মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতাঃ উম্মাহ্‌র জন্য শিক্ষনীয়

মাহাথির মোহাম্মদ | অক্টোবর ১১, ২০১৫
Download PDF

মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক সঙ্কট নিরসনে আমার ভূমিকার জন্য আমাকে ‘লাইফ টাইম এ্যাচিভমেন্ট এ্যাওয়ার্ড’ (Life Time Achievement Award) প্রদান করায় আমি আমেরিকার ফাইন্যান্স হাউজ ‘লারিবা’ (Lariba)- কে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি জানতে পেরেছি যে, প্রথম এই এ্যাওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে আমাকে; এজন্য আমি বিশেষভাবে সম্মানিত বোধ করছি।

অত্যন্ত বিনয় ও ধন্যবাদের সাথে আমি এই স্বীকৃতি গ্রহণ করলেও বাস্তবে মালয়েশিয়ার জনগণ সত্যিকারভাবে এই এ্যাওয়ার্ড পাওয়ার জন্য উপযুক্ত। আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করার কতিপয় শক্তির সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার বিপুল জনগোষ্ঠীর আন্তরিক সমর্থন, গভীর উপলব্ধি ও পূর্ণ সহযোগিতা থাকায় আমরা আমাদের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি। আইএমএফ (IMF) বা বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোন দেশের সহায়তা ছাড়াই একাজ আমাদের নিজেদেরকেই করতে হয়েছে। এজন্য আমি মালয়েশিয়ার জনগণের সম্মানের স্মারক হিসেবে ‘লারিবা’র কাছ থেকে এই মর্যাদাপূর্ণ এ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করছি।

ইসলামী বিশ্বে এখন দেখা যায় আপাতবিরোধী ও পরস্পরবিরোধী সত্য। সম্পদের দিক থেকে সম্পদশালী হলেও আমরা অর্থনৈতিকভাবে গরীব ও দুর্বল। আমাদের মধ্যে অনেকে বসবাস করে প্রাচুর্যের মধ্যে। কিন্তু উম্মাহর অধিকাংশ লোক বাস করে হীন দারিদ্রের মধ্যে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয়ে অনেক কিছু অর্জিত হলেও মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ লোক ব্যাপক অজ্ঞতা ও পশ্চাতপদতার মধ্যে আছে। ইসলামের স্বর্ণযুগের সাথে এই অবস্থান সুম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই সময়টা ছিলো জাগতিক ও আধ্যাতিক অর্জনের স্বর্ণযুগ – বিজয় ও ঔজ্জ্বল্যের যুগ। পারস্য সাম্রাজ্য ও রোমান সাম্রাজ্যের অনেক অংশ মুসলমানদের পদানত হয়। ইসলাম অতি দ্রুত একটা নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে – এর বিস্তৃতি ছিলো পায়রিনিস (Pyrenees) থেকে হিমালয় পর্যন্ত। ওই সাম্রাজ্য ছিলো রোমান সাম্রাজ্য থেকেও বড়।

আমরা আগে যা ছিলাম, সেই তুলনায় এখন কতটা নিচে পতিত হয়েছি। ইসলামী বিশ্বকে এখন গভীরভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে– আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই কি না এবং কিভাবে এগিয়ে যেতে চাই সে সম্পর্কে। আমি বলি, আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই কি না তা ভেবে দেখতে হবে। কারণ আমাদের মধ্যে বেশ কিছু সংখক লোক তা চান না এবং অনেকে তাদের বিরোধিতা করতে ভয় পান এজন্য যে, তারা তাদের অবস্থানকে এবং তারা যা কিছু করে তার সব কিছুতেই ইসলামকে কারণ হিসেবে যুক্তি দেখান। আমরা যদি এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করি তাহলে ওই ধরণের প্রয়াস কোন কাজে আসবে না।

প্রাথমিক যুগের বড় বড় ব্যবসায়ী মুসলমানদের মতো মালয়েশিয়াও মুক্ত ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশ্বাসী। মালয়েশিয়ায় আমদানি-রফতানির ওপর কোন বাধা-নিষেধ নেই। আমরা সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগকে (এফডিআই) সাদরে আমন্ত্রণ জানাই এবং মূলধন ও লাভ স্বদেশে ফেরত নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও কোন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করি না। আমরা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেছি যেন মুসলমানরা আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুফল ভোগ করতে পারে। কিন্তু এ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হলো ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আমরা মিতব্যয়ী। বাড়তি তহবিল থাকলে আমরা বৈদেশিক ঋণ আগেই পরিশোধ করে দেই। এ সরকারের ইতিহাসে কখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ঘাটতির মূলধনে পড়তে হয়নি। আমরা একটা লাভজনক ও গতিশীল স্টক এক্সচেঞ্জ গড়ে তুলেছি – এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার কোম্পানীগুলো সহজে তাদের মূলধন বৃদ্ধি করতে পারে। আমরা বেসরকারীকরণ নীতি গ্রহণ করেছি ব্যাপকভাবে। আমরা বিশ্বাস করি যে, সরকারকে তার উন্নয়ন কৌশলে বাস্তবমুখী ও প্রায়োগিক হতে হবে এবং অন্য দেশে সফলভাবে বাস্তবায়িত কর্মসূচীর মূল্যায়ন করতে হবে। চাকাকে নতুনভবে আবিষ্কার করার কোন প্রয়োজন নেই।

