়ে কাজ করেছেন। বিশেষ করে উনিশ শতকে ইউরোপের ওরিয়েন্টালিস্টরা হাদিস সংগ্রহের ঐতিহাসিকতা নিয়ে যে সন্দেহ পোষণ করেছেন তিনি তার যুক্তিসিদ্ধ জওয়াব দিয়েছেন। ওরিয়েন্টালিস্টরা সেকালে যেটা বলার চেষ্টা করেছেন তা হলো হাদিস সংগ্রহ ও সম্পাদনার ব্যাপারটা ঘটেছে তৃতীয় শতাব্দীতে এবং যেহেতু এই সম্পাদনার কাজটি মৌখিক বর্ণনার উপর ভিত্তি করে হয়েছে তাই তাদের ধারণায় এর মধ্যে ভুল বর্ণনা, বর্ণনার মধ্যে সংযোজন ও বিয়োজনের মত ঘটনা ঘটেছে। ওরিয়েন্টালিস্টরা সম্পূর্ণ অসদুদ্দেশ্যে এই মৌখিক বর্ণনার তত্ত্বকে এমন শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করেছে যে পূর্ব ও পশ্চিমের অনেক পাঠকই তাদের কথায় বিশ্বাস করে ফেলেছে।

ড. হামিদুল্লাহর ওস্তাদ মওলানা মানাজির আহসান গিলানী প্রথম এই বিষয়টি তাঁর প্রতিভাধর ছাত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং এই বিষয়ে কাজ করবার কথা বলেন। মরহুম মওলানা অনেক পরিশ্রম করে যাবতীয় তথ্য প্রমাণ উদ্ধার করে প্রমাণ করেছেন রসুল (সঃ)-এর পুণ্য সাহাবীরা লিখিতভাবে তাঁর কথা ও দৃষ্টান্তকে হেফাজত করেছিলেন। ওস্তাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়ে ড. হামিদুল্লাহ এই বিষয়টি হাতে নেন এবং তাঁর সহজাত উদ্যম, মনীষা ও পরিশ্রমী সাধনার ফলে অচিরেই ফল ফলতে থাকে। ড. হামিদুল্লাহ তুরস্ক, জার্মানী ও ফরাসী দেশের কয়েকটি লাইব্রেরী থেকে হাদীসের কিছু প্রাচীন নমুনা সংগ্রহ করেন যা কিনা রসুল (সঃ)-এর সাহাবীদের দ্বারাই লিখিত হয়েছি্ল। এই আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে তিনি ওরিয়েন্টালিস্টদের মিথ্যা প্রচারের প্রতিবাদ করেন।

তিনি আরো উল্লেখযোগ্য প্রমাণসহ দাবি করেন শুধুমাত্র রসুলের সাহাবীরাই হাদিস লিখিতভাবে রক্ষা করেননি, স্বয়ং রসু্ল (সঃ)-এর নির্দেশেও লিখিতভাবে হেফাজত করা হয়েছিল। এইসব হাদীসের মধ্যে ৫২টি ধারা সংবলিত মদীনা সনদ এবং বিভিন্ন শাসক ও গোত্র প্রধানদের কাছে নানা রকম নির্দেশ ও পরামর্শ সংবলিত পাঠানো রসুলের চিঠিপত্রও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ড. হামিদুল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন সবচেয়ে মূল্যবান ও নির্ভরযোগ্য লিখিত হাদিস সংগ্রহগুলো হচ্ছে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস আবু রাফি, আনাস ইবনে মালিক, আমর ইবনে হাজম এবং আবু হুরায়রা কৃত। সর্বসাকুল্যে ড. হামিদুল্লাহ এ ধরনের ১৪টি প্রাচীন হাদিস গ্রন্থের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন।

পাঁচ

হায়দারাবাদ দখল যাওয়ার পর জীবনের বাকি ষাট বছর ড. হামিদুল্লাহ রিফিউজী হিসেবে প্যারিসে কাটিয়ে দেন। এখানে বসেই তিনি তাঁর মনন ও বিশ্বাসের চর্চা করে গেছেন, কিন্তু কোন অবস্থাতেই তিনি তাঁর বিশ্বাসকে কলুষিত হতে দেননি। ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। প্যারিসের সাধারণ একটি ফ্লাটে থাকতেন। বাজার থেকে শুরু করে রান্না পর্যন্ত সবই নিজ হাতে করতেন। কামিজ, পায়জামা, মাথায় কারকুলি টুপি এই ছিল তাঁর দৈনন্দিন পোষাক। তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও মনীষার সাথে ভদ্রতা, সৌজন্যতা ও বিনম্রতার এক অবিস্মরণীয় সমন্বয় ঘটেছিল। রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবার সাথে তিনি একই রকমভাবে মিশতেন। এ সময় তাঁর ব্যবহারে কোন তারতম্য দেখা যেত না। এতবড় পণ্ডিত, দুনিয়া জোড়া যার খ্যাতি, কয়েকটি ভাষায় যিনি সমান দক্ষতা ও স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে লেখালেখি করেছেন এবং প্রায় ২০টি ভাষার উপর যার স্বচ্ছন্দ দখল ছিল তাঁর ভিতর ঘূর্ণাক্ষরেও অহমিকার মত মানবীয় দুর্বলতা প্রশ্রয় পায়নি। সত্যিকার অর্থেই তিনি ছিলেন ফকীর, দা’য়ী ও ওয়ালিউল্লাহ।

প্যারিসের বিভিন্ন মসজিদে তিনি ইসলামের উপর বক্তৃতা দিতেন এবং অমুসলিমদের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেবার চেষ্টা করতেন। আমৃত্যু তিনি অমুসলিমদের সাথে ডায়ালগ ও সহাবস্থানের উপর জোর দিয়ে গেছেন। অমুসলিমদের কাছে ইসলামের বাণী সহজবোধ্য ভাষায় পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি ফরাসী ভাষায় কুরআনের তর্জমা করেন যা Le Coran নামে প্রকাশিত হয়। এই তর্জমা এত বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে প্রকাশের প্রথম বছরই ১ লাখ কপি নিঃশেষ হয়ে যায় এবং এটি পড়ে অসংখ্য অমুসলমান ইসলাম গ্রহণ করে।

ড. হামিদুল্লাহ বরাবরই আরবী ভাষা শিক্ষার উপর জোর দিতেন। কারণ তিনি মনে করতেন আরবী হচ্ছে কুরআনের ভাষা। এটি ছাড়া ইসলামকে জানা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই বিনম্র জ্ঞান সাধককে ১৯৮৫ সালে পাকিস্তানের হিজরা এডওয়ার্ড দেয়া হয়। এই পুরষ্কার তিনি গ্রহণ করেন, কিন্তু পুরষ্কারের বিপুল অর্থ তিনি ইসলামাবাদের ইসলামিক রিসার্স ইনস্টিটিউটে দান করে দেন। আর একবার তাঁকে বিখ্যাত ফয়সাল পুরষ্কার দেয়ার কথা উঠে। তাঁর শুভার্থীরা তাঁকে সৌদি আরবের ফয়সাল ফাউন্ডেশনে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেয়ার অনুরোধ করে। এর উত্তরে তাঁর শুভার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি যা লেখেন তা কেবল একজন ওয়ালীউল্লাহর পক্ষেই সম্ভবঃ

I fear that if I were to accept any worldly reward for my modest work, I may not get my due in the hereafter and be left with only my sins in my book of deeds and, therefore, I keep telling everyone I don’t want these awards.

প্যারিসে অবস্থান করলেও ড. হামিদুল্লাহর মন পড়ে ছিল মুসলিম উম্মাহর সাথেই। মুসলিম দুনিয়ার কোন আমন্ত্রণ পেলেই বা কোন সংকটে তাঁর ডাক পড়লেই তিনি সেখানে ছুটে যেতেন। ১৯৪৯ সালে তিনি করাচী যান এবং বছর খানেক অবস্থান করেন। এখানে তখন পাকিস্তানের সব মতের উলামা ও ইসলামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা মিলিত হয়ে সংবিধানের যে খসড়া তৈরি করেছিলেন তিনি তাঁর পরাপর্শক হিসেবে এসেছিলেন, যা পরবর্তীকালে Basic Principles of an Islamic State হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল।

তিনি কিছদিন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ইলাহিয়াৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া তিনি দা’য়ী হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে চলা মুসলিম স্বাধিকার আন্দোলনগুলো নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল প্রচুর। ড. হামিদুল্লাহ ছিলেন ইকবালের সেই কবিতার দরবেশের মত যাকে পূর্ব কিংবা পশ্চিমের শৃঙ্খল দিয়ে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন একালে ইসলামের ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূত। ২০০২ সালের ১৭ ডিসেম্বর এই বিনম্র ফকীর ও জীবন সাধক ইন্তেকাল করেন।

ছয়

ড. হামিদুল্লাহর উত্তুঙ্গ ব্যক্তিত্ব ও মনীষা তাঁর চিন্তাভাবনার একটি স্বাতন্ত্র্য দিয়েছিল। আজকাল অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী প্রতিনিধিত্বমূ্লক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উত্তম রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মনে করেছেন। কিন্তু ড. হামিদুল্লাহ democracy-কে demo(n)cracy বলে মনে করতেন। কারণ তাঁর ধারণা ছিল গণতন্ত্রে অধিকাংশের স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত হয় ও বাকী ৪৯% এর অধিকার অস্বীকৃত হয়। এ ক্ষেত্রে তিনি ইসলামের নীতি প্রয়োগ করে সকলের অধিকার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে পারস্পারিক সহাবস্থান সম্ভব বলে মনে করতেন। ইসলামের ইতিহাস এর বড় নজির। এক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, বাদশাহ কিংবা অন্য যে কেউ এ নীতি প্রয়োগ করতে পারে। ইসলামের ক্ষেত্রে দেখার ব্যাপার হচ্ছে নীতির যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কিনা। ড. হামিদুল্লাহর এসব চিন্তার সাথে অনেকে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু তাঁর চিন্তার যথার্থতা হালকা বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই।

ড. হামিদুল্লাহ পারিবারিকভাবে শাফেঈ ধারার অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বভাবজাত উদারতা তাঁকে এই সব মাযহাবের উর্ধ্বে নিয়ে গিয়েছিল। মাযহাব, তরীকা ও ফিরকার নীতি দ্বারা তিনি কখনোই ইসলামকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেননি। ইসলামের প্রয়োজনে তিনি সকল মাযহাবের আইনের উৎসগুলো ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। হানাফী, হাম্বলী, মালেকী এমনকী শিয়া আইনগুলো নিয়েও তিনি নির্বিবাদে কাজ করেছেন। এসব বিষয়ে তাঁর মধ্যে কোন সংকীর্ণতা কাজ করেনি। তিনি মনে করতেন ইসলামের উদারতার নীতিকে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। সংকীর্ণতা দিয়ে ইসলামের হারানো গৌরবকে ফিরিয়ে আনা যাবে না।

গ্রন্থঋণঃ

1.  “The Last Citizen of Hyderabad, M H Faruqi” In Impact International, Vol 33: No 1, 2 and 3, January-March, 2003.

2.  প্রাগুক্ত।

3.  প্রাগুক্ত।

4.  “Sirah, Hadith and Law: Almost a Century of Scholarship, Dr. Mahmood Ahmed Ghazi “In Impact International”, Vol 33: No 1, 2 and 3 January-March, 2003.

5.  প্রাগুক্ত।

6.  “Story of King Faisal Prize: In the event, escaped embarrassment, Syed Faiyazuddin Ahmed” in Impact International, Vol 33: No 1, 2 and 3, Janualry-March, 2003.

7.  “Confessions and Conversation: Poet, Politican and Polymath, Sadida Athaullah” in Impact International, Vol 33: No 1, 2 and 3 January-March, 2003.

সূত্রঃ বাংলা সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত “উত্তর আধুনিক মুসলিম মন” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
iqbaler kobita

ইকবালের কবিতা

সৈয়দ আলী আহসান | মার্চ ১৪, ২০১৬
Download PDF

আমাদের সাজাত্যবোধের উন্মেষ ঊনিশ শতকে ইংরাজ অধিকার বিস্তৃত হবার পর। বঙ্কিমচন্দ্রের পূর্ববর্তী সাহিত্য-সাধকদের রচনায় দেশের অব্যবস্থার জন্ম বেদনাবোধ ছিলো কিন্তু মুসলমানদের হাত থেকে নিস্কৃতি পেয়েছি ব’লে কেমন এক ধরণের অমার্জিত সস্তিবোধও ছিলো। রাজা রামমোহন ইউরোপীয়দের নেতৃত্ব মেনেছিলেন এবং তাদের ভারতে বসতি স্থাপন সমর্থন ক’রে একপ্রকার মিশ্রিত জাতির উদ্ভব কল্পনা ক’রেছিলেন। এ ক্ষেত্রে সমীকরণের কল্পনা হ’ইয়েছিলো হিন্দু এবং খৃষ্টানদের মধ্যে। সঙ্কীর্ণ গণ্ডীবদ্ধ হিন্দু সমাজনীতির সংস্কারই ছিলো বিদ্যাসাগরের একমাত্র কাম্য। রঙ্গলাল স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রাচীন আর্যসভ্যতার পুনর্জাগরণের- অবশ্য সেই আর্যসভ্যতা যার “পুরুষার্থে” দীপ্ত হ’য়ে রাজপুতনা স্বাধীনতার জয়োচ্চারণ করেছিলেন। রঙ্গলালের বক্তব্য হৃদয়াবেগ-রহিত, স্থূল। “স্বদেশীয় বীরদের গৌরবগাঁথা” তিনি গেয়েছেন কিন্তু ঐ পর্যন্তই। জাতীয়তা অথবা স্বাধীনতার অর্থ তিনি, পরিমিত ত’ নয়ই, সঙ্কীর্ণ পরিসরেও প্রকাশ করেন নি। প্রকৃত প্রস্তাবে বীর রসাশ্রিত কথকতাই তিনি ক’রেছেন, কবিতা রচনা করেন নি। তিনি গল্প ব’লে উত্তর দিতে চেয়েছেন এ-প্রশ্নের-

“কবে পুনঃ বীর রসে,

জগৎ ভরিবে যশে,

ভারত ভাস্বর হবে পুনঃ?”

হেমচন্দ্র সঙ্কোচ ও বিহবলতার মধ্যে দিয়ে সাজাত্যবোধের মর্মবাণী বহন করতে চেয়েছেন। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার কথা স্মরণ ক’রে আত্মশ্লাঘা আছে, শক্তিমত্ততার বন্দনা আছে। ইংরাজ-অধিকারের স্বীকৃতি আছে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পরাধীনতাজনিত উদ্যমহীনতার জন্ম, হতাশা ও আক্ষেপ আছে। হেমচন্দ্র অধিকারী ইংরাজের কাছেই কল্যাণ যাচ্‌ঞা ক’রেছেন, অধুনা দুর্বল ও সন্ত্রস্ত ভারতীয়দের জন্যকৃপাভিক্ষা ক’রেছেন। হিন্দু ধর্মাদর্শের পুনর্প্রভাব কামনা ক’রেছেন প্রাচীন আর্য-সাধনার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের মিশ্রণ যাচ্‌ঞা ক’রে। রাষ্ট্রীয় অধিকারবোধের আভাষ পর্যন্ত নেই কিন্তু সাজাতিকতা এবং হিন্দু ভারতের একীকরণের কথা আছে।

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ প্রকাশিত হয় ১৮৮২ খৃষ্টাব্দে। সর্বপ্রথম বলিষ্ঠভাবে এবং যথেষ্ঠ স্বচ্ছতার সঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবোধের কথা এখানেই বলা হয়। দেশমাতৃকার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা এবং অর্চনার মধ্যে, অনেকটা ধর্মীয় রূপকেরর সাহায্যেই, হিন্দুর কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনের জন্য তিনি যে জাতীয় ঐক্যতত্ত্বের সংবাদ আনলেন বাংলা দেশে, তার প্রভাব হ’ল অভূতপূর্ব। জাতি হিসেবে হিন্দুদের প্রতিষ্ঠা এবং সস্তিলাভের পক্ষে মুসলমানকেই বঙ্কিমচন্দ্র এমমাত্র প্রতিবন্ধক ভেবেছেন। অধিকারী ইংরেজের বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ নেই। অনুদারতা এবং অসদ্ভাবের এই যে ভিত্তিভূমি রচনা করে হ’ল, আজ পর্যন্তও তা স্থির ও সুদৃঢ় রয়েছ।

উর্দূ কবি হালীর ‘মসদ্দস’ প্রায় একই সময়ে প্রকাশিত হয়। হালী ভারতীয় মুসলমানদের কল্যাণের জন্য কুসংস্কার-রহিত যে বিশ্ব মুসলিম ঐক্যবোধের কথা বল্‌লেন, তা’তে মুসলমনদের তৎকালীন বিপর্যয় এবং অশেষ হতাশার জন্যরোনাজারি আছে কিন্তু কোথাও হিন্দুর অকল্যাণ-কামনা নেই। স্যার সৈয়দের সংস্কার ও শিক্ষা আন্দোলনের পশ্চাতে হালীর অনুভূতি সক্রিয় ছিল। নির্জিত-প্রাণ মুসলমানদের জন্য পূর্ব-গৌরবের রুদ্ধ-কবাট প্রথম উন্মোচন করলেন হালী। এ-গৌরবের পুনপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ইউরোপের সে-জ্ঞানভাণ্ডার যা আজ বিশ্ব কর্তৃক স্বীকৃত, নিরলস কর্মপথে আচারের জীবনকে বর্জন এবং বুদ্ধির আলোকদীপ্ত জীবনপথের সন্ধান।

বাংলা দেশের মুসলমানদের কাছে মুসলিম সভ্যতার পুনরুত্থানের কথা অ্রজ্ঞাত ছিলো না। রাজনৈতিক তরঙ্গবিক্ষোভে বাঙ্গালী মুসলমানদের নির্যাতিত মনও কম্পমান হ’লো। বিহবল মুসলমানদের জাগরণের কথা বল্‌লেন মীর মুশাররফ হোসেন, মুষাম্মেল হক, ইসমাইল হোসেন শিরাজী ও কায়কোবাদ। এঁদের রচনার পরাধীনতার জন্য তীব্র বেদনাবোধ ছিলো, এবং ইংরাজ তোষণের মতো হীনমন্যতার প্রশ্রয় ছিলো না। শব্দবোধ শ্লথ এবং দুর্বল, কোথাও কোথাও হেম-নবীনের অনুকৃতি মাত্র কিন্তু এর মধ্যেই কেমন একটি অকপট, নিষ্কলঙ্ক মনের পরিচয় আছে, যা’ আজ্‌কের দিনে আর পাওয়া যায় না।

ইক্‌বালের সঙ্গে আমাদের পরিচয় তারও অনেক পরে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর তুর্কীর খেলাফত যখন আর নেই, যখন বিশ্বমুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের স্বপ্ন অস্পষ্ট হ’য়েছে, তখন নজরুল ইস্‌লাম অতর্কিতে আমাদের প্রাণে উন্মাদনা আন্‌লেন উদ্ভব-যুগের ইস্‌লামের কাহিনী স্মরণ ক’রে এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্থাবর শান্ত মনে প্রচণ্ড আঘাতে ক’রে। নজরুল ইস্‌লামকে পূরোভাগে রেখে বাঙ্গালী মুসলমান যখন আপন জীবনের ভিত্তিহীনতার জন্য অভিযোগ তুল্‌ছে, তখন ইক্‌বালের “শেকোয়া”র সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়।

নজরুলকে পথিকৃৎ মেনে আশরাফ আলী খান আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে অভিযোগ আন্‌লেন আমাদের জীবনের বিপর্যয় ও স্বস্তিহীনতার জন্য এবং সত্যাদর্শের অভাবের জন্যও। “শেকোয়া”য় তিনি আপন মনের অনুরণন শুন্‌লেন। কাব্য হিসেবে “শেকোয়া”র মূল্য যতই লঘু হোক্‌ না কেন, এর অভিযোগ আমাদের অনুভূতিতে শিহরণ তুলেছিলো। নজরুলকে ভাল লেগেছিলো, ই্‌কবালকে আরো ভালো লাগ্‌লো। নজরুলের দীপ্তি অসাধারণ কিন্তু সে দীপ্তির দাহন আছে- স্নিগ্ধতা নেই; ইক্‌বালের কাব্য জ্বালা আছে কিন্তু ধর্মের স্থির-সত্যের সঙ্গে তার অসদ্ভাব নেই, তাই তা’ মূলতঃ প্রশান্ত এবং জীবনানুভূতিতে অতুলনীয়।

এর পর যখন তিনি স্পষ্ট ভাষায় হিন্দু থেকে বিশ্লিষ্ট হ’ইয়ে ভারতীয় মুসলমানকে অন্য এক জাতীয় ঐক্যতত্ত্বের সন্ধান  করতে বল্‌লেন, তখন তাঁকে আমরা নেতৃপদ দিলাম। ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ মুসলিম লীগ অধিবেশনের সভাপতির ভাষণে ইক্‌বাল ভারতের দ্বিজাতিতত্ত্বের যে-তথ্য প্রকাশ ক’রলেন, পরবর্তীকালে তাই হ’য়ে দাঁড়ালো পাকিস্তান পরিকল্পনার অঙ্কুর। অভিভাষণে ইক্‌বাল বল্‌লেন যে, রেন বলেন, মানুষ তার গোত্র বা ধর্মের দাসত্বে আবদ্ধ থাকে না। ভৌগলিক সীমারেখাও তা’কে বন্ধনদশায় রাখ্‌তে পারে না। উদারহৃদয়, বিদগ্ধমনা মানুষের সমষ্টি একটি বিশেষ আদর্শ ও বোধের সৃষ্টি ক’রে থাকে যা’কে আমরা জাতি ব’লে আখ্যাত করি। এহেন জাতির সৃষ্টি একেবারে যে অসম্ভব, তা’ নয়, যদিও এর সম্ভাব্যতার জন্য মানুষের মনকে নতুন ক’রে সংগঠন ক’রবার একটি বিলম্বিত প্রক্রিয়ার প্রয়োজন করে। এমন অবস্থা সত্য হ’তে পারতো, যদি কবীরের শিক্ষা এবং আকবরের বিশ্বাস জনসাধারণের মনকে স্পর্শ ক’রতো।

