বায়তুল্ মাল তহবীল (পর্ব-১)

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ | জানুয়ারী ৯, ২০১৫
Download PDF

 “১”

অনেক দিন আগের কথা, মাসিক মোহাম্মদীতে “সমস্যা ও সমাধান” নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হইয়াছিল। সে সময় একদল উচ্চশিক্ষিত মুছলমান স্ব-সমাজকে বুঝাইতে চাহিয়াছিলেন যে, এছলাম ধর্ম্মের কার্য্যকারিতার যুগ অনেক আগেই শেষ হইয়া গিয়াছে! কারণ বর্ত্তমান বৈজ্ঞানিক যুগের প্রগতিশীল মানব সমাজের সম্মুখে যে সব নতুন নতুন পরিস্থিতি আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে, এছলামের ভাণ্ডারে তাহার কোন সমাধান নাই। কাজেই তাহার বিধি ব্যবস্থাগুলি বর্ত্তমান যুগেই স্বভাবতই অচল হইয়া গিয়াছে। এছলাম ধর্ম্মের এই অচলতার প্রমাণ হিসাবে অন্য একটা বিষয়ের সঙ্গে, তাহারা সুদ-সমস্যারও অবতারণা করিয়াছিলেন। বলা আবশ্যক যে, এইটাই ছিল তাঁহাদের আক্রমণের সব চাইতে বড় উপকরণ। উপরোক্ত বন্ধুরা এই প্রসঙ্গে যে সব কথা বলিয়াছিলেন, তাহার সারমর্ম্ম এই যে, এছলামের কঠোর নির্দ্দেশ অনুসারে সুদের আদান প্রদান করা, এমন কি তাহার সাক্ষী ও লেখক হওয়া সমস্তই নিষিদ্ধ। সুদ গ্রহীতা ও সুদ দাতা প্রভৃতি সকলেই এছলামের বিধানে সমান অপরাধী। কিন্তু “মোল্লা-মৌলবীদের” এই সব ধমক সত্ত্বেও অভাবগ্রস্থ মুছলমানেরা সকলেই দরকার মত সুদী কর্জ্জ নিতে বাধ্য হইতেছে। অথচ এছলাম ইহাদের জন্য হাভীয়া দোজখ ছাড়া আর কিছুরই ব্যবস্থা করিতে পারে নাই।

এই অভিযোগের যে উত্তর তখন দিয়েছিলাম, আজ একটু সবিস্তারে তাহারই পুনরুল্লেখ করিব। আমরা দেখাইয়াছিলাম, এছলাম সুদকে হারাম করার ব্যবস্থা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুগপৎভাবে দুস্থ মুছলমানদিগের রক্ষার জন্য বায়তুল-মাল তহবিল প্রতিষ্ঠাকে মুছলমান জাতির জন্য ফরজ বা অপরিহার্য্য কর্ত্তব্য বলিয়া নির্দ্দেশ দিয়াছে। সুতরাং যে ত্রুটির কথা তাঁহারা বলিতেছেন, তাহার জন্য দায়ী মুছলমান সমাজ, এছলাম নহে। এসব যুক্তিবাদে তাঁহারা কর্ণপাত করিতে চাহেন নাই। তাঁহাদের সে সব বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত তাৎপর্য এই যে, রাজশক্তির সাহায্য ব্যতীত বায়তুল-মাল তহবীল প্রতিষ্ঠার আদর্শকে বাস্তবে পরিণত করা অসম্ভব। সুতরাং এছলামের এ ব্যবস্থাটি এ যুগে অচল। ভবিষ্যতেও ইহা অচল হইয় থাকিবে, কারণ রাষ্ট্রশক্তিকে হস্তগত করার কোন সম্ভাবনাও ভারতীয় মুছলমানদিগের নাই।

