All posts by আবুল হাসান আলী নদভী

বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী। উপমহাদেশের গণ্ডী পেরিয়ে যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল আরব বিশ্বেও। তিনি ১৯১৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। উর্দু এবং হিন্দি উভয় ভাষাতেই তাঁর হাত ছিল সিদ্ধহস্ত। তিনি দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামার প্রাক্তন রেক্টর এবং পাশাপাশি রাবেতা মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি রাবেতা ফিকাহ কাউন্সিলের সদস্য এবং মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। ইসলামের সেবার জন্য ১৯৮০ সালে তিনি মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মাননা বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কার লাভ করেন। বর্তমান সময়ের স্বনামধন্য ইসলামী চিন্তাবিদ তারিক রমাদানের পিতা সাঈদ রমাদান (হাসান আল-বান্নার জামাতা) এর সাথেও সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর উষ্ণ ও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল যা তারিক রমাদানের Islam, The West & The Challenges of Modernity বইটির ভূমিকায় আলোচিত হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক জগত ছাড়িয়ে তিনি মাঠ পর্যায়েও ছিলেন সদা তৎপর একজন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। মুসলিম সমাজে তো বটেই অমুসলিমদের কাছেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। ১৯৯৯ সনের ৩১শে ডিসেম্বর এই মহান মনীষী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু মুসলিম ভারতের এক ইতিহাসের সমাপ্তি এবং অদূর ভবিষ্যতেও এ শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়।
iqbal o adhunik sikka

ইকবাল ও আধুনিক শিক্ষা

আবুল হাসান আলী নদভী | জুন ১৭, ২০১৫
Download PDF

আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ইকবাল কিছু ত্রুটি লক্ষ্য করে সে-সব দোষত্রুটির গঠনমূলক সমালোচনা করেন এবং যাঁরা শিক্ষা-পদ্ধতিতে বিশেষজ্ঞ তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সে সবের দিকে।

‘স্কুল’, ‘সেমিনারি’ (ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গন) ‘শিক্ষার্থী’ দ্বারা ইকবাল সাধারণত পাশ্চাত্য বা পাশ্চাত্য প্রভাবাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সে ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষা-ব্যবস্থা তরুণদের জন্যে অভিশাপতুল্য, এ ব্যবস্থা তাদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে। মাদ্রাসা আর খানকার প্রতিও তিনি অনুকূল মনোভাব পোষণ করতেন না; কারণ, এর শিক্ষায়তনে জীবনের প্রতি আগ্রহ ও প্রেমের উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় না, হয় না জ্ঞান আর আদর্শবাদের পরিপোষণ।

‘মাদ্রাসা আর খানকাহ থেকে হতাশা নিয়ে গাত্রোত্থান করলাম,
কারণ সেখানে জীবনের অগ্রগতি সাধিত হয় না, হয় না প্রেম,
জ্ঞান বা দৃষ্টি শক্তির পরিপোষণ।’

তিনি একইভাবে স্কুলের দেউলেত্ব আর সন্ন্যাসী-আলয়ের অন্তঃসারশূন্যতার প্রতি বিরাগ প্রকাশ করেনঃ

‘মাদ্রাসার বিদ্যার্থীরা অজ্ঞ আর কৌতূহলহীন,
খানকাহ্‌র সংসার-বিরাগীরা গভীরতাহীন আর উচ্চাকাঙক্ষা-বিবর্জিত,’

ইকবাল দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, আধুনিক শিক্ষা অমলঙ্গকর; কারণ, এ শিক্ষা তরুণদের সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে। এর ফলে যুবকদের মধ্যে চারিত্র্যিক সংকট দেখা দিয়েছে। ভারসাম্যহীন শিক্ষার ফলে তরুণরা পরিবেশের সংগে, প্রতিবেশের বাস্তব পরিস্থিতির সংগে নিজেকে খাপ খাওয়াতে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে। সর্বত্রই যে তরুণরা উচ্ছৃঙ্খল ও অস্থির, তার কারণ ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা-বিষয়ক পরিকল্পনাজাত আবেগ সংক্রান্ত ভারসাম্যের অভাব। তাদের অন্তর্নিহিত সত্তা ও দৃশ্যমান সত্তার মধ্যে একটা গভীর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দেহ আর মনের, জ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যে অতল ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। পরিণামে তারা অর্জন করেছে দ্বিধা-বিভক্ত ব্যক্তিসত্তা (split personality).

আজকের দিনের তরুণদের মন বুদ্ধিদীপ্ত ও আলোকচ্ছটাময়, কিন্তু তাদের আত্মা অমানিশার অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তরুণদের মানসিক বিকাশ আর আত্মিক অপকর্ষ উভয়ই ঘটে যুগপৎভাবে। তরুণদের সম্পর্কে ইকবালের ধারণা ছিল সুস্পষ্ট। তাই তিনি তাদের সম্বন্ধে যে সব উক্তি করেছেন আর মত প্রকাশ করেছেন তা কল্পনাপ্রসূলত নয়, একান্তই বাস্তবভিত্তিক। তিনি দুঃখ করে বলেন যে, তরুণদের পানপাত্র শূণ্য, আর তাদের আত্মা দীপ্ত ও প্রাণবন্ত মনে হলেও তা তৃষাতুর। তাদের অন্তর আলোকোজ্জ্বল কিন্তু ভালমন্দের পার্থক্য নির্ণয় ও প্রকৃত উপলব্ধির ক্ষেত্রে অক্ষম। হাল জামানার তরুণদের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দ্বিধা, অনিশ্চয়তা ও নৈরাশ্যগ্রস্ততা আর তাদের অদৃষ্ট হচ্ছে ব্যর্থতা। তরুণদের মধ্যে তারুণ্য নেই, তারা সচল মৃতদেহ। তারা নিজ পরিচয়কে অস্বীকার করে, কিন্তু অন্যের উপর আস্থা স্থাপন করতে সদা প্রস্তুত। পরদেশী আর আগন্তুকরা ইসলামী ভাবধারা নিয়ে গীর্জা আর মন্দির নির্মাণ করছে। পানশালার দ্বারপ্রান্তে মুসলিম তরুণদের শক্তি অপচয়ে নিঃশেষ হচ্ছে। তারা অলস, নিস্ক্রিয় আর আরামপ্রিয় হয়ে পড়েছে। তাদের অনাসক্তি, জড়তা আর নির্বীর্যতা এমনই অসীম যে, অন্তর-মাঝে তারা আকাঙক্ষার স্পন্দনটুকুও অনুভব করে না। আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থা তাদের আত্মাকে ভোঁতা আর বস্তুত প্রাণহীন করে দিয়েছে।

মুসলিম তরুণদের মধ্যে আত্ম-শক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতা আর তাদের অদৃষ্টের প্রতি ঔদাসীন্য ব্যাপক। পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবে মুসলিম তরুণ ক্ষুদে দু’চার টুকরো রুটির বিনিময়ে তার সত্তা বিসর্জন করতে প্রস্তুত। তরুণদের যাঁরা পরামর্শদাতা তাঁরা তাদের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত তাদের (তরুণদের) মহত্ব ও গৌরব অর্জনের গূঢ় তত্ত্ব শেখাতে আগ্রহহীন। তাঁরা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর আনন্দ ও তৌহিদের (আল্লাহ্‌র একত্ববাদের) শক্তি সম্পর্কে অজ্ঞ। তাঁরা পাশ্চাত্য জগৎ থেকে বিগ্রহ ধার করতে মর্মপীড়া বোধ করেন না। হরমের (কাবার) সন্তানরা ‘কলংকের পথে’ তীর্থযাত্রা করতে ও রূক্ষতার পায়ে কপাল ছোঁয়াতে উৎসাহহীন নন। বিন্দুমাত্র রক্তপাত না ঘটিয়ে পাশ্চাত্য জগৎ তাদের হত্যা করেছে। বুদ্ধি তাঁদের উদ্ধত, হৃদয় মৃত আর দৃষ্টি নির্লজ্জ। নিষ্ঠুরতম আঘাত আর সর্বনাশও তাদের অন্তরে কোন রেখাপাত করে না। তাঁদের জ্ঞান আর শিক্ষা, বিশ্বাস আর রাজনীতি, চিন্তা আর আবেগ- সব কিছুই প্রেরণা লাভ করে বস্তুবাদের কাছ থেকে। তাদের হৃদয়ে কামনার ঢেউ জাগে না, মন তাদের উন্নত চিন্তা-ভাবনা-বিবর্জিত আর তাদের গোটা অস্তিত্বের উপর চেপে বসেছে স্নায়বিক দুর্বলতা আর নিশ্চলতা।

স্কুলে আজকাল খোঁদাই করে যে মূর্তিগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে
তাদের অঙ্গে না আছে আযরের পরশ না আছে সৌন্দর্য।’
বিদ্যালয়ে যাঁরা শিক্ষা দেন তাঁদের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ এইঃ
‘ঈগল-শাবকদের তাঁরা জাগতিক বিষয়াদির পাঠ দান করেন।’
‘ধর্মীয় শিক্ষার বিদ্যালয় তোমার শ্বাস রোধ করেছে,
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র ধ্বনি আসবে কোত্থেকে?’
‘মাদ্রাসায় কি চিন্তার সৌন্দর্য আছে?
খানকায় কি বর্তমান আছে রহস্যের আনন্দ?’
‘ঈমানের সুরা থেকে জীবনের ঊষ্ণতার উৎসারণ,
হে প্রভু, ধর্মীয় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে এ তরল অগ্নি দান কর।”
‘এই কি আধুনিক দুনিয়ার গোটা ভাগ্য-
আলোকোজ্জ্বল মন, অন্ধকারাচ্ছন্ন অন্তঃকরণ, অতিনিকৃষ্ট আঁখি?’
‘হায়! তপ্ত শোনিত প্রবাহিত হচ্ছে স্কুলের যে তরুণের শিরায়
সেই কি-না পশ্চিমের ইন্দ্রজালের অসহায় শিকার!
তরুণরা তৃষ্ণার্ত, পেয়ালা তাদের শূন্য,
তাদের মুখমন্ডল মার্জিত, আত্মা অন্ধকার, বৃদ্ধিবৃত্তি দীপ্ত।’
‘দৃষ্টিহীন, বিশ্বাস-বিহীন, আশাহারা
তরুণের দৃষ্টি বিশ্বে কিছু দেখতে পায় না।

এ অবস্থা সত্ত্বেও ইকবাল হতাশ-বিমর্ষ হননি। তরুণদের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা, আর তাঁর কবিতায় তাদের জন্য আশা আর উৎসাহের বাণী অভিব্যক্তঃ

‘আমি সেই সব তরুণদের প্রতি আসক্ত
যারা ফাঁদ পাতে নক্ষত্র ধরতে।
‘প্রভাতে আমার হৃদয়ে যে হা-হুতাশ তা দান কর তরুণদের অন্তরে!’
ঈগল-শাবকদের পুনরায় পালক আর পাখা দান কর!
হে প্রভু! আমার একটি মাত্র কামনা আছে-
প্রত্যেককে আমার দূরদৃষ্টি এনায়েত কর।’

এই আশা আর প্রত্যাশার এক ঝলক দেখা যায় তাঁর ‘খিতাব বা জওয়ানাঁ’-ই-ইসলাম’ (ইসলামের তরুণদের উদ্দেশ্যে ভাষণ) ও অন্যান্য ক’টি কবিতায়। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্বজ্জনদের উদ্দেশে তাঁর বাণীতে নীচের পংক্তি দুটো বর্তমানঃ

‘আরবের গৌরবের উৎস হরমের প্রচন্ড আবেগ’
তার স্থান ভিন্নতর, তার কানুন অনন্য।”

‘এক নওজোয়ান কি নাম’ (এক তরুণের উদ্দেশ্যে) কবিতায়ও তাঁর চিন্তা-ভাবনা আর আবেগের প্রকাশ প্রত্যক্ষ করা যায়ঃ

“তোমার সোফা ইউরোপের, তোমার গালিচা ইরানের-
তরুণদের মধ্যে যখন আমি এ সব বিলাসিতা
প্রত্যক্ষ করি তখন অশ্রু হয়ে ঝরে আমার রুধির।
পদ আর পদবির কী মূল্য, খসরুর জাঁক-জমকেরই বা কী দাম
যখন হায়দারের মতো বীরদর্পে বিশ্বের মোকাবিলা কর না,
বা সালমানের মত জগৎকে তুচ্ছজ্ঞানে কর না ত্যাগ,
চাকচিক্যময় আধুনিক বিশ্বে যে তুষ্টি খূঁজে পাওয়া যায় না,
তা হচ্ছে অকৃত্রিম ঈমানদারের গৌরব, তার সেই বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত।
তরুণদের অন্তরে যখন ঈগলের উদ্যম জাগ্রত হয়
তখন তার মঞ্জিল দৃশ্যমান হয়ে ওঠে সুদূর আকাশে!
আশা ছেড়ো না! হতাশায় মন আর আত্মার পতন,
প্রকৃত বিশ্বাসীর আশা-আকাঙক্ষা বিরাজ করে আল্লাহ পাকের অন্তরঙ্গ জনদের মাঝে।
রাজা-বাদশাহদের প্রাসাদ তোমার বিশ্রামস্থল নয়,
তুমি রাজপাখি, তোমার বাসা নির্মাণ কর পর্বত-শিখরে।’