কিন্তু অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয় যে, একটি বৃহত্তর পরিবেশে সম্মিলিত হবার আকাঙ্ক্ষা ভারতের কোন ধর্মাবলম্বীই আপন বিশ্বাস ও আদর্শকে অস্বীকার ক’রতে প্রস্তুত নয়। সম্মিলিত অস্তিত্বের জন্য কারোই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় না এবং সেজন্য যে মূল্য দিতে হবে, তা’ও কেউ দিতে চায় না। ভারতীয় ঐক্যবোধের জন্য প্রয়োজন অনেক আদর্শ এবং জাতির অনস্তিত্বের নয় কিন্তু সে সবার মধ্যে পারস্পরিক বুঝাপড়ার। একমাত্র যুক্তিসঙ্গত এবং বাস্তব পন্থা হচ্ছে, যা’ নেই তা’ মেনে নেওয়া নয় কিন্তু প্রচলিত অবস্থাকে স্বীকার করা।

পাকিস্তান পরিকল্পনার উন্মেষ হ’লো এভাবেই। রাষ্ট্রনৈতিক পরিকল্পনা নয় কিন্তু আদর্শের স্বীকার। সাহিত্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা শুনা যেতে লাগলো আরো পরে ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে মুস্‌লিম লীগের লাহোর প্রস্তাবের পর। বলা হ’লো প্রকাশ্যেই যে, আমাদের সাহিত্য হবে আলাদা, কেন না আমাদের জীবনবোধ হিন্দুদের সঙ্গে সংসক্ত নয়। কবিতার ক্ষেত্রেই এ-আদর্শের অনুসৃতি হ’লো সার্থক। পাকিস্তান তখনও পর্যন্ত আবেগ, উল্লাস ও কল্পনার এবং কবিতাই হ’ল এ-আবেগ প্রকাশের একমাত্র পরিসর। এ-বক্তব্যের সঙ্গে রূপকল্পের সমন্বয় সাধনের পর কখনও কখনও কারো কবিতা শ্রোত্ররসায়নও হ’য়েছে। কিছুটা অগভীরভাবে হ’লেও কাব্যক্ষেত্রে তিনটি ধারার চিহ্ন দেখা গেলো- ইস্‌লামী ঐতিহ্যের কাহিনী ও সৌন্দর্যের ধারা; ইস্‌লামের সত্য, বিশ্বাস এবং উপলব্ধিগত আদর্শ জীবনবোধ এবং সর্বশেষে পুঁথিসাহিত্য ও পল্লীগীতির রূপ এবং কল্পনার জীবন।

ইক্‌বালের প্রভাব কার্যকরী হ’ইয়েছিলো প্রথম দু’টি ক্ষেত্রে। ইক্‌বালের প্রভাবে এ-দুটি ধারা বলিষ্ঠ এবং নতুন রূপ নিয়েছিলো- ক্ষীণ প্রাণধারা স্রোতাবেগ পেয়েছিলো। ষোল শতকের কবি সৈয়দ সুলতান “জ্ঞান-চৌতিশা”র ইস্‌লামের ধর্ম-তত্ত্ব সম্পর্কে আলোকপাত ক’রেছেন। সতের শতকের কবি আলাওল সুফী-তত্ত্বজ্ঞ ছিলেন যা’র পরিচয় তাঁর অনুবাদ-গ্রন্থ “তোহফা”য় বিশেষভাবে পাওয়া যায়। আঠারো শতকের কবি আলী রাজা “জ্ঞানসাগরে” নিগূঢ় আধ্যাত্মিকতার পরিচয় দিয়েছেন। অর্থাৎ বাংলার কাব্যে ইস্‌লামী আধ্যাত্মিকতার স্ফুরণ এবং বিকাশ বহু আগেই হ’য়েছে। কিন্তু এহেন বিকাশের মধ্যে কেমন যেন স্থূলত্ব ছিলো। ধর্মকে সেখানে নির্মমভাবে জীবনের নিয়ামক করা হ’য়েছে, কিন্তু জীবনের আবেগ ও অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত রাখা হয়নি।

অবশ্য উনিশ শতকের পূর্বের বাংলার কাব্যে আত্মবিশ্লেষণ নেই, হৃদয়াবেগের সঞ্চারণ নেই- তা’র মূল্য কাহিনী-মাহাত্ম্যে, কখনও বস্তু-প্রকৃতি, দেব-বিগ্রহ বা ভগবানের কাছে নিবেদিত চিত্ততায়। যাই হোক্‌, ঊনিশ শতকের মুসলমান সাহিত্যিক মীর মুশার্‌রফ হোসেনের রচনায় এবং পরবর্তীকালে মুযাম্মেল হক্‌, কায়কোবাদ, ইস্‌মাইল হোসেন শিরাজীর কাব্যে ইস্‌লামের ইতিহাসের অপরিমিত প্রয়োগ দেখি উপাদান হিসেবে এঁদের রচনায় ইতিহাসের সংবাদ আছে অর্থাৎ ইতিহাসমিশ্রিত জ্ঞানের পরিচয় আছে। যে বস্তুত অভাব মনে হয়, তা হচ্ছে ইতিহাসের অভিজ্ঞতা এবং ঐতিহ্যবোধ। অনেক পরে নজরুল ইস্‌লামের কাব্যে ইস্‌লামের ইতিহাস নিছক পটভূমি বা উপাদান নয় কিন্তু অনুভূতির লালনভূমি, সৌন্দর্যের প্রাণকেন্দ্র এবং জীবনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় পরিণত হয়। নজরুল ইস্‌লামের কাব্যে অভাব ছিলো তওহীদ বা নিঃসংশয় একত্ববাদের, এবং কোরানের ইস্‌লামের সৌন্দর্য ও উপলব্ধির চিত্রের। বিপর্যয়ের জন্য বেদনা এবং বিদ্রোহের অগ্নিবর্ষণ আছে কিন্তু আত্মবিশ্লেষণের অভাবের জন্য গ্লানি ও হতচেতনার সত্যিকারের প্রতিষেধক নির্ণিত হয়নি।

ইক্‌বাল মুসলমানের নিশ্চেষ্টতা ও হতোদ্যমের যথাযথ চিত্র অঙ্কন করেছেন এবং এই পতন ও সর্বনাশের জন্য তাঁর ক্ষোভ নিদারুণ। “জওয়াব-ই-শেকোয়া”য় যে পথ-নির্দেশ আছে, তা’তে ইস্‌লামের চিরশক্তিমত্ততায় বিশ্বাসী ইক্‌বালের নিবিড় উপলব্ধির পরিচয় মেলে। তিনি প্রত্যেক মুসলমানকে অবলম্বন ক’রতে ব’লেছেন, ইসলামের প্রবাহমান সত্য এবং কোরানের অমোঘ সঞ্জীবনী বাণীকে। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, “In times of crises in their history it is not Muslims that saved Islam, on the contrary, it is Islam that saved Muslims.”- ইতিহাসের সঙ্কট-মুহূর্তে মুসলমান ইস্‌লামের ত্রাণকর্তা হননি, অন্যপক্ষে ইস্‌লামই রক্ষা ক’রেছে মুসলমানকে। অবশ্য মনে রাখ্‌তে হবে যে, ইস্‌লামের অর্থ ইক্‌বালের কাছে স্তিমিত-প্রাণ ব্যক্তির আত্মসমর্পণ নয়; ইসলামের অর্থ শক্তিমত্তা, ন্যায়নুসরণ ও সাধনা একই সঙ্গে।

ইক্‌বালের এই বলিষ্ট আবেগ তরুণ মুসলমানের মনকে নাড়া দিয়েছিলো প্রচণ্ডভাবে। সাহিত্যক্ষেত্রে এ-আলোড়নের সংবাদ পাই ১৯৪২-৪৩ সাল থেকে। যাদের অনেকটা পরিহাস ক’রে কাজী আবদুল অদুদ “আত্মনিয়ন্ত্রণী দল” ব’লেছেন, তাদের উদ্ভব এ-সময়ের দু’টি সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। পূর্ব-পাকিস্তান রেঁনেসা সোসাইটি এবং পূর্ব-পাকিস্তান সাহিত্য-সংসদ মুস্‌লিম সাহিত্য-সাধনার পথ-নির্দেশ দিতে চাইল। আবুল কালাম শামসুদ্দীনের আগ্রহ ও ঐকান্তিকতাই ছিলো এ-আন্দোলনের সজীবতার উৎস। কাব্যক্ষেত্রে নেমে এলাম ফর্‌রুখ আহমদ ও আমি। ইক্‌বালের আদর্শের অনুবর্তী হ’তে চেষ্টা ক’রলেন ফর্‌রুখ আহমদ। তাঁর কাছে পরম মূল্যবান হ’লো উন্মেষ-যুগের ইস্‌লাম। আজ হয় তো বিপর্যয় এবং পরিবেশের সঙ্গে অসদ্ভাব আছে কিন্তু বিশ্বাস ও উপলব্ধির পথে প্রথম যাত্রার উৎসাহ ছিলো অদম্য এবং স্বস্তিও ছিলো প্রগাঢ়। তাই হেরার রাজতোরণই তাঁর লক্ষ্য, যে লক্ষ্যে অগ্রসর হ’তে হ’লে বিশ্ব-মুসলিম ঐক্যবোধ, ইস্‌লামী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা এবং সর্বোপরি খিলাফতের প্রয়োজন। মুজীবুর রহমান অবতীর্ণ হ’লেন স্বতন্ত্র তমদ্দুনের তুর্যবাদক হিসেবে।

ইক্‌বাল বাংলাতে অনূদিত হ’ইয়েছেন দু’টি কারণে। প্রথমতঃ, আমাদের হৃদয়বৃত্তির সঙ্গে যোগসূত্র নির্ণয়ের জন্য; দ্বিতীয়তঃ ধর্মবোধের পোষকতা ও তত্ত্বজিজ্ঞাসার মীমাংসার জন্য। বাংলাতে তাঁর প্রথম অনূদিত গ্রন্থ “শেকোয়া”। যে সময় বাঙালী মুসলমান নজরুল ইস্‌লামকে পূরোভাগে রেখে আপন দুঃখদুর্দশার নিবৃত্তি খুঁজ্‌ছে, স্বস্তিহীন মুহূর্তে সে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধেও অভিযোগ এনেছে, তখন ইক্‌বালের “শেকোয়া”য় সে আপন মনের অনুরণন শুনেছিলো। চরম দারিদ্র্যে নিষ্পিষ্ট, দুঃখ জর্জরিত এবং তৎহেতু আত্মঘাতী কবি আশরাফ আলী খান “শেকোয়া”র প্রথম তর্জমা ক’রেছিলেন। আশ্চর্য আবেগ এবং গতির মধ্যে আশরাফ আলী “শেকোয়া’য় আপন মনের প্রতিফলন দেখেছিলেন, তাই তাঁর অনুবাদ আক্ষরিক না হ’লেও আন্তরিকতায় উজ্জ্বল এং কাব্য-সৌন্দর্যে নবোদিত সূর্যের বর্ণবৈচিত্র্যের মতো। এর পর “শেকোয়া”র তর্জমা অনেক হয়েছে – মুহম্মদ সুল্‌তান, মীজানুর রহ্‌মান, ডক্টর শহীদুল্লাহ্‌ এ-তিনজনের নামই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মীজানুর রহমান ও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ মূলকে যথাযথভাবে অনুসরণ ক’রেছেন; তাই তাঁদের রূপায়ণে ইক্‌বালের বক্তব্যের বিকৃতি ঘটেনি, কিন্তু কাব্যিক মাধুর্য ক্ষুণ্ন হ’য়েছে। একে তাঁরা দোষের মনে করেননি, কেননা তাঁদের উদ্দেশ্য বাংলার পরিবেশে ইক্‌বালকে যথাযথভাবে পরিদৃশ্যমান করা, সুদৃশ্যভাবে নয়।

আমাদের ধর্মবোধের পোষকতা এবং তত্ত্বজিজ্ঞাসার জন্য অনূদিত হয়েছে ইক্‌বালের ‘আস্‌রারে খুদী’ ও ‘রমুজে বেখুদী’। উভয় গ্রন্থই নিগূঢ় দার্শনিক তত্ত্বসমন্বিত, নিশ্চিন্তে বোধগম্য নয়। ‘আস্‌রারে খুদী’র প্রথম বাংলা তর্জমা করেন সৈয়দ আবদুল মান্নান। অনুবাদটি জনপ্রিয়ও হয়েছে। আবদুল মান্নান গদ্যে তর্জমা ক’রেছেন। এর পর আমি সপ্তম অধ্যায় পর্যন্ত কাব্যানুবাদ করেছিলাম। আমি মূলকে যথাযথভাবে অনুসরণ করিনি, শুধু মূলীভূত তত্ত্ব এবং আদর্শকে অক্ষুণ্ন চেয়েছি। ফর্‌রুখ আহমদও কাব্যে অংশবিশেষ অনুবাদ করেছেন।

এ ভাবে বিচিত্রভাবে বাংলা কবিতার আসরে আমরা ইক্‌বালকে পেয়েছি। বাংলার হাওয়ায় তাঁর গান ভেসেছে, বাংলার জলকল্লোলে তাঁর কণ্ঠ শুনেছি, তাঁর হৃদয়ের বিপুলতা দেখেছি বাংলার আকাশে। যেমন নবোদিত সূর্য সমুদ্রের দিগন্তে কাল্পনিক তটরেখা সৃষ্টি করে, যেমন মেঘের কৃষ্ণছায়া আকাশকে স্পর্শ ক’রেছে ব’লে মনে হয়, তেমনি আমরাও মনে করছি যে, ইক্‌বালকে বোধের আয়ত্তে এনেছি; কিন্তু সমুদ্রের কল্লোলের যেমন পরিমাপ হয় না অথচ তা দেখে বিহবল ও আনন্দিত হওয়া যায়, তেমনি ইক্‌বালের গভীরতা, ব্যাপকতা ও বিপুলতা আয়ত্তাতীত কিন্তু আমাদের জন্য সংবেদনশীল ও আনন্দদীপ্ত।

সূত্রঃ প্যারাডাইজ লাইব্রেরী কর্তৃক প্রকাশিত, সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত “ইকবালের কবিতা” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
stri kinba ma howatai

স্ত্রী কিংবা মা হওয়াটাই জান্নাতে যাওয়ার একমাত্র পথ নয়

মারিয়াম আমিরএব্রাহিমী | মার্চ ১২, ২০১৬
Download PDF

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক বোনকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, “আপনি এই বিষয়ে মেজর করছেন কেন?” দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “সত্যি বলতে কি, আমি আসলে কী পড়ছি সে ব্যাপারে মোটেও চিন্তিত নই। আমি আমার বিয়ের জন্য অপেক্ষা করছি, যাতে স্ত্রী আর মা হতে পারি।”

অবাক বিস্ময়ে ভাবি,স্ত্রী কিংবা মা হতে চাওয়াটা অবশ্যই চমৎকার কিছু। কিন্তু সেজন্য জীবনকে কেন থামিয়ে রাখতে হবে?” শিক্ষিত ও দক্ষ একজন নারী কেন তার আত্ম-উন্নয়নের পথে বাধা তৈরি করবেন? স্ত্রী কিংবা মা হওয়ার মতো গুরুদায়িত্ব যখন এখনো পর্যন্ত তার উপর চাপেনি, তখন সমাজ পরিবর্তনের পথে কেন তিনি নিজেই নিজের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখবেন? স্ত্রী কিংবা মা হওয়া নিশ্চয় এক অসাধারণ রহমত। কিন্তু বিয়ের আগেই কেন বাস্তব সুযোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন? কখন বিয়ে হবে তার প্রহর গুনবেন?

আরেকজন বোন বললেন, “আমার বয়স ইতোমধ্যেই ২৬ হয়ে গেছে। বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে। মা-বাবা আমার বিয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছেন। তারা ভাবছেন আমার হয়তো আর কখনো বিয়ে হবে না। তারা প্রতিনিয়ত আমাকে চাপ দিচ্ছেন। আমার মা’র বান্ধবীরা বারবার তাকে তাগাদা দিচ্ছেন যে আমার বয়স বেড়েই চলেছে। আমার মা এজন্য আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। বলেন, তিনি মনে হয় আর নানী হতে পারবেন না। ব্যাপারটা এমন না যে আমি বিয়ে করতে চাই না। কলেজে পড়ার সময় থেকেই আমি এর জন্য তৈরি। কিন্তু আমি আসলে আমার জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাচ্ছি না।”—বলতে বলতে কেঁদেই দিলেন বোনটি।

বিয়ের জন্য নারীদের যেভাবে চাপ দিই, ইসলামি শিক্ষা অর্জনের জন্য আমরা কেন নারীদের সেভাবে চাপ দিই না? কিংবা উচ্চ শিক্ষার জন্য? অথবা জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে যা তারা ভবিষ্যতে পারিবারিক জীবনে বাস্তবায়ন করবে এবং যা তাদের সাহায্য করবে? হয়তো এটা এজন্যই যে, আমরা নারীদের ক্ষেত্রে এই ধারণায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি যে, নারীরা বিয়ে করবে, মা হবে— যদি তারা তা করতে না পারে তবে তারা হয়তো সত্যিকার সাফল্য অর্জন করতে পারল না।

স্ত্রী ও মা হওয়ার মর্যাদা ইসলামে কত বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা জানি বিয়ে মানুষের দীনের অর্ধেক পূরণ করে [১]। নবী (সা) মা-এর মর্যাদার ব্যাপারে বলেছেন, “[...]  তার পা’র নিচে জান্নাত।” [২] কিন্তু বিয়ে করা এবং মা হওয়াটাই জান্নাতে যাওয়ার একমাত্র পথ নয়। আর প্রতিটা পরিণত নারীই স্ত্রী কিংবা মা নন। আর তা হবেও না। কিছু নারী আল্লাহর অনুগ্রহে স্ত্রী কিংবা মা বা উভয়টিয় হবেন। অন্যদেরকে আল্লাহ হয়তো অন্যান্য সুযোগ দিয়ে তাঁর অনুগ্রহে শামিল করবেন।

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কেবল স্ত্রী কিংবা মা হওয়ার জন্য নারীদের সৃষ্টি করেননি। এটা আমাদের প্রথম কিংবা শেষ উদ্দেশ্যও নয়। আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে এক বিশেষ উদ্দেশ্যে: তাঁর বান্দা হওয়ার জন্য। সূরাহ্‌ আয-যারিয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধু আমার ইবাদতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি।” [৩]

ইবাদাত বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। গৃহিণী  হওয়াটা এক প্রকার ইবাদাত হতে পারে। গৃহিনী-মা হওয়াটা এক প্রকার ইবাদাত হতে পারে। অবিবাহিত ছাত্রী হওয়াটাও ইবাদাত হতে পারে। তালাকপ্রাপ্ত নারী ডাক্তার, নারী সাংবাদিক, নারী ইসলামী স্কলার, চলচ্চিত্র পরিচালক, রাধুঁনী (পেস্ট্রি শেফ), শিক্ষক, পশুচিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক, আইনজীবি, শিল্পী, সেবিকা, কুর’আন শিক্ষক, মনরোগ বিশেষজ্ঞ, ফার্মাসিস্ট এর প্রত্যেকটিই হতে পারে একেক ধরনের ইবাদাত। সুকন্যা হওয়াটাও হতে পারে ইবাদাতের একটি ধরন। বিভিন্নভাবে আমরা আল্লাহর ইবাদাত করতে পারি। শুধু খেয়াল রাখতে হবে ইবাদাতের নিয়্যাতটা যেন আন্তরিক হয়। এবং যা করছি সেটা যেন আল্লাহর দেওয়া নির্দেশনা মেনে করা হয়।

তবে, দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের সমাজ অবিবাহিত অথবা ডিভোর্সী নারীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে না। আমি যখন সমাজের বিভিন্ন নারীদের সাথে কথা বলি, আমি তাদের প্রশ্ন করি কীভাবে তারা সমাজে ভূমিকা রাখতে চায়, কীভাবে তাদের সময় ও সামর্থ্যকে ব্যবহার করতে চায়। তাদের বড় একটা অংশ আমাকে এই উত্তর দেবে যে, এ ব্যাপারে তাদের কোনো ধারণা নেই। তারা কেবল স্রোতের অনুকূলে গা ভাসাচ্ছে। আর উপযুক্ত পাত্রের জন্য অপেক্ষা করছে, যাদের সঙ্গে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।

তবে উপযুক্ত অনেক মুসলিম নারীর জন্যই উপযুক্ত পাত্র দ্রুত কিংবা সহজে আসে না। অনেকের জন্য হয়তো আসে। কিন্তু সে সম্পর্ক পরে হয়তো সুসামঞ্জস্যপূর্ণ না-হয়ে জঘন্য রূপ নেয়। কুমারী কিংবা তালাকপ্রাপ্ত, সামর্থ্যবান ও বুদ্ধিমতী প্রায় প্রতিটি মুসলিম নারীকেই এ কথা শুনতে হয়, “তো কখন তোমার বিয়ে হবে? তোমার বয়স তো দিন দিন বাড়ছে। বয়স বেড়ে গেলে বাচ্চা নেওয়া সমস্যা।”

বিয়ে করার জন্য এবং বাচ্চা নেওয়ার জন্য আমাদের সমাজে নারীদেরকে ক্রমাগত যে-পরিমাণ যন্ত্রণা, চাপ ও হতাশাকে মোকাবিলা করতে হয় সেটা আমাদের ধর্মের কথা নয়।

