ইসলাম ও পাশ্চাত্যঃ পুনরায় মুখোমুখি? (পর্ব-২)

Download PDF

মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক আজ অবশ্য Pope এর কাছ থেকে নাও আসতে পারে-বরং আজ তা আসতে পারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে- যখন সেখান থেকে “একটি পতিত দেশকে(মুসলিম দেশ অবশ্যই)” বাঁচাবার জন্য আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের ডাক দেয়া হয় অথবা যখন অন্যের আগ্রাসনের শিকার একটি মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র আমদানীর নিষেদ্ধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ইউরোপীয় মানসের উপর জমে থাকা আবরণকে কেউ একটু ঘষে মেজে সাফ করে নিলেই, তার মাঝে মুসলিম বিদ্বেষ আবিষ্কার করতে পারবেন-Vienna অবরোধের আতংক সেখানে বিদ্যমান- এসব কিছুকেই যে কোন সময়ে সহজেই  পুনরুজ্জীবিত করে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়া যায়। গত বিশ বৎসর যাবত ইউরোপেও ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছে।

ইহুদিদের বিরুদ্ধে অতীতে সংঘটিত ভয়ঙ্কর অপরাধসমূহের পরিপ্রেক্ষিতে, আজ ইউরোপের অবশিষ্ট ইহুদি জনসংখ্যা নতুন অত্যাচার ও বৈষম্য থেকে মুসলমানদের তুলনায় অনেক নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু সুপ্ত বর্ণবাদী অনুভূতি যখন  Semite দের বিরুদ্ধে, আরবদের বিরুদ্ধে এবং ঐ Semite তথা আরবীয় ধর্মের অন্য অনুসারীদের বিরুদ্ধে মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে তখন কি হবে? ইতিমধ্যে এমন একটা দিন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে দিন ইউরোপের কোথাও না কোথাও কোন না কোন মসজিদ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়নি। উন্নত বিবেকের জনগোষ্ঠী দ্বারা, নিজেদের মাতৃভূমিকে মানব নামধারী তেলাপোকার সমষ্টি থেকেও মুক্ত করার সংকল্পে কি এবার মুসলমানদের  বিরুদ্ধে “Crystal Night” উদযাপিত হবে?-ঠিক যেমনটি নাৎসি  জার্মানীতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে উদযাপন করা হয়েছিল ? আমার এই কথাগুলো অত্যুক্তি হলে কি ভালোই না হতো ! আমি যে বিপদের আশঙ্কা করছি তা থেকে সবাই মুক্তি পেতো !

সে যা হোক, আমরা যেন কেবল অন্য পক্ষকেই দোষ না দেই। নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তি বজায় রাখতে, দূর্ভাগ্যজনক ভাবে, মুসলিম জগতের প্রচুর অবদান রয়েছে। সর্বোপরি ইরান ও লিবিয়ায় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা, আর আল্লাহর নাম নিয়ে Bathist ইরাক কর্তৃক কুয়েত আক্রমণের ঘটনা ইত্যাদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে পশ্চিমের বৈষম্যমূলক নেতিবাচক ধারণাকে আরো জোরালো করেছে। আমরা পছন্দ করি বা না করি- ব্যাপারটা যুক্তিসঙ্গত এবং তথ্য ভিত্তিক হোক বা না হোক- পশ্চিমা জনগণের মনে ইসলামের প্রসঙ্গ উঠলে ধর্মান্ধতা, নিষ্ঠুরতা, অসহিষ্ণুতা, সন্ত্রাস, স্বৈরাচার, মানবাধিকার লংঘন ও জ্ঞানবিমুখতার মত নেতিবাচক বিষয়সমূহ আপনা আপনিই ভেসে ওঠে।

পরিতাপের বিষয় এই যে, আজকের এই পৃথিবীতে এমন একটা মুসলিম দেশও খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যেখানে ইসলামী অনুশাসন সম্পূর্ণরুপে মেনে চলা হয়। আর একটি সম্পূর্ণ কার্যরত ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মডেলও খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব যেটাকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবে। এটাও অস্বীকার করার কোন অর্থ হয় না যে, মানবাধিকার বিষয়সমূহ নিয়ে নিঃসংকোচ গঠনমূলক এবং অপরাধবোধহীন আলোচনা থেকে মুসলিম জগত নিজেদের  বহুদিন যাবত দূরে সরিয়ে রেখেছে, (আমি নীচে এই সমস্ত এবং অপরাপর দুর্বলতা নিয়ে আলাপ করবো।)

এসমস্ত কারণে, এই বাস্তবতা অস্বীকার করার কারণ নেই যে, বর্তমানে ইসলামকে “আধুনিকতার বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত” বলে মনে করা হয়। সুতরাং Wilfred Cantwell Smith  যখন বলেন “শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, পশ্চিমের জনমানুষের মনে ইসলামের বিরুদ্ধে যে সমস্ত মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা ও আবেগ লালিত হয়ে আসছে, সে তুলনায় সমাজতন্ত্র বিরোধী পশ্চিমা ভীতি ও তিক্ততা অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী এবং গৌণ” তখন তাকে সঠিকই বলতে হয়।

বর্তমানে ইসলাম বিরোধী আবেগ বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়ে থাকে। যার মধ্যে অবজ্ঞা, বৈষম্য ও মারমুখী বর্ণবাদী নাস্তিকতাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। উদাহরণ স্বরুপ আমরা অবজ্ঞার ব্যাপারটাকেই বিশ্লেষণ করে দেখি। সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় স্থান পাওয়া Jostein Gaardner- এর Sofies World –এর মত প্রকাশনাসহ, দর্শনের ইতিহাসের উপর বহু পাঠ্য বই আমরা বছরের পর বছর প্রকাশ হতে দেখি। কিন্তু বলতে গেলে এর কোনটাতেই, মুসলিম দর্শনকে স্বীকৃতি দিতে দেওয়া হয়নি বা মুসলিম দর্শনের প্রতি কোন কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করা হয়নি। এর কোনটিতে হয়ত Ibn Sina বা  Ibn Rushd এর উল্লেখ থেকে থাকতে পারে। কিন্তু তা কেবল তাদের ল্যাটিন নাম বা Avicanna ও  Avevroses ব্যবহার করে এবং তাও, ক্যাথলিক পান্ডিত্যের উপর আলোচনার অধ্যায়ে পাওয়া যাবে।

Al Kindi, Al Razi, Al Farabi, Al Ashari, Mutazilah চিন্তাধারার জ্ঞানীগণ, Al Ghazzale, Al Suhrawardi এবং Ibn Al Arabi-র মত দর্শনের বিশাল ব্যক্তিত্বদের সাধারণতঃ এড়িয়ে যাওয়া হয়। অথচ এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, আজকের ইউরোপে যে গ্রীক ও হেলেনীয় ঐতিহ্য দেখতে পাওয়া যায়, তা মূলতঃ মুসলিম দার্শনিকগণ কর্তৃক ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সংরক্ষিত ও বিকশিত গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের কল্যাণে এসেছে- মুসলমানরা পাশ্চাত্যকে উপহার দিয়েছিল বা বলা যায় পাশ্চাত্যের কাছে হস্তান্তর করেছিল।

Muslim Andalusiaএর অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে যে প্রায়- অবিশ্বাস্য সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটেছিল, সে বিষয়ে অজ্ঞতা ক্ষমার অযোগ্য। অথচ সহজাতভাবে বলতে গেলেঃ ইসলাম এবং এর সভ্যতা সম্পর্কে অজ্ঞতাকে এখনো ইউরোপ বা আমেরিকায়, শিক্ষার অভাব বা জ্ঞানহীনতা বলে গণ্য করা হয় না।

পাশ্চাত্য যে নিজেদের তথা অন্যা্ন্য অমুসলিমদের ব্যাপার-স্যাপার এবং মুসলিম বিশ্বের বিষয়সমুহকে দ্বৈত মাপকাঠিতে বা Double Standard এ বিচার করে থাকে এটা স্পষ্ট এবং প্রমাণিত একটা সত্য। উদাহরণ স্বরুপ আমরা পশ্চিমা গণ-মাধ্যমগুলোর কথাই প্রথমে চিন্তা করিঃ মুসলিম বিশ্বের বাইরের কোন সন্ত্রাসী আক্রমণের কথা যখন খবরে প্রকাশ করা হয়, তখন “IRA চরমপন্থী” বা “ETA বিচ্ছিন্নতাবাদী”রা গ্রেনেড ছুঁড়ছে, এভাবে কথাটা প্রকাশ করা হয়- বিশ্লেষণগুলো একধরণের-কখন কোন কাজটা কোন “গোড়া ক্যথলিক” করেছে বলে আখ্যায়িত করা হয় না। এমনকি ১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে, Tokyo-র পাতাল রেলে বিষাক্ত Sarin গ্যাস ব্যবহার করে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, তাকেও গণমাধ্যম কেবল “চরমপন্থী গোষ্ঠীর” কাজ বলে আখ্যায়িত হয়েছে-কোন “ধর্মের গোঁড়া সমর্থক গোষ্ঠীর” বলে আখ্যায়িত করেনি। অপরদিকে, নিকটা প্রাচ্য বা আলজেরিয়ায় যদি কেউ একটা গ্রেনেড ছুড়েঁ থাকে, তবে সেই কাজের দায় ভার “গোড়াঁ মুসলিম” বা “মুসলিম মৌলবাদী”দের কাধেঁ চাপানো হবে- এমনকি যদি বা কাজটা কোন আরব খৃষ্টানের বা নাস্তিক Bathist এরও হয়।

আমার নিজের ব্যাপারটাই না হয় বিবেচনা করি। ১৯৯২ সালে, আমার Islam: The Alternative এর জার্মান সংস্করণ প্রকাশিত হবার কয়েক সপ্তাহ আগে, জার্মান গণ-মাধ্যমগুলো আমার বিরুদ্ধে এক “ঘৃণ্য প্রচারণা”র অভিযান চালায় এবং  মরক্কোতে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে আমাকে প্রত্যাহার করলে দেশে ডেকে পাঠানো হোক বলে দাবী তোলে। তারা অভিযোগ করে যে আমি নাকি পুরুষের একাধিক বিবাহ, মেয়েদের প্রহার এবং পাথর নিক্ষেপে শাস্তি, হাত ও পা কেটে ফেলে শাস্তি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে কথা বলেছি আমার মতে বইতে- অথচ আমার বইটা তারা কেউ পড়েও দেখেনি একবার যে তাতে কি আছে। (Salman Rushdie কে মুরতাদ বলার আগে তার বইটা অন্ততঃ পড়ে দেখা হয়েছিল)।

গণ-মাধ্যমগুলো কতগুলো বাধাঁধরা ধ্যানধারণার বেড়াজ়ালে আটকা পড়ে আছে বলে মনে হয়- বিশেষতঃ তারা যখন কোন গোলযোগের সাথে, ইসলামকে, একটা ধর্ম হিসেবে, সম্পৃক্ত করে-তাদের ভাব-সাবে মনে হয় যেন অপরাপর ধর্মীয় গোষ্ঠীর চেয়ে হিংসাত্মক কার্যকলাপের প্রতি ইসলামের একটা স্বাভাবিক আসক্তি রয়েছ। ইরাকী প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসাইনের কার্যকলাপকে যখন “একজন মুসলমানের” কার্যকলাপ বলে আখ্যা দেওয়া হয়, তখন আমরা এমন একটা লেখা খুজেঁ পাই না কেন যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের গগনচুম্বী অপরাধ সংঘটিত করার জন্য “গোড়াঁ খৃষ্টান স্ট্যালিন” কে অভিযুক্ত করা হয়েছে অথবা নাৎসী জার্মানীতে সংঘটিত অপরাধের জন্য “ক্যাথলিক এডলফ হিটলার”কে অভিযুক্ত করা হয়েছে?

মুসলমানদের প্রসঙ্গ না ওঠা পর্যন্ত, পশ্চিমা মিডিয়া তাদের খৃষ্টান পরিচিতিকে উহ্য রেখে থাকে। মুসলমানদের রাজনৈতিক কার্যকলাপের পেছনে রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা দেখতে পায় না তারা- বরং সেসবের পেছনে ধর্মীয় আদেশ ও সংকল্প আবিষ্কৃত হয়ে যায়। আসলে সত্যিই কি কেউ এই সত্য উদঘাটন করতে ইচ্ছুক যে ইতিহাসে কাদের অধ্যায় বেশী রক্তরঞ্জিত? খৃষ্টানদের না মুসলমানদের?

References

 

 

  1. Akbar S. Ahmad, “Bosnia: The last Crusade,” The Arab Review(London:1993)
  2. James and Mart Hefley, Arabs, Christians and Jews: Whose Side is God on? (Hannibal, MO: 1991)
  3. The Nazis Used this term to refer the demolition of Jewish property, organized by them all over the Germany, on 9 November 1938.
  4. David Pryce-Jones, At War with Modernity: Islamic Challenge to the West (London: 1992).
  5. Wilfred C. Smith, in What is Scripture? (London:1193)

সূত্রঃ বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ প্রকাশিত “ইসলাম ২০০০” গ্রন্থ

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
৩৩৬ বার পঠিত