একইভাবে, প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের মতো আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক। প্রথমেই প্রয়োজন উৎপাদন বৃদ্ধি। জিডিপি বৃদ্ধির জন্য প্রথাগতভাবে যা করার দরকার তার সবকিছুই আমরা করেছি; ইকুইটির সাথে উৎপাদন বৃদ্ধি আমরা নিশ্চিত করেছি। পশ্চিমা দেশগুলো এ ধারণার সমালোচনা করেছে, কারণ তারা সবচেয়ে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তির বেচেঁ থাকার ও সমৃদ্ধি অর্জনের নীতিতে বিশ্বাস করে।

বিভিন্ন মানবগোষ্ঠী ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত মালয়েশিয়ায় ইকুইটির সাথে উৎপাদন বৃদ্ধির একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। ভূমিপুত্র নামে পরিচিত দেশীয় লোকের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ষাট ভাগ। আর ভূমিপুত্রদের মধ্য শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমান। সম্পদ ও আয়ের দিক থেকে ভূমিপুত্র লোকেরা অ-ভূমিপুত্র লোকদের চেয়ে সব সময় পেছনে পড়ে আছে। ১৯৭০ সালে আমরা একটা নতুন অর্থনৈতিক নীতি কার্যকর ধারায় ভূমিপুত্রদের অংশ নিশ্চিত করি। ধনীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তা গরীবদের দিয়ে এই নতুন অর্থনৈতিক নীতি কার্যকর করা হয়নি। এই নীতির বাস্তবায়ন করা হয় এমনভাবে যেন প্রসারিত আর্থিক কর্মকান্ডের একটা বিরাট অংশ ভূমিপুত্রদের কাছে যায়। পুনর্গঠিত আর্থ-সামাজিক এই কাঠামোয় আমরা অনেকটা সফল হই এবং এর ফলে দেশে সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিরতা নিশ্চিত হয়। ভূমিপুত্রদের মধ্যে শতকরা নব্বই ভাগ যেহেতু মুসলমান সেহেতু মালয়েশিয়ায় উম্মাহর আর্থিক উন্নয়নের সাথে এই নতুন অর্থনৈতিক নীতি ছিলো সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ায়ও আমরা মৌলিক নীতি অনুসরণ করি। উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ কার্যব্যবস্থা হলো, সরকারী সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান বিদেশীদের কাছে বিক্রি করা। কিন্তু আমরা সরকারী সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান বিক্রি করি মালয়েশিয়ার লোকদের কাছে। সব স্তরেই ইকুইটির সাথে উৎপাদন বৃদ্ধি হওয়ায় সক্ষম ভূমিপুত্রদেকে এই বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ায় অধিক সুবিধা দেওয়া হয়। এর ফলে উচ্চ স্তরে প্রতিনিধিত্ব করতে ভূমিপুত্ররা সক্ষম হয়। যা আশা করা হয়েছিলো, তাই হলো। পশ্চিমা দেশগুলো আমাদের বেসরকারীকরণ নীতির সমালোচনা করলো, কারণ এ খাতের মুনাফা তাদের হাতছাড়া হয়ে গেলো। আমাদের নতুন অর্থনৈতিক নীতিকে তারা সমালোচনা করলো। কিন্তু আমরা সব স্তরে, এমনকি উচ্চ স্তরেও বিভিন্ন গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা করতে সফল হলাম।

আমরা বাস্তবয়ন করলাম অনুপম এক পদ্ধতি – ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধিতি। মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে সবাই ইসলামী ব্যাংকিং-এর সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। ধর্ম-নির্বিশেষে সবাই এই ব্যবস্থাকে সাদরে গ্রহণ করলো – এই ব্যবস্থা গৃহীত হওয়ার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ব্যাহত হয়নি বা উৎপাদন বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি।

এ ছাড়া আমরা ছাব্বিশটি উন্নয়নশীল দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক অর্থ প্রদান ব্যবস্থা কার্যকর করি। এই উদ্দেশ্য ছিলো ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থ জোগানের জন্য নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশের সাথে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় শতকরা চারশ’ ভাগ।