ইসলাম নারীদের জ্ঞানী হওয়ার অধিকার দিয়েছে। আমাদের ইতিহাসে এমন অনেক নারীদের খুঁজে পাওয়া যাবে যারা ইসলাম শিক্ষার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আপনি কি ফাতিমাহ সা‘দ আল-খাইরের নাম শুনেছেন? ৫২২ সালে জন্ম নেওয়া এই নারী ছিলেন একজন ‘আলিমাহ। তাঁর বাবা সা‘দ আল-খাইরও ছিলেন ‘আলিম। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ক্লাস নিতেন। বিশেষ করে তাঁর মেয়েরা যেন হাদীস ক্লাসে অংশ নেয় সে ব্যাপারে বেশ যত্নবান ছিলেন তিনি। তিনিই তাদেরকে বিভিন্ন শিক্ষকদের কাছে বারবার নিয়ে যেতেন। তিনি নিজেও তাদের শেখাতেন। [৪] ফাতিমাহ্‌ বিখ্যাত ‘আলিম আত-তাবারানির কর্মসমূহের তৎকালীন শীর্ষ বর্ণনাকারীর অধীনে অধ্যয়ন করেছেন। আপনি কি জানেন কে ছিলেন সেই শীর্ষ বর্ণনাকারী? তাঁর সময়ের শীর্ষ বর্ণনাকারী কোন পুরুষ ছিলেন না। ফাতিমাহ্‌র সময়কার শীর্ষস্থানীয় ‘আলিমাহ ছিলেন একজন নারী যার নাম ছিলো ফাতিমাহ আল-জুযাদনিয়্যাহ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই তাঁর কাছে শিখতে যেতেন, কারণ তাঁর সময়ে ক্ল্যাসিকাল কিছু টেক্সটে তিনি ছিলেন সবচাইতে বিখ্যাত এবং জ্ঞানী।[৫]

ফাতিমাহ সা‘দ আল-খাইর এক পর্যায়ে বিয়ে করে দামাস্কাসে চলে যান। সেখান থেকে কায়রোতে যান এবং সেখানেই শিক্ষকতার কাজ চলতে থাকে। অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিরাই তাঁর শহরে সফরে যেতেন শুধু তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান অন্বেষণের জন্য।[৬]

ফাতিমাহ এমন এক পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন যারা নারী শিক্ষা ও জ্ঞানকে মূল্য দিয়েছিল: এতটাই যে কিশোরী বয়স থেকেই ফাতিমাহ যেন বিভিন্ন ‘আলিমদের কাছ থেকে জ্ঞান অন্বেষণ করতে পারেন সেটা নিশ্চিত করেছিলেন তাঁর বাবা। বিয়ের আগে তাঁকে বলা হয়নি যে শুধু ঘরে বসে থাকুক। সমাজ থেকে নিষ্ক্রিয় থাকুক এই আশঙ্কায় যে, কোনো পুরুষের কাছে হয়তো শিক্ষিত নারীকে অনাকর্ষণীয় লাগবে। ভয়ঙ্কর মনে হবে। ফলে বিয়ে করতে চাইবে না। তাঁর অবস্থা এমন ছিল না যে, বিয়ের আগে ঘরে পড়ে ছিলেন বলে দায়সারাভাবে পড়াশোনা করে গেছেন। তিনি জ্ঞান অন্বেষণ করেছেন, আর আল্লাহও তাঁকে তাঁর সমমর্যাদার স্বামী দিয়ে অনুগৃহীত করেছিলেন। তাঁর স্বামী তাঁর যোগ্যতার সঠিক মর্যাদা দিয়েছিলেন। বুঝেছিলেন তাঁর কাজের স্পৃহা। আর তাই বিয়ের পরও শিক্ষকতা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সবসময় সমর্থন জুগিয়ে গেছেন। তিনি এমন এক সম্পদ আমাদের জন্য রেখে গেছেন দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে ব্যাপারে আমরা অধিকাংশই জানি না। আমরা জানি না হাদীসের উপর বিশেষজ্ঞ ৮ হাজারেরও অধিক নারীদের কথা যারা আমাদের ইতিহাসেরই অংশ। [৭]

কেন আমরা কখনো ফাতিমাহ আল-খাইর কিংবা তাঁর মতো হাজারো নারী ‘আলিমাহ্‌দের ব্যাপারে শুনিনি? আমার মতে এর একটা কারণ হচ্ছে, আমাদের সমাজে নারীদেরকে স্ত্রী ও মা হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে আমরা এতটাই নিবদ্ধ যে, ওটাই যে আমাদের প্রথম কাজ নয় সে ব্যাপারটা আমাদের নজর থেকে সরে যায়।

আল্লাহর আনুগত্য করা আমাদের প্রথম কাজ। কীভাবে সর্বোত্তমভাবে তাঁর ইবাদাত করা যায় সে ব্যাপারে আল্লাহ প্রদত্ত সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত।

ইসলামের ইতিহাস এমন সব নারীদের উদাহরণে ভরপুর যেখানে দেখা যায়, অনেক নারীরা স্ত্রী এবং মা ছিলেন, এবং তারা কেবল তাদের সেই দায়িত্বের প্রতিই পরিপূর্ণ নিবদ্ধ ছিলেন। তাঁদের ঘর থেকেই জন্ম নিয়েছে ইমাম আহমাদের মতো মহান মহান ‘আলিমগণ।[৮] সমাজে আমরা কেবল এসব উদাহরণগুলোই নিই এবং এসব মহান নারীদের অভিজাত মর্যাদাকে বারবার তুলে ধরি।

কিন্তু আমাদের ইতিহাসে এমন অনেক নারীই ছিলেন, যারা কেবল স্ত্রী কিংবা মা ছিলেন না। ছিলেন দুটোই, কোনো একটি অথবা কোনোটাই না। কিন্তু তারপরও আল্লাহ তাদেরকে যেসব প্রতিভা ও দক্ষতা দিয়ে অনুগৃহীত করেছিলেন সেগুলোর সদ্ব্যবহার করে তাঁর সৃষ্টির সেবা করে তাঁর ইবাদাত করে গেছেন। তারা মানুষকে তাঁর দীনের দিকে ডেকেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন উত্তম আদর্শ। কিছু নারী ছিলেন যারা স্ত্রী ও মা ছিলেন, এবং সে হিসেবেই তাদের পারিবারিক দায়িত্ব পালনের প্রতি পরিপূর্ণ নিবদ্ধ ছিলেন। অন্যদিকে কিছু নারী এমন ছিলেন যারা অন্যভাবে সমাজের সেবা করেছেন।

নারী মুহাদ্দিসের অভিধান বিষয়ক গ্রন্থ ‘আল-মুহাদ্দিসাত-এর ভূমিকায় শাইখ মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী উল্লেখ করেছেন, “যে ৮০০০ নারী হাদীস বিশেষজ্ঞের ব্যাপারে তিনি গবেষণা করেছেন তাদের কেউই পারিবারিক জীবনের দায়িত্বকে ছোটো মনে করেননি। কিংবা সেই দায়িত্বকে অবহেলা করেননি। নারী হওয়ায় পুরুষের চেয়ে নিজেদের কোনো অংশে ছোটো মনে করেননি। সামর্থ্য ও প্রতিভা থাকার পরও তারা এমনটা ভাবেননি যে, পারিবারিক জীবনের বাইরে তাদের আর কোনো দায়িত্ব নেই।” [৯]

আমাদের ইতিহাসে যেসব নারীরা ‘আলিমাহ ছিলেন এবং যাদের পরিবার ছিল তারা দুটো দায়িত্বই সমানভাবে পালন করেছেন। তাদের জীবনে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। আর সেটা কেবল স্ত্রী কিংবা মা হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তো এখনো যাদের বিয়ে হয়নি তাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়? অনেক সিঙ্গল নারীরা তাদের সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করছেন। নিজেদের সামর্থ্য ও দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে উম্মাহ্‌র অগ্রগতির পথে ভূমিকা রাখছেন। তাদের সামর্থ্যকে বিনিয়োগ করছেন আল্লাহর প্রতি ‘ইবাদাতের জন্য। আরও ভালো কিছুর জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছেন। আমরা কি  এদের উদাহরণ হিসাবে নিতে পারি না?

আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী নারী ও পুরুষকে আলাদাভাবে সৃষ্টি করেছেন। দিয়েছেন আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। কেউ কেউ তা উপলব্ধি করে। ফলে সে যে পর্যায়েই থাকুক না কেন তা নিয়ে অসন্তুষ্ট হয় না। নিজেদের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটায়। আল্লাহ আমাদের যে-সময় ও সামর্থ্য দিয়েছেন আসুন আমরা তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের ইবাদাতকে বাড়িয়ে তুলি। সমাজ ও মানবতার সার্বিক উন্নয়নে নিজেদের নিয়োজিত করি। এগুলো করতে করতেই যদি আমরা স্ত্রী কিংবা মা হয়ে যাই, তাহলে অন্তত বলতে পারব স্ত্রী বা মা হওয়ার আগে আমরা আমাদের সব সামর্থ্য তাঁর ইবাদাতের তরে নিয়োজিত করেছিলাম। আর স্ত্রী কিংবা মা হওয়ার পরও আমরা আমাদের অর্জিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁর ইবাদাতে রত থাকতে পারি। অর্জন করতে পারি উৎকৃষ্টতা।

যেসব অভিভাবক, পরিবার ও সমাজ নারীদেরকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন তাদেরকে বলছি: আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হোন যে তিনি আপনাকে মেয়ে সন্তান দিয়েছেন। হোক না সে বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত। নবী (সা) বলেছেন, “কন্যাদের প্রতি বিমুখ হবে না। কারণ তারা হচ্ছে মূল্যবান রত্ন, যারা তোমাদের হৃদয়ে স্বস্তি এনে দেয়।” [১০] আমাদের বোনেরা মানসিকভাবে যতটুকু চাপ সহ্য করতে সক্ষম, আমরা তাদেরকে তার চেয়ে অনেক বেশি চাপ প্রয়োগ করছি। আসুন আমরা তাদেরকে একটু সুযোগ করে দিই যাতে তারা আল্লাহর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক মজবুত করতে পারে।

আল্লাহর ইবাদাতের জন্যই তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। এটাই আমাদের প্রথম কাজ। আসুন, এখন আমরা আমাদের কাজ করি। খুঁজে বের করি- কীভাবে আমরা সেই উদ্দেশ্যকে যথাযথভাবে পালন করতে পারব, যে উদ্দেশ্যে আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে।

সূত্রসমূহ

১. আল-বায়হাকি

২. আন-নাসা’ই

৩. কুর’আন, ৫১:৫৬

৪. নাদভী, মুহাম্মাদ আকরাম, আল-মুহাদ্দিসাত, ইন্টারফেস পাবলিকেশনস, (২০০৭): পৃষ্ঠা ৯৩।

৫. প্রাগুক্ত

৬. নাদভী, মুহাম্মাদ আকরাম, আল-মুহাদ্দিসাত, ইন্টারফেস পাবলিকেশনস, (২০০৭): পৃষ্ঠা ৯৫।

৭. নাদভী, মুহাম্মাদ আকরাম, আল-মুহাদ্দিসাত, ইন্টারফেস পাবলিকেশনস, (২০০৭)।

৮. দ্যা কোড অফ স্কলারস, মুহাম্মাদ আশ-শারীফ। ঈমান রাশ, ২০০৮। সিডি।

৯. নাদভী, মুহাম্মাদ আকরাম, আল-মুহাদ্দিসাত, ইন্টারফেস পাবলিকেশনস, (২০০৭): পৃষ্ঠা ১৫।

১০. আল-হায়সাম, মাজমা আল-যাওয়াইদ, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৮৬, আল-মুহাদ্দিসাতে উদ্ধৃত।

সূত্রঃ VirtualMosque.com

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
Hasan al-Turabi

হাসান আল তুরাবী

ফাহমিদ-উর-রহমান | মার্চ ১১, ২০১৬
Download PDF

এক

সুদানের বিপ্লবী রাজনীতিবিদ ও তাত্ত্বিক ড. হাসান আল তুরাবীর গুরুত্ব ও মর্যাদা মুসলিম বিশ্ব ও পশ্চিমী দুনিয়ায় তাঁর জাতীয় পরিচিতিকে ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। তিনি সুদান সংসদের স্পিকার, সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, এটর্নি জেনারেল প্রভৃতি নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। তার চেয়ে বড় কথা লন্ডন ও সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র তুরাবী একই সঙ্গে ইসলামী ঐতিহ্য ও আইন বিশেষজ্ঞ, পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে সমসাময়িক ইসলামী ভাবনার অন্যতম প্রধান ভাষ্যকার এবং ইসলামী জগতের অগ্রণী তাত্ত্বিক নেতা।

সোরবোর্নে তাঁর পিএইচডির বিষয় ছিল উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জরুরী অবস্থা সম্পর্কিত ক্ষমতার প্রয়োগ কতটা গ্রহণযোগ্য। পিএইচডি শেষে ১৯৬৪ সালে দেশে ফেরার পর সবাই মনে করেছিল তুরাবী হবেন সুদানের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে তিনি হয়ে যান বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী মুসলিম  নেতা ও তাত্ত্বিক। আজকে ইসলামী ও পশ্চিমা সভ্যতার ঠানাপোড়ন থেকে উঠে আসা সামাজিক রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে তুরাবীর নজির টানা জরুরী হয়ে পড়ে। এ কারণেই তাকে আধুনিক ইসলামী মননের অন্যতম সংকট বিশ্লেষক হিসেবে গণ্য করা হয়।

দেশে ফেরার পর তুরাবী খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ফ্যাকাল্টিতে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন পান। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আহবান উপেক্ষা করে তৎকালীন সুদানী সামরিক শাসক ইব্রাহিম আবুদের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত জনসমাবেশে এক তীব্র ও ঝাঁঝালো বক্তৃতা দেন। সেই থেকে তুরাবী সুদানী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এসে হাজির হন এবং আজও তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। অনেকের ধারণা ১৯৮৯ সালে সুদানে ইসলামী শক্তির মদদে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে যে উমর আল বশিরের সরকার ক্ষমতায় আসে তার প্রধান তাত্ত্বিক ও নেপথ্যের নায়ক আসলে তিনি। তুরাবীর সবচেয়ে বড় ভূমিকা হচ্ছে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কয়েক দশকের মধ্যে সুদানী সমাজ ও রাষ্ট্রের ইসলামীকরণের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইসলামের অন্তর্মুখিতা কাটিয়ে তিনি এটিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রোগ্রাম হিসেবে সকলের সামনে তুলে ধরেছেন যা অনেকের কাছে চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুই

হাসান আল তুরাবী হচ্ছেন সুদানের এক দীর্ঘ ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী পরিবারে সন্তান। এই পরিবারের সদস্যরা তাঁদের ধার্মিকতা, বিদ্যাবুদ্ধি ও সামাজিক কাজ-কর্মের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তুরাবীর পরিবারের পূর্বপুরুষ ছিলেন আঠারো শতকের আলেম ও ফকীহ ওয়াদ আল তুরাব, খার্তুমের দক্ষিণে যার বিখ্যাত দরগাহ রয়েছে। হাসান আল তু্রাবীর ভাষায় তিনি হলেন সুদানের প্রথম মাহদী, যিনি ছিলেন একই সাথে বুদ্ধিজীবী, সংস্কারপন্থী ও একজন সুফী। হাসান আল তুরাবীর জীবনে আমরা এই ত্রিগুণের এক অপূর্ব সমাবেশ দেখি।

তুরাবীর পিতা ছিলেন সেকালের সুদানের ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীন শরীয়াহ্‌ আদালতের একজন বিচারক। তিনি ওমদুর মানের বিখ্যাত ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র আল মাহাদ আল ইলমি থেকে গ্রাজুয়েট হয়েছিলেন। তুরাবী জানিয়েছেন সরকারি চাকরির বদলির সূত্রে তাঁর বিচারক পিতাকে সুদানের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। সেই সাথে তাঁর পরিবারকেও ঘুরতে হয়েছে। এছাড়া ব্রিটিশ প্রশাসকদের হাত থেকে তুরবীর পিতা তাঁর কর্তৃত্ব রক্ষার সবসময় একটা চেষ্টা করেছেন। এ কারণেও তাকে বারংবার বদলি করা হয়েছে।

হাসান আল তুরাবির জন্ম সুদানের কাসসালায়, ১৯৩২ সালে। তুরাবী ছিলেন ভাইবোনের মধ্যে কনিষ্ঠ এবং তাঁর জন্মের অল্প কিছুদিন পরেই তাঁর মা মারা যান। ফলে তাঁকে বিচারক পিতার তত্ত্বাবধানেই কাটাতে হয় এবং সুদানের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে হয়। পিতার সাথে তুরাবীর ঘুরে বেড়ানো ও পড়াশোনা নিয়ে পরবর্তীকালে এক হৃদয়গ্রাহী মন্তব্য করেছেন তিনিঃ I went to school in each of the local places, but I look forward after vacations to going back to school.

পিতার কাছেই তুরাবীর লেখাপড়ার হাতেখড়ি। বিচারক পিতা সন্ধ্যার পর এবং ছুটির সময় তুরাবীকে নিজে পড়াতেন যাতে তার পুত্র সত্যিকারের শিক্ষাটা পায়। পিতার তত্ত্বাবধানে অল্প বয়সে তুরাবী ইবনে মালিকের আলফিয়া ও লামিয়াত আফাল পড়ে মুখস্থ করেন। এ দু’টো ব্যাকরণ বই ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষার জন্য ছিল, কারণ এটি কুরআনের ভাষা ব্যাখ্যায় সাহায্য করতো। ১৯৫০ সালের মধ্যে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন এবং বিদ্যালয়ে প্রবেশের প্রস্তুতি নেন। খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তিনি এখানকার ছাত্র সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সংস্পর্শে আসেন। ব্রাদারহুড তাঁর চিন্তা ভাবনার মোড় অনেকটাই ঘুরিয়ে দেয়। তিনি সেদিনকার অভিজ্ঞতার কথা এভাবে বলেছেনঃ

… the Islamic movement which I met at the university was quite an experience for me. All of the dead literature that I had learned by heart became alive. I saw everything in a different light.

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি বিলাত যান এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন এবং প্যারিসের সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের উপর পিএইচডি অর্জন করেন।

১৯৬৪ সালে দেশে ফিরে তিনি প্রথম কাজ করেন খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নীতি-নির্ধারণী বিতর্কে সুদানের তৎকালীন সামরিক শাসক ইব্রাহীম আবুদকে আক্রমন করেন। এটি চলমান আবুদবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি দেয় এবং বিরোধী দলের এই আন্দোলনে মুসলিম ব্রাদারহুডের অবস্থানকে আরো মজবুত করে। এর ফলে ১৯৬৪ সালের অক্টোবরে আবুদ সরকারের পতন ঘটে।

এই আন্দোলনের সফলতা এবং তুরাবী ও মুসলিম ব্রাদারহুডের অভিজ্ঞতা তুরাবীর রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ। তুরাবীর এই সাফল্য ঠিক সরাসরি ইসলামী কোন অবস্থান থেকে আসেনি বরং একটি সামগ্রিক সমস্যার তিনি একটি ইসলামী অভিব্যক্তি ঘটিয়েছিলেন। তুরাবীর নেতৃত্বের এই বিশেষ কৌশলই তাঁকে সুদানী রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যমণি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

হাসান আল তুরাবী রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ও আলোচিত হলেও মূলত তিনি একজন বুদ্ধিজীবী। তাঁর সমসাময়িক সুদানী রাজনীতিবিদদের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিক দিয়ে তিনি অনেক অগ্রসর। একই সাথে সুদানের ব্রাদারহুডের নেতৃত্বও তিনি দিয়েছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে যেয়ে অন্যান্য রাজনীতিবিদদের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বি্তায় নামতে হয়েছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি অন্য সকলকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং ব্রাদারহুডের মতো একটি এলিটিস্ট প্রতিষ্ঠানকে রীতিমত জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করেছন।

তিন

হাসান আল তুরাবীর চিন্তাভাবনার মূলে আছে তাঁর ইসলামকে বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। কিন্তু সেই রকম সামর্থ্য অর্জন করতে হলে তুরাবী মনে করেন আধুনিককালে ইসলামের তাজদীদ বা পুনরুজ্জীবন দরকার। এই কাজ করতে হলে প্রথমে চাই একালে মুসলিম সমাজের দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সকল বিশ্বাসীকে এই পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া।

তুরাবীর মুসলিম ইতিহাস চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে তাজদীদ। কারণ প্রতি যুগেই ইসলামের তাজদীদ প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত না থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের বিকাশ স্তব্ধ হয়ে যায় এবং ইসলাম পরিণত হয় একটি আচারসর্বস্ব জীবনীশক্তিহীন ধর্মে। অবশেষে দেখা যায় ইসলাম বিশ্বাসীরা এমন রীতিনীতি নিয়ে বসবাস করছে যাকে আর কোনভাবেই ইসলামসম্মত বলা চলে না।

তুরাবী তাই মনে করেন ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে এই তাজদীদ ও তাকলীদের (অতীতের অন্ধ অনুকরণ) পারস্পারিক উত্তেজনা ও দ্বন্দ্বমানতা বরাবর ছিল। তুরাবী অবশ্য এটা মনে করেন না তাজদীদ মানে হচ্ছে ইসলামের মৌলিক নীতিকে পাল্টে দেয়া কিংবা নতুন পরিস্থিতির সাপেক্ষে কুরআন শরীফের পরিবর্তন ঘটানো। তুরাবীর কাছে তাজদীদ মানে হচ্ছেঃ

The revelation in the Qur’an is the comprehensive revelation of God’s eternal truth. However, the implications of that Qur’anic message for specific peoples, times and places do change.