ইসলামের পরিবর্তে ভিনদেশী ধ্যান-ধারণা দ্বারা মুসলিম যুবকদের প্রভাবিত দেখলে ইকবাল অত্যন্ত ব্যথিত হতেন। তাঁর ‘ফালসাফা-জাদা সৈয়দ-জাদা কেনাম’ (দর্শনা-ক্রান্ত সৈয়দ-নন্দনের উদ্দেশ্যে) কবিতায় তিনি লিখেছেনঃ

‘তুমি যদি তোমার ব্যক্তিত্ব না হারাতে
তবে কেসিঁ-এর দাস হতে না;
বুদ্ধির শেষ অনুপস্থিতি
দর্শনজীবন থেকে অপসারণ।
চিন্তার নিঃশব্দ সুরমালা হচ্ছে
কর্ম-প্রেমের জন্য মৃত্যু।
ঈমান দ্বারা জীবন-পথ সংরক্ষিত হয়,
ঈমান হচ্ছে মুহাম্মদ ও ইবরাহীমের গূঢ়তত্ত্ব।
মুহাম্মদের শিক্ষামালাকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখ,
তুমি আলীর পুত্র, বু-আলি (আবু সিনা) থেকে দূরে থাকো।
তোমার ভেদাভেদ লক্ষ্য করার দৃষ্টি নেই।
তাই বোখারার নেতা থেকে কুরাইশ নেতা উৎকৃষ্টতর।’

ইকবাল আধুনিক শিক্ষাকে মুসলমানদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতনের জন্যে দায়ী বলে গণ্য করেন। তিনি বলেন যে, উদীয়মান তরুণদের অন্তরে উষ্ণতা ও ধর্মানুরাগ নেই। তরুণদের জবানে ধার আছে কিন্তু তাদের চোখে অনুতাপের অশ্রু বা অন্তরে আল্লাহ্-ভীরুতা নেই।

‘পাশ্চাত্যের সুরমা মাখা চোখে ঔজ্জ্বল্য আছে।
সে চোখ আকর্ষণ করে, বাগ্ময়, কিন্তু সিক্ত নয়।’

তিনি আধুনিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে এ অবস্থার জন্যে সম্পূর্ণ দায়ী বলে গণ্য করেন। অমঙ্গলের অন্য একটি উৎস হচ্ছে মাত্রাতিরিক্তি যুক্তিবাদ বা প্রতি পদক্ষেপে লাভ আর সুবিধার যুক্তি উপস্থাপন করে আত্মার তেজ-বীর্যকে অসাড় করে দেয়।

নৈতিক ও বুদ্ধিগত অবক্ষয়ের আরও একটি কারণ হচ্ছে অপরিমিত বস্তুবাদ ও পার্থিব উপায়-উপকরণের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ও শিক্ষাকে চাকরি-প্রাপ্তি ও পদ-পদবি লাভের উপায় হিসেবে গণ্য করার দুঃখজনক অভ্যাস।

‘হে সুদূর আকাশ বিহারী-বিহঙ্গ, মৃত্যু শ্রেয়ঃ সে রুজির চেয়ে
যে রুজি ছেটে দেয় পক্ষ আর ব্যাহত করে উড্ডয়ন।’

আধুনিক শিক্ষার প্রধান ত্রুটি হচ্ছে এই যে, এ শিক্ষা ‘মা’আদ’ (ভবিষ্যত)-এর পরিবর্তে ‘মা’আশ’ (জড় জীবন) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ শিক্ষা বুলবুলের কণ্ঠ থেকে গান ও তার সৌন্দর্যের বিশিষ্ট প্রকৃতি কেড়ে নেয়। এ শিক্ষা রুটির ব্যবস্থা করে না, তবু কেড়ে নেয় আত্মা।

‘এটা বুলবুলির বক্ষ থেকে অপহরণ করেছিল সংগীত,
আর অপহরণ করেছিল ঢিউলিপের রক্তের আগুন;
তুমি গর্বিত যে বিদ্যালয় আর শিক্ষা নিয়ে
তা তোমায় দেয়নি রুটি, তবু ছিনিয়ে নিয়েছে জীবন।’

ইকবাল আধুনিক শিক্ষার ক্ষতিকর চরিত্রকে সর্বসমক্ষে ফাঁস করে দিয়েছেন আর নির্ভুলভাবে দুর্বল স্থানগুলোর প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। এই শিক্ষার কল্যাণে মানব জাতি যা কিছু লাভ করেছে তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে রুটি-রুজি লাভের উপায়ের উপর অত্যধিক গুরুত্ব, অসংগত সুবিধাবাদ, কৃত্রিম কৃষ্টি আর অনুকরণমূলক জীবন-যাপনরীতি।

“আধুনিক যুগ হচ্ছে তোমার মৃত্যুদূত,
রেজেকের ধান্দ্বায় তুমি আত্মা থেকে বঞ্চিত;
তোমার শিক্ষা তোমাকে উন্নত আবেগ থেকে করেছে বিচ্ছিন্ন;
যে আবেগ মনকে পলায়ন প্রচেষ্টা থেকে রাখত বিরত
প্রকৃতি তোমাকে দিয়েছিল বাজপক্ষীর শ্যেনদৃষ্টি,
দাসত্ব তোমার অক্ষিকোঠরদ্বয়ে রেনে’র আঁখি ঢুকিয়ে দিচ্ছে,
স্কুল তাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে গূঢ় তত্ত্বগুলো
যা পাহাড়ে আর মরু-প্রান্তরের রয়েছে উন্মুক্ত।”

আধুনিক শিক্ষার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগঃ এ শিক্ষা আরাম-আয়েশপরায়ণতা, ঔদাসীন্য ও নিস্ক্রিয়তা সৃষ্টি করে জীবনকে, সমুদ্রকে বদ্ধ ডোবায় পরিণত করে। শিক্ষার্থীর জন্যে ইকবালের প্রার্থনা হচ্ছেঃ

‘আল্লাহ তোমাকে ঝড়-ঝঞ্চার সাথে পরিচয় করিয়ে দিন,
তোমার সাগরের পানি স্রোতহীন আর নিস্তরঙ্গ’।

আধুনিক শিক্ষা-পরিকল্পনা প্রাচ্যে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। এ শিক্ষা নির্বিচারে পাশ্চাত্যের আচার-আচরণ, রীতি-নীতি ও ভাবাদর্শ অনুকরণের প্রেরণা যোগায়, আর উপনিবেশবাদের পথকে করে প্রশস্ত, প্রাচ্যের জনসাধারণের উপর চাপিয়ে দেয় পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি, আর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ছদ্মাবরণে সৃষ্টি করে নতুন নতুন সমস্যা। যুগ-যুগ ধরে প্রচলিত প্রাচ্যের মূল্যবোধ আর ঐতিহ্যকে অবমূল্যায়ণের মাধ্যমে এমন এক সমাজ সৃষ্টি করার প্রয়াস পায় যে সমাজ, মেকলের ভাষায়, নামে আর জন্মগতভাবে প্রাচ্যের কিন্তু অন্তরবস্তুতে ও বাস্তবে পাশ্চাত্যের।

পশ্চিম দেশীয় শিক্ষা-বিষয়ক পরিকল্পনার মূলে রয়েছে নাস্তিক্যবাদ, অথবা ন্যূনপক্ষে এর ধারণা জন্ম লাভ করেছে মানসিক অস্থিরতা ও বুদ্ধিগত নৈরাজ্যবাদে; সেই কারণেই এই শিক্ষা একই ব্যাধি আর অসম্ভব ভাবের প্রবেশ ঘটায় তরুণদের অন্তরে, যুক্তিবাদ আর মুক্ত-চিন্তার ছদ্মাবরণে সৃষ্টি করে সংশয়বাদ, অসন্তোষ আর বিশৃংখলা। ইকবালের মতে, বিকৃত দৃষ্টির চেয়ে দৃষ্টিহীনতা ভাল, আর অজ্ঞতা ভাল পাণ্ডিত্যপূর্ণ ধর্মহীনতা থেকে।

“আমার কাছ থেকে জেনে নাওঃ অন্ধ
শ্রেয়ঃ যার দৃষ্টি বক্র তার চেয়ে;
আমার কথা বিশ্বাস কর যে সৎকর্মে নিযুক্ত স্থূলবুদ্ধি ব্যক্তি
ভাল সেই বিজ্ঞের চেয়ে যে আল্লাহর অস্তিত্ব করে অস্বীকার।”

যে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি মানুষকে মহাশূন্য জয়ে ও বায়মুন্ডলে উড়ে চলার সামর্থ্য দান করতে পারে, কিন্তু উলটে ফেলে দেয় আর আধ্যাত্মিক নোঙ্গর-ঘাট থেকে বিচ্যুত করে তার উপকারিতা সম্পর্কে ইকবালের সন্দেহ বার বার উচ্চারিত হয়েছেঃ

‘কি উপযোগিতা আকাশ পরিমাপকারী বুদ্ধির
যে বুদ্ধি নক্ষত্ররাজি আর গ্রহমন্ডলকে প্রদক্ষিণ করে
আর হাওয়ার কাঁধে ভর করে ভাসমান মেঘখন্ডের মত
উদ্দেশ্যহীনভাবে নিঃস্বীম বায়ুমন্ডলে ভেসে বেড়ায়?’

মানুষ যদিও ‘সৃষ্টির মহাসমুদ্রে আকাঙ্ক্ষিত মুক্তো’ আর ‘অস্তিত্বের শস্য-ক্ষেত থেকে সংগৃহীত ফসল’, তবু আধুনিক শিক্ষা যন্ত্র, উৎপাদন-শিল্প ও বস্তুগত অগ্রগতির অন্যান্য নিদর্শনের তুলনায় তার মূল্য হ্রাস করতে সচেষ্ট। ইকবালের মতে, দুনিয়া মানুষের তাবেদার হওয়া বিধেয়, মানুষের দুনিয়ার কাছে তাবেদার হওয়ার নয়।

“নামিয়ে রেখো না আকাঙক্ষার দীপ তোমার কর্‌ থেকে,
কামনা আর পরমানন্দের দশা অর্জন কর,
হারিওনা স্বীয় আত্মা দুনিয়ার চৌরাস্তায়,
বিনাশ কর চৌরাস্তা, আর ফিরে এসো নিজের কাছে।”
“দুটো জগৎকেই টেনে নাও নিজের কাছে
ভেগো না নিজ অস্তিত্বের কাছ থেকে;

প্রত্যক্ষ করো না তোমার বর্তমানকে অতীতের আলোকে,
আজকে গতকাল থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না কেউ”
“তোমার তো কোন সামঞ্জস্য নেই আল্লাহর (অনুগত) মানুষের সঙ্গে,
তিনি বিশ্বচরাচরের কর্তা, তুমি দাসানুদাস,
তোমার মাঝে নেই সৈকতেরও অন্বেষা,
তিনি নিজের মাঝে ধারণ করেন মহাসমুদ্রের কেন্দ্রস্থল।”

অলৌকিক অনুগ্রহ আর ঐশী প্রত্যাদেশ (ওহী) ছাড়া মানবের উপলব্ধি থাকে অসম্পূর্ণ। পরিপক্বতা লাভের পূর্বে তাকে মুক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত করার অর্থ হচ্ছে খেয়ালিপনা ও উচ্ছৃংখলতাকে আমন্ত্রণ করা। ইকবাল “আযাদি-ই-ফিক্‌র” (চিন্তার স্বাধীনতা) নামের এক কবিতায় (দ্বি-চরণ কবিতায়) লিখেছেনঃ

“চিন্তার স্বাধীনতা ধ্বংস সাধন তাদের জন্যে
যাদের নেই বিশোধিত চিত্ত;
চিত্তটি যদি হয় অপরিণত তা হলে চিন্তার স্বাধীনতা
পরিণত হয় মানুষকে পশুতে বানাবার পন্থায়।’

অপরিণত ভাবাদর্শগুলো যে-ভাবে ব্যাপকতা লাভ করছে আর যে-ভাবে আংশিক-জীর্ণ মতবাদসমূহ বস্তুগত অসন্তোষ সৃষ্টি করছে তা হলো প্রতিটি মস্তিস্ক-তরঙ্গকে দর্শন নামক মর্যাদাবান নামে অভিহিত করার আধুনিক যে বাতিক তার পরিণামঃ

“শাস্ত্রীয় বিদ্যাদান কেন্দ্রের লোকেরা পাণ্ডিত্যের গোলক ধাঁধায় দিশাহারা,
আধুনিক যুগে কে আর ভাল মন্দের হিসাব কষবার ধার ধারে?’

