আল-ফারাবি এবং সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া ধারণা

ইব্রাহিম কালিন | ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০১৭
Download PDF

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দার্শনিকদের অন্যতম একজন হলেন আবু নাসর মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ আল-ফারাবি (৮৭২-৯৫০)। অধিবিদ্যা (metaphysics), জ্ঞানতত্ত্ব অথবা রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা কখনো হারিয়ে যায় না। ইবনে ফারাবির ‘নৈতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত নগর’ (আল-মাদিনাহ্‌ আল ফাদিলাহ্‌) ধারণাটি ইসলামী এবং গ্রীক নীতিশাস্ত্র ও রাজনৈতিক চিন্তাব্যাবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায় প্রতিনিধিত্ব করে।

তিনি নগর জীবন, সভ্যতা এবং অধিবিদ্যার মাঝে একটি সংযোগ সৃষ্টি করেছেন। যদিও এই ধারণাগুলো সঠিক অর্থে আমাদের পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছে, কিন্তু মানুষের উপযুক্ত আবাস হাজির থাকার জন্যে এই ধারণাগুলোর পারস্পারিক সংযোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আল-ফারাবির এই সংযোগ প্রচেষ্টাকে তাই পুনরুদ্ধার করার প্রয়োজন রয়েছে।

১৭৫৭ সালে ‘সভ্যতা’ শব্দটি প্রথম যখন ভিক্টর রিকেতি মিরাবু তার “মানুষের বন্ধু বা জনগণের চুক্তিনামা” (L’ami des hommes ou traité de la population) শীর্ষক গ্রন্থে ব্যবহার করেছিলেন, তখন থেকেই এই শব্দটির সাথে একটি বাজে ইতিহাস জড়িত ছিল। শব্দটির এহেন খারাপ পরিচয় ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। উপনিবেশবাদীরা তাদের তথাকথিত “সাদা মানুষের গুরুদায়িত্ব” এবং “সভ্যায়ণ কর্মসূচি”–কে ন্যায্যতা প্রদানের জন্যে ‘সভ্যতার’ ধারনাটি ব্যবহার করেছিল।

১৮ শতাব্দীতে এসে পৃথিবীটা সুস্পষ্টভাবে ‘সভ্য’ ও ‘অসভ্য’ দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এটি আশ্চর্যজনক নয় যে, ইউরোপ প্রতিনিধিত্ব করেছিল সভ্যতার, এবং পৃথিবীর বাকি অংশটা আদিমতা আর বর্বরতার। সভ্য জাতিগোষ্ঠীর মাঝে শামিল হবার জন্য অসভ্য জাতিগুলোর প্রয়োজন হয়েছিলো পশ্চিমা সভ্যতার যাদুকরী এবং প্রায়ই কঠোর স্পর্শের।

প্রায় দুই শতাব্দী পর একবিংশ শতাব্দীতে যখন স্যামুয়েল হান্টিংটন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর তাঁর বিখ্যাত একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন, সেখানে সভ্যতার পরিবর্তে সরাসরি “সংঘাত”-কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। হান্টিংটন পুরাতন উপনিবেশবাদীদের মত ছিলেন না ঠিক, কিন্তু তাঁর ‘সংঘাত তত্ত্বটি’ শেষে গিয়ে ক্লাসিক্যাল পশ্চিমা উপনিবেশবাদেরই কাছাকাছি একটি ধারণাকে সমর্থন দিয়েছে। তাঁর সংঘাত তত্ত্বের বাজারীকরণের ফলে যে প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে, আমরা এখনো তা মোকাবেলা করছি।

সভ্যতা শব্দটির আজ যে অপব্যবহার হচ্ছে, সেখানে একজন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারক হিসাবে আল-ফারাবিকে আনা যেতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক মডেল যেটিকে তিনি ‘নৈতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত নগর’ (আল-মাদিনাহ্‌ আল ফাদিলাহ্‌) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তা প্লেটো-এরিস্টটলীয় চিন্তার এবং সেইসাথে ইসলামের উন্নত জীবন, সুখ ও অধিবিদ্যা ধারণাগুলোর ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হয়েছে। তাঁর মৌলিক প্রস্তাবনাটা হল অধিবিদ্যা এবং নৈতিকতার ভিত্তি ব্যতীত কোনো সভ্যতা ও নগর জীবন হতে পারে না।