সুতরাং প্রত্যেক বিশ্বাসী মুসলমানকে যুগের রূপান্তরকে, ইতিহাসের রূপান্তরকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সেই সময় নির্ধারিত রূপান্তরকে মেনে ইসলামী নীতির ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে হবে। এর মানে হচ্ছে পরিবর্তনে সাড়া দেয়াই ইসলামের নীতি। পরিবর্তনের এই নীতিকে ইসলামের পরিভাষায় বলে ইজতিহাদ। কিন্তু তুরাবী তার সমসাময়িকদের থেকে ইজতিহাদকে মূল্যায়ন করেছেন ভিন্নভাবে।

তাঁর মতে ইজতিহাদ এমন কিছু নয় যা শুধুঃ

…to go to old books to dig out bits and pieces that we hope will help us solve today’s problems. What we need is to go back to the roots and create a revolution at the level of principles.

তুরাবীর এই চিন্তাভাবনা তাঁর পূর্ববর্তী মুজতাহিদ ও ভাবুকদের থেকে অনেকখানি ব্যতিক্রমী ও স্বাতন্ত্র্যধর্মী। তিনি পূর্ববর্তীচিন্তা থেকে অনেকখানি সরে এসেছেন। যেমন মুসলমানরা রাসূল (সঃ) এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজকে আজও মডেল মনে করে এবং সেটির আদলে নতুন সমাজ তৈরির কথা ভাবে। কিন্তু তুরাবী বলেছেন আজকের যুগ ও বাস্তবতা সাপেক্ষে রাসূলের (সঃ) নীতির সমন্বয় করতে হবে। তাঁর ভাষায়ঃ

…although the prototype community of the Prophet offers us an ideal standard, when we use that prototype as a basis we may feel obliged to build a new model which unites the eternal principles with the changing reality.

তুরাবী পূর্ববর্তীদের থেকে সরে এসে ইজতিহাদ সম্পর্কে বলেছেন এটি এতকাল ধরে একটি বিশেষ বুদ্ধিজীবী শ্রেণী ও উলামারাই করে এসেছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে আজকের দিনে বুদ্ধিজীবীতার এই সংজ্ঞার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে এবং তাদের শ্রেণী ও পেশার মধ্যেও রূপান্তর ঘটেছে। তুরাবী উলা্মার সংজ্ঞাকে অনেক বিস্তৃত করে দিয়েছেনঃ

What do I mean by ulama? The word historically has come to mean those versed in the legacy of religious (revealed) knowledge (ilm). However, ilm does not mean that alone. It means anyone who knows anything well enough to relate it to God. Because all knowledge is divine and religious, a chemist, an engineer, an economist, or a jurist are all ulama. So the ulama in this broad sense, whether they are social or natural scientists, public opinion leaders or philosophers, should enlighten society.

ইজতিহাদ চর্চায় তুরাবীর এই গণতন্ত্রায়নের দাবি একালে একটা খুব উল্লেখযোগ্য বিষয়। এর মানে হচ্ছে জ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখায় প্রবুদ্ধ মুসলমানরা ইসলামী পুনর্জীবনের লক্ষ্যে তাঁদের স্বাধীন বিচারবুদ্ধি ও মতামতের ব্যবহার করতে পারবেন। আজকের দিনে এই ধরনের পুনর্জীবন ভাবনা হতে হবে সামগ্রিক। শুধু অতীত চিন্তার পুনঃবিকরণ ও পারলৌকিক ভাবনার মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ করা চলবে না। এটিকে জীবনের প্রতিটি স্তরে এবং দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলোর সাথে যুক্ত করে মূল্যায়ন করতে হবে। তুরাবী মনে করেন এই প্রক্রিয়া ইসলামী ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শক্তির অংশ এবং মুসলমানকেও আজ সেই প্রয়োজনের দায় মেটাতে হবে।

চার

তাজদীদের কথা বিবেচনা করলে হাসান আল তুরাবী ইসলামী আইন ব্যবস্থার পুনর্জীবনের দিকটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন বেশি। এর কারণ বোধহয় তিনি ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন আইনের ছাত্র এবং পরবর্তীকালে খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ফ্যাকাল্টির ডীন। রাজনীতিক হিসেবে তিনি যখন সরকারে এসেছেন তখনও তিনি আইন সম্পর্কিত পদগুলোতেই অবস্থান করেছেন বেশি। প্রেসিডেন্ট নিমেরীর ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত হবার পর তিনি সুদানের এটর্নি জেনারেল, পরে প্রেসিডেন্টের আইন ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হন। পরবর্তীতে সংসদীয় গণতন্ত্রের সময় তাঁর ন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্ট কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিলে তিনি আইনমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া তিনি সরকারের অনেক আইন ও সংবিধান বিষয়ক কমিটিতে কাজ করেছেন। এসব জায়গায় কাজ করার সময় তাঁর লেখালেখি ও রিপোর্টের মধ্যে আইনী ব্যবস্থার পুনর্জীবন ভাবনা বেশ স্পষ্ট। পরিবর্তনশীল সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি যেহেতু আইনী পুনর্জীবন চান, তাই তিনি মনে করেন কোনো বিদেশী ব্যবস্থা থেকে ধার করে নয় ইসলামের ভিতরকার শক্তি ও সম্পদ ব্যবহার করেই এটা করতে হবে।

১৯৬৫ সালে সুদান কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হওয়ার পর সেখানকার সাংবিধানিক সংকটের প্রেক্ষাপটে গঠিত কমিটির সদস্য হিসেবে তুরাবী যে মতামত দেন তার মধ্যে এরকম অভিব্যক্তি দেখা যায়। সুদান কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৪ সালে আবুদ সরকারের পতনে গুরুতপূর্ণ ভূমিকা রাখা এবং পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালের সংসদ নির্বাচনে বেশ কয়েকটি সিট পায়। কিন্তু ব্রাদারহুডের চাপে পার্লামেন্টে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে বিল পাস হয়। এ ঘটনাকে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক হিসেবে আখ্যায়িত করলে সেখানকার সুপ্রিম কাউন্সিল তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে সার্বিক পরিস্থিতির সাপেক্ষে রিপোর্ট দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন, যার সদস্য হিসেবে তুরাবী কাজ করেন। কমিটির অন্যান্য সদস্যের মতো তুরাবীও আইন প্রণয়নে সংসদের চূড়ান্ত ক্ষমতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং একই সাথে তিনি রিপোর্টের সাথে যোগ করে দেনঃ

The Constituent Assembly is the agency entrusted with the exercise of the highest constitutional authority and it is an expression of the sovereignty which the constitutions establish for the Ummah after God.

এখানে তুরাবীর ‘খোদার পরে’ শব্দটার ব্যবহার লক্ষণীয়। পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বকে তিনি খোদায়ী কর্তৃত্বের আয়ত্তাধীন রেখেছেন যা তাঁর ইসলামী প্রত্যয়ের বহিঃপ্রকাশ। তুরাবী শুধুরিপোর্ট দিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না, এই সাংবিধানিক সংকটের কারণ বিশ্লেষণ করে তিনি লেখেনঃ …the Sudanese constitution is simply a collection of limbs amputated from foreign constitutions and imposed on the Sudanese people.

সুতরাং ধার করা ব্যবস্থা নয়; কার্যকর সংস্কার ও পুনর্জীবনের কাজ করতে হলে ইসলামের ভিত্তিতেই করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তুরাবী পুনর্জীবনের জন্য দু’টি বিষয় চিহ্নিত করেছেন। একটি ফিকাহ্‌র পুনঃনির্মাণ, অপরটি শরীয়াহ্‌র বাস্তবায়ন। মুসলিম চিন্তার জগতে শরীয়াহ বিবেচিত হয় ইসলামী আইন হিসেবে যার উৎস হলো পবিত্র কুরআন ও রাসূলের (সঃ) সুন্নাত। অন্যদিকে ফিকাহ্‌ হচ্ছে শরীয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, বিশ্লেষণ ও তার ফলাফল। তার মানে ফিকাহ্‌ হচ্ছে মানবীয় চিন্তাপ্রসূত, শরীয়াহ ঐশী জ্ঞানলব্ধ। ফিকাহ্‌ হচ্ছে শরীয়াহ্‌র উপর ভিত্তি করে মানবীয় সমস্যার সমাধান বের করার পদ্ধতি।

তুরাবী মনে করেন প্রথম যুগের মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা শরীয়াহ্‌র আলোচনার জন্য ফিকাহ্‌ শাস্ত্রের বিকাশ ঘটিয়ে ইসলামী জ্ঞান জগতে এক বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু তাই বলেতো এক যুগের ফিকাহ্‌ দিয়ে অন্য যুগের প্রয়োজন মিটতে পারে না। তাই আজকের যুগের প্রয়োজনে শরীয়াহ্‌কে ভিত্তি করে নতুন ফিকাহ্‌র বিকাশ ঘটাতে হবে। তাছাড়া পুরানো ফিকাহ্‌ শাস্ত্রগুলোর অনেক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে জটিলতা ও মতবিরোধের কারণ হয়ে উঠেছে। তুরাবীর ভাষায়ঃ

…the issues of the fundamental sources in the fiqh literature were considered abstractly, so that they became sterile speculative discussions which produced absolutely no fiqh at all. Even worse, it produced never ending controversy.

সুতরাং সমকালীন ইসলামী আন্দোলনের জন্য এই ফিকাহ্‌ কোন কাজে আসবে নাঃ

It is clear to the movement that fiqh which it has in its possession – however specialized its load of deductions and inferences, and however careful in its explorations and consultations – will never be adequate for the needs of the Islamic mission.১০

আজকের যুগের জন্য তুরাবী যে নতুন ফিকাহ্‌র কথা বলেছেন তা যেমন পুরনো ফিকাহ্‌র সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করবে তেমনি তা হবে সমস্যার সুনির্দিষ্ট উত্তর। তুরাবীর প্রস্তাবিত নতুন ফিকাহ্‌র কর্মপদ্ধতি কেমন হবে দেখা যাকঃ

Human knowledge has expanded greatly, while the old fiqh was based on knowledge that was restricted [by the conditions of its historical era] … it becomes imperative for us to adopt a new position in the fiqh of Islam so that we can utilize all knowledge for the service of God. This is a new construction which unites what exists in the transmitted traditional disciplines … with the rational sciences which are renewed every day and which are completed knowledge, we can renew our fiqh for the faith and what challenges it time after time in our contemporary life.১১

এই পরিপ্রেক্ষিতে তুরাবী উলামার যে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন তাকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে হয়। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার প্রবুদ্ধ ব্যক্তিরা এই নতুন ও সমন্বিত ফিকাহ্‌ তৈরিতে এগিয়ে আসবে বলে তিনি আশা করেন। এর পাশাপাশি ফিকাহ্‌ বিকাশের স্বার্থে তিনি কিয়াসের ধারণাকে সহজীকরণের কথা বলেছেন। ইসলামের প্রথম যুগেই স্বীকৃত হয়েছিল ইসলামের মৌল পুস্তক কুরআন শরীফে নীতির কথা বলা হয়েছে কিন্তু বিভিন্ন পরিস্থিতিকে মুসলমানরা কিভাবে মোকাবিলা করবে তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখানে নেই। এই জন্যই ইসলামী আইনশাস্ত্রে কিয়াসের উদ্ভব হয়েছিল। যদিও পরবর্তীকালে উলামারা কিয়াসকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন যা তুরাবী প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এমন পরিস্থিতিতে কিয়াসের সীমানা প্রসারিত করার কথা বলেছেন এবং এই সূত্রে আধুনিককালে ইসলামের শুরা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের কথাও বলেছেন।

ইসলামী আইনের ব্যাপারগুলো নিয়ে তুরাবীকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ভাবতে হয়েছে কেননা ইসলামী রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে সমকালীন মুসলিম সমাজে ইসলামী আইন কিভাবে প্রয়োগ করা যাবে এবং ফিকাহ্‌র কোন অংশের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনঃবিকরণ করা দরকার এটা তাঁর কাছে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। যদিও উনিশশো ষাটের দশকে তুরাবী যখন সুদানের রাজনীতিতে পা রাখেন তখন তাঁর মুসলিম ব্রাদারহুড ও এর রাজনৈতিক শাখা ইসলামিক চার্টার ফ্রন্টকে ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী সংবিধানের ধারণাগুলোকে লোক সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে খাটতে হয়েছে বেশি। পরে অবশ্য তুরাবী ও তাঁর দলের প্রচেষ্টায় ইসলামী সংবিধানের ধারণা সুদানী রাজনীতির প্রধান এজেন্ডায় পরিণত হয়। এর ফলে পার্লামেন্টের সংবিধান কমিটি ইসলামের নীতেকে সুদানী সংবিধানের মূল উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতির ফলে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা হয়ে যায় এমন নয় কিন্তু সুদানের রাজনৈতিক লড়াইয়ে ইসলামের অবস্থানকে এখন আর কেউ অস্বীকার করতে পারে না।

তুরাবী ও তাঁর ব্রাদারহুড প্রথম দিকে ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়ার নীতি অনুসরণ করে এবং ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার আগে ব্যক্তি ও সমাজের ইসলামীকরণের উপর জোর দেয়। কারণ ব্যক্তি ও সমাজের ইসলামীকরণ ছাড়া রাষ্ট্র কর্তৃক উপর থেকে চাপানো ইসলামীকরণের বুনিয়াদ দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক। তুরাবী ও ব্রাদারহুডের এই ‘ধীরে চলো’ নীতি সুদানী রাজনীতির দু’টি ঘটনায় বড় রকমের ধাক্কা খায়। একটি হচ্ছে সামরিক শাসক উমর হাসান আল বশীরের ১৯৮৯ এর অভ্যুত্থান। তুরাবী, ব্রাদারহুড ও এর রাজনৈতিক শাখা ন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্ট যেমন নিমেরীর ইসলামীকরণ প্রক্রিয়াকে সমর্থন দেয় তেমনি পরবর্তীতে উমর আল বশীরের সরকারের সাথেও কাজ করে। সামরিক একনাকয়দের সাথে তুরাবীর এই কাজকর্ম তাকে কিছুটা বিতর্কিত করে। তবে তুরাবীর যুক্তি ছিল। এর ফলে সুদানে ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক কাজকর্ম করতে সুবিধা হয়। অন্যদিকে নিমেরীর ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার ফলে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার সামাজিক ভিত্তি অনেক মজবুত হয়। এমনকি নিমেরীর পতনের পরও সুদানী সমাজে ইসলামী আইনের ভূমিকাকে বাতিল বলা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং সেই থেকে সুদানী রাজনীতিতে ইসলামী আইনের বাস্তবায়নের ধারণা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে তুরাবী ও তাঁর ন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্টের জন্য ইসলামী আইনের পক্ষে লড়াই সহজ হয়।

পাঁচ

ষাটের দশকে তুরাবী যখন সুদানের রাজনীতিতে পা রাখেন তখন সেখানকার মেয়েরা জেনানা মহল থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে এবং তাদের সমানাধিকার অর্জনের প্রক্রিয়াটিও জোরদার হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি জীবনে মেয়েদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কমিউনিস্টরা এইসব শিক্ষিত মেয়েদের কাছে টানতে থাকে এবং তাদের ভোট পেতে থাকে।

তুরাবী ইসলামপন্থীদের সংকট মোচনে এগিয়ে আসেন। তাঁর প্রভাবে নারীদের অধিকার বিষয়ক সুদানী মুসলিম সমাজের ঐতিহ্যবাহী ধ্যান-ধারণা বাদ দিয়ে ব্রাদারহুড ইসলামের উদারনৈতিক শিক্ষার আলোকে নারী অধিকারের প্রতি সচেতন হয়। তুরাবীর কথা হচ্ছে ইসলামে নারীর সমানাধিকার স্বীকৃত। একই সঙ্গে তিনি আধুনিকীকরণের চ্যালেঞ্জ থেকে ইসলামপন্থীদের পিছিয়ে আসার প্রবণতার তীব্র নিন্দা জানান। তুরাবী বলেন আজকের মুসলিম সমাজ নারীদের লাঞ্ছনা ও অবমাননার উৎস হচ্ছে অনৈসলামিক ও সামাজিক প্রভাব। এ প্রসঙ্গে সুদানে মহিলা ভোটারদের মন জয় করতে তখনকার ইসলামিক চার্টার ফ্রন্টের মহাসচিব তুরাবী ইসলামের উষালগ্নে উদীয়মান মুসলিম সমাজের অগ্রণী নারীদের ঐতিহ্য পুনরাবিষ্কারের উপর জোর দেন। ইসলামী মর্মবস্তুকে বজায় রেখে নারী মুক্তি আন্দোলনের এই শ্লোগান ইসলামী নারীবাদী ধারাকে পুষ্ট করে তোলে।

তুরাবী জোর দিয়ে বলেন ইসলামে নারী ও পুরুষে কোন মৌলিক তফাৎ নেই। তাঁর এই অবস্থানের পক্ষে তিনি জোরালো মতামত দেন তাঁর লেখা Women between the Teachings of Religion and the Customs of Society শীর্ষক বইয়ে। তুরাবী যেসব শক্তিশালী লেখা লিখেছেন এটা তাঁর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট এমন মতামত অনেকের। এ বইয়ে ইসলামে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে তুরাবী যে বিপ্লবী ভাষ্য দিয়েছেন তা রীতিমত মৌলবাদী, নারীবাদী, মার্কসবাদী সব তরফের কাছেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তুরাবীর এই ভূমিকার ফলেই সুদানে মহিলা ভোটের হাওয়া ঘুরে যায় ইসলামী শক্তির পক্ষে এবং ইসলামিক আইডেন্টিটি ও নারীবাদী চেতনায় বিশ্বাসীরা সুদানে মার্কসবাদীদের ছাড়িয়ে যায়।

তুরাবী এ বইয়ে প্রথমে যুগের মুসলিম সমাজে নারীদের ভূমিকার নজির দিয়েছেন এবং এই ভূমিকাকে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশের সাথে সমন্বয়  করে বলতে চেয়েছেনঃ

… in the religion of Islam, a women is and independent entity, and thus a fully responsible human being. Islam addresses her directly and does not approach her through the agency of Muslim males.১২

এর মানে হচ্ছে নারীর অধিকার ও দায়িত্বের সাথে পুরুষের অধিকার ও দায়িত্বের কোন তফাৎ নেইঃ

The verdict of Islamic jurisprudence is just the practical expression of the dictates of faith. Women, according to Shariah, are counterparts of men. And in Islamic jurisprudence, there is no separate order of regulations for them … The underlying presumption in the Shariah is that sex is immaterial.১৩

তুরাবী উল্লেখ করেছেন ইসলামের প্রথম যুগে নারীরা নিজের ব্যক্তিগত দায়িত্বে ইসলাম কবুল করেছেন, এমনকি বাড়ির পুরুষদেরও আগে। তারা সেদিন সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কখনো যুদ্ধের ময়দানে, কখনো রাজনীতির অঙ্গনে। তুরাবী মনে করেন সমাজের মুক্ত অঙ্গনে শুধু পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট হয়নি, এখানে লৈঙ্গিক পার্থক্য টানা মূর্খতা। ইসলামের প্রথম যুগের এসব মুসলিম মহিলারাই কার্যত ইসলামী আচরণ করেছেন। সমাজ জীবনে যেরকম, তেমনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কেও একই কথা। নারী এককভাবে যে কোনো বিয়ের  প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তার নিজের সম্পত্তির পুরোপুরি দেখভাল করার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে পূর্ণভাবে।

তাহলে ইসলাম যদি নারীর সমানাধিকার দিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে মুসলিম সমাজে নারীর বর্তমান লাঞ্ছনা, অবমাননার কারণ কি? তুরাবী বলেছেন মুসলমানের বিশ্বাসে যখন অবক্ষয় শুরু হলো তখনই তারা তাদের নারীদের উপর জুলুম শুরু করলো। ইসলামের প্রতি দুর্বল আনুগত্যই তাদেরকে নারীদের প্রতি অসহিষ্ণু, বেইনসাফী আচরণ করতে প্রণোদিত করলো। পরিণতিতে যা দাঁড়ালো তা হলো নারীর মৌলিক ধর্মীয় দায়িত্ব ও অধিকারকে অস্বীকার করা হলো এবং মুসলিম সমাজের মধ্যকার সমতা ও ইনসাফের ধারণা যা কিনা শরীয়াহ্‌ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তাকে উপেক্ষা করা হলো। এর ফলে জন্ম হলো তথাকথিত ঐতিহ্যবাহী মুসলিম সমাজের। ঐতিহাসিক অবক্ষয়ের ধাক্কায় যে তথাকথিত মুসলিম সমাজ তৈরি হয়েছে তুরাবী মনে করেন এটিকে আজ বদলে ফেলা দরকার এবং ইসলামপন্থীদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই সংগ্রামে এগিয়ে আসা। তার কথা শোনা যাকঃ

… a revolution against the condition of women in the traditional Muslim societies is inevitable and that is the task of Islamists to close the gap between the fallen historical reality and the desired model of ideal Islam.১৪

তুরাবী অবশ্য সতর্ক এই কারণে যে সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি একটি জটিল বিষয় বিশেষ করে এই যুগে যেখানে পশ্চিমী নীতি ও মূল্যবোধ মুসলিম সমাজের উপর আছড়ে পড়ছে এবং নির্যাতিত মুসলিম নারীদের কাছে তা একধরনের প্রলোভন ও মুক্তির উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পশ্চিমী মূল্যবোধ আত্তীকৃত হওয়ার আগেই ইসলামী সংস্কারকে এগিয়ে নেয়া চাই। সেজন্য নিছক পশ্চিমী মূল্যবোধের সমালোচনা করে লাভ হবে না। অতীতকে ধরে রেখার চেষ্টা শক্তির অপব্যয় মাত্র। ইসলামবাদীরাই নারীমুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারেন। আদর্শ ইসলামের দিকে যাত্রার শর্ত হচ্ছে এই প্রচেষ্টা। পশ্চিমী মতে আধুনিকতার প্রবক্তারা যাতে পরিস্থিতির ফায়দা তুলতে না পারে সেদিকে নজর দেয়াই আমাদের কর্তব্য।