‘আস্‌র্‌-ই-হাযির’ (আধুনিক যুগ)-শীর্ষক আরও একটা কবিতায় ইকবাল প্রাচ্য ও প্রতীচ্য উভয় গোলার্ধের ত্রুটিগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। তিনি বলেন যে, প্রযুক্তিবিদ্যার যুগের অশোভন ত্বরা ও অধৈর্য সবকিছুর কাঠিন্য ধ্বংস করেছে আর দর্শনকে পরিণত করেছে কতগুলো চিন্তার অবিন্যস্ত সমষ্টিতে। পাশ্চাত্য জগতে প্রেম (হৃদয়সঞ্জাত আবেগাদি) তার যথার্থ স্থান লাভ করেনি, কারণ সেখানে নিরীশ্বরবাদ প্রেমের আবর্তনের জন্যে কোন অক্ষ রাখেনি, আর চিন্তায় কোন সংগতি ছিল না বলে প্রাচ্যে বুদ্ধি তার ন্যায়সংগত স্থান পায়নি।

পরিণত ভাবরাজি, পরিপূর্ণ ভাবে বিকশিত চিন্তা, কে আছে
এ-সব, খোঁজবার
বর্তমান যুগের জলবায়ু সব-কিছুকেই অপরিণত রাখে।
বিদ্যায়তন বুদ্ধিকে লাগাম ছেড়ে দেয়, কিন্তু
প্রেমকে তা না দিয়ে মতগুলোকে অস্পষ্ট, সংগতিহীন আর বিশৃংখল রেখে দেয়।
চিত্তের নাস্তিক্যবাদী প্রবণতার কল্যাণে পাশ্চাত্যে প্রেমের ঘটেছে মৃত্যু।’
চিন্তার অসঙ্গতির কারণে প্রাচ্যে বুদ্ধি স্বাধীনতাহীন।’

আধুনিক শিক্ষা যুবকদের মধ্যে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণকে এতদূর উৎসাহিত করে যে, পরিণামে মৌলিকত্বের ধাত বা স্বাধীন কর্মম্পৃহার অণু-মাত্র অবশিষ্ট থাকে না। পৃথিবীটাই প্রচলিত রীতির দাস কিন্তু শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশ সংকীর্ণ ও গোঁড়ামি-শৃংখলিত, আর সেখানে অসাধারণ প্রতিভাবান ব্যক্তিরা যুগ-নেতার ভূমিকা পালন করার চেয়ে স্বদলত্যাগী, সুযোগসন্ধানী ও কালের গোলাম হওয়া গৌরবের মনে করেন।

বাদাকশানের চুনির চাষ যদি তোমার হয় উদ্দেশ্য
তা হলে খেয়ালী সূর্যের প্রতিবিম্ব তুচ্ছ।
বিশ্বটা প্রচলিত রীতির জালে আবদ্ধ,
বিদ্যায়তনের কি মূল্য, কি দাম জনদের চেষ্টার?
যারা যুগ-নেতার কাজ করতে পারত,
হায়! তারাই হয়েছে যুগের আজ্ঞাবহ।

ইকবাল মনে করেন মুসলিম তরুণ-সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব নেই; তারা পাশ্চাত্যের ছায়া মাত্র এবং তারা কৃত্রিম জীবন যাপন করে তাও ধার করা। নতুন বংশধররা পশ্চিমা কারিগর দ্বারা পিটিয়ে তৈরি করা মাংস আর বস্তুর কাঠামো, কিন্তু এর মাঝে তারা আত্মা প্রবিষ্ট করেনি। এটা এমন একখানা খাপ যার গায়ে অলংকরণের অভাব নেই, কিন্তু ভিতরে নেই অসির অস্তিত্ব। ইকবাল সুতীব্র ক্ষোভের সাথে মন্তব্য করেন যে, তরুণদের দৃষ্টিতে আল্লাহর অস্তিত্ব একটি কল্পকথা আর তার নিজ অস্তিত্ব ছায়তুল্য ও অবাস্তব।

তোমার সত্তা ইউরোপ থেকে সংগ্রহ করে আলোঃ
তুমি ইউরোপের স্থপতিদের দ্বারা নির্মিত চার দেয়াল;
কিন্তু বাসকারীবিহীন কদর্মনির্মিত এ এমরাত,
পুষ্প-চিত্রিত, অলঙ্করণ সজ্জিত শূন্য অসি-আধার;
আমার সত্তার কাছে
তোমার অস্তিত্ব অপ্রমাণিত।
তাকেই বলে জীবন যা থেকে বিচ্ছুরিত হয় আত্মার স্ফুলিঙ্গ,
এটা খেয়াল কর! তোমার আত্মার জ্যোতি পড়ে না আমার নজরে।’

পশ্চিমের শিক্ষা সম্পর্কীয় পরিকল্পনা মুসলিম তরুণের আত্মাকে চূর্ণ করেছে, আশা আর উচ্চাভিলাষের অগ্নি-প্রজ্বলিত করার পরিবর্তে তাতে ভরে দিয়েছে যন্ত্রণা আর বিতৃষ্ণা। এ শিক্ষা তরুণদের আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন শিক্ষা দিয়েছে, তাদের কোমল আর স্ত্রৈণ করেছে আর জীবনের কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবার ক্ষমতা থেকে করেছে বঞ্চিত। যে শিক্ষা মানুষকে মুজাহিদদের পুরুষোচিত গুণাবলী থেকে বঞ্চিত করে আর জীবনের রণক্ষেত্রে বিলাস-সামগ্রী সরবরাহ করে, যুদ্ধাস্ত্র ছিনিয়ে নেয় সে-শিক্ষাকে ইকবাল মূল্যহীন-অসার বলে মনে করেন।

যে বংশধররা আজ বড় হয়ে উঠছে তাদের কল্যাণে ব্রতীদের কাছে ইকবাল আকুল আবেদন জানান, আর যখন এক ছাত্রবৎসল শিক্ষক ও এক স্নেহশীল অভিভাবকের মাধ্যমে নিম্নোক্ত ভাবাবেগ প্রকাশ করেন তখন মনে হয় সারা বিশ্বের যন্ত্রণা ঘনীভূত হয়ে তাঁর হৃদয়ে আশ্রয় নিয়েছে, আর গোটা মুসলিম মিল্লাতের দুঃখ-বেদনা তাঁর অস্তিত্বকে করেছে অভিভূতঃ

‘হে হরমের বৃদ্ধ! আশ্রমের পোশাক ত্যাগ কর,
আমার বিলাপের মর্ম কর হৃদয়ঙ্গম;
আল্লাহ তোমার তরুণদের সালামতে রাখুন!
তাদের ব্যক্তিত্বের, আত্মকৃচ্ছ্রতার শিক্ষা দাও,
তাদের শিলা বিদ্ধ করার পথ বলে দাও,
পাশ্চাত্য তাদের কাঁচের জিনিসপত্র তৈরির প্রণালী শিখিয়েছে;
দু’শো বছরের দাসত্ব তাদের হৃদয় ভেঙ্গে দিয়েছে;
এখন ভেবে-চিন্তে তাদের বিভ্রান্তিমুক্ত করার একটা দাওয়াই বের কর;
আমার প্রমত্ততায় তোমার গোপন কথাগুলো প্রকাশ করছি,
আমার মর্মযন্ত্রণাও রেখো খেয়ালে।’

সূত্রঃ আল্লামা ইকবাল সংসদ পত্রিকা: নভেম্বর, ১৯৮৯ সংখ্যা

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
Bangla

বাংলাভাষার নেতৃত্ব গ্রহণ করুন

আবুল হাসান আলী নদভী | নভেম্বর ২৩, ২০১৪
Download PDF

১৪ই মার্চ, ১৯৮৪ কিশোরগঞ্জের জামিয়া এমদাদিয়া প্রাঙ্গনে বিশিষ্ট আলিম, ইসলামী বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র-শিক্ষক সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণ। প্রথমে তিনি ওলামায়ে হিন্দের সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড ও যুগান্তকারী অবদান সম্পর্কে আলোচনা করেন। তারপর বাংলাদেশের আলিম ও তালিবানে ইলমের প্রতি ওলামায়ে হিন্দের কর্মধারা অনুসরণের আহবান জানান।
তাঁর বক্তব্যের সারসংক্ষেপ এই যে, বাংলাদেশে ইসলাম ও ইসলামী উম্মাহর এই সংকটসন্ধিক্ষণে ঐক্যবদ্ধ কর্মপ্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। প্রথমত ইসলামের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক অটুট রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত আলিম সমাজকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় এদেশে আলিম সমাজের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যেতে পারে।

***********************************************************

উপস্থিত ওলামায়ে কিরাম এবং আমার প্রিয় তালিবানে ইলম! এতক্ষণ আমি হিন্দুস্তানী ওলামায়ে কেরামের সংস্কারআন্দোলন এবং কীর্তি ও অবদানের কথা আলোচনা করলাম এবং সফলতার যে চিত্র তুলে ধরলাম, যদি বাংলাদেশে আপনারা সেই সফলতা অর্জন করতে চান তাহলে আপনাদেরও একই পথ ও পন্থা অনুসরণ করতে হবে।

আপনাদের প্রথম কর্তব্য হবে দেশ ও জাতির চিন্তার গতিধারা এবং স্বভাব ও প্রবণতা সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকা এবং সতর্ক দৃষ্টি রাখা। আপনাদের মুহূর্তের অসতর্কতার সুযোগে ইসলামের শত্রুরা এ জাতিকে নিয়ে যেতে পারে জাহেলিয়াতের পথে অনেক দূরে। কারণ আপনারাই হলেন এ জাতির ঈমান-আকীদা ও চিন্ত-চেতনার অতন্দ্র প্রহরী। প্রহরী অসতর্ক বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে কোন দুর্গ শত্রুর হামলা থেকে নিরাপদ হতে পারে না। সুতরাং আপনাদেরকে পূর্ণ সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে, যেন ইসলামের সঙ্গে এদেশের সম্পর্ক বিন্দুমাত্র শিথিল না হয়। যে দেশ এবং যে জাতির খিদমতের জন্য আল্লাহ আপনাদের নির্বাচন করেছেন তাদের সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে একদিন আপনাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। নবীর ওয়ারিছ ও উত্তরাধিকারী হিসেবে অবশ্যই আপনাদেরকে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে যে, সেখানে তোমাদের উপস্থিতিতে আমার উম্মত কীভাবে ইসলামের দুশমনদের প্রতারণার শিকার হলো? কীভাবে দ্বীন থেকে সরে গেলো? এ দেশের শাসক যারা, রাজনৈতিক কর্ণধার যারা, তারা জিজ্ঞাসিত হবে কি না, সে প্রশ্ন এখানে নয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, সবার আগে ওলামায়ে কেরামের কাছেই কৈফিয়ত চাওযা হবে যে, তোমরা বেঁচে থাকতে আমার রেখে আসা দ্বীনের এমন করুণ অবস্থা হতে পারলো কীভাবে? কোন মুখে আজ আমার সামনে দাঁড়িয়েছো? আল্লাহ হেফাযত করুন, হাশরের ময়দানে আল্লাহর নবীর সামনে যেন লজ্জিত না হতে হয়? আপনারা জানেন, ইরতিদাদের ফিতনার যুগে আল্লাহর রাসূলের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রাঃ) পরিবেশ ও পরিস্থিতির সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে গর্জে উঠেছিলেন- আমি বেঁচে থাকবো, আর দ্বীনের অঙ্গহানি হবে?