শহর হচ্ছে মানব জীবনের সার্বিক মানোন্নয়নের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট একটি সামষ্টিক ব্যাবস্থা। শহর মানুষের সত্ত্বাগত একটি প্রয়োজন; কারণ, কোনো মানুষ একা একা বাস করতে পারে না, এবং একা একা তার নিয়তি পূর্ণ করতে পারে না। ‘একজন মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং তার সর্বোচ্চ উৎকর্ষ সাধনের জন্যে’ তার অন্য মানুষের প্রয়োজন হয়।

মানুষের সমষ্টিগত জীবনের উদ্দেশ্য হোলো তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নৈতিক উৎকর্ষ সাধন করা। এ কারণে মানুষের সত্ত্বা ও নৈতিকতার ধারণা একটি অর্থপূর্ণ শহরের আকার গড়ে তুলতে ভুমিকা রাখে, যেখানে কেবল পাশবিক বাসনা পূরণ এবং অন্যের উপর আধিপত্য জাহির করা প্রধান নয়, বরং একটি সুখী জীবনযাপন করাই উদ্দেশ্য – এরিস্টটলের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘উন্নত জীবন’।

আর যাই হোক না কেনো, সমষ্টিগত জীবন জরুরীভাবে একাই কল্যাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। মানুষের সকল কার্যক্রমই নৈতিক পছন্দ ও অপছন্দের দ্বারা পরিচালিত হয়, তাই, শহর ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সত্য এবং পারস্পারিক সহানুভূতির উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে যে শহরের বাসিন্দারা তাদের বুদ্ধিমত্তা ও ইচ্ছাশক্তির ব্যবহার করে এবং সর্বসাধারণের ভালোর জন্যে কাজ করে সেটাই একটি ভালো শহর। অর্থনৈতিক শক্তিমত্তা, সামরিক বা তথ্যপ্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠতার কারণে একটি শহর, দেশ বা সাম্রাজ্য মানব আবাসস্থল হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠে না, বরং নৈতিক সংশোধন ও আধ্যাত্মিক সুখের অঙ্গিকারই মানব আবাসস্থলকে আকাঙ্খিত করে তোলে।

ন্যায়-নীতিপূর্ণ একটি শহর এবং বৃহত্তর ক্ষেত্রে একটি সভ্যতার সবার আগে বস্তুগত ভিত্তিমূলের পরিবর্তে বরং একটি অধিবিদ্যিমূলক ভিত্তিমূল থাকে। আল-ফারাবীর সংজ্ঞা অনুসারে, সুখ ও উন্নত জীবন কেবল তখনি লাভ করা যায়, যখন কেউ সত্যের সন্ধান পায় এবং ‘বিমূর্ত বুদ্ধিমত্তার (disembodied intellect) সাথে একতাবদ্ধ হয়’ অর্থাৎ বস্তুগত আবেদন ও কামনার বেড়াজালে আবদ্ধ এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর বাইরে বোধগম্য সত্যের দুনিয়া।

‘সত্য’ ব্যতীত আমরা না পারব প্রকৃতির হক আদায় করতে, আর না পারব মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতে। যদিও মানব সমাজ তাদের নগর জীবনের বস্তুগত ভিত্তিকে অগ্রাহ্য করতে পারে না; সুতরাং, বিষয়টি পৃথিবীকে বর্জন করার ব্যাপারে না, বরং পৃথিবীকে তার উপযুক্ত স্থানে রাখা এবং এর ভিতরে নিমজ্জিত না হওয়া।

আল ফারাবি নগর জীবন ও সভ্যতার অধিবিদ্যামূলক ভিত্তির উপর এতই জোরালোভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন যে তাঁর রাজনৈতিক লেখনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনি অধিবিদ্যা (metaphysics), সৃষ্টিতত্ত্ব (cosmology) এবং তত্ত্ববিদ্যার (ontology) জন্যে উৎসর্গ করেছেন। তিনি তাঁর পাঠকদেরকে রাজনীতি বুঝার আগে সত্তা ও অস্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ ক্রমধারাটা (great chain of being) বুঝার আহবান জানিয়েছেন। ইসলামী বুদ্ধিভিত্তিক ঐতিহ্যের প্রকৃতি অনুসারে এটা বোধগম্য যে আসমানি আদেশের মৌলিক রীতিনীতি অনুধাবন করা ব্যতীত কোনো ধরণের রাজনৈতিক ব্যাবস্থাই টিকে থাকতে পারে না।

