বিবাহিত জীবনকে সুখী করার উপায় (পর্ব-২)

মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ | নভেম্বর ১২, ২০১৪
Download PDF

৪. অসুখী দাম্পত্য জীবনে কীভাবে সুখ ফিরিয়ে আনা যায়?

কাজটা নিঃসন্দেহে অত্যান্ত কঠিন, কারণ এর জন্য একটা পূর্বশর্ত আছে। আপনি যদি সেই পূর্বশর্তটা পূরণ করতে পারেন তাহলে অবশ্য বেশ সহজ। শর্তটা হচ্ছে, ‘আপনি কি সত্যিই চান আপনার দাম্পত্য জীবন সুখের হোক?’ কথাটি শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু আমি আমার দীর্ঘ কাউন্সেলিং জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সংসারে অশান্তির প্রধান কারণই হচ্ছে নিজেরা সত্যিকার অর্থে সুখ না চাওয়া। জীবনকে সুখময় করার ব্যাপারে তারা কেউই সচেতন ছিল না; বরং কেবল নিজেকে বা অন্যকে সন্তুষ্ট করার জন্য কিছু একটা করে বুঝ দিতে চাইছিল যে ‘তারা চেষ্টা করছে’। বাস্তবে কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা; কেননা তারা কখনোই সত্যিকার অর্থে চেষ্টা করেনি। তারা অসমাপ্ত একটা নাটকে অভিনয় করে চলেছিল মাত্র।

  আপনি যদি আন্তরিকভাবে পরিবর্তন চান তাহলে আপনার জীবনসঙ্গী যা যা পছন্দ করে তার একটা তালিকা করে ফেলুন। বিয়ের প্রথম দিকে তার কী কী গুণ আপনার যথেষ্ট পছন্দের ছিল নিশ্চয়ই মনে আছে সেগুলো? আপনি তা লিখে ফেলুন। একই সাথে সমস্যার বিষয়গুলোও লিখুন। সাধানণত এটা ম্যাজিকের মতো কাজ করে। যখন ভালো গুণগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করি না এবং অবদানগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ হই না, তখন দাম্পত্য সম্পর্কে চিড় ধরাটাই নিয়তি। আমি প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, ‘দিনে কতবার আপনারা ধন্যবাদ জানান? দিনে ক’বার তাকে জড়িয়ে ধরেন, চুমু খান? দিনে কতবার তাকে বলেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি?’

  অদ্ভুত একটা বিষয় হলো, আমরা জীবনসঙ্গীর কাজকে কমই মূল্যায়ন করি। অনেকেই মনে করেন, সমালোচনা না করাটাই যেন কাজের মূল্যায়ন। এমন চিন্তা একটি মারাত্মক ভুল। কারও কাজের সত্যিকার মূল্যায়ন করা মানে, সে আপনার জন্য যা করেছে তার সবকিছুর জন্য প্রত্যক্ষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়।’ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা একটি সুন্দর দাম্পত্য জীবনের প্রাণ। মনে রাখবেন, নিয়মিত এ কাজটা করা একটি দারুন ব্যাপার। কোনো সমস্যা হলে তা বলতে যদি আমরা দেরি না করি তাহলে সবকিছু সুন্দরভাবে চললে তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কেন কার্পণ্য করব?

৫. মনের মানুষ বলতে কি কিছু আছে?

আত্মার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, আপনাআপনি সৃষ্টি হয় না; একটু করে যত্নের সাথে গড়ে তুলতে হয়। কখনো এজন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে তাদের আপনি দেখবেন যে, তারা হয়তো কোনো বিষয় নিয়ে মুচকি হেসে যাছে, কী কারনে তারা দুজন হাসছে তা কেবল তারাই বুঝতে পারে। হয়তো দেখবেন তারা এমন একটা ভাষায় কথা বলছে যা কেবল তারাই বুঝতে পারছে। তাদের কথাগুলো হয়তো অন্যদের কাছে একেবারেই সাধারণ মনে হয়, কিন্তু তা তাদের পরস্পরের হৃদয় ছুয়ে যায়। এটা যদি আপনি গড়ে তুলতে পারেন তাহলে ৩০ বছর পরেও দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে প্রেমে পড়বেন বারবার। হাসির ব্যাপারটাও এমনই গুরুত্বপূর্ণ। হাসির কিছু পেলে সেটা অন্যজনকে জানান, যেন সে-ও আনন্দ পায়। এই আনন্দ ভাগাভাগির মাঝেই এক ধরনের নির্মল আনন্দ রয়েছে।

৬. সুখী দাম্পত্য জীবনের পেছনে কী কী বিষয় ভূমিকা রাখে?

আবারও বলছি, সত্যবাদিতা, যত্নবান হওয়া এবং পারস্পরিক সম্মানবোধই হলো দাম্পত্য-সুখের মূলসূত্র। প্রতিটি কাজ এবং উদ্যোগকে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে। আপনি কি সত্যবাদী? জীবনসঙ্গীর প্রয়োজনকে কি আপনার নিজের প্রয়োজন হিসেবে দেখেন? আপনি তার জন্য অন্তরে যে সম্মান বোধ করেন তা কি প্রকাশ করেন? আমার স্পষ্ট মনে পড়ে আমার দাদা-দাদির কথা। প্রত্যেক বেলায় দাদি আমার দাদাকে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করতেন।

তিনি দাদার প্লেটে নিজ হাতে খাবার তুলে দিতেন, তার পছন্দের গোশের টুকরোটা বেছে দিতেন, খেয়াল করে দেখতেন তার কী প্রয়োজন; চাওয়ার আগেই তিনি তা প্লেটে তুলে দিতেন। বিশেষ কোনো কারণ না ঘটলে তিনি প্রতিবেলায় দাদার সাথে খেতে বসতেন। ঘরে একধিক কাজের লোক থাকা সত্ত্বেও কারও অনুমতি ছিল না দাদার খাবার পরিবশনের। তারা ট্রে নিয়ে দাদির সামনে হাজির করত, দাদি সেখানে থেকে তুলে দাদাকে পরিবেশন করতেন। এই কাজগুলো করার সময় যে ভালোবাসা আর আন্তরিকতার ছাপ তার চোখে-মুখে ফুটে উঠত, আজ ৪০ বছর পর এবং তাদের দুজনের মৃত্যুর ২৫ বছর পরও আমার মনে স্পষ্ট গেঁথে আছে। দাদি কেমন করে এ কাজগুলো করতেন? কারণ তিনি এই কাজগুলো করতে পছন্দ করতেন।

  দাদাও এই ভালোবাসার বিনিময় দিতে কার্পণ্য করতেন না। তিনি প্রায় সব ব্যপারেই দাদির সাথে পরামর্শ করতেন। কোথাও গেলে দাদিকে সাথে নিয়ে যেতেন। দাদির পছন্দ অনুযায়ী কাপড়চোপড় পরতেন। দাদি ছিলেন দাদার চেকবইবিহীন ব্যাংক। তিনি সে টাকাপয়সা নিয়ে কখনো প্রশ্নও করতেন না দাদিকে। এতটা বিশ্বাস এখনকার সময়ে খুব কমই দেখা যায়। দাদা কখনো দাদির সাথে গলা চড়িয়ে কথা বলেননি। সবসময় ভালোবাসার দৃষ্টি বোলাতেন। বলতে গেলে দাদি ছিলেন দাদার প্রাণ। তারা যে দুজন দুজনকে খুবই ভালোবাসতেন তা তাদের আচার-ব্যবহারেই ফুটে উঠত।

  দাদি আগে মারা গিয়েছিলেন। তিন মাস পর দাদাও দাদির কাছে চলে গেলেন। কিন্তু তারা তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনীদের জন্য স্মৃতি রেখে গেলেন – কীভাবে দাম্পত্য জীবন যাপন করতে হয়, জীবনসঙ্গীর সাথে কেমন ব্যবহার করতে হয়।

সূত্রঃ সিয়ান পাবলিকেশন প্রকাশিত “বিয়েঃ স্বপ্ন থেকে অষ্টপ্রহর” গ্রন্থ

(সিয়ান পাবলিকেশনের অনুমতিক্রমে বই থেকে এই অংশবিশেষ প্রকাশ করা হল)

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
৯৩৭ বার পঠিত