মুসলিম নারীদের নিয়ে তুরাবীর বিপ্লবী চিন্তাভাবনা এবং ইসলামী আন্দোলনে তুরাবীর প্রেরণায় আরো অধিক নারীর অংশগ্রহণ তার রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে মুসলিম দুনিয়ায় তুরাবীর নারী সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার বিপুল প্রভাব পড়েছে এবং বিভিন্ন দেশের ইসলামবাদীরা তাদের আন্দোলনে নারীর অধিক অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততার ব্যাপারে উৎসাহী হয়েছে। ১৯৯২ সালে তুরাবী তাঁর নিজের সূচনা করা কর্মসূচীর মূল্যায়ন করেছেন এভাবেঃ

… in the Islamic movement I would say that women have played a more important role of late than men. They came with a vengeance because they had been deprived, and so when we allowed them in the movement, more women voted for us than men because we were the ones who gave them more recognition and a message and placed in society. They were definitely more active on our election campaigns than men. Most of our social work and charitable work was done by women. They are now even in the popular defense forces, and nobody raises questions about that … of course. I don’t claim that women have achieved parity … but there is no bar to women anywhere, and there is no complex about women being present anywhere.১৫

পাঁচ

তুরাবীর রাজনৈতিক জীবনের সাথে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। যদিও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ ও পদ্ধতি নিয়ে ইসলামবাদীদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। একদল মনে করেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে সমাজ ও আইনের ইসলামীকরণ করতে হবে। অন্য দলের মতামত হচ্ছে ব্যক্তি ও সমাজের ইসলামীকরণের পরিণত রূপ হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র। তুরাবী মোটামুটি দ্বিতীয় দলের পক্ষপাতী এবং নীতি ও তত্ত্বের দিক দিয়ে মোটামুটি একই চিন্তায় তিনি স্থিতিশীল। তাঁর অবস্থান হচ্ছেঃ

An Islamic state can not be isolated from society, because Islam is a comprehensive, integrated way of life. The division between private and public, the state and society, which is familiar in western culture, has not been known in Islam. The state is only the political expression of an Islamic society. You can not have an Islamic state except in so far as you have an Islamic society. Any attempt at establishing a political order for the establishment of a genuine Islamic society would be superimposition of laws over a reluctant society.১৬

তুরাবীর কথা হচ্ছে এই ইসলামীকরণকে এগিয়ে নিতে হলে সুদানের বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতির সু্যোগ নিতে হবে এবং তিনি তা করেছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের কালে তিনি সে প্রক্রিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়েছেন এবং সংসদের ভিতরে সুদানের সাংবিধানিক ও আইনী ইসলামীকরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে ইসলামীকরণের স্বার্থে তিনি সমারিক শাসকদেরও সহযোগিতা করেছেন। যদিও এই সহযোগিতাকে অনেকেই বাঁকা চোখে দেখেছেন এবং কর্তৃত্ববাদী সরকারকে বৈধতা দেয়ার জন্য তাঁকে অভিযুক্ত হতে হয়েছে।

তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করলে ইসলামী রাষ্ট্র বা সরকার বলতে কি বোঝায়? তুরাবী একটা মডেল খাড়া করেছেন, যদিও এ মডেল প্রশ্নোর্ধ্ব নয়। তবুও বলতে হবে ইসলামী দুনিয়ায় ইসলামী রাষ্ট্রের মডেল একালে তাঁর মত দু’ একজনই সৃষ্টি করতে পেরেছেন। এখানেই তুরাবীর সাফল্য। ইসলামবাদীরা এ মডেল থেকে অনুপ্রেরণা পাবেন। ভবিষ্যতের ইসলামবাদীরা এ মডেলের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো অতিক্রম করে নতুন মডেল উপস্থাপন করবেন এ আশা করা যায়।

তুরাবী বলেছেন ইসলামী রাষ্ট্রের মডেল হবে পুরোপুরি গণতান্ত্রিক। কোনভাবেই এটা স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা নয়। এখানে সরকারের ভূমিকা অনেকখানি সীমিত। আইন সামাজিক নিয়ন্ত্রনের একমাত্র চাবিকাঠি নয়। নৈতিক বিধি, ব্যক্তির বিবেকবোধ – এসবেরও গুরুত্ব রয়েছে এবং এসবই স্বাধীন মতামতের ব্যাপার। ইসলামের প্রতি মননশীল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে তা মোটেই নিয়ন্ত্রিত বা বিধিবদ্ধ হবে না। মূল ধারণাটা হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রে স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অমুসলিমের স্বাধীনতা নয়, মুসলমানদের মধ্যে চিন্তার বহুত্বকেও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

ইসলামের মূল তত্ত্বটা তৌহিদবাদী। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সেকুলার রাষ্ট্রের মতো নয়। ইসলামী রাষ্ট্রও সেকুলার নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। ধর্মহীনতা আত্মবিভাজন ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পথ পরিষ্কার করে। সুদানে তুরাবীর ইসলামী রাষ্ট্রের পরীক্ষা-নিরিক্ষার সুযোগ আসে ১৯৮৯ সালে উমর আল বশীরের নেতৃত্বে তুরাবীর অনুগত একদল সামরিক অফিসারের অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে। উমর আল বশীরের সরকারে তুরাবীর ন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্ট প্রধান ভুমিকা রাখে এবং তুরাবী এই সরকারের প্রধান তাত্ত্বিক ও থিংক ট্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হন।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তুরাবী সুদান পার্লামেন্টের স্পীকার হন এবং ১৯৯৮ সালে প্রণীত সুদানী সংবিধানে তুরাবীর চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটে। বিশেষ করে তাঁর প্রিয় তাজদীদ বা ইসলামী পুনর্জীবনের ভাবনা এখানে স্পষ্ট। তাছাড়া এ যাবৎকাল তাঁর লেখালেখি ও বক্তৃতায় যেসব বিষয় উঠে আসতো তাও এ সংবিধানে কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে। যেমন তিনি মুসলিম দুনিয়ার জনপ্রিয় ধারণা খেলাফতকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ ও ঐশী সার্বভৌমত্বের একটি সমন্বিত রূপ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সংবিধানের ভাষাটা পরীক্ষা করা যাকঃ

Supremacy in the state is to God, the Creator of human beings and sovereignty is to the divergent people of the Sudan who practice it as worship of God, bearing the trust, building up the country and spreading justice, freedom and public consultation.১৭

অথবা ইসলামের ইজমার ধরণাকে তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জনগণের ঐকমত্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন – The consensus of the nation by referendum এবং এই প্রক্রিয়াকে তিনি আইনের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এই সংবিধানে ইসলামী আইনের সুনির্দিষ্ট ধারাগুলোও সন্নিবেশিত হয়েছে যেমন সুদ, এলকোহল ও জুয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা, রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাতের নীতি প্রবর্তনের মতো বিষয়গুলো। সাংবিধানিকভাবে এইসব নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তুরাবী তাঁর লক্ষ্যের কথা খোলামেলা প্রকাশ করেছেন।

Those in service in the state and public life shall envisage the dedication thereof for the worship of God, wherein Muslims stick to the scripture and tradition, and all shall maintain religious motivation and give due regard to such spirit in plans, laws, politics and official business in the political, economic, social and cultural fields in order to promote public life towards its objectives, and adjust them towards justice and uprightedness to be directed towards the grace of God in the hereafter.১৮

এটা হচ্ছে সেকুলারিজমকে প্রত্যাখ্যান করার সাংবিধানিক ভাষা। কিন্তু এই সংবিধানের ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে একটি প্রশ্ন বরাবর ছিল। কারণ সুদান মূলত ইসলামিক ও খ্রিষ্টিয় ধারায় বিভক্ত একটি জাতি রাষ্ট্র। সার্বিকভাবে সুদানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এর দক্ষিণাংশে বিপুলসংখ্যক খ্রিষ্টান ও আদিবাসীদের বাস। সুতরাং সংবিধানের ইসলামী ধারাগুলোকে অমুসলিমদের উপর ব্যবহার করা হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়। সংবিধানের ধারাটা পরীক্ষা করা যাকঃ

The effectiveness of some laws shall be subject to territorial limitations, considering the prevalence of certain religions or cultures in the areas at variance with the religion dominant in the country at large … In there matters exclusive local rules can be established in the area based on the local majority mandate … Thus the legislative authority of any region predominantly inhabited by non-Muslims can take exception to the general operation of the national law, with respect to any rule of a criminal or penal nature derived directly and solely from a text in the Shariah contrary to the local culture.১৯

সুতরাং একটা ইসলামী রাষ্ট্রেও অমুসলমানদের মূলস্রোতের সাথে আত্তীকরণ করা যেতে পারে বলেই তুরাবী মনে করেন।

পাঁচ

উমর আল বশীরের সাথে দীর্ঘ এক দশক ধরে তুরাবীর এইসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল কি তা একটু বিবেচনা করা যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে তুরাবীর ইসলামী রাষ্ট্র মুসলিম বিশ্বে তেমন কোনো জোরালো প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে মনে হয়। এর কারণ তুরাবীর রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের সময় বিশ্বপরিস্থিতি মোটেই তাঁর অনুকূলে ছিল না। পশ্চিমী রাষ্ট্রসমূহ একযোগে তুরাবীর সাথে শত্রুতা শুরু করে পাশাপাশি তারাই সুদানের দক্ষিণাঞ্চেলের খ্রিষ্টানদের মুসলিম প্রধান উত্তরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়। মুসলমান-খ্রিষ্টান দাঙ্গা ও গৃহযুদ্ধ সুদানের ঐক্য ও সংহতি একেবারে ঝাঁঝড়া করে দেয়। এ ছাড়া সুদানের প্রধান বিরোধী দলগুলোও তুরাবীর ইসলামীকরণের ধারণায় কখনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেনি। উল্টো নানা ইস্যুতে তারা তুরাবীর বিরোধিতা করতে ছাড়েনি। এসব কারণে তুরাবীর বিকশিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিচার করা বেশ কঠিন এবং শেষমেষ কার্যত আমেরিকার চাপে প্রেসিডেন্ট উমর আল বশীর তুরাবীকে তাঁর পদ থেকে ১৯৯৯ সালে সরিয়ে দেন। একালে ইসলামী নবচেতনাবাহীদের অন্যতম পুরোধা তুরাবীর নেতৃত্বে সুদানে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল তাঁর জন্য এটা একটি বড় বিপর্যয় বটে। অনেকের মতে তুরাবীর সামরিক গণতান্ত্রিকভাবে তাঁর লক্ষ্য পূরণের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত ছিল। তাহলে তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন হতো না।

তারপরেও বলা হয় তুরাবী আজীবন একজন সৃষ্টিশীল ও মননশীল মানুষ। মুসলিম বিশ্বে তাঁর সুগভীর মনীষা ও মননসমৃদ্ধ ধ্যান-ধারণার একটা বড় প্রভাব পড়েছে এবং তাঁর লেখালেখি ও চিন্তাভাবনার অনুসারী একদল মানুষও তৈরি হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ পথ চলায় এটা একটি ইতিবাচক সংযোজন বলে ধরে নেওয়া যায়।

গ্রন্থঋণঃ

1.  John L. Esposito and John O. Voll, Makers of Contemporary Islam. New York; Oxford University Press, 2001.

2.  প্রাগুক্ত।

3.  প্রাগুক্ত।

4.  Abdel Wahab El-Affendi, Turabi’s Revolution: Islam and Power in Sudan. London: Grey Seal, 1991.

5.  প্রাগুক্ত।

6.  Hasan Turabi, “The Islamic State”, in Voices of Resurgent Islam. Ed, John L. Esposito. New York: Oxford University Press, 1983.

7. Quoted in John L. Esposito and John O. Voll, Makers of Contemporary Islam.

8.  প্রাগুক্ত।

9.  প্রাগুক্ত।

10. প্রাগুক্ত।

11. প্রাগুক্ত।

12. Hasan Turabi, Women in Islam and Muslim Society. London: Mile Stones, 1991.

13.  প্রাগুক্ত।

14.  প্রাগুক্ত।

15. In Arthur L. Lowrie, ed., Islam, Democracy, the State and the West : A Roundtable with Dr. Hasan Turabi. Tampa, FL : World and Islam Studies Enterprise, 1993.

16. Hasan Turabi, “Principles of Governance, Freedom, and Responsibility in Islam”, American Journal of Islamic Social Sciences 4,1 (1987):1.

17. Quoted in John L. Esposito and John O. Voll, Makers of Contemporary Islam.

18. প্রাগুক্ত।

19. প্রাগুক্ত।

সূত্রঃ বাংলা সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত “উত্তর আধুনিক মুসলিম মন” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
agami diner itihas

আগামী দিনের ইতিহাস

আলী শরীয়তি | মার্চ ৩, ২০১৬
Download PDF

আমার বন্ধুদের অবশ্যই উচিৎ হবে না আজ আমার কাছ থেকে একটা  জ্ঞানগর্ভ ও সুসম্পন্ন বক্তৃতা আশা করা। কারণ, বক্তৃতার বিষয়বস্তুর উপর চিন্তা করার জন্যে আমি ঘন্টা দুয়েকের বেশী সময় পাইনি। কিন্তু, ঠিক এ প্রসঙ্গে, কিছুদিন আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম। আশা করি সেখানে বলা কিছু কথা আজও মনে করতে  পারবো এবং আপনাদের সামনে তা-ই উপস্থাপন করবো।

টিবর মেনডে (Tebor mende) হচ্ছেন ইদানিংকালের একজন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিলো ‘তৃতীয় বিশ্ব’। হাঙ্গেরীয়-ফরাসী এ বিখ্যাত পণ্ডিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ইতিহাস ও সভ্যতার উপর ব্যাপক গবেষণা করেন। তৃতীয় বিশ্ব সম্পর্কিত তাঁর সুচিন্তিত মতামত এবং রচিত গ্রন্থ অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল বলে বিবেচিত হয়েছে। এ বিখ্যাত পণ্ডিত এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো তৃতীত বিশ্বের দেশগুলো পর্যবেক্ষণ করে ‘A Glance at Tomorrow’s History’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

আমি এখানে তাঁর অনাগত ইতিহাস চেতনা বা তাঁর গ্রন্থটি সম্পর্কে কোনো আলোচনা করবো না। বরং আমি তাঁর কাছ থেকে শোনা কথাগুলো আপনাদের সামনে উপস্থাপনা করবো। তাঁর কথাগুলো ছিলো আধুনিক ও বিস্ময়কর।

আন্দ্রে জিদ (Andre Gide) বলেছিলেন, কোন কোন কথা বা বাণী কোন কোন ব্যক্তিকে স্মরণীয় করে রাখার ক্ষমতা রাখে। আর স্মরণীয় করে রাখতে না পারলেও তা অন্ততঃ একটা বোধ বা উপলব্ধির জন্ম দেয়। এমনও হয় যে, আমাদের মধ্যেই কোন কোন বোধ বা উপলব্ধি লুকিয়ে থাকে যার সম্পর্কে আমরা নিজেরাই ভালো বুঝি না। সে সব লুকানো বোধ বা উপলব্ধিগুলো আমরা নিজে নিজে প্রকাশ করতেও পানি না। কিন্তু আমরা যখন এমন একটা বক্তব্য শুনি যা আমাদের মাঝে লুকানো বোধ বা উপলব্ধির সাথে মিলে মিশে একটা ধারণার জন্ম দেয়। এবং এমনিভাবে আমাদের মনোজগতে কোন বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার জন্ম হয়।

‘আগামী দিনের ইতিহাস’ ভাবনাটা মূলতঃ একটা আধুনিক ও বিপ্লবী অভিব্যক্তি। ইতিহাস তার বিষয়  ও মেজাজগত দিক থেকে সর্বদাই অতীতাশ্রয়ী। ইতিহাসের কাজ হচ্ছে অতীতের প্রতিফলন। ইতিহাস বলতেই আমরা বুঝি অতীত। যা কিছু পুরানো তা-ই অতীত। এক্ষেত্রে, ‘আগামী দিনের ইতিহাস’ কথাটা একটা নতুন ভাবনার দ্যোতক। আজকের আধুনিক মানুষ কেবল অতীত ও বর্তমানকে জানতে পারলেই সুখী নয়। মানুষ তার অনাগত ভবিষ্যতকেও নিশ্চিত জানতে চায়। কারণ, আধুনিক মানুষ অনেক বেশী সতর্ক ও সচেতন। তাই আধুনিক মানুষকে আগামী দিন সম্পর্কে ভাবতে হয়। আর আগামী দিনের ইতিহাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই হতে হবে বিজ্ঞান মনস্ক। এ ক্ষেত্রে ইতিহাসকে বিজ্ঞান হিসাবে বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য।

আমরা যদি সেই অনাগত দিনের ইতিহাস লিখতে পারি তা হলেই ইতিহাস পাবে তার সত্যিকার মর্যাদা। সেই ইতিহাসকে হতে হবে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নির্দেশক। যদি সেই ইতিহাস ভবিষ্যৎ নির্দেশে ব্যর্থ হয়, এমনকি ন্যূনপক্ষে বর্তমান মানবগোষ্ঠি ও অনাগত মানব গোষ্ঠি সম্পর্কে জানতে সহায়ক না হয়, তবে তা হবে অর্থহীন। কারণ, মানবজাতি, ভবিষ্যৎমুখী মানুষের বহমান জীবন এবং বর্তমান ও অনাগত মানবগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ ও আদর্শ নির্দেশে সামগ্রিক সহায়তা প্রদান করাই সমস্ত বিজ্ঞানের নিম্নতম ভূমিকা হওয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে প্রথমেই মানব জাতির অতীত ইতিহাস সম্পর্কে (সম্যক) ধারণা থাকা আবশ্যক যা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ইতিহাস নির্মাণে সহায়ক হবে।

টিবর মেনডের মতো নয় বরং আমি আমার বিশ্বাসের আলোকেই আগামী দিনের ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করতে চাই। আমার কথা বলার ভঙ্গি বক্তার মতো না হয়ে শিক্ষকের মতো হওয়াটাই স্বাভাবিক; কারণ পেশায় আমি একজন শিক্ষক। এ জন্যে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সৌভাগ্যশতঃ আমার সামনে বসা মুখগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরই যারা আমার বাচনভঙ্গি ও বক্তব্যের সাথে পরিচিত।

আমার বক্তব্যকে অনুধাবনের জন্যে আমি আপনাদেরকে কল্পনার একটা ‘কোণ’ (Cone) ধরে নিতে বলবো। (কোণ একটা গাণিতিক কাঠামো যার ভূমি সংলগ্ন অংশটা সবচেয়ে বিস্তৃত ও বৃত্তাকার। কাঠামোটি ভূমি থেকে উপরের দিকে ক্রমশঃই বৃত্তাকারভাবে সরু হবে। কাঠামোর শীর্ষ বিন্দু সূক্ষ্ম বা সুচালো। অনুবাদক) আমার বক্তৃতা শেষ হওয়া পর্যন্ত আশা করি ‘কোণ’টার কথা মনে রাখবেন। কারণ এর ভিত্তিতেই আমি আমার বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করবো।

এ ‘কোণ’ হলো আমাদের চিন্তা, বিচার বিশ্লেষণ ও অনুধাবনের কাঠামো। একটা যুগের সমাজ, সভ্যতা ও ইতিহাস তার পরবর্তী যুগের সমাজ, সভ্যতা ও ইতিহাসকে অনুসরণ করে। ব্যাপারটা এমন যে অতীতের মানব সভ্যতার কোনো একটা যুগ ক্রমশঃ পরবর্তী একটা সভ্যতর ঐতিহাসিক যুগে উত্তীর্ণ হয়। কোন একটা যুগ শেষ পর্যায়ে এসে থেমে যায় না বরং পরবর্তী ঐতিহাসিক যুগের সূচনা করে। এর অর্থই হলো ইতিহাস বহমান। টিবর মেনডের ভাষায় মানব সভ্যতার প্রথম সূর্যোদয় হতে আজ পর্যন্ত ৩, ৪, ৫, ১০ এমনিভাবে ২৭ টি যুগ পার হয়ে গেছে।

একটা অস্তিত্বশীল জীবন্ত সত্তার মতো প্রতিটি যুগেরই আছে ভিন্ন মেজাজ, চিন্তাধারা ও বিশেষ ধরণের ভাবপ্রবণতা। আমরা আজ ভালোভাবেই জানি অবস্থা, স্বকীয়তা, চিন্তাধারা, ঝোঁক-প্রবণতা ও লক্ষ্যের দিক থেকে প্রতিটি যুগেই তার আগের যুগ হতে স্বতন্ত্র।

সুতরাং প্রত্যেকটি যুগকে বোঝার জন্যে আমাদের ‘কল্পিত কোণ’ খুবই প্রয়োজনীয় এবং এরই আলোকে ইতিহাসের প্রতিটি যুগকেই সূক্ষ্মভাবে বিভক্ত করা যাবে। আর তার উপর সতর্ক অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা এমনকি ভবিষ্যত সম্পর্কে’ও বলতে পারবো।

উদাহরণ হিসেবে, আমরা তিনশত বৎসর পূর্বের মধ্য যুগের ইউরোপীয় ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করতে পারি। এক্ষেত্রে আমাদের কল্পিত ‘কোণ’কেই আমরা মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করবো। এর ভূমি সংলগ্ন অংশ যা সবচেয়ে বেশী বিস্তৃত, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দ্বারা পূর্ণ। এই জনগণ কারা? এরা হলো সমাজের সাধারণ মানুষ। প্রত্যেকটি সমাজেরই সাধরণ মানুষ তাদের সংখ্যা ও স্তরের বিবেচনায় আমাদের ‘কল্পিত কোণ’ এর ভূমিতেই অবস্থান করে।