আপনাদের দেশে এখন ইরতিদাদের ফিতনা শুরু হয়েছে, চিন্তার ইরতিদাদ। সুতরাং সেই ছিদ্দীকীঈমান বুকে নিয়ে আপনাদেরও আজ গর্জে ওঠতে হবে বাতিলের বিরুদ্ধে, ‘আমরা বেঁচে থাকতে দ্বীনের ক্ষতি হবে?’ না, তা হতে পারে না। এখন আপনারদেরকে গৌণ মতপার্থক্যগুলো ভুলে গিয়ে দ্বীন ও ঈমান রক্ষার বৃহত্তর ও মৌলিক লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটে নিপতিত জাতির এ মুহূর্তে বড় প্রয়োজন ওলামায়ে উম্মতের ঐক্যবদ্ধ পথনির্দেশনার।

ইখলাছ ও আত্মত্যাগ, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা এবং উন্নত চরিত্রের আলো দ্বারা জাতির সেই অংশটিকে প্রভাবিত ও উদ্বুদ্ধ করুন, তাকদীরের ফায়সালায় যাদের হাতে আজ দেশ শাসনের ভার অর্পিত হয়েছে, কিংবা আগামীকাল অর্পিত হতে চলেছে। এ যুগে শাসন ক্ষমতা লাভের জন্য অপরিহার্য যোগ্যতা, দক্ষতা ও উপায়-উপকরণ যাদের হাতে রয়েছে, জাতির সেই সংবেদনশীল অংশটিকে দ্বীনের কাজে প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে সহযোগী বানাবার চেষ্টা করুন। শুধু এবং শুধু দ্বীনের ফায়দার উদ্দেশ্যে তাদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করা আপনাদের অপরিহার্য কর্তব্য। অত্যন্ত হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে তাদেরকে তাদের ভাষায় এবং তাদের মেযাজে বোঝাতে হবে।

আপনাদের সম্পর্কে তাদের মনে এ বিশ্বাস ও আশ্বাস যেন অটুট থাকে যে, আপনারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, বরং তাদের ও উম্মতের প্রকৃত কল্যাণকামী। আপনারা নি:স্বার্থ ও আন্তরিক। তাদের কাছে আপনাদের যেন কোন প্রত্যাশা না থাকে। চাওয়া-পাওয়ার কোন প্রশ্ন যেন না থাকে। সুয়োগ সুবিধার কথা হয়ত বলা হবে, লোভ ও প্রলোভনের হাতছানি হয়ত আসবে; এমনকি হয়ত বা সুযোগ গ্রহণের মাঝে দ্বীনের ‘ফায়দা’ নজরে আসবে। এ বড় কঠিন পরীক্ষা। তখন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের উপর অটল-অবিচল থাকতে হবে। ওয়ারিছে নবীর ঈমান ও বিশ্বাস এবং ইতমিনান ও প্রশান্তি নিয়ে আপনাদের তখন বলতে হবে, তোমাদের দুনিয়া তোমাদের জন্য মোবারক হোক, আমরা তো দ্বীনের রাস্তায় তোমাদের কল্যাণ চাই। তোমাদের আখেরাতের সৌভাগ্য চাই। মনে রাখবেন, আপনাদের বিনিময় আল্লাহর কাছে। আল্লাহ ছাড়া কেউ আপনাদের বিনিময় দিতে পারে না।

দ্বিতীয় যে বিষয়টির প্রতি আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই তা হলো এ দেশের ভাষা ও সাহিত্য। বাংলাভাষাকে অন্তরের মমতা দিয়ে গ্রহণ করুন এবং মেধা ও প্রতিভা দিয়ে বাংলাসাহিত্যচর্চা করুন। কে বলেছে, এটা অস্পৃশ্য ভাষা? কে বলেছে, এটা হিন্দুদের ভাষা? বাংলাভাষা ও সাহিত্য চর্চায় পুণ্য নেই, পুণ্য শুধু আরবীতে, উর্দুতে, কোথায় পেয়েছেন এ ফতোয়া? এ ভ্রান্ত ও আত্নঘাতী ধারণা বর্জন করুন। এটা অজ্ঞতা, এটা মূর্খতা এবং আগামীদিনের জন্য এর পরিণতি বড় ভয়াবহ।

এ যুগে ভাষা ও সাহিত্য হলো চিন্তার বাহন, হয় কল্যাণের চিন্তা, নয় ধ্বংসের চিন্তা। বাংলাভাষা ও সাহিত্যাকে আপনারা শুভ ও কল্যাণের এবং ঈমান ও বিশ্বাসের বাহনরূপে ব্যবহার করুন। অন্যথায় শত্রুরা একে ধ্বংস ও বরবাদির এবং শিরক ও কুফুরির বাহনরূপে ব্যবহার করবে।

সাহিত্যের অঙ্গনে আপনাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের আসন অধিকার করতে হবে। আপনাদের হতে হবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী লেখক-সাহিত্যিক ও বাগ্মী বক্তা। ভাষা ও সাহিত্যের সকল শাখায় আপনাদের থাকতে হবে দৃপ্ত পদচারণা। আপনাদের লেখা হবে শিল্পসম্মত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। আপনাদের লেখনী হবে জাদুময়ী ও অগ্নিগর্ভা, যেন আজকের ধর্মবিমুখ শিক্ষিত সমাজ অমুসলিম ও নামধারী মুসলিম লেখক-সাহিত্যিকদের ছেড়ে আপনাদের সাহিত্য নিয়েই মেতে ওঠে এবং আপনাদের কলম-জাদুতেই আচ্ছন্ন থাকে।

দেখুন; এ কথা আপনারা লখনৌর অধিবাসী, উর্দুভাষার প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং আরবী ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী ব্যক্তির মুখ থেকে শুনছেন। আলহামদু লিল্লাহ, আমার বিগত জীবন কেটেছে আরবী ভাষার সেবায় এবং আল্লাহ চাহে তো আগামী জীবনও আরবী ভাষারই সেবায় হবে নিবেদিত। আরবী ভাষা আমাদের নিজেদের ভাষা, বরং আমি মনে করি যে, আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের কথা থাকুক, আল্লাহ শোকর আমার খান্দানের অনেক সদস্যের এবং আমার ছাত্রদের অনেকের সাহিত্যপ্রতিভা খোদ আরবসাহিত্যিকদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আরবরাও নিঃসংকোচে তা স্বীকার করে।

বন্ধুগণ! উর্দুভাষার পরিবেশে যে চোখ মেলেছে, আরবী সাহিত্যের সেবায় যার জীবন-যৌবন নিঃশেষ হয়েছে সে আজ তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পূর্ণ দায়িত্ব সচেতনতার সাথে বলছে, বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে ইসলাম বিরোধী শক্তির রহম করমের উপর ছেড়ে দিও না। ‘ওরা লিখবে, তোমরা পড়বে’- এ অবস্থা কিছুতেই বরদাশত করা উচিত নয়। মনে রেখো, লেখা ও লেখনীর রয়েছে অদ্ভূত প্রভাবক শক্তি, এর মাধ্যমে লেখকের ভাব-অনুভূতি, এমনকি তার হৃদয়ের স্পন্দনও পাঠকের মাঝে সংক্রমিত হয়। অনেক সময় পাঠক নিজেও তা অনুভব করতে পারে না। অবচেতন মনে চলে তার ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া। ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান লেখকের লেখনী পাঠকের অন্তরেও সৃষ্টি করে ঈমানের বিদ্যুৎ প্রবাহ। হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহ) বলতেন-

‘পত্রযোগেও মুরীদের প্রতি তাওয়াজ্জুহ আত্মসংযোগ নিবদ্ধ করা যায়। শায়খ তাওয়াজ্জুহসহকারে মুরীদের উদ্দেশ্যে যখন পত্র লেখেন তখন সে পত্রের হরফে হরফে থাকে এক অত্যাশ্চর্য প্রভাবশক্তি।’

এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। আমাদের মহান পূর্ববর্তীদের রচনাসম্ভার আজো বিদ্যমান রয়েছে। পড়ে দেখুন, আপনার ছালাতের প্রকৃতি বদলে যাবে। হয়ত পঠিত বিষয়ের সঙ্গে ছালাতের কোন সম্পর্ক নেই, কিন্তু লেখার সময় হয়ত সে দিকে তাঁর তাওয়াজ্জুহ নিবদ্ধ ছিলো। এখন সে লেখা পড়ে গিয়ে ছালাত আদায় করুন; হৃদয় জীবন্ত এবং অনুভূতি জাগ্রত হলে অবশ্যই আপনি উপলদ্ধি করবেন যে, আপনার ছালাতের রূপ ও প্রকৃতি বদলে গেছে, তাতে রূহ ও রূহানিয়াত সৃষ্টি হয়েছে। এ অভিজ্ঞতা আমার বহুবার হয়েছে। আপনি অমুসলিম লেখকের সাহিত্য পাঠ করবেন, তাদের রচিত গল্প-উপন্যাস ও কাব্যের রস উপভোগ করবেন, তাদের লিখিত ইতিহাস গলাধ:করণ করবেন অথচ আপনার হৃদয়ে তা রেখাপাত করবে না, আপনার চিন্তা-চেতনাকে তা আচ্ছন্ন করবে না, এটা কী করে হতে পারে? আগুনজ্বালাবে না এবং বিষ তার ক্রিয়া করবে না, এটা কীভাবে বিশ্বাস করা চলে? চেতন মনে আপনি অস্বীকার করুন, কিন্তু আপনার অবচেতন মনে লেখা ও লেখনী তার নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করবেই। আমি মনে করি আপনাদের জন্য এটা বড়ই লজ্জার কথা। বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত না হলে আমার কিছুতেই বিশ্বাস হতো না যে, যে দেশ যে ভাষায় লক্ষ লক্ষ আলিমের জন্ম হয়েছে সে দেশে সেভাষায় কোরআনের প্রথম অনুবাদকারী হচ্ছেন একজন হিন্দু সাহিত্যিক।

এদেশের মুসলিম সাহিত্যিকদের আপনারা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরুন। নজরুল ও ফররূখকে তুলে ধরুন। সাহিত্যের অঙ্গনে তাদেরও যে অবিস্মরণীয় কীর্তি ও কৃতিত্ব রয়েছে তা বিশ্বকে অবহিত করুন। নিবিষ্ট চিত্ত ও গবেষক দৃষ্টি নিয়ে তাদের সাহিত্য অধ্যয়ন করুন, অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করুন এবং সম্ভব হলে আরবী ভাষায়ও তাদের সাহিত্য তুলে ধরুন। কত শত আলোড়ন সৃষ্টিকারী মুসলিম সাহিত্য-প্রতিভার জন্ম এ দেশে হয়েছে তাদের কথা লিখুন। বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে তাদের তুলে আনুন।

আল্লাহর রহমতে এমন কোন যোগ্যতা নেই যা কুদরতের পক্ষ হতে আপনাদের দেয়া হয়নি। হিন্দুস্তানে আমাদের মাদরাসাগুলোতে এমন অনেক বাঙ্গালী ছাত্র আমি দেখেছি যাদের মেধা ও প্রতিভার কথা মনে হলে এখনো ঈর্ষা জাগে। পরীক্ষায় ও প্রতিয়োগিতায় তাদের মোকাবেলায় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ছাত্ররা অনেক পিছনে থাকতো। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে মানপত্র দেয়া হয়েছে। আমাদের ধারণাই ছিলো না যে, এত সুন্দর আরবী লেখার লোকও এখানে রয়েছে। কখনো হীনমন্যতার শিকার হবেন না। সব রকম যোগ্যতাই আল্লাহ আপনাদের দান করেছেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় এগুলোর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।

আমার কথা মনে রাখবেন। বাংলাভাষা ও সাহিত্যের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নিতে হবে। দু’টি শক্তির হাত থেকে নেতৃত্ব ছিনিয়ে আনতে হবে। অমুসলিম শক্তির হাত থেকে এবং অনৈসলামী শক্তির হাত থেকে। অনৈসলামী শক্তির অর্থ ঐসব নামধারী মুসলিম লেখক-সাহিত্যিক যাদের মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তা-চেতনা ইসলামী নয়। ক্ষতি ও দুষ্কৃতির ক্ষেত্রে এরা অমুসলিম লেখকদের চেয়েও ভয়ংকর।

মোটকথা, এ উভয় শক্তির হাত থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের নেতৃত্ব ছিনিয়ে আনতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যসাধনায় আত্মনিয়োগ করুন এবং এমন অনবদ্য সাহিত্য সৃষ্টি করুন যেন অন্য দিকে কেউ ফিরেও না তাকায়। আলহামদু লিল্লাহ! আমাদের হিন্দুস্তানী আলিম সমাজ প্রথম থেকেই এদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন। ফলে সাহিত্য, কাব্য, সমালোচনা, ইতহাস- এক কথায় সাহিত্যের সর্বশাখায় এখন আলিমদের রয়েছে দৃপ্ত পদচারণা। তাঁদের উজ্জ্বল প্রতিভার সামনে সাহিত্যের বড় বড় দাবীদাররাও নিষ্প্রভ। একবার একটি জনপ্রিয় উর্দু সাহিত্যসাময়িকীর পক্ষ হতে একটি সাহিত্য-প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিলো। প্রতিযোগীদের দায়িত্ব ছিলো উর্দুভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নির্বাচন। বিচারকদের রায়ে তিনিই পুরস্কার লাভ করেছেন যিনি মাওলানা শিবলী নোমানীকে উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পুরুষ প্রমাণ করেছিলেন। উর্দুভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক কোন সম্মেলন বা সেমিনার হলে সভাপতিত্বের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হতো মাওলানা সৈয়দ সোলায়মান নদবী, মাওলানা আব্দুসসালাম নদবী, মাওলানা হাবীবুর রহমান খান শিরওয়ানী, কিংবা মাওলানা আবদুল মাজেদ দরয়াবাদীকে। উর্দু কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসের উপর দু’টি বই বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের পাঠ্য-সূচীর অন্তর্ভুক্ত। একটি হলো মওলভী মুহাম্মদ হোসাইন আযাদ কৃত ‘আবে হায়াত’, দ্বিতীয়টি আমার মরহুম পিতা মাওলানা আবদুল হাই কৃত ‘গুলে রা‘না’ (কোমল গোলাপ)।

মোট কথা হিন্দুস্তানে উর্দু সাহিত্যকে আমরা অন্যের নিয়ন্ত্রণে যেতে দেই নি। তাই আল্লাহর রহমতে সেখানে কেউ এ কথা বলতে পারে না যে, মাওলানারা উর্দু জানে না, কিংবা টাকশালী উর্দুতে তাদের হাত নেই। এখনো হিন্দুস্তানী আলিমদের মাঝে এমন লেখক, সাহিত্যিক ও অনলবর্ষী বক্তা রয়েছেন যাদের সামনে দাঁড়াতেও অন্যদের সংকোচ বোধ হবে। ঠিক এ কাজটাই আপনাদের করতে হবে বাংলাদেশে।

আমার কথা আপনারা লিখে রাখুন। দীর্ঘ জীবনের লদ্ধ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন, কিংবা বিমাতাসুলভ আচরণ এ দেশের আলিম সমাজের জন্য জাতীয় আত্মহত্যারই নামান্তর হবে।

প্রিয় বন্ধুগণ! আমার এ দু’টি কথা মনে রেখো; এর বেশী কিছু আমি বলতে চাই না। প্রথম কথা হলো- এই দেশ ও জাতির হিফাযতের দায়িত্ব তোমাদের। সুতরাং ইসলামের সাথে এ দেশের সম্পর্ক কোন অবস্থাতেই যেন শিথিল হতে না পারে। অন্যথায় তোমাদের এই শত শত মকতব-মাদরাসা বেকার ও মূল্যহীন হয়ে পড়বে। আমি সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই। আমার কথায় তোমরা দোষ ধরো না। কেননা আমি তো মাদরাসারই মানুষ, মাদরাসার চৌহদ্দিতেই কেটেছে আমার জীবন। আমি বলছি, আল্লাহ না করুন, ইসলামই যদি এ দেশে বিপন্ন হলো তাহলে মকতব-মাদরাসার কী প্রয়োজন থাকলো, বরং এগুলোর অস্তিত্বের সুয়োগই বা কোথায় থাকলো? সুতরাং তোমাদের প্রথম কাজ হলো এদেশে ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা করা, ইসলামের সঙ্গে এ জাতির বন্ধন অটুট রাখা। দ্বিতীয় কাজ হলো, যে কোন মূল্যে দেশ ও জাতির নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়া। আর তা বাংলাভাষা ও সাহিত্যে পূর্ণ অধিকার এবং সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন ছাড়া কখনো সম্ভব নয়।

আমার খুবই আফসোস হচ্ছে যে, আপনাদের সাথে আমি বাংলাভাষায় কথা বলতে সক্ষম নই। যদি আমি আপনাদের ভাষায় আপনাদেরকে সম্বোধন করতে পারতাম তাহলে আজ আমার আনন্দের কোন সীমা থাকতো না। ইসলামের দৃষ্টিতে কোন ভাষাই পর নয়, বিদেশী নয়। পৃথিবীর সকল ভাষাই আল্লাহর সৃষ্টি এবং প্রত্যেক ভাষারই রয়েছে নিজস্ব কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্য। ভাষাবিদ্বেষ হলো জাহেলিয়াতের উত্তরাধিকার। কোন ভাষা যেমন পূজনীয় নয়, তেমনি ঘৃণা-বিদ্বেষেরও পাত্র নয়। একমাত্র আরবী ভাষাই পেতে পারে পবিত্র ভাষার মর্যাদা। এছাড়া পৃথিবীর আর সব ভাষাই সমমর্যাদার অধিকারী। আল্লাহ মানুষকে বাকশক্তি দিয়েছেন এবং যুগে যুগে মানুষের মুখের ভাষা উন্নতি ও সমৃদ্ধির বিভিন্ন সোপান অতিক্রম করে বর্তমান রূপ ও আকৃতিতে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। মুসলমান প্রতিটি ভাষাকেই শ্রদ্ধা ও মর্যাদার চোখে দেখে। কেননা ভাষা আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহর দান এবং মনের ভাব প্রকাশে সব ভাষাই মানুষকে সাহায্য করে। তাই প্রয়োজনে যে কোন ভাষা শিক্ষা করা ইসলামেরই নির্দেশ। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়দ বিন ছাবিত (রা:) কে হিব্রুভাষা শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ হিব্রু হচ্ছে নির্ভেজাল ইহুদী ভাষা। মাতৃভাষা ও সাহিত্যের প্রতি যদি আমরা উদাসীন থাকি তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তা চলে যাবে বাতিল শক্তির নিয়ন্ত্রণে। ফলে যে ভাষা ও সাহিত্য হতে পারতো ইসলামের শিক্ষা ও দীক্ষা প্রচারের কার্যকর মাধ্যম, সেটাই হয়ে দাঁড়াবে শয়তান ও শয়তানিয়াতের বাহন। আপনাদের এখানে কলকাতা থেকে বিরুদ্ধ সংস্কৃতির সাহিত্য আসছে। সাহিত্যের ছদ্মাবরণে ইসলামবিরোধী বাদ-মতবাদ এবং চরিত্রবিধ্বংসী সংস্কৃতির প্রচার চলছে। তাতে ইসলামী মূল্যবোধ ধ্বংসের মালমশলা মেশানো হচ্ছে, আর সরলমনা তরুণ সমাজ গোগ্রাসে তাই গিলছে। এর পরিণতি কখনো শুভ হতে পারে না।

আপনারা তিরমিযি, মিশকাত, কিংবা মীযানের শরাহ লিখতে চাইলে আরবী-উর্দুতে লিখুন, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু জনগণকে বোঝাতে হলে জনগণের ভাষায় কথা বলতে হবে। যুগে যুগে আল্লহর প্রেরিত নবী-রাসূলকে তাঁদের কাওমের ভাষায় কথা বলতে হয়েছে; নায়েবে রাসূল হিসাবে আপনাদেরও একই তরীকা অনুসরণ করতেহবে।

আমি আপনাদের খিদমতে পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই- পাক-ভারত উপমহাদেশে হাদীছ, তাফসীর, ফেকাহ ও উছূল শাস্ত্রের উপর এ পর্যন্ত অনেক কাজ হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যাখ্যা ও টীকাগ্রন্থও লেখা হয়ে গেছে। তাতে নতুন সংযোজনের বিশেষ কিছু নেই। আপনাদের সামনে এখন পড়ে আছে কর্মের নতুন ও বিস্তৃত এক ময়দান। দেশ ও জাতির উপর আপনাদের নিয়ন্ত্রণ যেন শিথিল হতে না পারে। মানুষ যেন মনে না করে যে, দেশে থেকেও আপনারা পরদেশী। স্বদেশের মাটিতে এই প্রবাস-জীবন অবশ্যই আপনাদের ত্যাগ করতে হবে। মনে রাখবেন, এ দেশেই আপনাদের থাকতে হবে এবং এ দেশের সমাজেই দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ আঞ্জাম দিতে হবে। এদেশের সাথেই আপনাদের ভাগ্য ও ভবিষ্যত জড়িত।

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
হে মুসলমানগণ! তোমাদের জান এবং তোমাদের মাল এবং তোমাদের আবরু-ইজ্জত পরস্পরের জন্য হারাম ও পবিত্র। যেমন এই মাসের এই দিনটি তোমাদের জন্য হারাম ও পবিত্র। যারা উপস্থিত তারা আমার বাণী পৌঁছে দাও ঐলোকদের কাছে যারা অনুপস্থিত।

সুতরাং ভাষাগত পার্থক্যের কারণে কোন মুসলমান ভাইকে অপমান করা, তার ইজ্জত-আবরু লুণ্ঠন করা, কিংবা তাকে হত্যা করা হবে চরম জুলুম ও অবিচার। আল্লাহ বলেছেন- প্রতিটি বস্তুর জন্য আল্লাহ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ও স্তর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কোন মুসলমানের জন্য সে সীমা লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। মাতৃভাষা ও সাহিত্যকে ভালবাসো। চর্চা-সাধনায় আত্মনিয়োগ করো। তোমার সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটাও, কাব্যের রস উপভোগ করো, কিন্তু অতিরঞ্জন ও সীমা লঙ্ঘন করো না। কোরআন শরীফকেও যদিকেউ পূজা করা শুরু করে এবং উপাস্যজ্ঞানে সিজদা করে তবে সে মুশরিক হয়ে যাবে। কেননা ইবাদত শুধু আল্লাহর প্রাপ্য। তবে সব ভাষাকে স্ব স্ব মর্যাদায় বহাল রেখে মাতৃভাষাকে ভালোবাসা এবং স্বীয় অবদানে তাকে সমৃদ্ধ করে তোলা শুধু প্রশংসনীয়ই নয়, অপরিহার্য কর্তব্যও বটে।

বন্ধুগণ! আমি পরদেশী মুসাফির। দুদিনের জন্য এসেছি তোমাদের দেশে তোমাদের মেহমান হয়ে। তোমাদের কল্যাণ কামনায় নিবেদিত হয়ে “কল্যাণকামিতাই দ্বীন” এই হাদীছের উপর আমল করে তোমাদের কয়েকটি উপদেশ দিয়ে গেলাম। যদি পরদেশী মুসফির ভাইয়ের এ দরদভরা আওয়ায তোমাদের মনে থাকে তাহলে একদিন না একদিন অবশ্যই এর গুরুত্ব তোমরা উপলব্ধি করতে পারবে। কিন্তু তা যেন সময় পার হয়ে যাওয়ার পর এবং পানি মাথার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার পর না হয়। একদিন তোমরা অবশ্যই বোঝবে, আমি কী বলেছিলাম এবং কেন বলেছিলাম।

তোমাদের যা বলছি, অচিরেই তোমরা তা স্মরণ করবে। আমি আমার যাবতীয় বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করছি। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সবকিছু দেখেন।

আসমানের ফিরেশতারা যেন সাক্ষী থাকে, কিরামান কাতিবীন যেন লিখে রাখে যে, প্রতিবেশী ভাইদের প্রতি আমি আমার দায়িত্ব পূর্ণ করেছি। আমি আবার বলছি- শেষবারের মত বলছি, তোমরা যদি এ দেশের মাটিতে বাঁচতে চাও; যদি এখানে ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাও তাহলে এটাই হচ্ছে একমাত্র পথ। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন। আমীন।

সূত্রঃ দারুল কলম প্রকাশিত “তালিবে ‘ইলমের জীবন পথের পাথেয়”

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
madrasar lokko o uddesso

মাদরাসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

আবুল হাসান আলী নদভী | জুলাই ১২, ২০১৪
Download PDF

১২ইমার্চ, ১৯৬৪ ইংরেজীতে দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামার সুপ্রশস্ত মসজিদে নতুন শিক্ষাবর্ষের উদ্বোধন উপলক্ষে হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর মূল্যবান ভাষণ। তাতে তিনি মাদরাসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং এ যুগের তালিবানে ইলমের করণীয় সম্পর্কে সারগর্ভ আলোচনা করেছেন।

তালিবানে ইলমের জীবন গঠনের ব্যাপারে হযরত মাওলানার অন্তরে যে দরদ-ব্যথা সর্বদা ক্রিয়াশীল তারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে আলোচ্য ভাষণের প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি ছন্দে। আল্লাহ কবুল করুন। আমীন।

*******************************************************************

    আমার প্রিয় তলিবানে ইলম!

আল্লাহর রহমতে আজ আপনাদের নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে চলেছে। এ সময় আপনাদের সাথে পরিচিত হওয়া এবং নিজের জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় কাজ। এ জন্যই আজ শিক্ষাবর্ষের উদ্বোধনী জলসায় আমি উপস্থিত হয়েছি। আপনাদের দু’টি কথা শুনবো এবং আপনাদের দু’টি কথা বলবো, এ-ই আমার ইচ্ছা।

আমার অনুভূতি এই যে, আপনাদের সঙ্গে কথা বলা যেমন সহজ তেমনি কঠিন, যেমন সরল তেমনি জটিল। সহজ ও সরল এজন্য যে, আমার ও আপনাদের মাঝে লৌকিকতার কোন আড়াল এবং কৃত্রিমতার বেড়াজাল নেই। মনের কথা আমি মন খুলেই আপনাদের বলতে পারি। ঘরে পিতা ও পুত্রের আলোচনায়, কিংবা অন্তরঙ্গ পরিবেশে প্রিয়জনদের আলাপচারিতায় কি কোন আড়াল থাকে? দ্বিধা-সংকোচের বাধা থাকে? থাকে না। আমার এবং আপনাদের মাঝেও নেই। সুতরাং কী প্রয়োজন দ্বিধা-সংকোচের কিংবা গুরুগম্ভীর ভাষা ও শব্দ ব্যবহারের!  আমি তো চিরকালের জানা-শোনা কথাই বলবো এবং আমার প্রিয়জনদের কাছে বলবো। আমি তো আমার জীবন-সফরের বিভিন্ন চড়াই-উতরাই ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরবো এবং আমার সন্তানদের কাছে তুলে ধরবো । সুতরাং খুব সহজ কথা এবং একান্ত সরল আলোচনা, যার জন্য বিশেষ চিন্তা-ভাবনার যেমন দরকার নেই তেমনি দীর্ঘ ভূমিকারও প্রয়োজন নেই।