আমাদের উন্নয়ন কৌশল অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়। ১৯৯৬ সালের শেষে দেখা যায়, বার্ষিক প্রকৃত জিডিপি হার শতকরা প্রায় ৮.৫ ভাগ এবং ওই বৃদ্ধির হার চলছে গত দশ বছর ধরে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ভবিষ্যতে আরও অনেক বছর ধরে ওই বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকবে।

১৯৯৭ সালে বহির্বাণিজ্যের পরিমান দাঁড়ায় ১৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি; রফতানির ক্ষেত্রে বিশ্বে মালয়েশিয়ার অবস্থান হয় ১৮ তম এবং আমদানির ক্ষেত্রে ১৭ তম। এটা ছিলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হিসাব। সরকার উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবস্থার অধিকারী হয়। বহির্বাণিজ্যে ঋণের পরিমাণ কমে যায় জিএনপি’র মাত্র শতকরা ৪০ ভাগ। অর্থ প্রদানের ভারসাম্যের বর্তমান হিসাব সংকুচিত হয় –জিএনপি’র শতকরা ১০ ভাগ থেকে ৫ ভাগে নেমে আসে। ভবিষ্যতে এ ধারার আরও উন্নতি হবে বলে আশা করা হয়। মুদ্রাস্ফীতি ছিলো সর্বনিম্ন পর্যায়ে, শতকরা মাত্র ২.১ ভাগ। আর্থিক খাতে ব্যাংকিং পদ্ধতি ছিলো সবল – এর প্রতিফলন ঘটে শক্তিশালী মূলধন ও অধিক পরিমান সম্পদের হিসাবে। মালয়েশিয়ার সঞ্চয়ের শতকরা হার জিডিপি’র শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ – এই হার বিশ্বের মধ্যে শীর্ষে। জাতীয় সঞ্চয় থেকে মোট বিনিয়োগ ব্যয়ের শতকরা ৯৫ ভাগ যোগান দেওয়া যায়।

মালয়েশিয়া ২০২০ সালের মধ্য উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে স্পষ্টভাবে উন্নয়ন অব্যাহত রাখার পথে চলেছে; এর প্রয়াস শুরু হয় ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে যখন এই এলাকায় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা যায়। আমাদের মুদ্রার মান যা ছিলো তা থেকে অর্ধেক করা হয়। অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠার জন্য অনেকগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, কিন্তু গৃহীত সব ব্যবস্থাই ব্যর্থ হয়ে যায়।

সংকট উত্তরণে অনেকে আমাদের পরামর্শ দেয় আইএমএফ-এর কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু আমরা তা করিনি। আইএমএফ-এর কছে যাওয়ার অর্থ ছিলো মালয়েশিয়ার উম্মাহর জন্য একটা বিরাট বিপর্যয়। কারণ আমাদের নতুন অর্থনৈতিক নীতির সাথে আইএমএফ-এর নীতির সামঞ্জস্য ছিলো না-আইএমএফ-এর নীতি ছিলো মুক্ত প্রতিযোগিতা, যেখানে শক্তিশালীরাই সবকিছু ভোগ করে। আইএমএফ-এর কাছে ইকুইটি বিবেচনার কোন বিষয় নয়। তাদের বিবেচ্য বিষয় ছিলো দক্ষতা এবং যারা ধনী তাদের অধিক মুনাফা লাভের সুযোগ করে দেওয়া।

সমস্যা সমাধানে আমাদের চিন্তা করতে হয় এবং গৃহীত ব্যবস্থায় আমরা স্বাধীন হয়েই থাকি। আল্লাহর রহমতে আমরা এমন এক পদ্ধতি অনুসরণ করি যা আমাদের জাতি ও মালয়েশিয়ার উম্মাহকে রক্ষা করে। যাহোক, আমরা যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলাম (অর্থাৎ সেলেকটিভ এক্সচেঞ্জ কন্ট্রোল রেজিম) সে সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে কী ঘটেছিলো তা বর্ণনা করতে চাই।

১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে থাই বাট (Thai Baht) আক্রান্ত হলে মালয়েশিয়া কোন চিন্তাই করেনি। কারণ আমরা জানতাম যে, থাইল্যান্ডের চেয়ে মালয়েশিয়ার আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো। থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তথাকার অধিবাসীরা থাইল্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদী অভ্যন্তরীণ প্রজেক্টে অর্থ জোগান দেওয়ার জন্য স্বল্পমেয়াদী অফশোর (Offshore) তহবিল থেকে বিরাট অংকের অর্থ ঋণ নিতে থাকে। তাদের কাছে এ কৌশল গ্রহণের একটা যুক্তি ছিলো। কারণ মার্কিন ডলার সুদের হার বাট-এর সুদের হারের চেয়ে অনেক কম ছিলো। যাহোক, এ কৌশল পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলো মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাট-এর বিনিময় হারের স্থিরতার ওপর।

এ কারণে থাই সেন্ট্রাল ব্যাংক দেশের মুদ্রার ওপর আশংকাকৃত আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে বাট-কে রক্ষা করার চেষ্টা করে। কারণ থাই বাট-এর অবমূল্যায়ন হলে বিদেশী মুদ্রার ঋণ পরিশোধের জন্য বহু বাট দিতে হবে। আবার থাই ঋণ গ্রহণকারীরা যথেষ্ট বাট অর্জন করতে ব্যর্থ হলে থাইল্যান্ডের ওপর আর্থিক সংকট আপতিত হবে এবং এর ফলে বাট-এর আরও অবমূল্যায়ন ঘটবে ও আর্থিক সংকট ঘনীভূত হবে। সে কারণে সেণ্ট্রাল ব্যাংক বাট-কে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করে, যতক্ষণ পর্যন্ত রিজার্ভ প্রকৃতপক্ষে শেষ হয়ে না যায়। কিন্তু বেশিদিন বাট-এর মূল্যমান রক্ষা করতে অসমর্থ হওয়ায় সেন্ট্রাল ব্যাংক বাজারে বাট মুদ্রা ছাড়ে। এর ফলে বাট-এর মুদ্রামান অতি দ্রুত নিম্নগামী হয়। থাইল্যান্ড মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হয়। এ অবস্থা থেকে সে নিজের প্রচেষ্টায় বেরিয়ে আসতে পারেনি।

মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা অবশ্য ভালো ছিলো এবং এর ঋণ পরিশোধেরও সামর্থ ছিলো। তবু ‘সংক্রমণ’ মতবাদকে কার্যকর করা হয় এবং এ ফলে মালয়েশিয়ান রিংগিট-এর অবমূল্যায়ন ঘটে নিশ্চিতভাবে। মুদ্রা ব্যবসায়ীরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য রিংগিট থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আসলে তাদের কাছে রিংগিটই ছিলো না। তারা রিংগিট-এর সম্ভাব্য অবমূল্যায়নকে যুক্তি হিসেবে প্রতিপন্ন করে এর দ্রুত অবমূল্যায়ন ঘটায় এবং নিজেদেরকে প্রস্তুত করার জন্য অধিকতর তৎপর হয়।

আপনারা জানেন, মনিটর করার জন্য মুদ্রার নিজস্ব কোন অনুভূতি নেই এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক কার্যকলাপে তা কোন প্রতিক্রিয়া করে না। কোন দেশ কত বেশি বা কত কম অর্থ ধার নিয়েছে, ঋণ পরিশোধ করতে পারবে কি পারবে না, প্রতিবেশি দেশের মুদ্রা ‘সংক্রমণ রোগের’ কারণ দুর্বল কি না, উত্তম শাসন আছে কি নেই, সরকার দুর্নীতিপরায়ন, স্বচ্ছ বা স্বজনপ্রীতি কী করে কি না তা মুদ্রা জানে না। মানুষ কী করে, বিশেষভাবে মুদ্রা ব্যবসায়ীরা কী করে তা-ও মুদ্রা জানে না। মুদ্রা ব্যবসায়ীরা অবশ্য জানে যে, কোন নির্দিষ্ট মুদ্রা ব্যাপক হারে বিক্রি বা ক্রয় করে তারা মুদ্রা বিনিময় হার প্রভাবিত করতে পারে। শঠ ব্যবসায়ীরা যদি মনে করে যে, একটা নির্দিষ্ট মুদ্রার মানের অবমূল্যায়ন হতে যাচ্ছে, তাহলে তারা ওই মুদ্রা ধার করে তা বার বার বিক্রি করে অবমূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ব্যবসায়ীদের বিক্রির কারণে মুদ্রা মান পড়ে যায়; আর যুক্তিসংগত পর্যায়ের নিচে মুদ্রার মান পড়ে যায় কোন দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেরে মাধ্যমে।

থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেওয়ার পর শঠ ব্যবসায়ীরা মালয়েশিয়ার শক্তিশালী আর্থিক ভিতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। ‘সংক্রমণ রোগে’র ভীতি তাদেরকে আতঙ্কগ্রস্থ করে এবং তারা মালয়েশিয়ান রিংগিট ধার করে সাময়িক উত্তেজনায় তা বিক্রি করতে থাকে। বিক্রি করার এই সাময়িক তৎপরতায় মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের বিপরীতে রিংগিটের বিনিময় হার দ্রুত পড়ে যায়। এর সাথে যোগ হয় মালয়েশিয়ার স্টক মার্কেট থেকে স্বল্পমেয়াদী বিদেশী মূলধনের প্রত্যাহার; ফলে বাজারে মূলধনের মূল্যমান মূল মানের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে এবং অধিকাংশ কোম্পানী সংকটে পড়ে যায়।

এ অবস্থায় দেশের নেতাগণ অসহায় হয়ে পড়েন। আমরা সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারি যে, রিংগিটের মান কমানোর ব্যাপারে মুদ্রা ব্যবসায়ীরা দোষী। যা ধারণা করা হয়েছিল তাই হলো। মালয়েশিয়ার নেতারা শঠতার জন্য মুদ্রা ব্যবসায়ীদের সমালোচনা করলো। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলোর ম্যানেজার থেকে শুরু করে স্ব-ঘোষিত বিশেষজ্ঞ ও মুদ্রা ব্যবসায়ীরা সমালোচনা করলো মালয়েশিয়ার নেতৃবৃন্দকে। এসব লোক ওই সময় এমন কথা প্রকাশ করলো যে, খারাপ প্রশাসনের জন্য মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটেছে। মুদ্রার মান পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং আস্থা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন খারাপ প্রশাসনের পরিবর্তে উত্তম প্রশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা। ওইসব বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, বর্তমান সংকট সাময়িক। সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে একমাত্র মালয়েশিয়া অনুধাবন করে যে, বেশি দামে বিক্রির আশায় মুদ্রা ক্রয়ের প্রবণতা সত্যিকার দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার ইঙ্গিতবহ।

প্রথাগত কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার পর তা ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে আমরা নির্ধারিত বিনিময় নিয়ন্ত্রণ (selective exchange control)-এর ক্ষেত্রে কিছু ‘অপ্রচলিত’ পদ্ধতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। গৃহীত এই ব্যবস্থা ছিলো খুবই সামান্য। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ছিলোঃ ১. ভ্রাম্যমান রিংগিট মার্কটের বিলোপ এবং মুদ্রার ফটকা কারবারীদের রিংগিট তহবিল ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণ করতে না দেওয়া। এটা করা হয় মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকে বিদেশীদের বিদেশী রিংগিট হিসাব বন্ধ করে দিয়ে। এই ব্যবস্থায় বিদেশীরা তাদের রিংগিট তহবিল ব্যবহার করে স্বাধীনভাবে মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ করতে পারতো। কিন্তু তাদের তহবিল তারা অন্য কারও কাছে ধার বা বিক্রি করতে পারতো না। রিংগিট ধার বা ক্রয় করতে না পারায় মুদ্রা ব্যবসায়ীরা তাদের ফটকা কারবার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। ২. রিংগিটের বিনিময়ে হার মার্কিন ডলারের বিপরীতে নির্ধারণ করা হয় ৩.৮০ রিংগিট; এই নিয়ন্ত্রণ আরোপের সময় ওই হার বিদ্যমান ছিলো। ৩.১২ মাসের জন্য ‘পোর্টফোলিও ফান্ড’ স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় ‘১২ মাসের বিধান’ মোতাবেক। আর্থিক বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ওই ‘১২ মাসের বিধান’ প্রয়োজন ছিলো। এমন একটা সম্ভাবনা ছিলো যে মালয়েশিয়ার গৃহীত ‘অপ্রচলিত’ ব্যবস্থাগুলো খারাপভাবে প্রচারিত হবে এবং তার ফলে স্বল্পমেয়াদী মূলধন বাইরে চলে যাবে ব্যাপকভাবে। এ কারণে বারো মাসের বিধিনিষেধ আরোপ খুবই প্রয়োজন ছিলো। যাহোক, ছ’মাস পর পরিস্থিতি যখন স্থিতিশীল হয় তখন এই ‘১২ মাসের বিধান’-এর পরিবর্তে ‘লেভি’ আরোপ করা হয় (নতুন তহবিলের জন্য); পরিশেষে এই ‘লেভি’ বিলুপ্ত করে আবেদন করার সময় স্টক মার্কেটে ডিভিডেন্সের ওপর নামমাত্র টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। উল্লেখ করার বিষয় এই যে, ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এই ‘১২ মাসের বিধান’-এর সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার সময় ব্যাপকভাবে মূলধন বেরিয়ে যাওয়ার কোন ঘটনাই ঘটেনি। সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ থেকে সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ এর মধ্যে বাজার সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তন হয় নাটকীয়ভাবে। মালয়েশিয়ার সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় এবং কেএলএসই (KLSE)-তে শেয়ার থাকায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তাদের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।

মালয়েশিয়ার ‘নির্ধারিত বিনিময় নিয়ন্ত্রণ’ কালের – যা ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাস্তবায়ন করা হয় – প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো মুদ্রা ফকট কারবারীদের কবল থেকে মালয়েশিয়ার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা, যেন মালয়েশিয়ার জনগণ মালয়েশিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। যে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তা অত্যন্ত সকর্ততার সাথে নির্ধারণ করা হয়, যেন তা বিশ্বায়নের ইতিবাচক বিষয়গুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং নেতিবাচক দিকগুলোকে বিদূরিত করে। বিশ্বায়নের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে ছিলো আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের বিষয়ে স্বাধীনতা, এবং তা রক্ষা করা হয়। নমনীয় ওই মেয়াদকালে ব্যবসায়িক আদান-প্রদান ও সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ অপরিবর্তিত রাখা হয়। বিশ্বায়নের নেতিবাচক বিষয়গুলোর মধ্যে ছিলো রিংগিট মুদ্রা ব্যবসায়ের ভ্রাম্যমান মার্কেট এবং স্বল্পমেয়াদী তহবিলের মুক্ত প্রবাহ – এ দুই ব্যবস্থাকে বিলোপ করা হয়, কারণ তা অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে। সুতরাং ওই নিয়ন্ত্রণ ছিলো নির্ধারিত ক্ষেত্রে।

অন্যরা যে ফর্মুলা অনুসরণ করে সফল হতে পারেনি, আমরা সেই ফর্মুলা অনুসরণ করে সফল হলাম কেমন করে? কারণ আমরা অনুধাবন করতে সচেষ্ট ছিলাম, বিদেশী বিনিয়োগ মার্কেট কিভাবে কাজ করে। মাসের পর মাস ধরে আমরা গবেষণা করেছি বিদেশ বিনেয়াগ মার্কেট, ভ্রাম্যমান রিংগিট-এর ধারণা, বিদেশী বিনিয়োগ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য (লোভ ও ভয়), মূল্য নির্ধারণের কৌশল ইত্যাদি সম্পর্কে। একবার তা অনুধাবন করা গেলে মুদ্রা ফটকা কারবারীদের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করার সমাধান পাওয়া কষ্টকর কিছু নয়।

একই সাথে আমরা অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকি কিভাবে সেন্ট্রাল লিমিট অর্ডার বুক (Central Limit Order Book-CLOB) সিঙ্গাপুরে মালয়েশিয়ার সিকিউরিটি ব্যবসা করতে সমর্থ হয় – ওই ব্যবসা ছিলো ভাম্যমান শেয়ার মার্কেটের বিপরীত। কিন্তু তা মালয়েশিয়ার ইকুইটি মার্কেটে সমস্যা সৃষ্টি করছিলো; কারণ CLOB-এর মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে মালয়েশিয়ার শেয়ার কম বিক্রি হচ্ছিলো। CLOB ছিলো মালয়েশিয়া আওতার বাইরে এবং সে কারণে তা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত কার্যধারা জানার পর আমরা ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তা বন্ধ করে দিতে সক্ষম হই।

নির্ধারিত বিনিময় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Selective exchange control measures) কার্যকর এবং CLOB-বন্ধ হওয়ার পর মুদ্রা ও শেয়ার মার্কেট স্থিতিশীল হয়। সরকার সে সময় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সুদের হার কমানো হয় এবং ঋণ বৃদ্ধি করা হয়। বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্জীবিত করে সরকারী খরচ বৃদ্ধি করা হয় – সংকটের সময় ওইসব প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। ব্যবসা পুনর্জীবিত করার কাজে কন্ট্রাক্ট ও সাব-কন্ট্রাক্ট খুবই সহায়ক হয়।

আমরা ১৯৯৭ সালে ন্যাশনাল ইকনোমিক এ্যাকশন কাউন্সিল (National Economic Action Council – NEAC) গঠন করি এবং সংকটের সময় NEAC নির্বাহী কমিটির সদস্যগণ প্রতিদিনই বৈঠকে বসতেন। NEAC নির্বাহী কমিটির সদস্যগণ একটা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানী (দানাহারতা-Danaharta), ব্যাংকে পুনরায় মূলধন যোগানদাতা কোম্পানী (দানামোদাল-Danamodal) এবং কর্পোরেট ঋণ পুনর্গঠিত কমিটি (Corporate Dept Restructing Committee – CERC)-এর কার্যধারা সম্পর্কে বিশেষভাবে নজর দিতেন – এসব প্রতিষ্ঠান সংকটের সময় গড়ে তোলা হয় অকার্যকর ঋণ (non-performing loans) ও ব্যাংকে পুনরায় মূলধন যোগান সম্পর্কিত সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য। ব্যাংকিং পদ্ধতি থেকে দানাহারতা অকার্যকর ঋণ দূর করে দেয় – এর ফলে ব্যাংকগুলো অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করার জন্য তাদের ঋণ দেওয়ার কাজকে পুনর্গঠিত করতে সক্ষম হয়। দানামোদাল পুনরায় মূলধন যোগান দেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে – এর ফলে ব্যাংকিং পদ্ধতির মূলধন ক্ষমতা একটা সুস্থ স্তরে এসে উপনীত হয়। CDRC-এর ভূমিকা ছিলো কোম্পানী ও ব্যাংকগুলোকে একসাথে মিলিত হওয়ার একটা প্লাটফরম তৈরি করে দেওয়া এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে পুনর্গঠিত কাঠামোর মধ্যে ঋণ কর্মসূচী চালু করা।

নির্ধারিত বিনিময় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Selective Exchange Control measures) বাস্তবায়িত হওয়ার পর ওই তিনটি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত কার্যকর হয়ে ওঠে। ১৯৯৯ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে দানাহারতা ১৬ বিলিয়ন আরএম (RM 16 billion) অকার্যকর ঋণ অর্জন করে, দানামোদাল ১০টি ব্যাংককে ৬.২ বিলিয়ন আরএম (RM 6.2 billion) মূলধন পুনরায় যোগান দেয়, আর CDRC – তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কয়েকটি বড় বড় কোম্পানীর কাঠামো পুনর্গঠনের কাজে।

NEAC-এর নির্বাহী কমিটি অর্থনীতির প্রতিটি বিষয় প্রতিদিন নিরীক্ষণ করতো। প্রতিদিন এ কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হতো সম্পাদিত বিভিন্ন কাজের হিসাব, যেমন ব্যবসায়ের অগ্রগতি, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, সুদের হার, ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ, সম্পত্তি ও মটর গাড়ি বিক্রির হিসাব, খুচরা বিক্রির হিসাব, জাহাজের মাল ধারণ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন বন্দরে কত কনটেইনার মাল বোঝাই ও খালাস করা হয়েছে তার হিসাব, বিমানবন্দরের যাত্রী ও মাল পরিবহনের হিসাব, উৎপাদিত দ্রব্য ও রফতানির হিসাব, আমদানির হিসাব, নতুন ব্যবসা তালিকাভূক্তির হিসাব ও ব্যাংক দেউলিয়ার হিসাব, বেকারত্ব ও চাকুরির সুযোগের হিসাব, মজুরি, সরকারি প্রজেক্ট ও চুক্তি, বিদ্যুৎ ব্যবহার ইত্যাদি। প্রায়ই বিশেষ কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো তাৎক্ষণিকভাবে। মটর গাড়ি বিক্রির অবস্থা যখন ভালো ছিলো না তখন কমিটি বিশেষ কিস্তির শর্তে গাড়ি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় এবং যথার্থ দাম নিশ্চিত করে। সম্পত্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার জন্য সম্পত্তির মালিকানার বিষয়ে দুটো অভিযান চালানো হয় সংঘবদ্ধভাবে। সম্পত্তির মেলায় ডেভেলপাররা উৎসাহের সাথে অংশগ্রহণ করে – তারা তাদের বাড়ির মডেল ও ব্রোসিউর উপস্থাপন করে এবং মেলায় তাদের স্টলে অনেক বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ করে। একই সাথে, সম্পত্তি বিক্রির রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বিধিগত বিষয়ের নিষ্পত্তিসহ ব্যাংক, ইনসিওরেন্স, কোম্পানী, আইনজীবী ও সরকারি কর্মকর্তাদের একই বিধির আওতায় আনা হয়। ওই দুই অভিযানের সময় মোট ৬.৪ বিলিয়ন আরএম (6.4 billion RM) মূল্যের সম্পত্তি বিক্রি হয়।

আর্থিক সংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় মোকাবেলায় মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের বিশেষ করে ওআইসি-ভুক্ত দেশগুলোর জন্য অনেক কিছু শিক্ষনীয় আছে। সবচেয়ে বড় শিক্ষনীয় বিষয় হলো আর্থিক সংকটের কারণগুলো জানা, কিভাবে তা ক্রিয়াশীল হয় এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কে কিভাবে কার্যকর থাকে। সমস্যার কারণগুলো বিস্তারিতভাবে জানা গেলে ওইসব সমস্যার শক্তিগুলো প্রতিহত করা খুব একটা সমস্যার বিষয় নয়। একটি সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন সমাধানের প্রস্তাব আসতে পারে। এক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে যে কোন পন্থা অবলম্বন করে কাজ করা যেতে পারে। গৃহীত পন্থা ব্যর্থ হলে অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে। এজন্য বিকল্প পন্থা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা উচিত। কৌশল বা সমাধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে – কমপক্ষে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তাদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনবোধে সঠিক কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

মাঠ পর্যায়ে কী ঘটছে তার পুরো তথ্য অব্যাহতভাবে পাওয়া খুবই প্রয়োজনীয় বিষয়। কথামালার রিপোর্টের চেয়ে সংখ্যা, গ্রাফ ও চার্ট স্পষ্ট চিত্র প্রকাশ করে। যারা রিপোর্ট করে তাদেরকে অবশ্যই মৌখিকভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে। অবশ্য ওইসব রিপোর্ট যাদের কাছে উপস্থাপন করা হয় তাঁদেরকে ওই বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে যেন তারা মূল্যায়ন করতে পারেন এবং কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত তার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই ব্যবস্থা উত্তম, কিন্তু ওই ব্যবস্থায় যারা কাজ করেন তারা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আসলে উত্তম পদ্ধতি কেবলমাত্র আংশিক ফল দিতে পারে – ওই পদ্ধতির কাজে নিয়োজিত লোকেরাই পদ্ধতিকে সচল করতে পারে।

একটা কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, সরকারকে সব সময় সতর্কভাবে তার অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা করতে হবে। আর্থিক ক্ষমতার প্রবহমানতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারকে কখনই অসতর্ক হওয়া চলবে না; এতে সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে। একমাত্র সর্বাত্মক সতর্কতা অবলম্বন করে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, মালয়েশিয়ার উৎপাদন বৃদ্ধির হার এবং ২০২০ সালের মধ্যে আমরা যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি তা উন্নত দেশের মর্যাদা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

মুদ্রা সংকট একটা অপ্রয়োজনীয় সংকট – এ সংকট ঘটে না যদি আন্তর্জাতিক আর্থিক পদ্ধতির উদ্দেশ্য সত্যিকারভাবে সরাসরি বিনিয়োগসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ সহজতর করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। কিন্তু বড় বড় পুঁজিবাদী শক্তির অধিকারীরা এর চেয়ে আরও বেশি কিছু চায়। তারা তাদের রাজনৈতিক কার্যতালিকা প্রসারিত করতে চায়। আর এই রাজনৈতিক কার্যতালিকার জন্যই আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মুদ্রা ব্যবসা শুধু অনুমোদন করা হয় না, অনেক ক্ষেত্রে উৎসাহিত করা হয়। এ ধরনের কাজ একেবারে অপ্রয়োজনীয়। এর ফলে কান্ডজ্ঞানহীন মুদ্রা ব্যবসায়ীরা যে ক্ষতি করে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে ওই ধরনের উৎসাহ প্রদানের কাজ।

মুসলমানদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ মুসলমানদের হাতেই রয়েছে। একথা সত্য যে, আমরা যে বিশ্বে বাস করি তা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অমুসলিমদের কর্তৃত্বে রয়েছে। একথাও সত্য যে, আমরা যে বিশ্বে বাস করি তা বিশেষভাবে মুসলমানদের কাছে প্রিয় নয়। কিন্তু উম্মাহ যদি চায় তাহলে তার পুনরুত্থানকে বাধা দেওয়ার মতো কিছু নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামী বিশ্বকে বাস্তব অবস্থা মেনে নিতে হবে এবং ইসলামের মৌলিক বিষয় প্রত্যাখ্যান না করে ওই অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘মৌলিক’ কথাটা উল্লেখ করেছি, কারণ ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মহান ইসলামী সভ্যতা সৃষ্টি করেছিলো। বর্তমানকালের তথাকথিত ইসলামী মৌলবাদীরা শুধুমাত্র ইসলামের জাঁকালো পোশাকের বিষয়ে আগ্রহী – তারা সত্যিকার ‘মৌলিক’ বিষয়ের প্রতি আগ্রহী নয়। তাদের এ পথ মুসলমানদের মধ্যে আরও ব্যাপক ও গভীরভাবে বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যাবে – এ পথে তাদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং অন্যদের দ্বারা তাদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত থাকবে। সত্যিকার জেহাদ হলো মুসলমানদের ঐক্য, মুসলিম রাষ্ট্র, জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সংগ্রাম। এর ফলে মুসলমানরা নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে এবং অধিকতর উন্নত মুসলিম সভ্যতার সফল সদস্য হিসেবে তারা নিজেদের স্থান গ্রহণ করতে সমর্থ হবে।

সূত্রঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে ‘লারিবা লাইফটাইম এচিভমেন্ট এওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণ, ১ সেপ্টেম্বর ২০০০ ইং

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
৬৩৮ বার পঠিত