সে দিন অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে এবং খোদার ফজলে, তাঁহাদের অনেকের  বিরুদ্ধাচরণ সত্ত্বেও দেশের মুসলসান আজ একটা বিরাট স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অধিকারী। শুধু ইহাই নহে, আদর্শ প্রস্তাবের অনুসরণে বায়তুল-মাল তহবিলেন প্রতিষ্ঠার জন্য আজ সরকার স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে চেষ্টা আরম্ভ করিয়া দিয়াছেন।আরও আনন্দের বিষয় এই যে, সে চেষ্টার বাস্তব সূচনা আরম্ভ হইয়া গিয়াছে সর্ব্বপ্রথম “সেই” ঢাকা শহর হইতে! এই মোবারক দিনের সুপ্রভাত আমি নিজ জীবনে দেখিয়া যাইতেছি, এবং সে প্রচেষ্টা সহায়তা করার জন্য আজ আবার এই প্রবন্ধ রচনা করিতে সমর্থ হইতেছি, এই সৌভাগ্যের জন্য সেই বে-নায়াজ বান্দ নাওয়াজের দরগাহে অন্তরের শোকরানা নিবেদন করিতেছি।

  ‘‘২’’

একটা প্রাথমিক কথা

জাকাত ও বায়তুল-মাল সম্বন্ধে, এবং বস্তুতঃ এছলামের প্রত্যেক নিয়ম, নীতি ও আদেশ নিষেধ সম্বন্ধে আলোচনার প্রবৃত্ত হওয়ার সময় আমাদিগকে খুব ভাল করিয়া স্মরণ রাখিতে হইবে যে, দুনিয়ার ধর্ম্ম বলিয়া যেই সব নীতি ও সংস্কার প্রচলিত আছে, এছলামের সহিত তাহার মৌলিক ক্ষেত্রেও আকাশ-পাতাল প্রভেদ বর্ত্তমান। মন মস্তিস্ককে ঐসব বাজার প্রচলিত সংস্কার হইতে সমপূর্ণভাবে মুক্ত করিয়া নিতে না পারিলে, এছলামের পূর্ণ ও প্রকৃত স্বরূপকে বুঝিয়া নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হইবে না। উদাহরণ হিসাবে বলিতেছি- একদল পণ্ডিত ধর্ম্মশাস্ত্রের শ্লোক উদ্ধৃত করিয়া বলিতেছেন, আচার ও ব্যবহার পালন করিয়া চলিলেই মানুষের ধর্ম্মীয় কর্ত্তব্য সব শেষ হইয়া গেল। আর একদল পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, বৈষয়িক ও আধ্যাত্নিক প্রভৃতি বলিয়া মানব জীবনকে খণ্ড-বিখণ্ডে বিভক্ত করিয়া তাহারই একটা নিভৃত ও নিষ্প্রয়োজন কক্ষে ধর্ম্মকে একটু স্থান দিয়া রাখিয়াছেন। কিন্তু মানব জীবনের এই বিভাগ বাটোয়ারাকে এছলাম একেবারেইস্বীকার করে না। তাহার অর্থনীতি ধর্ম্ম, তাহার রাজনীতি ধর্ম্ম, তাহার পরিবারিক জীবন ধর্ম্ম, তাহার বিষয়কর্ম্ম ধর্ম্ম, তাহার ব্যবসা-বানিজ্য ধর্ম্ম এবং তাহার দাম্পত্য জীবন প্রভৃতি সমস্তই ধর্ম্ম। মানুষের জীবন সাধনাকে সমগ্র ও সর্ব্বব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয় এবং সর্ব্বসাকুল্যে সেই সাধনাকে সফল করিয়া তোলার স্বাভাবিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ খোদায়ী বিধানের নামই হইতেছে এছলাম।

আবার এই স্বাভাবিকতার বৈজ্ঞানিক ধর্ম্ম অনুসারে এছলাম ধর্ম্মের উপলক্ষে উপাদান ও করণ-উপকরণগুলি সম্পূর্ণভাবে পরস্পরের সংযোগ ও সংযোগ সাপেক্ষে- অর্থাৎ একের ত্রুটি অন্যের দুর্ব্বলতার এবং একের সুষ্ঠুতা অন্যে সমর্থতার কারণ হইয়া দাঁড়ায়। প্রবন্ধের সূচনায় যে সুদ প্রসঙ্গের অবতারণা করা হইয়াছে, উদাহরণ স্থলে এক্ষেত্রে তাহারই উল্লেখ করা যাইতে পারে। আমাদের আলেম সমাজ দীর্ঘকাল হইতে প্রচার করিয়া আসিতেছেন যে,  মুসলমানের পক্ষে সুদ দেওয়া হারাম, সুদ নেওয়াও হারাম, সুদের দলিল লেখা হারাম এবং তাহার স্বাক্ষী হওয়াও হারাম। উহার অপরাধী হিসেবে সকলে সমান। হজরত রছুলে করিম [সা.] উহাদের সকলের উপর লানৎ করিয়াছেন। এই সব উক্তির সঙ্গতি ও সত্যতা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকিতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন এই যে, আল্লাহ ও তার রছুলকে অন্তরের অন্তস্থল হইতে মান্য করা সত্ত্বেও বহু মুছলমান আজও সুদি কর্জ্জ নিতে বিরত থাকিতেছে না, আলেম সমাজের সমবেত প্রচার তাহাদের অন্তরে ধর্ম্মনিষ্ঠার উদ্রেক করিয়া দিতে পারিতেছে না, উহার কারণ কি? এইসব প্রশ্নের একমাত্র উত্তর এই যে, সুদী কর্জ্জ গ্রহণ করিতে মুছলমান নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হইয়া যায়, সাধারণত অভাবের তাড়নায়। জাতির দুস্থ ও দুর্দশাগ্রস্থ অংশের এই অভাব পূরণ করার জন্যই জাকাতের অনুষ্ঠান। এই জন্যই জাকাতকে ফরজ করা হইয়াছে, এই জন্যই সুদের আদান-প্রদানকারী প্রভৃতির ন্যায়ে জাকাত দানে বিরত মুছলমানদের উপরও হজরত একই সঙ্গে লা’নত করিয়াছেন, এই জন্যই জাকাত আদায় ও বিতরণের ব্যবস্থাদি কোরআনে ও হাদীসে বিস্তারিতভাবে বুঝাইয়া দেওয়া হইয়াছে এবং এই জন্যই এছলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর জাকাত আদায় করিতে অস্বীকৃত আরবদিগের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করিতেও কুন্ঠিত হন নাই। কিন্তু আমরা সেই জাকাত সম্বন্ধে উপেক্ষা করিয়া সুদের নির্দ্দেশকে বলবৎ করিতে চাহিয়াছি, তাই আমাদের সমস্ত ওয়াজ-নছিহৎ এ পর্য্যন্ত সুদ সম্বন্ধে একেবারে অনর্থক হইয়া গিয়াছে। ইহা একটি মাত্র উদাহরণের একটু মাত্র পরিচয়। এই পারস্পরিক সহযোগ-সাপেক্ষতার প্রমাণ এছলামের সমস্ত শিক্ষার সকল স্তরে স্পষ্টরূপে ভাস্বর হইয়া আছে। কোরআনের এক অংশকে বিশ্বাস করিব এবং অন্য অংশকে অস্বীকার করিব- এ ইমান এহুদির ইমান। এহুদির ইমান দিয়া এছলামের বিশ্ব বিজয়ী আদর্শকে বাস্তবে রূপায়িত করার আস্পর্দ্ধা আমরা করিয়াছি এবং শুধু এই জন্যই প্রতিক্ষেত্রে পরাজিত ও প্রতিহত হইয়াছি।

মোটের উপর কথা এই যে, এছলাম মানব-জীবনকে দেখিয়াছে সমগ্রভাবে একটা organic whole রূপে এবং তাহার সমস্ত আদেশ-নির্দ্দেশ ও নীতি-পদ্ধতিগুলি পূর্ণ বিকাশের ও যথাযত সাফল্যের জন্যই স্বভাবতই পরস্পরের উপর নির্ভরশীল।

“৩” 

জাকাত, ফেৎরা ও কোরবানী

জাকাত শব্দের আভিধানিক অর্থ- বর্দ্ধিত করা, নির্ম্মল করা, বিশুদ্ধ করা, কোন বস্তু হইতে তাহার সহিত মিশ্রিত অন্য বস্তুকে পৃথক করিয়া ফেলা। মানুষের নিজস্ব ধন-সম্পত্তির উপর নিশ্চয়ই তাহার ষোল আনা অধিকার আছে। কিন্তু যে সম্পত্তির ন্যায্য মালেক সে নহে, যে সম্পত্তি বস্তুতঃ অন্যের প্রাপ্য,  সে সম্পত্তির উপর তাহার কোনো স্বত্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে না। এছলামের স্পষ্ট বিধান অনুসারে সকলের স্মরণ রাখা উচিত যে, বিশ্ব চরাচরের সকল প্রকারের সমস্ত সম্পত্তির প্রকৃত ও একমাত্র মালেক হইতাছেন আল্লাহ। সেই আল্লাহর স্পষ্ট নির্দ্দেশ এই যে, অবস্থাপন্ন মুছলমান যে ধন-দওলৎ সঞ্চয় করে, তাহা সমস্তটাই তাহার নিজস্ব নহে, তাহাতে আরও কতকগুলি “অংশীদার” আছে। সেই অংশীদারদিগের প্রাপ্যাংশের প্রকৃত মালেক তাহারাই। জাকাতের বিধানে যে পরস্ব ধন মানুষের নিজের ধন হইতে পৃথক হইয়া যায়, ফলে তাহার ধনসম্পদ বিশুদ্ধ হইয়া যায়। জাকাতের দ্বারা ব্যক্তির ন্যায় জাতির ধনসম্পদ বর্দ্ধিত হইয়া যায়। এই সব কারণে ধনের উপর স্থাপিত poor rate কে এছলামের পরিভাষায় জাকাত নাম দেওয়া হইয়াছে।জাকাত ও অন্যান্য ফরজ ও নফল ছাদাকা সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করিতে যাওয়া এক্ষেত্রে অসম্ভব। কারণ তাহাতে এছলামী অর্থনীতির অনেক প্রসঙ্গই উপস্থিত হইয়া যায় এবং সে জন্য একখানা স্বতন্ত্র পুস্তক রচনা করার দরকার হইয়া পড়ে। তবে, প্রবন্ধের বিভিন্ন স্তরে, পাঠকগণ জাকাতের উদ্দেশ্য ও আদর্শ সম্বন্ধে প্রাসঙ্গিকভাবে কিছুটা পরিচয় অবগত হইতে পারিবেন। ছাদাকা- ছেদ্‌ক ধাতু হইতে সম্পন্ন অধিকরণ কারক। ছেদ্‌ক শব্দের অর্থ- সত্য বা সত্যতা। মুছলমান মুখে এছলামের সত্যতা স্বীকার করে, আল্লাহ তাআলার ফরমাঁবারদারীর দাবী করে। এই সব উক্তি ও দাবীর সত্যতা বাস্তবক্ষেত্রে প্রমাণিত হয় যে ত্যাগ স্বীকার ও অর্থ ব্যয়ের দ্বারা, এছলামের পরিভাষায় সেই সবগুলিকেই ছাদাকা বলা হয়। এই সব ছাদাকা দুই ভাগে বিভক্তঃ [১] ফরজ ছাদাকা – যেমন জাকাত ও রমজানের ফেৎরা ইত্যাদি। [২] নফল ছাদাকা- যেমন সাধারণ দান-খয়রাত ইত্যাদি। ফরজ ছাদাকা বা obligating charity হইতেছে এছলামের Legal Law বা বিধিবদ্ধ আইনের অন্তর্গত একটি State Institution বা রাষ্টীয় প্রতিষ্ঠান। কেতাব ও সুন্নতের বিধান অনুসারে রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে তাহার বিতরণ করার ব্যবস্থা করিতে হইবে, জাকাত প্রদানকারী তাহাতে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করিতে পারিবেন না। নফল ছাদাকার দান ও বিতরণের কর্ত্তব্য সম্পূর্ণভাবে দাতার হাতেই ন্যস্ত রাখা হইয়াছে। তবে এক্ষেত্রেও দাতাকে এছলামের Moral Law বা নৈতিক বিধান ব্যবস্থাগুলির অনুসরণ করিয়া চলিতে হইবে। মুসলমানের আর্থিক অবস্থা কোন পর্যায়ে উপস্থিত হইলে তাহার উপর জাকাত দেওয়া ফরজ হইবে, শরিয়তে তাহার একটা নিম্নতম মান নির্দ্ধারিত হইয়া আছে। এই নিম্নতম মানকে এছলামের পরিভাষায় “নেছাব” বলা হয়। নেছাবের মালেক বা ছাহেবে নেছাব মুছলমানদিগের উপর জাকাত দেওয়া ফরজ।

 “৪”

এছলামের ধন-নীতি

ব্যক্তিগত ধন-সম্পদের মালেকানা স্বত্বাধিকারকে এছলাম স্পষ্টভাবে স্বীকার করে। নিজের পরিশ্রমের, প্রতিভার ও সুশিক্ষার ফল ভোগ করিবার অধিকার প্রত্যেক মানুষের আছে, এই নীতিকেও ইসলাম অনাবিল ভাষায় স্বীকার করিয়া থাকে। কিন্তু এ সব সত্ত্বেও বর্ত্তমান যুগের সাম্যবাদ ও ধনতন্ত্রবাদের কোনটাকেই এছলাম সঙ্গত বলিয়া স্বীকার করেনা। কোরআনে মুছলমানকে ‘মধ্যস্থ জাতি’ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে এবং আল্লাহর প্রদর্শিত ছেরাতুল মোস্তাকিম বা মধ্যপথের শাস্ত্রীয় নাম হইতেছে এছলাম। অর্থনীতি সম্বন্ধেও এছলাম এই মধ্যপথকে অবলম্বন করারই নির্দ্দেশ প্রদান করে। তাই অবস্থাপন্ন লোকদিগকে বাধিঁয়া-ধরিয়া টানিয়া-হেঁচড়াইয়াও নীচে নামাইয়া আনা যেমন এছলামের অভিপ্রেত নহে, ঠিক সেইরূপ দীন দরিদ্রদিগকে তাহাদের বর্ত্তমান অবস্থার মধ্যে আবদ্ধ হইয়া থাকার কোন ব্যবস্থার সমর্থন এছলাম একেবারেই করিতে পারে না। এছলামের নির্দ্দেশ এক্ষেত্রে শুধু একটা নেতিমুলক নীতিকথায় পর্যবসিত হইয়া রহে নাই। দুঃস্থ মানবতার মঙ্গল ও মুক্তি সম্বন্ধে এছলাম যে নির্দ্দেশ দিয়াছে তাহা সক্রিয় ও বাস্তব। এছলাম নিজ অভ্যুদয়ের প্রথম যুগ হইতে স্বধর্ম্মের এই নির্দ্দেশক হাতে কলমে কাজে পরিণত করিয়া দেখাইয়া আসিয়াছে।

এই আদর্শকে বাস্তবে রূপায়িত রাখার জন্য এছলাম যে সব আইন-কানুন ও বিধি-ব্যবস্থার প্রবর্তন করিয়াছে, সেগুলিকে দুইভাগে বিভক্ত করিয়া লওয়া যাইতে পারে। প্রথমটি হইতেছে স্থায়ী প্রতিকারের শাশ্বত আদর্শ, আর দ্বিতীয়টি হইতেছে আশু প্রতিকারের সহজ, সুন্দর ও স্বাভাবিক নীতি। মানব সমাজের দুঃখ-দৈন্যের স্থায়ী প্রতিবিধানের জন্য এছলাম যে আদর্শকে সত্য বলিয়া গ্রাহণ করিয়াছে, আজকালকার পরিভাষায় তাহাকে ধনের নিষ্কেন্দ্রীকরণের আদর্শ বলিয়া উল্লেখ করা যাইতে পারে। এছলামের প্রবর্তিত রাজস্ব-নীতি, ভূমিবণ্টন-নীতি, বাণিজ্য নীতি প্রভৃতি সব কিছুই প্রধানতঃ এই আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত। এদেশের মুসলমানের সমাজ-জীবন এই আদর্শের প্রেরণা হইতে বঞ্চিত হইয়া আসিতেছে অনেকদিন হইতে। কিন্তু তবু যাহা কিছু অবশিষ্ট ছিল [একটা ব্যতীত] ক্লাইভ, ওয়াভেল, মাউন্টব্যাটন ও র‌্যাটক্লিকের সগোত্রীয়রা তাহার সমস্তগুলিকে অচল করিয়া রাখিয়াছিলেন দীর্ঘ দুইশত বৎসর ধরিয়া। সেই একটা হইতে ফারাএজ বা মুছলমানের দায়ভাগ আইন।

স্বোপার্জিত হউক, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হউক, যে কোন প্রকারের ও যে কোন মুল্যের ক্ষুদ্র-বৃহৎ যে কোন বিষয়-সম্পত্তি বা অর্থ সম্পদ মুছলমানের মালেকানা অধিকারে আসিবে, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাহার প্রতি রতিমাশা পযন্ত বিভক্ত হইয়া যাইবে তাহার ওয়ারেছদিগের মধ্যে। এই ওয়ারেছদিগের তালিকা এমন ব্যাপক যে, স্বামী-স্ত্রী, পিতা মাতা, পুত্র-কন্যা, ভাই-ভগ্নী, নানা-নানী ও দাদা-দাদী প্রভৃতি ও ছাড়া বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভ্রাতা-ভগ্নীরাও অনেক সময় মৃত ব্যক্তির উত্তরাধীকারী হইয়া বসেন। আমাদের কর্ম্মজীবনের প্রথম দিকে আধুনিক মুছলমানদিগের মধ্যে আর্ত্তনাদ শুনিয়াছি-‘এই সর্ব্বনাশি উত্তরাধিকার ব্যবস্থার কালোপযোগী সংস্কার করা না হইলে গোটা মুছলমান জাতিটাই অল্পদিনের মধ্যে ফকীর-মিছকিনের একটা অভিশপ্ত সমাজে পরিণত হইয়া যাইবে। ‘কিন্তু এই আশঙ্কা বস্তুতঃ সম্পূর্ণ অমূলক। আর সকলকে বঞ্চিত করিয়া যোতদারের বেটা তালুকদার হইবেন, তালুকদারের পুত্র জমিদার হইবেন- পক্ষান্তরে লক্ষপতির পুত্র কোটিপতি হইবেন, কোটিপতির পুত্র কুবের হইয়া কারুনের খাজনা জমা করিবেন, আর তাহাদিগেরই ভাই-ব্রাদার ও আত্নীয়-স্বজনগণ তাহাদের ক্ষুধার্ত্ত স্ত্রী-পুরুষগণের মুখে দিনান্তেও এক মুঠা অন্ন দিতে পারিবে না। সমাজের জনসাধারণ দিন দিন অধিকতর নিঃস্ব হইয়া যাইতে থাকে এই কারুনী অনাচারেরই অভিশাপে। এছলামী ব্যবস্থার কয়েকটা লক্ষপতি কোটিপতির সংখ্যা কমিয়া যাইবে, দশ হাজার বিশ হাজার বিঘা জমির মালেকদের অস্তিত্ব হয়ত দুই চার ফেরার মধ্যেই লোপ পাইয়া যাইবে। কিন্তু একজনের পরিবর্ত্তে একশত জন খোদার বান্দা মানুষের মত আল্লার মুক্ত আছমানের তলায় মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারিবে, নিজের জীবন ধারাকে উন্নত করিয়া নিতে পারিবে, নিজের পুত্র-পৌত্রগণের জন্য হয়তো একটা মঙ্গল ভবিষ্যৎ রচনা করিয়া রাখিতে পারে।

এই নিষ্কেন্দ্রীকরণের আদর্শ মুছলমানের অভিনব আবিষ্কার নহে, কাহারো মতামতের প্রতিধ্বনিও ইহা নহে। মাত্র তের শত বৎসর পূর্ব্বে আল্লার কোরআন অনাবিল ভাষায় বিশ্বমানবকে এই জীবন-ভেদ পরিজ্ঞাত করিয়া দিয়াছে।

মুছলমানরা বিনাযুদ্ধে অমুছলমানদিগের নিকট হইতে যে সব ধন-সম্পদ হস্তগত করিবে, তাহা রছুলের মধবর্ত্তিতায় পিতৃহীন অভাবগ্রস্থ দুঃস্থ পথিক প্রভৃতির মধ্যে বন্টন করিয়া দেওয়ার নির্দ্দেশ প্রদানের পর, ধন সম্পদ নীতির Ethics বা নৈতিক আদর্শ সম্বন্ধে বলা হইতেছেঃ

“যেন এই সব ধন-সম্পদ ঘুরিয়া ফিরিয়া তোমাদিগের মধ্যকার ধনিক সমাজের মধ্যে সঞ্চিত না হইয়া যায়” – হাশর, ৭ আয়ত।

ছুরা মায়ারেজে বলা হইয়াছে-

“আর তাহাদিগের [মুছলমানদিগের] ধন-সম্পদগুলিতে সুনির্দিষ্ট স্বত্বাধিকার রহিয়াছে-প্রার্থীদের জন্য আর বঞ্চিতদিগের জন্য”- ২৪, ২৫ আয়ত। সূরা জারিয়াতেও এই মর্ম্মের একটি আয়ত আছে। এই দুইটি আয়ত স্পষ্টতঃ জানা যাইতেছে যে, মুসলমানের হাতে যে সব ধন সঞ্চিত হয়, তাহার সমস্তটার ভোগদখল করার অধিকার তাহার নাই। সেই সঞ্চিত ধনের একটা প্রার্থী ও বঞ্চিতদিগের প্রাপ্য এবং সে অংশও আল্লাহর আইন কতৃক নির্দ্ধারিত হইয়া আছে। যেমন সঞ্চিত অর্থের এবং বাণিজ্যার্থে সংগৃহীত [stoke in trade] মালপত্রের বাজার দামের বার্ষিক শতকরা আড়াই টাকা অথবা ওশরী জমিনের উৎপন্ন ফসলের [অবস্থাভেদে] দশ ভাগের এক ভাগ অথবা বিশ ভাগের এক ভাগ, গো-মহিষাদি পশুপালের উপর প্রবর্ত্তিত এবং জাকাতের নির্দিষ্ট অংশ ইত্যাদি। ইহা দান নহে, ভিক্ষা নহে, দাতার কোন অনুগ্রহ ইহাতে নাই। প্রাপক ইহা গ্রহণ করিবেন নিজের অধিকার বলে এবং দাতাকে ইহা দিতে হইবে অলঙ্ঘ্য খোদায়ী আইনের স্পষ্ট নির্দ্দেশ অনুসারে। অংশ বা অনুপাত নিয়া ব্যবস্থাপক সভার দ্বারস্থ মুছলমানকে হইতে হবে না। কারণ তাহাও পূর্ব হইতে আইনতঃ নির্দ্ধারিত হইয়া আছে।

সূত্রঃ সাহিত্য ত্রৈমাসিক “প্রেক্ষণ”, মাওলানা আকরম খাঁ স্মরণ, জুলাই-সেপ্টেম্বর-২০০৫

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
৪৭৫ বার পঠিত