মানবজাতি তার অস্তিত্বের সার্বিক প্রাসঙ্গিকতা যে প্রেক্ষাপটে আমরা বুদ্ধিমান ও স্বাধীন মানুষ হিসেবে বসবাস করি তা বোঝাপড়াই না আনলে কোন সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন সুখ বয়ে আনবে না এবং জীবন পরিপূর্ণতা পাবে না। সত্য, প্রজ্ঞা ও ন্যায়-নীতি এই ধারণাগুলোর সাথে বিভিন্ন জাতি একমত না হলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না।

ইবন সিনা তাঁর মাস্টারপিস ‘শিফা’-এর মধ্যে এই বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, কিছু ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা ব্যতীত মানুষের পারস্পারিক সহযোগিতাগুলো অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে না; আর তা তখনি কেবল সম্ভব হয়, যখন মানুষ সঠিক পথ (সুন্নাহ্‌) এবং ন্যায়-নীতি (‘আদল)-এর দ্বারা পরিচালিত হয়। দেখুন, ইবনে সিনা এখানে সমষ্টিগত জীবন, নগরায়ন এবং সভ্যতাকে উচ্চতর নৈতিক ভিত্তির উপর স্থাপন করার জন্যে ‘সুন্নাহ’ শব্দটি ব্যাবহার করেছেন। এখানের ‘সুন্নাহ্‌’ শব্দটি এবং রাসূল (স)–এর সুন্নাহ্‌—শব্দ দুটি একই। রাসূল (স)–এর সুন্নাহ্‌ হোলো এমন একটি সঠিক পথ যা বিশ্বাস, বুদ্ধিমত্তা ও সৎকাজের উপর ভিত্তি করে জীবন পরিচালনার রূপরেখা প্রদান করে।

ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (স)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি সঠিক পদ্ধতিতে মদিনায় একটি ইসলামী শহর গড়ে তোলেন। মদিনার মুসলিম শাসনের একদম শুরুর দিকের মুসলিম সমাজ সেখানে শুধু নগর জীবনের স্বাদ-ই পায়নি, বরং একটি সভ্যতার ভিতরে থাকার অভিজ্ঞতাও লাভ করেছিলো। মদিনার এই অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যৎ ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি তৈরি করেছিল। শাব্দিক উৎপত্তির দিক থেকে আরবি ও পশ্চিমা ভাষাগুলোতে ‘শহর’ ও ‘সভ্যতা’ শব্দ দুটি সাদৃশ্য রাখে যেটি ন্যায়নীতিপূর্ণ শহর ও সভ্যতার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখে। ইবনে সিনা শাব্দিক এ বিষয়টা খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন, এবং একটি অর্থপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের জন্যে সত্য-ন্যায়বিচারের সঠিক পথের গুরুত্ব কেমন তা উল্লেখ করেছেন।

আমরা আজ বৈশ্বিক যে দুর্যোগের মুখে আছি, সেখানে নগর জীবন এবং সভ্যতার এই অর্থগুলো আমাদের পুনরুদ্ধার করা উচিত। সভ্যতাকে সাম্রাজ্যবাদ ও দখলদারিত্বের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে আমাদেরকে সত্য, পুণ্য, বোঝাপাড়া ও সহমর্মিতার মূলনীতির উপর ভিত্তি করে সভ্যতা গড়ে তুলতে হবে।

সূত্রঃ Daily Sabah

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
৫৪৮ বার পঠিত
  • Mamun Abdullah

    রাসূল (স)–এর সুন্নাহ্‌ হোলো এমন একটি সঠিক পথ যা বিশ্বাস, বুদ্ধিমত্তা ও সৎকাজের উপর ভিত্তি করে জীবন পরিচালনার রূপরেখা প্রদান করে।

  • ওয়াহিদ সুজন

    প্লেটো ধারণাটা তখনকার নগররাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠে। যাকে আদর্শ রাষ্ট্র বলা হয়। ফারাবির আলোচনায় স্রেফ ‘শহর’ শব্দটা কেমন যেন লাগে, যেখানে আমরা রাষ্ট্রের ধারণা ও রাষ্ট্রের মধ্যেই বসবাস করি। ‘শহর’ যাকে বৃহত্তর অর্থে সভ্যতা বলা হচ্ছে- সে শহর ব্যাপারটা স্পষ্ট করলে ভালো হয়। যেহেতু বর্তমান সময়ের মধ্যে রেখেই আলোচনা করা হচ্ছে। জানতে চাই, রাষ্ট্রের মধ্যে তার ভিত্তি বা উপযোগিতা কী? নাকি প্লেটোর ইউটোপিয়ার মতোই ব্যাপার।