প্রতিটি যুগের পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের অবস্থান আমাদের ‘কোণ’টির উপরের অংশে। এরা হলো বুদ্ধিজীবী। তার মানে হলো, এদের যাবতীয় কার্যাদি মূলতঃ বহুমুখী চিন্তার ক্ষেত্রে আবর্তিত। শরীরের কোন অঙ্গ বা কারখানার কোনো হাতিয়ারের মতো ‘এরা কাজ করেন না। এমনিভাবে ধর্মীয় নেতা, পণ্ডিত, কবি, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণের অবস্থান হলো ‘কোণ’র উপরের অংশে।

‘কোণ’টির সবচেয়ে নীচের অংশে অবস্থান করে প্রতিটি সমাজের সাধারণ মানুষ। বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর অবস্থান হলো এর উপরের অংশে। আদিম সমাজের জন্যেও একথা প্রযোজ্য। আদিম সমাজের গোত্রবদ্ধ গণমানুষের ‘কোণ’র ভূমিতেই অবস্থান করতো তখনকার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক লোকগুলো বলতে বোঝাতো জাদুকর, শ্বেতশ্মশ্রুধারী অথবা যে কোনভাবে জনগণের নেতৃত্ব দেয় এমন ব্যক্তিবর্গ।

বহুযুগ পার হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের ‘কোণ’টি সব যুগ বিশ্লেষণে সমানভাবে প্রযোজ্য। আমার বিশ্বাস দিন যত এগুচ্ছে ‘কোণ’র ভূমি সংলগ্ন সাধা্রণ মানুষের অবস্থানও ক্রমশঃ বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরের নিকটবর্তী হচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং একই হারে তা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীতে যুক্ত হচ্ছে। মানে হলো, প্রতিটি যুগেই বিদ্বান ব্যক্তিদের সংখ্যা তার পূর্ববর্তী যুগের সংখ্যা হতে বৃহত্তর হচ্ছে। কারণ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি এখন ব্যাপক রূপ লাভ করেছে। চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। শিল্প ও বিজ্ঞানচর্চা অতি সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষ ক্রমান্বয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরের দিকে উন্নীত হচ্ছে।

সাধারণ জনগণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর মধ্যে আজ আর তেমন পার্থক্যসূচক সীমারেখা নেই। আমরা আমাদের ‘কল্পিত কাঠামো’ বা ‘কোণ’ ধরে যতই উপরে উঠবো, দেখবো যে সাধারণ জনগণ ক্রমশঃই বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর নিকটবর্তী হচ্ছে। এবং আগেই বলছি উচ্চতর স্তরতো বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীরই অবস্থান। আবার নীচের দিকে নামলে দেখা যাবে যে, বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীটা সাধারণ জনগণের কাছাকাছি এসে পড়েছে। অপরদিকে ‘কোণ’টি বেয়ে উপরে যেতে এমন একটা অবস্থানে পৌছানো যায় (যা শীর্ষবিন্দু) যেখানে প্রতিটি যুগের বিশেষ কিছু পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব অবস্থান করেন। এসব ব্যক্তিগণ সমাজের শিক্ষিত মানুষের কাছে রীতিমতো মূর্তিতে পরিণত হন। এমনিভাবে প্রতিটি যুগের সেইসব শীর্ষস্থানীয় চিন্তাবিদগণ তাঁদের যুগের চিন্তা-চেতনার উৎস হয়ে দাঁড়ান।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জ্যাঁ পল সাঁত্রে, বার্ট্রান্ড রাসেল, সোয়ার্জ প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ আমাদের ‘কোণ’ এর শীর্ষ বিন্দুতে অবস্থানরত। তাঁদের অবস্থান হলো বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর শীর্ষে। এ শ্রেণীর নিম্নতম ব্যক্তিবর্গ হচ্ছেন স্কুল পড়ুয়াগণ। অবস্থানের দিক দিয়ে তাঁরা অবশ্য সাধারণ জনগণের কাছাকাছি। এই হলো আমি যা বলতে চাই তার ভূমিকা – এবার আমি মূল বক্তব্য শুরু করবো।

কল্পিত ‘কোণ’টা আমরা মধ্যযুগের বেলায় প্রয়োগ করবো। মধ্যযুগের সাধারণ জনগণ কারা? তখনকার ফ্রান্স, ইতালী ও ইংল্যান্ডের জনসাধারণ গীর্জায় যেত। তারা যাজকদের আদেশগুলো পালন করতো। বাইবেল, পেন্টালিক, যীশু বা ঈশ্বরের নামে দেয়া সরকারী পণ্ডিতদের নির্দেশগুলো বাস্তবায়ন করতো। এইসব নির্দেশ শ্রবণ, গ্রহণ ও অনুশীলন করাই ছিলো তাদের কাজ। এরা হলো মধ্যযুগের সাধারণ মানুষ।

এই একই অনূভুতি ও বৈশিষ্টসম্পন্ন সাধারণ জনগণের উপস্থিতি আজও সমাজে রয়েছে। বড়দিন উপলক্ষে সেন্ট পিটারসের বাতায়নের ফাঁক দিয়ে পোপ যখন আবির্ভূত হন তখন তাঁর মহামূল্যবান শ্বেত শুভ্র পবিত্র পোশাক দেখে আজও লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ খৃষ্টান ধর্মীয় অনূভুতি ও আবেগ উদ্বেল হয়ে পড়ে। তারা উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন জুড়ে দেয়। এ হলো তেমন অনূভুতি ও চিন্তা, যেমনটা তিন চার শতাব্দী আগে মধ্যযুগীয় ইতালী বা ফ্রান্সের জনগোষ্টি ধর্মীয় আবেগে লালন করতো।

আমরা প্রায়ই বলি এখন নতুন যুগ চলছে। এর অর্থ কি? অর্থ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর মধ্যে একটা পরিবর্তন ঘটেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়। সুতরাং প্রতিটি যুগের এইসব বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর মধ্যে কি ধরণের বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা ছিলো তা আজ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।

এর পরেও কথা থেকে যায়। প্রতিটি যুগে সাধারণ মানুষ এবং উচ্চস্তরে অবস্থানরত শিক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর বাইরেও হাতে গোনা ব্যক্তিক্রমধর্মী কিছু ব্যক্তিত্ব থাকেন। যাঁদের চিন্তা ও বিশ্বাস তাঁদের সমসাময়িক বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর চিন্তা ও বিশ্বাসের মধ্যে বৈপরীত্যসূচক চৈতন্যের সূচনা করে। তাঁরা সে যুগের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। সাধারণের মধ্যেও তাঁদেরকে গণ্য করা যায় না। তাঁদেরকে কোনো বিশেষ কালের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর মধ্যেও ফেলা যায় না। তাঁরা হচ্ছেন সমগ্র মানব গোষ্ঠির সেই প্রখ্যাত প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব যাঁদেরকে কোন কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। কারণ, তাঁরা যে-কথা বলছেন বা যে-চিন্তা করছেন বুদ্ধিজীবী শ্রেণী বলে পরিচিত গোষ্ঠি সে কথা বলেন না, তা ভাবেন না বা তা বিশ্বাসও করেন না, করার প্রয়োজনও বোধ করেন না। তাঁদের কথাগুলো খুবই নতুন। বোমার মতো তার বিস্ফোরণ।

এঁদের পরিচয় কি? এঁদেরকে তো কোন বিশেষ শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত করা যায় না। এঁদের সংখ্যা খুবই নগণ্য, হাতে গোনা ক’জন মাত্র। তবে এটা ঠিক যে, এঁরা প্রতিভাবান। এঁরা আধুনিক চিন্তা ও চেতনার উদ্ভাবক। এঁদের মানস প্রবণতা সমসাময়িক সমাজের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ হতে ভিন্নতর, শিক্ষা-ঐতিহ্যের পরিপন্থি, বিজ্ঞান পদ্ধতির বিপরীত এবং যুগ ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক।

মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। তখনকার ইউরোপের সাধারণ মানুষ বর্তমান ইউরোপের সাধারণ মানুষের মতোই জীবন যাপন করতো যেমন আজকের আধুনিক ইউরোপের সাধারণ ইউরোপের সাধারণ মানুষ গীর্জার আনুগত্য করে এবং সাবেক মধ্যযুগীয় যাজকদেরই মেনে চলে।

ইউরোপের শিক্ষিত সমাজের আবির্ভাব তিন শতাব্দী আগে, সতের শতকে। এই শতকেই বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশ ক্রমশঃ বর্তমান অবস্থায় পরিণতি লাভ করে। আজ যাঁরা বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠি হিসেবে পরিচিত- যাঁরা নতুন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, তাঁরা মূলতঃ সতের শতকের বুদ্ধিজীবীদের আধুনিক সংস্করণ মাত্র। আজও তাঁদের ভাবধারাকে লালন করা হয়, তাঁদের মতোই তাঁরা চিন্তা করেন, বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস ও তত্ত্বের বেলায় তাঁদেরকেই তাঁরা অনুকরণ করেন। এ  ভাবে তাঁরা, সতের শতকে ইউরোপে গড়ে ওঠা, শিক্ষিত সমাজ যাঁরা অদ্যাবধি বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও আধুনিক জীবন ধারাকে চালিয়ে নিচ্ছে তাঁদের অনুগামীদের বাড়তি একটা সংযোজনে পরিণত হন।

মধ্যযুগের এসব শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীদের পরিচয় কি? তাঁরা ছিলেন খ্রীষ্টান ধর্মযাজক ও গীর্জার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের লক্ষ্য ছিলো ধর্মীয় সত্যকে আবিস্কার করা। সাধারণ মানুষদের আলো অভিসারে নিয়ে আসা। জনগণের নেতৃত্ব দেয়া। মূলতঃ তাঁদের লক্ষ্য ছিলো একই ধর্মীয় আবর্তে বিপুল জনগোষ্টিকে উদ্বুদ্ধ ও একই দলভূক্ত করে তোলা।

এভাবে দেখা যায় যে, ‘কোণ’টি যখন আমরা মধ্যযুগে বিশ্লেষণে ব্যবহার করি তখন বুদ্ধিজীবী শ্রেণী বলতে যা বোঝাতো তা মূলতঃ খ্রীষ্টান যাজক ও ধর্মীয় নেতাদের দ্বারাই পরিপূর্ণ ছিলো। তখনকার দিনের ধর্মীয় নেতাদের আপনারা ভালোভাবেই চেনেন। কিন্তু পনের হতে সতের শতকের মাঝামাঝি এই দীর্ঘ সময়ে এসব ধর্মীয় নেতাদের পাশাপাশি আরোও কিছু প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁরা ছিলেন নতুন চিন্তার ধারক ও বাহক। কিন্তু তখনও পর্যাপ্ত কোন শ্রেণীতে তাঁরা রূপান্তরিত হতে পারেননি।

এ সময়ের কতিপয় চিন্তাবিদ সাধারণ ধর্মপ্রাণ, ঈশ্বর ভক্ত খ্রীষ্টান মূল্যবোধ পরিহার করে একটা নতুন চিন্তাধারার প্রবর্তন করেন।

তাঁরা ষোল হতে আঠার শতকের মধ্যবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে (কোণ-এর) শীর্ষে আরোহণ করেন। মধ্যযুগীয় শিক্ষিত সমাজের ধর্ম বোধে অনুগত না হয়ে তাঁরা হয়ে উঠলেন বিজ্ঞানমনস্ক। ধর্মের কথা হলো, ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর দ্বারা অনুমোদিত বিষয়গুলোকেই গ্রহণ করতে হবে, আর যা উল্লেখ করা হয়নি তা সবই পরিত্যাজ্য। ঠিক তেমনি ভাবে তাঁরা ঘোষণা করলেন যে, কেবল বিজ্ঞান ও পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত বিষয়গুলোকেই তাঁরা বিশ্বাস করবেন। ধর্ম বা পবিত্র গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত থাকলেই কোন কিছুর উপর তাঁরা বিশ্বাস আনবেন না, যতক্ষণ না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার দ্বারা প্রমাণিত সত্যে পরিণত হয়।

এভাবেই আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগের সূচনা হলো। কেপলার ও গ্যালিলিওর মতো বিখ্যাত পণ্ডিতবর্গ বিজ্ঞান ভাবনার প্রচার ও প্রসার ঘটালেন। এভাবেই মধ্যযুগীয় ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ও প্রচার তীব্র আকার ধারণ করলো। তখন এই বিজ্ঞান-মনস্ক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কায়েমী স্বার্থবাদী শ্রেণী সোচ্চার হয়ে উঠলো। তাঁদেরকে নিন্দা করলো, ধর্মের শত্রু বলে আখ্যা দিলো, কারাগারে নিক্ষেপ করলো, বিচারের কাঠগড়ায় আসামী হিসেবে হাজির করলো; এমনকি আগুনে পোড়ালো। গ্যালিলিও যার জ্বলন্ত উদাহরণ। কেন? কারণ, তাঁরা সমাজের সনাতন শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে নতুন ধ্যান-ধারণার প্রচার করেছিলেন।

মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ে সাধারণ জনগণ ও শিক্ষিত শ্রেণীর (ধর্ম বিষয়ে শিক্ষিত ও গীর্জার সাথে সম্পর্কযুক্ত) চেয়ে উপরের স্তরের একটা স্বতন্ত্র প্রতিভাবান দলের উন্মেষ ঘটে। যারা ছিলেন সংখ্যায় অতি নগন্য, ১০/১২ জনের মতো। এই ক্ষুদ্র দলভুক্ত প্রতিভাবান ব্যক্তিবর্গ ধর্মীয় মূল্যবোধের বিপরীতে নতুন চিন্তা ও চেতনার প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত তাঁরা সমাজে একটা শ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি। তাঁরা ছিলেন বিচ্ছিন্ন কতিপয় ব্যক্তি মাত্র।

এবার আমরা আধুনিক যুগে বিশ্লেষণে আমাদের ‘কোণ’টা ব্যবহার করবো। আধুনিক যুগের সময়কাল সতের থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা দেখবো যে এ যুগের সাধারণ জনগণের মধ্যে মূলতঃ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। শুধু আয়তনের দিক থেকে এ শ্রেণীর হ্রাস ঘটেছে এবং এ শ্রেণী হতে কিছু ব্যক্তি শিক্ষিত হয়ে উপরের শ্রেণীতে যোগ দিয়েছে।

আধুনিক যুগের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে এবার ভাবা যাক। তাঁদের অবস্থান হবে আমাদের ‘কোণ’-এর শীর্ষে। আজ তাঁরা ঠিক একই কথা বলছেন যা ষোল শতকের প্রতিভাধর বিচ্ছিন্ন কতিপয় ব্যক্তিবর্গ বলতেন। যে কথাগুলো তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। এমনভাবে দেখা যায় যে ‘কোণ’-এর শীর্ষে সর্বদাই সমাজের এমন কিছু সংখ্যক শিক্ষিত ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের অবস্থান, যাঁরা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের প্রচলিত চিন্তাধারার বিপরীতে নতুন চিন্তাধারার প্রবর্তন করেন। এক পর্যায়ে এসে এসব বিচ্ছিন্ন স্বল্প পরিচিত, প্রতিভাবানাদের মতবাদগুলো আগামী দিনের শিক্ষিত সমাজের জন্যে একটা মননশীল চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটায়। এবং সেইসব চিন্তাধারা পরবর্তী যুগের মানুষদের বিশ্বাস ও চিন্তধারার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।

এভাবেই আমরা দেখছি যে, আমাদের ‘কল্পিত কোণ’-এর শীর্ষদেশে এমন সব প্রতিভাধর ব্যক্তিবর্গ অবস্থান করেন যাঁরা তাঁদের সমকালীন বুদ্ধিজীবীদের বিরোধী হন এবং তাঁদের বক্তব্যকে অগ্রাহ্য করেন। এখানেই শুরু হয় মূল বিরোধ। প্রতিভাবানরা সংখ্যার দিক দিয়ে যেমন নগন্য তেমনি স্বল্প পরিচিত। ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হতে থাকে তাঁদের চিন্তাধারা ও আদর্শ। ক্রমে কালের প্রয়োজনে তাঁরা নিজেরাই একটা শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। এমনকি তাঁরা তাঁদের পূর্ববর্তী বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক অবস্থান দখল করে ফেলেন।

আজকের ইউরোপে এখনও যাজকরা রয়েছেন। এখনও সমাজে তাঁদের কর্তৃত্ব রয়েছে। কিন্তু এ যুগের মানস-প্রবণতা শিক্ষিতদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; যাঁরা বিজ্ঞানের দাস, খোদার নয়। তবে, আমরা যদি, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক যুগকে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখবো যে, এ যুগেও সাধারণ মানুষদের চিন্তা ও চেতনা মূলতঃ ধর্মবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এমনকি ধর্ম সংস্কৃতির সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও দেখা যাবে যে, আজও ‘ধর্ম’ সাধারণ মানুষের চিন্তা, চেতনার মূল ভিত্তি হয়ে টিকে আছে।

আজ আমরা দেখছি যে, এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যাঁরা বিজ্ঞানের পূজারী। আজকের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত শ্রেণী বিজ্ঞানের পূজা করেন ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসকে পাওয়ার জন্যে নয়। সুতরাং এ নিয়ম অনুযায়ী আধুনিক কালে শিক্ষিতদের অবশ্যই ধার্মিক হওয়া যাবে না। কেন? কারণ, এ নতুন যুগে সাধারণ মানুষেরাই কেবল ধর্মে বিশ্বাস করেন। কিন্তু এর বিপরিতে দেখা যাবে যে, মধ্যযুগের বুদ্ধিজীবীরা একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবী ও ধার্মিক ছিলেন। এ যুগের নব্যশিক্ষিতদের সবাই বিজ্ঞানের পূজারী এবং বিজ্ঞানের পূজা করাই এদের আদর্শে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানের পূজারী নব্যশিক্ষিতরা ধর্মীয় নির্দেশে ও বিশ্বাসের বিপরীতে মতবাদ হিসেবে এসব আদর্শকে প্রচার করেন। তাঁদের মতবাদ বিজ্ঞানের পূজা করা। এর বিপরীতে ধর্মের আদর্শ হচ্ছে ধর্মীয় নির্দেশে, বিশ্বাসে ও রীতিনীতে; যা প্রশ্নাতীতভাবেই মেনে নিতে হবে।

একটা বিষয় এখানে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মধ্যযুগের মতো আজও ‘ধর্ম’ সাধারণ মানুষের মাঝেই বিরাজমান। অন্যদিকে, বিজ্ঞান-মনস্ক নব্যশিক্ষিতদের উদ্ভব হয়েছিল সতের শতকে। আজ পর্যন্ত ও দীর্ঘ সময়ে, এসব শিক্ষিত জনগণ বিজ্ঞান পূজার দিকে যতই ঘনিষ্ট হয়েছে- ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা হতে তাঁরা ততই দূরত্বে চলে যাচ্ছে। আর ঠিক একই হারে সাধারণ জনগণ হতেও তারা বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।

মধ্যযুগের শিক্ষিত শ্রেণী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে চিন্তা ও বিশ্বাসের সাদৃশ্য ছিলো। তাঁরা একই লক্ষ্যে একইভাবে কথা বলতো। কিন্তু, আজকের শিক্ষিত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চিন্তা ও বিশ্বাসে বৈসাদৃশ্য ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিতরা বিজ্ঞানে পূজারী আর সাধারণ মানুষ ধর্মপ্রাণ।

এটা একটা চরম বাস্তবতা যা আমাদের সমগ্র চিন্তা, বিশ্বাস ও হাজারও মন্তব্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয় যে, কেন বিজ্ঞানের জয়যাত্রা এতো ব্যাপক হয়েছিলো। একটা দীর্ঘ সময়ব্যাপী ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইরান এবং বিস্তৃত এশিয়ার মানুষদের মধ্যে বিজ্ঞান-মনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশঃই প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে। এমনিভাবে, সতের, আঠারো ও উনিশ শতকব্যাপী বিজ্ঞানের জয়যাত্রা এতই ব্যাপকআকার ধারণ করে যে, মানুষের ধর্মবোধ ক্রমশঃই আমাদের ‘কল্পিত কোণ’র শীর্ষস্থান থেকে ভূমিতে অবতরণ করেছে। এভাবেই বিজ্ঞান ধর্ম এবং ধর্মবোধকে ধ্বংস করে দিতে থাকে। সেই ধ্বংসের পাদপীঠে বিজ্ঞান-ভাবনা এবং বিজ্ঞানের মহিমা স্থান জুড়ে বসে।

আজকের সাধারণ মানুষ মধ্যযুগের সাধারণ মানুষদের মতোই ধর্মে বিশ্বাস করে। বিশ্বব্যাপী তাঁরা ধর্মেরই অনুসারী। সাবেক ধর্ম-বিশ্বাস এখনও তাঁদের মধ্যে বিরাজমান। আজকের নব্যশিক্ষিতরা ঐতিহ্যগত ও জাতীয় ধর্ম হতে বিচ্যুৎ হচ্ছে। ধর্ম-বিশ্বাসই ছিলো তাদের পূর্ব ঐতিহ্য যা হতে তারা আজ দূরে সরে গেছে। আজকে যারা ইউরোপ, আমেরিকা, প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের ধর্ম-সংস্কৃতির সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় নিয়োজিত আছেন তারা সবাই এই একই সত্য উপলব্ধি  করতে পারবেন।

এর পরেও একটা সমস্যা থেকে যায়। বর্ণিত দুটো শ্রেণীর বাইরে অন্য একটা দলকে আমরা খুঁজে বের করতে পারি। আমরা দেখেছি প্রত্যেক যুগেই কতিপয় বিরল প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব থাকেন যাঁদেরকে ‘কোণ’-এর শীর্ষ বিন্দুতে স্থান দিতে আমরা বাধ্য। প্রত্যেক  যুগের শেষ পর্যায়ে এসে এসব বিরল প্রতিভাবান ব্যক্তিবর্গ সংখ্যার দিক থেকে বড়ো হতে থাকেন। ক্রমেই তারা ক্ষমতা ও শক্তিলাভে সমর্থ হন। তাঁরা আগামী দিনের বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা ও চেতনার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, কেপলার আইজাক নিউটন, ফ্রান্সিস বেকন, ও রজার বেকন প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ তাঁদের নিজেদের যুগের মানব সমাজের জন্য ভবিষ্যত চিন্তা-চেতনার সুদূর ভিত্তি রচনা করেছিলেন।