এটা আমার ক্ষেত্রে যেমন সত্য, আপনাদের সকল আসাতেযা কেরামের ক্ষেত্রেও একই রকম সত্য। তারাও আপনাদের সঙ্গে একই ভাষায়, একই ধারায় কথা বলবেন। কেননা তাদেরও সঙ্গে আপনাদের হৃদয় ও আত্মার সম্পর্ক! এবং তাদেরও জীবন জ্ঞানে, প্রজ্ঞায় ও অভিজ্ঞতায় সুসমৃদ্ধ!  কবির ভাষায়-

‘এ উপত্যকায় সফর করে করেই তো কেটেছে সারাটা জীবন।’

কিন্তু একই সঙ্গে আপনাদের সামনে কথা বলা খুবই কঠিন ও জটিল দায়িত্ব। কেননা আপনাদের মজলিসে যখন দাঁড়াই, আপনাদের সম্বোধন করে যখন কিছু বলতে চাই তখন হৃদয় এমনই আবেগ-উদ্বেলিত হয়ে ওঠে এবং কথার অথৈ সমুদ্র এমনই ঢেউ তোলে যে, কী বলে শুরু করবো, কী বলে শেষ করবো এবং কোন কথা রেখে কোন কথা বলবো বুঝে উঠতে পারি না। তাই মন চায়, জীবনের সমগ্র অভিজ্ঞতা এবং পঞ্চাশ বছরের ইলমী সফরের সম্পূর্ণ সারনির্যাস একত্রে আপনাদের হাতে সোপর্দ করি এবং আপনাদের আমানত আপনাদের হাতে তুলে দিয়ে দায়মুক্ত হয়ে যাই। কেননা মৃত্যর ডাক কখন এসে পড়বে কেউ জানে না, মউতের পরোয়ানা কাউকে মুহলত দেয় না।

কিন্তু সারা জীবনের সব কথা, সারা জীবনের সব অভিজ্ঞতা এক সাথে তো বলা যায় না, ধারণও করা যায় না। তাই সময় ও পরিবেশের আলোকে অতি সংক্ষেপে দু’চারটি কথাই শুধু এখন বলবো। যিন্দেগী যদি মুহলত দেয় তাহলে আবার আমি আপনাদের সামনে দাঁড়াবো এবং আরো অনেক কথা বলবো, ইনশাআল্লাহ। বলার মত অনেক কথাই আছে আমার হৃদয়ের ভাণ্ডারে।

***

সর্বপ্রথম আমি আপনাদের আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। বিগত বছরের তালিবানে ইলম যারা, তাদেরকে মোবারকবাদ এজন্য যে, যুগের দুর্যোগ ও যামানার গার্দিশ মোকাবেলা করে এখনো তারা টিকে আছেন এবং ইলমের সাধনা ও মোজাহাদা অব্যাহত রেখেছেন। সর্বোপরি জীবনের সুমহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের পথে আত্মনিবেদিত রয়েছেন। পরিবেশ-পরিস্থিতির শত প্রতিকূলতা এবং সময়ের কঠিন ঝড়-ঝাপটা তাদের হিম্মতহারা করতে পারে নি। আলহামদুলিল্লাহ!

আর ইলমে নববীর এ কাফেলায় নবাগত যারা,  তাদেরকে মোবারকবাদ এ জন্য যে, ফেতনা ফাসাদের এ ঘোর অন্ধকার যুগেও তারা ইলমে দ্বীন হাছিলের পথ গ্রহণ করেছেন এবং মাদরাসার ‘কিশতিয়ে নূহ’ –এ সওয়ার হয়েছেন।

আল্লাহ তা‘আলার কী অসীম অনুগ্রহ ও করুণা যে তিনি আপনার আম্মা-আব্বাকে তাওফীক দিয়েছেন, আর দ্বীন শিক্ষার জন্য তারা আপনাকে দ্বীনী মাদরাসায় পাঠিয়েছেন। অবশ্য এমন তালিবও আছে যারা স্বেচ্ছায় আসেনি, এসেছে পরিবারের চাপে। তাদেরও আমি আদর করি, তাদেরও আমি সমাদর করি। কেননা তারাও আল্লাহর আদরের এবং সমাদরের। হাদীছ শরীফে আছে-

‘এমন কিছু লোকও জান্নাতে যাবে, যাদের পায়ে থাকবে শেকল।’

অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা‘আলার এমনই  ‘চাহতা বান্দা’ ও প্রিয়পাত্র যে, স্বেচ্ছায় তারা জান্নাতের পথে আগুয়ান নয়, বরং জাহান্নামের পথে ধাবমান। কিন্তু আল্লাহ তাদের শেকল-বাঁধা করে হলেও জাহান্নাম থেকে ফিরিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাবেন।

তদ্রূপ ইলমে দ্বীন এমনই বিরাট নেয়ামত যে, বাধ্য হয়েও যারা তা গ্রহণ করে এবং উদ্দেশ্য না বুঝেও মাদরাসার নূরানী পরিমণ্ডলে এসে পড়ে তারাও আমাদের মোবারকবাদ লাভের যোগ্য। হয়ত না বোঝার কারণে আজ এ মহানেয়ামতের কদর হলো না, কিন্তু আল্লাহ যেদিন অন্তর্চক্ষু খুলে দেবেন এবং ইলমের হাকীকত ও ফযীলত তাদের সামনে উদ্ভাসিত করবেন সেদিন চোখের পানি ফেলে ফেলে তারা মা-বাবার জন্য দু‘আ করবে এবং আসাতেযা কেরামকে ‘জাযাকুমুল্লাহ’ বলবে।

মোটকথা, যে যেভাবেই দ্বীনী মাদরাসায় এসেছে এবং ইলমের নূরানী পরিবেশে দাখিল হয়েছে সে এবং তার মা-বাবা অবশ্যই আমাদের হৃদয় নিংড়ানো মোবারকবাদ লাভের যোগ্য।

***

এখন প্রশ্ন হলো, এখানে ইলমের ময়দানে কী আপনারা পাবেন? কোন মহাসম্পদের অধিকারী হবেন?

এটা অবশ্য বিশদ আলোচনা ও ব্যাপক আলোকপাতের বিষয়, যার সময় ও সুযোগ এখন নেই। যুগশ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক পুরুষ হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযযালী (রহ) বিরচিত ইহয়াউল উলূম হচ্ছে এ বিষয়ের সর্বোত্তম গ্রন্থ। সময়-সুযোগ করে উস্তাদের তত্ত্বাবধানে এর নির্বাচিত অংশ পড়ুন। সেখানে আপনার প্রশ্নের সন্তোষজনক সমাধান রয়েছে। একটি দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার শিক্ষার্থীকে কী অমূল্য সম্পদ দান করে এবং সে কোন মহাসৌভাগ্যের অধিকারী হয়, অবশ্যই আপনি তা বুঝতে পারবেন।

আল্লাহর কালামের নেয়ামত

একটিু আগে ক্বারী সাহেবের মুখে আল্লাহর কালামের তেলাওয়াত শ্রবণকালে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার সমগ্র সত্তা এ ভাব ও ভাবনায় তন্ময় ছিলো যে, আমাকে ও মানবজাতিকে যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং বিশ্বজগতের যিনি স্রষ্টা তাঁর কালাম এক তুচ্ছ মানুষ তেলাওয়াত করছে আর আমি এক তুচ্ছতম মানুষ তা শ্রবণ করছি!

সুবহানাল্লাহ! আমার আপনার মত গান্দা ইনসানের কী যোগ্যতা আছে যে ‘পবিত্র স্রষ্টার পবিত্র বাণী’ উচ্চারণ করতে পারি, শ্রবণ করতে পারি এবং হৃদয়ঙ্গম করতে পারি!

আমার আল্লাহ আমাকে সম্বোধন করে কালাম করছেন, আর আমি তা শ্রবণ করছি এবং অনুভব করছি! মাটির মানুষের জন্য এ কোন আসমানী মর্যাদা ও সৌভাগ্য! তুচ্ছ মানুষ এ অত্যুচ্চ নেয়ামত লাভ করে কেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় না? আল্লাহর কালাম বুঝতে পারাতো এমন নেয়ামত যে, মানুষ যদি খুশিতে মাতোয়ারা এবং আনন্দে আত্মহারা হয়, আর লায়লার প্রেমে পাগল মজনুর মত দেওয়ানা হয়ে যায় তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা কী বলবো! আমাদের না আছে সে হৃদয়, না আছে সেই অনুভূতি।

ছাহাবী হযরত উবাঈ ইবনে কা‘আবের ঘটনা কি ভুলে গেছেন? ইতিহাসের পাতায় আবার নজর বুলিয়ে দেখুন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন-

‘আল্লাহ তোমার নাম নিয়ে আমাকে বলেছেন যে, তাকে দিয়ে আমার কালাম পড়িয়ে শুনুন।’

এ খোশখবর শুনে তিনি এমনই আত্মহারা হলেন যে, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনেই খুশিতে চিৎকার করে বলে উঠলেন-

সত্যি আমার আল্লাহ আমার নাম নিয়েছেন! সত্যি আমার আল্লাহ উবাঈ বিন কা‘আব বলে আমায় ডেকেছেন!

সুবহানাল্লাহ! ইশকে ইলাহী ও ইশকে নবীর কেমন দিওয়ানা ছিলেন তাঁরা! এর হাজার ভাগের একভাগও কি আছে আমাদের কলবে, আমাদের অনুভবে?

আমার প্রিয় তালেবানে ইলম!

দ্বীনী মাদারেসে এসে আর কিছু যদি ভাগ্যে নাও জোটে, জীবনের সমস্ত সময় ও সম্পদ ব্যয় করে শুধু এই একটি নেয়ামত যদি নছীব হয়, যদি আল্লাহর কালামের ‘সম্বোধনপাত্র’ হওয়ার এবং তা বোঝার উপযুক্ত হয়ে যেতে পারি তাহলে বিশ্বাস করুন, দুনিয়ার সব সাজসজ্জা, আরাম-আয়েশ ও ভোগ-ভিলাস তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ। এ ‘নেয়ামত-মহান’ যদি দান করেন আল্লাহ মেহেরবার, তাহলে জীবনের সব কিছু তাঁর জন্য কোরবান! তাহলে আপনার সাধনা ও অধ্যবসায় সফল, আপনার মা-বাবার ত্যাগ ও আম্মত্যাগ সার্থক। আপনি ধন্য, আপনার পরিবার ধন্য।

***

প্রিয় বন্ধুগণ! এ কথা ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করুন যে, এখানে আপনারা কী জন্য এসেছেন? কোন প্রাপ্তির আশায় জড়ো হয়েছেন? শিক্ষা জীবনের শুরুতেই নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে হৃদয়ে বদ্ধমূল করুন এবং চিন্তা ও চেতনাকে জাগ্রত করুন।

এই দ্বীনী মাদরাসায় তোমরা স্বেচ্ছায় এসেছো না অনিচ্ছায় সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা এই যে, তোমাদের মাঝে এবং তোমাদের খালিক ও স্রষ্টার মাঝে রয়েছে এক ‘স্বর্ণ-শৃঙ্খল’, যার এক প্রান্ত তোমাদের হাতে, অন্য প্রান্ত আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের কুদরতি কবযায়। অর্থাৎ তোমাদের মাঝে এবং আল্লাহর মাঝে এমন এক নূরানী রিশতা কায়েম হয়েছে যার বদৌলতে তোমরা তাঁর পাক কালাম বুঝতে এবং হৃদয়ঙ্গম করতে পারো, এমনকি আল্লাহর সঙ্গে কালাম করার তরীকাও জানতে পারো।

***

সবার আগে আমাদের জানতে হবে, মাদরাসার পরিচয় কী এবং তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? কোন মাদরাসার এ পরিচয় আমি মেনে নিতে রাজী নই যে, এখানে আরবী ভাষা শেখানো হয়, যাতে আরবী কিতাব পড়া যায় কিংবা দুনিয়ার কোন ফায়দা হাসিল করা যায়। এটা কোন দ্বীনী মাদরাসার পরিচয় হতে পারে না।মাদরাসা তো সেই পবিত্র স্থান যেখানে – আগেও আমি বলেছি – তালিবে ইলমের মাঝে এবং আল্লাহর মাঝে একটি প্রত্যক্ষ ও সুদৃঢ় সংযোগসুত্র সৃষ্টি হয়, যার এক প্রান্ত এদিকে, অন্য প্রান্ত স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কুদরতি হাতে।

আমাদের করণীয়

আমার প্রিয় তালিবানে ইলম! ভালো করে বুঝে নাও যে, এ মহান নেয়ামতের উপযুক্ত হতে হলে কী কী গুণ অর্জন করা এবং ন্যূনতম কোন কোন চাহিদা পূরণ করা দরকার?

প্রথমত নিজের মাঝে শোকর ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি সৃষ্টি করো। নির্জনে আত্মসমাহিত হয়ে চিন্তা করো যে, আল্লাহ তোমাকে নবীওয়ালা পথে এনছেন। এখন তুমি যদি আগের অন্ধকারে ফিরে যাও কিংবা এখানে থেকেও আলো গ্রহণে ব্যর্থ হও তাহলে এ তোমার দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কি বলো?

এ পথে তুমি প্রিয় নবীর পুণ্য পদচিহ্ন দেখতে পাবে এবং ইলমে নবুওয়তের আলো ও নূরের অধিকারী হবে। সবচে’ বড় কথা, এ পথে তুমি তোমার আল্লাহর রিযা ও সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে।

দ্বিতীয়ত নিজেকে যথাসাধ্য মাদরাসার পরিবেশ অনুযায়ী গড়ে তোলার চেষ্টা করো। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের নিজস্ব কিছু চাহিদা আছে এবং প্রতিটি পথের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। সফলতা লাভের জন্য সেই চাহিদাপূরণ করা এবং সেই বৈশিষ্ট্য অর্জন করা অপরিহার্য। মাদরাসায় এসেও যারা মাহরূম হয় তারা এজন্যই মাহরূম হয় যে, মাদরাসার পরিবেশ থেকে তারা কিছু গ্রহণ করে না, বরং পরিবেশকে দূষিত করে।

তুমি যে দ্বীন শিখতে এসেছো, এ পথের দাবী ও চাহিদা এই যে, ফরয ও ওয়াজিব আমলগুলো পাবন্দির সাথে আদায় করবে, নামাযের প্রতি ভালোবাসা ও যত্নপোষণ করবে, জামাতের বেশ আগে মসজিদে এসে নামাযের ইনতিযার করবে, যিকির ও নফল ইবাদাতের শওক এবং আল্লাহর কাছে চাওয়ার ও দু‘আ মুনাজাতের যাওক পয়দা করবে।

তৃতীয়ত আখলাক ও চরিত্রকে ইলমের স্বভাব অনুযায়ী গড়ে তোলার চেষ্টা করো। ইলমের স্বভাব হলো ছবর ও ধৈর্য, বিনয় ও আত্মবিলোপ, যুহদ ও নির্মোহতা এবং গিনা ও আল্লাহ-নির্ভরতা। সুতরাং এই ভাব ও স্বভাব যত বেশী পারো নিজের মাঝে অর্জন করো। হিংসা ও হাসাদ, অহংকার ও ক্রোধ, কৃপণতা ও সংকীর্ণতা ইত্যাদি হলো ইলমের বিরোধী স্বভাব। সুতরাং এগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিহার করো।

চতুর্থত তোমার চাল-চলন ও আচার-আচরণকে সুন্নতের পূর্ণ অনুগত করো। এ পথের ইমাম ও রাহবার যারা তাঁদেরই মত যেন হয় তোমার বাহ্যিক বেশভূষা।

এ সকল দাবী ও চাহিদা পূরণ করে দেখো দুনিয়া ও আখেরাতে তোমার মাকাম ও মর্যাদা কোথায় নির্ধারিত হয়! আল্লাহর কসম, তোমাদের সম্পর্কে আমার এ আশংকা নেই যে, দ্বীনী মাদরাসা থেকে ফারিগ হয়ে তোমরা অভাব ও দারিদ্র্যের শিকার হবে; আমার ভয় ও আশংকা বরং এই যে, আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের বে-কদরীর কারণে বিমুখতা ও বঞ্চনার আযাব না এসে পড়ে!

পক্ষান্তরে তোমরা যদি এ নেয়ামতের যথাযোগ্য কদর করো এবং পূর্ণ শোকর আদায় করো তাহলে প্রতিদানরূপে তোমাদের যোগ্যতা ও প্রাপ্তি বহুগুণ বেড়ে যাবে। দেখো আল্লাহ কত মযবুতভাবে বলেছেন-

যদি তোমরা শোকর করো তাহলে অবশ্যই আমি বাড়িয়ে দেবো, আর যদি কৃতঘ্ন হও তাহলে মনে রেখো, আমার আযাব অতি কঠিন।

আর শোনো, তোমার মাঝে এবং সবার মাঝে আল্লাহ রেখে দিয়েছেন কিছু সুপ্ত প্রতিভা ও ঘুমন্ত যোগ্যতা। ত্যাগ ও আত্মত্যাগ এবং নিরবচ্ছিন্ন সাধনার মাধ্যমে তুমি যদি সেই আত্মপ্রতিভার স্ফূরণ না ঘটাও এবং ইলমী যোগ্যতায় পরিপক্কতা অর্জনে সচেষ্ট না হও তাহলে তুমি ‘পদার্থ’ বলেই গণ্য হবে না এবং দুনিয়ার কোথাও তোমার কোন সমাদর হবে না; তুমি কোন কাজেরই হবে না।

***

পরিশেষে আবার আমি পরিষ্কার ভাষায় তোমাদের বলতে চাই, শিক্ষা জীবনের শুরুতেই নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝে নাও এবং নিজেদের মাকাম ও মর্যাদা চিনে নাও। ইলমের সাধনায় আত্মনিমগ্নতা এবং প্রতিভা ও যোগ্যতার বিকাশ সাধনে ঐকান্তিকতা- এই যেন হয় তোমার একমাত্র পরিচয়; আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভই যেন হয় তোমার একমাত্র উদ্দেশ্য। এছাড়া অন্যদিকে চোখ তুলেও তাকিয়ো না; অন্যকিছুতে মন দিয়ে বঞ্চিত হয়ো না। জীবন-কাফেলার বৃদ্ধ মুসাফিরের এ উপদেশ যদি গ্রহণ করো, ইনশাআল্লাহ দুনিয়াতেও তোমরা সফল হবে এবং সৌভাগ্য তোমাদের পদচুম্বন করবে। এরপর আল্লাহ রাব্বুল ইযযতের দরবারে যখন হাযির হবে তখন তোমাদের চেহারা হবে নূরে-ঝলমল। আল্লাহ তোমাদের কামিয়াব করুন। আমীন। ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

সূত্রঃ দারুল কলম প্রকাশিত “তালিবে ইলমের জীবন পথের পাথেয়” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
fall of muslim

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কি হারালো?

জুলাই ১২, ২০১৪
Download PDF

সংক্ষিপ্ত গ্রন্থাকার ও গ্রন্থ পরিচিতিঃ

বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী।  উপমহাদেশের গণ্ডী পেরিয়ে যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল আরব বিশ্বেও। তিনি ১৯১৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। উর্দু এবং হিন্দি উভয় ভাষাতেই তাঁর হাত ছিল সিদ্ধহস্ত। তিনি দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামার প্রাক্তন রেক্টর এবং পাশাপাশি রাবেতা মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি রাবেতা ফিকাহ কাউন্সিলের সদস্য এবং মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। ইসলামের সেবার জন্য ১৯৮০ সালে তিনি মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মাননা বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কার লাভ করেন। বর্তমান সময়ের স্বনামধন্য ইসলামী চিন্তাবিদ তারিক রমাদানের পিতা সাঈদ রমাদান (হাসান আল-বান্নার জামাতা) এর সাথেও  সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর উষ্ণ ও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল যা তারিক রমাদানের Islam, The West & The Challenges of Modernity বইটির ভূমিকায় আলোচিত হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক জগত ছাড়িয়ে তিনি মাঠ পর্যায়েও ছিলেন সদা তৎপর একজন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। মুসলিম সমাজে তো বটেই অমুসলিমদের কাছেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। ১৯৯৯ সনের ৩১শে ডিসেম্বর এই মহান মনীষী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু মুসলিম ভারতের এক ইতিহাসের সমাপ্তি এবং অদূর ভবিষ্যতেও এ শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়।

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কি হারালো তাঁর একটি বিখ্যাত গ্রন্থ যা সর্বপ্রথম মিসরের এক অভিজাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে আরবী ভাষায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে বইটি ইংরেজীতে Islam and The World নামে প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয় সংস্করণে গত শতাব্দীর অন্যতম মুসলিম মনীষী সাইয়েদ কুতুবের লিখিত ভূমিকায় বইটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে।  ২০০২ সনে এই মহামূল্যবান বইটি সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়।

বইটিতে মুসলিম বিশ্বের উত্থানের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের চিত্রায়ন মুসলিম মানসে ফিরিয়ে দেয় আত্ববিশ্বাস। অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ থেকে উন্নতির শীর্ষে মুসলিম বিশ্বের অবগাহন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মুসলিম বিশ্ব আজো ফুরিয়ে যায় নি। এই একবিংশ শতাব্দীতেও ইসলাম এনে দিতে পারে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সাফল্যের অপূর্ব সম্মিলন। কিন্তু সে পথ বন্ধুর, কণ্টকময়। পতনযুগের সার্বিক দিক বিবেচনা করে লেখক উচ্চারণ করেছেন এক সতর্কবাণী। সংকীর্ণ দৃষ্টিভংগী নিয়ে তিনি কি কেবল আধ্যাত্মিক ব্যর্থতার কথা-ই তুলে ধরেছেন? না, তা নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক তথা জ্ঞানের রাজ্যে মুসলিম বিশ্বের পশ্চাদপদতার দিকেও তিনি অংগুলি নির্দেশ করেছেন। এখানেই লেখক পরিসমাপ্তি ঘটাননি, সামরিক ক্ষেত্রে অদক্ষতাকে সমানভাবেই দায়ী করেছেন। বইটির পাতায় পাতায় পাঠক যেন অন্তরের এক গভীর ক্রন্দন খুঁজে পাবেন। তবে স্মৃতিকাতরতা আর সমালোচনা নয়, জীবনের ময়দানে মুসলিম বিশ্বকে নতুন প্রস্তুতির দিকে আহবান করে এক সুসংবদ্ধ দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।

বইটি এতই আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় যে মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমুনের প্রশিক্ষণী সিলেবাসের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। স্টাডি সার্কেল ও ট্রেনিং সেশন থেকে শুরু করে জেলখানা পর্যন্ত এর প্রচার ও প্রসারের কাজ করা হয়। আদালতের বিতর্কে ও পার্লামেণ্টের বক্তৃতায়ও এ বই থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে।  গত শতাব্দীর অন্যতম মুসলিম মনীষী সাইয়েদ কুতুবের সাপ্তাহিক আলোচনায় বইয়ের সারসংক্ষেপ ও তার উপর আলোচনা-পর্যালোচনা হত। তরুণ সমাজকে ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও আদর্শে উদ্বুদ্ধকরণে বইটি বিশেষভাবে সহায়ক।

রাসূল আকরাম (সা)-এর আবির্ভাবের পূর্বেঃ

নবুয়াতের পূর্ববর্তী সময়ের সমগ্র বিশ্বের বীভৎস চিত্র ফুটে উঠেছে এই লেখনীতে এক নিরপেক্ষ দৃষ্টি ভঙ্গিতে। এইচ জি ওয়েলস্‌ ও রবার্ট ব্রিফল্ট এর মত উঁচু মাপের পশ্চিমা গবেষকদের সম্ভার থেকেই প্রমাণ করে  দেওয়া হয়েছে প্রাক-ইসলামী যুগে ইউরোপের  অন্ধকারাচ্ছন্নতার  কথা। ঐ সময়ে যৌন অরাজকতা, বর্ণবৈষম্য, নারীর অমর্যাদা আর মূর্তিপূজার মত মানব বিধংসী কর্মকান্ডের প্রাদূর্ভাব লক্ষ করা যায়। আরব সমাজের অন্ধ গোত্রপ্রীতি আর যুদ্ধবিগ্রহ তৎকালীন সমাজে বিষফোঁড়ার মত কাজ করছিল। রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল নিরংকুশ স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র যেখানে অত্যাচারী শাসকের নিকট সাধারন মানুষ ছিল বন্দী আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও ছিল বৈষম্যমূলক। বইটির প্রথম অধ্যায় ছিল মূলত এই সমস্ত বিষয়াবলীর প্রতি কেন্দ্রীভুত।

রাসূল আকরাম (সা)-এর আবির্ভাবের পরঃ

এ অধ্যায়ে মানবতার  মুক্তির দূত মুহাম্মদ (সঃ) এর আবির্ভাব এবং পূর্ববর্তী অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ হতে এক পরিপূর্ণ, অদ্বিতীয় ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজে উত্তরণের ধাপ সমূহ বর্ণিত হয়। এই অংশে লেখক এ উত্তরণকে এক পরিপূর্ণ সংস্কার হিসেবে উল্লেখ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর নৈতিক প্রশিক্ষণ এবং তাঁর প্রভাব কিভাবে তাদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে তা এখানে আলোচিত হয়েছে।

মুসলমানদের নেতৃত্বের যুগঃ

মুসলমানদের নেতৃত্বের আসনে পরিপূর্ণ আসন গ্রহণ এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের সর্বক্ষেত্রে অবদানকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই অংশে। মুসলমানদের এই অগ্রগতি পরবর্তীতে ইউরোপীয় রেঁনেসাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে  এবং ইউরোপীয় জ্ঞানবিজ্ঞানে কিরুপ অবদান রেখেছে তা মুসলমানদের নেতৃত্বের যুগ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। জীবন সম্পর্কে মুসলমানদের ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা আধুনিক সময়ে মুহাম্মদ আসাদের মত ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ইহুদী ব্যক্তিত্বকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে কিভাবে অনুপ্রাণিত করেছে তাও এ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।

 

মুসলমানদের পতন যুগঃ

এ অংশে মুসলমানদের পতন যুগ আলোচিত হয়েছে। মুসলমানদের এ পতনের উৎসমূল হিসেবে লেখক চিহ্নিত করেছেন জিহাদ ও ইজতিহাদের অভাবকে। খুলাফায়ে রাশেদীনের পর মুসলিম শাসকদের নৈতিক অধঃপতন পরবর্তীতে রাজতন্ত্রের দিকে রূপ নেয়। রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে ধর্ম ও রাজনীতির যে বিভাজন শুরু হয় তা ইসলামকে তার দুনিয়ার নেতৃত্বের আসন থেকে সরিয়ে দেয়। গ্রন্থকার তৎকালীন সময়ের মুসলিম চিন্তানায়কদের অধিবিদ্যা ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে অহেতুক মনোযোগ প্রদানকে পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। পক্ষান্তরে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান অবহেলার পাত্র হিসেবে পরিগনিত হয়। গ্রীক দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব মুসলিম পন্ডিতদের এক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রভাবিত করে।  পাশাপাশি শিরক ও বিদআত এর আবির্ভাবে ইসলামের প্রাণশক্তি নির্জীব হয়ে পড়ে। অপরপ্রান্তে খ্রিষ্টান ইউরোপ শতাব্দীর পর শতাব্দী মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে রত ছিল। কেননা মুসলমানরা গোটা প্রাচ্যের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল এবং খ্রিষ্টানদের সকল পবিত্র স্থাপনায় মুসলমানদের দখলে ছিল। কিন্তু মুসলমানদের পতনের যুগে তা আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হল না। ক্রুসেডাররা বায়তুল মুকাদ্দাসে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করল। ক্রসেডারদের এই অভিযানের পরিণতি ছিল খুবই ভয়াবহ। এই পতন যুগেও নুরুদ্দীন জঙ্গী ও সালাউদ্দীন আইয়ুবীর মত নেতৃত্ব মুসলিম বিশ্বকে আরো কিছু সময়ের জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করে। উত্তম চরিত্র, আল্লাহভীতি আর জিহাদী প্রেরণার সমন্বয়ে এই দুই মনীষী ক্রুসেডারদের উপর্যূপরি পরাজয় বরণে বাধ্য করেন।  তাঁদের অনূপম চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনুল আছীর জাযারী তাঁর ‘তারীফুল কামিল’ নামক গ্রন্থে বলেন,

“আমি বিগত  সুলতানদের জীবন ও সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে গভীরভাবে পড়াশুনা করেছি। খুলাফায়ে রাশেদীন ও ওমর ইবনুল আবদুল আযীযের পর নুরুদ্দীনের চেয়ে অনুপম চরিত্রের অধিকারী ও তার চেয়ে অধিক ন্যায় বিচারক সুলতান আমি আর দেখিনি।”

কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় এসেছিল তারই হাতে গড়া ও প্রশিক্ষিত সুলতান সালাউদ্দিনের হাতে। বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করে তিনি মুসলমানদের সুদীর্ঘ ৯০ বছরের আকাংখা পূর্ণ করেন। সুলতান সালাউদ্দীনের অনুগ্রহের কথা ঐতিহাসিক লেনপুন এর ভাষায় উঠে এসেছে এভাবেঃ

সুলতান সালাউদ্দীনের সমস্ত গুনের ভেতর কেবল এই একটি গুনের কথা যদি দুনিয়া জানত; যদি জানতে পারত তিনি কিভাবে জেরুজালেমকে অনুগৃহীত করেছিলেন তাহলে তারা এক বাক্যে স্বীকার করত, সুলতান সালাউদ্দীন কেবল তার যুগের নন, বরং সর্বযুগের সর্বাপেক্ষা উন্নত মনোবলসম্পন্ন হৃদয়বান মানুষ এবং বীরত্ব ও ঔদার্যের জীবন্ত প্রতীক ছিলেন।

কিন্তু সুলতান সালাউদ্দীনের পর মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব পুনরায় স্থবির হয়ে পড়ে। আর ঠিক এই সময়েই অত্যাচারীদের বন্য ও বর্বর আক্রমন সংগঠিত হয়।  ৬৫৬ হিজরীতে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বাগদাদে ব্যাপক হত্যা ও ধ্বংসের রাজত্ব চলে যা তৎকালীন বিশ্বের গৌরবজ্জ্বল ও জমজমাট শহরটিকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। পরবর্তীতে মিসরীয় সেনাবাহিনী তাতারীদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়। যদিও ততদিনে তাতারী আক্রমণের ফলে মুসলিম বিশ্বের চিন্তা ও শক্তিতে নির্জীবতা ও উদাসীনতা জন্ম নেয় যা হতাশা ও স্থবিরতায় রূপ নেয়। হিজরী অষ্টম শতাব্দীতে উসমানীয়  তুর্কীরা ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে এসে হাজির হয় এবং একই সাথে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বুকে রাজত্ব কায়েমে সক্ষম হয়। কিন্তু তুর্কীদের এ উত্থানও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি এবং ধীরে ধীরে তাদের মাঝেও স্থবিরতা ও পশ্চাৎপদতা লক্ষ করা যায়।

মুসলিমদের এ বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানগত অধঃগতির যুগেও গ্রন্থকার বেশ কিছু নক্ষত্র তুলে এনেছেন তার গ্রন্থে যারা ছিলেন স্বমহিমায় ভাস্বর । এ সময় ইবনে খালদুনের মত মনীষী মুসলিম বিশ্বকে মুকাদ্দিমার ন্যায় গ্রন্থ উপহার দেন। উপমহাদেশের হযরত শায়খ আহমদ সরহিন্দী মুজাদ্দিদ আলফেছানী , হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী, তার পুত্র শাহ রফীউদ্দীন দেহলভী, হযরত শাহ ইসমাইল শহীদ দেহলভী স্ব স্ব ক্ষেত্রে ছিলেন যুগান্তকারী মনীষী। তুর্কীদের সমসাময়িক প্রাচ্য সমাজের দিকেও দৃষ্টিপাত করা হয়েছে এ গ্রন্থে। ভারতবর্ষের মোঘল সম্রাজ্যের সর্বশেষ শক্তিশালী সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর যিনি সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি, বিজয়ের আধিক্য, দীনদারী ও ধর্মীয় জ্ঞানবত্তারদিক দিয়ে ভারতবর্ষের সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দাবিদার ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী মোঘল বাদশাদের অযোগ্যতা ও দুর্বল নেতৃত্বের কারণে ইংরেজ শাসনের প্রতিষ্ঠা ঘটে।

প্রাচ্য ভূখন্ডে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য ছিল ইরানের সম্রাজ্ঞীর হুকুমাত কিন্তু শী’আ মতবাদ নিয়ে বাড়াবাড়ি ও এর প্রতি অতিমাত্রায় স্পর্শকাতরতা প্রদর্শন এবং তুর্কীদের সংগে সংঘাত সংঘর্ষ তাকে সুস্থ মস্তিস্কে গঠনমূলক চিন্তার অবকাশ দেয়নি। খ্রিষ্টীয় ষষ্টাদশ ও সপ্তদশ শতাব্দী ইউরোপের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই দীর্ঘ সময়টাতে  ইউরোপ তার দীর্ঘ নিদ্রা থেকে আড়ামোড়া ভেঙে জেগে উঠেছিল। জ্ঞান বিজ্ঞানে কোপার্নিকাস, ব্রুনো, গ্যালিলিও, কেপলার ও নিউটনের মত মনীষীর আগমন ঘটে; পর্যটক ও নাবিকদের মধ্যে কলম্বাস, ভাস্কো দা গামা, ও ম্যাগলিন এর মত উদ্দমী, সাহসী ও দৃঢ়বেত্তা ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে যারা অজানা অনেক দেশ আবিস্কার করেন।

বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে পাশ্চাত্য জগত ও তার ফলাফলঃ

পরবর্তী অধ্যায়ে নেতৃত্বের আসনে পাশ্চাত্য জগত ও তার ফলাফল আলোচিত হয়েছে। গ্রন্থাকার এখানে পাশ্চাত্য সভ্যতার চিন্তাগতের উৎসমূল নিরুপন করার চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন পাশ্চাত্য সভ্যতা কোন স্বল্প বয়সী সভ্যতা নয় যার জন্ম বিগত কয়েক শতাব্দীতে হয়েছে। বরং এই সভ্যতার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো। গ্রীক ও রোমান সভ্যতার রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ও তাত্ত্বিক দর্শনকে পুঁজি করে এ সভ্যতা গড়ে উঠেছে। গ্রীক সভ্যতার বস্তুবাদী চিন্তা, ভোগবাদীতা এবং দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পাশ্চাত্য সভ্যতার দর্শনকে অনুপ্রাণিত করে।  এরিস্টটলের নৈতিক বিধিব্যবস্থার শীর্ষে ছিল দেশপ্রেম যা গ্রীকদের জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারনাকে সমর্থন করে। রোম সভ্যতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল রাজতন্ত্র প্রীতি, সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা ও জীবন সম্পর্কে নির্ভেজাল বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী। কিন্ত পরবর্তীতে রোমকদের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ ছিল এক বৈপ্লবিক ঘটনা যদিও তা পরবর্তীতে খ্রিষ্টধর্মকে মূর্তিপুজার মিশ্রণের দিকে ধাবিত করে। খ্রিষ্টধর্মের এই বিকৃত রূপ রোমকদের পতনরোধে সক্ষম ছিল না। তাই বিপরীতক্রমে জন্ম নিল বৈরাগ্যবাদ যা ছিল প্রকৃতি বিরোধী এবং এক প্রকার বিকৃতি।  খ্রিস্ট একাদশ শতাব্দীতে গীর্জা ও রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত শুরু হয় এবং তা মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করে। পোপের বিস্তৃত ক্ষমতা ও বিশাল সাম্রাজ্য, ধর্মগ্রন্থে সংযোজন, পরিমার্জন ও বিকৃতি সাধন এবং ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সংঘাত যার পরিণতি ছিল চার্চের অত্যাচার ইত্যাদি ঘটনা ধর্মের বিরুদ্ধে রেঁনেসাপন্থীদের বিদ্রোহ করতে অনুপ্রাণিত করে। বিজ্ঞানী ব্রুনো ও গ্যালিলিওর নির্মম পরিণতি ছিল চার্চের অত্যাচারের প্রধান স্বাক্ষর। ইউরোপের রেঁনেসা জন্ম দিল এমন সব লেখক, সাহিত্যিক, সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর যারা বস্তুবাদের শিঙ্গায় ফু দিলেন এবং জনগণের মনমস্তিস্কে বস্তুবাদের বীজ বপন করলেন।  মেকিয়াভেলীর ‘ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা’ এই দর্শন ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা পায়। কার্লমার্কসের অর্থনৈতিক সর্বেশ্বরবাদ আর ডারউইনের বিবর্তনবাদের প্রভাব ছিল এ সময় অপরিসীম। একই সাথে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ ছিল উল্লেখযোগ্য। বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের অপ্রপ্রয়োগ বস্তুবাদের এই যুগে ব্যাপক হারে পরিলক্ষিত হয়।

পাশ্চাত্যের নেতৃত্ব থাকাকালে পৃথিবীর পারিভাষিক ক্ষয়ক্ষতিঃ

পাশ্চাত্যের নেতৃত্ব থাকাকালে পৃথিবীর পারিভাষিক ক্ষয়ক্ষতি গ্রন্থকার এ অধ্যায়ে ফুটিয়ে তোলেন। ধমীর্য় অনূভূতির অভাব ও নৈতিক অধঃপতনকে তিনি বিশেষ ভাবে ইঙ্গিত করেন। কিন্তু এর মাঝেও গ্রন্থকার উপমহাদেশের অনেক সুলতান ও আলেমের জীবন পর্যালোচনা করেন যা ছিল পতন যুগে অকল্পনীয়।

জীবনের ময়দানে মুসলিম বিশ্বঃ

জীবনের ময়দানে মুসলিম বিশ্বের আলোচনায় নেতৃত্বের অভাবকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। গ্রন্থকার এখানে অর্থপূর্ণ প্রস্তুতি ও চেতনাবোধের প্রশিক্ষণের কথা বলেছেন। শিল্প-প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রস্তুতি এবং নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা গঠনের আহবান জানিয়েছেন।

আরব বিশ্বের নেতৃত্বঃ

সর্বশেষ আরব বিশ্বের নেতৃত্ব গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়েছে। আরব বিশ্বের ভৌগলিক গুরুত্বের উপর তিনি খুব জোর দিয়েছেন। পার্থিব লালসা থেকে মুক্ত হয়ে মানবতার মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহন করার আহবান জানিয়েছেন মহান দার্শনিক ইকবালের কবিতার মাধ্যমে -

 “কাবার নির্মাতা তুমি ঘুম থেকে জেগে ওঠো ফের

হাতে তুলে নাও ফের দায়িত্ব গড়া এ বিশ্বের।”

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather