শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে কিভাবে ভূমিকা রাখবেন

ডঃ মোনা ইয়ুসরী | নভেম্বর ১২, ২০১৪
Download PDF

বিয়ের পূর্বে, সকল মানুষই কিছু স্বপ্নের জাল বুনেন তার অনাগত সন্তানদের নিয়ে; ভাবনার ভীড়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে কিভাবে সন্তানদের বড় করবেন সেই চিন্তাটি, প্রতিজ্ঞা করেন প্রতিটি সন্তানকে একজন অনুকরণীয় ও চমৎকার ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার।

অনেক মা-ই বাইরে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেন যাতে তাঁরা যথাযথভাবে সন্তানকে লালন পালন করতে পারেন, পাশে থাকতে পারেন সন্তানের বেড়ে উঠার, বড় হয়ে ওঠার সময়টুকুতে। তারপর যখন তাদের স্বপ্ন সত্যি হয়, তাদের কোল আলো করে আসে চমৎকার একটি সন্তান তখন বাস্তবতা কিছুটা ভিন্নভাবে হাজির হয়। সন্তানদের প্রতিদিনকার লালন পালনে চ্যালেঞ্জগুলো আসে কিছুটা ভিন্নভাবে। সন্তানের খাওয়া-পরা ও তাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পেছনেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন মা। আর কর্মক্লান্ত বাবা বাসায় ফিরে অল্পেই বিরক্ত হয়ে পড়েন বাচ্চার কান্নায়। আর এই প্রাত্যাহিকতায় আড়াল পড়ে যায় সন্তানের আত্মা ও ব্যক্তিত্বের গঠনের দিকটা; সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের গঠনটাই যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা সেটা বেমালুম ভুলে যান মা-বাবারা।

অনেক বাবা-মাই এই ধারণা দ্বারা আচ্ছন্ন থাকেন যে, যেহেতু তাদের সন্তানরা তাদের মাধ্যমে এই পৃথিবীতে এসেছে, সন্তানদের উপর তাদের এক ধরণের মালিকানা-স্বত্ত্ব রয়েছে; তাদের অধিকার রয়েছে, স্বাধীনতা রয়েছে সন্তানের ব্যাপারে যা ইচ্ছে তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও পছন্দ করার।

কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। কাহলিল জিবরানের ভাষায় বলা চলে,

“তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়,

জীবনের জন্য জীবনের যে আকাঙ্খা তারা তারই সন্তান

তোমার মাধ্যমেই তাদের আগমন তোমা হতে নয়

যদিও তারা তোমার সাথে থাকে, তারা তোমার নয়।”

প্রতিটি বাবা-মাই অপর একজন মানুষের দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার সম্মানে সম্মানিত। তবে এটি বুঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে এই দায়িত্ব তাকে এই ছোট্ট মানুষটির মালিকে পরিণত করে না। বরংচ বাবা-মার দায়িত্ব হলো সন্তানকে স্বতন্ত্র একটি ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করা, সন্তানের সমস্ত সম্ভাবনার বিকাশে ভূমিকা রাখা, ইতিবাচক গুণাবলীর আলোকে সুন্দর একটি জীবন গঠনে সন্তানকে সহায়তা করা।

সন্তান লালন-পালনে কিছু সাধারণ পরামর্শঃ

সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রে চমৎকার একটি নির্দেশনা হলো সন্তানের সঙ্গে এমন আচরণ করুন, যে আচরণ আপনি অন্য লোকদের কাছ থেকে নিজের জন্য আশা করে থাকেনঃ

০১. বাবা কিংবা মা হিসেবে কী করা উচিত তার হোমওয়ার্ক করুন: বাচ্চারা কীভাবে আচরণ করে, কীভাবে বেড়ে ওঠে সে সম্পর্কে পড়াশোনা করুন, শিখুন। খুব সাধারণ একটি উদাহরণ হলো, প্রায়শই দেখা যায় বাবা-মা সন্তানকে শাস্তি দিচ্ছেন দেয়ালে ছবি আঁকার কারণে কিংবা খাওয়ার সময় মুখ থেকে খাবার ফেলে দেওয়ার কারণে। অথচ এই ছবি আঁকার সহজ ব্যাখ্যা হচ্ছে আপনার সন্তানের মধ্যে শৈল্পিক প্রবণতা ও সৌন্দর্যবোধের অনুভূতি রয়েছে। তাই এর সঠিক সমাধান হওয়া উচিত একসাথে দেওয়ালটি পরিষ্কার করা এবং চার্ট পেপার দিয়ে পুরো দেয়াল সাজিয়ে আপনার সন্তানকে বলা যে, সে এখন ইচ্ছেমতো আঁকতে পারে।

আর খাবার ফেলে দেওয়ার ব্যাপারে খুব বেশি জোড়াজুড়ি না করে সাত কিংবা তার চাইতে একটু বেশি বয়স পর্যন্ত তাকে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিন যাতে সে ব্যাপারটি আয়ত্ত্ব করতে পারে।

০২. নিজের যত্ন নিন, নিজেকে সময় দিন:

আপনি যখন প্লেনে চড়েন প্লেনের মাইকে কোন কথাটি ভেসে আসে? এটি কি বলে না যে, আপনার সাথে যদি কোন বাচ্চা থাকে, তবে প্রথমে নিজের অক্সিজেন মাস্কটি পরে নিন এবং আপনার সন্তানকে তার মাস্কটি পরতে সাহায্য করুন? বাবা-মা বিশেষ করে মায়েরা তাদের সন্তানের জন্মের পরে নিজের সকল চাহিদা, সকল প্রয়োজনীয়তাকে অবহেলা করতে শুরু করেন। অত্যন্ত মেধাবী এক চিত্রশিল্পীর সাথে দেখা হওয়ার পরে তাকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম কোন কাজটি তুমি সবচাইতে বেশি ভালোবাসো, সে দু:খের সাথে জবাব দিয়েছিলো বিয়ের পর গত ১০ বছরে সে ক্যানভাসে তুলির একটি আঁচড়ও কাটে নি। ভেবে দেখুন এই এতোগুলো বছর কি পরিমাণ হতাশা সে বুকে বয়ে বেড়াচ্ছিলো।

এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, বাবা-মা রা তাদের নিজেদের খেয়াল রাখবেন, যত্ন নিবেন; কেননা নিজের অক্সিজেন মাস্কটি না পরলে কোনভাবেই আপনার সন্তানের খেয়াল রাখার মতো সুস্থতা আপনার থাকবে না।

০৩. শাস্তির পরিবর্তে ভুল শোধরানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন:

দুষ্টুমির কারণে শাস্তি পেয়েছেন এই বলে যদি আপনার বন্ধু আপনাকে ক্রমাগত খোঁচাতে থাকে আপনার কেমন লাগবে বলুন তো! আপনার সন্তান যদি কোন ভুল করে সেক্ষেত্রে তাকে শাস্তি না দিয়ে সেই ভুল শোধরানের অভ্যাস গড়ে তুলুন। শাস্তিদানের ব্যাপারটার মধ্যে এক ধরণের আঘাত থাকে যা বাচ্চার মানসিক গঠনের অন্তরায় হতে পারে। তাছাড়া প্রতিটি ভুল কাজ কিংবা ভুল আচরণই শোধরানো সম্ভব ভুল হয়ে যাওয়ার পরে কি করতে হবে তা সঠিকভাবে শেখানোর মাধ্যমে। যেমন- কোনকিছু মেঝেতে ফেললে তা মুছে ফেলা ইত্যাদি।

০৪. ভালো আচরণের জন্য আপনার সন্তানের প্রশংসা করুন

আপনার সন্তানের কাজগুলোকে ইতিবাচকভাবে বর্ণনা করুন। যেমন “যাক অবশেষে দুষ্টুটা তাহলে ক্লান্ত হলো” না বলে বলুন “তুমি এতো শান্ত হয়ে চমৎকারভাবে বসেছো, আমার খুব ভালো লাগছে।”

যে কোন ধরণের নেতিবাচক বর্ণনা স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং নেতিবাচক আচরণের প্রবণতা বৃদ্ধি করবে।

০৫. আপনার সন্তানের সাথে নম্রভাবে, যথাযথ সম্মানের সাথে কথা বলুন

আপনি যেভাবে কথা বলেন আপনার সন্তান ঠিক একইভাবে কথা বলাটাকে আয়ত্ত্ব করবে। তাই আপনি যদি একজন নম্র-ভদ্র সন্তান চান, বাবা-মা হিসেবে সন্তানের সাথে নম্র-ভদ্র আচরণই আপনাকে করতে হবে। এমন কিছু আপনার সন্তানকে বলবেন না যা তাকে আঘাত করবে কিংবা তার মধ্যে এ ধরণের অনুভূতি তৈরি করবে যে তার প্রতি আপনার ভালোবাসা তার আচরণের উপর নির্ভরশীল। আপনার সন্তানকে অনুভব করতে দিন, তার প্রতি আপনার ভালোবাসা একেবারেই নিঃশর্ত।

০৬. স্বউদ্যোগী হোন এবং খারাপ আচরণ প্রতিরোধে পরিকল্পনা করুন:

ধরুন আপনি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন এবং আপনার সন্তানও আপনার সাথে যাবে। সেখানে আপনার যথেষ্ঠ সময় লাগবে এবং আপনি জানেন আপনার সন্তান খুব তাড়াতাড়ি অস্থির হয়ে পড়বে, তাই আপনার ব্যাগে এমনকিছু রাখুন, হতে পারে সেটি খেলনা সামগ্রী কিংবা অন্য কিছু, যা দিয়ে সে কিছু সময় অন্ততঃ কাটাতে পারবে। এই পুরোটা সময় তাকে শান্তভাবে চুপচাপ বসে থাকতে বলাটা বাচ্চার স্বাভাবিক আচরণের বিরোধী।

০৭. একবারে একটি ভুল ধরুন, তার বেশি নয়

যদি আপনার সন্তানের আচরণে অনেকগুলো ভুল খুঁজে পান, সেখান থেকে একটি কিংবা দুইটি ভুল আচরণ বাছাই করুন এবং তা শোধরানোর চেষ্টা করুন; বাকি ভুলগুলো আপাততঃ উপেক্ষা করুন।

তোমার এটা ভুল, ওটা ভুল, সারাদিন এই ধরনের অভিযোগ মারাত্মক হতাশা তৈরি করে এবং এতে বাচ্চা নিজেকে খারাপ ভাবতে শুরু করে। সে নিজের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং হাল ছেড়ে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে সে আরো বাজে আচরণ করতে থাকে।

০৮. সত্যিকার অর্থে কার্যকরী সময় কাটান:

আসলে কি পরিমাণ সময় আপনি আপনার সন্তানের সাথে কাটাচ্ছেন তার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার সাথে কাটানো মূহুর্তগুলো আপনি কীভাবে ব্যয় করছেন। ঘরে থাকা অনেক বাবা-মায়েরা বাসার কাজকর্মে কিংবা প্রাত্যহিক রুটিন কাজে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে তারা তাদের সন্তানের সাথে একটু কথা বলতে কিংবা খেলতে ভুলে যান নতুবা ক্লান্তির কারণে পেরে উঠেন না।

মাঝে মাঝে বাবা-মাদের যখন জিজ্ঞেস করি তারা তাদের সন্তানের সাথে কীভাবে সময় কাটান উত্তর আসে, “আরে আমরাতো্ প্রতি সপ্তাহেই ওদের বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাই।” কিন্তু আসলে আপনি যদি সত্যিকার অর্থে তাদের সাথে কিছু কার্যকরী সময় কাটাতে চান তার জন্য সবচাইতে উপযুক্ত জায়গা হলো আপনার বাড়ি কিংবা এমন কোন স্থান যেখানে কথা বলার প্রচুর সুযোগ রয়েছে, সুযোগ রয়েছে পরস্পরকে বোঝার, ভাব বিনিময় করার, চোখের দৃষ্টির যে ভাষা তা পড়ার। এই যোগাযোগের, ভাব বিনিময়ের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আপনার সন্তানের সঙ্গে খেলাধূলা করা এবং অবশ্যই সবধরণের ইলেকট্রনিক সামগ্রী কিংবা গ্যাজেট বাইরে রেখে।

সবশেষে, এই কথাটি সবসময় মনে রাখবেন আজকে আপনার তরুণ বয়সে, শারীরিকভাবে শক্তিশালী থাকার এই সময়টিতে যে বীজ আপনি বপন করবেন তারই ফসল আপনি তুলবেন কালকে আপনার বৃদ্ধ বয়সে, দুর্বল সময়টিতে।

সূত্রঃ OnIslam.net

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
১৬১৯ বার পঠিত