আমার বর্ণিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী বর্তমানে কল্পিত ‘কোণ’ এর শীর্ষে অবস্থানরত ব্যক্তিবর্গ আগামী দিনের বিদ্যাবিদদের চিন্তা চেতনার নির্মাতা হয়ে থাকেন।

এভাবেই আমরা আগামী দিনের ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে পারি। তা কিভাবে? যদি আমরা বর্তমানে ‘কোণ’ এর শীর্ষে অবস্থানরতদের চিনতে পারি, তাদের চিন্তার পদ্ধতি সম্পর্কে আপনাদের বলতে পারি এবং দেখাতে পারি বিগত তিন শতক ধরে চলে আসা বিজ্ঞান পূজাকে তারা কিভাবে বিরোধিতা করেছেন তাহলেই আমরা সমাধানে পৌঁছে যাবো। এমনকি, আমরা এ যুগের শেষ পর্যায়ের চিন্তাবিদদের ভাব-প্রবণতা কিভাবে আগামী দিনের চিন্তাবিদদের বিশ্বাস, অনুভূতি ও ভাবপ্রবণতাকে প্রভাবিত করবে তা-ও নিশ্চিত ভাবে জানতে পারবো।

আধুনিক কালেও মানব জাতির মধ্যে কতিপয় বিরল প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের অবস্থান আমরা লক্ষ্য করে থাকি। শিক্ষিতদের মধ্যে এঁদের শীর্ষে স্থান দিতে আমরা বাধ্য। কারণ, একদিকে শিক্ষিত মহল তাঁদেরকে অশিক্ষিত বলে মনে করেন অপরদিকে তাঁরা শিক্ষিতদের চেয়ে ভিন্ন চিন্তা করেন ও ভিন্ন কথা বলেন। এঁদেরই একজন হলেন গুইনন (Guenon)। সম্প্রতি তাঁর রচিত গ্রন্থ ‘ক্রাইসিস অব দি মডার্ন ওয়ার্ল্ড ও ধর্মীয় গবেষণা-পত্র ইউরোপে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিখ্যাত ফরাসী পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব হঠাৎ করেই একদিন আধুনিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান পূজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসলেন। তিনি প্রাচ্যে চলে গেলেন। সেখান থেকে চলে যান মিশরে। কোন শাব্দিক অর্থে নয় বরং সত্যিকার অর্থেই তিনি বর্তমান ইউরোপীয় সমাজ ও চিন্তাধারা হতে সরে দাঁড়ালেন, যাতে করে, তিনি ইউরোপীয় জনগণের প্রয়োজনে ও জ্ঞানপিপাসা নিবারণে সাহায্য করতে পারেন।

তেমনি ইদানিংকালের অপর একজন প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন এলেক্স ক্যারোল। তাঁর প্রখ্যাত গ্রন্থ Li homme c’est inconnu সহ বেশ কিছু লেখা ফারসী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর লেখা ‘The Fate of Mankind’ এর দু’টো ফারসী সংস্করণ বের হয়েছে। অনুবাদ সুন্দর না হলেও বিষয়বস্তুর দিক থেকে বইটি সুখপাঠ্য। এ ছাড়াও আইনস্টাইন, উইলিয়াম জেমস, বাসালার্ড প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ। এমনকি সাম্প্রতিককালের জাঁ পল সাঁত্রে ও বাট্রান্ড রাসেলের মতো ব্যক্তিবর্গ যাঁদেরকে বিশ্ববাসী ভালোভাবেই জানেন তার চেয়েও অনেক শ্রেষ্ঠতর হচ্ছেন ফরাসী বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও চিন্তাবিদগণ। আরও আছেন ম্যাক্স প্লাংক, জর্জ গারভিচ, প্যাট্রিক ডোনিজ ও ডাঃ জিভাগোর লেখক প্যাস্টারনাক। নব্যশিক্ষিতদের কাতারে এসব মহান ব্যক্তিত্বদের টেনে আনা যাবে না। এঁদের অবস্থান হচ্ছে শীর্ষে। কারণ বিজ্ঞান পূজাকে এঁরা সাধারণতঃ বিরোধিতা করেন। বিগত তিন শতাব্দী ধরে তথাকথিত শিক্ষিতদের পালিত বিজ্ঞান-ধর্মের বিরুদ্ধে এসব শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ কথা বলে এসেছেন।

অবশ্য এ কথাও বলা যাবে না যে, ম্যাক্স প্লাংক ও ক্যারল দু’জনেই হুবহু একই কথা বলেছেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব ও ভিন্ন ভিন্ন মতামত আছে। তা সত্বেও কিছু ব্যাপারে তাঁদের মিলও রয়েছে। আর সেই মিলটাই হবে আমাদের বিবেচ্য বিষয়।

আমরা যদি তাঁদের সেসব অভিন্ন চিন্তাগুলো্কে চিহ্নিত করতে পারি তাহলে দেখবো যে, আজ তাঁদের মধ্যে যে সব সাধারণ প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা মূলতঃ আজকের বুদ্ধিজীবীদের মৌলিক ঝোঁক-প্রবণতায় পরিণতি লাভ করেছে। এবং সেই ঝোঁক-প্রবণতার মূলে রয়েছে বিজ্ঞান পূজার সম্পূর্ণ বিরোধী হয়ে ওঠা। মূলতঃ এ প্রবণতাটাই হচ্ছ আধুনিক বুদ্ধিজীবীদের ধর্ম।

আগামী দিনগুলোতে এ প্রবণতাই অনাগত পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীদের ধর্মে পরিণত হবে। এবং আধুনিক কালের বুদ্ধিজীবীদের এই ঝোঁক-প্রবণতা ক্রমে বিজ্ঞান পূজার স্থলাভিষিক্ত হবে। এ সকল ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একটা সাধারণ ধারণা ব্যতিক্রমহীনভাবে বিদ্যমান, তা হলো আধ্যাত্মিকতার মাঝে ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসকে লালন করা। (দুর্ভাগ্যবশতঃ সময়ের সংক্ষিপ্ততার জন্য তাঁদের প্রত্যেকের উদ্ধৃতি দেয়া গেল না)।

আমরা জানি, ধর্মের প্রতি আইনস্টাইনের একটা গভীর অনুরাগ ছিলো। কিন্তু, আমরা বলেছি, ধর্ম হচ্ছে সাধারণ জনগণের বিশ্বাসের বুনিয়াদ। তাহলে আমরা কি বলতে পারি যে, আইনস্টাইন সাধারণ মানুষের একজন ছিলেন! অথবা তিনি হাইস্কুল পড়ুয়া, কলেজের ডিগ্রীধারী বা আমার মতো একজন পি, এইচ, ডি ওয়ালা নব্য শিক্ষিতদের শ্রেণীভুক্ত ছিলেন! কখনো না। মূলতঃ তিনি ছিলেন ধার্মিক।

এভাবে দেখা যাচ্ছে যে, বিজ্ঞান-পূজা ছাড়াও দুনিয়াতে চিন্তার রাজ্যে একটা নতুন ও মহৎ চিন্তা তরঙ্গের প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা কখনো বলবো না যে, আইনস্টাইনও কেবল সাধারণ মানুষের মতো একই ধরণের ধর্ম-বিশ্বাস পোষণ করেন। বরং আমরা বলতে পারি যে, ‘ধর্ম’ বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের চেয়েও উর্ধ্বে।

মূলতঃ ধর্মের দু’ধরণের অস্তিত্ব বিদ্যমান। একটা ধর্ম ‘কল্পিত কোণ’-এর ভূমিতে অবস্থানরত জ্ঞান-বিজ্ঞানহীন সাধারণ জনগণের দ্বারা আচরিত ধর্ম। আমরা ধর্মের উ’চু স্তরের দিকে এগুলো আমাদের যুগে ‘বৈজ্ঞানিক আস্তিক’ স্তরে উপনীত হবো। এবং এরপর আরোও উপরে meta religion এর অবস্থান। আজকের দুনিয়েতেও এমনটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে।

শিক্ষিতদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। কেউ কেউ একই সঙ্গে শিক্ষিত ও ধার্মিক। কিন্তু তাঁর সেই ধর্মবোধ অত্যন্ত নীচু স্তরের। কারণ, ধর্মকে সেই ব্যক্তি তাঁর প্রয়োজনের অতীত একটা বাড়তি সংযোজন বলে মনে করে। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার যা-ই হোক না কেনো ধর্মকে সে ধরে রেখেছে অত্যন্ত নাজুকভাবে। তাঁর এই ধর্মবোধ সাধারণ জনগণ হতে নেয়া, যা সে গ্রহণ করেছে ও আঁকড়ে ধরেছে। এমনি ধর্মবোধ একেবারেই অস্বাভাবিক ও অবশ্যই পরিত্যাজ্য। আমার ধারণা, সে যদি ধর্মহীন হয়ে যায় তবে সে বিজ্ঞান বহির্ভূত হবে এবং meta science ধর্মের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।

অন্য একজন শিক্ষিত ব্যক্তিকে যদি দেখা যায় যে, তিনিও ধার্মিক; আমরা দেখবো বিজ্ঞানের উর্ধ্বে অবস্থিত একটা ধর্মকে তিনি কিভাবে অনুসরণ করেন। তাঁর সেই ধর্মবোধ সহজেই তাঁর লেখনীতে প্রতিফলিত হবে। এই ধরণের ধর্মবোধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।

যে-ধর্ম বিজ্ঞানের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ তা শিক্ষিতদের চেয়েও নিম্ন স্তরের। কিন্তু যে ধর্ম বিজ্ঞানের ঊর্ধ্বে, বিজ্ঞার যার উচ্চতায় এখনও পৌঁছতে পারেনি তা হচ্ছে এ যুগের চিন্তানায়কদের ধর্ম। তাঁরা শিক্ষিত সম্প্রদায়ের চিন্তা-চেতনার অনেক উর্ধ্বে অবস্থান করছেন। এঁরা হলেন বর্তমান যুগের প্রতিভা।

মাক্স প্লাংক, আইনস্টাইন বা ক্যারোলের কোন বই বা তাঁদের কোন অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে সহসাই আমরা এমন সব কথা বা উদ্ধৃতি লক্ষ্য করি যে-সব কথাগুলো কোরানে উল্লিখিত বাণীর সাথে মিলে যায়। অর্থাৎ তাঁদের কোন কোন কথা কোরানে উল্লিখিত বাণীর সাথে সামঞ্জস্যের ইঙ্গিত বহন করে। আমাদের বর্ণিত এসব ব্যক্তিত্বের অনেকেই বহুযুগের বহু সংকট অতিক্রম করেছিলেন। একটা যুগ গেছে চরম নাস্তিকতার যুগ। তারপর যুগের প্রয়োজনেই এসেছে সংস্কারের যুগ। এবং সবশেষে এসেছে ধর্মবোধের যুগ যে-ধর্ম বিজ্ঞানের চেয়েও উ’চু এবং শ্রেষ্ঠ।

সেসব সুবিদিত ও সুশিক্ষিত মানুষেরা যাঁরা প্রতিটি যুগের সংকটকে অতিক্রম করে বিজ্ঞান পূজার বিরোধিতা করেছিলেন তাঁদের সবাই আজ আমাদের অতি পরিচিত হয়েছেন। তাঁদের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে আধ্যাত্মিকতা, ধর্মীয় অনুভূতি ও পরিবেশের দিকে ফিরে যাওয়া। ধর্ম যেহেতু সাধারণ জনগণের চিন্তা ও বিশ্বাসের বুনিয়াদ সেহেতু তা অপাংক্তেয় এই যুক্তিতে গত তিন শতক ধরে এসব চিন্তাবিদদের অবজ্ঞা ও নিন্দা করা হয়েছে। আজ তাঁরা মোটেই অবজ্ঞার পাত্র নন, অপাংক্তেয়ও নন।

আজ আমাদের নবতর উপলব্ধির সময় এসেছে। এতদিনে ষোল শতকের সেসব বিজ্ঞান-মনস্ক, প্রতিভাধর ব্যক্তিবর্গ ও আজকের শিক্ষিত শ্রেণীর চিন্তা-চেতনার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত তাঁদের বক্তব্যগুলো কোন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। এখনও তাঁদের চিন্তাগুলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গৃহীত ও পরিস্রুত হয়নি। কিন্তু তাঁদের কথাগুলো বা চিন্তার পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধী-সীমার ঊর্ধ্বে স্থান পাবার যোগ্য। এ সব ব্যক্তিবর্গের বাণী বা বক্তব্যগুলো আগামী দিনের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর বিশ্বাস ও চৈতন্যের বুনিয়াদ তৈরী করবে।

সুতরাং সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, আজকের ‘ধর্ম’ হবে সেই ধর্মের কাছে ফিরে যাওয়া যে-ধর্ম ক্রমেই বিজ্ঞানকে অতিক্রম করছে এবং বিজ্ঞানের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত হয়েছে। আজকের যে-বিজ্ঞান পূজা যা সতের শতক থেকে অদ্যাবধি ধর্মবিমুখ ভাবনার দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। সেই বিজ্ঞান পূজা তার অন্তিম পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে কেন? কারণ, আজকের বিশ্বে নবতর চিন্তা-নায়কের আবির্ভাব ঘটেছে। যাঁদের চিন্তা ও চেতনা আধুনিক বিজ্ঞান ভাবনার ঊর্ধ্বে। যাঁদের বৃহৎ চিন্তা, বিশ্বাস, মেধা-মনন দৃঢ়ভাবে মানব জাতির নবতর উপলব্ধির ঘোষণা দিয়েছে। আর তা হলো, সমগ্র বিশ্ব মানবের কল্যাণে বিজ্ঞান-পূজার বিপরীতে ধর্মীয় বিশ্বাসকে উজ্জীবিত করে তোলা।

মাক্স প্লাংক ও কেপলার দু’জনেই ছিলেন পদার্থবিদ। কেপলার সম্বন্ধে প্লাংক বলেছেন, “পণ্ডিত কেপলার জ্ঞানের সামগ্রিকতায় বিশ্বাস করতেন। সৃষ্টির তাবৎ বিষয়ে জ্ঞান লাভের জন্যে গভীর মনোযোগ, সতর্কতা ও সচেতনতার  প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।” অপর একজন পণ্ডিত ব্যক্তির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন- “তাঁকে আমরা একজন ক্ষুদে শিক্ষাণবীশ পণ্ডিত হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। কারণ, বিশ্বের বহুমুখী চিন্তার সামগ্রিকতায় তিনি বিশ্বাস করতেন না। তাঁকে ক্ষুদে পণ্ডিত বলা হচ্ছে এই অর্থে যে, তিনি জ্ঞানের সার্বজনীনতায় বিশ্বাস করতেন না। কেপলার জ্ঞানের সার্বজনীনতায় বিশ্বাস করতেন। আর এ জন্যেই তিনি আধুনিক পদার্থ বিদ্যার স্রষ্টা হতে পেরেছেন।”

এক্ষেত্রে, আইনস্টাইন আরোও স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেছেন, “ধর্মীয় অনুভূতি ও সৃষ্টির গূঢ় রহস্যের উপর বিশ্বাসই হলো যে কোন বৃহৎ গবেষণার চাবিকাঠি”। এই কথাগুলোর জন্য জনগণের গোত্রেও তাঁকে ফেলা যায় না। তবে, আলেক্স কেরল অবশ্যই প্রথম মানব যিনি দু’বার নোবেল শান্তি-পুরস্কার লাভে সমর্থ হয়েছেন। লারইউজ ডিকশ্‌নারীতে তাঁকে একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত-গ্রন্থে তাঁকে বিংশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি আরোও বলেছেন- “যদি সমাজ থেকে স্রষ্টার প্রতি ভক্তের আনুগত্য ও প্রার্থনার নিয়ম তুলে দেয়া হয় তবে তা হবে আমাদের সমাজের জন্যে মৃত্যুর সনদপত্রে স্বাক্ষর করার মতো ভয়ঙ্কর।”

সতের, আঠারো ও ঊনিশ শতকের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা কি কখনও এমন কথা বলতেন? সতের, আঠারো ও ঊনিশ শতকের শিক্ষিত শ্রেণীর বক্তব্য ছিলো- “যদি আমি আমার অস্ত্রোপচারের ছুরির নাগালের মধ্যে খোদাকে দেখতে না পাই তবে আমি তাঁর উপর বিশ্বাস আনতে পারি না।” বিজ্ঞান পূজারীদের ভাবনাই মূলতঃ নাস্তিকতা। কিন্তু, আজ নতুন চিন্তা ও চিন্তা-নায়কদের আবির্ভাব ঘটেছে। যা অপর একজন মনোবিজ্ঞানী বলেছেন অন্যভাবে। তিনি বলেন-“জীবন ধারণের জন্যে মানুষের যেমন অক্সিজেন ও খাদ্যের প্রয়োজন তেমনি খোদার আনুগত্য ও তাঁর নিকট প্রার্থনার প্রয়োজনও অপরিহার্য; কেননা এটাই মানব জাতির নিয়তি। এগুলো মানুষের অকৃত্রিম প্রয়োজন। আমরা যদি এই আনুগত্যের প্রয়োজনকে অস্বীকার করি তাহলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো।”

এবার কেরলের কথায় আসা যাক। তিনি মোটেই ধার্মিক ছিলেন না। চড়ুই পাখীর হৃৎপিন্ড ও হৃৎপিন্ড সংযোজন প্রক্রিয়ার উপর তিনি গবেষণা করেন। আর এ জন্যেই তিনি দু’বার নোবেল শান্তি-পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি বলেন- “শ্বাস-প্রশ্বাস ও খাদ্য গ্রহণের মতোই আমাদের প্রয়োজন রয়েছে খোদার আনুগত্য করার। এমনকি আমাদের দৈহিক, মানসিক, স্নায়বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজনেও তা’র আনুগত্য করা আবশ্যক।” তিনি আরোও বলেছেন- “ধর্মের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থার অভাবেই রোম সভ্যতার পতন হয়েছিলো।”

কথাগুলো আলেক্স কেরলের। তিনি ধার্মিক নন, যাজকও নন। আমাদের ‘কল্পিত কাঠামো’র ভূমি সংলগ্ন সাধারণ ধার্মিক, আস্তিকতায় বিশ্বাস করেন। গার্ভি’চের বক্তব্য হলো, সুদীর্ঘ ঊনিশ শতক-ব্যাপী সমাজবিজ্ঞান ১৯৮ ধরণের সূত্র আবিষ্কার করেছে এবং যে-গুলোতে মানুষ বিশ্বাস স্থাপন এনেছে; কিন্তু বিংশ শতকের সমাজ বিজ্ঞান সেসবের কোনটাতেই আজ আর বিশ্বাস আনতে পারছে না।

প্রখ্যাত ফরাসী গণিতবিদ সোয়ার্জ বলেন, “ঊনিশ শতকের পদার্থ বিজ্ঞানের ধারণা ছিলো প্রতিটি জীবন-সত্য আবিষ্কারে তারা সক্ষম হবেন। এমনকি কবিতায়ও। কিন্তু বিংশ শতকের পদার্থবিজ্ঞান বিশ্বাস করে যে, ‘বস্তু’ কি তা’রা তা-ই জানেন না।”

কেন বিংশ শতকের বিজ্ঞান-ভাবনা হঠাৎ করেই এমন বিনয়ী মূর্তি ধারণ করেছে? কেনই বা ষোল, সতের, আঠারো ও ঊনিশ শতক-ব্যাপী বিরাজমান বিজ্ঞানের দাম্ভিক আস্ফালন বিচূর্ণ হয়ে গেল? কারণ, ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী একটা নতুন যুগের সূচনা হয়ে গেছে। আগামী দিনের শিক্ষিতদের চিন্তা-ভাবনা হবে বর্তমান কালের শিক্ষিতদের বিপরীত। তাঁদের চিন্তাধারা হবে ধর্ম কেন্দ্রিক। তা হবে এমন একটা ধর্ম যা অবশ্যই বিজ্ঞানের চেয়ে নীচু নয় বরং বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক উ’চু ও শ্রেষ্ঠ।

সূত্রঃ আগামী প্রকাশন কর্তৃক প্রকাশিত “আগামী দিনের ইতিহাস” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
ibn taymiyar chintar punorpaat

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার চিন্তার পুনর্পাঠ

রশীদ আল ঘান্নুশী | জানুয়ারী ১৩, ২০১৬
Download PDF

ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে বর্তমানে আগ্রহী কোনো কর্মী, চিন্তাবিদ, সাংবাদিক বা অন্য যে কারো কাছেই ইবনে তাইমিয়া একটি পরিচিত নাম। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু নাম ও কিছু অস্পষ্ট পূর্বানুমান ছাড়া তাঁর সম্পর্কে লোকজনের তেমন জানাশোনা নেই। মৃত্যুর আট শতাধিক বছর পরেও যাকে নিয়ে বিতর্ক চলছে, কে সেই ইবনে তাইমিয়া?

হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী একটি সম্মানিত পরিবারে আহমদ তাকিউদ্দীন ইবনে তাইমিয়ার জন্ম। ৬৬১ হিজরীর (১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দ) ১০ রবিউল আউয়াল তারিখে বর্তমান সিরিয়া ও তুরস্কের মাঝামাঝি অবস্থিত হার্‌রানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সাত বছর বয়স পর্যন্ত তিনি সেখানেই বেড়ে ওঠেন। তারপর মোঙ্গলদের আক্রমণের ফলে পুরো অঞ্চলে ত্রাস ও ধ্বংসলীলা ছড়িয়ে পড়লে তাঁর পরিবার রাতের আঁধারে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। সাথে করে নিয়ে যায় যে কোনো আলেম পরিবারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ – বই।

হার্‌রান ছেড়ে দামেস্কের উদ্দেশ্যে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা অল্পবয়সী ইবনে তাইমিয়ার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর ফলে তাতার দখলদারদের প্রতি তাঁর মনে ধীরে ধীরে তীব্র ঘৃণার জন্ম হয়। পরবর্তীতে তাঁর কলম, জবান ও তরবারী দিয়ে তাতারদের বিরোধিতায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করায় তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাঁর দৃষ্টিতে বিদআত ও ভ্রান্ত আকীদার ফলেই উম্মাহর কার্যকারিতা, জিহাদ ও ইজতিহাদের চেতনা বিনষ্ট হয়েছে। এসব থেকে উম্মাহ্‌কে মুক্ত করার মাধ্যমে তাতারদের প্রতিরোধ করার জন্যে তিনি শাসক ও জনগণকে আহ্বান করেন।

দামেস্কে পৌঁছার পরপরই ইবনে তাইমিয়ার পিতা শাইখ শিহাব উদ্দীন শহরের সমঝদার জ্ঞানী মহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। উমাইয়া মসজিদে দলে দলে লোকজন তাঁর দার্‌সে অংশগ্রহণ করতো। তিনি দারুল হাদীস আল-শুক্কারিয়্যাহ্‌র শাইখ হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। তাঁর পুত্র এই পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন।

তাকিউদ্দীন অল্প বয়সেই কোরআন হিফজ করেন। কোরআনের পাশাপাশি তিনি তাঁর বাবার কাছে হাদীস ও ফিকাহ্‌র পাঠ নেন। এছাড়া অন্যান্য আলেমের অধীনে ভাষাবিজ্ঞান, উসূল এবং দ্বীনি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অধ্যয়ন করেন। তরুণ ইবনে তাইমিয়া শুধু পরিবার থেকে প্রাপ্ত বিষয়সমূহের শিক্ষায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং তিনি গভীরভাবে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, গণিত, বীজগণিত, এবং ধর্মের ইতিহাস অধ্যয়ন করেন। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, তিনি দ্রুত মুখস্ত করতে পারতেন এবং খুব কমই ভুলতেন।

বিশ বছর বয়সের পূর্বেই তিনি ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে উঠেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি দারুল হাদীস আল-শুক্কারিয়ায় হাদীস ও ফিক্‌হের শিক্ষক হিসেবে পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল একুশ বছর। উমাইয়া মসজিদেও তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। সেখানে তিনি তাফসীরের ওপর দার্‌স দিতেন। ১২৯৬ সালে তাঁর শিক্ষক ও মাদ্রাসা আল-হাম্বলিয়ার ফিকাহ শাস্ত্রের অধ্যাপক যাইনুদ্দীন ইবনে মুনাজ্জা মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে তাইমিয়া পরবর্তীতে সে পদে যোগদান করেন।

ইবনে তাইমিয়া উপলব্ধি করেন তাওহীদ হচ্ছে ইসলামের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ফলে হেলেনীয় দর্শন, অজ্ঞেয়বাদ, অবান্তর ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক এবং দার্শনিক মরমিবাদ থেকে ইসলামী চিন্তা ও আকীদাকে মুক্ত করতে তিনি জীবনের বিরাট অংশ ব্যয় করেন। ইসলামী সংস্কৃতির সকল ক্ষেত্রেই এই বিষয়গুলো গভীরভাবে গেড়ে বসেছিল। বিশেষ করে মানুষের ধারণা, বিশ্বজগতে তার অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কিত ধারণাগুলো ‘ওয়াহ্‌দাতুল ওজুদ’ (সর্বেশ্বরবাদী অদ্বৈতবাদ – এতে মনে করা হয় – সবকিছু একই সত্ত্বার নির্যাস) ও ‘হুলুল’ (অবতারবাদ) সংক্রান্ত আকীদা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। ইবনে তাইমিয়া এ সমস্ত আকীদার ব্যাপারে শংকিত হয়ে উঠেছিলেন। এগুলো বিভাজন, সংশয়, কঠোরতা এবং নিষ্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। এগুলো উম্মাহ্‌র ভিত্তিমূলে আঘাত করার মাধ্যমে এর গতিশীলতাকে স্তব্ধ করে দিচ্ছিলো এবং উম্মাহ যে সমস্ত বিপদের সম্মুখীন সেগুলোর ব্যাপারেও অনুভূতিশূন্য করে তুলছিলো।

ইবনে তাইমিয়া ছিলেন সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক। পতনোন্মুখ ঐতিহ্য, ফিক্‌হী তাকলীদ, সমাজবিচ্ছিন্ন বিভিন্ন তরিকা ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার মধ্যে পারস্পরিক শক্তিশালী মৈত্রিতার কারণে জীবদ্দশায় তাঁর সংস্কারচিন্তা সাফল্য ও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা না পেলেও তা বৃথা যায়নি। সমকালীন সংস্কার আন্দোলনে তাঁর কর্মপ্রচেষ্টার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ইবনে তাইমিয়ার তৎপরতা ও পুনর্জাগরণ প্রচেষ্টার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হচ্ছে – একদিকে উম্মাহর বাস্তবতা ও সংকটের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন এবং অন্যদিকে প্রকৃত উৎসের সাথে এ বাস্তবতার সংযোগ পুনঃস্থাপন, পরবর্তীকালে যুক্ত হওয়া বিচ্যুতিগুলো থেকে তাওহীদী আকীদাকে মুক্ত করা, আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষা ও মিশনের প্রতি মানুষের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি এবং ইজতেহাদ ও জিহাদের গুরুত্ব তুলে ধরা।

বর্তমানে কোরআন-হাদীসের আলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যাগুলোর ব্যাখ্যা দেখতে দেখতে অনেকে হয়ত এই সমস্ত ইজতিহাদী মূলনীতিকে স্বাভাবিক ধরে নেয়। এ কারণে তারা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া কিংবা পরবর্তীকালের যেসব সংস্কারবাদীরা এই কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন এবং ইতিহাসের ধ্বংসস্তুপ থেকে বের করে এনেছেন তাঁদেরকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না।

এসব পথপ্রদর্শনমূলক প্রচেষ্টাগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে যেসব তরুণ সচেতন নয়, তাদের জন্যে এটুকু বলাই হয়তো যথেষ্ট হবে – ইজতিহাদ করার অভিযোগে একদল আলেমকে আঠারো শতকের শেষ দিকে দামেস্কে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছিল! যাইহোক, এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সমকালীন সংস্কার আন্দোলনগুলো ইবনে তাইমিয়ার চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা বাহ্যিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। অথচ ইবনে তাইমিয়া বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক সুবিচারের মতো অসাধারণ মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর চিন্তার এই সামাজিক দিকগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংস্কার আন্দোলনগুলোতে অবহেলিত ও প্রান্তিক রয়ে গেছে। আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার, এই মহান আলেমের অনুসারী বলে যারা নিজেদের দাবি করেন, তারা সবাই তাঁর চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন এমনটা মনে করার কারণ নেই।

তিনি নুসুসের সহায়তা ছাড়াই রাজনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে ন্যায়বিচারের মূলনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর ছাত্র ইবনুল কাইয়্যুম আল-জাওযিয়্যাহ্‌ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, রাজনৈতিক তত্ত্ব কোরআন-হাদীস দ্বারা নির্দেশিত হওয়া জরুরি নয়। এটি কোরআন-হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়াটাই যথেষ্ট। ইবনে তাইমিয়া উম্মাহ্‌র অনুমোদনের নীতিকে শাসকের বৈধতার একমাত্র ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। উদাহরণস্বরুপ তিনি ব্যাখ্যা করেন, রাসূলের (সা) ওফাতের পর সংঘটিত আল-সাকীফার চুক্তি কিংবা উমর (রা) কর্তৃক গঠিত ছয় সাহাবীর শুরা কর্তৃক উসমান (রা) এর নিয়োগে অঙ্গীকার বাধ্যতামূলক (বাইয়্যাত) ছিল না বরঞ্চ তা ছিল মনোনয়ন মাত্র। মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও একচেটিয়া বাজার রোধকল্পে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের নীতি এবং রাষ্ট্রের সামাজিক ভূমিকা সক্রিয় করার লক্ষ্যে অন্যান্য প্রক্রিয়াও ইবনে তাইমিয়া প্রতিষ্ঠা করেন।

একজন চিন্তাবিদ যে সময়ে বাস করেছেন, যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন এবং যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও বিষয়াদির সম্মুখীন হয়েছেন সেই আলোকে তার লেখা পাঠ করা উচিত। প্রকৃতপক্ষে এটিই ইসলামের বাণীর বৈশিষ্ট্য। ইসলামের এই চিরন্তন বৈশিষ্ট্যই নতুন পরিস্থিতির আলোকে কোরআন-হাদীসের পুনর্ব্যাখ্যাকারী সংস্কারকদের আবির্ভাবকে অপরিহার্য করে তোলে। সপ্তম ও অষ্টম শতকের সাংস্কৃতিক জীবন ছিল অনেকটা নিম্নরূপ:

সুন্নী মুসলমানদের মধ্যে ফিকাহ সংক্রান্ত বিষয়ে চার মাজহাবের প্রবল তাকলীদ বিদ্যমান ছিল। পূর্ববর্তীদের কাজের ব্যাখ্যা ও সারসংক্ষেপ তৈরি করার মধ্যেই মূলত তৎকালীন ফকীহদের তৎপরতা সীমিত ছিল। এছাড়া ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ মাজহাব থেকে স্বীয় মাজহাবকে রক্ষা করায়ও তারা ব্যস্ত থাকতেন। যখন কোনো শাসক নির্দিষ্ট একটি মাজহাব গ্রহণ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো মাজহাবের আলেমদের প্রশ্রয় দিতেন, তখন মাজহাবগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব আরো বেড়ে যেত। ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছিলেন এবং ইমাম আহমদের প্রতি তাঁর অশেষ শ্রদ্ধা ছিল। তথাপি তিনি ছিলেন একজন স্বাধীন চিন্তাবিদ, যিনি কেবল কোরআন ও হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনা এবং সাহাবী ও তাঁদের উত্তরসূরীদের উদাহরণ দ্বারা অনুপ্রাণিত হতেন। এর ফলে তিনি এমন ইজতিহাদ ও মতামত দিয়েছেন যা শুধু তাঁর নিজের মাজহাব থেকেই ভিন্ন ছিলো না বরং চার মাজহাব থেকেই ভিন্ন ছিলো। তিনি তাকলীদের সীমানা ভাঙ্গার মাধ্যমে অসাধারণ সাহসের পরিচয় দেন। এই সাহসের কারণে তাঁকে অসংখ্য সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাঁকে তাকলীদপন্থী আলেম ও তাঁদের অনুসারীদের আক্রোশের শিকার হতে হয়।

তারবিয়্যাহ্‌র ক্ষেত্রে তাসাউফের প্রভাব ছিল প্রবল। কিন্তু ততদিনে তাসাউফের অংশবিশেষ ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ (অদ্বৈতবাদ), ‘হুলুল’ (অবতারবাদ) এবং ‘জাবরিয়া’ (অদৃষ্টবাদ) আকীদাগুলো দ্বারা আক্রান্ত হয়। ইবনে তাইমিয়া এইসব আকীদা, হালাল-হারামের প্রতি অবহেলা এবং স্বৈরাচারী শাসক ও দখলদারদের জোটবদ্ধতার বিরোধিতা করেন। বৈরাগ্যবাদসহ যে সমস্ত বিদআত তাসাউফের ভেতর অনুপ্রবেশ করেছিল তিনি সেগুলোর বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, দারিদ্র্য ও দুর্বলতাকে মহিমান্বিত করা ইসলামবিরুদ্ধ এইসব আকীদা খ্রিষ্টধর্ম (যে ধর্ম নিজেই গ্রিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত) থেকে আমদানি করা হয়েছে। বিভিন্ন মাজহাব ও তাসাউফের মধ্যে বিভাজন সমাজকে আরো বেশি বিভক্ত করে। বিশেষ করে, কারো কারো প্রতি রাষ্ট্রের সমর্থনের ফলে ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে আসীন যাজকতন্ত্রের মতোই একটি শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে। এই বিচ্যুতিগুলো ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে ইসলামকে একটি আচারসর্বস্ব অদৃষ্টবাদী বৈরাগ্যবাদে পরিণত করে।

তাসাউফের প্রতি তাঁর তীব্র সমালোচনার ফলে এর প্রতি তাঁর বিরোধিতা সম্পর্কে সৃষ্ট ধারণা সত্ত্বেও বলা চলে তিনি তাসাউফের ব্যাপারে তাঁর মতামতগুলো সরলীকরণ করেননি। বরং তিনি তাসাউফের বিশুদ্ধ ও বিচ্যুত ধারার মধ্যে পার্থক্য করেছেন মাত্র। তিনি প্রায়ই আল জোনাইদ ও আল কায়লানীর মতো তাসাউফের প্রথম দিককার শায়েখদের প্রশংসা করতেন। আর আল হাল্লাজ, ইবনে ‘আরাবী, ইবনে সাবঈন, আন নাকাবী ও অন্যান্যদের দার্শনিক মরমিবাদের সমালোচনা করতেন। তিনি সুন্নাহ্‌র সাথে সাংঘর্ষিক আচারসমূহের সমালোচনা করতেন। তাতার, ক্রুসেডার ও স্বৈরাচারী শাসকদের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার বিরোধিতা করেছেন। হাম্বলী সুফী আব্দুল কাদির জিলানীর নামানুসারে গড়ে ওঠা কাদেরিয়া সুফী তরীকার সাথে ইবনে তাইমিয়া সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন। এমনকি আব্দুল কাদির জিলানীর রচিত “ফুতুহ্‌  আল-গায়েব” বইয়ের অংশবিশেষের ব্যাখ্যা হিসেবে ইবনে তাইমিয়া “শরহে ফুতুহ্‌ আল-গায়েব” নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেন।

এভাবে তৎকালীন পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জসমূহ ইবনে তাইমিয়ার কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে যেমন জড়িয়ে আছে, তেমনি তাঁর কাজকে প্রভাবিতও করেছে। তাঁর লেখালেখিগুলো তাঁর গভীর জ্ঞান ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবে আমাদের সামনে রয়েছে। তিনি তাঁর লেখালেখিতে তৎকালীন সংস্কৃতিকে বুঝা ও একে শরয়ী মানদণ্ডে বিচার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ওহী (মানকুল) ও যুক্তিবোধ (মা’কুল) উভয়কেই তিনি শরয়ী মানদণ্ডের অংশ মনে করতেন। আল্লাহ, রাসূল (সা) ও সালফে সালেহীনদের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং তীক্ষ্ণ মননের সমন্বয়ে তিনি এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করেন।

ইবনে তাইমিয়া মনে করতেন, উম্মাহ্‌ তার প্রকৃত বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। তিনিসহ অন্যান্য সংস্কারকগণ উম্মাহ্‌র পতন, পশ্চাৎপদতা ও অন্য জাতির অধীনস্ত হওয়ার প্রকৃত কারণ হিসেবে উম্মাহ্‌ ও ইসলামের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্বকে চিহ্নিত করেন। ইমাম মালিকের বক্তব্যের মূলনীতির আলোকে তিনি একটি সামগ্রিক সংস্কার প্রচেষ্টা শুরু করেন। ইমাম মালিক বলেছিলেন: “এই উম্মাহ্‌র পরবর্তী প্রজন্মগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ঐ পদ্ধতি অবলম্বন করবে, যা প্রথম প্রজন্মকে সফল করেছিল।”

ইবনে তাইমিয়া সালাফদের অনুসৃত পদ্ধতির আলোকে ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিকদের পদ্ধতির বিরোধিতা করেন। এ পদ্ধতি শরীয়াহ্‌কে মনন দ্বারা বিচারের স্থলে শরীয়াহ্‌ দ্বারাই বিচারের নীতি ধারণ করতো, এই অনুমানের ভিত্তিতে যে এই দুয়ের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো ধরণের সংঘাত নেই। তিনি আলেমদের কঠোরতা অবলম্বনের নীতিরও বিরোধিতা করেন। এ লক্ষ্যে তিনি ইজতিহাদের ডাক দেন এবং মতবিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো কোরআন-সুন্নাহ্‌র আলোকে বিবেচনা করার আহবান জানান। সালাফদের আকীদার দিকে আহবানের মাধ্যমে তিনি ‘হুলুল’ ও ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ আকীদার বিরোধিতা করেন। তাকওয়া ও জিহাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নবুয়তী তারবিয়্যাহ্‌র দিকে আহবানের মাধ্যমে ভ্রান্ত আকীদাগুলোর তারবিয়্যাহ্‌ ও সুলুকের বিরোধিতা করেন। তিনি শাসকদের স্বৈরাচারিতা এবং সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্বের প্রতি অবহেলার বিরোধিতা করেন। তিনি এমন একটি সরকার ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন যা শাসক ও শাসিতের পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। এই ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দরিদ্রদের সুরক্ষা প্রদান, বণ্টন ও মূল্য নির্ধারণে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাসহ জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। ‘আল-হিসবা’ বইয়ে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন।

উপরোক্ত বক্তব্য সত্ত্বেও ইবনে তাইমিয়া বিভক্তির দিকে ডাকেননি। তিনি শাসক, আলেম ও জনগণসহ সমস্ত উম্মাহ্‌কে পুনর্জাগরিত ও পুনুরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি কেবল বক্তব্য দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বাস্তবেও অনেক কিছু করেছেন। তিনি প্রায়ই জনগণের অভিযোগ ও দাবি নিয়ে সরাসরি শাসকদের কাছে চলে যেতেন। তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছেন। এমনকি যুদ্ধবন্দীদের সংকট নিরসনে রাজনৈতিকভাবে ভূমিকা রেখেছেন।

তাঁর মতো মহান সংস্কারককে বুঝতে হলে তৎকালীন বাহ্যিক সামরিক ও সভ্যতার চ্যালেঞ্জসমূহ এবং অভ্যন্তরীণ সংকটগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে। এই বহুবিধ সংকট উম্মাহ্‌কে একটি আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছিল। এর ফলে পারস্পরিক সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে উম্মাহ্‌ নিজস্ব স্বতন্ত্র চরিত্রের সন্ধানে অধিক জোর দিয়েছিল। এই জায়গা থেকে দেখলে এটি স্পষ্ট হয়, ইবনে তাইমিয়ার কর্মপ্রচেষ্টা ছিল তাঁর সময়ের চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকারের ব্যাপারে একটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া।

যাইহোক, তিনি এমন একটি সময়ে কাজ শুরু করেছিলেন যখন উম্মাহ গভীর পতনের সম্মুখীন। ফলে তাঁর আহবান তাদের সুখনিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটায়। তাঁর আহবানকে বিবেচনায় নেয়ার পরিবর্তে উম্মাহ্‌র নেতৃবৃন্দ একে স্তব্ধ করে দিতে উঠেপড়ে লাগে। তিনি একের পর এক বিচারের সম্মুখীন হন। প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তি ইবনে তাইমিয়াকে নয়, বরং যে রেনেসাঁর আহ্বান তিনি জানাচ্ছিলেন তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল। এবং এর বিচারক কোনো মালিকী অথবা শাফিয়ী আলেম ছিলেন না বরং এর বিচারক ছিল তৎকালীন যুগের পতনাবস্থা। শাফেয়ী মাজহাবভুক্ত তাঁর শিষ্য আল-বিরজালী, আয-যাহাবী, ইবনে কাসীর এবং হাম্বলী মাজহাবভুক্ত জীবনীকার ইবনে রজব ইবনে তাইমিয়ার জীবনের এই কঠিন পরীক্ষাগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তবে তাঁর নিজের মতে, বন্দীজীবন ছিল তাঁর জন্যে রহমতস্বরূপ, যা ইলমের সাথে আমলের সম্মান এবং ইজতিহাদের সাথে জিহাদের মুকুটে তাঁকে সজ্জিত করেছে।

জীবনীকারগণ ইবনে তাইমিয়ার বন্দীজীবনের বেশ কিছু বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, যা তাঁর ঐ সময়ের মানসিক অবস্থার পরিচয় দেয়। যেমন: “আমার শত্রুরা আমার কিই-বা করতে পারে? আমার জান্নাত তো আমার অন্তরে, আমি যেখানেই যাই তা আমার সাথেই থাকে; একে আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কারাগার হলো আমার জন্য নির্জন আশ্রয়; মৃত্যুদণ্ড হলো শাহাদাতের সুযোগ এবং নির্বাসন হলো ভ্রমণের সুযোগ।”

ইবনে তাইমিয়ার মৃত্যুর তিন মাস আগে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আল-ইখনা’য়ী সুলতানের কাছে নালিশ করেন। এই ব্যক্তির যুক্তি খণ্ডন করে একবার ইবনে তাইমিয়া একটি লেখা লিখেছিলেন। আল-ইখনা’য়ীর নালিশের প্রেক্ষিতে ইবনে তাইমিয়াকে কারাগারে লেখালেখি করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার আদেশ দেয়া হয়। ফলে তাঁর কাগজ, কালি ও কলম ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ৭২৮ হিজরীর ২০ জিলকদ (২৬ সেপ্টেম্বর, ১৩২৮) ইবনে তাইমিয়া ৬৫ বছর বয়সে জেলখানায় মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে কাসীরের মতে, ৬০ হাজার থেকে ১ লক্ষ লোক তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিল। এর মাঝে ১৫ হাজার ছিলেন নারী।

আল হাফিজ আল মিজ্জী বলেছেন, “আমি তাঁর মতো আর কাউকে দেখিনি, তিনিও তাঁর মতো কাউকে দেখেননি। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সা) সুন্নাহর ব্যাপারে তাঁর মতো জ্ঞানী ও পাবন্দী আর কাউকে আমি দেখিনি।”

সূত্রঃ Ibn Taymiyyah: Misunderstood Genius

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather